📄 ভূমিকা
নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা শুধু তাঁর প্রশংসা করছি এবং তাঁর সাহায্য চাচ্ছি। আর আমাদের অসৎকাজসমূহ ও নিজেদের প্রবৃত্তির কলুষতা হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে পথপ্রদর্শন করেন, তাকে বিপথগামী করার কেউ নেই। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে পথপ্রদর্শন করারও কেউ নেই। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই এবং আমরা আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা এবং তাঁর প্রেরিত পুরুষ (রাসূল)। হে আল্লাহ! তাঁর উপর শান্তি, অনুগ্রহ ও বারাকাত অবতীর্ণ করুন এবং তাঁদের উপর যাঁরা তাঁর আহ্বান মুতাবিক আহ্বান করেন এবং তাঁরই সুন্নাতের উপর কাজ করেন- আমীন।
নিশ্চয়ই আল্লাহ যে সকল বিষয় দ্বারা ইসলামী উম্মাহকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন, সেটার একটি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে পুনরুত্থানের দিন পূর্ববর্তী সকল উম্মাহ্র জন্য সাক্ষী বানিয়েছেন। কেননা মুসলিম উম্মাহ্ দা'ওয়াতের এমন একটি গুরু-দায়িত্ব বহন করেছেন, যা সকল সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করাকে শামিল করে থাকে। এ কাজ আমার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং নবুওয়াতীর উত্তরাধিকারের অন্তর্ভূক্ত। কেননা নিশ্চয়ই সকল নাবীগণের দা'ওয়াত হল সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা। আর এটা হতে প্রতীয়মান হয় যে, এ মুসলিম উম্মাহ্র 'আলিমগণ বানী ইসরাঈলের নাবীগণের মত। কেননা তাঁরা অন্য সকল উম্মাহ্র প্রতি তাঁদের উপর বর্তিত আদেশ ও নিষেধ, উপদেশ এবং পথ প্রদর্শনের গুরু-দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল শাসক বা শাসিত এ উভয় বিষয় তাঁদের স্কন্ধে অর্পিত স্বীয় সমাজের প্রতি পালনীয় দায়িত্বের বাস্তব অনুভূতি প্রসূত। শাসিতের কথা বলার পূর্বে শাসকের তার সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও আমানতদারীর অনুভূতি ও বক্তব্যের গুরুত্বের উপর জোর দিচ্ছি। যখন জ্ঞানী ব্যক্তি সততা ও অনাবিল অন্তরে উপদেশ দিবেন, আর শাসক সেটা সততা, নম্রতা ও আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করবেন তখন কেবল প্রজা সাধারণের সকল বিষয় সুষ্ঠু ও সুন্দর হবে। কারণ শাসক ও পণ্ডিতবর্গ কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের অধিকারী। তাই যখন জ্ঞানী ব্যক্তি তার উপদেশ দানে সৎ হবেন এবং শাসক সেটার বাস্তবায়নে আন্তরিকতাপূর্ণ হবেন ও তার দায়িত্ব পালনে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের বাস্তবায়নে কঠোর পরিশ্রমী হবেন, তখন জাতির জন্য ভাগ্য উন্নয়ন সম্ভব হবে এবং সেটার অবস্থাও সুন্দর হবে। জাতির প্রতিটি সদস্য তার অধিকার, সম্মান, ইয্যত-আবরুর নিরাপত্তা নিশ্চিন্ত হবে। সেটা ব্যতীত জাতির কর্মকাণ্ড তথা সার্বিক বিষয়েরও কোন সুরাহা হবে না। সেটা হবে তখন, যখন 'আলিম ও শাসকগণ শান্তি ও যুদ্ধের কর্ণধার হবেন এবং স্থির সিদ্ধান্তের অধিকারী, ক্ষমতাশীল ও জাতির মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করবেন। এ মর্মে কুরআন ও হাদীসের বহু উক্তি রয়েছে, যা মুসলিমগণকে দুষ্কৃতিকারী 'আলিম ও অত্যাচারী শাসকের আপদ হতে সতর্ক করছে। কুরআন ও হাদীসের বহু উক্তি আছে, যা বিস্তারিতভাবে জ্ঞানীজনের করণীয় কাজ ও শাসকের দায়িত্ব এবং সমাজ সংশোধন কিংবা সেটার বিনাশের ক্ষেত্রে উভয়ের বক্তব্যের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করছে। এখানে আমি জ্ঞানীজনের প্রয়োজনীয়তা এবং জাতির অবস্থার সংশোধনে তার ভূমিকার সুদীর্ঘ বর্ণনা দান করতে চাই না। অনুরূপভাবে শাসকেরও না। কেননা এ ক্ষেত্রে বিষয়টি এত সুস্পষ্ট যে, বেশী ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না।
আসলে যা আমাকে এ কথাগুলোর দিকে আহ্বান করেছে, সেটা ইসলামী উম্মাহর বর্তমান অবস্থা, যেমন- অনুন্নতি, অধঃপতন ও দুর্বলতা আর এক শ্রেণীর 'আলিমের স্ব-স্ব দায়িত্ব নিয়ে জাগরণের অভাব এবং দায়িত্বপূর্ণ কাজের ঝুঁকি, যা তারা নিয়েছিল- সেটা হতে দূরে সরে থাকা। এটা ছাড়াও এক শ্রেণীর শাসকদের একচ্ছত্রতা, তাদের যুলুম, সীমালঙ্ঘন, জাতির ভবিষ্যৎ ও সেটার ইতিহাস নিয়ে তাদের স্বেচ্ছাচারিতা এবং সেটার শত্রুদের পক্ষে বেহায়াপনা কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্য। এসব ঘটমান সত্য যার মধ্যে সমকালীন মুসলিমগণ দৈনন্দিন জীবন অতিবাহিত করছে এবং সেটার কঠোর তিক্ত স্বাদও প্রত্যহ সকাল-সন্ধ্যায় হাড়ে হাড়ে অনুভব করছে। আর ইসলামের অবস্থা সেটার অধিকাংশ দেশগুলোতে এমন দাঁড়িয়েছে, যেমন- কোন এক কবি বলেছেন-
"যেভাবে তাকাবে ইসলামের দিকে যে কোন দেশে, সেভাবে পাবে তাকে সেথায় কর্তিত ডানা পাখীর বেশে।"
সমাজ ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি এবং জাতি ও সেটার (শুভ-অশুভ) পরিণতি সম্পর্কে কোন ব্যক্তির অনুভূতি না থাকা বা একেবারেই সেটা অনুপস্থিত থাকা, যে কারণে বিষয়টি আরও বেশী ভয়াবহ হয়েছে সেটা এই যে, কিছু লোকের মুখে এ বক্তব্যটি সামাজিক কপটতা ও রাজনৈতিকভাবে বিক্রয়ের বাজারে ব্যবসায়ের পণ্য স্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, সেটা যে কোন ব্যবহারিক পণ্যের ন্যায় বেচা-কেনা হচ্ছে আর হাতে পাওয়া মাত্র সেটা মূল্যহীন হয়ে পড়ছে। আর ঠিক এটার কুফল আজকালকার যুব সমাজের অন্তরে বিদ্যমান, সেটা তাদের অনেকের মধ্য দিয়ে প্রতিভাত হচ্ছে এবং এটা হতে প্রত্যেকটি বিষয়ে যা বলা হতে পারে ও যারা বলেন, তাদের মধ্যে কখনও কখনও বিশ্বস্ততার অভাব সৃষ্টি হচ্ছে যা, উক্ত বিষয়টিকে গুরুত্বহীনতা বা পায়ে ঠেলা অবস্থার দিকে- যে অবস্থায় আজ যুব-সমাজের কিছু অংশ রয়েছে বা ক্রমাগত তাদের নিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃত প্রস্তাবে এটা একটি জাতি বা গোষ্ঠী যা ব্যাধি দ্বারা সংক্রামিত হয়ে থাকে- তার চাইতেও বেশী ভয়ঙ্কর আর সেটা হল- জাতির ভবিষ্যৎ গঠনের কাজে অংশগ্রহণ করা হতে সেটার সন্তানদের দূরে থাকা এবং জাতির অবশ্য করণীয় কাজের দায়িত্বানুভূতিহীন হয়ে পড়া।
প্রত্যেকটি জাতির প্রয়োজনে যারা আদেশ করবে ও যা হতে নিষেধ করবে, যেমনভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির এবং সে যার আদেশ করবে এবং যা হতে নিষেধ করবে- চায় সেটা তার অন্তরে সম্পাদিত হোক আর না-ই হোক সে সেটার আদেশ করবে, এবং নিষেধও করবে অথবা তার নিজের মধ্যে এবং অপরের মধ্যে সে সেটার আদেশ ও নিষেধ করবে। এরূপ ছাড়া মানুষ বা সমাজের অবস্থা কল্পনা করা যায় না। আর যখন কোন জাতির নিকট- যার সে আদেশ দিবে ও যা হতে নিষেধ করবে, এটা না থাকে, তখন সেটা সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রেরিত মহাপুরুষগণকে এবং বিশ্বাসীগণকে যার আদেশ দিয়েছেন সেটাকেও তাঁরই আদেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেনঃ "হে বিশ্বাসীগণ! আমরা তোমাদেরকে যে রিযক দান করেছি সেটা হতে পবিত্র, ভালগুলো আহার কর এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।" আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রেরিত পুরুষগণকে বলেছেন: "হে প্রেরিত পুরুষগণ! উত্তম বস্তু হতে আহার কর এবং সৎকাজ কর।" আর এ সম্প্রদায়ের উপর রাসূলগণ যার আদেশ করেছেন এবং যা হতে নিষেধ করেছেন তার আদেশ করা ও নিষেধ করা অবশ্য করণীয় করেছেন। অতঃপর মহামহিম পবিত্র আল্লাহ বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে এমন একটি সম্প্রদায় হওয়া উচিত, যারা ভালোর দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করবে।"
এ আদেশ ও নিষেধের গুরুদায়িত্ব পালনের মাধ্যমে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে এ জাতির স্থান ও স্থানীয়মান নির্ণয় করেছেন। মহান ও মহীয়ান আল্লাহ বলেছেন: "তোমরা হচ্ছো উত্তম জাতি, যাদেরকে মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করবে।" অনুরূপভাবে এ দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয়তার উপর নাবী-এর পবিত্র বাণী সেটার প্রমাণ বহন করছে। নাবী বলেছেন: "তোমাদের কেউ যদি কোন অসৎকাজ হতে দেখে তবে সে যেন সেটা তার হাত (শক্তি) দ্বারা প্রতিহত করে, যদি সে তা না পারে, তবে সে যেন সেটাকে অন্তরে অন্তরে ঘৃণা করে, আর ওটা হচ্ছে সবচাইতে দুর্বল ঈমানের কাজ।" সহীহ হাদীসে এসেছে, "তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করবে, অন্যথায় তোমাদের পাপের কারণে আল্লাহ তোমাদের উপর (শাস্তি স্বরূপ) অত্যাচারী শাসক চাপিয়ে দিবেন, তখন তোমরা দু'আ করবে অথচ সেটা গৃহীত হবে না।" যেমন- আল-কুরআনুল মাজীদ বর্ণনা দিচ্ছে যে, বানী ইসরাঈল সম্প্রদায়ের পতন এবং আল্লাহর অনুগ্রহ হতে দূরে সরিয়ে দেয়ার কারণসমূহের মধ্যে এটাও একটা অন্যতম প্রধান কারণ ছিল যে, তারা যে অসৎকাজ করত কিন্তু সেটা হতে নিজেরা বিরত থাকত না। বরং দুষ্কর্ম তাদের কাছে সামাজিক প্রথা এবং হীন ও নীচু পর্যায়ের কর্মকাণ্ড তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।
আল-কুরআনুল কারীমে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের কাহিনী এজন্য এসেছে, যাতে তাদের ঘটনা হতে ইসলামী উম্মাহ্ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং বিশ্বাসের জ্ঞান অর্জন করতে পারে যে, যদি উপকরণাদি পাওয়া যায় তবে আল্লাহর সৃষ্টি জগতে তাঁর বিধানের পরিবর্তন হয় না। সামাজিক ব্যাধি হতে সমাজকে সুস্থ রাখার কামনায় এ গুরুদায়িত্ব পালন করাটা মুসলিমগণের উপর ওয়াজিব-ই-কিফায়াহ্, যা পূর্ববর্তী উম্মতসমূহকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। অতএব ইসলামী উম্মাহর ঐ দায়িত্ব পালনে কোনরূপ অবহেলা বা গড়িমসি করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আর যদি এ দায়িত্ব পালনে কেউ এগিয়ে না আসে, তাহলে এজন্য সম্মিলিতভাবে সকলে অপরাধী হবে এবং এ উম্মাহর উপর সেটাই বর্তাবে, যা পূর্ববর্তী জাতিসমূহের উপর বর্তিয়েছিল।
যখন প্রত্যেক জাতিরই কোনও না কোন বিষয়ে আদেশ করতে ও নিষেধ করতে হয়; তখন আল্লাহ তা'আলা যে বিষয়ে আদেশ ও নিষেধ করার জন্য পবিত্র গ্রন্থে উম্মাহর উদ্দেশে আদেশসমূহ ও নিষেধাবলী স্বয়ং নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং নাবী-এর পবিত্র সুন্নাহ্ তথা হাদীস ও সেটার পদ্ধতিসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। আর এখান থেকেই প্রতীয়মান হল যে, আল্লাহ যা আদেশ করেছেন এবং যা' হতে নিষেধ করেছেন, সেটা ব্যতীত অন্য কিছুর আদেশ করা বা নিষেধ করা কারও জন্য বৈধ হবে না। সুতরাং এ বিষয়টা যে ব্যক্তি আদেশ করবেন বা নিষেধ করবেন, তার নিকট এ দাবীই করে যে, তিনি যেন সূক্ষ্মজ্ঞানী হন এবং আল্লাহর আদেশাবলী ও নিষেধাবলী সম্পর্কে পূর্ণমাত্রায় জ্ঞানে অবহিত হন, যাতে তিনি বুদ্ধি অথবা রুচি, স্বাদ বা প্রবৃত্তিকেই তার আদেশাবলী ও নিষেধসমূহের উৎসস্থল ধরে না নেন এবং মানুষকে অজ্ঞানতাবশতঃ সৎপথ হতে বিভ্রান্ত না করেন। যে বিষয়ে মনের ধারণা প্রবল হবে যে, এটা শারী'আতের আদেশাবলীরই অন্তর্ভুক্ত, সে বিষয়ে আদেশ দেয়াও যথেষ্ট হবে না; কেননা মনের ধারণা আদেশের বেলায় দৃঢ় বিশ্বাসের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে না, যদিও সেটা বেশী নিরাপদ ও বেশী পরিব্যপ্ত গণ্য করে নিষেধের বেলায় তা হতে পারে। এটাতে অবশ্যই প্রতীয়মান হবে যে, কোন বিষয়ে আদেশ দেয়া যদিও সেটা সর্বজন পরিচিত বিষয়, সে আদেশ যেন ঐ বিষয়টিকে সেটার খারাপের দিকে ঠেলে নিয়ে না যায় অথবা এমন কোন অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির সৃষ্টি না করে, যা জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ঐক্যে ফাঁটল ধরতে পারে এবং এমন কোন বিষয় হতে নিষেধ না করা, যা ঐ অন্যায় বিষয়টির চাইতেও বড় কোন ক্ষতিকর কিছুর দিকে নিয়ে যায়। কেননা কোনও উপকার সাধনের চেয়ে কোনও অপকার রোধ করাই শ্রেয় ও অগ্রগণ্য।
আদেশ দানকারীর কাছে আদেশ দানের স্থান, কাল, পাত্র ও পরিবেশসমূহের যেথায় আদেশ দান করা প্রয়োজন হবে, সে সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান অবশ্যই থাকতে হবে এবং কখন কিভাবে আদেশ দিবে তাও তার জানতে হবে। কেননা পরিবেশ ও স্থান এবং অবস্থা ভেদে দৃষ্টিভঙ্গি ও উপকরণের অবস্থা অনুযায়ী পার্থক্য হয়ে থাকে। অতএব যা এমন যুগে গ্রহণ ও ব্যবহার প্রয়োজন সেটাই অন্য সময়ে অপ্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়। আবার এটাও জানতে হবে যে, দু'টি ক্ষতিকর বিষয়কে প্রতিহত করতে যেয়ে বৃহত্তর কল্যাণ সাধনের ইচ্ছায় অপেক্ষাকৃত ছোট ক্ষতিকর বিষয়টি বরণ করে নেয়া বৈধ, যদি না এটা ব্যতীত উক্ত বিষয়ে আদেশ করা সম্ভব হয়। এটা আদেশদাতার কাছে এ দাবী করে যে, তিনি যেন আল্লাহর আদেশসমূহের ও নিষেধাবলীর কারণসমূহ এবং সেটার উপকরণগুলো ভালভাবে জ্ঞাত হন। যাতে তিনি নিছক আদেশ ও নিষেধের জন্য পরিমিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের আদেশ না দেন এবং নিষেধও না করেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহর পথে আহ্বানকারীগণ ও মুসলিমগণের সমস্যাদি নিয়ে যারা মাথা ঘামান তাদের এদিকে অবশ্যই দৃষ্টিপাত করা উচিত, যাতে তারা তাদের পদসমূহের সঠিক বা ভুল অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত ও সচেতন হতে পারেন।
এটা ছাড়াও আরও অন্যবিধ বিষয় আছে, যা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে মানুষকে নিষেধকারীদের জন্য ঐসব বিষয়ে স্পষ্ট অবগতি থাকা বাঞ্ছনীয়। ইসলামী সূক্ষ্মজ্ঞানের অধিকারী হওয়া এবং যে বিষয়ে আদেশ দিবে ও নিষেধ করবে সেটা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান থাকার সাথে সাথে তাকে মানুষের কষ্ট সহ্য করার ব্যাপারে অত্যন্ত ধৈর্যশীল হতে হবে। তাদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণকারী হতে হবে, সহনশীল ও সত্যের জন্য সৎসাহসী হতে হবে, তার সেটা ছাড়া কোন ক্রমেই চলবে না। কেননা আল্লাহর পথে আহ্বানকারীকে মানুষের দেয়া অনেক কষ্টের সম্মুখীন হওয়া ছাড়া উপায় নেই। আর এটা এমনই বিষয় যে, এটা ছাড়া তার গত্যন্তরও নেই। তাই তার উক্ত অত্যাচার ও লাঞ্ছনা-গঞ্জনা নিজের অন্তরে সহ্য করার অভ্যাস করা উচিত। কেননা এমন কোন প্রেরিত নাবী অথবা কোন সংস্কারক ছিলেন না যিনি কোনও মতবাদ বা দা'ওয়াতের পতাকা উত্তোলন করে জান-মাল ও পারিবারিক দিক হতে অনেক দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হননি। যখন তার ধৈর্যের পোষাক না হবে, যা দ্বারা সে সজ্জিত হবে তখন যে জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেছে সে উদ্দেশ্যই সাধন করতে পারবে না, বরং এমন ক্ষতির দিকেই নিয়ে যাবে যার অপকার মুসলিমগণের জন্য তার উপকারের চেয়েও অনেক বেশী। অনুরূপভাবে সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎকাজ হতে নিষেধের সময় তাকে মানুষের সাথে বন্ধুসুলভ, নম্র, দয়ার্দ্র ও সহনশীল হতে হবে। কেননা নম্রতাও মানুষকে আহ্বানের জন্য অপরিহার্য বিষয়ের অন্তর্গত, যাতে আমরা আদেশ ও নিষেধের আসল উদ্দেশ্য লাভ করতে পারি। আল্লাহ হচ্ছেন রাফিক বা বন্ধু, তাই তাঁর সকল কাজে বন্ধুসুলভ নম্রতা পাওয়া যাবে, ঐ গুণটি তখনই সেটাকে পরিপূর্ণ সৌন্দর্য দান করবে। আর যখনই কোন বিষয় হতে নম্রতাকে ছিনিয়ে নেয়া হবে, তখনই সেটাকে অসুন্দর করে ফেলবে।
এটা আল্লাহ তা'আলার কথারই বাস্তবায়নে যথা- "সুন্দর উপদেশ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর এবং যে দলীল-প্রমাণগুলো সবচেয়ে উত্তম সেটা দ্বারা তাদের সাথে যুক্তিপূর্ণ বাকতর্ক কর।" যে ব্যক্তি মানুষকে আদেশ করা ও নিষেধ করার সম্মুখীন হবেন, তার জন্য এ বিষয়গুলো যথা- ফিকহ্ তথা সূক্ষ্মজ্ঞান, ধৈর্য, সহনশীলতা, নম্রতা ও বন্ধুসুলভ আচরণের প্রয়োজনীয়তার উপর শাইখুল ইসলাম (রহ.) বেশী গুরুত্বারোপ করেছেন। অনুরূপভাবে সত্যের ব্যাপারে সাহসিকতা ও তার জন্য অত্যাবশ্যক, যেন আদেশ ও নিষেধ তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাধন করতে পারে। এখানে কিন্তু প্রয়োজনীয় সাহসিকতা, ক্ষমতা ও বীরত্ব বলতে শারীরিক শক্তি অথবা পেশীর শক্তি নয়, বরং সেটা হচ্ছে অন্তরের সাহস ও সামরিক ঘাঁটি। ঐ শক্তির উৎস হচ্ছে একমাত্র আল্লাহর উপর বিশ্বাসের দৃঢ়তা এবং সেটাতে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। আমরা দেখেছি এমন বহু লোক রয়েছে, যাদেরকে শারীরিক গঠনের দিক হতে খুবই শক্তিশালী বলে মনে হয়, অথচ অন্তরের দিক হতে তারা খুবই দুর্বল। তাদেরকে পলায়ন করার ব্যাপারে প্রথম সারির লোক হিসেবে দেখতে পাবে, অথচ আক্রমণ করা, সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া ও সাহসী বীরদের কর্মক্ষেত্রে তাদেরকে দেখতে পাবে সকলের শেষের সারিতে। এখানে আল্লাহর পথে আহ্বানকারীর জন্য তার অন্তরের সাহসিকতাই মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়। কেননা সেটা সে শক্তি যা, তাকে সীমালঙ্ঘনকারী ও অত্যাচারীর প্রতি এ কথা নির্ভীকভাবে নির্দ্বিধায় বলতে অনুপ্রেরণা দান করবে যে, থামো! সেটা যুলুম-অত্যাচার বা সীমালঙ্ঘন করো না। আর সেটা এমন এক শক্তি যা তাকে শক্তিশালী ও পর-স্বার্থ হরণকারীকে এ কথা বলতে প্রস্তুত করবে যে, দুর্বলের প্রাপ্য যথাযথভাবে দিয়ে দাও এবং আল্লাহর বান্দাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। তাদের হক নিয়ে আর ছিনিমিনি খেলো না এবং সেটাতো সে শক্তি যা তার বক্তব্যকে তার নির্ভেজাল নিয়্যাত ও সততা হতে প্রকাশ করবে এবং সেটা কোনরূপ বানোয়াট, রঙিন বা মুনাফিকী তথা কপটতাও হবে না। এটা কোন ব্যবসা ভিত্তিকও হবে না। এমনকি ঐ বক্তব্য তার অন্তরাত্মা হতে বের হয়ে আসবে, যাতে সেটা মুসলিম জাতির অন্তরে স্থায়ীভাবে অবস্থান নিতে পারে; অতঃপর তাকে যেন দুনিয়া ও আখিরাতের যেরূপ কল্যাণ ইচ্ছা সেরূপ কল্যাণের দিকেই সুপরিচালিত করতে পারে।
আল্লাহর পথে আহ্বানকারী মুসলিম ব্যক্তির জন্য আজ যে পুস্তকখানা উপহার দিব, সেটা পূর্বপুরুষদের পর্যায়ক্রমিক উত্তরাধিকার, যা দশ বৎসর পূর্বেই প্রকাশ করতে শুরু করেছি, যেন তাতে ঐ সকল মৌলিক বিষয়ের স্পষ্ট নিদর্শনাবলী- আমাদের বর্তমান যুগে আমরা যার খুব বেশী অভাবী- সুন্দররূপে তা ফুটিয়ে তুলতে পারি। বিশেষ করে সৎপথ চ্যুত চিন্তাধারা, অশ্লীল সমাজ ব্যবস্থা, বেপরোয়া রাজনৈতিক স্রোত গড্ডালিকা প্রবাহের ন্যায় বইতে শুরু করার পর হতে যা যুবসমাজের নির্মল বিবেক বুদ্ধি নিয়ে অহেতুক তামাশা করছে এবং তাদের সামনে সত্যকে মিথ্যা ও মিথ্যাকে সত্যরূপে সাজিয়ে তুলে ধরছে। এ সময় "সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ" শীর্ষক পুস্তকখানা এমন কাজসমূহের একটি ধরা হবে, যাকে বর্তমান যুগের একজন মুসলিম তার ব্যধিস্থলে এবং তার রোগ লুকিয়ে থাকার স্থানে এবং জাতির পীড়ার কারণ স্থানে স্থাপন করবে এবং সেটা তার এ রোগের উপযোগী প্রতিষেধক হিসেবে বর্ণনা করবে, যা তার জন্য ঐ ব্যাধির মূলোৎপাটক হবে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ্ (রহ.)-এর আগে ও পরে বহু মুহাদ্দিস, ফকীহ্ ও তর্কবিদগণ এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছেন। এই কিতাবটি সংক্ষিপ্ত কথা ও উল্লেখিত বিষয়ের প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহনকারী। কখনও কখনও আহ্বানকারীর দোষত্রুটিকে ঔজ্জ্বল্যমান করে তুলে ধরতে সক্ষম, আবার কখনও বা কি কি গুণে গুণান্বিত হতে হবে তার দিশা দানকারী এবং পরিবেশ ও বাধা বিপত্তির ব্যাখ্যা দান করতঃ আহ্বানকারীর পদ্ধতি ও ভূমিকায় কি কি পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন তারও ব্যাখ্যা দান করে থাকে। এই পুস্তকখানা পর্যায়ক্রমিক সালাফী উত্তরাধিকারের 'আল-মাতাত' প্রথম ভাগের তৃতীয় পুস্তক। সেটার পূর্বে প্রকাশিত হয়েছে: ১। দাকায়িকু-আল-তাফসীর আল-জামিউ লি তাফসীর-ই শাইখ আল-ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ্, চার খণ্ডে সমাপ্ত। ২। কিতাবুত্ তাওহীদ ওয়া ইখলাসুল ওয়াজহি ওয়াল 'আমালি লিল্লাহ। ৩। আল-ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ্ তা'ওয়ীল এর বিষয়ে তার ভূমিকা। ৪। সালাফী মতবাদে বিশ্বাসের ভিত্তিসমূহ।
ইতোপূর্বে এ পুস্তকখানা তার আগে 'মাজমু'আত শাজ্বারাতিল বালাজ্বীন' এর সাথে যা আল-শাইখ আল-মরহুম মুহাম্মাদ হা-মি আল-ফাকী সংগ্রহ করেছেন। অনুরূপভাবে সর্বশেষে 'আল-মাকতাবাতুল কাইয়্যিমার' মালিক কায়রোতে সেটা ছাপিয়ে ছিলেন। যারা এ মুদ্রণের বেলায় পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন এবং প্রশংসারযোগ্য শ্রম দিয়েছেন, তাদের উক্ত ত্যাগ আমরা স্বীকার করছি এবং দু'আ করছি যেন তাদের নির্ভেজাল-খালিস আমলসমূহ আল্লাহর কাছে গৃহীত হয়। এ কথাটিকে সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক ভঙ্গিমায় বাস্তবায়নের প্রয়োজন স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে, বিশেষ করে পূর্ববর্তী সংস্করণগুলোতে কোন কোন স্থানে কিছু ভুলভ্রান্তি বের হয়েছে, যা তাইমিয়াহর বক্তব্যের অর্থে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। ইতোপূর্বে আমরা সেটার স্থানানুযায়ী ঐদিকে ইঙ্গিত করেছি। বর্তমান সংস্করণে ঐসব দোষত্রুটির গোটাটাই সংশোধন করে দেয়া হয়েছে। এখানে জেদ্দাস্থ 'দারুল মুজামা' লাইব্রেরীর মালিক ভাই 'আবদুর রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন না করে আর পারছি না, যিনি আমাদেরকে এ বর্ণনার মূল্যায়নের ও বাস্তবায়নের জন্য সেটাকে পুনঃ মুদ্রণের প্রস্তাব রেখেছিলেন এবং পাঠক সমাজে এ বইখানার বহুল প্রচার-প্রচলনের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বের দিকে তাকিয়ে এটার প্রতি তার বিশেষ যত্ন ও প্রশংসনীয় ভূমিকা দেখিয়েছিলেন। অতএব আল্লাহ যেন তাকে উত্তম প্রতিফল দান করেন, তাদের ও আমাদের নেক আমলসমূহ কবুল করেন এবং সেটাকে শুধু তাঁরই পুতঃ পবিত্র সত্তার জন্য নির্দিষ্ট করে নেন, সেটা দ্বারা ইসলাম ও মুসলিমদের সার্বিক কল্যাণ সাধন করেন। আল্লাহ যেন তাঁর বান্দা ও প্রেরিত পুরুষ মুহাম্মদ ﷺ ও তদীয় বংশধর এবং সাহাবাদের উপর বারাকাত, রাহমাত ও দয়ার বারি বর্ষণ করেন।
ড. মুহাম্মাদ আস-সাইয়্যিদ আল-জালিন্দ
টিকাঃ
* অর্থাৎ- ইসলামী চরিত্র।
** অর্থাৎ- "আল্লাহ তা'আলা কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যদি না ঐ জাতি নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন না করে।" (সূরা রা'দ)
*** ওয়াজিব-ই-কিফাইয়াহ- যা কোন এলাকার একজন বা একদলে আদায় করলে অন্য সকলের পক্ষ হতে আদায় হয়ে যায়। যেমন- জানাযার নামায।