📄 শাসকদের অত্যাচারে ধৈর্য ধারণ
এজন্যই নাবী শাসকদের অত্যাচারে ধৈর্য ধারণের আদেশ দিয়েছেন এবং তারা যতদিন পর্যন্ত নামায যথারীতি প্রতিষ্ঠা করতে থাকবে, ততদিন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নিষেধ করেছেন। এ মর্মে নাবী ইরশাদ করেছেন: “তোমরা তাদের (শাসকদের) প্রাপ্য তাদের কাছে পৌঁছিয়ে দাও এবং তোমাদের প্রাপ্য আল্লাহ্র কাছে চাও।” এ বিষয়ে অন্যত্র বিশদ আলোচনা করেছি।
এ কারনেই আহলে সুন্নাহ্ ওয়াল জামা'আহ্-এর মূল নীতিসমূহের অন্তর্গত:
১. দলবদ্ধ জীবন-যাপন করা।
২. শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ না হওয়া।
৩. ফিত্নার সময়ে যুদ্ধ পরিহার করা।
অথচ প্রবৃত্তির আজ্ঞাবহ যারা। যেমন- মুতাযিলারা, তারা শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে তাদের ধর্মের মূলনীতি বলে গণ্য করে থাকে। ওদিকে মুতাযিলারা তাদের ধর্মের মূলনীতি নির্ধারণ করে নিয়েছে নিম্নের পাঁচটি বিষয়কে: এমন (তাওহীদ) যা দ্বারা আল্লাহ্র গুণরাজিকে বাদ দেয়া হয়েছে; এমন (ন্যায়বিচার) যা দ্বারা তাব্দীরকে মিথ্যা বানানো হয়েছে; এমন (স্থান) যা দু'স্থানের মধ্যবর্তী; এমনতর (ধমকিকে) কার্যকর করা; এবং সৎকাজ আদেশ দান করাও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা। এমনভাবে, যাতে শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা পর্যন্ত রয়েছে। এ সম্পর্কে অন্যত্র আলোকপাত করেছি।
টিকাঃ
১. অর্থাৎ- অত্যাচারী শাসকদের সময় নিজেদের দা'ওয়াতই শাসকদের প্রাপ্য আর শাসকদের পক্ষ হতে দা'ওয়াত গ্রহণ তোমাদের প্রাপ্য, এটা আল্লাহ্র কাছে চেয়ে নিতে হবে। উল্লেখিত হাদীসখানা বুখারী ও মুসলিম; ইবনে হাম্বল ১/৪৩২; আত্-তিরমিযী: ৪/৪৮২; কিতাবুল ফিতান: হা: নং- ২১৭ দ্রষ্টব্য।
📄 মঙ্গল আনার চেয়ে অমঙ্গল দূর করাই শ্রেয়
এটার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়টি হচ্ছে, যা সাধারণ নিয়মনীতির আওতায় আসে। যখন ভাল ও মন্দ এবং পাপ ও পুণ্যের মাঝে দ্বন্দ্ব বাঁধতে বা একত্রে পাশাপাশি জমা হয়ে ভীড় সৃষ্টি করবে, তখন উত্তম বিষয়টিকেই প্রাধান্য দিতে হবে। কেননা নিশ্চয়ই আদেশ ও নিষেধ যদিও মঙ্গল বিধান করা ও অমঙ্গল দূর করাকে সংশ্লিষ্ট করে থাকে, তবুও পরস্পর দ্বন্দ্বের সময় বিপরীত বিষয়টির প্রতিই দৃষ্টি ফেলতে হবে। যদি দেখা যায় যে, একটি বিষয়ে (স্থান-কাল-পাত্র ভেদে) আদেশ দান করলে তথায় মঙ্গল বিধান করা সম্ভব হবে না, সেটা বরং অমঙ্গল ডেকে আনবে, এমতাবস্থায় ঐ বিষয়টি সম্পর্কে আদেশ দেয়ার কোনই হুকুম থাকবে না, বরং আদেশ দেয়াই হবে নিষিদ্ধ। কেননা তাতে মঙ্গলের চাইতে অমঙ্গলই বেশি।
আসলে কল্যাণ-অকল্যাণের পরিমাপ নির্ধারণ করা হবে শারী'আতের নিক্তিতে। মানুষ যখন কুরআন ও হাদীসের সরাসরি বর্ণনা মেনে চলতে সক্ষম হবে, তখন তারা সেটা হতে আর দূরে সরে যাবে না। পক্ষান্তরে যদি তা না পারে, তাহলে তারা সমরূপ বিষয় ও দৃষ্টান্তবলী জানার জন্য নিজস্ব রায় বা দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ইজতিহাদ করতে শুরু করবে। কুরআন ও হাদীসের মূল বক্তব্য তা ঐরূপ মানুষের খুব অল্পই প্রয়োজন বোধ করে থাকে, যারা ঐ বক্তব্যসমূহ ও সেটার অন্তর্নিহিত আহ্কামের প্রতি সূক্ষ্ম ইঙ্গিতাদি সম্বন্ধে পুরাপুরি ওয়াকিফহাল বা জ্ঞাত।
এটার উপর ভিত্তি করেই বলা যায় যে, যখন কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পাপ ও পুণ্যকে একত্রিত করে ফেলবে এমনভাবে যে, ঐ পরস্পর বিরোধী দু'প্রকারের কাজের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য করছে না। করছে তো পাপ পুণ্যের উভয়বিধ কাজ একত্রে করে যাচ্ছে, আবার ছাড়ছে তো উভয়বিধ কাজকে একত্রেই ছাড়ছে, তবে তাদেরকে সৎকাজের আদেশ দেয়া তো বৈধ হবে না, আবার অসৎকাজ হতে নিষেধ করাও বৈধ হবে না, বরং দেখতে হবে যে, যদি সৎকাজ বেশি হয় তাহলে সৎকাজেরই আদেশ দেয়া হবে। আর যদি এমনই হয় যে, সেটার চেয়ে নিম্নমানের (অসৎ) কাজকে জরুরী মনে করে এবং অসৎ হতে নিষেধও করে না, তাহলে সেটার চেয়েও বড় (উত্তম) কাজ বাদ পড়ে যাবার কারণ হবে। তখন বরং ঐ কাজ হতে নিষেধ করা হবে আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল-এর আনুগত্য নিঃশেষ হয়ে যাওয়া ও সৎকাজ বিলীন হয়ে যাবার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
এহেন পরিস্থিতিতে যদি অসৎকাজই প্রবল হয়ে থাকে যা হতে নিষেধ করা হয়েছে এবং যদি সেটার চাইতে কম মানের (সৎ) কাজ বিলীন হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং ঐ সৎকাজের জন্য আদেশ করা উক্ত অতিরিক্ত অসৎকাজের কারণ হয়ে উঠে, তাহলে সেটা হবে অসৎকাজে আদেশ দেয়া ও আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল-এর অবাধ্যতায় সচেষ্ট হওয়া।
অথচ যদি সৎকাজ ও অসৎকাজ সমান সমান হয় এবং উভয়টি ওৎপ্রোতভাবে জড়িত, অবস্থা এমন যে, তাদের কোনটিরই আদেশও দেয়া হয়নি আবার নিষেধও করা হয় না। সুতরাং এবার আদেশও করা চলে, আবার নিষেধও করা চলে। অন্যবার কিছুই চলে না। কারণ এখানে সৎকাজ অসৎকাজ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এবং ঐগুলো প্রাত্যহিক কিছু বিশেষ বিষয়ের মধ্যে বিদ্যমান পাওয়া যায়।
অথচ যদি প্রকারের দিকের কথা তুলি, তবে সাধারণভাবে সৎকাজেরই আদেশ দেয়া হবে এবং অসৎকাজ হতে মূলতঃ সাধারণভাবে নিষেধই করা হবে। অসৎকাজের কোন একজন কর্মীকে অথবা একটি দলকে সেটার সৎকাজের জন্য আদেশ দেয়া হবে এবং সেটার অসৎকাজ হতে নিষেধও করতে হবে। সেটার ভাল কাজ-কর্মের প্রশংসাও যেমন করা হবে, তার খারাপ কাজ-কারবারের জন্য তেমনই যথাযথ নিন্দাও করা হবে, যেন কোন সৎকাজে আদেশ করার কারণে তার চাইতেও কোন ভাল কাজে খোয়া না যায়। অথবা ঐ অসৎকাজের চাইতেও জঘন্য ধরনের কোন অশ্লীল কাজ সংঘটিত হবার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। সাথে সাথে ঐ উত্তম কাজের আদেশ দানের ফলে, সেটা হতে অতি উত্তম কাজ বা বিষয় যেন বাদ পড়ে না যায়।
নাবী যে 'আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল প্রমুখ (কপট ও দুষ্কর্মের পাণ্ডাদের নেতা)-কে তাদের দলবল ও সাঙ্গ-পাঙ্গ থাকার কারণে শাস্তি না দিয়ে বরং নীরব ভূমিকা অবলম্বন করেছিলেন তাও এ অধ্যায়েরই অন্তর্গত। কেননা 'আবদুল্লাহ বিন উবাইকে তার দুষ্কর্মের উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে ঐ অপকর্ম তখনই উচ্ছেদ করার অর্থই ছিল তার গোত্রীয় লোকদের গোস্বা ও প্রতিশোধ গ্রহণের উগ্রতা এবং রাসূলুল্লাহ তাঁর সাথীদেরকে হত্যা করছে শুনে লোকজনের দূরে সরে পড়ার সামনে, তদপেক্ষা বেশী বড় সৎকাজের পথই বন্ধ করে দেয়া।
📄 আল্লাহুর পছন্দ অনুযায়ী পছন্দ এবং আল্লাহুর অপছন্দ অনুযায়ী তা অপছন্দ
এটার মৌলিক বিষয়টি হচ্ছে এই যে, মানুষ সকলেই প্রত্যেকটি সৎকাজকে ভালবাসবে এবং প্রতিটি অসৎকাজকেই ঘৃণা করবে। আবার সৎকাজ করার সদিচ্ছা ও অসৎকাজকে অপছন্দ করা ও ঘৃণা করা ঠিক আল্লাহ্ তা'আলার পছন্দ ও অপছন্দ অনুযায়ীই তা হতে হবে। এই সাথে তার কোন কিছুকে ভাল মনে করে তা পালনের ইচ্ছা বা ঘৃণাবশতঃ তাকে খারাপ মনে করে না করার শারী'আত সম্মত ইচ্ছা বা অনিচ্ছা হচ্ছে যে, সে প্রিয় ও ভাল বিষয়টি কাজে পরিণত করবে এবং যথাসাধ্য অপ্রিয় ও খারাপ বিষয়গুলোকে প্রতিহত করবে।
যেহেতু আল্লাহ তা'আলা কোন প্রাণীকেই তার সামর্থ্যের মাত্রাতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং বলেছেন: “অতএব তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো।” (সূরা আত্-তাগাবুন ৬৪: ১৬) আর এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে আল্লাহ্র প্রতি ঈমানে ত্রুটি না পাওয়া গেলে কখনও আল্লাহ্র প্রতি ভয় কম হবে না। আর যে শারীরিক কাজ-কর্ম তা তো মানুষের শারীরিক শক্তি অনুযায়ীই হবে।
আর যখনই মানুষের কোন কিছু করার মানসিক ইচ্ছা প্রবল ও পরিপূর্ণ হবে, অথবা সেটার প্রতি ঘৃণা প্রবল বা পরিপূর্ণ হবে এবং ব্যক্তির ইচ্ছানুযায়ী সামর্থ্যানুসারে হবে তখনই তাকে তার কাজের পরিপূর্ণ প্রতিফল দেয়া হবে। এ কথা সত্য যে, মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছেন যার প্রীতি-অপ্রীতি, কামনা-বাসনা বা ঘৃণা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-এর ভালবাসা, অথবা পছন্দ-অপছন্দ অনুযায়ী না হয়ে, বরং তা তার নক্সের অন্তরের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী হয়ে থাকে। আসলে এটা এক ধরনের কু-প্রবৃত্তি। যদি মানুষ একেই শিরোধার্য করে নেয়, তাহলে তো তার নিজ প্রবৃত্তিরই দাসত্ব করল। এ লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা প্রদত্ত পথনির্দেশনা ছাড়া স্বীয় প্রবৃত্তির দাসত্ব করে, তার চাইতে বেশি পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে?"- (সূরা আল-ক্বাসাস ২৮: ৫০)।
প্রিয় নাবী বলেছেন: তিনটি বিষয় আছে যা মানুষকে রক্ষা করতে পারে- ১. গোপনে-প্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করা। ২. অভাব ও প্রাচুর্যের মধ্যপথে চলা। ৩. রাগ বা খুশি উভয় অবস্থাতেই হক/সত্য কথা বলা। অপরপক্ষে ধ্বংসকারীও তিনটি বিষয় রয়েছে: ১. এমন কৃপণতা যার আনুগত্য করা হচ্ছে। ২. এমন প্রবৃত্তি যার অনুসরণ করা হচ্ছে। ৩. ব্যক্তির নিজেকে নিয়ে নিজে নিজে খুশি বা আনন্দিত হওয়া।
ব্যক্তি প্রিয় বস্তু বা অপ্রিয় বস্তুর উপস্থিতিকালে রুচি, ভালবাসা বা ঘৃণার অনুসরণ করে থাকে। অনুরূপ প্রেম, ইচ্ছা ইত্যাদিও। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তদীয় রাসূল-এর আদেশ ব্যতিরেকেই সেটার অনুসরণ করবে, সে আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান ছাড়াই স্বীয় প্রবৃত্তির দাসত্বকারীদের অন্তর্ভুক্ত। বরং তার এ অবস্থা তাকে নিয়ে এতদূর গড়াতে পারে যে, সে স্বীয় প্রবৃত্তিকেই সর্বকর্তা তথা ইলাহ্ বানিয়ে নিবে।
অতএব যারাই আল-কুরআন ও সুন্নাহ্ নীতির বাইরে চলে গেছে- যাদেরকে 'উলামাহ্ ও দরবেশ সম্প্রদায়ভুক্ত বলে ধরা হয়, তাদেরকেই 'প্রবৃত্তির অনুসরণকারী' বলে আখ্যা দেয়া হবে। দীন সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহ সে হিদায়াত (পথ নির্দেশনা) যা দিয়ে তিনি তাঁর রাসূল-কে পাঠিয়েছিলেন- তাছাড়া কোনরূপেই হতে পারে না।
অতএব ব্যক্তির অবশ্য কর্তব্য হল, সে যেন তার নিজের পছন্দ ও অপছন্দের প্রতিই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং পছন্দ-অপছন্দের সঠিক পরিমাণ তলিয়ে দেখে- সেটা কি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-এর আদেশ মতোই আছে? সেটা কি আল্লাহ্র পথ নির্দেশনা মুতাবিক- যা তিনি তাঁর রাসূল-এর প্রতি অবতীর্ণ করেছিলেন, যাতে তিনি ঐ পছন্দ ও অপছন্দ মেনে চলতে আদিষ্ট হতে পারেন-হচ্ছে। যাতে সে (ব্যক্তি) ঐ বিষয়ে আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের আগে বেড়ে ধৃষ্টতা প্রদর্শনকারী হয়ে না পড়ে।
সেটার বাস্তবায়ন হল, নিশ্চয়ই সৎকাজে আদেশ দান ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা, সবচাইতে অবশ্য করণীয়, সবচাইতে উত্তম ও সবচাইতে সুন্দর। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা বলেছেন: “তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য যে, তোমাদের মধ্যে উত্তম কাজ সম্পাদনকারী কে?” (সূরা আল-মুল্ক ৬৭ : ২)
সেটা ঠিক আল্-ফুযাইল বিন ইয়ায (রাযি.)-এর উক্তিরই অনুরূপ : "কাজ যতই খালিস আল্লাহ্র জন্য হবে ততই সঠিক হবে। কেননা যখন কাজ (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ) একমাত্র আল্লাহ্র জন্য হবে অথচ সঠিক হবে না, তখন সেটা গৃহীত হবে না। আবার যখন কাজটি শুদ্ধই হয়েছে অথচ একমাত্র আল্লাহ্রই জন্য হয়নি, তখন সেটাও গৃহীত হবে না যতক্ষণ না খালিস হবে, সঠিক হবে এবং শুধু একমাত্র আল্লাহ্র জন্য হবে। আর কাজ তখনই সঠিক হবে, যখন রাসূল-এর সুন্নাত মুতাবিক হবে।
টিকাঃ
১. সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় করার মানদণ্ড হচ্ছে ব্যক্তির ঈমান। যার ঈমান যে পরিমাণে বেশি বা কম, আল্লাহ্র প্রতি তার ভয়ের মাত্রাও সে পরিমাণে বেশি বা কম হবে।
২. জ্ঞানানুযায়ী কাজ না করার অর্থই প্রবৃত্তির অনুসরণ করা। কারণ জ্ঞান মানুষকে সত্য পথে পরিচালনা করে, প্রবৃত্তি তার বিপরীতমুখী।
৩. ওয়াহীর জ্ঞানের অর্থ নেওয়া হয়েছে।
📄 সৎকাজে আদেশ দেয়া ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করার ক্ষেত্রে শর্তাবলী
১। তার কাজ সুষ্ঠু হবে না যদি না সেটা পরিমিত শিক্ষা ও তীক্ষ্ণজ্ঞান ভিত্তিক হয়। যেমন- 'উমার বিন 'আবদুল 'আযীয (রহ.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি বিনা বিদ্যায় আল্লাহ্র 'ইবাদাত করে, সে যতটুকু ভাল করে, তার চাইতে খারাপই বেশি করে।" যেমন- মা'আয বিন জাবাল (রাযি.)-এর হাদীসে আছে: "কাজ করার আগে প্রয়োজন জ্ঞান; কাজের স্থান হল বিদ্যার্জনের পর।" এটা তো একেবারেই স্পষ্ট। কেননা ইচ্ছা করা ও কর্ম সম্পাদন করা যদি জ্ঞানের আলোকেই না হয়, তাহলে সেটাই মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতা, সর্বোপরি প্রবৃত্তির অনুসরণ।
২। উত্তম হল: আদেশ বা নিষেধ করা। যেমন, সিরাতাল মুস্তাকীম তথা সরলপথ অনুযায়ী হয়। আসলে সিরাতাল মুস্তাকীম হল- উদ্দেশ্য অর্জনের দিকে অতি দ্রুত পৌঁছাবার মত সংক্ষিপ্ত তথা নিকটতম পথ।
৩। সুনম্র ব্যবহার ঐ কাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। যেমন- নাবী বলেছেন: “যে বিষয়েই নম্রতা পাওয়া গেছে তা সে বিষয়কেই সুশোভিত করেছে, আবার যে বিষয়েই খানিকটা কঠোরতা পাওয়া গেছে তা সে বিষয়কেই অশোভিত করেছে- দৃষ্টিকটু করে ফেলেছে।” নাবী বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ দয়াশীল, প্রত্যেকটি বিষয়েই নম্র ব্যবহার তিনি পছন্দ করেন, নম্রতাপূর্ণ ব্যবহারের ফলে তিনি যা দান করেন কঠোরতার কারণে তা দেন না।"
৪। আদেশ দানকারী বা নিষেধকারীকে অবশ্যই কষ্টে সহিষ্ণু ও ধৈর্যশীল হতে হবে। কেননা, এ কথা সত্য যে, তার উপর বিপদ আসবেই। এমন সময় যদি সে ধৈর্য ধারণই না করে, সহ্যই না করে, তাহলে সে যা ভাল করতে পারত তার চাইতে নষ্টই করে বসবে বেশি। যেমন- লুকমান হাকীম তদীয় তনয়কে উপদেশ দানকালে বলেছিলেন: "এবং (হে বৎস)! সৎকাজ আদেশ দান কর এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ কর, (এ কাজ করতে যেয়ে) তোমার উপর যে বিপদ আপতিত হবে তাতে ধৈর্য অবলম্বন কর, নিঃসন্দেহে সেটা একটি মহৎ কাজ।” (সূরা লুকমান ৩১: ১৭)
নাবী-কে রাসূল হিসেবে সৃষ্টি জগতে প্রেরণের আয়াতগুলো ভীতি প্রদর্শনমূলক বিষয় দ্বারাই শুরু তথা সূচনা করেছেন এবং ধৈর্য ধারণের আদেশ দানের মাধ্যমে শেষ করেছেন। মূলতঃ শাস্তির ভয় প্রদর্শনই হল সৎকাজে আদেশ দান ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা।
সুতরাং শিক্ষা, নম্রতা ও ধৈর্য- এ তিনটি বিষয় ছাড়া কোন ক্রমেই চলবে না। আদেশ করা বা নিষেধ করার পূর্বেই জ্ঞানের দরকার এবং সে সঙ্গে নম্রতা, আর এটার পরেই প্রয়োজন ধৈর্যের। যদিও এ ত্রিবিধ বিষয়গুলোই সর্বাবস্থাতেই একই সঙ্গে পাওয়া যেতে হবে। যেমন- সাল্ফে সালিহীনদের কোন একজনের উক্তি: "যিনি সৎকাজে আদেশ করবেন ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করবেন, তিনি যদি ঐ বিষয়ে সুবিজ্ঞ 'আলিম তথা ফকীহ্ না হন, তাহলে তিনি তা করতে পারেন না। অনুরূপ তিনি যে বিষয়ে আদেশ দিবেন, সে বিষয় নম্র হবেন এবং যে বিষয় হতে নিষেধ করবেন সে বিষয়েও নম্র হবেন এবং যে বিষয়ে আদেশ দিবেন সে বিষয়ে তাকে সহিষ্ণু হতে হবে, আবার যে বিষয় হতে নিষেধ করবেন সে বিষয়েও তাকে সহিষ্ণু হতে হবে।" তা না হলে তিনি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করতে পারবেন না।