📘 সৎকাজ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ > 📄 তাঁর প্রতিপালন ও কর্মময় জীবন

📄 তাঁর প্রতিপালন ও কর্মময় জীবন


তিনি আল-ইমাম তাকীউদ্দীন আবুল 'আব্বাস আহমাদ বিন 'আবদিল হালীম আল-ইমাম মাজদুদ্দীন আবিল বারাকাত আবদুস সালাম বিন আবি মুহাম্মাদ বিন 'আবদিল্লাহ্ বিন আবিল কাসীম মুহাম্মাদ বিন আল-খাদির বিন আল-খাদির বিন 'আলী বিন 'আবদিল্লাহ্ বিন তাইমিয়াহ্ আল-হাররানী। তিনি ৬৬১ হিজরীর ১০ই রবিউল আউয়াল, রোজ সোমবার, মুতাবিক ইংরেজী ১২৬৩ সন ২২শে জানুয়ারী হাররানে জন্মগ্রহণ করেন। ৬৬৭ হিজরী মুতাবিক ১২৬৮ খৃঃ যখন দুর্ধর্ষ তাতার বাহিনী ইসলামী দেশসমূহের উপর আক্রমণ করে, তখন তাঁর পিতা তাঁকে নিয়ে দামেস্কে তাঁর পরিবারের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করেন। তিনি কেবলমাত্র তখন উঠতি বয়সের বালক মাত্র। তিনি তখন শৈশবে মাত্র। তখনও তিনি তাঁর জীবনের সাতটি বৎসরও অতিক্রম করেননি। সেই ছোট বেলা থেকেই জ্ঞান ও জ্ঞানীগণকে ভালবেসেই তিনি বড় হয়েছেন। জ্ঞানীদের সাথে উঠা-বসা ও জ্ঞান-চর্চা ভিন্ন অন্য কোন বিষয়ের প্রতি কখনও তিনি অগ্রসর হননি। তাঁর পিতা ছিলেন হাদীসশাস্ত্র ও তৎসংশ্লিষ্ট জ্ঞানের ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ও অসাধারণ পণ্ডিত ব্যক্তি এবং এটাই ইবনে তাইমিয়াহকে হাদীসশাস্ত্র ও তদসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত থাকতে আগ্রহী করে তুলেছিল।

দামেস্কে গমনের সাথে সাথেই তাঁর সুনাম চতুর্দিকে প্রচারিত হয়ে পড়ে এবং তাঁর প্রশংসাপূর্ণ কর্মকাণ্ড ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করে। তখনই দামেস্কের মাসজিদে তাঁর পাঠ দানের একটি হালকা বা বৈঠক বসত। 'দারুস্ সুক্রিয়া' যেখানে তিনি স্থায়ীভাবে বাস করতেন, হাদীসশাস্ত্রের পণ্ডিতগণের জ্ঞানানুশীলনের স্থানগুলোর মধ্যে সেটিই ছিল শীর্ষস্থানীয়, যা ইবনে তাইমিয়াহকে তাঁর শৈশবে স্নেহের কোলে তুলে নিয়েছিল, তিনি এটার দায়িত্ব নিয়েছিলেন (ইবনে কাসীর, আল-বিদায়াহ্ ওয়া আন্-নিহায়াহ, ১৩-৩০৮ পৃষ্ঠা)।

শিশুকালেই তিনি আল-কুরআনুল মাজীদ মুখস্থ করেন। এটার পর তিনি হাদীস, ফিক্‌হ, উসূল ও 'ইল্মী কালাম তথা তর্কবিদ্যা শিক্ষার দিকে মনোনিবেশ করলেন। বহু ফকীহ্ এবং হাদীস বিশারদগণের নিকট হতে পাঠ শ্রবণ করেছেন এবং তাঁদের সামনে পড়ে তা শুনিয়েছেন। তাঁদের জ্ঞান ভাণ্ডার হতে সংগ্রহ করেছেন। তাঁদের সকলের সাথেই যুক্তিপূর্ণ তর্ক প্রতিযোগিতা করেছেন অথচ তখনও তিনি অল্প বয়সের ছেলে মানুষ মাত্র।

তিনি যখনই মক্তবে যেতে চাইতেন তখনই একজন ইয়াহুদী তাঁর যাত্রায় বাধ সাধতো। ঐ ইয়াহুদীর বাড়ী ইবনে তাইমিয়াহ্ পথের ধারেই ছিল। সে ইবনে তাইমিয়ার শৈশব হতে যে মেধাবী ও ভদ্র অভ্যাস সম্বন্ধে জানতে পেরেছিল সে সকল বিষয়ে তাঁকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করত। আর ইবনে তাইমিয়াহ্ ঝটপট সেটার সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম জবাব দিতেন। এতে ঐ ইয়াহুদী খুবই আশ্চর্য হতো। অতঃপর শাইখ যে আদর্শের উপর আছেন তাতে সন্দেহ জন্মাবার হীন উদ্দেশে ইয়াহুদী একই ঘটনা পুনঃ পুনঃ ঘটায়। কিন্তু সেটা তাঁর 'আকীদাহ্ দীনের উপর অবিচলতা ভিন্ন আর কিছুই বর্ধিত করতে পারেনি। এরূপ ঘটনার পর উক্ত ইয়াহুদী আর কাল বিলম্ব না করে অকপটে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেছিল (আল-আ'লাম আল-আলিয়‍্যাহ ফী মানকির-ই ইবনে তাইমিয়াহ্, বায্যার ১৮-১৯ পৃষ্ঠা)।

তাঁর মেধাশক্তি, স্মৃতিশক্তি এবং দ্রুত উপলব্ধি ক্ষমতায় সমগ্র দামেস্কবাসী অবাক হয়ে গিয়েছিল। তাঁর সম্পর্কে ইমাম আল-যাহাবী (রহ.) বলেছেন: “তিনি ছেলে বেলাতেই মাহফিল ও বিদ্যালয়সমূহে উপস্থিত হতেন এবং বড়দের সাথে যুক্তিপূর্ণ ধর্মীয় বাকতর্ক করে উক্ত বিতর্কে বড়দেরকে পরাজিতও করতেন এবং এমন সব যুক্তিপূর্ণ জ্ঞানগর্ভ বিষয়েরই অবতারণা করতেন, যাতে জ্ঞানের গভীরতার ক্ষেত্রে শহরবাসীগণ হতভম্ব হয়ে যেত। তিনি মাত্র ১৯ (উনিশ) বৎসর বয়সেই ফাতাওয়া দেন এবং তখন হতেই সংগ্রহ ও সংকলন করতে আরম্ভ করেন (আল-উকুদুদ্দুররিইয়্যাহ ৪ পৃষ্ঠা)। তাঁর সমর্থক ও বিরোধী সকলেই তাঁর প্রশংসা করেছেন। তাঁর লেখা গ্রন্থের সুনাম দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কাফেলাবাসীগণের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে, হয়তো বা তা তিনশত খণ্ড পর্যন্ত পৌঁছেছে।” (ইমাম যাহাবী, তাক্বিরাতুল হুফফাজ, ৪-১৪৭৬: মুদ্রিত, হায়দারাবাদ ১৯৫৮ খৃষ্টাব্দ)

ইমাম যাহাবী তদীয় 'মু'আজামে' বলেছেন: “ইবনে তাইমিয়াহ্, জুমু'আর দিনে বড় জামে মাসজিদে তাঁর পিতার স্থানে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের ব্যাখ্যার জন্য বসতেন এবং তাঁর মুখস্থ জ্ঞান হতে দু' কপি বা তার বেশী পরিমাণ উপস্থাপন করতেন। এভাবে জুমু'আর দিনগুলোতে 'সূরা নূহ' এর ব্যাখ্যা কয়েক বৎসর ধরে করেছিলেন।" ইবনে তাইমিয়াহ্, আল-কুরআনের সূক্ষ্মাতি-সূক্ষ্ম অর্থসমূহের মধ্যে একেবারে পানির মত সাধারণ ও সহজভাবে সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তলিয়ে দেখেছেন এবং যেখানে যেখানে প্রশ্নের অবতারণা হতে পারে তা লক্ষ্য করে সেদিকে মনোনিবেশ করেছেন, আর যা অস্পষ্ট তা তিনি নৈপুণ্যের সাথে দূর করেছেন। আল-কুরআনের অর্থসমূহ হতে এমন সব বিষয়বস্তু তিনি চয়ন করেছেন, যার দিকে ইতোপূর্বে আর অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে হাদীসের সনদ (বর্ণনাকারীর সূত্র পরম্পরা) সহ মুখস্থ করার ও সেটার ফিকহ্ ও উসূলের বিষয় বহু দূর পর্যন্ত তিনি পৌঁছেছিলেন। ফিক্‌হ্ শাস্ত্রবিদগণের মতভেদ ও মাযহাবসমূহের সূক্ষ্মজ্ঞান, সাহাবী ও তাবিঈগণের ফাতাওয়ার জ্ঞান ও প্রমাণ দ্রুত উপস্থাপনের বেলায় তাঁর জুড়ি মিলতো না। তিনি তাতে এমন অপ্রতিদ্বন্দী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, যা পাঠক মাত্রকেই অবাক করে দেয়।

যখন তিনি ফাতাওয়া দিতেন তখন তিনি কোন বিশেষ মাযহাবের অনুসরণ করতেন না বরং যে মাযহাবের সমর্থনে (কুরআন-হাদীসের) প্রমাণাদি যুক্তিযুক্ত হতো সে মত বা মাযহাব অনুযায়ীই ফাতাওয়া দিতেন। সুতরাং তিনি সাল্‌ফ-ই-সালিহীনদের পথকেই সাহায্য করেছেন, সূফী, দার্শনিক সকলকেই প্রতিহত করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সালাফী তরীকার পক্ষে বিজয় এনেছেন এবং বহুবিধ মালায় তাদের ভুলও ধরিয়ে দিয়েছেন। তদুপরি সুন্নাহকে সুদৃঢ় দলীলাদি ও প্রমাণ দ্বারা সাহায্য করেছেন।

কামালুদ্দীন বিন ঝামালকানী বলেন: “অবস্থা এমন ছিল যে, যখন ইবনে তাইমিয়াহকে শিক্ষকের পক্ষ হতে কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হতো, তখন তিনি এমনভাবে সেটার উত্তর দিতেন যে, উপস্থিত শ্রোতা ও দর্শনার্থী মনে করত এ ব্যক্তি এ বিষয় ছাড়া হয়তঃ অন্য আর কিছুই জানেন না আর এরূপ সিদ্ধান্ত করত যে এ বিষয়ে এ ব্যক্তির মত আর কেউই জানেন না। যখন ফিকহ্ শাস্ত্রবিদ্গণ তাঁর সাথে বসতেন তখন তাঁরা তাঁদের মাযহাবী বিষয়ে তাঁর নিকট হতে জ্ঞান আহরণ করে লাভবান হতেন ও ফায়দা অর্জন করতেন। এ মহান ব্যক্তির সম্পর্কে এমন কোন তথ্য জানা যায় না যে, কারও সাথে যুক্তি তর্ক করে উত্তীর্ণ হতে না পেরে পরে তা বন্ধ করে দিয়ে কেটে পড়েছেন বরং যখনই কোনও জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা করেছেন তখনই তিনি তাতে শ্রেষ্ঠ হয়েছেন। তিনি দুনিয়ার মোহ-মায়া হতে দূরে থেকে জ্ঞানের অন্বেষণ, তার প্রচার ও জ্ঞানানুযায়ী কাজ করা ভিন্ন কোন কিছুতেই স্বাদ পেতেন না।

Hাদীসশাস্ত্র ও এতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ সম্পর্কিত জ্ঞানে তাঁর সমসাময়িক কেউই তাঁর সমকক্ষ ছিলেন না। এমনকি তাঁর সমকালীন 'আলিমগণ বলেছেন যে, প্রত্যেকটি হাদীস যা ইবনে তাইমিয়াহ্ মুখস্থ করেননি, সেটা বিশুদ্ধই নয়। হাদীস বর্ণনাকারী ব্যক্তিগণও তাঁদের কে যোগ্য, আর কে-ই বা অযোগ্য এবং কার কি দোষ-ত্রুটি, আর কে কি কি গুণাবলীর অধিকারী ইত্যাদির জ্ঞানসহ তাঁদের শ্রেণী সম্পর্কে পূর্ণ অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। হাদীসের বিবিধ বিষয়, সেটার কোন্টি উঁচু পর্যায়ের, আর কোন্টি নীচু পর্যায়ের, আবার কোন্টি শুদ্ধ এবং কোনটি অশুদ্ধ (সুস্থ বা রোগা), এতসম্পর্কেও তাঁর সুতীক্ষ্ণ জ্ঞান ছিল। তিনি হাদীসের বর্ণনাকারী পরম্পরাসহ মূল বক্তব্যসমূহ মুখস্থ করেছিলেন।

তাঁর সম্পর্কে আল-বায্যার বলেছেন: “ইসলামী বড় বড় সংকলনগুলো যেমন মুসনাদ-ই-আল-ইমাম আহমাদ, সহীহ্ বুখারী, মুসলিম, জামি আল-তিরমিযী, সুনান-ই-আবি-দাউদ আল-সিজিস্তানী, আন্-নাসায়ী, ইবনে মাজাহ ও আল দারিকুতনী, নিশ্চয়ই তিনি তাঁদের সকলের নিকট হতেই একাধিকবার শ্রবণ করেছেন।” জ্ঞান-বিজ্ঞানের খুব অল্প পুস্তকই হবে, যা তিনি (তাঁর সময়ে) না পড়েছেন। আর আসলে আল্লাহ তাঁকে দ্রুত মুখস্থ করা ও দেরীতে বিস্মৃত হওয়ার বিশেষভাবে বিশেষিত করেছিলেন। অবস্থা এরূপ ছিল যে, তিনি কোন বিষয়ের সম্মুখীন হলে বা জ্ঞান অর্জন করলে সেটা তাঁর স্মৃতিপটে হয় হু-বহু শাব্দিকভাবে, না হয় অর্থগতভাবে স্থায়ী হয়ে থাকত আর এভাবেই তিনি তাঁর সমসাময়িক পণ্ডিতগণের হাদীসের চাহিদায় সিহাহ সিত্তাহ (হাদীসের ছয় কিতাব) ও আল-মুসনাদে প্রত্যাবর্তনস্থল তথা সকলের জন্য জ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র স্বরূপ হয়ে উঠেছিলেন।

ইমামুদ্দীন আল-ওয়া-সিত্বি বলেছেন: “ইবনে তাইমিয়াহ্ তাঁর যুগের লোকদের মধ্যে জ্ঞানে ছিলেন সবচাইতে সহীহ এবং ওয়াদা পালনে সবচাইতে সত্যবাদী। সত্যের পক্ষে বিজয়ের ক্ষেত্রে সবার উপরে ও দানশীলতায় অত্যধিক দাতা ব্যক্তি। তাঁদের মধ্যে আল্লাহর নাবী-এর পরিপূর্ণ অনুসরণকারী ছিলেন একমাত্র তিনি। আমাদের যুগে এ ব্যক্তি ছাড়া আর কাউকেও এমন দেখতে পাইনি, যার কথা-বার্তা ও কাজে কর্মে মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াতী উজ্জ্বলভাবে প্রতিভাত হয়, যাতে যে কোন নিষ্কলুষ অন্তরাত্মাই সাক্ষ্য দিবে যে, নিশ্চয়ই এটাই হল সত্যিকার অর্থে ঐকান্তিক অনুসরণ।

ইমাম তাইমিয়াহ্র যুগে দামেস্ক ছিল আল-নাবায়ী, ইবনে দাকীক আল-ঈদ, আল-মুজাবী ও ইবনে জামা'আর প্রমুখ খ্যাতনামা আলিমগণের চারণভূমি। তাঁরা সকলেই হাদীস ও সেটার সনদসমূহের গবেষণামূলক অধ্যয়নে যথাযথভাবে একনিষ্ঠ চিত্তে অংশ গ্রহণ করেছিলেন, যাতে সেটার কোন্টির সনদ দুর্বল আবার কোন্ হাদীসটি হাসান ইত্যাদি ও তদ্‌সংশ্লিষ্ট জ্ঞানগর্ভ বর্ণনা দিতে পারেন। তখন হাদীস শাস্ত্র শিক্ষালয়ের পাশেই ফিক্হ ও তর্কশাস্ত্র শিক্ষার জন্যও বিদ্যালয়সমূহ পাওয়া যেত, যা ইবনে তাইমিয়াহকে চুম্বকের ন্যায় আকর্ষণ করেছিল। তিনি সমালোচনা ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে বহু শ্রম দেন এবং তাঁর অনেক মূল্যবান সময় সেখানে অতিবাহিত করেন।

ইবনে তাইমিয়াহ্হ্র যুগে সর্বশ্রেষ্ঠ যে সকল আন্দোলন প্রকাশ পায় তন্মধ্যে হাম্বালী ও আশা-ইরাদের মধ্যকার পরস্পর তর্ক ও মুনাজারা তথা মাযহাবী দ্বন্দুই প্রধান। হাম্বালীগণ আকাঈদের অধ্যয়নে ও গবেষণায় ঐ পথই অবলম্বন করেছিলেন, যে পথ অবলম্বনে তাঁরা ফিক্হ্ ও সেটার শাখা মাসআলাগুলোর অধ্যয়ন করেছিলেন। সুতরাং তাঁরা ফিক্হ্ বিষয়ক মাসআলার ক্ষেত্রে যেভাবে শারী'আতের হুকুম আহকাম তথা নির্দেশাবলী আহরণ করছিলেন, ঠিক সেভাবেই আকাঈদের বিষয়গুলোকেও সরাসরি কুরআন হাদীস হতেই চয়ন করছিলেন। কেননা উক্ত দু'টি বিষয়ই এমন, মানুষ যার খুব বেশি প্রয়োজনবোধ করে থাকে। আর আল-দীন (ইসলাম) তো মানুষ যার সবচাইতে বেশি বেশি প্রয়োজন অনুভব করে। আকাঈদ-ই-ফিকহ্ এসব বিষয়ের স্পষ্ট ধারণা নিয়ে এসেছে। অথচ 'আশা-ইরাগণ এবং অন্যান্যরা দার্শনিকগণ মুতাযিলাহ্ সম্প্রদায়ের ঘৃণ্যপথ অবলম্বন করেছিল। সুতরাং তাঁরা আকাঈদের মতো মৌলিক বিষয়ের উপরও নিজেদের বিবেক বুদ্ধিপ্রসূত প্রমাণাদি ও দর্শনভিত্তিক দলীল ব্যবহার করত। আর এ সময় আশা-ইরা ও হাম্বলীদের মধ্যকার আকাঈদের মত মৌলিক বিষয়ক মতবিরোধ চক্রে ইবনে তাইমিয়াহ্ সম্মুখ প্রতিদ্বন্দ্বীতা ও বলিষ্ঠ ভূমিকা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আজ পর্যন্ত সেটাই তাঁর ব্রত ও স্বর্ণোজ্জ্বল কীর্তি হিসেবে সর্বজনবিদিত হয়ে রয়েছে। এ মহান মানুষটি ইসলামী আকাঈদের গবেষণায় সেটার প্রথম উৎসস্থলের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে চেয়েছিলেন, যা দার্শনিক বিতর্ক ও অনুকরণ প্রসূত টীকাটিপ্পনী হতে মুক্ত হবে। এটা ঐ সময়ের কথা, যখন সারা দেশ ইবনে তাইমিয়াহ্হ্ বিরোধী পক্ষ ফিকহবিদ ও তর্কশাস্ত্র পণ্ডিতগণের স্বার্থে বিজয় লাভ করেছিল এবং এখান থেকেই তাইমিয়াহ্ জীবনটা ছিল ফকীহ্, মুতাকাল্লিমীন (দার্শনিকগণ), সুফী এবং সরকারী লোক তথা আমলাদের সাথে লাগাগার একটানা বৈঠক আর বৈঠক। আর তিনি একটি কাজ হতে অবসর হতে না হতেই আর একটি কাজে জড়িত হয়ে পড়তেন। ইবনে কাসীর তাঁর প্রসিদ্ধ ইতিহাস গ্রন্থে ইবনে তাইমিয়াহর জীবনের বহু ঘটনা উল্লেখ করেছেন (আল-বিদায়াহ্ ওয়া আন্-নিহায়াহ, ১৪শ খণ্ড, হাওয়াদিস, ৭০৪ সন-৮২৮ সন)।

📘 সৎকাজ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ > 📄 যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর অবদান

📄 যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর অবদান


কোন যুদ্ধে তিনি যদি মুসলিম সৈন্যদের কোন ছাউনীতে উপস্থিত হতেন, তাহলে তিনি তাদের জন্য রক্ষাকবজ ও অবিচলতার কেন্দ্রবিন্দু তথা মেরুদণ্ডরূপ হয়ে থাকতেন। যদি তাদের কারও মধ্যে ভয়, দুর্বলতা বা কাপুরুষতার লক্ষণ দেখতে পেতেন, তাহলে তাকে সাহস দিতেন, স্থির রাখতে চেষ্টা করতেন, যুদ্ধে বিজয়ের সুসংবাদ ও গানীমাত তথা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ওয়া'দা দিতেন এবং তাকে জিহাদ ও মুজাহিদগণের মর্যাদার কথা বর্ণনা করে বুঝাতেন (আল-বাজার: ৬৭)।

দুর্ধর্ষ তাতার বাহিনীর আক্রমণের বিরুদ্ধে ইবনে তাইমিয়াহ্ ভূমিকা ও মুসলিমদেরকে তাতারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রেরণা দান সম্পর্কে ইতিহাস আমাদেরকে স্পষ্ট বর্ণনা দান করছে। ৭০২ হিজরীতে কাশহাবের যুদ্ধে সৈন্যদের সারি এগিয়ে চলেছে, এমন সময় তিনি সৈন্যদেরকে রোযা ভাঙ্গার প্রয়োজনীয়তার উপর ফাতাওয়া দিলেন, যাতে তারা শত্রুদের মুকাবিলায় বেশি শক্তিশালী হয়। এ সুবাদে তিনিও নিজে তাদের সামনে রোযা ভঙ্গ করলেন। দেশের শান্তি রক্ষায় তিনি বিশ্বস্ত প্রহরীর ন্যায় দেয়ালসমূহের উপরই বিনিদ্রভাবে সমস্ত রাত্রি অতিবাহিত করতেন।

📘 সৎকাজ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ > 📄 তাতার রাজ কাজানের সাথে সাক্ষাৎ

📄 তাতার রাজ কাজানের সাথে সাক্ষাৎ


যখন তাঁর সাহসিকতা ও বীরত্বের কথা জানাজানি হয়ে গেল, তখন মানুষেরা নিজেদের প্রয়োজনে তাঁর নিকট গমন করত এবং আপদে-বিপদে তাঁর শরণাপন্ন হত। ৬৯৯ হিজরীতে তাতারগণ যখন সিরিয়া আক্রমণ করেছিল এবং রাজধানী দামেস্কের অতি নিকটে এসে পড়েছিল, তখন লোকজন ইবনে তাইমিয়াহ্ পাশে এসে একত্রিত হয়ে তাঁকে এ আবেদন জানাল যে, তিনি যেন একজন দলনেতা হয়ে রাষ্ট্রদূতের মত তাতার রাজ্যের দরবারে যেয়ে তাদের দামেস্কে প্রবেশ হতে বিরত থাকার ব্যাপারে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আলোচনা করেন।

আর সত্যিই তিনি যখন তাতার রাজ 'কাজানের' প্রাসাদে প্রবেশ করলেন, তখন তার সাথে এমন কথাই বলেছিলেন যা তাঁর নির্ভীকতা ও বীরত্বের প্রমাণে সভাস্থ সকলকেই হতভম্ব করে ফেলেছিল। এমনকি রাজা স্বয়ং তাঁর ব্যবহারে আশ্চর্য হন এবং জিজ্ঞেস করেন: কে এ ভদ্র লোক? এমন ভয়ঙ্কর লোক আমি আর জীবনে দেখিনি। তাঁর চাইতে স্থিরচিত্ত লোকও আর কাউকেও দেখিনি এবং আমার অন্তরে তাঁর কথার চাইতে বেশি স্থায়ী হতে পারে এমন কথাও আর শুনিনি। আর আমার স্বত্ত্বাকে তাকে ছাড়া আর অন্য কাউকেও এত বেশি স্বীকার করতে দেখিনি (তারীক-ই-ইবনে আল-ওয়ারদী, দেখুনঃ ২-২৮৭: আল-বাজ্জার: ৭২-৭৩)।

তিনি ঐ প্রসঙ্গে তাতার রাজকে যা বলেছিলেন: তন্মধ্যে "আমার জানামতে তুমি দাবী করছ যে তুমি মুসলিম, তোমার সাথে কাজী, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং শাইখগণ রয়েছেন। তোমার বাপ ও দাদা উভয়েই কাফের ছিল। তবুও তুমি যা করছ তারা সেটা করেননি। তারা উভয়েই আমাদের সাথে সন্ধি চুক্তি করেছেন এবং সে অনুযায়ী কাজও করেছেন, অথচ তুমি চুক্তি করেছ আর গাদ্দারী করে সেটা ভঙ্গ করেছ। আমাদের অনেক লোক হত্যা করেছ; কিন্তু রক্তের বল্লা দাওনি"। তাঁর এ কথাগুলোতে সীমাহীন বারাকাত নিহিত ছিল, যাতে তিনি নিজেদের দেশে তাতারদের প্রবেশ না করার ব্যাপারে কাজান হতে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন।

এ বৎসরই মারজি সাফ্রির ঘটনার দিকে তাতারদের আক্রমণ ও যুলুমের কারণে সকল মানুষের অন্তরে হতাশা বিস্তার করেছিল। ওদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আবার দেশ জুড়ে অশ্লীলতাও বেড়ে গিয়েছিল। এ সময় তাতারগণ দামেস্কের দূর্গ দখল করতে চেয়েছিল। এ উদ্দেশে 'কাব্‌জাক্' তাতার বাহিনীর হাতে উক্ত দূর্গ অর্পণ করার জন্য দূর্গের নায়েবের বরাবরে একটি চিঠি লিখেছিল, যাতে দেশের অবস্থা শান্ত হয় এবং সার্বিক অবস্থা স্থিত হয়; কিন্তু ঐ খবর ইবনে তাইমিয়াহ্র কাছে পৌঁছতে না পৌঁছতেই তিনি নায়েবের প্রতি এক আদেশনামা লিখলেন-

"যদি পার তাহলে সেটার (দূর্গের) এক খণ্ড পাথর অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত সেটা কারও হাতে ছেড়ে দিও না।"

অতএব আরজাওয়াশ্ ইবনে তাইমিয়াহ্র আদেশে কেল্লা হতে অবতরণ করলে এবং দূত পাঠিয়ে কান্জাককে বলে দিলেন, "আমি এটা (দূর্গ) কস্মিনকালেও তোমাদের হাতে সমর্পণ করব না, যতক্ষণ পর্যন্ত তাতে একটি চোখও পলক দিবে। আর তাতেই ঐ কেল্লা মুসলিমদের জন্য নিরাপদ ও শত্রুদের জন্য দুর্ভেদ্য দূর্গ হয়ে রয়েছে।”

📘 সৎকাজ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ > 📄 মিসরীয় সুলতানের প্রতি নাসীহাত

📄 মিসরীয় সুলতানের প্রতি নাসীহাত


৭০০ হিজরীতে একবার প্রচার হয়ে গেল যে, তাতারগণ দামেস্ক আক্রমণের জন্য অতি নিকটে এসে পড়েছে। এতে লোকজন তাতার বাহিনীর হাত হতে বাঁচার জন্য শত্রুকে দেশ লুণ্ঠন করার সুযোগ দিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে লাগল। এ সময় ইবনে তাইমিয়াহ্ মিসরীয় সুলতান ও শাসকদের নিকট দেশের জন্য সাহায্য সহযোগিতা চাইতে গেলেন এবং মিসরের সুলতানকে এ কথা বলে শাসালেন যে, "যদি তোমরা দেশ রক্ষা হতে বিরত থাক, তাহলে যে তাকে রক্ষা করবে এবং শান্তির সময় কাজে লাগাবে আমরা তাকেই প্রতিষ্ঠিত করব। আর এটা যদি নিরূপিত হয়ে থাকে যে, তোমরা এ দেশের বাদশাহ্ও নও আর শাসকও নও, এটার পরও মুসলিমগণ তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে তোমার কাছে সাহায্য চায়, তবুও তোমাদের উপর সাহায্য করা অবশ্য কর্তব্য। আর যখন তোমরা দেশের শাসক, তারা তোমাদের প্রজা-সাধারণ, তোমরা তাদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তখন তোমাদের এ ব্যাপারে কেমন ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত তা তোমরাই বুঝে দেখ (আল-বিদায়াহ ওয়া আন-নিহায়াহ : ১৪-১৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00