📄 সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধের ক্ষেত্রে মানুষের শ্রেণীসমূহ
আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং যে যুদ্ধের আদেশ দিয়েছেন, ঐ যুদ্ধ যে ব্যক্তি পরিত্যাগ করে, সে তার অন্তরের সন্দেহ ও হৃদয়ের ব্যাধিতে পতিত হবার ফলে এবং আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট জিহাদ ছেড়ে দেয়ায় আসলে ফিত্নার মধ্যে পড়েই আছে। এ বিষয়টি সূক্ষ্মভাবে অনুভব করে দেখুন... নিশ্চয়ই এখানেই মানুষ তিন শ্রেণীভুক্ত:
১. এক শ্রেণী- তারা আদেশও দেয়, নিষেধও করে, আবার জিহাদও করে তারা মনে করেছে যে, ফিত্নার মূলোৎপাটন করার জন্যই এসব করছে কিন্তু আসলে তাদের ঐ কর্ম-কাণ্ডই হচ্ছে মস্ত বড় ফিত্নাহ্। উদাহরণে ঐ সকল যোদ্ধাদের উল্লেখ করা যেতে পারে যারা জাতির অভ্যন্তরীণ গোলযোগের সময় অস্ত্র ধরেছিল। যেমন 'খারিজী সম্প্রদায়'।
২. দ্বিতীয়তঃ এমন সব সম্প্রদায় যারা ঐ সৎকাজের আদেশ করা, অসৎকাজ হতে নিষেধ করা ও যুদ্ধ করা হতে পিছিয়ে থাকে যা দ্বারা ধর্ম পুরোপুরিই আল্লাহ্র হয়ে যায়। তারা পিছিয়ে থাকে এজন্য যে, তারা যেন বিপদে পতিত না হয়, অথচ তারা ঐ বিপদে পড়েই আছে। যারা নিজদেরকে ধার্মিক বলে মনে করে, তাদের অনেকেরই এ অবস্থা।
৩. তারা মনে করে যে তারা তাদের মিথ্যা ধারণা অনুযায়ী যে ফিত্নাহ্ হতে বাঁচার জন্য পলায়ন করেছিল, তদপেক্ষা অধিক বড় ফিত্নাতে ইতোমধ্যেই পতিত হয়েছে।
আসলে তাদের কর্তব্য হল, আদেশ দান ও নিষেধ প্রদানের মত গুরুদায়িত্ব পালন করা এবং নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ পরিহার করা। ওয়াজিব আদায় করা ও নিষিদ্ধ বিষয় ত্যাগ করা (এ দু'টি কাজই) ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। যেহেতু তাদের নাক্সসমূহ ঐ দু'টি কাজই একত্রে পালন করা বা পরিহার করা ছাড়া তাদের আনুগত্যই করবে না।
এমতাবস্থায় তার অবশ্য কর্তব্য হলো: সবচাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজটির প্রতি দৃষ্টি দেয়া। সুতরাং যদি আদিষ্ট বিষয়টি নিষিদ্ধ বিষয়টিকে ছেড়ে দেয়ার চাইতে অধিক সাওয়াবের হয়ে থাকে, তাহলে ঐ বিষয়টির সাথে সেটা অপেক্ষা কম ফাসাদের কোন বিষয় জড়িত হবার ভয়ে তাকে ছেড়ে দিবে না।
📄 আদেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রে আদম সন্তানদের পূর্ণতার অন্তর্ভুক্ত বিষয়
পৃথিবীর বুকে প্রত্যেকটি মানুষ তার আদেশ করা ও নিষেধ করা ছাড়া চলবে না এবং তাকেও আদেশ করা হবে ও নিষেধ করা হবে তা ভিন্ন কোন উপায় নেই। এমনকি সে একাকী হলেও নিজেকে নিজেই আদেশ দিবে ও নিষেধ করবে, সেটা হয়ত সৎকাজের না হয়ত অসৎকাজের হবে। নিশ্চয়ই আদেশ হলো কোন কাজ করতে বলা ও সেটার বাসনা করা। আবার নিষেধ হলো কোন কাজ পরিত্যাগের বাসনা করা।
আর প্রত্যেক প্রাণীরই তার অন্তরে আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদা আছে এবং ঐ কারণেই সে নিজের কাজের প্রয়োজনবোধ করে, যদি পেরে উঠে, তাহলে অন্যের কাজেরও প্রয়োজন অনুভব করে। যেহেতু ইন্সান জীবন্ত সে স্বীয় ইচ্ছায় চলাফেরা করে। আর আদম সন্তানগণ পরস্পর মিলে মিশে ছাড়া জীবন-যাপন করতে পারে না। যদি তারা দু'জন বা ততোধিক ব্যক্তি একত্রে মিলিত হয়, তাহলেই তাদের মধ্যে কোন বিষয়ে আদেশ এবং কোন না কোন বিষয় হতে নিষেধ করা না হয়েই পারে না।
যখন আদেশ করা ও নিষেধ করা আদম সন্তানদের পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত, তখন সে ব্যক্তি সৎকাজের আদেশ না করে, যার আদেশ দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ ও তদীয় রাসূল ﷺ, এবং অসৎকাজ হতেও বিরত করে না, যা হতে স্বয়ং আল্লাহ ও তদীয় রাসূল ﷺ নিষেধ করেছেন।
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গ্রন্থে তাঁর ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করতে (বান্দাকে) আদেশ করেছেন। এই সাথে মু'মিনগণের মধ্যে যারা নেতৃতস্থানীয় (দায়িত্বশীল) তাদের আনুগত্য করতেও আদেশ করেছেন। এ বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা বলেছেন: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ আনুগত্য কর ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যে যারা উপরস্থ তাদেরও। অনন্তর যদি তোমরা কোন বিষয়ে পরস্পর দ্বিমত হও, তবে ঐ বিষয়কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিকট উপস্থাপিত করে দাও...।” (সূরা আন্-নিসা ৪: ৫৯)
এখানে "উলুল আম্রি” দায়িত্বশীল ও সেটার অধিকারীগণ এবং ঐ সকল ব্যক্তিগণই মানুষকে সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করেন। দায়িত্বশীলগণ দু'শ্রেণীতে বিভক্ত: 'উলামা' ও 'উমারা' ('আলিম শ্রেণী ও আমীর শ্রেণী)। এখন তারা যদি ভাল হন তবে সাধারণ মানুষও ভাল হবে, আর তারাই যদি খারাপ হন তবে সাধারণ মানুষও খারাপ হয়ে যাবে।
তাদের প্রত্যেকের উপর করণীয় হলো: আল্লাহ যার আদেশ দিয়েছেন সেটার আদেশ দেয়া এবং আল্লাহ যা হতে নিষেধ করেছেন সেটা হতে নিষেধ করা এবং তার আনুগত্য করা যাদের জন্য অপরিহার্য, তাদের করণীয় হলো: যে সকল বিষয়ে আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্য হবে শুধু সে সকল বিষয়েই তার আনুগত্য করবে; আর আল্লাহ্র সাথে অবাধ্যতা হবে এমন কোন বিষয়েই তার প্রতি আনুগত্য করবে না।
📄 ‘আমালকে একমাত্র আল্লাহুর জন্য নির্দিষ্ট করা
যখন সমস্ত পুণ্য কাজে দু'টি বিষয় ছাড়া উপায় নেই, একটা হলো আল্লাহ্র সন্তুষ্টি বিধানের ইচ্ছা করা; দ্বিতীয়তঃ শারী'আত সম্মত হওয়া আর এটাই প্রয়োজন সকল কথা-বার্তা ও কার্যকলাপে। এ সম্পর্কে নাবী ﷺ হতে সহীহ্ হাদীসে পাওয়া গেছে যে, তিনি বলেছেন: “নিশ্চয়ই তিন ব্যক্তি এমন, যাদেরকে দিয়ে সর্বপ্রথম দোযখের আগুন জ্বালানো হবে। তাদের একজন হলো যে ব্যক্তি নিজে জ্ঞান অর্জন করেছে এবং অন্যকেও সেটা শিখিয়েছে... এজন্য যে, লোকে তাকে বলবে সে 'আলিম। দ্বিতীয় ব্যক্তি, যেজন যুদ্ধ করেছে... এজন্য যে, লোকে তাকে বলবে: সে বীর। তৃতীয় ব্যক্তি হলো, যে জন দান-খায়রাত করেছে এজন্য যে, মানুষ তাকে বলবে সে দাতা।”
এই যে তিন ব্যক্তি, যারা লৌকিকতা এবং প্রচারের আকাঙ্ক্ষা করছিল, তারাতো নাবীগণের পরেই তিন ব্যক্তির পাশের মর্যাদার যোগ্য ছিল সিদ্দীকীন, শুহাদা এবং সালিহীন।
১. নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি ঐ জ্ঞান অর্জন করবে- যে জ্ঞান সহকারে আল্লাহ তা'আলা তদীয় রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন এবং সে অন্যকে ঐ জ্ঞান শিক্ষা দিবে, যেন আল্লাহ সন্তুষ্ট হন, ইনিই হবেন 'সিদ্দীক'।
২. আর যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য দান করবেন তিনিই হবেন সালিহ্।
এজন্যই সম্পদে অপচয়কারী মৃত্যুক্ষণে পুনঃ পৃথিবীর জীবনে প্রত্যাবর্তনের দরখাস্ত করবে। যাকে সম্পদ দেয়া হয়েছে অথচ হাজ্জও আদায় করেনি, যাকাতও দেয়নি, সে মৃত্যু মুহূর্তে প্রত্যাবর্তন ভিক্ষা করবে। এ সুবাদে আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন বলেছেন: “তোমাদেরকে আমরা যে রিস্ক দিয়েছি সেটা হতে খরচ কর (আল্লাহ্ পথে) তোমাদের কারো নিকট মৃত্যু আসার পূর্বেই, তখন সে বলবে, হে আমার রব! হায় আমাকে যদি একটি নিকটবর্তী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সুযোগ দিতেন, তাহলে আমি দান-খায়রাত করতাম এবং নেক্কারদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।” (সূরা আল-মুনাফিকুন ৬৩ : ১০)
আর এ সকল বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক বিষয়সমূহ এমন হওয়া প্রয়োজন, যা দ্বারা আল্লাহ ও পরকাল সম্বন্ধে সংবাদ দিবে এবং যা ছিল ও হবে সত্যরূপে নির্ভুলভাবে, আর যার আদেশ দিবে এবং যা হতে নিষেধ করবে।
টিকাঃ
* আন্-নাসায়ী: ৬/২৩, কিতাবুল জিহাদ-বাবু মান কাতালা লি ইউক্বালা ফুলানুন জারিইউ ভিন্ন শব্দে, সে স্থানে এসেছে- “কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে সে হলো এক শহীদ... তাকে বলা হবে তুমি মিথ্যা বলছ, তুমি তো বীরত্বের জন্য যুদ্ধ করেছিলে।”
📄 ইসলাম-এর মর্মকথা
ভাল করে বুঝে নাও, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ দীন, যা সহ তিনি তদীয় গ্রন্থসমূহ অবতীর্ণ করেছেন, রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন; এসবই একমাত্র আল্লাহ তা'আলা (তার বান্দা হতে) নেক 'আমাল ইচ্ছা করেন বলেই। আর এটাই হলো সাধারণ ইসলাম, যা ব্যতীত আল্লাহ তা'আলা আর কিছুই কারও নিকট হতে গ্রহণ করবেন না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা তা স্পষ্টভাবে বলেছেন: “আর যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম অন্বেষণ করবে, তবে সেটা তা হতে গৃহীত হবে না। আর সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সূরা আ-লি-'ইমরান ৩: ৮৫)
“আল-ইসলাম” শব্দটি দু'টি অর্থ প্রকাশ করে। তাদের একটি হলো আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য। অতএব (মুসলিম) অহংকারী হবে না। দ্বিতীয়টি হলো একনিষ্ঠতা; একত্ববাদ, নির্দিষ্টকরণ (ইখলাস)। সুতরাং সে মিলিতভাবে নয়। আর সেটা হলো যে, বান্দা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা- যিনি বিশ্বপ্রতিপালকের নিকটই আত্মসমর্পণ করবে।
যেমন- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা বলেছেন: “ইব্রাহীমের ধর্ম হতে ঐ ব্যক্তিই মুখ ফিরাবে, যে মূলতঃই নির্বোধ আর আমি তাকে দুনিয়ায় নির্বাচিত করেছি... যখন তাকে তার প্রভূ বললেন, 'অনুগত হও', তিনি বললেন: আমি অনুগত হলাম বিশ্বপালকের।” (সূরা আল-বাকারাহ্ ২: ১৩০-১৩২)
আপনি বলে দিন, নিশ্চয়ই আমার নামায এবং আমার সকল 'ইবাদাত এবং আমার জীবন এবং আমার মরণ এ সমুদয় একমাত্র আল্লাহ্রই জন্য, যিনি সমগ্র বিশ্বের অধিপতি। তাঁর কোন শারীক নেই। “মুতাআদ্দি” সকর্মক ও ব্যবহৃত হয়, তখন ধাতু নির্গত ক্রিয়া যোগ থাকে। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা বলেছেন: “তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি তার মুখমণ্ডলকে আল্লাহ্র সমীপে সোপর্দ করে এবং সে মুহসিন তথা উচ্চস্তরের নিষ্ঠাবানও; তার জন্য পুরস্কার রয়েছে তার প্রতিপালকের কাছে।”
এ দীন হলো নিষ্ঠার সাথে স্বীয় সত্তাকে আল্লাহ্র সমীপে সোপর্দ করা। আল্লাহ তা'আলা তো ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, নিশ্চয়ই প্রত্যেক ব্যক্তিই যিনি নিজের মস্তক নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ তা'আলার সামনে নুইয়ে দিবে, তার প্রতিপালকের নিকট তার জন্য পুরস্কার রয়েছে। আর এমন লোকদের কোন ভয়ও থাকবে না, আর তারা চিন্তান্বিতও হবে না।