📄 স্ত্রীর সাথে সচ্চরিত্রতা
চরিত্রবান স্বামী স্ত্রীর প্রতি কোন কর্তব্য পালনে ত্রুটি করে না। যেহেতু যা মহান আল্লাহর নির্দেশ তা তাকে পালন করতেই হবে। সেই সাথে কিছু এমন কাজ আছে, যা করলে স্বামী-স্ত্রীর সংসার সুখময় হয়ে ওঠে। আমরা শুরু করি ফরয কাজগুলি দিয়ে।
১. স্ত্রীর মোহর আদায় দেওয়া স্বামীর জন্য আবশ্যক। যেহেতু মহান আল্লাহর নির্দেশ,
وَآتُوا النِّسَاء صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً فَإِن طِبْنَ لَكُمْ عَن شَيْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَّرِيئًا
অর্থাৎ, তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্ট মনে দিয়ে দাও, পরে তারা খুশী মনে ওর (মোহরের) কিয়দংশ ছেড়ে দিলে, তোমরা তা স্বচ্ছন্দে ভোগ কর। ৬৮৯
আর মহানবী বলেছেন,
إِنَّ أَحَقَّ الشَّرْطِ أَنْ يُوفَى بِهِ مَا اسْتَحْلَلْتُمْ بِهِ الْفُرُوجَ
"যে সকল শর্ত তোমাদের জন্য পালন করা জরুরী, তন্মধ্যে সব চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল তাই---যার দ্বারা তোমরা তোমাদের (পরস্পরের) গোপনাঙ্গ হালাল ক'রে থাক।" ৬৯০
নগদ মোহর না দিয়ে তাতে ফাঁকি দিতে চেষ্টা করা অথবা মনে মনে পরিশোধ করার নিয়ত না রাখা অথবা তা মাফ ক'রে দিতে স্ত্রীকে চাপ দেওয়া চরিত্রবান স্বামীর জন্য বৈধ নয়। দেনমোহর স্ত্রীর কাছে পরিশোধ্য ঋণ। আর ঋণ নিয়ে পরিশোধ করার নিয়ত না থাকলে কী হয় পড়ুন, মহানবী বলেছেন,
أَيُّمَا رَجُلٍ يَدَيَّنُ دَيْنًا وَهُوَ مُجْمِعُ أَنْ لَا يُوَفِّيَهُ إِيَّاهُ لَقِيَ اللَّهُ سَارِقًا
"যে ব্যক্তি ঋণ করার পর তার মনে পাকা এই সংকল্প রাখে যে, সে তা পরিশোধ করবে না, সে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে 'চোর' হয়ে সাক্ষাৎ করবে।" ৬৯১
আর দেনমোহর আদায় না ক'রে তালাক দিলে বিশাল পাপী হয় স্বামী। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ أَعْظَمَ الذُّنُوبِ عِنْدَ اللهِ رَجُلٌ تَزَوَّجَ امْرَأَةً فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ مِنْهَا طَلَّقَهَا
"আল্লাহর নিকট সব চাইতে বড় পাপিষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যে কোন মহিলাকে বিবাহ করে, অতঃপর তার নিকট থেকে মজা লুটে নিয়ে তাকে তালাক দেয় এবং তার মোহরও আত্মসাৎ করে। (দ্বিতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে কোন লোককে মজুর খাটায়, অতঃপর তার মজুরী আত্মসাৎ করে এবং (তৃতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে খামোখা পশু হত্যা করে।"৬৯২
এমন পাপিষ্ঠ স্বামী নিশ্চয়ই চরিত্রবান নয়। তাহলে সেই স্বামীর জন্য কী বলবেন, যে মোহর দেওয়ার জায়গায় নিজে গ্রহণ ক'রে থাকে? পণ বা যৌতুক নিয়ে বিয়ে ক'রে থাকে এবং অনাদায়ে বধূনির্যাতন চালায়?
২. আর্থিক অবস্থানুযায়ী স্ত্রীর ভরণ-পোষণ করা আবশ্যক। স্বামী নিজে যা খাবে, তাকে খাওয়াবে এবং যা পরিধান করবে, ঠিক সেই সমমানের লেবাস তাঁকেও পরিধান করাবে।
মুআবিয়াহ ইবনে হাইদাহ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কারো স্ত্রীর অধিকার স্বামীর উপর কতটুকু?' তিনি বললেন,
أَنْ تُطْعِمَهَا إِذَا طَعِمْتَ ، وَتَكْسُوهَا إِذَا اكْتَسَيْتَ ، وَلَا تَضْرِبَ الوَجْهَ ، وَلا تُقَبِّحُ ، وَلَا تَهْجُرُ إِلَّا فِي البَيْتِ
"তুমি খেলে তাকে খাওয়াবে এবং তুমি পরলে তাকে পরাবে। (তার) চেহারায় মারবে না, তাকে 'কুৎসিত হ' বলে বদ্দুআ দেবে না এবং তার থেকে পৃথক থাকলে বাড়ীর ভিতরেই থাকবে। ৬৯৩
এই খরচে স্বামী সওয়াবপ্রাপ্তও হবে। মহানবী বলেছেন,
إِذَا أَنْفَقَ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِهِ نَفَقَةً يَحْتَسِبُهَا فَهِيَ لَهُ صَدَقَةٌ
"সওয়াবের আশায় কোন মুসলমান যখন তার পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করে, তখন তা সাদকাহ হিসাবে গণ্য হয়।”৬৯৪
পক্ষান্তরে যে হতভাগা স্বামী নিজ স্ত্রীকে ঠিকমতো খেতে-পরতে দেয় না, সে গোনাহগার। যার কাছে সে প্রয়োজনে প্রেম ভিক্ষা করে, তাকে খেতে-পরতে দেয় না, এ আবার পাপী না হয়? মহানবী বলেছেন,
كَفَى بِالمَرْءِ إِثْمَا أَنْ يُضَيِّعَ مَنْ يَقُوتُ
"একটি মানুষের পাপী হওয়ার জন্য এটা যথেষ্ট যে, সে তাদের (অধিকার) নষ্ট করবে (অর্থাৎ, তাদের ভরণ-পোষণে কার্পণ্য করবে) যাদের জীবিকার জন্য সে দায়িত্বশীল।"৬৯৫
كَفَى بِالمَرْءِ إِثْماً أَنْ يُحْبِسَ عَمَّنْ يَمْلِكُ قُوتَهُ
"মানুষের পাপী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যার খাদ্যের মালিক, তার খাদ্য সে আটকে রাখে।"৬৯৬
আর এমন স্বামী কি চরিত্রবান হতে পারে? কক্ষনো নয়।
৩. স্ত্রীর সাথে সদ্ভাবে বসবাস করা কর্তব্য চরিত্রবান স্বামীর। স্ত্রীকে ভালোবাসার পাত্রী জ্ঞান ক'রে স্নেহ করা ও ভালোবাসা তার কর্তব্য। আর কোন কারণে তাকে ভালো না বাসতে পারলেও তার প্রতি অন্যায় ও অত্যাচার করা উচিত নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهِ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
অর্থাৎ, স্ত্রীদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন কর; তোমরা যদি তাদেরকে ঘৃণা কর, তাহলে এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকে ঘৃণা করছ। ৬৯৭
আর মহানবী বলেছেন,
لا يَفْرَكُ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقاً رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
"কোন ঈমানদার পুরুষ যেন কোন ঈমানদার নারী (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। যদি সে তার একটি আচরণে অসন্তুষ্ট হয়, তবে অন্য আচরণে সন্তুষ্ট হবে।"৬৯৮
দাম্পত্য জীবনে স্ত্রী হল ঠুনকো কাঁচের তৈরি পাত্র। খুব সাবধানে ব্যবহার করতে হয় তাকে। নচেৎ বেশি ঠুকাঠুকি করলেই ভেঙ্গে যেতে পারে।
প্রিয় নবী বলেন,
(اسْتَوْصُوا بالنِّساءِ خَيْراً فَإِنَّ المَرأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلعٍ أَعْوَجَ وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ في الضلع أعلاهُ فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمَهُ كَسَرْتَهُ وإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلُ أَعْوَجَ فَاسْتَوْصُوا بالنِّساءِ خَيْراً
"তোমরা নারীদের জন্য হিতাকাঙ্ক্ষী হও। কারণ, নারী জাতি বঙ্কিম পঞ্জরাস্থি হতে সৃষ্ট। আর তার উপরের অংশ বেশী টেরা। (সুতরাং তাদের প্রকৃতিই বঙ্কিম ও টেরা।) অতএব তুমি সোজা করতে গেলে হয়তো তা ভেঙ্গেই ফেলবে। আর নিজের অবস্থায় উপেক্ষা করলে বাঁকা থেকেই যাবে। অতএব তাদের জন্য মঙ্গলকামী হও।"৬৯৯
হ্যাঁ, সংসারের ঝামেলা কখনো কখনো অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। তবে শরীয়ত-সম্মত কারণ ছাড়া তালাক দেওয়া চরিত্রবান স্বামীর উচিত নয়। ব্যবহারে সদ্ভাব প্রকাশ ক'রে স্ত্রীর সাথে প্রেমমাখা স্বরে কথা বলা চরিত্রবান স্বামীর কর্তব্য। ভালো ভাষা প্রয়োগ না করলে দাম্পত্যে ভালোবাসার বসন্তে বৈশাখ আসে।
৪. তার সাথে হাস্য-রসিকতা করা, সব সময় পৌরুষ মেজাজ না রেখে কোন কোন সময় তার সাথে বৈধ খেলা করা, শরীরচর্চা বা ব্যায়ামাদি করা ইত্যাদিও স্বামীর কর্তব্য। প্রিয় নবী স্ত্রী আয়েশার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা ক'রে একবার হেরেছিলেন ও পরে আর একবারে তিনি জিতেছিলেন। ৭০০
তদনুরূপ স্ত্রীকে কোন বৈধ খেলা দেখতে সুযোগ দেওয়াও দূষণীয় নয়। যেহেতু এ হল সদ্ভাবে বসবাস। তবে এসব কিছু হবে একান্ত নির্জনে, পর্দা-সীমার ভিতরে।
৫. স্ত্রী ভালো খাবার তৈরী করলে, সাজগোজ করলে বা কোন ভালো কাজ করলে তার প্রশংসা করবে স্বামী। এমনকি স্ত্রীর হৃদয়কে লুটে নেওয়ার জন্য ইসলাম মিথ্যা বলাকেও বৈধ করেছে। ৭০১
তবে যে মিথ্যা তার অধিকার হরণ করে ও তাকে ধোঁকা দেয়, সে মিথ্যা নয়। উল্লেখ্য যে, স্ত্রীর প্রতিপক্ষে কোন অন্য মহিলার প্রশংসা তার সামনে করা আসলে তাকে ছোট করা। এমনটি করা কোন আদর্শবান স্বামীর উচিত নয়। যেমন উচিত নয়, স্ত্রীর রূপ-সৌন্দর্য বা সদ্গুণ নিয়ে কোন অন্য পুরুষের কাছে প্রশংসা করা। কারণ তাতে তাকে তাদের মানসপটের ছবি নির্মাণ ক'রে দেওয়া হবে, যার পরিণাম অশুভ হতে পারে।
৬. স্বামী নিজ স্ত্রীর গৃহস্থালি কর্মেও সহযোগিতা করবে। এতে স্ত্রীর মন স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রেমে আরো পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রিয় নবী ; যিনি দুজাহানের সর্দার তিনিও সংসারের কাজ করতেন। স্ত্রীদের সহায়তা করতেন, অতঃপর স্বলাতের সময় হলেই মসজিদের দিকে রওনা হতেন। ৭০২
তিনি অন্যান্য মানুষের মত একজন মানুষ ছিলেন; স্বহস্তে কাপড় পরিষ্কার করতেন, দুধ দোয়াতেন এবং নিজের খিদমত নিজেই করতেন। ৭০৩
৭. স্বামী যেমন স্ত্রীকে সুন্দরী দেখতে পছন্দ করে, তেমনি স্ত্রীও স্বামীকে সুন্দর ও সুসজ্জিত দেখতে ভালোবাসে। এটাই হল মানুষের প্রকৃতি। সুতরাং স্বামীরও উচিত স্ত্রীকে খোশ করার জন্য সাজগোজ করা। যাতে তারও নজর অন্য পুরুষের (স্বামীর কোন পরিচ্ছন্ন আত্মীয়ের) পদ্ধতি আকৃষ্ট না হয়। ইবনে আব্বাস বলেন, 'আমি আমার স্ত্রীর জন্য সাজসজ্জা করি, যেমন সে আমার জন্য সাজসজ্জা করে। '৭০৪
৮. স্ত্রীকে বিভিন্ন উপলক্ষে (যেমন ঈদ, কুরবানী প্রভৃতিতে) ছোটখাট উপহার দেওয়াও সম্ভাবে বাস করার পর্যায়ভুক্ত। এতেও স্ত্রীর হৃদয় চিরবন্দী হয় স্বামীর হৃদয় কারাগারে।
৯. স্ত্রীকে কথায় ও খরচে কষ্ট না দেওয়া স্বামীর কর্তব্য। কোনও দোষে মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া, মারধর করা শোভনীয় নয় চরিত্রবান স্বামীর জন্য।
স্ত্রীর সাথে বাস তো প্রেমিকার সাথে বাস। সর্বতোভাবে তাকে খোশ রাখা মানুষের প্রকৃতিগত স্বভাব। প্রেমিকাকে কষ্ট দেওয়া কোন মুসলিম, কোন মানুষের, বরং কোন পশুরও কাজ নয়।
চরিত্রবান পুরুষ তার ভালো স্ত্রীর কাছে ভালো হয়। আর সেই হয় পূর্ণ ঈমানদার। প্রিয় নবী বলেন,
( خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
"তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি সেই, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম। আর আমি নিজ স্ত্রীর নিকট তোমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তি। "৭০৫
(أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِكُمْ
"সবার চেয়ে পূর্ণ ঈমানদার ব্যক্তি সে, যার চরিত্র সবার চেয়ে সুন্দর এবং তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি সেই, যে তোমাদের স্ত্রীদের নিকট উত্তম।”৭০৬
১০. তাকে সর্বতোভাবে হিফাযতে রাখার চেষ্টা করবে চরিত্রবান স্বামী। বিপদ-আপদ থেকে তাকে রক্ষা করবে। স্ত্রীকে রক্ষা করতে গিয়ে যদি স্বামী শত্রুর হাতে মারা যায়, তবে সে শহীদের মর্যাদা লাভ করবে। মহানবী বলেন,
(مَنْ قُتِلَ دُونَ مَالِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ ، وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دَمِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ ، وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دِينِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ ، وَمَنْ قُتِلَ دُونَ أَهْلِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ
"যে ব্যক্তি তার মাল-ধন রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সে শহীদ। যে ব্যক্তি নিজ রক্ত (প্রাণ) রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সে শহীদ। যে তার দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সে শহীদ এবং যে তার পরিবার রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সেও শহীদ।"৭০৭
অনুরূপ স্ত্রীকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করাও তার এক বড় দায়িত্ব। তাকে দ্বীন, আক্বীদা, পবিত্রতা, ইবাদত, হারাম, হালাল, অধিকার ও ব্যবহার প্রভৃতি শিক্ষা দিয়ে সৎকাজ করতে আদেশ ও অসৎকাজে বাধা দিয়ে আল্লাহর আযাব থেকে রেহাই দেবে স্বামী। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজ পরিবারকে জাহান্নام থেকে বাঁচাও; যার ইন্ধন মানুষ ও পাথর --।"৭০৮
১১. স্ত্রীকে সুশিক্ষা দেওয়া, ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করা ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া স্বামীর কর্তব্য। সে অনুমতি চাইলে তাকে মসজিদে যেতে বাধা না দেওয়া উচিত চরিত্রবান পুরুষের। যেহেতু সেখানেও সুশিক্ষা লাভ করার সুযোগ আছে। মহানবী বলেছেন,
لا تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللهِ مَسَاجِدَ اللهِ وَلَكِنْ لِيَخْرُجْنَ وَهُنَّ تَفِلاَتٌ
"আল্লাহর বান্দীদেরকে মসজিদে আসতে বারণ করো না, তবে তারা যেন খোশবু ব্যবহার না ক'রে সাদাসিধাভাবে আসে।”৭০৯
১২. স্ত্রীর ধর্ম, দেহ, যৌবন ও মর্যাদায় ঈর্ষাবান হওয়া এবং এ সবে কোন প্রকার কলঙ্ক লাগতে না দেওয়া স্বামীর উপর তার এক অধিকার। সুতরাং স্ত্রী এক উত্তম সংরক্ষণীয় ও হিফাজতের জিনিস। লোকের মুখে-মুখে, পরপুরুষদের চোখে-চোখে ও যুবকদের মনে- মনে বিচরণ করতে না দেওয়া; যাকে দেখা দেওয়া তার স্ত্রীর পক্ষে হারাম, তাকে সাধারণ অনুমতি দিয়ে বাড়ি আসতে-যেতে না দেওয়া সুপুরুষের কর্ম। মহানবী বলেছেন,
(ثلاثة لا يَنظُرُ الله إِلَيْهِمْ يَوْمَ القِيامَةِ العاقِ والمَرْأَةُ المُتَرَجُلَةِ المُتَشَبِّهَةُ بالرجال والديوث
"তিন ব্যক্তির দিকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকিয়ে দেখবেন না; পিতা- মাতার অবাধ্য সন্তান, পুরুষের বেশধারী মহিলা এবং মেড়া (স্ত্রী-কন্যার পর্দাহীনতা ও নোংরামীর ব্যাপারে ঈর্ষাহীন) পুরুষ।"৭১০
(ثلاثة لا يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ العاقُ لِوالِدَيْهِ وَالدَّيُوتُ وَرَجِلَةُ النِّسَاءِ
"তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, ভেড়া পুরুষ এবং পুরুষের বেশধারী মহিলা। "৭১১
১৩. গুণধর স্বামী নিজ স্ত্রীর কোন রহস্য বা গোপন কথা অপরের কাছে প্রকাশ করে না। যেমন স্ত্রীর রূপ-যৌবন ও তার সংসর্গে যৌনসুখের কথাও অন্য পুরুষের কাছে উল্লেখ ক'রে তৃপ্তি ও মজা নেয় না। যেহেতু তা ঈর্ষাহীন পুরুষদের অভ্যাস।
১৪. স্ত্রীর যৌন-আহবানে সত্বর সাড়া দেওয়া উচিত চরিত্রবান স্বামীর। নারীর মন ও যৌবন ধীর ও শান্ত প্রকৃতির। যৌন ব্যাপারে পুরুষের মতো তৎপর নয়। কিন্তু ভাগ্যক্রমে অনেক স্বামী এ বাজারে গরম হয়, স্ত্রী হয় ঠাণ্ডা। অনেক স্বামী ঠাণ্ডা হয়, স্ত্রী হয় গরম। তবুও স্ত্রী শান্ত থাকে। পুরুষ ধৈর্য রাখতে পারে না, স্ত্রী পারে। কিন্তু স্বামী ঠাণ্ডা প্রকৃতির হলে, পরিশ্রমী হলে অথবা বৈরাগ্য-সাধনে সওয়াব আছে মনে করলে স্ত্রীর অবস্থা বিধবার মতো হয়।
পরহেযগার সাহেব অধিকারীর অধিকার নষ্ট করে। সে সওয়াবের চিন্তায় থাকে, কিন্তু সে জানে না যে, স্ত্রীর পরশেও সওয়াব আছে। সে মা-কে প্রাধান্য দেয়, কিন্তু জানে না যে, একজনের হক ছিনিয়ে অপরকে দান করলে চুরিকৃত টাকা দান করা হয়। আল্লাহ, দ্বীন, মা-বাপ, স্ত্রী, সন্তান, বন্ধুবান্ধব, মেহমান প্রভৃতি প্রত্যেকের নিজ নিজ হক আছে, আর যথার্থভাবে প্রত্যেকের হক আদায় করতে হয়। একজনের ভাগ কেটে অন্যকে দিলে অন্যায় হয়।
(إِنَّ لِرَبِّكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا فَأَعْطِ كُلَّ ذِي حَقٌّ حَقَّهُ
'নিশ্চয় তোমার উপর তোমার প্রভুর অধিকার রয়েছে। তোমার প্রতি তোমার আত্মারও অধিকার আছে এবং তোমার প্রতি তোমার পরিবারেরও অধিকার রয়েছে। অতএব তুমি প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার প্রদান কর। '৭১২
স্ত্রীর রূপ-যৌবনের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে সওয়াবের আশা করে অনেক হতভাগ্য পুরুষ? অথচ তাতেও যে সওয়াব আছে, তা হয়তো জানে না অথবা মানে না সে। মহানবী বলেছেন,
أَوَلَيْسَ قَدْ جَعَلَ اللهُ لَكُمْ مَا تَصَدَّقُونَ بِهِ : إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلَّ تَكْبِيرَةٍ صَدَقَةً، وَكُلِّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلِّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةً ، وَأَمْرُ بِالمَعْرُوفِ صَدَقَةٌ ، وَنَهْي عَنِ الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ، وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ
"আল্লাহ কি তোমাদের জন্য সাদকাহ করার মত জিনিস দান করেননি? নিঃসন্দেহে প্রত্যেক তাসবীহ সাদকাহ, প্রত্যেক তাকবীর সাদকাহ, প্রত্যেক তাহলীল সাদকাহ, ভাল কাজের নির্দেশ দেওয়া সাদকাহ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা সাদকাহ এবং তোমাদের স্ত্রী-মিলন করাও সাদকাহ।”
সাহাবাগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ স্ত্রী-মিলন ক'রে নিজের যৌনক্ষুধা নিবারণ করে, তবে এতেও কি তার পুণ্য হবে?' তিনি বললেন,
أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا في حَرامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ وِزْرٌ ؟ فكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الحَلالِ كَانَ لَهُ أَجْرٌ
"কী রায় তোমাদের, যদি কেউ অবৈধভাবে যৌন-মিলন করে, তাহলে কি তার পাপ হবে? (নিশ্চয় হবে।) অনুরূপ সে যদি বৈধভাবে (স্ত্রী-মিলন করে) নিজের কামক্ষুধা নিবারণ করে, তাহলে তাতে তার পুণ্য হবে। "৭১৩
স্ত্রীর প্রতি উদাসীন হলে সে পরকীয় প্রেমে ফেঁসে যেতে পারে। আর তাতে পাপ হয় স্বামীর। যেমন তার সম্মতি ছাড়া বাড়ি ছেড়ে বাইরে বা বিদেশে থাকা অবস্থায় সে পাপ করলেও স্বামীর পাপ হবে।
১৫. একাধিক স্ত্রী হলে মনের ভালোবাসাকে ভাগ ক'রে দিতে না পারলেও দেহের পরশকে ভাগ ক'রে দিতে হবে। তা না পারলে আল্লাহর রসূল বলেছেন,
مَنْ كَانَت لَهُ امْرَأَتَانِ ، فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا جَاءَ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَشِقُه مَائِل "
"যে ব্যক্তির দু'টি স্ত্রী আছে, কিন্তু সে তন্মধ্যে একটির দিকে ঝুঁকে যায়, এরূপ ব্যক্তি কিয়ামতের দিন তার অর্ধদেহ ধসা অবস্থায় উপস্থিত হবে। "৭১৪
১৬. ধনলোভী স্বামীর স্ত্রীধনে লোভ থাকে। ফলে তার পৃথক ধন-সম্পত্তি থাকলে অথবা চাকরির বেতন থাকলে তা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। অনেকে সে ধন হাতে করে অসহায় স্ত্রীর খাস অধিকার নষ্ট করে। অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)। আর নিজেদেরকে হত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। ৭১৫
অতএব অনুমতি ছাড়া তার অর্থ ব্যয় করা অথবা সংসারে নিজে ব্যয় করতে কার্পণ্য ক'রে স্ত্রীকে ব্যয় করতে বাধ্য করা চরিত্রবান স্বামীর কাজ হতে পারে না।
১৭. ভুল নিয়েই মানুষের জীবন। কিন্তু সে ভুলের সংশোধন হওয়া প্রয়োজন। ভুলের মাসুলের জায়গায় যদি ক্ষমা হয়, তাহলেই সংসার সুখময় হয়ে ওঠে। সুতরাং মহান আল্লাহর এই বাণী প্রত্যেক স্বামীর মনে রাখা উচিত; তিনি বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ وَإِن تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (١٤)
"হে মুমিনগণ! নিশ্চয় তোমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের (পার্থিব ও পারলৌকিক বিষয়ের) শত্রু। অতএব তাদের ব্যাপারে তোমরা সতর্ক থেকো। অবশ্য (দ্বীনী বিষয়ে অন্যায় থেকে তওবা করলে ও পার্থিব বিষয়ক অন্যায়ে) তোমরা যদি ওদেরকে মার্জনা কর, ওদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা কর এবং ওদেরকে ক্ষমা করে দাও তাহলে জেনে রাখ যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"৭১৬
স্ত্রীর ছোটখাট ভুলে ধৈর্যধারণ করা চরিত্রবান আদর্শ স্বামীর কর্তব্য। ভালোবাসা কুরবানী চায়, কুরবানী দিতে না পারলে ভালোবাসা অনির্বাণ থাকে না।
টিকাঃ
৬৮৯. সূরা নিসা: ৪
৬৯০. বুখারী ২৭২১, ৫১৫১, মুসলিম ৩৫৩৭, মিশকাত ৩১৪৩
৬৯১. ইবনে মাজাহ ২৪১০
৬৯২. হাকেম ২৭৪৩, বাইহাকী ১৪৭৮১, সহীহুল জামে' ১৫৬৭
৬৯৩. আহমাদ ২০০৮৯, আবু দাউদ ২১৪২
৬৯৪. বুখারী ৫৫, মুসলিম ২৩৬৮
৬৯৫. আহমাদ, আবু দাউদ ১৬৯২, হাকেম, বাইহাকী, সহীহুল জামে' ৪৪৮১
৬৯৬. মুসলিম ২৩৫৯
৬৯৭. সূরা নিসা: ১৯
৬৯৮. মুসলিম ১৪৬৯
৬৯৯. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৩২৩৮
৭০০. আহমাদ ২৬২৭৭, আবু দাউদ ২৫৮০, নাসাঈ প্রমুখ
৭০১. বুখারী, মুসলিম, সিঃ সহীহাহ ৫৪৫
৭০২. বুখারী, তিরমিযী, আদাবুয যিফাফ ২৯০পৃ
৭০৩. সিঃ সহীহাহ ৬৭০, আদাবুয যিফাফ ২৯১পৃঃ
৭০৪. বাইহাক্বী ১৪৫০৫, ইবনে আবী শাইবা ১৯২৬৩
৭০৫. তিরমিযী ৩৮৯৫, ইবনে মাজাহ ১৯৭৭, তাবারানী, ইবনে হিব্বান, সঃ জামে' ৩৩১৪
৭০৬. আহমাদ ১০১০৬, তিরমিযী ১১৬২, ইবনে হিব্বان, সহীহুল জামে' ১২৩২
৭০৭. আহমাদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ, মিশকাত ৩৫২৯
৭০৮. তাহরীম: ৬
৭০৯
৭১০. আহমাদ, নাসাঈ ২৫৬১
৭১১. নাসাঈ ২১৫৫৫, বাযযার, হাকেম ১/৭২, সহীহুল জামে' ৩০৬৩
৭১২. বুখারী ১৯৬৮
৭১৩. মুসলিম ২৩৭৬
৭১৪. আহমাদ ২/৩৪৭, আসহাবে সুনান, হাকেম ২/১৮৬, ইবনে হিব্বান ৪১৯৪
৭১৫. সূরা নিসা: ২৯
৭১৬. সূরা তাগাবুন ১৪
চরিত্রবান স্বামী স্ত্রীর প্রতি কোন কর্তব্য পালনে ত্রুটি করে না। যেহেতু যা মহান আল্লাহর নির্দেশ তা তাকে পালন করতেই হবে। সেই সাথে কিছু এমন কাজ আছে, যা করলে স্বামী-স্ত্রীর সংসার সুখময় হয়ে ওঠে। আমরা শুরু করি ফরয কাজগুলি দিয়ে।
১. স্ত্রীর মোহর আদায় দেওয়া স্বামীর জন্য আবশ্যক। যেহেতু মহান আল্লাহর নির্দেশ,
وَآتُوا النِّسَاء صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً فَإِن طِبْنَ لَكُمْ عَن شَيْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَّرِيئًا
অর্থাৎ, তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্ট মনে দিয়ে দাও, পরে তারা খুশী মনে ওর (মোহরের) কিয়দংশ ছেড়ে দিলে, তোমরা তা স্বচ্ছন্দে ভোগ কর। ৬৮৯
আর মহানবী বলেছেন,
إِنَّ أَحَقَّ الشَّرْطِ أَنْ يُوفَى بِهِ مَا اسْتَحْلَلْتُمْ بِهِ الْفُرُوجَ
"যে সকল শর্ত তোমাদের জন্য পালন করা জরুরী, তন্মধ্যে সব চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল তাই---যার দ্বারা তোমরা তোমাদের (পরস্পরের) গোপনাঙ্গ হালাল ক'রে থাক।" ৬৯০
নগদ মোহর না দিয়ে তাতে ফাঁকি দিতে চেষ্টা করা অথবা মনে মনে পরিশোধ করার নিয়ত না রাখা অথবা তা মাফ ক'রে দিতে স্ত্রীকে চাপ দেওয়া চরিত্রবান স্বামীর জন্য বৈধ নয়। দেনমোহর স্ত্রীর কাছে পরিশোধ্য ঋণ। আর ঋণ নিয়ে পরিশোধ করার নিয়ত না থাকলে কী হয় পড়ুন, মহানবী বলেছেন,
أَيُّمَا رَجُلٍ يَدَيَّنُ دَيْنًا وَهُوَ مُجْمِعُ أَنْ لَا يُوَفِّيَهُ إِيَّاهُ لَقِيَ اللَّهُ سَارِقًا
"যে ব্যক্তি ঋণ করার পর তার মনে পাকা এই সংকল্প রাখে যে, সে তা পরিশোধ করবে না, সে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে 'চোর' হয়ে সাক্ষাৎ করবে।" ৬৯১
আর দেনমোহর আদায় না ক'রে তালাক দিলে বিশাল পাপী হয় স্বামী। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ أَعْظَمَ الذُّنُوبِ عِنْدَ اللهِ رَجُلٌ تَزَوَّجَ امْرَأَةً فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ مِنْهَا طَلَّقَهَا
"আল্লাহর নিকট সব চাইতে বড় পাপিষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যে কোন মহিলাকে বিবাহ করে, অতঃপর তার নিকট থেকে মজা লুটে নিয়ে তাকে তালাক দেয় এবং তার মোহরও আত্মসাৎ করে। (দ্বিতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে কোন লোককে মজুর খাটায়, অতঃপর তার মজুরী আত্মসাৎ করে এবং (তৃতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে খামোখা পশু হত্যা করে।"৬৯২
এমন পাপিষ্ঠ স্বামী নিশ্চয়ই চরিত্রবান নয়। তাহলে সেই স্বামীর জন্য কী বলবেন, যে মোহর দেওয়ার জায়গায় নিজে গ্রহণ ক'রে থাকে? পণ বা যৌতুক নিয়ে বিয়ে ক'রে থাকে এবং অনাদায়ে বধূনির্যাতন চালায়?
২. আর্থিক অবস্থানুযায়ী স্ত্রীর ভরণ-পোষণ করা আবশ্যক। স্বামী নিজে যা খাবে, তাকে খাওয়াবে এবং যা পরিধান করবে, ঠিক সেই সমমানের লেবাস তাঁকেও পরিধান করাবে।
মুআবিয়াহ ইবনে হাইদাহ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কারো স্ত্রীর অধিকার স্বামীর উপর কতটুকু?' তিনি বললেন,
أَنْ تُطْعِمَهَا إِذَا طَعِمْتَ ، وَتَكْسُوهَا إِذَا اكْتَسَيْتَ ، وَلَا تَضْرِبَ الوَجْهَ ، وَلا تُقَبِّحُ ، وَلَا تَهْجُرُ إِلَّا فِي البَيْتِ
"তুমি খেলে তাকে খাওয়াবে এবং তুমি পরলে তাকে পরাবে। (তার) চেহারায় মারবে না, তাকে 'কুৎসিত হ' বলে বদ্দুআ দেবে না এবং তার থেকে পৃথক থাকলে বাড়ীর ভিতরেই থাকবে। ৬৯৩
এই খরচে স্বামী সওয়াবপ্রাপ্তও হবে। মহানবী বলেছেন,
إِذَا أَنْفَقَ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِهِ نَفَقَةً يَحْتَسِبُهَا فَهِيَ لَهُ صَدَقَةٌ
"সওয়াবের আশায় কোন মুসলমান যখন তার পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করে, তখন তা সাদকাহ হিসাবে গণ্য হয়।”৬৯৪
পক্ষান্তরে যে হতভাগা স্বামী নিজ স্ত্রীকে ঠিকমতো খেতে-পরতে দেয় না, সে গোনাহগার। যার কাছে সে প্রয়োজনে প্রেম ভিক্ষা করে, তাকে খেতে-পরতে দেয় না, এ আবার পাপী না হয়? মহানবী বলেছেন,
كَفَى بِالمَرْءِ إِثْمَا أَنْ يُضَيِّعَ مَنْ يَقُوتُ
"একটি মানুষের পাপী হওয়ার জন্য এটা যথেষ্ট যে, সে তাদের (অধিকার) নষ্ট করবে (অর্থাৎ, তাদের ভরণ-পোষণে কার্পণ্য করবে) যাদের জীবিকার জন্য সে দায়িত্বশীল।"৬৯৫
كَفَى بِالمَرْءِ إِثْماً أَنْ يُحْبِسَ عَمَّنْ يَمْلِكُ قُوتَهُ
"মানুষের পাপী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যার খাদ্যের মালিক, তার খাদ্য সে আটকে রাখে।"৬৯৬
আর এমন স্বামী কি চরিত্রবান হতে পারে? কক্ষনো নয়।
৩. স্ত্রীর সাথে সদ্ভাবে বসবাস করা কর্তব্য চরিত্রবান স্বামীর। স্ত্রীকে ভালোবাসার পাত্রী জ্ঞান ক'রে স্নেহ করা ও ভালোবাসা তার কর্তব্য। আর কোন কারণে তাকে ভালো না বাসতে পারলেও তার প্রতি অন্যায় ও অত্যাচার করা উচিত নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهِ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
অর্থাৎ, স্ত্রীদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন কর; তোমরা যদি তাদেরকে ঘৃণা কর, তাহলে এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকে ঘৃণা করছ। ৬৯৭
আর মহানবী বলেছেন,
لا يَفْرَكُ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقاً رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
"কোন ঈমানদার পুরুষ যেন কোন ঈমানদার নারী (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। যদি সে তার একটি আচরণে অসন্তুষ্ট হয়, তবে অন্য আচরণে সন্তুষ্ট হবে।"৬৯৮
দাম্পত্য জীবনে স্ত্রী হল ঠুনকো কাঁচের তৈরি পাত্র। খুব সাবধানে ব্যবহার করতে হয় তাকে। নচেৎ বেশি ঠুকাঠুকি করলেই ভেঙ্গে যেতে পারে।
প্রিয় নবী বলেন,
(اسْتَوْصُوا بالنِّساءِ خَيْراً فَإِنَّ المَرأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلعٍ أَعْوَجَ وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ في الضلع أعلاهُ فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمَهُ كَسَرْتَهُ وإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلُ أَعْوَجَ فَاسْتَوْصُوا بالنِّساءِ خَيْراً
"তোমরা নারীদের জন্য হিতাকাঙ্ক্ষী হও। কারণ, নারী জাতি বঙ্কিম পঞ্জরাস্থি হতে সৃষ্ট। আর তার উপরের অংশ বেশী টেরা। (সুতরাং তাদের প্রকৃতিই বঙ্কিম ও টেরা।) অতএব তুমি সোজা করতে গেলে হয়তো তা ভেঙ্গেই ফেলবে। আর নিজের অবস্থায় উপেক্ষা করলে বাঁকা থেকেই যাবে। অতএব তাদের জন্য মঙ্গলকামী হও।"৬৯৯
হ্যাঁ, সংসারের ঝামেলা কখনো কখনো অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। তবে শরীয়ত-সম্মত কারণ ছাড়া তালাক দেওয়া চরিত্রবান স্বামীর উচিত নয়। ব্যবহারে সদ্ভাব প্রকাশ ক'রে স্ত্রীর সাথে প্রেমমাখা স্বরে কথা বলা চরিত্রবান স্বামীর কর্তব্য। ভালো ভাষা প্রয়োগ না করলে দাম্পত্যে ভালোবাসার বসন্তে বৈশাখ আসে।
৪. তার সাথে হাস্য-রসিকতা করা, সব সময় পৌরুষ মেজাজ না রেখে কোন কোন সময় তার সাথে বৈধ খেলা করা, শরীরচর্চা বা ব্যায়ামাদি করা ইত্যাদিও স্বামীর কর্তব্য। প্রিয় নবী স্ত্রী আয়েশার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা ক'রে একবার হেরেছিলেন ও পরে আর একবারে তিনি জিতেছিলেন। ৭০০
তদনুরূপ স্ত্রীকে কোন বৈধ খেলা দেখতে সুযোগ দেওয়াও দূষণীয় নয়। যেহেতু এ হল সদ্ভাবে বসবাস। তবে এসব কিছু হবে একান্ত নির্জনে, পর্দা-সীমার ভিতরে।
৫. স্ত্রী ভালো খাবার তৈরী করলে, সাজগোজ করলে বা কোন ভালো কাজ করলে তার প্রশংসা করবে স্বামী। এমনকি স্ত্রীর হৃদয়কে লুটে নেওয়ার জন্য ইসলাম মিথ্যা বলাকেও বৈধ করেছে। ৭০১
তবে যে মিথ্যা তার অধিকার হরণ করে ও তাকে ধোঁকা দেয়, সে মিথ্যা নয়। উল্লেখ্য যে, স্ত্রীর প্রতিপক্ষে কোন অন্য মহিলার প্রশংসা তার সামনে করা আসলে তাকে ছোট করা। এমনটি করা কোন আদর্শবান স্বামীর উচিত নয়। যেমন উচিত নয়, স্ত্রীর রূপ-সৌন্দর্য বা সদ্গুণ নিয়ে কোন অন্য পুরুষের কাছে প্রশংসা করা। কারণ তাতে তাকে তাদের মানসপটের ছবি নির্মাণ ক'রে দেওয়া হবে, যার পরিণাম অশুভ হতে পারে।
৬. স্বামী নিজ স্ত্রীর গৃহস্থালি কর্মেও সহযোগিতা করবে। এতে স্ত্রীর মন স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রেমে আরো পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রিয় নবী ; যিনি দুজাহানের সর্দার তিনিও সংসারের কাজ করতেন। স্ত্রীদের সহায়তা করতেন, অতঃপর স্বলাতের সময় হলেই মসজিদের দিকে রওনা হতেন। ৭০২
তিনি অন্যান্য মানুষের মত একজন মানুষ ছিলেন; স্বহস্তে কাপড় পরিষ্কার করতেন, দুধ দোয়াতেন এবং নিজের খিদমত নিজেই করতেন। ৭০৩
৭. স্বামী যেমন স্ত্রীকে সুন্দরী দেখতে পছন্দ করে, তেমনি স্ত্রীও স্বামীকে সুন্দর ও সুসজ্জিত দেখতে ভালোবাসে। এটাই হল মানুষের প্রকৃতি। সুতরাং স্বামীরও উচিত স্ত্রীকে খোশ করার জন্য সাজগোজ করা। যাতে তারও নজর অন্য পুরুষের (স্বামীর কোন পরিচ্ছন্ন আত্মীয়ের) পদ্ধতি আকৃষ্ট না হয়। ইবনে আব্বাস বলেন, 'আমি আমার স্ত্রীর জন্য সাজসজ্জা করি, যেমন সে আমার জন্য সাজসজ্জা করে। '৭০৪
৮. স্ত্রীকে বিভিন্ন উপলক্ষে (যেমন ঈদ, কুরবানী প্রভৃতিতে) ছোটখাট উপহার দেওয়াও সম্ভাবে বাস করার পর্যায়ভুক্ত। এতেও স্ত্রীর হৃদয় চিরবন্দী হয় স্বামীর হৃদয় কারাগারে।
৯. স্ত্রীকে কথায় ও খরচে কষ্ট না দেওয়া স্বামীর কর্তব্য। কোনও দোষে মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া, মারধর করা শোভনীয় নয় চরিত্রবান স্বামীর জন্য।
স্ত্রীর সাথে বাস তো প্রেমিকার সাথে বাস। সর্বতোভাবে তাকে খোশ রাখা মানুষের প্রকৃতিগত স্বভাব। প্রেমিকাকে কষ্ট দেওয়া কোন মুসলিম, কোন মানুষের, বরং কোন পশুরও কাজ নয়।
চরিত্রবান পুরুষ তার ভালো স্ত্রীর কাছে ভালো হয়। আর সেই হয় পূর্ণ ঈমানদার। প্রিয় নবী বলেন,
( خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
"তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি সেই, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম। আর আমি নিজ স্ত্রীর নিকট তোমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তি। "৭০৫
(أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِكُمْ
"সবার চেয়ে পূর্ণ ঈমানদার ব্যক্তি সে, যার চরিত্র সবার চেয়ে সুন্দর এবং তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি সেই, যে তোমাদের স্ত্রীদের নিকট উত্তম।”৭০৬
১০. তাকে সর্বতোভাবে হিফাযতে রাখার চেষ্টা করবে চরিত্রবান স্বামী। বিপদ-আপদ থেকে তাকে রক্ষা করবে। স্ত্রীকে রক্ষা করতে গিয়ে যদি স্বামী শত্রুর হাতে মারা যায়, তবে সে শহীদের মর্যাদা লাভ করবে। মহানবী বলেন,
(مَنْ قُتِلَ دُونَ مَالِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ ، وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دَمِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ ، وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دِينِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ ، وَمَنْ قُتِلَ دُونَ أَهْلِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ
"যে ব্যক্তি তার মাল-ধন রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সে শহীদ। যে ব্যক্তি নিজ রক্ত (প্রাণ) রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সে শহীদ। যে তার দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সে শহীদ এবং যে তার পরিবার রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সেও শহীদ।"৭০৭
অনুরূপ স্ত্রীকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করাও তার এক বড় দায়িত্ব। তাকে দ্বীন, আক্বীদা, পবিত্রতা, ইবাদত, হারাম, হালাল, অধিকার ও ব্যবহার প্রভৃতি শিক্ষা দিয়ে সৎকাজ করতে আদেশ ও অসৎকাজে বাধা দিয়ে আল্লাহর আযাব থেকে রেহাই দেবে স্বামী। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজ পরিবারকে জাহান্নام থেকে বাঁচাও; যার ইন্ধন মানুষ ও পাথর --।"৭০৮
১১. স্ত্রীকে সুশিক্ষা দেওয়া, ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করা ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া স্বামীর কর্তব্য। সে অনুমতি চাইলে তাকে মসজিদে যেতে বাধা না দেওয়া উচিত চরিত্রবান পুরুষের। যেহেতু সেখানেও সুশিক্ষা লাভ করার সুযোগ আছে। মহানবী বলেছেন,
لا تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللهِ مَسَاجِدَ اللهِ وَلَكِنْ لِيَخْرُجْنَ وَهُنَّ تَفِلاَتٌ
"আল্লাহর বান্দীদেরকে মসজিদে আসতে বারণ করো না, তবে তারা যেন খোশবু ব্যবহার না ক'রে সাদাসিধাভাবে আসে।”৭০৯
১২. স্ত্রীর ধর্ম, দেহ, যৌবন ও মর্যাদায় ঈর্ষাবান হওয়া এবং এ সবে কোন প্রকার কলঙ্ক লাগতে না দেওয়া স্বামীর উপর তার এক অধিকার। সুতরাং স্ত্রী এক উত্তম সংরক্ষণীয় ও হিফাজতের জিনিস। লোকের মুখে-মুখে, পরপুরুষদের চোখে-চোখে ও যুবকদের মনে- মনে বিচরণ করতে না দেওয়া; যাকে দেখা দেওয়া তার স্ত্রীর পক্ষে হারাম, তাকে সাধারণ অনুমতি দিয়ে বাড়ি আসতে-যেতে না দেওয়া সুপুরুষের কর্ম। মহানবী বলেছেন,
(ثلاثة لا يَنظُرُ الله إِلَيْهِمْ يَوْمَ القِيامَةِ العاقِ والمَرْأَةُ المُتَرَجُلَةِ المُتَشَبِّهَةُ بالرجال والديوث
"তিন ব্যক্তির দিকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকিয়ে দেখবেন না; পিতা- মাতার অবাধ্য সন্তান, পুরুষের বেশধারী মহিলা এবং মেড়া (স্ত্রী-কন্যার পর্দাহীনতা ও নোংরামীর ব্যাপারে ঈর্ষাহীন) পুরুষ।"৭১০
(ثلاثة لا يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ العاقُ لِوالِدَيْهِ وَالدَّيُوتُ وَرَجِلَةُ النِّسَاءِ
"তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, ভেড়া পুরুষ এবং পুরুষের বেশধারী মহিলা। "৭১১
১৩. গুণধর স্বামী নিজ স্ত্রীর কোন রহস্য বা গোপন কথা অপরের কাছে প্রকাশ করে না। যেমন স্ত্রীর রূপ-যৌবন ও তার সংসর্গে যৌনসুখের কথাও অন্য পুরুষের কাছে উল্লেখ ক'রে তৃপ্তি ও মজা নেয় না। যেহেতু তা ঈর্ষাহীন পুরুষদের অভ্যাস।
১৪. স্ত্রীর যৌন-আহবানে সত্বর সাড়া দেওয়া উচিত চরিত্রবান স্বামীর। নারীর মন ও যৌবন ধীর ও শান্ত প্রকৃতির। যৌন ব্যাপারে পুরুষের মতো তৎপর নয়। কিন্তু ভাগ্যক্রমে অনেক স্বামী এ বাজারে গরম হয়, স্ত্রী হয় ঠাণ্ডা। অনেক স্বামী ঠাণ্ডা হয়, স্ত্রী হয় গরম। তবুও স্ত্রী শান্ত থাকে। পুরুষ ধৈর্য রাখতে পারে না, স্ত্রী পারে। কিন্তু স্বামী ঠাণ্ডা প্রকৃতির হলে, পরিশ্রমী হলে অথবা বৈরাগ্য-সাধনে সওয়াব আছে মনে করলে স্ত্রীর অবস্থা বিধবার মতো হয়।
পরহেযগার সাহেব অধিকারীর অধিকার নষ্ট করে। সে সওয়াবের চিন্তায় থাকে, কিন্তু সে জানে না যে, স্ত্রীর পরশেও সওয়াব আছে। সে মা-কে প্রাধান্য দেয়, কিন্তু জানে না যে, একজনের হক ছিনিয়ে অপরকে দান করলে চুরিকৃত টাকা দান করা হয়। আল্লাহ, দ্বীন, মা-বাপ, স্ত্রী, সন্তান, বন্ধুবান্ধব, মেহমান প্রভৃতি প্রত্যেকের নিজ নিজ হক আছে, আর যথার্থভাবে প্রত্যেকের হক আদায় করতে হয়। একজনের ভাগ কেটে অন্যকে দিলে অন্যায় হয়।
(إِنَّ لِرَبِّكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا فَأَعْطِ كُلَّ ذِي حَقٌّ حَقَّهُ
'নিশ্চয় তোমার উপর তোমার প্রভুর অধিকার রয়েছে। তোমার প্রতি তোমার আত্মারও অধিকার আছে এবং তোমার প্রতি তোমার পরিবারেরও অধিকার রয়েছে। অতএব তুমি প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার প্রদান কর। '৭১২
স্ত্রীর রূপ-যৌবনের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে সওয়াবের আশা করে অনেক হতভাগ্য পুরুষ? অথচ তাতেও যে সওয়াব আছে, তা হয়তো জানে না অথবা মানে না সে। মহানবী বলেছেন,
أَوَلَيْسَ قَدْ جَعَلَ اللهُ لَكُمْ مَا تَصَدَّقُونَ بِهِ : إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلَّ تَكْبِيرَةٍ صَدَقَةً، وَكُلِّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلِّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةً ، وَأَمْرُ بِالمَعْرُوفِ صَدَقَةٌ ، وَنَهْي عَنِ الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ، وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ
"আল্লাহ কি তোমাদের জন্য সাদকাহ করার মত জিনিস দান করেননি? নিঃসন্দেহে প্রত্যেক তাসবীহ সাদকাহ, প্রত্যেক তাকবীর সাদকাহ, প্রত্যেক তাহলীল সাদকাহ, ভাল কাজের নির্দেশ দেওয়া সাদকাহ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা সাদকাহ এবং তোমাদের স্ত্রী-মিলন করাও সাদকাহ।”
সাহাবাগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ স্ত্রী-মিলন ক'রে নিজের যৌনক্ষুধা নিবারণ করে, তবে এতেও কি তার পুণ্য হবে?' তিনি বললেন,
أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا في حَرامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ وِزْرٌ ؟ فكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الحَلالِ كَانَ لَهُ أَجْرٌ
"কী রায় তোমাদের, যদি কেউ অবৈধভাবে যৌন-মিলন করে, তাহলে কি তার পাপ হবে? (নিশ্চয় হবে।) অনুরূপ সে যদি বৈধভাবে (স্ত্রী-মিলন করে) নিজের কামক্ষুধা নিবারণ করে, তাহলে তাতে তার পুণ্য হবে। "৭১৩
স্ত্রীর প্রতি উদাসীন হলে সে পরকীয় প্রেমে ফেঁসে যেতে পারে। আর তাতে পাপ হয় স্বামীর। যেমন তার সম্মতি ছাড়া বাড়ি ছেড়ে বাইরে বা বিদেশে থাকা অবস্থায় সে পাপ করলেও স্বামীর পাপ হবে।
১৫. একাধিক স্ত্রী হলে মনের ভালোবাসাকে ভাগ ক'রে দিতে না পারলেও দেহের পরশকে ভাগ ক'রে দিতে হবে। তা না পারলে আল্লাহর রসূল বলেছেন,
مَنْ كَانَت لَهُ امْرَأَتَانِ ، فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا جَاءَ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَشِقُه مَائِل "
"যে ব্যক্তির দু'টি স্ত্রী আছে, কিন্তু সে তন্মধ্যে একটির দিকে ঝুঁকে যায়, এরূপ ব্যক্তি কিয়ামতের দিন তার অর্ধদেহ ধসা অবস্থায় উপস্থিত হবে। "৭১৪
১৬. ধনলোভী স্বামীর স্ত্রীধনে লোভ থাকে। ফলে তার পৃথক ধন-সম্পত্তি থাকলে অথবা চাকরির বেতন থাকলে তা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। অনেকে সে ধন হাতে করে অসহায় স্ত্রীর খাস অধিকার নষ্ট করে। অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)। আর নিজেদেরকে হত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। ৭১৫
অতএব অনুমতি ছাড়া তার অর্থ ব্যয় করা অথবা সংসারে নিজে ব্যয় করতে কার্পণ্য ক'রে স্ত্রীকে ব্যয় করতে বাধ্য করা চরিত্রবান স্বামীর কাজ হতে পারে না।
১৭. ভুল নিয়েই মানুষের জীবন। কিন্তু সে ভুলের সংশোধন হওয়া প্রয়োজন। ভুলের মাসুলের জায়গায় যদি ক্ষমা হয়, তাহলেই সংসার সুখময় হয়ে ওঠে। সুতরাং মহান আল্লাহর এই বাণী প্রত্যেক স্বামীর মনে রাখা উচিত; তিনি বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ وَإِن تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (١٤)
"হে মুমিনগণ! নিশ্চয় তোমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের (পার্থিব ও পারলৌকিক বিষয়ের) শত্রু। অতএব তাদের ব্যাপারে তোমরা সতর্ক থেকো। অবশ্য (দ্বীনী বিষয়ে অন্যায় থেকে তওবা করলে ও পার্থিব বিষয়ক অন্যায়ে) তোমরা যদি ওদেরকে মার্জনা কর, ওদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা কর এবং ওদেরকে ক্ষমা করে দাও তাহলে জেনে রাখ যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"৭১৬
স্ত্রীর ছোটখাট ভুলে ধৈর্যধারণ করা চরিত্রবান আদর্শ স্বামীর কর্তব্য। ভালোবাসা কুরবানী চায়, কুরবানী দিতে না পারলে ভালোবাসা অনির্বাণ থাকে না।
টিকাঃ
৬৮৯. সূরা নিসা: ৪
৬৯০. বুখারী ২৭২১, ৫১৫১, মুসলিম ৩৫৩৭, মিশকাত ৩১৪৩
৬৯১. ইবনে মাজাহ ২৪১০
৬৯২. হাকেম ২৭৪৩, বাইহাকী ১৪৭৮১, সহীহুল জামে' ১৫৬৭
৬৯৩. আহমাদ ২০০৮৯, আবু দাউদ ২১৪২
৬৯৪. বুখারী ৫৫, মুসলিম ২৩৬৮
৬৯৫. আহমাদ, আবু দাউদ ১৬৯২, হাকেম, বাইহাকী, সহীহুল জামে' ৪৪৮১
৬৯৬. মুসলিম ২৩৫৯
৬৯৭. সূরা নিসা: ১৯
৬৯৮. মুসলিম ১৪৬৯
৬৯৯. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৩২৩৮
৭০০. আহমাদ ২৬২৭৭, আবু দাউদ ২৫৮০, নাসাঈ প্রমুখ
৭০১. বুখারী, মুসলিম, সিঃ সহীহাহ ৫৪৫
৭০২. বুখারী, তিরমিযী, আদাবুয যিফাফ ২৯০পৃ
৭০৩. সিঃ সহীহাহ ৬৭০, আদাবুয যিফাফ ২৯১পৃঃ
৭০৪. বাইহাক্বী ১৪৫০৫, ইবনে আবী শাইবা ১৯২৬৩
৭০৫. তিরমিযী ৩৮৯৫, ইবনে মাজাহ ১৯৭৭, তাবারানী, ইবনে হিব্বান, সঃ জামে' ৩৩১৪
৭০৬. আহমাদ ১০১০৬, তিরমিযী ১১৬২, ইবনে হিব্বان, সহীহুল জামে' ১২৩২
৭০৭. আহমাদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ, মিশকাত ৩৫২৯
৭০৮. তাহরীম: ৬
৭০৯
৭১০. আহমাদ, নাসাঈ ২৫৬১
৭১১. নাসাঈ ২১৫৫৫, বাযযার, হাকেম ১/৭২, সহীহুল জামে' ৩০৬৩
৭১২. বুখারী ১৯৬৮
৭১৩. মুসলিম ২৩৭৬
৭১৪. আহমাদ ২/৩৪৭, আসহাবে সুনান, হাকেম ২/১৮৬, ইবনে হিব্বান ৪১৯৪
৭১৫. সূরা নিসা: ২৯
৭১৬. সূরা তাগাবুন ১৪
📄 আত্মীয়র সাথে সচ্চরিত্রতা
আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং সচ্চরিত্রতার আচরণ করা একটি জরুরী বিষয়। যেহেতু মহান আল্লাহর নির্দেশ তাই। মহানবী এর আদেশ তাই। ঈমানের দাবী তাই।
যেহেতু আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করলে আল্লাহ সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
যেহেতু জ্ঞাতিবন্ধন বজায় রাখা আল্লাহর নিকট প্রিয় কাজ এবং জ্ঞাতিবন্ধন ছিন্ন করা আল্লাহর নিকট ঘৃণ্য কাজ।
আত্মীয় যদি আত্মীয়তা বজায় না রাখতে চায়, তবুও তার সাথে নিজের কর্তব্য হিসাবে বন্ধন বজায় রাখার চেষ্টা ক'রে যেতে হবে। সে না এলেও আপনাকে যেতে হবে। সে না দিলেও আপনাকে দিতে হবে। সে দাওয়াত না দিলেও আপনাকে দিতে হবে। আপনার অসুখে সে দেখা করতে না এলেও আপনাকে তার অসুখে দেখা করতে যেতে হবে। সে অধম হলে আপনাকে উত্তম হতে হবে। তবেই আপনি চরিত্রবান মানুষ। তবেই আপনি ভালো মানুষ। তাতে আপনার আয়ু বাড়বে, আপনার বয়সে বরকত হবে। আপনার রুযী-রোযগারেও বরকত হবে।
আত্মীয়কে বিশেষ উপলক্ষ্যে দাওয়াত দিন। তার বিপদে সাহায্য করুন। তার অভাবে দান করুন। যেহেতু আত্মীয়কে দান করলে ডবল সওয়াব লাভ হয়।
মাঝে-মধ্যে যিয়ারত করুন। সময়াভাবে যাওয়া-আসা না করতে পারলেও ফোনের মাধ্যমে খোঁজ-খবর নিন।
তবে মনে রাখবেন, আত্মীয়তার বন্ধন অপেক্ষা ঈমানের বন্ধন বেশি মজবুত। আশা করি তা বুঝিয়ে বলার দরকার হবে না। যেহেতু আপনি এ কাজ করবেন আল্লাহর ওয়াস্তে। আর আত্মীয় যদি আল্লাহর দুশমন হয়, তাহলে আল্লাহর দুশমনের সাথে আপনার সম্পর্ক কীসের?
পারলে আত্মীয়র বন্ধুর সাথেও সম্পর্ক বজায় রাখুন। যেহেতু 'দোস্ত কা দোস্ত, দোস্ত হোতা হ্যায়।'
আর জেনে রাখবেন, আত্মীয়তার বন্ধন ছেদন করার শাস্তি দুনিয়াতেও পাওয়া যায়। আর আখেরাতেও আছে। সেখানে আত্মীয়তার বন্ধন ছেদনকারীর স্থান জাহান্নামে। আর আত্মীয়তার বন্ধন বজায়কারী জান্নাত লাভে ধন্য হবে। আল্লাহ করুন, আপনি চরিত্রবান হন এবং জান্নাতলাভে ধন্য হন।
আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং সচ্চরিত্রতার আচরণ করা একটি জরুরী বিষয়। যেহেতু মহান আল্লাহর নির্দেশ তাই। মহানবী এর আদেশ তাই। ঈমানের দাবী তাই।
যেহেতু আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করলে আল্লাহ সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
যেহেতু জ্ঞাতিবন্ধন বজায় রাখা আল্লাহর নিকট প্রিয় কাজ এবং জ্ঞাতিবন্ধন ছিন্ন করা আল্লাহর নিকট ঘৃণ্য কাজ।
আত্মীয় যদি আত্মীয়তা বজায় না রাখতে চায়, তবুও তার সাথে নিজের কর্তব্য হিসাবে বন্ধন বজায় রাখার চেষ্টা ক'রে যেতে হবে। সে না এলেও আপনাকে যেতে হবে। সে না দিলেও আপনাকে দিতে হবে। সে দাওয়াত না দিলেও আপনাকে দিতে হবে। আপনার অসুখে সে দেখা করতে না এলেও আপনাকে তার অসুখে দেখা করতে যেতে হবে। সে অধম হলে আপনাকে উত্তম হতে হবে। তবেই আপনি চরিত্রবান মানুষ। তবেই আপনি ভালো মানুষ। তাতে আপনার আয়ু বাড়বে, আপনার বয়সে বরকত হবে। আপনার রুযী-রোযগারেও বরকত হবে।
আত্মীয়কে বিশেষ উপলক্ষ্যে দাওয়াত দিন। তার বিপদে সাহায্য করুন। তার অভাবে দান করুন। যেহেতু আত্মীয়কে দান করলে ডবল সওয়াব লাভ হয়।
মাঝে-মধ্যে যিয়ারত করুন। সময়াভাবে যাওয়া-আসা না করতে পারলেও ফোনের মাধ্যমে খোঁজ-খবর নিন।
তবে মনে রাখবেন, আত্মীয়তার বন্ধন অপেক্ষা ঈমানের বন্ধন বেশি মজবুত। আশা করি তা বুঝিয়ে বলার দরকার হবে না। যেহেতু আপনি এ কাজ করবেন আল্লাহর ওয়াস্তে। আর আত্মীয় যদি আল্লাহর দুশমন হয়, তাহলে আল্লাহর দুশমনের সাথে আপনার সম্পর্ক কীসের?
পারলে আত্মীয়র বন্ধুর সাথেও সম্পর্ক বজায় রাখুন। যেহেতু 'দোস্ত কা দোস্ত, দোস্ত হোতা হ্যায়।'
আর জেনে রাখবেন, আত্মীয়তার বন্ধন ছেদন করার শাস্তি দুনিয়াতেও পাওয়া যায়। আর আখেরাতেও আছে। সেখানে আত্মীয়তার বন্ধন ছেদনকারীর স্থান জাহান্নামে। আর আত্মীয়তার বন্ধন বজায়কারী জান্নাত লাভে ধন্য হবে। আল্লাহ করুন, আপনি চরিত্রবান হন এবং জান্নাতলাভে ধন্য হন।