📄 ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.)-এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) সপ্তম হিজরীর শেষদিকে বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচী পালনসহ সামগ্রিকভাবে সমস্ত কুসংস্কার আর কায়েমী স্বার্থবাদীদের বিরুদ্ধে এক আপোষহীন সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। ফলে একটি চক্র ও একশ্রেণীর আলিম-ফকীহ মনগড়া ও দিকভ্রান্তভাবে সমাজে সর্বত্র তাদের আধিপত্য ও প্রভাবের এক প্রাচীর তৈরী করেছিল। শাইখুল ইসলামের এক নবতর উদ্দীপনা ও চিন্তা-চেতানিয়া নিয়ে ঘুণে ধরা জাতির ভিত্তিমূলে এক নতুন আলোর দীপশিখা প্রজ্জ্বলিত করেন। ফলে কায়েমী স্বার্থান্বেষী চক্রটি ইমাম ইবনে তাইমিয়ার বিরুদ্ধে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা ও অপরিণামদর্শী বিবেকহীন প্রতিরোধের মাধ্যমে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.)-এর জীবনে মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল মূলতঃ তিনটি বিষয়ের সঠিক প্রতিফলন ঘটানো। প্রথমতঃ আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের দীন প্রচার ও বাস্তব জীবনে তার পরিপূর্ণ রূপদান করা। আর দ্বিতীয়তঃ পৃথিবীর বুক হতে ইসলাম বিরোধী বাতিল বিভিন্ন মতবাদ ও আকীদাসমূহ সংস্কার করে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে ঘষে মেজে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং তৃতীয়তঃ জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে বিশ্বে মুসলিম জাতিকে ইসলাম বিরোধী শক্তির কবল হতে উদ্ধার করা।
আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন মূলতঃ তাঁকে উপরোক্ত কাজসমূহ পরিপূর্ণভাবে সম্পাদন করার যোগ্য নেতৃত্বদানের সুযোগ দিয়েছিলেন। ইসলাম বিরোধী সমস্ত চক্রান্ত ও চিন্তাধারায় যে সমস্ত বাতিল শক্তির উদ্ভব হয়েছিল ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) সুদৃঢ়ভাবে তা প্রতিরাধ করেছিলেন। আর মুসলিম জাতির সম্মুখে দিক-নির্দেশনার ক্ষেত্রে সঠিকভাবে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে পরিপূর্ণ এক দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
শাইখুল ইসলাম সারাটি জীবন শুধু দুঃখ-যন্ত্রণা আর ব্যথা-বেদনায় জর্জরিত হয়েছেন তবু এসব ক্ষেত্রে কোন প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। বরং চরম শত্রুদেরকেও ক্ষমা করে দেয়ার অনুপম এক মহান আদর্শ পৃথিবীর বুকে রেখে গেছেন।
এ প্রসঙ্গে সুলতান কালাউন যখন ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.)-কে যে নানাভাবে উত্তেজিত করে তৎকালীন কাযী ও আলেমদের বিরুদ্ধে ফতোয়া চাইলেন তখন শাইখুল ইসলাম নিম্নের ভাষায় বলেছিলেন: "আমার ব্যাপারে আমি কতটুকু বলতে পারি, যারা আমাকে কষ্ট দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। তাদের আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। আর যারা আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন ও রাসূলুল্লাহ-এর নিকট পাপ কাজে সম্পৃক্ত হয়েছে তাদের কার্যকলাপের প্রতিশোধ নেবার জন্য আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন নিজেই যথেষ্ট। আমার নিজের জন্য কখনো প্রতিশোধ নিই না।”
পৃথিবীর বুকে সমস্ত মাযহাবের সীমারেখা অতিক্রম করে আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের প্রকৃত দীন ও শিকসহ সমস্ত কুসংস্কার ও বিদআতের উৎখাত করে নির্ভেজাল সুন্নাহ প্রতিষ্ঠা ও প্রসারই তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল। তাই তৎকালীন অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী শাইখ ইমামুদ্দীন (রহ.)-এর মুখে সেই সত্যেরই বহিঃ প্রকাশ ঘটেছিল। "আজ আকাশের তলে ইবনে তাইমিয়ার সমতুল্য আর কাউকেই দেখা যায় না। না ইলমের দিক দিয়ে, না 'আমালের দিক দিয়ে। আল্লাহর শপথ- কারো কথা ও কাজের মধ্যে যদি নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর উজ্জ্বল আলোক-জ্যোতি পরিপূর্ণভাবে উৎসারিত হয় তবে তাকে দেখে আমরা বিমুগ্ধ কণ্ঠে বলতে পারি- এটাকেই বলে নাবীর সত্যিকার অনুসরণ, তবে তিনি ইবনে তাইমিয়াহ ব্যতীত অন্য কেউ নন।"
📄 তাঁর জীবনের শেষ কিছু কথা
শাইখুল ইসলামের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত যে অন্তরজগৎ ছিল আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন দীন প্রতিষ্ঠায় নিমগ্ন। আর নাবী মুহাম্মাদ-ও তাঁর সহীহ হাদীসের আলোকের সেই প্রকৃত দীনের অবিকল বাস্তবায়ন। পৃথিবীর ইতিহাসে শাইখুল ইসলামের প্রতি এমন এক মানসিক নির্যাতন নিপীড়ন খুব কম মানুষের ভাগ্যেই এভাবে নির্ধারিত হয়েছিল। আল্লাহ আয্যা ওয়া জাল্লা তাঁকে যে ধৈর্য ও সবর দান করেছিলেন তা এক বিরল অধ্যায়। কারাগারের এখানে সেখানে যে কাগজসমূহ সংগ্রহ করেছিলেন তা কালির পরিবর্তে কয়লা দিয়ে লিখেছিলেন। আর জীবনের শেষ অধ্যায়ে লিখেছিলেন তা যেন বিদায়ী সূর্যের এক উজ্জ্বল আলোকরশ্মি বলা যেতে পারে। এ এক ব্যথাতুর মহামানবের সেই সত্য ভাষণ তা আজও মানুষকে যুগে যুগে সত্য ও ন্যায়ের পথে আহ্বান জানায়। 'সিরাতুল মুস্তাকীমের' পথে চালিত করে। তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় হৃদয়-মন দিয়ে অনুধাবন করলে অন্তর স্পর্শ করে আর চোখের পাতা ভিজে আসে। নিম্নে তাঁর শেষ লেখার কিছু অংশ উদ্ধৃত হলো:
“আমি আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের অনুগ্রহে খুবই সন্তুষ্ট, আল্লাহ যা কিছু করেন ইসলামের মঙ্গলের জন্যই করেন। ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর সবচাইতে বড় নিয়ামাত। তিনি তাঁর রাসূলকে তাঁর তাওহীদ বাণী প্রচার করার জন্যই পাঠিয়েছিলেন। আর শয়তান অনাগত কাল হতেই তাঁর অনুগত সৈনিক বাহিনীর সাহায্যে ইসলামের গৌরব বিনষ্ট করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। প্রথম দিন হতেই আল্লাহর এ নিয়ম অব্যাহতভাবেই চলে আসছে। আর তিনি সত্যের সাহায্যের জন্য এমন সব মানুষ নির্বাচন করেন যারা বাতিল মতবাদ ও ইসলাম বিরোধী আকীদা ও ‘আমলের মূল উৎসস্থলসমূহের উপর অগ্নিবর্ষণ করেন। ইবলিস শুধু দীন ইসলামের শত্রুতা করেননি, সমগ্র ধর্ম ও তাদের অনুসারীদের চলার পথে সৃষ্টি করেছে বাধা-বিপত্তি।”
“আমার উপর বিরোধীগণ নানাভাবে দোষারোপ করেছে আর আল্লাহ তাদের লাঞ্ছিত করেছেন। আমাকে বিদআতী আখ্যায়িত করা হয়েছে অথচ আসল ব্যাপারটি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান লাভ করার পর শুধু সেই বিদআতী থাকতে পারে যাকে পাশবিক লালসার উৎকট তাড়না ব্যস্ত করে তুলেছে। আর সে শুধু আপন মনের চাহিদার পূজারী হয়ে গেছে। আল্লাহর হাজারো শুকর, তিনি আমাকে জিহাদ করার সুযোগ দিয়েছেন এবং আমি আমার সাধ্যানুসারে বাতিলের দূর্গ চূর্ণ করে দিয়েছি।”
এটা ইমামের ইন্তিকালের পূর্বে এ লেখা। কাগজ, কালি ও কলম হতে বঞ্চিত হয়ে ইমাম সাহেব একান্তভাবে নিবেদিত একপ্রাণ ডুবে গেলেন ‘ইবাদাতে ও কুরআনের মর্ম বাণী অধ্যয়নে। এ সময়ে তাঁর দা’ওয়াত ও পয়গামের বাণী পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রান্তে প্রসার ও বিস্তৃতি লাভ করেছিল। হয়তো তাঁর জীবন বায়ু এ সময় আল্লাহর আহ্বানের অপেক্ষায় ঊর্ধ্বে জগতে প্রত্যাবর্তনের জন্য উদ্বেলিত হয়েছিল।
📄 তাঁর ধৈর্য ও মহাপ্রস্থান
জগৎসংসার মানব প্রকৃতি এরূপই চলে এসেছে যে, যাঁরই কৃতিত্বের নক্ষত্র ঊর্ধ্বে উঠিয়েছে এবং গৌরব ও সম্মানে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, তাঁরই ঈর্ষাকাতর শত্রুদের সংখ্যা বেড়েছে। ইবনে তাইমিয়াহ্ ঈর্ষাকারীদের সংখ্যা কতই না বেড়েছিল। নিশ্চয়ই লোকটির রচনা ও লিখনী কাউকেও তাঁর বন্ধু বানায়নি। কারণ তিনি কাউকেও তোষণ করেননি। আর কপটতা তাঁর অন্তর পর্যন্ত কোনরূপ পথই খুঁজে পায়নি। ইবনে তাইমিয়াহর বেশিরভাগ বিপদের সময়েই তাঁর বিরোধিতা করছিল তাঁর বিরুদ্ধে আনীত মামলার বিচারকমণ্ডলী ও ফকীহগণ; যাদের রায় ও ফাতাওয়াগুলোর কারণে তাদের বিরুদ্ধে তাঁর বিরোধিতা প্রকটতর হয়েছিল। তাঁর প্রথম পরীক্ষা আরম্ভ হয় ৭০৫ হিজরী, যেদিন সুলতানের আদেশক্রমে তাঁকে বন্দী করা কার্যকর করার জন্য তাঁকে মিসরে নিয়ে আসা হয়।
ইবনে তাইমিয়াহ্ যখন বিচারকমণ্ডলী ও ফকীহগণের সম্মুখে উপস্থিত হলেন, তখন তিনি নিজেকে রক্ষা করার জন্য কথা বলতে চেষ্টা করলেন; কিন্তু তারা সে সুযোগ হতে তাঁকে বঞ্চিত করল। উপরন্তু ইবনে মাখলুফ তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা দাবী তুলল যে, তিনি বলেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ সত্যিকারভাবে 'আরশের উপর আছেন এবং শব্দ ও অক্ষর দ্বারাই তিনি কথা বলেন।" অতঃপর ইবনে তাইমিয়াহ্ বললেন: আমার বিচার করবে কে? তখন ইবনে মাখলুফ বললেন: 'আমি'। তখন ইবনে তাইমিয়াহ বললেন: “তুমি আমার প্রতিপক্ষ তথা বাদীপক্ষ হয়ে আমারই বিচার আবার কিভাবে করবে?” এতে ইবনে মাখলুফ রোষাভিভূত হয়ে তাঁকে কারাগারে পুরে রাখল। এ ঘটনাটি ঘটেছিল ৭০৫ হিজরী সনের ২৬শে রামাযান, রোজ শুক্রবার। এরপর ঈদের দিন তাঁকে এ বন্দীখানা হতে সরিয়ে অন্যত্র এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তী বৎসরটিও তিনি ঐ অবস্থাতেই রইলেন। মিসরীয় কতকজন 'আলিম মিসরের খলীফার নায়েব (সাইফুদ্দীন সালার)-এর নিকট গিয়ে তার সাথে শাইখকে তাঁর কতিপয় বদ্ধমূল বিশ্বাসসমূহ হতে বাইরে আসতে বলেছিলেন। অতঃপর তাঁর নিকট দূত পাঠালেন, যেন ঐ ব্যাপারে তাঁর সাথে কথা বলতে পারে। এতে তিনি তাদের সম্মুখে হাযির হওয়া হতে বিরত রইলেন। তাঁর নিকট পুনঃপুনঃ বহুবার দূত আসল, যাতে তিনি তাদের সম্মুখে উপস্থিত হন; কিন্তু তিনি তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপও করেননি। এতে তাঁর উপস্থিতির ব্যাপারে নিরাশ হয়ে তারা প্রস্থান করলেন।
৭০৭ হিঃ ১৪ই সফর, রোজ শুক্রবার, বিচারপতি ইবনে জামা'আহ্ কিল্লার ভিতরে ইবনে তাইমিয়াহ্র নিকট গেলেন এবং তাঁর সাথে দারুল আওহাদীতে মিলিত হলেন ও কারাগার হতে তাঁর বাইরে আসার বিষয়ে আলাপ আলোচনা করলেন; কিন্তু ইবনে তাইমিয়াহ্ জেলমুক্তির আলোচনা প্রত্যাখ্যান করলেন, যদি না আরোপিত সকল প্রতিবন্ধকতা ও শর্তাদি প্রত্যাহার করা হয়। আবার ৭০৭ হিজরী ২৩শে রবিউল আউয়াল, আমীর হুসামুদ্দীন মুহনা বিন 'ঈসা স্বয়ং তাঁর নিকট উপস্থিত হন এবং তাঁর সাথে জেলের ভিতরে একান্ত ব্যক্তিগতভাবে মিলিত হয়ে তাঁকে জেল হতে বের হবার ব্যাপারে শপথ করে বলেন যে, তিনি যা বলবেন ও বিশ্বাস করবেন, তাতে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকবেন। তবুও পূর্ব আরোপিত সকল প্রতিবন্ধকতা প্রত্যাহার ও শর্তাদি বাতিল করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি জেলখানা হতে বের হননি। এরপর তিনি আমীর সালাবের সাথে জেলখানা হতে বের হন এবং 'আলিমগণের ও ফকীহদের একটি দল তাঁর কাছে উপস্থিত হন। উক্ত সালার শাইখকে মিসরে অবস্থানের জন্য বলেন, যাতে লোকজন তাঁর জ্ঞান ও উচ্চ সম্মান প্রত্যক্ষ করতে পারে।
৭০৬ হিঃ-এর শাওয়াল মাসে সুফীগণ অনেকগুলো ব্যাপারে তাঁর বিরুদ্ধে সরকারের কাছে বিভিন্ন অভিযোগ আনল এবং ইবনে আতাও তাঁর বিরুদ্ধে অনেক বিষয়ে দাবী এনেছিল, ঘটনাক্রমে যার কিছুই প্রমাণিত হয়নি, অথচ সরকার ইবনে তাইমিয়াহ্ বিষয়টি ফকীহগণের নিকট ছেড়ে দিয়েছিলেন, যাতে সুফীগণের দাবীর ব্যাপারে তারা তাদের রায় দিতে পারে। এতে কতক ফকীহগণ বললেন, ইবনে তাইমিয়াহ্ যে বিষয়ে যা বলেছেন এতে তাঁর কোনই অপরাধ নেই। আর ইবনে জামা'আহ রায় দিলেন সেটা ছিল তাঁর জন্য অশিষ্টাচার ও অশোভনীয়।
অতঃপর সরকার তাঁকে অনেকগুলো ব্যাপারে এখতিয়ার-অধিকার দিয়েছিল; হয় তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় না হয় দামেস্কে চলে যাবেন, কিন্তু কিছু শর্ত সাপেক্ষে অথবা তাঁকে জেলে ঢুকানো হবে। তখন ইবনে তাইমিয়াহ্ জেলের বাইরে বোবা হয়ে থাকার চাইতে জেলের ভিতরের জীবনকেই ভাল বলে অগ্রাধিকার দিলেন। কিন্তু কিছু সংখ্যক সুফী শাইখগণ তাঁকে দামেস্কের দিকে সফর করার জন্য পুনঃপুনঃ তোষামোদ করলেন তিনি তাদের অন্তরের সন্তুষ্টি নিবারণের জন্য তাদের অনুরোধে সাড়া দিলেন।
শাওয়ালের ২৮ তারিখে সরকারী তত্ত্বাবধানে দামেস্কে অভিমুখে রাওয়ানা হলেন। দামেস্কের পথে খুব বেশি সময় অতিবাহিত হয়নি। মাত্র এক রাত্রি, পরের দিনই তাঁর পিছনে তারা দ্বিতীয় আরও একটি ডাক পাঠিয়েছে, এরপর তাঁকে পুনঃ মিসরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। তিনি ইবনে জামা'আর কাছে উপস্থিত হলেন, এমতাবস্থায় তার ওখানে ফকীহগণের এক সমাবেশ ছিল, তাদের কেউ কেউ কথায় বললেন: "সরকার ইবনে তাইমিয়াহকে বন্দী করা ব্যতীত খুশী হবে না।”
ইবনে জামা'আহ্ মালিকী মাযহাবের বিচারকের প্রতি শাইখকে বন্দী করার আদেশ প্রদান করতে অনুরোধ করলেন, এতে বিচারক অসম্মতি জ্ঞাপন করে বললেন: "আমার নিকট তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত কোন কিছু প্রমাণিত হয়নি। সুতরাং আমি তাঁকে বন্দী করার হুকুম দেই কিভাবে? অতঃপর নুরুদ্দীন আল-জাওয়ারী (মালিকী মাযহাবের কাজী) কেউ একই অনুরোধ করলে তিনিও তাতে বিরত রইলেন।
অতঃপর যখন তাইমিয়াহ্ তাদের চোখে মুখে তাঁকে বন্দী করতে না পারায় হয়রানীর চিহ্ন লক্ষ্য করলেন, তখন তিনি স্বেচ্ছায় স্বয়ং জেলখানার দিকে এ কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেলেন "আমি স্বয়ং স্বেচ্ছায় জেলে যাচ্ছি সেখানে কি মঙ্গল আছে আমি তা অন্বেষণ করব।"
অতঃপর ঐ কাজী সাহেব বললেন, "শাইখের ঐরূপ যোগ্যস্থানেই থাকা প্রয়োজন যা তাঁর মত লোকের জন্যই কেবল শোভা পায়।" এরপর তাঁকে বলা হল যে, জেল ছাড়া অন্য কিছুতেই সরকার খুশী নয়, সুতরাং শাইখকে জেলেই পাঠিয়ে দেয়া হল। ঐসবই হয়েছিল 'আল-মাম্বাজী' ধর্মের যারা অনুসারী, তাদেরই ইঙ্গিতে। শাইখ জেলেই রইলেন। আর এদিকে লোকজন তাঁর নিকট ফাতাওয়া চাইতে আসত। যেসব জটিল জটিল মাস্সালাসমূহে তিনি ছাড়া অন্যরা অক্ষম হতো এবং জ্ঞানীগণও হিমশিম খেত ঐসব বিষয়ে তিনি তাদেরকে ফাতাওয়া লিখে দিতেন।
অতঃপর শাইখ কারাগার হতে বের হলেন এবং আলেকজান্দ্রিয়ায় নীত হলেন। সেখানে তিনি কিছুকাল অবস্থান করলেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন ধরনের চিন্তাভাবনা, ভয়ভীতি ও যুগ্ম নির্যাতনের শিকার হলেন। এ সময় সুফীগণ তাঁর বিরুদ্ধে গীবতের মাধ্যমে বদনাম রটনা করে বসল এবং তাঁকে অতর্কিতে হত্যা করে তাঁর যাবতীয় চ্যালেঞ্জ হতে মুক্তি লাভের চেষ্টা করল। অথচ আল্লাহ তা'আলা তদীয় মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের হাফিযগণের মধ্য হতে তাঁর ও অন্যদের জন্য এমন সকল ব্যক্তিগণকে নির্ধারিত করেছিলেন, যারা তাঁর পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন এবং তাদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র হতে তাঁকে রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু ঐ সুফীগণ আর একবার তাঁকে আলেকজান্দ্রিয়ার জেলে রাখার ব্যাপারে কৃতকার্য হয়েছিল, একসাথে তাঁর ধ্যান ধারণার বিশ্বাসী তাঁর অসংখ্য শিষ্যদেরকেও কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল।
সুলতান কালাউনের শাসনভার গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত তাঁর উপর কারাগারের ভিতর অমানুষিক নির্যাতন চলছিল। তিনি এসে সর্বপ্রথম যা করতে চাইলেন, তন্মধ্যে ছিল ইবনে তাইমিয়াহকে তাঁর বন্দীদশা হতে বের করা। অতএব ৭০৯ হিজরী ঈদুল ফিত্রের দিন সুলতান কালাউন ইবনে তাইমিয়ার্কে আলেকজান্দ্রিয়ার জেল হতে বের হয়ে আসতে অনুরোধ জানালেন এবং শাইখ স্বসম্মানে স্বগৌরবে বের হয়ে আসলেন। ৮ই শাওয়াল, তিনি সুলতানের দরবারে প্রবেশ করলে, সুলতান তাঁর সাথে আন্তরিকভাবে মিলিত হলেন এবং যে সকল ফকীহগণ তাঁকে জেলে দেয়ার জন্য ফাতাওয়া দিয়েছিলেন, তাদেরও শাইখের মাঝে একটি আপোষ মীমাংসা করে দিতে চেষ্টা করলেন।
যে মানুষকে জীবনে কপটতা এবং জানা বিষয়ে সত্যে ও অসত্যের উপর মুখ বন্ধ করে চুপ থাকতে বাধ্য করে, ইবনে তাইমিয়াহ্র নিকট ঐ জীবনের চাইতে জেলখানাসমূহের বন্দী জীবনই বেশি প্রিয় হয়ে দেখা দিয়েছিল। শাইখের বিরুদ্ধে বিচার প্রার্থনা করা, ফকীহগণের বিচারকমণ্ডলীর ভূমিকা সর্বদাই ন্যাক্কারজনক ছিল। ইবনে তাইমিয়াহ্ জীবন এমন চলছিল যে, তিনি এক জেল হতে অন্য জেলে ঢুকবেন ব্যতীত বের হতে পারতেন না। একটি বিচার আবেদন শেষ না হতেই আর একটি শুরু হয়ে যেত। ফকীহগণও ছিলেন সরকারের ধামাধরা। তারা ইবনে তাইমিয়াহ্ বিরুদ্ধে ফাতাওয়া ও দ্রুত রায় দিয়ে সুলতানের সন্তোষ অর্জনের মাধ্যমে নৈকট্য লাভের চেষ্টা করত। অপরপক্ষে ইবনে তাইমিয়াহ্র উপর যত বিপদই আসত, এটার কিছুতেই তিনি মানুষের অন্তরের ইসলামী মূল্যবোধ সংশোধনের ব্যাপারে এতটুকুও নিরাশ হতেন না। বরং তিনি তাঁর সঙ্গী সাথীদেরকে এ বলে সান্ত্বনা দিতেন, "আমার শত্রুগণ আমার সাথে যেরূপ ব্যবহারই করুক না কেন, আমার বুকের বাগান আমি যেখানেই যাব, সেখানেই সেটা আমার সঙ্গে সাথী। যদি তারা আমাকে জেলে রাখে, তাহলে সেটা আমার জন্য একটু নিরিবিলির ব্যবস্থা হল। আর যদি আমাকে এক দেশ হতে অন্য দেশে, এক কারাগার হতে অন্য কারাগারে নিয়ে যায়, তাহলে সেটা আমার জন্য সফর স্বরূপ হবে। আর যদি তারা আমাকে হত্যা করে, তাহলে সেটা হবে আল্লাহর পথে আমার শাহাদাত। নিশ্চয়ই আমার বুকে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল-এর সুন্নাহ্ তথা আদর্শ রয়েছে।”
📄 মুসীবাতের চূড়ান্ত পর্যায়
শাইখের কিছু সিদ্ধান্ত, মতবাদ ও ধারণার কারণে ৭২৬ হিজরীতে যে ঘটনাটি ঘটেছিল, সেটাই ছিল তাঁর উপর পতিত সর্বশেষ বিপদ। ৭২৬ হিজরীর ১০ই শা'বান, রোজ শুক্রবার, দামেস্কের জামে মাসজিদে সুলতানের একটি ফরমান পাঠ করা হয়, যা শাইখকে ফাতাওয়া দিতে নিষেধ করে ও তাঁকে বন্দী করতে আদেশ দেয়। এতে ইবনে খুত্বাইবি দামেস্কে উপস্থিত হন ও সুলতানের শাহী ফরমান সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করেন।
এসব শ্রবণে ইবনে তাইমিয়াহ্ বললেন: “আরে, আমিতো ঐ ফরমানেরই অপেক্ষা করছিলাম। আসলে তাতে সীমাহীন লাভ, বড় ধরনের সফলতা রয়েছে। তখন শাইখ স্বয়ং বন্দী অবস্থায় দূর্গের ফটকের ভিতরে প্রবেশ করলেন। উক্ত মাসের মাঝামাঝিতে রোজ বুধবার, বিচারপতি সাহেব ইবনে তাইমিয়াহ্ অসংখ্য সাথী ও শিষ্যদেরকে আটক করার আদেশ দিলেন এবং তাদের এক দলকে শাস্তি স্বরূপ পথে-ঘাটে- হাটে-বাজারে প্রদর্শনীর জন্য পাঠিয়ে দেয়া হল, যেন অমানুষিকভাবে প্রতিশোধ নেয়া হয়।
ইমাম তাইমিয়াহ্ এভাবে দু'বৎসর ও আরো কয়েক মাস জেল হাজতে কাটান। কিছু সংখ্যক লোক (যারা মনে যা চায়, তাই করে) তাঁকে বন্দী করার জন্য ফাতাওয়া দেয় এবং তাদের পুরোধা ছিলেন মালিকী মাযহাবের কাজী আল-আস্থায়ী'।
এবার তাঁকে বন্দী করার কারণ ছিল, তিনি মুসলিমগণের 'আকীদাহ্ ও বিশ্বাসসমূহকে সাধারণ মানুষের মাসজিদ ও আউলিয়াদের কবরস্থানের যিয়ারাতের জন্য ভ্রমণ বাহন ও পাথেয় সংগ্রহ ও সেটার ব্যবস্থা করার ব্যাপারে পরিশুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর শত্রুগণ একেই উপযুক্ত সুযোগ মনে করে, বড় ধরনের ফন্দি এঁটেছিল এবং তাঁর ফাতাওয়ার অনেক শব্দ রদবদল করে, তিনি যা বলেননি, ঐরূপ অনেক কিছু তাঁরা এ বলে প্রচার করে, তাঁর বিরুদ্ধে অনেক অপবাদের ঝড় তোলে; তাতে সাধারণ মানুষ খুবই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। আর সেটা কোন অসম্ভব ব্যাপারও ছিল বা অসম্ভব মনেও করা যায় না। কেননা এরূপ ষড়যন্ত্র তো যুগে যুগে ক্ষমতাসীনদের যুগ্মের উপকরণ হয়ে আসছে যা দ্বারা এ সকল উৎসর্গ প্রাণ উলামা কর্মীগণের উপর যুগ্ম করেছে, যারা কপটতা করেননি, লোক দেখানোর উপকরণাদির প্রতিও ভরসা করেননি অথবা সরকারী যুগ্ম নির্যাতন হতে মুক্তির জন্য কোনরূপ তোষণনীতির অবলম্বন করেননি। আসলে ইবনে তাইমিয়াহ্ কবরসমূহের যিয়ারাত নিষেধ করেননি। ঐরূপ কিছুই বলেননি এবং রাসূলুল্লাহ-এর রওযা মুবারাক যিয়ারাতও নিষেধ করেননি। যিনি এ বিষয়ে স্বীয় অনুধাবনকে বিশুদ্ধ করতে আগ্রহী, তার জন্য ইবনে তাইমিয়াহ ফাতাওয়া মওজুদ রয়েছে।
আসল বিষয়টি রাসূলুল্লাহ-এর হাদীসে বর্ণিত তিনটি মাসজিদ (আল-মাসজিদুল হারাম মাক্কাহ্, আল-মাসজিদুল আক্সা যেরুজালেমে ও আল মাসজিদুন্ নববী মাদীনাহ্) এর জন্য ছাড়া অন্য কোন মাসজিদ বা স্থানের উদ্দেশে (বেশি পুণ্যের বাসনায়) ভ্রমণ বাহন করতে নিষেধ করেছেন বৈ আর কিছুই নয়। ঐ বিষয়ে ইবনে তাইমিয়াহ্হ্র নিকট এসব প্রমাণাদি আছে, যা তাঁর বিরোধীগণকে কৃষ্ণকায় কয়লাবৎ বানিয়ে ফেলবে। কিন্তু তারা এ ব্যক্তিকে বন্দী না করে, তাঁর জিহ্বাকে চুপ না করিয়ে অন্য কিছুতেই সন্তুষ্ট হবে না।