📄 মিসরীয় সুলতানের প্রতি নাসীহাত
৭০০ হিজরীতে একবার প্রচার হয়ে গেল যে, তাতারগণ দামেস্ক আক্রমণের জন্য অতি নিকটে এসে পড়েছে। এতে লোকজন তাতার বাহিনীর হাত হতে বাঁচার জন্য শত্রুকে দেশ লুণ্ঠন করার সুযোগ দিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে লাগল। এ সময় ইবনে তাইমিয়াহ্ মিসরীয় সুলতান ও শাসকদের নিকট দেশের জন্য সাহায্য সহযোগিতা চাইতে গেলেন এবং মিসরের সুলতানকে এ কথা বলে শাসালেন যে, "যদি তোমরা দেশ রক্ষা হতে বিরত থাক, তাহলে যে তাকে রক্ষা করবে এবং শান্তির সময় কাজে লাগাবে আমরা তাকেই প্রতিষ্ঠিত করব। আর এটা যদি নিরূপিত হয়ে থাকে যে, তোমরা এ দেশের বাদশাহ্ও নও আর শাসকও নও, এটার পরও মুসলিমগণ তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে তোমার কাছে সাহায্য চায়, তবুও তোমাদের উপর সাহায্য করা অবশ্য কর্তব্য। আর যখন তোমরা দেশের শাসক, তারা তোমাদের প্রজা-সাধারণ, তোমরা তাদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তখন তোমাদের এ ব্যাপারে কেমন ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত তা তোমরাই বুঝে দেখ (আল-বিদায়াহ ওয়া আন-নিহায়াহ : ১৪-১৫)।
📄 মুসীবাতের অগ্নি পরীক্ষা
মোটকথা, যখনই ইবনে তাইমিয়াহ্র সামনে বিপদাপদ ও মুসীবাত উপস্থিত হত, তখনই তিনি অধিক সাহসী হতেন ও সেটার মুকাবিলা করতেন। ৭০৭ হিজরীতে ইবনে তাইমিয়াহ্ সুফীগণের এক শ্রেণীকে অপমান করেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কিছু কথা বলার প্রেক্ষিতে তাঁকে আটক করার জন্য সুলতানী ফরমান জারী হয়। এ মর্মে কাজী ও ফকীহগণের নিকট তাঁকে বন্দী করার বৈধতার পক্ষে ফাতাওয়া দিতে অনুরোধও করা হয়। কিন্তু ফকীহগণ শাইখের কাছে শারী'আতের দৃষ্টিতে এতটুকু ত্রুটিও পেলেন না, যাকে কেন্দ্র করে অন্ততঃ তাঁকে বন্দী করার পক্ষে ফাতাওয়া দাঁড় করাতে পারেন। এতে তাদের বিষয়টিতে অস্থিরতা পরিলক্ষিত হল। ইবনে তাইমিয়াহ্ যখন তাদের চোখে মুখে গ্লানি ও বিষাদের স্পষ্ট ছাপ অবলোকন করলেন, তখন তিনি স্বয়ং বন্দীশালার দিকে এ কথা বলতে বলতে অগ্রসর হলেন- "আমি নিজে স্বেচ্ছায় জেলের দিকে যাচ্ছি এবং যাতে মুসলিমগণের মঙ্গল রয়েছে তারই সন্ধান আমি ওখানে করব (আল-বিদায়াহ ওয়া আন-নিহায়াহ: ১৪-১৩৫ ও তারপরও)।"
📄 অসৎকাজের বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম
ইবনে তাইমিয়াহ্ বীরত্ব তাঁর জীবনে শুধু মাতৃভূমিকে নিয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তাঁর দীনীশক্তি ও সেটা পালনে আপন চিন্তা ও চেতনা নিয়োজিত করেছিলেন। সুতরাং তিনি দীনকে যাবতীয় অশ্লীলতা, বিদ'আত এবং সন্দেহসমূহ যা কিছু ঐ দীনের মধ্যে প্রবেশ করেছে ও ভয়ঙ্কররূপ পরিগ্রহণ করে সমাজের উপর সেটার ভয়াবহতা বিস্তার করেছে- সেটা হতে পবিত্র করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন।
তাঁর জীবনের এ দিকটি তাঁর সময় ও শক্তি সামর্থ্যের এক বিরাট অংশ দখল করে নিয়ে গিয়েছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনিত অপবাদ ও তাঁর জীবনের সকল দুঃখ কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কেননা ইসলামী দেশসমূহ কোনও ধরনের বিদ'আত ও অশ্লীলতা প্রকাশ হওয়াটা একটা মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি, যা হতে তিনি সমাজকে পূর্ণমাত্রায় সুস্থ রাখতে চেয়েছিলেন। যেহেতু কোনও সমাজে অমূলক ও আজগুবি বিষয় ও বিদ'আত (তথা ধর্মীয় বিষয়ে কোন নতুন সংযোজন) ছড়িয়ে পড়াটা ঐ সমাজ ধ্বংস ও বিলীন হবার আভাস এবং তার শত্রুদের চোখে সেটার শক্তি খর্বকারী।
সুদীর্ঘ দিন ধরে ইবনে তাইমিয়াহ্ তাঁর রুগ্ন সমাজের জন্য সুদক্ষ চিকিৎসকের ভূমিকায় ছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে ব্যামোটা ভয়ঙ্কররূপ ধারণ করে নিয়েছিল, রোগটি রোগীর সারাটা দেহেই বিস্তার লাভ করেছিল। সুতরাং বিদ'আত প্রথা এবং অশ্লীলতা সমাজের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। আর এ কথাটিও সত্য যে, কোন প্রথাকে সহজে পাল্টানো এবং কোন অভ্যাসের সহসাই মূলোৎপাটন করা একজন সংস্কারকের জন্য খুবই কঠিন ব্যাপার। আর এজন্যই ইবনে তাইমিয়াহ্ তাঁর সমাজের চোখে প্রচলিত প্রথা হতে দূরের এবং সামাজিক অভ্যাস বিরোধী সত্ত্বা হিসেবে প্রতিভাত হলেন। এটার পর হতেই তাঁর জীবন ছিল বিপদাপদ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরস্পর বিজড়িত করায় তৈরী শিকল স্বরূপ। কতগুলো কঠিন ক্ষেত্র ছিল, যেখানে তাঁর অস্ত্র ছিল কখনও বর্শা আবার কখনও বা মুখের ভাষা। এসবগুলোর ক্ষেত্রে পশ্চাতেই এ বীরোচিত ব্যক্তিত্ব বলিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। সুতরাং কোন সুলতানকে তিনি অস্বীকার করবেন এতে তাঁকে দোষ দেয়া যাবে না। অথবা কোন আত্ম গৌরবান্বিত ব্যক্তিকে তিনি 'আমাল দিবেন না, তাতেও তাঁর কিছু আসে যায় না। কেননা তিনি ছিলেন ক্ষুরধার যুক্তির অধিকারী এবং অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে সবচাইতে ধারালোটি তো তাঁরই কাছে ছিল। কাজেই ভয়ের কি আছে?
এখান হতেই স্পষ্ট বুঝা যায় যে, তিনি বিদ'আতের শ্রেণীভেদে প্রত্যেক বিদ'আতীর বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং দার্শনিক, ভেদবাদী, বাতিনী, শী'আ, সূফী, কারামাতিয়া এবং ইসমা'ঈলীয়া সম্প্রদায়ের মতবাদের সমালোচনা করতে ও সেটার অসারতা বর্ণনায় আত্মনিয়োগ করেন। এ পথে এদেরও তাদের সকলেরই গোপন ভেদ ফাঁস করে দিয়ে সত্য ও সত্য দীনের পক্ষে তাদের সকলের উপর শুভ বিজয় লাভ করেন।
সুফীবাদী ও ভেদবাদীদের বিরুদ্ধে ইবনে তাইমিয়াহ্ বিদ্রোহ চরম পর্যায়ে উঠেছিল। তিনি তাদের অমূলক আজগুবি কর্মকাণ্ড হতে যা দ্বারা বোকাদের শেষ বুদ্ধিটুকুও কেড়ে নেয়া হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মাথা অবনমিত করানো হয়েছে- তাঁর সমাজকে এ ঘোষণার মাধ্যমে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন যে, মুহাম্মাদ-এর পথনির্দেশনা ব্যতীত আল্লাহকে পাবার আর দ্বিতীয় কোনও পথ নেই। এজন্য পবিত্র কুরআনের নির্দেশিত পথ ছাড়া বিকল্প নেই।
একদা সুফীগণ সুলতানের উপস্থিতিতে তাঁর পাশে জমা হয়ে তাঁকে অনুরোধ করলেন যে, তিনি যেন তাদের অবস্থার উপর আর হস্তক্ষেপ না করে বরং তাদেরকে যথা অবস্থায় ছেড়ে দেন। তখন ইবনে তাইমিয়াহ্ তাদেরকে উদ্দেশ্য করে ঘোষণা করলেন যে, কাউকেও একটি কাজ বা কথায় শারী'আত হতে বের হয়ে যাবার অনুমতি দেয়া যাবে না। তবে যদি তাদের মধ্যে কেউ দোযখে প্রবেশ করতে চায়, তাহলে সে যেন গোসলখানায় তার শরীর ধৌত করে নেয়, অতঃপর সিরকা দ্বারা শরীর মর্দন করে আগুনে প্রবেশ করে। আর সে যদি আগুনে প্রবেশও করে তবুও তার প্রতি সহানুভূতির সাথে তাকানো হবে না, কারণ এটা এক ধরনের দাজ্জালী ও ফাঁকী এবং ভেল্কিবাজি!
শেষে তাঁর কথা যখন তাদেরকে একেবারে অনন্যোপায় করে ফেলল, তখন তারা সুলতানকে এ কথা বলে প্রস্থান করল: "তাতারাদের নিকট যাওয়া ছাড়া আমাদের অবস্থাসমূহের মিল হবে না, আর শারী'আতের সামনে তো মিল হবেই না (আল-উকুদ্দুদ্দুররিইয়্যাহ : ১৯৬ পৃষ্ঠা)।"
📄 সুলতান কালাউনের পরামর্শ
সত্যের জন্য ইমাম তাইমিয়াহ্ সাহসী হওয়ার সাথে সাথে অত্যধিক সহনশীলও ছিলেন, যেহেতু সহনশীলতা সেটার অধিকারীকে সম্মানিত করে থাকে। সুলতান 'কালাউন' একবার ইমাম তাইমিয়াহকে ঐ সকল 'আলিমগণকে হত্যা করতে ফাতাওয়া দেয়ার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন, যাদের পক্ষ হতে তাঁকে বন্দী করার জন্য বারবার ফাতাওয়া এসেছিল। এ সময় কাজী, ফকীহগণও শাইখের ও সুলতানের শত্রুদেরকে অনেক সাহায্য-সহযোগিতা করেছিলেন। সুতরাং এখন সুযোগ বুঝে সেটা কাজে লাগাতে চাইলেন এবং তাদেরকে হত্যা করার পক্ষে ইমাম তাইমিয়াহ্ নিকট ফাতাওয়া চাইলেন, কিন্তু তাঁর অসীম ধৈর্য, সহনশীলতা ও ক্ষমাগুণ ঐরূপ প্রতিশোধমূলক কাজ হতে তাঁকে বারণ করেছিল। তাঁর বীরোচিত আত্মা ঐ সকল 'আলিমগণকে হত্যার সুবর্ণ সযোগ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। এ সুবাদে তিনি সুলতানকে বলেছেন: “যে ব্যক্তি আমাকে কষ্ট দিয়েছে, সে অত্র বিষয়ে বৈধ অবস্থায় আছে। আর যে লোক আল্লাহ ও তদীয় রাসূলকে কষ্ট দিবে স্বয়ং আল্লাহই তার কাছ হতে পূর্ণ প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। আজ যদি তুমি ঐ সকল 'আলিমগণকে হত্যা করে ফেল, তাহলে তাদের পরে তাদের মত আর কাউকেও পাবে না।"