📄 আমাদের দীন প্রত্যেকটি সৎকাজের আদেশ ও প্রত্যেকটি অসৎকাজ হতে নিষেধকে সম্পৃক্ত করে
আল্লাহ তাঁর দ্বারাই আল-দীন যা সকল সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ, প্রত্যেকটি উত্তম জিনিসকে বৈধ এবং খারাপকে অবৈধ করেছেন, ইত্যাদিকে পরিপূর্ণ করেছেন।
আল্লাহর শেষ নাবীর পূর্বে যে সকল নাবীগণ ছিলেন তাঁরা তাঁদের উম্মাতের উপর কতক বৈধ জিনিসকে অবৈধ ঘোষণা করতেন- যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা বলেছেন: “অতএব ইয়াহুদীদের যুল্মের কারণে তাদের উপর এমন কিছু জিনিস হারাম করে দিয়েছি যা তাদের জন্য হালাল ছিল।” (সূরা আন্-নিসা ৪ : ১৬০)
হয়তো বা তাদের উপর সকল খারাপ বিষয় হারাম করা হয়নি, যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা বলেছেন: “প্রত্যেকটি খাদ্যদ্রব্যই ইসরাঈল বংশীয়দের জন্য হালাল ছিল, শুধু ঐ জিনিসটি ছাড়া, যা পবিত্র তাওরাত অবতীর্ণের পূর্বে ইস্রাঈল [ইয়া'কূব ('আঃ)] স্বয়ং নিজের উপর অবৈধ করে নিয়েছিল।” (সূরা আ-লি 'ইমরান ৩ : ৯৩)
কোন খারাপ জিনিস অবৈধ করা অসৎকাজ হতে নিষেধ করারই অন্তর্গত। যেমনভাবে পবিত্র জিনিসটি বৈধ করাও সৎকাজে আদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। কেননা উত্তম জিনিসকে অবৈধ করা, আল্লাহ যা করতে নিষেধ করেছেন, তারই অন্তর্ভুক্ত। এমনিভাবে সকল সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা- আল্লাহর রাসূলকে ছাড়া যা পূর্ণ হয়নি, যাঁকে দ্বারা আল্লাহ তা'আলা উন্নত চরিত্রের পরিপূর্ণতা সাধন করেছেন- সৎকাজের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন ইরশাদ করেছেন: “আমি আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম, তোমাদের উপর আমার নিয়ামাত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য 'দীন ইসলাম'কে একমাত্র ধর্ম হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল-মায়িদাহ্ ৫: ২১)
আল্লাহ আমাদের জন্য দীনকে পরিপূর্ণ করেছেন, আমাদের উপর তাঁর অনুগ্রহ পুরো করেছেন এবং দীন ইসলামকে আমাদের দীন (ধর্ম) হিসেবে মনোনীত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নাবীকে যে বিশেষণে বিশেষিত করেছেন উম্মাতকেও সে গুণে গুণান্বিত করেছেন এবং একই দায়িত্ব দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন: “তোমরাই হচ্ছো উত্তম জাতি, যাদেরকে মানুষের কল্যাণের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে, তোমরা সৎকাজে আদেশ করবে এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করবে, তদুপরি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে।” (সূরা আ-লি 'ইমরান ৩ : ১১০)
আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন আরও 'ইরশাদ করেছেন: “আর মু'মিন পুরুষ ও নারীগণ একে অপরের বন্ধু, তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করে।” (সূরা আত্-তাওবাহ্ ৯ : ৭১)
এজন্যই আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) বলেছেন: "তোমরা মানুষের কল্যাণের জন্য উত্তম মানুষ। তোমরা তাদেরকে তাদের গলদেশসমূহে শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় নিয়ে আসবে, শেষ পর্যন্ত তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে।"
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন: এ জাতি মানুষের কল্যাণের জন্য সর্বোত্তম জাতি। অতএব তারা তাদের জন্য সবচাইতে বেশী ফলপ্রদ, উপকারী, সবচাইতে দয়ার্দ্র। কেননা তারা গুণ-সংখ্যা ও পরিমাপের দিক হতে সকল উত্তম ও ভাল বিষয় পরিপূর্ণ করেছে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করার মাধ্যমে। তারা প্রত্যেকেই প্রত্যেককে প্রতিটি সৎকাজের আদেশ করেছে, অর্থ ও প্রাণের বিনিময়ে আল্লাহর পথে জিহাদের তথা সংগ্রামের মাধ্যমে সেটা প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটাই হল সৃষ্টি জগতের জন্য পরিপূর্ণ উপকার।
অন্য সকল জাতির প্রত্যেকে প্রত্যেককেই সৎকাজেরও আদেশ দেয়নি, অসৎকাজ হতেও নিষেধ করেনি, এ সুবাদে জিহাদ বা সংগ্রামও করেনি। আর যারা জিহাদ করেছে, যেমন ইস্রাঈল বংশ- তাদের সাধারণ জিহাদ ছিল, স্বদেশ হতে শত্রুদেরকে বিতাড়িত করা। যেমন- অত্যাচারী-অনাচারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়ে থাকে। অথচ যাদের সাথে যুদ্ধ করা হয়েছে তাদেরকে উত্তম বিষয় ও হিদায়াতের পথে আহ্বান করার জন্য বা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করার জন্য উক্ত জিহাদ ছিল না।
এ জাতি মু'মিন হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি ছিল ইস্রাঈল বংশ। যেমন- বুখারী ও মুসলিমের একমত হওয়া একটি হাদীসে ইবনে 'আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত আছে, নাবী বলেছেন: "নাবীগণকে তাঁদের উম্মাতসহ গতরাত্রে আমার সামনে পেশ করা হয়, এমতাবস্থায় (দেখলাম), একজন নাবী যাচ্ছিলেন তাঁর সাথে একজন লোক, আর একজন নাবী যাচ্ছিলেন তাঁর সাথে দু'জন লোক, আর একজন নাবী যাচ্ছিলেন তাঁর সঙ্গে একদল লোক, আবার কোন নাবী যাচ্ছেন অথচ তাঁর সাথে কেউই নেই। অথচ আমি বহু সমাবেশ দেখেছি।”
বলা হল: তারাই আপনার উম্মাত। তাদের সাথে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে বেহেস্তে প্রবেশ করবে। যারা চিকিৎসার জন্য আগুনের দাগ নেয়নি, তাবীজ-কবজ ব্যবহার করেনি এবং কোন কিছু দেখে শুভাশুভ বিশ্বাস করে 'ফাল' গ্রহণ করেনি, তারাই তাদের প্রতিপালকের প্রতি ভরসা করে থাকেন।
এ জাতির সর্বসম্মত রায় বা মতটি শারী'আতের জন্য প্রমাণ বা দলীল। কেননা স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন: তারা প্রতিটি ভাল ও সৎকাজের জন্য আদেশ দেয় ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করে। তারা যদি কোন হারামকে হালাল করে, কোন একটি ওয়াজিবকে বাদ দেয়, কোনও হালালকেই হারাম করে, অথবা আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টি জগৎ সম্পর্কে কোন ভুল তথ্য পরিবেশন করার ব্যাপারে একমত হয়, তাহলে সেটা তাদের দ্বারা সৎকাজ হতে নিষেধ করা ও অসৎকাজের আদেশ দেয়া হয় বলে গণ্য করা হবে। অথচ অসৎকাজের আদেশ ও সৎকাজ হতে নিষেধ করা, কোনক্রমেই তা ভাল কথা নয় আর উপযুক্ত কাজও নয়।
টিকাঃ
১. এ হাদীসখানা আবু হুরাইরাহ্ (রাযি.) পর্যন্ত মাওকূফ অবস্থায় বুখারী শাব্দিকভাবে হুবহু উল্লেখ করেছেন- تأتون بهم في السلاسل في أعناقهم حتى يدخلوا الجنة
📄 প্রত্যেকটি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা অপরিহার্য
জাতির সৎকাজে আদেশ দান ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করাকে ওয়াজিব-ই-কিফাইয়াহ ধার্য করে এ বলে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা 'ইরশাদ করেছেন: “তোমাদের মধ্য হতে এমন একটি জাতি হওয়া উচিত যারা সকল ভাল তথা উত্তম বিষয়ের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করবে, আসলে তারাই হচ্ছে সফলকাম সম্প্রদায়।” (সূরা আ-লি 'ইমরান ৩: ১০৪)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা যখন, তাদের দ্বারা সৎকাজের আদেশ সংঘটিত হবে বলে সংবাদ দিয়েছেন, তখন তাতে এমন কোন শর্ত নেই যে, আদেশকারীর আদেশ ও নিষেধকারীর নিষেধ, বিশ্বের প্রত্যেকটি (প্রাপ্তবয়স্ক) ব্যক্তির নিকটে পৌঁছাতে হবে। যখন কোন জাতির নিকট- যার সে আদেশ দিবে ও যা হতে নিষেধ করবে, এটা না থাকে, তখন সেটা সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
অতঃপর যদি তারা গাফলতি করে, তাহলে তার কর্মীর পূর্ণ ব্যবস্থা নেয়া সত্ত্বেও সেটা তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়ে না উঠে, তাহলে ঐ গাফলতিটা তাদের পক্ষ হতেই হয়েছে বলে ধরা হবে; কর্মীর পক্ষ হতে নয়। অনুরূপভাবে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা নির্দিষ্ট করে প্রত্যেকের উপর বর্তাবে না; বরং পবিত্র কুরআনের প্রমাণ অনুসারে সেটা ওয়াজিব-ই-কিফাইয়াহ্।
জিহাদও ঠিক অনুরূপভাবে ওয়াজিব-ই-কিফায়াহ্। অতএব সেটার দায়িত্বশীল যখন সেটা সম্পাদনে ব্রতী হবেন না, তখন সকল সামর্থ্য ব্যক্তিগণ তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ঐ দায়িত্ব পালন না করার দোষে সমভাবে দোষী হবেন। সুতরাং এটা স্পষ্টভাবেই বুঝা গেল যে, প্রতিটি মানুষের উপরই তার শক্তি সামর্থ্য অনুযায়ী ঐ দায়িত্ব বর্তাবে। যেমন- নাবী হাদীসে বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে যে কোন একটি অসৎকাজ (হতে) দেখবে, সে যেন তাকে তার হাত দ্বারা প্রতিহত করে। তবে যদি সে ঐরূপ করতে অক্ষম হয়, তাহলে কথা দ্বারা যেন তাকে প্রতিহত করে, যদি এরূপও করতে অক্ষম হয়, তাহলে যেন অন্তর দিয়ে তাকে ঘৃণা করে। আর সেটা হচ্ছে সবচাইতে দুর্বল ঈমান।"
যদি বিষয়টি ঐ রকমই হয়, তাহলে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা, যা পরিপূর্ণ করা হয়ে থাকে জিহাদের মাধ্যমে সেটা একটি বৃহত্তম সৎকাজ; যার জন্য আমরা আদিষ্ট হয়েছি। তার জন্যই বলা হয়েছে- তোমার আদেশ যেন সৎকাজের জন্য হয় এবং অসৎকাজে তোমার নিষেধ করাও যেন সৎ হয়।
যখন এটা সর্বোত্তম ওয়াজিব এবং পছন্দনীয় কাজ, সুতরাং এ ওয়াজিবসমূহ (অপরিহার্য) ও মুস্তাহাবগুলোর সুফল তাদের (প্রয়োগের কারণে) অপকারের চাইতে বেশী ভারি হওয়াই বাঞ্ছনীয়। যেহেতু এটা সহকারেই রাসূলগণকে পাঠানো হয়েছিল এবং আসমানী গ্রন্থসমূহ অবতীর্ণ করা হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা কখনও ফাসাদ বা অনাসৃষ্টি পছন্দ করেন না। উপরন্তু আল্লাহ যার আদেশ করবেন, তা উত্তমই হবে।
অসৎকাজ হতে নিষেধ করা কখনও শক্তি দ্বারা হতে পারে, আবার কখনও বা রসনার দ্বারা, আবার কখনও শুধু অন্তরের ঘৃণা দ্বারাই হয়ে থাকে। অন্তর দ্বারা সেটা করা সর্বাবস্থায়ই ওয়াজিব হবে। যেহেতু সেটা করতে কোনই ক্ষতি নেই। যে ব্যক্তি এতটুকু ঘৃণাও পোষণ করে না সে আসলে মু'মিনই নয়। নাবী -এর হতে এরূপই বুঝা যায়। তিনি বলেছেন : “আর সেটা হল সবচাইতে দুর্বল ঈমান।” এবং আরও বলেছেন- "সেটার পর সরিষা পরিমাণ ঈমানও আর নেই।"
টিকাঃ
১. ওয়াজিব-ই-কিফাইয়াহ- যা কোন এলাকার একজন বা একদলে আদায় করলে অন্য সকলের পক্ষ হতে আদায় হয়ে যায়। যেমন- জানাযার নামায।
২. কোন অসৎকাজকে মনে মনে শুধু ঘৃণা করা দুর্বল ঈমান, আর এটুকুও যখন করবে না তখন বুঝা যাবে যে, অন্তরে ঈমান আর অবশিষ্ট নেই।
📄 আদেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রে মানুষ দু’শ্রেণী
এখানেই মানুষের দু'টি দলই ভুল করে থাকে। প্রথম দল: তাদের উপর আদেশ ও নিষেধের যে দায়িত্ব, এ আয়াতটির ব্যাখ্যা হিসেবে অবহেলা করে ছেড়ে দিচ্ছে। যেমন প্রথম খলীফা আবু বাক্র সিদ্দীক (রাযি.) তাঁর এক ভাষণে বলেছিলেন: হে লোক সকল! তোমরা এ আয়াতটি পড়ে থাক- “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের স্ব-স্ব হিদায়াতের দায়িত্ব তোমাদের নিজেদের উপর, তোমরা যদি সৎপথপ্রাপ্ত হও তাহলে যারা বিপথগামী হয়েছে তারা তোমাদেরকে ক্ষতি করতে পারবে না” (সূরা আল-মায়িদাহ্ ৫ : ১০৫)। অথচ তোমরা সেটার সদ্ব্যবহার করছ না। আমি নাবী-কে বলতে শুনেছি "নিশ্চয়ই মানুষ যখন অসৎকাজ চলতে দেখবে, অথচ সেটাকে প্রতিহত করবে না, এটা বেশী দূরে নয় যে, আল্লাহ তা'আলা ঐ কাজের দায়ে সকলকেই সাধারণভাবে শাস্তি দিবেন।"
আর দ্বিতীয় দলটি- যারা জিহ্বা বা হাত দ্বারা মোটকথা সৎকাজে আদেশ দিতে ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করতে চায়, কোন প্রয়োজনীয় জ্ঞান, সহনশীলতা বা ধৈর্য ছাড়াই এবং সেটার কোন্টি কোথায় চলবে, আর কোথায় চলবে না, কোন্টি সে করতে পারবে, আর কোন্টি সে করতে পারবে না, সেদিকে তার লক্ষ্য নেই। যেমন- আবূ সা'আলাবাহ্ আল্-খাশানী বর্ণিত হাদীসে আছে, আমি নাবী-কে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম, তিনি বলেছেন: “বরং তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে সৎকাজের আদেশ দিবে এবং অসৎকাজ হতে নিজেদেরকে নিজেরাই নিষেধ করবে। যখন দেখবে এমন কৃপণতা, যা অন্যেরা অনুসরণ করছে এবং অনুসৃত প্রবৃত্তি, প্রভাব বিস্তারকারী পার্থিব ঐশ্বর্য ও প্রত্যেক 'আলিম ব্যক্তি স্ব-স্ব রায় নিয়েই খুশি হচ্ছে এবং এমন সব অশ্লীল কর্ম কান্ড ঘটতে দেখবে যা ঠেকাবার মত তোমার কোন শক্তি নেই, এমতাবস্থায় 'চাচা আপন প্রাণ বাঁচা' ভিত্তিক নিজে নিজেকেই রক্ষা করবে।"
এমন কঠিন মুহূর্তে কোন একজন আদেশ ও নিষেধ নিয়ে এসে উপস্থিত হবে এ মনে করে যে, সে নিজে আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূল-এর অনুগত, আসলে সে নিজেই সীমালঙ্ঘনকারী। যেমন- অনেক বিদ্'আতী ও প্রবৃত্তির পূজারীগণ নিজেদেরকে সৎকাজের আদেশদাতা ও অসৎকাজ হতে নিষেধকারী হিসেবে নিজেদের সাজিয়ে বসেছে। এ সকল লোক ঐ খারিজী, মুতাযিলা, রাফিজী ও অনুরূপ অন্যান্য গোষ্ঠীরই মত, যারা তাদের প্রতি আগত আদেশ ও নিষেধাবলীর ক্ষেত্রে ভুল করে বসেছে এবং এভাবেই তাদের সংশোধনী কাজের চেয়ে অনাসৃষ্টিই বেশী হয়েছে।
টিকাঃ
১. হাদীসটি উল্লেখিত ঐ আয়াতের ব্যাখ্যায় পুরোপুরি এসেছে- (ক) আত্-তাবারী : ১১/১৩৭; (খ) ইবনে কাসীর ২/৬৬৭; (গ) ইবনে মাযাহ্ অনুযায়ী সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা ছেড়ে দিবার কোন প্রমাণ নেই। ইমাম তিরমিযী (রহ:) বলেছেন : আবু উমাইয়্যাহ্ হতে বর্ণিত- আমি আবু সা'আলাবাকে জিজ্ঞেস করে বললাম- এ আয়াতে আপনি কেমন করেন? তিনি বললেন : আল্লাহ্র শপথ! তুমি এমন লোকের কাছেই প্রশ্ন করেছ, যিনি সেটার উত্তর জ্ঞাত আছেন। আমি নাবী-কে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছি, তিনি বলেছেন : "বরং তোমরা নিজেরাই নিজেদের দ্বারা সৎকাজে আদিষ্ট হও এবং অসৎকাজ হতে নিজেরাই বিরত থাক। যখন দেখবে কৃপণতার অনুসরণ করা হচ্ছে, প্রবৃত্তির অনুসরণ চলছে, পাপ কাজ চলছে, 'আলিমগণ স্বীয় রায় নিয়েই খুশী তখন তোমরা নিজেদের ভাবনা নিজেরাই ভাববে...।"
📄 শাসকদের অত্যাচারে ধৈর্য ধারণ
এজন্যই নাবী শাসকদের অত্যাচারে ধৈর্য ধারণের আদেশ দিয়েছেন এবং তারা যতদিন পর্যন্ত নামায যথারীতি প্রতিষ্ঠা করতে থাকবে, ততদিন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নিষেধ করেছেন। এ মর্মে নাবী ইরশাদ করেছেন: “তোমরা তাদের (শাসকদের) প্রাপ্য তাদের কাছে পৌঁছিয়ে দাও এবং তোমাদের প্রাপ্য আল্লাহ্র কাছে চাও।” এ বিষয়ে অন্যত্র বিশদ আলোচনা করেছি।
এ কারনেই আহলে সুন্নাহ্ ওয়াল জামা'আহ্-এর মূল নীতিসমূহের অন্তর্গত:
১. দলবদ্ধ জীবন-যাপন করা।
২. শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ না হওয়া।
৩. ফিত্নার সময়ে যুদ্ধ পরিহার করা।
অথচ প্রবৃত্তির আজ্ঞাবহ যারা। যেমন- মুতাযিলারা, তারা শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে তাদের ধর্মের মূলনীতি বলে গণ্য করে থাকে। ওদিকে মুতাযিলারা তাদের ধর্মের মূলনীতি নির্ধারণ করে নিয়েছে নিম্নের পাঁচটি বিষয়কে: এমন (তাওহীদ) যা দ্বারা আল্লাহ্র গুণরাজিকে বাদ দেয়া হয়েছে; এমন (ন্যায়বিচার) যা দ্বারা তাব্দীরকে মিথ্যা বানানো হয়েছে; এমন (স্থান) যা দু'স্থানের মধ্যবর্তী; এমনতর (ধমকিকে) কার্যকর করা; এবং সৎকাজ আদেশ দান করাও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা। এমনভাবে, যাতে শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা পর্যন্ত রয়েছে। এ সম্পর্কে অন্যত্র আলোকপাত করেছি।
টিকাঃ
১. অর্থাৎ- অত্যাচারী শাসকদের সময় নিজেদের দা'ওয়াতই শাসকদের প্রাপ্য আর শাসকদের পক্ষ হতে দা'ওয়াত গ্রহণ তোমাদের প্রাপ্য, এটা আল্লাহ্র কাছে চেয়ে নিতে হবে। উল্লেখিত হাদীসখানা বুখারী ও মুসলিম; ইবনে হাম্বল ১/৪৩২; আত্-তিরমিযী: ৪/৪৮২; কিতাবুল ফিতান: হা: নং- ২১৭ দ্রষ্টব্য।