📘 সৎকাজ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ > 📄 জীবনের শেষ বেলায় বেদনাদায়ক স্মৃতি

📄 জীবনের শেষ বেলায় বেদনাদায়ক স্মৃতি


৯ই জুমাদা আল-আখিরাহ্, রোজ সোমবার, শাইখের নিকটে জেলখানার ভিতরের যত বই পুস্তক, কাগজপত্র, দোয়াত, কলম ইত্যাদি সব কিছুই বের করে দেয়া হল এবং লেখাপড়া করা হতে বারণ করা হল। রজবের প্রারম্ভে তাঁর সকল পুস্তকাদি আদিলিয়ার বড় গ্রন্থাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেটা প্রায় ৬০ ষাট খণ্ড এবং ১৪ চৌদ্দ বান্ডেল পাণ্ডুলিপি ছিল। ফকীহগণ ঐগুলো দেখতে পেয়ে নিজেদের মধ্যে তা বণ্টন করে নিলেন।

ইবনে তাইমিয়াহ্র এসব আত্মিক পাথেয় সামগ্রী, যা জেলখানার একাকীত্বের একমাত্র সঙ্গী ছিল, নিষিদ্ধ করা হল। তখন তাঁর পীড়া চরম আকার ধারণ করেছিল এবং ঐ অশোভন আচরণে তাঁর মনঃপীড়া আরও বেশি বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঐ অবস্থা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তাঁর পবিত্র আত্মা ৭২৮ হিজরীর ২২শে জুল-কাআদ, রোজ সোমবার, তাঁর স্রষ্টার কাছে মহা প্রস্থান করেছিল। এ ব্যক্তি অন্যান্য মহামানবের মতই স্থির বিশ্বাস ও প্রথিত মূল ঈমানের অধিকারী ছিলেন, যা তাঁর শত্রুদের গলদেশে শ্বাসরুদ্ধকারী হয়ে রয়েছিল, যেজন্য তাঁর অনুপস্থিতি ছাড়া তারা শ্বাস-প্রশ্বাস নিতেই পারছিল না এবং তাঁর চির প্রস্থানের পর ছাড়া, তাঁর জীবদ্দশায় তারা কখনও সুখী জীবন-যাপন করতে পারছিল না। অবশেষে এ মহান ব্যক্তি জেলখানাতেই ইন্তিকাল করেন।

ঐ শাইখের জানাযা ছিল আহমাদ বিন হাম্বালের কথার স্পষ্ট দৃষ্টান্ত: “তোমরা বিদ'আতীদেরকে বলে দাও, তোমাদেরকে ও আমাদের মধ্যে পার্থক্য হল জানাযায় উপস্থিত জনতার সংখ্যা অনুযায়ী।”

ইবনে তাইমিয়াহ্র জানাযায় এতলোক উপস্থিত হয়েছিল, যা ছিল গণনার বাইরে। ইবনুল বারজালী বলেন: "দামেস্কের অধিবাসীগণ শাইখের জানাযায় এমনভাবে একত্রিত হয়েছিলেন যে, যদি কোন মহাপরাক্রমশালী সুলতান ও তার হিসাব রক্ষাকারী দপ্তর তাদেরকে একত্রিত করতে চায় তবুও তাঁর জানাযায় যত লোক এসেছিল, এতলোক হাযির করতে পারতেন না।" আসলে দামেস্কের সকলেই তাঁর জানাযায় এসেছিলেন। ঐ বিষয়ে ইবনে কাসীর একটি টীকা লিখেছেন: “যদিও ঐ ব্যক্তি (ইবনে তাইমিয়াহ্) সুলতানের আদেশ অনুসারে, বন্দীকৃত অবস্থায় দুর্গের অভ্যন্তরে ইন্তিকাল করেছেন এবং অনেক ফকীহ্ ও সুফীগণ তাঁর ব্যাপারে মানুষের কাছে এমন অনেক কিছু বলে বেড়িয়েছেন যা দীনের অনুসারীগণকে নিরুৎসাহিত করে দূরে ঠেলে দেয়, দেখ, এরূপ ছিল তাদের কথা এবং তা হল তাঁর জানাযার অবস্থা। আসলে তাদের কথা ও প্রকৃত অবস্থার মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে।”

এই যে জানাযাসমূহ, এটাই আহলে সুন্নাহ্ ও বিদ'আতীদের মধ্যে পৃথককারী মহা প্রাচীর। ইতিহাসের কাছে তাঁর দিবারাত্রির যে ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে সেটার কোনটিই লুকিয়ে নেই। ইবনে তাইমিয়াহ্র ব্যাপারে অনেক কিছুই বলা হয়েছে, যা তাঁর জন্য দোষের ছিল, যেমনভাবে তাঁর ও অন্যান্য খাঁটি বিশ্বাসীগণের বিরুদ্ধেও বলা হয়ে থাকে। অথচ ইতিহাসের স্মৃতির পাতা ওসবের কিছুই বিস্মৃত হয় না, আজীবন সংরক্ষণ করে। এই দেখুন, ইবনে তাইমিয়াহ্ রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার সম্পদ, আর এগুলো তাঁর মতামত ও সিদ্ধান্তসমূহ, এসবই ঐ সকল ব্যক্তিদের জন্য মুখরোচক খাদ্য, যাদের কাছে বিপদাপদ এসে আত্মসমর্পণ করেছে এবং তাদের অবিচলতা সত্য বলে বিবেচিত হয়েছে।

অন্যান্য মহাপুরুষদের বেলায় যা ঘটেছে, ইবনে তাইমিয়াহ্ বেলায়ও তাই ঘটেছে। ইবনে তাইমিয়াহকে যেজন্য ভর্ৎসনা করা হয়েছে, অন্যান্যদেরকেও হয়তঃ সেজন্যই ভর্ৎসনা করা হয়ে থাকবে। কিন্তু ফেনারাশি শীঘ্রই মিলিয়ে যাবে, আর মানুষের জন্য যা উপকারে আসবে, সেটাই শুধু পৃথিবীতে জমা হবে ......... আর আল্লাহর সৃষ্টি জগতে তাঁর এটাই বিধান।

আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের সৃষ্ট জগত সংসারের মধ্যে এভাবেই কল্যাণ নিহিত রেখেছেন। যা সেভাবেই নির্ধারিত হয়েছিল। শত শত বছর পর আজও যার স্মৃতি ও দীনী কল্যাণময় কাজসমূহ ক্ষণস্থায়ী এ পৃথিবীকে আলোকিত করে চলছে। রাব্বুল 'আলামীন তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

সুতরাং গতকাল যা প্রবাহিত হয়েছে, তা আজ এবং আগামীকাল ও যথারীতি প্রবাহিত হতে পারে, যাতে ব্যক্তি ইতিহাস হতে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। হে আল্লাহ! ইবনে তাইমিয়াহকে দয়া করুন এবং তাঁকে ইসলাম ও মুসলিমগণের পক্ষ হতে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00