📄 আল্লাহুর পছন্দ অনুযায়ী পছন্দ এবং আল্লাহুর অপছন্দ অনুযায়ী তা অপছন্দ
এটার মৌলিক বিষয়টি হচ্ছে এই যে, মানুষ সকলেই প্রত্যেকটি সৎকাজকে ভালবাসবে এবং প্রতিটি অসৎকাজকেই ঘৃণা করবে। আবার সৎকাজ করার সদিচ্ছা ও অসৎকাজকে অপছন্দ করা ও ঘৃণা করা ঠিক আল্লাহ্ তা'আলার পছন্দ ও অপছন্দ অনুযায়ীই তা হতে হবে। এই সাথে তার কোন কিছুকে ভাল মনে করে তা পালনের ইচ্ছা বা ঘৃণাবশতঃ তাকে খারাপ মনে করে না করার শারী'আত সম্মত ইচ্ছা বা অনিচ্ছা হচ্ছে যে, সে প্রিয় ও ভাল বিষয়টি কাজে পরিণত করবে এবং যথাসাধ্য অপ্রিয় ও খারাপ বিষয়গুলোকে প্রতিহত করবে।
যেহেতু আল্লাহ তা'আলা কোন প্রাণীকেই তার সামর্থ্যের মাত্রাতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং বলেছেন: “অতএব তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো।” (সূরা আত্-তাগাবুন ৬৪: ১৬) আর এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে আল্লাহ্র প্রতি ঈমানে ত্রুটি না পাওয়া গেলে কখনও আল্লাহ্র প্রতি ভয় কম হবে না। আর যে শারীরিক কাজ-কর্ম তা তো মানুষের শারীরিক শক্তি অনুযায়ীই হবে।
আর যখনই মানুষের কোন কিছু করার মানসিক ইচ্ছা প্রবল ও পরিপূর্ণ হবে, অথবা সেটার প্রতি ঘৃণা প্রবল বা পরিপূর্ণ হবে এবং ব্যক্তির ইচ্ছানুযায়ী সামর্থ্যানুসারে হবে তখনই তাকে তার কাজের পরিপূর্ণ প্রতিফল দেয়া হবে। এ কথা সত্য যে, মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছেন যার প্রীতি-অপ্রীতি, কামনা-বাসনা বা ঘৃণা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-এর ভালবাসা, অথবা পছন্দ-অপছন্দ অনুযায়ী না হয়ে, বরং তা তার নক্সের অন্তরের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী হয়ে থাকে। আসলে এটা এক ধরনের কু-প্রবৃত্তি। যদি মানুষ একেই শিরোধার্য করে নেয়, তাহলে তো তার নিজ প্রবৃত্তিরই দাসত্ব করল। এ লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা প্রদত্ত পথনির্দেশনা ছাড়া স্বীয় প্রবৃত্তির দাসত্ব করে, তার চাইতে বেশি পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে?"- (সূরা আল-ক্বাসাস ২৮: ৫০)।
প্রিয় নাবী বলেছেন: তিনটি বিষয় আছে যা মানুষকে রক্ষা করতে পারে- ১. গোপনে-প্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করা। ২. অভাব ও প্রাচুর্যের মধ্যপথে চলা। ৩. রাগ বা খুশি উভয় অবস্থাতেই হক/সত্য কথা বলা। অপরপক্ষে ধ্বংসকারীও তিনটি বিষয় রয়েছে: ১. এমন কৃপণতা যার আনুগত্য করা হচ্ছে। ২. এমন প্রবৃত্তি যার অনুসরণ করা হচ্ছে। ৩. ব্যক্তির নিজেকে নিয়ে নিজে নিজে খুশি বা আনন্দিত হওয়া।
ব্যক্তি প্রিয় বস্তু বা অপ্রিয় বস্তুর উপস্থিতিকালে রুচি, ভালবাসা বা ঘৃণার অনুসরণ করে থাকে। অনুরূপ প্রেম, ইচ্ছা ইত্যাদিও। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তদীয় রাসূল-এর আদেশ ব্যতিরেকেই সেটার অনুসরণ করবে, সে আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান ছাড়াই স্বীয় প্রবৃত্তির দাসত্বকারীদের অন্তর্ভুক্ত। বরং তার এ অবস্থা তাকে নিয়ে এতদূর গড়াতে পারে যে, সে স্বীয় প্রবৃত্তিকেই সর্বকর্তা তথা ইলাহ্ বানিয়ে নিবে।
অতএব যারাই আল-কুরআন ও সুন্নাহ্ নীতির বাইরে চলে গেছে- যাদেরকে 'উলামাহ্ ও দরবেশ সম্প্রদায়ভুক্ত বলে ধরা হয়, তাদেরকেই 'প্রবৃত্তির অনুসরণকারী' বলে আখ্যা দেয়া হবে। দীন সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহ সে হিদায়াত (পথ নির্দেশনা) যা দিয়ে তিনি তাঁর রাসূল-কে পাঠিয়েছিলেন- তাছাড়া কোনরূপেই হতে পারে না।
অতএব ব্যক্তির অবশ্য কর্তব্য হল, সে যেন তার নিজের পছন্দ ও অপছন্দের প্রতিই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং পছন্দ-অপছন্দের সঠিক পরিমাণ তলিয়ে দেখে- সেটা কি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-এর আদেশ মতোই আছে? সেটা কি আল্লাহ্র পথ নির্দেশনা মুতাবিক- যা তিনি তাঁর রাসূল-এর প্রতি অবতীর্ণ করেছিলেন, যাতে তিনি ঐ পছন্দ ও অপছন্দ মেনে চলতে আদিষ্ট হতে পারেন-হচ্ছে। যাতে সে (ব্যক্তি) ঐ বিষয়ে আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের আগে বেড়ে ধৃষ্টতা প্রদর্শনকারী হয়ে না পড়ে।
সেটার বাস্তবায়ন হল, নিশ্চয়ই সৎকাজে আদেশ দান ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা, সবচাইতে অবশ্য করণীয়, সবচাইতে উত্তম ও সবচাইতে সুন্দর। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা বলেছেন: “তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য যে, তোমাদের মধ্যে উত্তম কাজ সম্পাদনকারী কে?” (সূরা আল-মুল্ক ৬৭ : ২)
সেটা ঠিক আল্-ফুযাইল বিন ইয়ায (রাযি.)-এর উক্তিরই অনুরূপ : "কাজ যতই খালিস আল্লাহ্র জন্য হবে ততই সঠিক হবে। কেননা যখন কাজ (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ) একমাত্র আল্লাহ্র জন্য হবে অথচ সঠিক হবে না, তখন সেটা গৃহীত হবে না। আবার যখন কাজটি শুদ্ধই হয়েছে অথচ একমাত্র আল্লাহ্রই জন্য হয়নি, তখন সেটাও গৃহীত হবে না যতক্ষণ না খালিস হবে, সঠিক হবে এবং শুধু একমাত্র আল্লাহ্র জন্য হবে। আর কাজ তখনই সঠিক হবে, যখন রাসূল-এর সুন্নাত মুতাবিক হবে।
টিকাঃ
১. সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় করার মানদণ্ড হচ্ছে ব্যক্তির ঈমান। যার ঈমান যে পরিমাণে বেশি বা কম, আল্লাহ্র প্রতি তার ভয়ের মাত্রাও সে পরিমাণে বেশি বা কম হবে।
২. জ্ঞানানুযায়ী কাজ না করার অর্থই প্রবৃত্তির অনুসরণ করা। কারণ জ্ঞান মানুষকে সত্য পথে পরিচালনা করে, প্রবৃত্তি তার বিপরীতমুখী।
৩. ওয়াহীর জ্ঞানের অর্থ নেওয়া হয়েছে।
📄 সৎকাজে আদেশ দেয়া ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করার ক্ষেত্রে শর্তাবলী
১। তার কাজ সুষ্ঠু হবে না যদি না সেটা পরিমিত শিক্ষা ও তীক্ষ্ণজ্ঞান ভিত্তিক হয়। যেমন- 'উমার বিন 'আবদুল 'আযীয (রহ.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি বিনা বিদ্যায় আল্লাহ্র 'ইবাদাত করে, সে যতটুকু ভাল করে, তার চাইতে খারাপই বেশি করে।" যেমন- মা'আয বিন জাবাল (রাযি.)-এর হাদীসে আছে: "কাজ করার আগে প্রয়োজন জ্ঞান; কাজের স্থান হল বিদ্যার্জনের পর।" এটা তো একেবারেই স্পষ্ট। কেননা ইচ্ছা করা ও কর্ম সম্পাদন করা যদি জ্ঞানের আলোকেই না হয়, তাহলে সেটাই মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতা, সর্বোপরি প্রবৃত্তির অনুসরণ।
২। উত্তম হল: আদেশ বা নিষেধ করা। যেমন, সিরাতাল মুস্তাকীম তথা সরলপথ অনুযায়ী হয়। আসলে সিরাতাল মুস্তাকীম হল- উদ্দেশ্য অর্জনের দিকে অতি দ্রুত পৌঁছাবার মত সংক্ষিপ্ত তথা নিকটতম পথ।
৩। সুনম্র ব্যবহার ঐ কাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। যেমন- নাবী বলেছেন: “যে বিষয়েই নম্রতা পাওয়া গেছে তা সে বিষয়কেই সুশোভিত করেছে, আবার যে বিষয়েই খানিকটা কঠোরতা পাওয়া গেছে তা সে বিষয়কেই অশোভিত করেছে- দৃষ্টিকটু করে ফেলেছে।” নাবী বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ দয়াশীল, প্রত্যেকটি বিষয়েই নম্র ব্যবহার তিনি পছন্দ করেন, নম্রতাপূর্ণ ব্যবহারের ফলে তিনি যা দান করেন কঠোরতার কারণে তা দেন না।"
৪। আদেশ দানকারী বা নিষেধকারীকে অবশ্যই কষ্টে সহিষ্ণু ও ধৈর্যশীল হতে হবে। কেননা, এ কথা সত্য যে, তার উপর বিপদ আসবেই। এমন সময় যদি সে ধৈর্য ধারণই না করে, সহ্যই না করে, তাহলে সে যা ভাল করতে পারত তার চাইতে নষ্টই করে বসবে বেশি। যেমন- লুকমান হাকীম তদীয় তনয়কে উপদেশ দানকালে বলেছিলেন: "এবং (হে বৎস)! সৎকাজ আদেশ দান কর এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ কর, (এ কাজ করতে যেয়ে) তোমার উপর যে বিপদ আপতিত হবে তাতে ধৈর্য অবলম্বন কর, নিঃসন্দেহে সেটা একটি মহৎ কাজ।” (সূরা লুকমান ৩১: ১৭)
নাবী-কে রাসূল হিসেবে সৃষ্টি জগতে প্রেরণের আয়াতগুলো ভীতি প্রদর্শনমূলক বিষয় দ্বারাই শুরু তথা সূচনা করেছেন এবং ধৈর্য ধারণের আদেশ দানের মাধ্যমে শেষ করেছেন। মূলতঃ শাস্তির ভয় প্রদর্শনই হল সৎকাজে আদেশ দান ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা।
সুতরাং শিক্ষা, নম্রতা ও ধৈর্য- এ তিনটি বিষয় ছাড়া কোন ক্রমেই চলবে না। আদেশ করা বা নিষেধ করার পূর্বেই জ্ঞানের দরকার এবং সে সঙ্গে নম্রতা, আর এটার পরেই প্রয়োজন ধৈর্যের। যদিও এ ত্রিবিধ বিষয়গুলোই সর্বাবস্থাতেই একই সঙ্গে পাওয়া যেতে হবে। যেমন- সাল্ফে সালিহীনদের কোন একজনের উক্তি: "যিনি সৎকাজে আদেশ করবেন ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করবেন, তিনি যদি ঐ বিষয়ে সুবিজ্ঞ 'আলিম তথা ফকীহ্ না হন, তাহলে তিনি তা করতে পারেন না। অনুরূপ তিনি যে বিষয়ে আদেশ দিবেন, সে বিষয় নম্র হবেন এবং যে বিষয় হতে নিষেধ করবেন সে বিষয়েও নম্র হবেন এবং যে বিষয়ে আদেশ দিবেন সে বিষয়ে তাকে সহিষ্ণু হতে হবে, আবার যে বিষয় হতে নিষেধ করবেন সে বিষয়েও তাকে সহিষ্ণু হতে হবে।" তা না হলে তিনি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করতে পারবেন না।
📄 জাতির পাপকাজেই বিপদের তথা দুর্ভোগের কারণ এবং পুণ্যের কারণে প্রাচুর্য আসে
এটা জানা কথা- আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিদর্শনসমূহ হতে আমাদের ভিতরকার বা তার সৌরমণ্ডলীয় যা আমাদেরকে দেখিয়েছেন আর তাঁর মহাগ্রন্থে যেসব বিষয়ে প্রমাণ উপস্থাপন করেছে, নিশ্চয়ই পাপসমূহই দুঃখ-দুর্দশার (একমাত্র) কারণ। সুতরাং কঠিন বিপদাপদ ও জঘন্য জঘন্য শাস্তি হয়ে থাকে শুধু জঘন্য ধরনের কুকর্মের কারণেই। অপরপক্ষে পুণ্য তথা সৎকাজ বয়ে আনে পুরস্কার। সুতরাং ব্যক্তির উত্তম কর্ম সম্পাদনই আল্লাহ্র পক্ষ হতে উত্তম পুরস্কারের কারণ।
এ সুবাদে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা বলেছেন: “আসলে তোমাদেরকে যেসব বিপদাপদে পেয়ে গেছে, সেটা তোমাদের হস্তসমূহেরই অর্জিত ফল, অথচ আল্লাহ তা'আলা অনেক বিষয়ই ক্ষমা করে থাকেন।" (সূরা আশ্-শূরা ৪২: ৩০)
নূহ্ ('আ.)-এর জাতির এরূপ আরও পাপী জাতিসমূহ যেমন- 'আদ, সামূদ, লূত নাবীর জাতি, মাদায়িনবাসী এবং ফির'আওনের জাতিকে এ পৃথিবীতেই কিসের জন্য আল্লাহ তা'আলা শাস্তি দিয়েছিলেন, সে সংবাদ তিনি দিয়েছেন। আবার পারলৌকিক জগতেও কিভাবে শাস্তি দিবেন তাও বলে দিয়েছেন। এজন্যই ফির 'আওন সম্প্রদায়ভূক্ত একজন মু'মিন ব্যক্তি বলেছিলেন: "হে আমার জাতি! আমি নিশ্চয়ই তোমাদের উপর বিপদের দিনে আসা বিপদের মত (আর একটি) আসন্ন বিপদের ভয় করছি। যেমন হয়েছিল নূহ্ ('আ.)-এর জাতির প্রতি, ওই দিকে 'আদ, সামূদ এবং যারা তাদের পরবর্তীকালে। আসলে আল্লাহ তো কখনই তার বান্দাদের প্রতি অত্যাচার চান না। হে আমার জাতি! আমি তোমাদের জন্য আশংকা করি উচ্চৈঃস্বরে আর্তনাদের সেদিনের (শাস্তির) ভয় করছি। যেদিন তোমরা পিঠটান দিয়ে পলায়নপর হয়ে চলে যাবে। আল্লাহ্র শাস্তি হতে রক্ষাকারী তোমাদের জন্য আর কেউই থাকবে না।"
আল্লাহ তা'আলা সাধারণভাবে সতর্কবাণী সম্বলিত সূরাসমূহে পৃথিবীতে পাপীদেরকে কিরূপে শাস্তি দিলেন এবং পরকালে তাদের জন্য কিরূপ শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন তা উল্লেখ করে থাকেন। আবার কোনও বিশেষ সূরায় শুধু আখিরাতের ওয়া'দা সম্পর্কিত বিষয়ই উল্লেখ করে থাকেন। যেমন- আখিরাতের 'আযাব অত্যন্ত কঠিন এবং অপরদিকে সে কাজের প্রতিদানে সাওয়াবও বৃহত্তর এবং তা-ই হল (মু'মিনদের জন্য) স্থায়ী বাসস্থান।
যেমন- ইউসুফ ('আ.)-এর ঘটনায় আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: “এবং এভাবে আমরা ইউসুফের জন্য এ পৃথিবীতে স্থান করে দিলাম (সুবিধা করে দিলাম), সে তার যেখানে ইচ্ছা সেখানেই অবস্থান গ্রহণ করবে। আমাদের অনুগ্রহ যাকে আমরা ইচ্ছা করব, তাকেই পৌঁছাব। অথচ নিষ্ঠাবান ও সৎকর্মশীলদের কাজের মূল্য আমরা নষ্ট করি না। আসলে যারা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহকে মূলতঃ ভয় করে তাদের জন্য পরকালের পারিশ্রমিকই উত্তম।” (সূরা ইউসুফ ১২: ৫৬-৫৭)
অনুরূপভাবে সূরা নূন ওয়াল্ কালামে সে অপরাধী (বাগানের বা শষ্য ক্ষেতের) মালিকদের কাহিনী বর্ণনা করেছেন, যারা তাদের ধন-সম্পদের হক আদায় করতে অস্বীকার করেছিল। ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে শাস্তি দিয়েছিলেন। এসব বর্ণনার পর বলেছেন: “এভাবেই এরূপই 'আযাব হয়ে থাকে এবং পরকালের 'আযাব এটা অপেক্ষা গুরুতর। যদি এরা জানত।" (সূরা আল-কালাম ৬৮: ৩৩)
আর এভাবেই আল্লাহ্ পক্ষ হতে প্রকৃত জ্ঞান আসার পর যদি তারা প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে, তবে সেটা তাদেরই নিজ হাতের কর্ম ফল। আসলে মানুষের জন্য যা উপকারে আসবে, সেটাই শুধু পৃথিবীতে জমা হবে এবং এটা নিঃসন্দেহে একটি ইসলামী জিহাদের সমতুল্য। যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎকর্ম সম্পাদন করেছে, এরাই হচ্ছে সফলকাম সম্প্রদায়। আর এই যে জানাযাসমূহ, এটাই আহলে সুন্নাহ্ ও বিদ'আতীদের মধ্যে পৃথককারী মহা প্রাচীর।
📄 তাদের অনুসরণে ফিত্নার কারণসমূহ
আসলে যে ব্যক্তি সংঘটিত ফিত্নাসমূহকে ভালভাবে অনুধাবন করে দেখতে পেয়েছে যে, ঐগুলোই সেটার কারণ এবং জাতির আমীর 'উমরাঙ্গণও 'আলিমগণের মধ্যে যা ঘটছে তাও দেখতে পেয়েছে। আরও দেখতে পেয়েছে যে, জাতির রাজা বাদশাহ্ ও শাইখ মাশায়েখণের কারা ঐ ফিত্নায় প্রবেশ করেছে আর তাদেরকে অনুসরণ করেই বা কারা উক্ত ফিত্নায় পতিত হয়েছে। এটাই ঐ ফিত্নার মূল কারণ। তদুপরি বিপথগামিতা ও পথভ্রষ্টতার কারণসমূহও সেটারই অন্তর্গত। যেমন- ধর্মীয় বিষয়ে যথেচ্ছাচারিতা এবং রিপুবৃত্তি, ধর্মে বিদ'আত আনয়ন ও পৃথিবীতে পাপাচার করা।
নাক্স চাইবে যে অন্যের যা লাভ হয়েছে নিজের জন্যও তা অর্জিত হোক। আর এটাই হল "গিত্তাহ্” (কোন কিছু লাভ করতে মানসিক প্রতিযোগিতা) যা দ্বিবিধ পরশ্রীকাতরতার মধ্যে নিকৃষ্টতর। কেননা নাক্স সর্বদাই অন্যের উপর স্বীয় প্রাধান্য ও আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষাই করে থাকে এবং অন্যকে ব্যতীত আপনাকে অগ্রগণ্য মনে করে ও ঈর্ষান্বিত হয়ে পরের প্রাচুর্য ও ঐশ্বর্য বিলীন হয়ে যাক এ আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে থাকে; যদিও সেটা অর্জিত না-ই হোক। আর তাতেই রয়েছে উচ্চাভিলাষ ও অনাসৃষ্টির উদগ্র বাসনা ও পরশ্রীকাতরতার কারণ হল এমন বাসনা যে, কোন ব্যাপারে কাম-বাসনা চরিতার্থ করতে অন্য কাউকেও ছাড়া এককভাবে তাতে বিশেষায়িত হওয়া। তবে যখন এরূপ নাক্স দেখবে যে অন্য কেউ ঐ ইপ্সিত ব্যাপারে ইতোমধ্যেই স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করে এবং ঐ বিষয়ে নিজেকে এককভাবে বিশেষিত ও অধিকারী করে নিয়েছে, তখন ব্যাপারটি কেমন হবে?
এ কথা সর্বজনবিদিত যে, যদিও এ সকল পাপাচারই ধর্মীয়ভাবে ও জ্ঞানের কাছে ঘৃণিত ও অপ্রসংশিত- তবুও স্বাভাবিকভাবে আত্মা ও রিপুর কাছে সেটা বড়ই স্বাদের। এ বিষয়ে নাবী ﷺ হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি ﷺ বাণী প্রদান করেছেন: “তোমরা সম্পদলিপ্সার কাছেও যেও না (সম্পদ-লিপ্সা হতে বেঁচে থাকো) কেননা নিশ্চয়ই সেটা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস করে ফেলেছিল। সম্পদলিপ্সা তাদেরকে কৃপণতা করতে আদেশ দিয়েছিল, ফলে তারা কার্পণ্যই করেছিল, সেটা তাদেরকে যুগ্ম-নির্যাতনের নির্দেশ দিয়েছিল, ফলে তারা (অর্থ লোভে মোহান্ধ হয়ে) যুগ্ম-নির্যাতনই করেছিল। অর্থলোভ তাদেরকে আত্মীয়তার সম্পর্কচ্ছেদ করতে আদেশ করেছিল, এতে তারা সম্পর্কচ্ছেদও করেছিল।”
অতএব এই যে সম্পদের প্রতি লিপ্সা- যা অন্তরের অতিমাত্রায় লোভ- তা ব্যক্তিকে তার করণীয় কাজ হতে ফিরিয়ে রেখে কৃপণতায় বাধ্য করে, পরের সম্পদ হরণের মাধ্যমে যুগ্ম করতে বাধ্য করে, নিকটাত্মীয়- স্বজনদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে বাধ্য করে এবং ঈর্ষাপরায়ণ করে তোলে- সেটা হল, অপর ব্যক্তি যার অধিকারী হয়েছে তাকে অপছন্দ করা ও তার বিনাশ কামনা করা। আসলে পরশ্রীকাতরতার মধ্যে কৃপণতা ও যুগ্ম বিদ্যমান।
যখন তাতে ব্যক্তি ভিত্তিক কারণ সংঘটিত হবে তখন তাতে দু'প্রকারের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। তাদের প্রথমটি: তাতে যে একক অধিকার ও যুগ্ম রয়েছে তজ্জন্য তাকে ঘৃণা করা, যেমনটি ঘটে থাকে মৌলিকভাবে বৈধ বিষয়গুলোতে। দ্বিতীয়টি: সেটার মধ্যে যে, আল্লাহ্র হক রয়েছে এজন্য তাকে ঘৃণা করা। আর ঠিক এ জন্যই গুনাহ্ (অপরাধ) তিন প্রকার যথা: ১. যাতে মানুষের উপর যুগ্ম করা রয়েছে; ২. যাতে আত্মার প্রতি অত্যাচার (যুল্ম) হয়ে থাকে; ৩. যাতে উভয়বিধ দু'টি বিষয়ই একত্র হতে পারে।