📘 সৎকাজ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ 📄 তাতার রাজ কাজানের সাথে সাক্ষাৎ

📄 তাতার রাজ কাজানের সাথে সাক্ষাৎ


যখন তাঁর সাহসিকতা ও বীরত্বের কথা জানাজানি হয়ে গেল, তখন মানুষেরা নিজেদের প্রয়োজনে তাঁর নিকট গমন করত এবং আপদে-বিপদে তাঁর শরণাপন্ন হত। ৬৯৯ হিজরীতে তাতারগণ যখন সিরিয়া আক্রমণ করেছিল এবং রাজধানী দামেস্কের অতি নিকটে এসে পড়েছিল, তখন লোকজন ইবনে তাইমিয়াহ্ পাশে এসে একত্রিত হয়ে তাঁকে এ আবেদন জানাল যে, তিনি যেন একজন দলনেতা হয়ে রাষ্ট্রদূতের মত তাতার রাজ্যের দরবারে যেয়ে তাদের দামেস্কে প্রবেশ হতে বিরত থাকার ব্যাপারে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আলোচনা করেন।

আর সত্যিই তিনি যখন তাতার রাজ 'কাজানের' প্রাসাদে প্রবেশ করলেন, তখন তার সাথে এমন কথাই বলেছিলেন যা তাঁর নির্ভীকতা ও বীরত্বের প্রমাণে সভাস্থ সকলকেই হতভম্ব করে ফেলেছিল। এমনকি রাজা স্বয়ং তাঁর ব্যবহারে আশ্চর্য হন এবং জিজ্ঞেস করেন: কে এ ভদ্র লোক? এমন ভয়ঙ্কর লোক আমি আর জীবনে দেখিনি। তাঁর চাইতে স্থিরচিত্ত লোকও আর কাউকেও দেখিনি এবং আমার অন্তরে তাঁর কথার চাইতে বেশি স্থায়ী হতে পারে এমন কথাও আর শুনিনি। আর আমার স্বত্ত্বাকে তাকে ছাড়া আর অন্য কাউকেও এত বেশি স্বীকার করতে দেখিনি (তারীক-ই-ইবনে আল-ওয়ারদী, দেখুনঃ ২-২৮৭: আল-বাজ্জার: ৭২-৭৩)।

তিনি ঐ প্রসঙ্গে তাতার রাজকে যা বলেছিলেন: তন্মধ্যে "আমার জানামতে তুমি দাবী করছ যে তুমি মুসলিম, তোমার সাথে কাজী, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং শাইখগণ রয়েছেন। তোমার বাপ ও দাদা উভয়েই কাফের ছিল। তবুও তুমি যা করছ তারা সেটা করেননি। তারা উভয়েই আমাদের সাথে সন্ধি চুক্তি করেছেন এবং সে অনুযায়ী কাজও করেছেন, অথচ তুমি চুক্তি করেছ আর গাদ্দারী করে সেটা ভঙ্গ করেছ। আমাদের অনেক লোক হত্যা করেছ; কিন্তু রক্তের বল্লা দাওনি"। তাঁর এ কথাগুলোতে সীমাহীন বারাকাত নিহিত ছিল, যাতে তিনি নিজেদের দেশে তাতারদের প্রবেশ না করার ব্যাপারে কাজান হতে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন।

এ বৎসরই মারজি সাফ্রির ঘটনার দিকে তাতারদের আক্রমণ ও যুলুমের কারণে সকল মানুষের অন্তরে হতাশা বিস্তার করেছিল। ওদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আবার দেশ জুড়ে অশ্লীলতাও বেড়ে গিয়েছিল। এ সময় তাতারগণ দামেস্কের দূর্গ দখল করতে চেয়েছিল। এ উদ্দেশে 'কাব্‌জাক্' তাতার বাহিনীর হাতে উক্ত দূর্গ অর্পণ করার জন্য দূর্গের নায়েবের বরাবরে একটি চিঠি লিখেছিল, যাতে দেশের অবস্থা শান্ত হয় এবং সার্বিক অবস্থা স্থিত হয়; কিন্তু ঐ খবর ইবনে তাইমিয়াহ্র কাছে পৌঁছতে না পৌঁছতেই তিনি নায়েবের প্রতি এক আদেশনামা লিখলেন-

"যদি পার তাহলে সেটার (দূর্গের) এক খণ্ড পাথর অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত সেটা কারও হাতে ছেড়ে দিও না।"

অতএব আরজাওয়াশ্ ইবনে তাইমিয়াহ্র আদেশে কেল্লা হতে অবতরণ করলে এবং দূত পাঠিয়ে কান্জাককে বলে দিলেন, "আমি এটা (দূর্গ) কস্মিনকালেও তোমাদের হাতে সমর্পণ করব না, যতক্ষণ পর্যন্ত তাতে একটি চোখও পলক দিবে। আর তাতেই ঐ কেল্লা মুসলিমদের জন্য নিরাপদ ও শত্রুদের জন্য দুর্ভেদ্য দূর্গ হয়ে রয়েছে।”

📘 সৎকাজ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ 📄 মিসরীয় সুলতানের প্রতি নাসীহাত

📄 মিসরীয় সুলতানের প্রতি নাসীহাত


৭০০ হিজরীতে একবার প্রচার হয়ে গেল যে, তাতারগণ দামেস্ক আক্রমণের জন্য অতি নিকটে এসে পড়েছে। এতে লোকজন তাতার বাহিনীর হাত হতে বাঁচার জন্য শত্রুকে দেশ লুণ্ঠন করার সুযোগ দিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে লাগল। এ সময় ইবনে তাইমিয়াহ্ মিসরীয় সুলতান ও শাসকদের নিকট দেশের জন্য সাহায্য সহযোগিতা চাইতে গেলেন এবং মিসরের সুলতানকে এ কথা বলে শাসালেন যে, "যদি তোমরা দেশ রক্ষা হতে বিরত থাক, তাহলে যে তাকে রক্ষা করবে এবং শান্তির সময় কাজে লাগাবে আমরা তাকেই প্রতিষ্ঠিত করব। আর এটা যদি নিরূপিত হয়ে থাকে যে, তোমরা এ দেশের বাদশাহ্ও নও আর শাসকও নও, এটার পরও মুসলিমগণ তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে তোমার কাছে সাহায্য চায়, তবুও তোমাদের উপর সাহায্য করা অবশ্য কর্তব্য। আর যখন তোমরা দেশের শাসক, তারা তোমাদের প্রজা-সাধারণ, তোমরা তাদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তখন তোমাদের এ ব্যাপারে কেমন ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত তা তোমরাই বুঝে দেখ (আল-বিদায়াহ ওয়া আন-নিহায়াহ : ১৪-১৫)।

📘 সৎকাজ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ 📄 মুসীবাতের অগ্নি পরীক্ষা

📄 মুসীবাতের অগ্নি পরীক্ষা


মোটকথা, যখনই ইবনে তাইমিয়াহ্র সামনে বিপদাপদ ও মুসীবাত উপস্থিত হত, তখনই তিনি অধিক সাহসী হতেন ও সেটার মুকাবিলা করতেন। ৭০৭ হিজরীতে ইবনে তাইমিয়াহ্ সুফীগণের এক শ্রেণীকে অপমান করেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কিছু কথা বলার প্রেক্ষিতে তাঁকে আটক করার জন্য সুলতানী ফরমান জারী হয়। এ মর্মে কাজী ও ফকীহগণের নিকট তাঁকে বন্দী করার বৈধতার পক্ষে ফাতাওয়া দিতে অনুরোধও করা হয়। কিন্তু ফকীহগণ শাইখের কাছে শারী'আতের দৃষ্টিতে এতটুকু ত্রুটিও পেলেন না, যাকে কেন্দ্র করে অন্ততঃ তাঁকে বন্দী করার পক্ষে ফাতাওয়া দাঁড় করাতে পারেন। এতে তাদের বিষয়টিতে অস্থিরতা পরিলক্ষিত হল। ইবনে তাইমিয়াহ্ যখন তাদের চোখে মুখে গ্লানি ও বিষাদের স্পষ্ট ছাপ অবলোকন করলেন, তখন তিনি স্বয়ং বন্দীশালার দিকে এ কথা বলতে বলতে অগ্রসর হলেন- "আমি নিজে স্বেচ্ছায় জেলের দিকে যাচ্ছি এবং যাতে মুসলিমগণের মঙ্গল রয়েছে তারই সন্ধান আমি ওখানে করব (আল-বিদায়াহ ওয়া আন-নিহায়াহ: ১৪-১৩৫ ও তারপরও)।"

📘 সৎকাজ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ 📄 অসৎকাজের বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম

📄 অসৎকাজের বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম


ইবনে তাইমিয়াহ্ বীরত্ব তাঁর জীবনে শুধু মাতৃভূমিকে নিয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তাঁর দীনীশক্তি ও সেটা পালনে আপন চিন্তা ও চেতনা নিয়োজিত করেছিলেন। সুতরাং তিনি দীনকে যাবতীয় অশ্লীলতা, বিদ'আত এবং সন্দেহসমূহ যা কিছু ঐ দীনের মধ্যে প্রবেশ করেছে ও ভয়ঙ্কররূপ পরিগ্রহণ করে সমাজের উপর সেটার ভয়াবহতা বিস্তার করেছে- সেটা হতে পবিত্র করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন।

তাঁর জীবনের এ দিকটি তাঁর সময় ও শক্তি সামর্থ্যের এক বিরাট অংশ দখল করে নিয়ে গিয়েছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনিত অপবাদ ও তাঁর জীবনের সকল দুঃখ কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কেননা ইসলামী দেশসমূহ কোনও ধরনের বিদ'আত ও অশ্লীলতা প্রকাশ হওয়াটা একটা মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি, যা হতে তিনি সমাজকে পূর্ণমাত্রায় সুস্থ রাখতে চেয়েছিলেন। যেহেতু কোনও সমাজে অমূলক ও আজগুবি বিষয় ও বিদ'আত (তথা ধর্মীয় বিষয়ে কোন নতুন সংযোজন) ছড়িয়ে পড়াটা ঐ সমাজ ধ্বংস ও বিলীন হবার আভাস এবং তার শত্রুদের চোখে সেটার শক্তি খর্বকারী।

সুদীর্ঘ দিন ধরে ইবনে তাইমিয়াহ্ তাঁর রুগ্ন সমাজের জন্য সুদক্ষ চিকিৎসকের ভূমিকায় ছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে ব্যামোটা ভয়ঙ্কররূপ ধারণ করে নিয়েছিল, রোগটি রোগীর সারাটা দেহেই বিস্তার লাভ করেছিল। সুতরাং বিদ'আত প্রথা এবং অশ্লীলতা সমাজের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। আর এ কথাটিও সত্য যে, কোন প্রথাকে সহজে পাল্টানো এবং কোন অভ্যাসের সহসাই মূলোৎপাটন করা একজন সংস্কারকের জন্য খুবই কঠিন ব্যাপার। আর এজন্যই ইবনে তাইমিয়াহ্ তাঁর সমাজের চোখে প্রচলিত প্রথা হতে দূরের এবং সামাজিক অভ্যাস বিরোধী সত্ত্বা হিসেবে প্রতিভাত হলেন। এটার পর হতেই তাঁর জীবন ছিল বিপদাপদ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরস্পর বিজড়িত করায় তৈরী শিকল স্বরূপ। কতগুলো কঠিন ক্ষেত্র ছিল, যেখানে তাঁর অস্ত্র ছিল কখনও বর্শা আবার কখনও বা মুখের ভাষা। এসবগুলোর ক্ষেত্রে পশ্চাতেই এ বীরোচিত ব্যক্তিত্ব বলিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। সুতরাং কোন সুলতানকে তিনি অস্বীকার করবেন এতে তাঁকে দোষ দেয়া যাবে না। অথবা কোন আত্ম গৌরবান্বিত ব্যক্তিকে তিনি 'আমাল দিবেন না, তাতেও তাঁর কিছু আসে যায় না। কেননা তিনি ছিলেন ক্ষুরধার যুক্তির অধিকারী এবং অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে সবচাইতে ধারালোটি তো তাঁরই কাছে ছিল। কাজেই ভয়ের কি আছে?

এখান হতেই স্পষ্ট বুঝা যায় যে, তিনি বিদ'আতের শ্রেণীভেদে প্রত্যেক বিদ'আতীর বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং দার্শনিক, ভেদবাদী, বাতিনী, শী'আ, সূফী, কারামাতিয়া এবং ইসমা'ঈলীয়া সম্প্রদায়ের মতবাদের সমালোচনা করতে ও সেটার অসারতা বর্ণনায় আত্মনিয়োগ করেন। এ পথে এদেরও তাদের সকলেরই গোপন ভেদ ফাঁস করে দিয়ে সত্য ও সত্য দীনের পক্ষে তাদের সকলের উপর শুভ বিজয় লাভ করেন।

সুফীবাদী ও ভেদবাদীদের বিরুদ্ধে ইবনে তাইমিয়াহ্ বিদ্রোহ চরম পর্যায়ে উঠেছিল। তিনি তাদের অমূলক আজগুবি কর্মকাণ্ড হতে যা দ্বারা বোকাদের শেষ বুদ্ধিটুকুও কেড়ে নেয়া হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মাথা অবনমিত করানো হয়েছে- তাঁর সমাজকে এ ঘোষণার মাধ্যমে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন যে, মুহাম্মাদ-এর পথনির্দেশনা ব্যতীত আল্লাহকে পাবার আর দ্বিতীয় কোনও পথ নেই। এজন্য পবিত্র কুরআনের নির্দেশিত পথ ছাড়া বিকল্প নেই।

একদা সুফীগণ সুলতানের উপস্থিতিতে তাঁর পাশে জমা হয়ে তাঁকে অনুরোধ করলেন যে, তিনি যেন তাদের অবস্থার উপর আর হস্তক্ষেপ না করে বরং তাদেরকে যথা অবস্থায় ছেড়ে দেন। তখন ইবনে তাইমিয়াহ্ তাদেরকে উদ্দেশ্য করে ঘোষণা করলেন যে, কাউকেও একটি কাজ বা কথায় শারী'আত হতে বের হয়ে যাবার অনুমতি দেয়া যাবে না। তবে যদি তাদের মধ্যে কেউ দোযখে প্রবেশ করতে চায়, তাহলে সে যেন গোসলখানায় তার শরীর ধৌত করে নেয়, অতঃপর সিরকা দ্বারা শরীর মর্দন করে আগুনে প্রবেশ করে। আর সে যদি আগুনে প্রবেশও করে তবুও তার প্রতি সহানুভূতির সাথে তাকানো হবে না, কারণ এটা এক ধরনের দাজ্জালী ও ফাঁকী এবং ভেল্কিবাজি!

শেষে তাঁর কথা যখন তাদেরকে একেবারে অনন্যোপায় করে ফেলল, তখন তারা সুলতানকে এ কথা বলে প্রস্থান করল: "তাতারাদের নিকট যাওয়া ছাড়া আমাদের অবস্থাসমূহের মিল হবে না, আর শারী'আতের সামনে তো মিল হবেই না (আল-উকুদ্দুদ্দুররিইয়্যাহ : ১৯৬ পৃষ্ঠা)।"

ফন্ট সাইজ
15px
17px