📄 যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর অবদান
কোন যুদ্ধে তিনি যদি মুসলিম সৈন্যদের কোন ছাউনীতে উপস্থিত হতেন, তাহলে তিনি তাদের জন্য রক্ষাকবজ ও অবিচলতার কেন্দ্রবিন্দু তথা মেরুদণ্ডরূপ হয়ে থাকতেন। যদি তাদের কারও মধ্যে ভয়, দুর্বলতা বা কাপুরুষতার লক্ষণ দেখতে পেতেন, তাহলে তাকে সাহস দিতেন, স্থির রাখতে চেষ্টা করতেন, যুদ্ধে বিজয়ের সুসংবাদ ও গানীমাত তথা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ওয়া'দা দিতেন এবং তাকে জিহাদ ও মুজাহিদগণের মর্যাদার কথা বর্ণনা করে বুঝাতেন (আল-বাজার: ৬৭)।
দুর্ধর্ষ তাতার বাহিনীর আক্রমণের বিরুদ্ধে ইবনে তাইমিয়াহ্ ভূমিকা ও মুসলিমদেরকে তাতারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রেরণা দান সম্পর্কে ইতিহাস আমাদেরকে স্পষ্ট বর্ণনা দান করছে। ৭০২ হিজরীতে কাশহাবের যুদ্ধে সৈন্যদের সারি এগিয়ে চলেছে, এমন সময় তিনি সৈন্যদেরকে রোযা ভাঙ্গার প্রয়োজনীয়তার উপর ফাতাওয়া দিলেন, যাতে তারা শত্রুদের মুকাবিলায় বেশি শক্তিশালী হয়। এ সুবাদে তিনিও নিজে তাদের সামনে রোযা ভঙ্গ করলেন। দেশের শান্তি রক্ষায় তিনি বিশ্বস্ত প্রহরীর ন্যায় দেয়ালসমূহের উপরই বিনিদ্রভাবে সমস্ত রাত্রি অতিবাহিত করতেন।
📄 তাতার রাজ কাজানের সাথে সাক্ষাৎ
যখন তাঁর সাহসিকতা ও বীরত্বের কথা জানাজানি হয়ে গেল, তখন মানুষেরা নিজেদের প্রয়োজনে তাঁর নিকট গমন করত এবং আপদে-বিপদে তাঁর শরণাপন্ন হত। ৬৯৯ হিজরীতে তাতারগণ যখন সিরিয়া আক্রমণ করেছিল এবং রাজধানী দামেস্কের অতি নিকটে এসে পড়েছিল, তখন লোকজন ইবনে তাইমিয়াহ্ পাশে এসে একত্রিত হয়ে তাঁকে এ আবেদন জানাল যে, তিনি যেন একজন দলনেতা হয়ে রাষ্ট্রদূতের মত তাতার রাজ্যের দরবারে যেয়ে তাদের দামেস্কে প্রবেশ হতে বিরত থাকার ব্যাপারে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আলোচনা করেন।
আর সত্যিই তিনি যখন তাতার রাজ 'কাজানের' প্রাসাদে প্রবেশ করলেন, তখন তার সাথে এমন কথাই বলেছিলেন যা তাঁর নির্ভীকতা ও বীরত্বের প্রমাণে সভাস্থ সকলকেই হতভম্ব করে ফেলেছিল। এমনকি রাজা স্বয়ং তাঁর ব্যবহারে আশ্চর্য হন এবং জিজ্ঞেস করেন: কে এ ভদ্র লোক? এমন ভয়ঙ্কর লোক আমি আর জীবনে দেখিনি। তাঁর চাইতে স্থিরচিত্ত লোকও আর কাউকেও দেখিনি এবং আমার অন্তরে তাঁর কথার চাইতে বেশি স্থায়ী হতে পারে এমন কথাও আর শুনিনি। আর আমার স্বত্ত্বাকে তাকে ছাড়া আর অন্য কাউকেও এত বেশি স্বীকার করতে দেখিনি (তারীক-ই-ইবনে আল-ওয়ারদী, দেখুনঃ ২-২৮৭: আল-বাজ্জার: ৭২-৭৩)।
তিনি ঐ প্রসঙ্গে তাতার রাজকে যা বলেছিলেন: তন্মধ্যে "আমার জানামতে তুমি দাবী করছ যে তুমি মুসলিম, তোমার সাথে কাজী, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং শাইখগণ রয়েছেন। তোমার বাপ ও দাদা উভয়েই কাফের ছিল। তবুও তুমি যা করছ তারা সেটা করেননি। তারা উভয়েই আমাদের সাথে সন্ধি চুক্তি করেছেন এবং সে অনুযায়ী কাজও করেছেন, অথচ তুমি চুক্তি করেছ আর গাদ্দারী করে সেটা ভঙ্গ করেছ। আমাদের অনেক লোক হত্যা করেছ; কিন্তু রক্তের বল্লা দাওনি"। তাঁর এ কথাগুলোতে সীমাহীন বারাকাত নিহিত ছিল, যাতে তিনি নিজেদের দেশে তাতারদের প্রবেশ না করার ব্যাপারে কাজান হতে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন।
এ বৎসরই মারজি সাফ্রির ঘটনার দিকে তাতারদের আক্রমণ ও যুলুমের কারণে সকল মানুষের অন্তরে হতাশা বিস্তার করেছিল। ওদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আবার দেশ জুড়ে অশ্লীলতাও বেড়ে গিয়েছিল। এ সময় তাতারগণ দামেস্কের দূর্গ দখল করতে চেয়েছিল। এ উদ্দেশে 'কাব্জাক্' তাতার বাহিনীর হাতে উক্ত দূর্গ অর্পণ করার জন্য দূর্গের নায়েবের বরাবরে একটি চিঠি লিখেছিল, যাতে দেশের অবস্থা শান্ত হয় এবং সার্বিক অবস্থা স্থিত হয়; কিন্তু ঐ খবর ইবনে তাইমিয়াহ্র কাছে পৌঁছতে না পৌঁছতেই তিনি নায়েবের প্রতি এক আদেশনামা লিখলেন-
"যদি পার তাহলে সেটার (দূর্গের) এক খণ্ড পাথর অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত সেটা কারও হাতে ছেড়ে দিও না।"
অতএব আরজাওয়াশ্ ইবনে তাইমিয়াহ্র আদেশে কেল্লা হতে অবতরণ করলে এবং দূত পাঠিয়ে কান্জাককে বলে দিলেন, "আমি এটা (দূর্গ) কস্মিনকালেও তোমাদের হাতে সমর্পণ করব না, যতক্ষণ পর্যন্ত তাতে একটি চোখও পলক দিবে। আর তাতেই ঐ কেল্লা মুসলিমদের জন্য নিরাপদ ও শত্রুদের জন্য দুর্ভেদ্য দূর্গ হয়ে রয়েছে।”
📄 মিসরীয় সুলতানের প্রতি নাসীহাত
৭০০ হিজরীতে একবার প্রচার হয়ে গেল যে, তাতারগণ দামেস্ক আক্রমণের জন্য অতি নিকটে এসে পড়েছে। এতে লোকজন তাতার বাহিনীর হাত হতে বাঁচার জন্য শত্রুকে দেশ লুণ্ঠন করার সুযোগ দিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে লাগল। এ সময় ইবনে তাইমিয়াহ্ মিসরীয় সুলতান ও শাসকদের নিকট দেশের জন্য সাহায্য সহযোগিতা চাইতে গেলেন এবং মিসরের সুলতানকে এ কথা বলে শাসালেন যে, "যদি তোমরা দেশ রক্ষা হতে বিরত থাক, তাহলে যে তাকে রক্ষা করবে এবং শান্তির সময় কাজে লাগাবে আমরা তাকেই প্রতিষ্ঠিত করব। আর এটা যদি নিরূপিত হয়ে থাকে যে, তোমরা এ দেশের বাদশাহ্ও নও আর শাসকও নও, এটার পরও মুসলিমগণ তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে তোমার কাছে সাহায্য চায়, তবুও তোমাদের উপর সাহায্য করা অবশ্য কর্তব্য। আর যখন তোমরা দেশের শাসক, তারা তোমাদের প্রজা-সাধারণ, তোমরা তাদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তখন তোমাদের এ ব্যাপারে কেমন ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত তা তোমরাই বুঝে দেখ (আল-বিদায়াহ ওয়া আন-নিহায়াহ : ১৪-১৫)।
📄 মুসীবাতের অগ্নি পরীক্ষা
মোটকথা, যখনই ইবনে তাইমিয়াহ্র সামনে বিপদাপদ ও মুসীবাত উপস্থিত হত, তখনই তিনি অধিক সাহসী হতেন ও সেটার মুকাবিলা করতেন। ৭০৭ হিজরীতে ইবনে তাইমিয়াহ্ সুফীগণের এক শ্রেণীকে অপমান করেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কিছু কথা বলার প্রেক্ষিতে তাঁকে আটক করার জন্য সুলতানী ফরমান জারী হয়। এ মর্মে কাজী ও ফকীহগণের নিকট তাঁকে বন্দী করার বৈধতার পক্ষে ফাতাওয়া দিতে অনুরোধও করা হয়। কিন্তু ফকীহগণ শাইখের কাছে শারী'আতের দৃষ্টিতে এতটুকু ত্রুটিও পেলেন না, যাকে কেন্দ্র করে অন্ততঃ তাঁকে বন্দী করার পক্ষে ফাতাওয়া দাঁড় করাতে পারেন। এতে তাদের বিষয়টিতে অস্থিরতা পরিলক্ষিত হল। ইবনে তাইমিয়াহ্ যখন তাদের চোখে মুখে গ্লানি ও বিষাদের স্পষ্ট ছাপ অবলোকন করলেন, তখন তিনি স্বয়ং বন্দীশালার দিকে এ কথা বলতে বলতে অগ্রসর হলেন- "আমি নিজে স্বেচ্ছায় জেলের দিকে যাচ্ছি এবং যাতে মুসলিমগণের মঙ্গল রয়েছে তারই সন্ধান আমি ওখানে করব (আল-বিদায়াহ ওয়া আন-নিহায়াহ: ১৪-১৩৫ ও তারপরও)।"