📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 স্বামীর সাথে সদ্‌ব্যবহার

📄 স্বামীর সাথে সদ্‌ব্যবহার


চরিত্রবতী স্বামী-সোহাগিনী নারী স্বামীর সাথে সদ্ব্যবহার করে। যত সুন্দর চরিত্র-গুণ আছে স্বামীর সাথে প্রয়োগ করে।
১. চরিত্রবতী স্ত্রী স্বামীর আদেশ পালন করে। তার মনের বিরোধিতা করে না। সে যেমন বলে, তেমন চলে। অবশ্য বৈধ বিষয়ে, অবৈধ বিষয়ে নয়। স্বামীর অনুগতা হওয়া বেহেস্তী স্ত্রীর পরিচয়। প্রিয় নবী বলেন,
إِذَا صَلَّتِ الْمَرْأَةُ خَمْسَهَا، وَصَامَتْ شَهْرَهَا ، وَحَصَّنَتْ فَرْجَهَا، وَأَطَاعَتْ بَعْلَهَا، دَخَلَتْ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شَاءَتْ
"রমণী তার পাঁচ ওয়াক্তের স্বলাত পড়লে, রমযানের সিয়াম পালন করলে, ইজ্জতের হিফাযত করলে ও স্বামীর তাবেদারী করলে জান্নাতের যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছামত প্রবেশ করতে পারবে।”৬৬০
এমন গুণবতী হল সর্বশ্রেষ্ঠ স্ত্রী। মহানবী বলেছেন,
خَيْرُ النِّسَاءِ الَّتِي تَسُرُّهُ إِذا نَظَرَ وَتُطِيعُهُ إِذا أَمَرَ ولا تُخَالِفُهُ فِي نَفْسِها ولا مالها بِمَا يَكْرَهُ
"সর্বশ্রেষ্ঠ রমণী সেই, যার প্রতি তার স্বামী দৃকপাত করলে সে তাকে খোশ করে দেয়, কোন আদেশ করলে তা পালন করে এবং তার জীবন ও সম্পদে স্বামীর অপছন্দনীয় বিরুদ্ধাচরণ করে না। ৬৬১
তবে আনুগত্যের ক্ষেত্রে মহানবী এর এ নির্দেশ অবশ্যই মনে রাখতে হবে,
لا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ
"স্রষ্টার অবাধ্যতা করে কোন সৃষ্টির আনুগত্য নেই। "৬৬২
২. চরিত্রবতী স্ত্রী স্বামীকে যেমন ভালোবাসে, তেমনি শ্রদ্ধাও করে। যেহেতু স্ত্রীর নিকট স্বামীর মর্যাদা বিরাট। এই মর্যাদার কথা ইসলাম নিজে ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاء بِمَا فَضَّل الله بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
অর্থাৎ, পুরুষ নারীর কর্তা। কারণ, আল্লাহ তাদের এককে রের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এ জন্য যে পুরুষ (তাদের জন্য) ধন ব্যয় করে। ৬৬৩
স্বামী শুধু স্ত্রীর কর্তাই নয়, বরং সে তার সিজদাযোগ্য শ্রদ্ধেয় ও মাননীয়। তবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা যেহেতু হারাম, তাই ইসলামে তাকে সিজদা করতে আদেশ দেওয়া হয়নি। মহানবী বলেছেন,
لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا
"যদি আমি কাউকে কারো জন্য সিজদা করতে আদেশ করতাম, তাহলে নারীকে আদেশ করতাম, সে যেন তার স্বামীকে সিজদা করে।”৬৬৪
প্রিয় নবী বলেন, "স্ত্রীর জন্য স্বামী তার জান্নাত অথবা জাহান্নাম।"৬৬৫
অর্থাৎ, স্ত্রী স্বামীর অবাধ্য হলে পরকালে তার স্থান হবে জাহান্নামে। আর বাধ্য হয়ে তাকে খোশ রাখতে পারলে তার স্থান হবে জান্নাতে।
স্ত্রীর উপর স্বামীর এত বড় মর্যাদা ও অধিকার রয়েছে যে, যতই সে তা প্রাণপণ দিয়ে আদায় করার চেষ্টা করুক, পরিপূর্ণরূপে তা আদায় করতে সক্ষম নয়। 'অত পারি না' বলে যে স্ত্রীরা মুখ ঘুরায়, নাক বাঁকায় অথবা কোন ওজুহাতে বা ছলবাহানা করে স্বামীর খিদমতে ফাঁকি দেয়, তারা চরিত্রবতী স্ত্রী নয়। মহানবী বলেছেন,
مِن حَقِّ الزَّوجِ عَلَى زَوجَتِهِ إِن سَالَ دَماً وَقَيحاً وَصَدِيداً فَلَحَسَتَهُ بِلِسَانِهَا مَا أَدَّتْ حَقَّهُ
"স্ত্রীর কাছে স্বামীর এমন অধিকার আছে যে, স্ত্রী যদি স্বামীর দেহের ঘা চেঁটেও থাকে, তবুও সে তার যথার্থ হক আদায় করতে পারবে না। "৬৬৬
অন্য এক হাদীসে তিনি বলেছেন,
(فَإِنَّ الْمَرْأَةَ لَوْ تَعْلَمُ مَا حَقٌّ زَوْجِهَا ، لَمْ تَزَلْ قَائِمَةً مَا حَضَرَ غَدَاؤُهُ وَعَشَاؤُهُ
"মহিলা যদি নিজ স্বামীর হক (যথার্থরূপে) জানতো, তাহলে তার দুপুর অথবা রাতের খাবার খেয়ে শেষ না করা পর্যন্ত সে (তার পাশে) দাঁড়িয়ে থাকতো। "৬৬৭
প্রেম-ভালোবাসার মাঝেই এত বড় প্রাপ্য অধিকার স্বামীর। আধুনিকারা তা স্বীকার না করলেও সে অধিকার আদায় না করা পর্যন্ত নিজ সৃষ্টিকর্তার অধিকার আদায় করতে পারবে না কোন নারী। সে অধিকার লংঘিত হলে এবং স্বামী ক্ষমা না করলে মহান আল্লাহ স্ত্রীকে ক্ষমা করবেন না। এমন মেয়েদের দ্বারা আপন প্রতিপালকের হক আদায় হয় না। মহানবী বলেছেন,
(وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لاَ تُؤَدِّي المَرْأَةُ حَقَّ رَبِّهَا حَتَّى تُؤدِّيَ حَقَّ زَوْجِهَا كُلَّهُ حَتَّى لَوْ سَأَلَهَا نَفْسَهَا وَهِيَ عَلَى قَتَبٍ لَمْ تَمْنَعُهُ
"তাঁর শপথ যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ আছে! নারী তার প্রতিপালকের হক ততক্ষণ পর্যন্ত আদায় করতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার স্বামীর হক আদায় করেছে। সওয়ারীর পিঠে থাকলেও যদি স্বামী তার মিলন চায়, তবে সে বাধা দিতে পারবে না।"৬৬৮
৩. চরিত্রবতী স্ত্রী স্বামীকে সর্বতোভাবে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করে এবং তাকে কোন প্রকার কষ্ট দেয় না।
অনেক স্ত্রী ধনী বলে ধনের গর্বে স্বামীকে পাত্তা দেয় না। সময়ে খিদমত করে না, প্রয়োজনে মিলন দেয় না।
স্ত্রী অধিক শিক্ষিতা বলে অথবা চাকরি করে বলে স্বামীকে চাকর বানিয়ে রাখে।
স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করেছে বলে স্ত্রী তাকে 'স্বামী' না ভেবে 'আসামী' ভাবে।
নিজের ছেলেমেয়ে বড় হয়ে পায়ের তলায় মাটি হয়েছে বলে স্বামীর কোন মর্যাদা রক্ষা করে না। তার কোন অধিকার আছে বলেও মনে করে না।
স্বামী অসুস্থ অথবা যৌবনহারা হলে স্ত্রী আর তাকে গুরুত্ব দেয় না। অনেক স্ত্রী তাকে ঘৃণা করে, বর্জন করে এবং অন্য পুরুষের দিকে আকৃষ্টা হয়।
অনেক স্ত্রী নিজ ভাই, ছেলে বা জামাইয়ের সহযোগিতায় নিরীহ স্বামীকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করে!
একই বাড়িতে বসবাস ক'রে পৃথক খাওয়া-শোওয়ার কথাও শোনা যায় অনেক স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারে।
এমন স্ত্রীরা যে চরিত্রবতী স্ত্রী নয়, তা বলাই বাহুল্য।
বান্দার হক আদায় না করা পর্যন্ত আল্লাহর হক আদায় করা সম্ভব নয়। বান্দার হক বিনষ্ট করলে আল্লাহ তাঁর আদায়কৃত হক গ্রহণ করেন না। কোন ক্রীতদাস নিজ প্রভুর অবাধ্য হলে মহান প্রভুরও অবাধ্যতা হয়। কোন স্ত্রী নিজ স্বামীকে খোশ করতে না পারলে তার প্রতি মহান স্বামীও নাখোশ থাকেন।
কোন সতী পতিকে সন্তুষ্ট না করতে পারলে বিশ্বাধিপতিও তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন। তার প্রাত্যহিকী ইবাদত রদ করে থাকেন। মহানবী বলেছেন,
اثْنَانِ لَا تُجَاوِزُ صَلَاتُهُمَا رُءُوسَهُمَا : عَبْدٌ آبِقٌ مِنْ مَوَالِيهِ حَتَّى يَرْجِعَ إِلَيْهِمْ ، وَامْرَأَةٌ عَصَتْ زَوْجَهَا حَتَّى تَرْجِعَ
"দুই ব্যক্তির স্বলাত তাদের মাথা অতিক্রম করে না (কবুল হয় না); সেই ক্রীতদাস যে তার প্রভুর নিকট থেকে পলায়ন করেছে, সে তার নিকট ফিরে না আসা পর্যন্ত এবং যে স্ত্রী তার স্বামীর অবাধ্যাচরণ করেছে, সে তার বাধ্য না হওয়া পর্যন্ত (স্বলাত কবুল হয় না।)”৬৬৯
(ثَلاثَةٌ لا يُقبَلُ منهم صَلاةٌ وَلَا تَصْعَدُ إِلَى السَّمَاءِ وَلَا تَجَاوِزُ رُءُوسُهُم : رَجُلٌ أَمَّ قَوْماً وَهُم لَه كَارِهُونَ ، وَرَجُلٌ صَلَّى عَلَى جَنَازَةٍ وَلَمْ يُؤْمَرٍ ، وَامْرَأَةُ دَعَاهَا زَوجُهَا من اللَّيْلِ فَأَبَتْ عَلَيْهِ
"তিন ব্যক্তির স্বলাত কবুল হয় না, আকাশের দিকে উঠে না; মাথার উপরে যায় না; এমন ইমাম যার ইমামতি (অধিকাংশ) লোকে অপছন্দ করে, বিনা আদেশে যে কারো জানাযা পড়ায়, এবং রাত্রে সঙ্গমের উদ্দেশ্যে স্বামী ডাকলে যে স্ত্রী তাতে অসম্মত হয়। ৬৭০
৪. চরিত্রবতী স্ত্রী স্বামীর যৌন-আহবানে সত্বর সাড়া দেয়। যৌন-বাজারে স্বামী-স্ত্রী চার শ্রেণীর হয়ে থাকে। তার মধ্যে স্বামী গরম ও স্ত্রী ঠাণ্ডা হলেও যথাসাধ্য স্বামীকে পরিতৃপ্ত করা চরিত্রবতী স্ত্রীর আচরণ। যেহেতু স্বামীর বিছানার অধিকার একটি বড় অধিকার। শয্যাসঙ্গিনী না হয়ে স্বামীকে অসন্তুষ্ট রাখলে, বিশ্বস্বামীও অসন্তুষ্ট থাকেন। মহানবী বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا مِنْ رَجُلٍ يَدْعُو امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهَا فَتَأْبَى عَلَيْهِ إِلَّا كَانَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ سَاخِطًا عَلَيْهَا حَتَّى يَرْضَى عَنْهَا »
"সেই আল্লাহর কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! কোন স্বামী তার স্ত্রীকে নিজ বিছানার দিকে আহবান করার পর সে আসতে অস্বীকার করলে যিনি আকাশে আছেন তিনি (আল্লাহ) তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন, যে পর্যন্ত না স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যায়।”৬৭১
বিবাহের একটি মহান উদ্দেশ্য যৌনক্ষুধা নিবারণ করা। অনেক সময় স্বামীর চাহিদা বেশী থাকে, কিন্তু স্ত্রীর থাকে না। হয়তো স্বামীর অতি সহবাসের ফলে তার নিজের সীমিত চাহিদা পূরণ হয়ে যায়। অথবা গোসল ইত্যাদি অন্য কোন ওজুহাত দেখিয়ে স্বামীর অভিসারের ইঙ্গিত সে এড়িয়ে চলে। এতে স্বামীর অধিকার লংঘন হয়। কোন শারীরিক অসুবিধা না থাকলে স্ত্রীর তাতে অসম্মত হওয়া বৈধ নয়। কারণ সে যদি অকারণে সে অধিকার আদায় না ক'রে স্বামীকে রাগান্বিত রাখে, তাহলে ফিরিস্তাবর্গও তাকে অভিশাপ করেন। মহানবী বলেছেন,
(إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إلى فِراشِهِ فَأَبَتْ فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا لَعَنَتُهَا المَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ
"স্বামী যখন তার স্ত্রীকে নিজ বিছানার দিকে (সঙ্গম করতে) আহ্বান করে, তখন যদি স্ত্রী আসতে অস্বীকার করে, অতঃপর সে তার উপর রাগান্বিত অবস্থায় রাত্রি কাটায়, তবে সকাল পর্যন্ত ফিরিস্তাবর্গ তার উপর অভিশাপ করতে থাকেন।"৬৭২
(إذا باتتِ المَرْأةُ هاجِرَةً فِراشَ زَوْجِهَا لَعَنَتْهَا المَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ
"যখন স্ত্রী নিজ স্বামীর বিছানা ত্যাগ করে (অন্যত্র) রাত্রিযাপন করে, তখন ফিরিস্তাবর্গ সকাল পর্যন্ত তাকে অভিশাপ দিতে থাকেন।"
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
(لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تَرْجِعَ
"যতক্ষণ পর্যন্ত না স্বামীর বিছানায় ফিরে এসেছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ফিরিস্তাগণ তার উপর অভিশাপ করতে থাকেন।"
চরিত্রবতী স্ত্রী যেমন নিজ প্রতিপালককে সন্তুষ্ট রাখে, তেমনই সন্তুষ্ট রাখে নিজ প্রাণপতিকে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতিপালকের নফল ইবাদতের তুলনায় স্বামীকে পরিতৃপ্ত রাখার গুরুত্ব বেশি। তাই কোন স্ত্রী তার স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ব্যতীত নফল সিয়াম রাখতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
لَا يَحِلُّ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَصُومَ وَزَوْجُهَا شَاهِدٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ وَلَا تَأْذَنَ فِي بَيْتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ
"মহিলার জন্য এ হালাল নয় যে, তার স্বামী (ঘরে) উপস্থিত থাকাকালে তার বিনা অনুমতিকে সে (নফল) সিয়াম রাখে এবং তার বিনা অনুমতিতে স্বামীর ঘরে প্রবেশ করতে কাউকে অনুমতি দেয়।"৬৭৩
বলাই বাহুল্য যে, অধিকাংশ তালাক ও দ্বিতীয় বিবাহের কারণ হল স্বামীর আহ্বানে স্ত্রীর যথাসময়ে সাড়া না দেওয়া। উক্ত অধিকার পালনেই স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন মজবুত ও মধুর থাকে, নচেৎ দাম্পত্যের মধু কদুতে পরিণত হয়। সে ক্ষেত্রে দেহের ভালোবাসা দিয়েই চালাক স্ত্রী স্বামীর মনকে বন্দী রাখে।
৫. স্বামীর অভিপ্রায় ও চাহিদার খেয়াল রাখা গুণবতী স্ত্রীর কর্তব্য। স্বামী বাইরে থেকে এসে যেন অপ্রীতিকর কিছু দেখতে, শুনতে, শুঁকতে বা অনুভব করতে না পারে। পুরুষ বাইরে কর্মব্যস্ততায় জ্বলে-পুড়ে বাড়িতে এসে যদি স্ত্রীর হাসিমুখ ও দেহ-সংসারের পারিপাট্য না পেল, তাহলে তার আর সুখ কোথায়? সংসারে তার মত দুর্ভাগা ব্যক্তি আর কেউ নেই, যাকে বাইরে মেহনতে জ্বলে এসে বাড়িতে স্ত্রীর তাপেও জ্বলতে হয়।
৬. স্বামীর দ্বীন ও ইজ্জতের খেয়াল করা ওয়াজেব। বেপর্দা, টো-টো কোম্পানী হয়ে, পাড়াকুঁদুলী হয়ে, দরজা, জানালা বা ছাদ হতে উঁকি ঝুঁকি মেরে, স্বামীর অবর্তমানে কোন বেগানার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করে, অন্য পুরুষের সাথে গোপন সম্পর্ক কায়েম করে এবং তার সাথে মোবাইলে বা নেটে কথা বলে, ম্যাসেজ দিয়ে অথবা ভিডিও-চ্যাট ক'রে অথবা কোথাও গেয়ে-এসে নিজের তথা স্বামীর বদনাম করা এবং আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করা মোটেই বৈধ নয়। স্বামী-গৃহে হিফাযতের সাথে থেকে তার মন মতো চলা এক আমানত। এই আমানতের খিয়ানত স্বামীর অবর্তমানে করলে নিশ্চয়ই সে সাধ্বী, সতী ও চরিত্রবতী নারী নয়। মহান আল্লাহ বলেন,
فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ الله
"সাধ্বী নারীরা অনুগতা এবং পুরুষের অনুপস্থিতিতে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিজেদের ইজ্জত রক্ষাকারিণী। আল্লাহর হিফাযতে তারা তা হিফাযত করে।"৬৭৪
স্বামীর নিকট স্বামীর ভয়ে বা তাকে প্রদর্শন ক'রে পর্দাবিবি বা হিফাযতকারিণী সেজে তার অবর্তমানে গোপনে আল্লাহকে ভয় না ক'রে হাট-বাজার, কুটুমবাড়ি, বিয়েবাড়ি, চিত্তবিনোদন কেন্দ্র প্রভৃতি গিয়ে অথবা শ্বশুরবাড়িতে পর্দানশীন সেজে এবং বাপের বাড়িতে বেপর্দা হয়ে নিজের মন ও খেয়াল-খুশীর তাবেদারী ক'রে থাকলে সে নারী নিশ্চয় বড় ধোঁকাবাজ। প্রিয় নবী বলেন,
(ثَلاَثَةٌ لَا تَسْأَلُ عَنْهُمْ رَجُلٌ فَارَقَ الجَمَاعَةَ وعَصَى إِمَامَهُ ومات عاصياً وأمَةٌ أوْ عَبْدٌ أَبقَ مِنْ سَيِّدِهِ فَمَاتَ وامْرَأَةٌ غاب عنها زَوْجَهَا وقد كفاها مَوْنَةَ الدُّنْيا فَتَبَرَّجَتْ بَعْدَهُ فَلَا تَسْأَلُ عَنْهُمْ
"তিন ব্যক্তি সম্পর্কে কোন প্রশ্নই করো না; যে জামাআত ত্যাগ করে ইমামের অবাধ্য হয়ে মারা যায়, যে ক্রীতদাস বা দাসী প্রভু থেকে পলায়ন করে মারা যায়, এবং সেই নারী যার স্বামী অনুপস্থিত থাকলে---তার সাংসারিক সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিস বন্দোবস্ত করে দেওয়া সত্ত্বেও---তার অনুপস্থিতিতে বেপর্দায় বাইরে যায়।" ৬৭৫
৭. স্বামীর বৈয়াক্তিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিও বিশেষ খেয়াল রাখা চরিত্রবতী স্ত্রীর কর্তব্য। সুতরাং তার ব্যক্তিগত কাজ-কারবার, পড়াশোনা প্রভৃতিতে ডিস্টার্ব করা বা বাধা দেওয়া হিতাকাঙ্কিনী স্ত্রীর অভ্যাস হতে পারে না।
৮. স্বামীর ঘর সংসার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং সাজিয়ে গুছিয়ে পরিপাটি ক'রে রাখা গুণবতী স্ত্রীর কর্তব্য। স্বামীর যাবতীয় খিদমত করা, ছেলে-মেয়েদেরকে পরিষ্কার ও সভ্য করে রাখাও তার দায়িত্ব। সর্বকাজ নিজের হাতে করাই উত্তম। তবুও কাজের চাপ বেশি হলে এমন দাসী ব্যবহার করতে পারে, যা তার জন্য অথবা সংসারের আর কারো জন্য সর্বনাশ বয়ে না আনে।
যেমন চরিত্রবতী স্ত্রী কেবল স্বামীর জন্য সাজ-সজ্জা ও প্রসাধন ব্যবহার করে। স্বামীর কাছে নেড়িখেড়ি থাকা ও তার অন্যান্য আত্মীয়ের কাছে প্রসাধিকা সুন্দরী সাজার অভ্যাস চরিত্রবতী স্ত্রীর হতে পারে না।
৯. স্বামীর কৃতজ্ঞতা করা। স্বামী তার স্ত্রীকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে থাকে। যথাসাধ্য উত্তম আহার-বসনের ব্যবস্থা ক'রে থাকে। তবুও ত্রুটি স্বাভাবিক। কিন্তু সামান্য ত্রুটি দেখে সমস্ত উপকার, উপহার ও প্রীতি-ভালোবাসাকে ভুলে যাওয়া নারীর সহজাত প্রকৃতি। কিছু শিক্ষা বা শাসনের কথা বললে মনে করে, স্বামী তাকে কোনদিন ভালোবাসে না। স্বামীর অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তার মনে নিদারুণ ব্যথা দিয়ে থাকে। এটি এমন একটি কর্ম যার জন্যও মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে অধিক সংখ্যায় জাহান্নামবাসিনী হবে। মহানবী বলেন, “আমি দেখলাম, জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসিনী হল মহিলা।” সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, 'তা কীসের জন্য হে আল্লাহর রসূল?' তিনি বললেন, "তাদের কুফরীর জন্য।" তাঁরা বললেন, 'আল্লাহর সাথে কুফরী?' তিনি বললেন,
(يَكْفُرْنَ الْعَشِيرَ وَيَكْفُرْنَ الإِحْسَانَ لَوْ أَحْسَنْتَ إِلَى إِحْدَاهُنَّ الدَّهْرَ ثُمَّ رَأَتْ مِنْكَ شَيْئًا قَالَتْ مَا رَأَيْتُ مِنْكَ خَيْرًا قَط
"(না,) তারা স্বামীর কুফরী (অকৃতজ্ঞতা) ও নিমকহারামি করে। তাদের কারো প্রতি যদি সারা জীবন এহসানী কর, অতঃপর সে যদি তোমার নিকট সামান্য ত্রুটি লক্ষ্য করে, তাহলে ব'লে বসে, 'তোমার নিকট কোন মঙ্গল দেখলাম না আমি!"৬৭৬
বড় দুঃখের বিষয় যে, স্ত্রী স্বামীর নিকট থেকে যা পায়, তা কেবল নিজের প্রাপ্য ভেবেই গ্রহণ করে। এই জন্যই আধুনিক যুগের নীতি হল, 'ভালোবাসায় নো থ্যাংক, নো সোরি।' কিন্তু ইসলাম বলে, ভালোবাসার ফুল যদি কৃতজ্ঞতার শিশিরে ভিজা থাকে, তাহলে বেশি সুন্দর দেখায়। নচেৎ অবেলায় শুকিয়ে যায়। প্রিয় নবী বলেন,
(لَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَى امْرَأَةٍ لَا تَشْكُرُ لِزَوْجِهَا ، وَهِيَ لَا تَسْتَغْنِي عَنْهُ
"আল্লাহ সেই রমণীর দিকে তাকিয়েও দেখেন না (দেখবেন না) যে তার স্বামীর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না, অথচ সে স্বামীর অমুখাপেক্ষিনী নয়।”৬৭৭
যে মহিলা নিজ স্বামীর প্রতি কৃতঘ্ন, সে চরিত্রবতী নয়, সে মহান প্রতিপালকের প্রতিও কৃতজ্ঞ হতে পারে না। কারণ মহানবী বলেছেন,
مَنْ لَمْ يَشْكُرِ النَّاسَ ، لَمْ يَشْكُرِ اللَّهِ
"যে ব্যক্তি (উপকারী) মানুষের শুক্র করল না, সে আল্লাহর শুক্র করল না। ৬৭৮
স্বামীর কৃতজ্ঞতা আদায় করার জন্য তার প্রশংসা করে গুণবতী স্ত্রী। তবে তার প্রতিপক্ষে অন্য কোন পুরুষের প্রশংসা তার সম্মুখে করে না। যেহেতু পরোক্ষভাবে তাতে তাকে গালি দেওয়া হয়। আর তাতে ফল মন্দ হতে পারে।
১০. স্ত্রী হয় সংসারের রানী। স্বামীর ধন-সম্পদ সর্বংসহা হয় তার রাজত্ব এবং স্বামীর আমানতও। তাই তার যথার্থ হিফাযত করা এবং যথাস্থানে সঠিকভাবে তা ব্যয় করা গুণবতী স্ত্রীর কর্তব্য। অন্যায়ভাবে গোপনে ব্যয় করা, তার বিনা অনুমতিতে দান করা বা আত্মীয়-স্বজনকে উপঢৌকন দেওয়া আমানতের খিয়ানত। এমন স্ত্রী পুণ্যময়ী নয়; বরং খিয়ানতকারিণী। মহানবী বলেন,
(لَا تُنْفِقِ امْرَأَةٌ شَيْئاً مِنْ بَيْتِ زَوْجِهَا إِلَّا بِإِذْنِ زَوْجِهَا
"স্বামীর অনুমতি ছাড়া কোন স্ত্রী যেন তার ঘর থেকে কোন কিছু দান না করে।" বলা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! খাবারও দান করতে পারে না কি?' তিনি বললেন, "খাবার তো আমাদের সর্বোত্তম মাল।”৬৭৯
১১. স্বামীর বিনা অনুমতিতে বাইরে, মার্কেট, বিয়েবাড়ি, মড়াবাড়ি ইত্যাদি না যাওয়া পতিভক্তির পরিচয়। এমনকি মসজিদে (ইমামের পশ্চাতে মহিলা জামাআতে) স্বলাত পড়তে গেলেও স্বামীর অনুমতি চাই। ৬৮০
আর এই পরাধীনতায় আছে মুক্তির পরম স্বাদ। মাতৃক্রোড় উপেক্ষা করে ঝড়-বৃষ্টি, শীত-গ্রীষ্মে যেমন শিশু নিজেকে বিপদে ফেলে, তা-এর কোল ছেড়ে ডিম যেমন ঘোলা হয়ে যায়, সুতো ছিঁড়ে স্বাধীন হয়ে ঘুড়ি যেমন ক্ষণিক উড়ে ধ্বংস হয়ে যায়, রাডার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিমান যেমন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, ঠিক তেমনি নারীও স্বামীর এই স্নেহ-সীমা ও বন্ধনকে উল্লংঘন করে নিজের দ্বীন ও দুনিয়া বরবাদ করে।
১২. কোন বিষয়ে স্বামী রাগান্বিত হলে চরিত্রবতী স্ত্রী বিনীতা হয়ে নীরব থাকে। নচেৎ ইটের বদলে পাটকেল ছুঁড়লে আগুনে পেট্রল পড়ে। যে সোহাগ করে, তার শাসন করার অধিকার আছে। আর এ শাসন স্ত্রী ঘাড় পেতে মেনে নিতে বাধ্য। ভুল হলে ক্ষমা চাইবে। যেহেতু স্বামী বয়সে ও মর্যাদায় বড়। ক্ষমা প্রার্থনায় অপমান নয়; বরং মানুষের মান বর্ধমান হয়; ইহকালে এবং পরকালেও। তাছাড়া অহংকার ও ঔদ্ধত্যের সাথে 'বেশ করেছি, অত পারি না' ইত্যাদি বলে অনমনীয়তা প্রকাশ গুণবতী সতী নারীর ধর্ম নয়। সুতরাং স্বামীর রাগের আগুনকে অহংকার ও ঔদ্ধত্যের পেট্রল দ্বারা নয় বরং বিনয়ের পানি দ্বারা নির্বাপিত করা উচিত। প্রিয় নবী বলেন,
( وَنِسَاؤُكُمْ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ الْوَدُودُ الوَلُودُ العَؤُودُ عَلَى زَوْجِهَا الَّتِي إِذَا غَضِبَ جَاءَتْ حَتَّى تَضَعَ يَدَهَا فِي يَدِ زَوْجِهَا ، وَتَقُولُ : لَا أُذُوقُ غَيْضاً حَتَّى تَرْضَى
"তোমাদের স্ত্রীরাও জান্নাতী হবে; যে স্ত্রী অধিক প্রণয়িণী, সন্তানদাত্রী, বার- বার ভুল করে বার-বার স্বামীর নিকট আত্মসমর্পণকারিণী, যার স্বামী রাগ করলে সে তার নিকট এসে তার হাতে হাত রেখে বলে, আপনি রাজি (ঠাণ্ডা) না হওয়া পর্যন্ত আমি ঘুমাবই না।”৬৮১
স্বামীকে সন্তুষ্ট ও রাজী করবার জন্য ইসলাম এক প্রকার মিথ্যা বলাকেও স্ত্রীর জন্য বৈধ করেছে।
উম্মে কুলসুম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'আমি নবী কে কেবলমাত্র তিন অবস্থায় মিথ্যা বলার অনুমতি দিতে শুনেছি : যুদ্ধের ব্যাপারে, লোকের মধ্যে আপোস-মীমাংসা করার সময় এবং স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের (প্রেম) আলাপ-আলোচনায়। '৬৮২
'ললনার ছলনা' যদিও মন্দ বলে প্রসিদ্ধ, তবুও স্বামীর মনকে ভোলানোর জন্য, তাকে খোশ করার জন্য, তার মনকে নিজের মনোকারাগারে চিরবন্দী করে রাখার জন্য ছলনা করা এবং প্রেমের অভিনয় করা বড় ফলপ্রসূ। প্রেমের শিশমহল বড় ভঙ্গুর। সুতরাং ভাঙ্গা প্রেমের মহল বহাল রাখতে ছলনা ও প্রেমের অভিনয় যদি কাজে দেয়, তাহলে চরিত্রবতী স্ত্রীকে তা করা উচিত।
১৩. স্বামীর সংসারে তার পিতামাতা ও বোনদের সাথে সদ্ব্যবহার করা গুণবতী স্ত্রীর অন্যতম কর্তব্য। স্বামীর মা-বাপ ও বোনকে নিজের মা-বাপ ও বোন ধারণা করে সংসারের প্রত্যেক কাজ তাদের পরামর্শ নিয়ে করা, যথাসাধ্য তাদের খিদমত করা এবং তাদের (বৈধ) আদেশ-নিষেধ মেনে চলা পুণ্যময়ী সাধ্বী নারীর কর্তব্য।
১৪. নিজের এবং অনুরূপ স্বামীর সন্তান-সন্ততির লালন-পালন, তরবিয়ত ও শিক্ষা দেওয়া স্ত্রীর শিরোধার্য কর্তব্য। এর জন্য তাকে ধৈর্য, স্থৈর্য, করুণা ও স্নেহের পথ অবলম্বন করা একান্ত উচিত। বিশেষ করে স্বামীর সামনে সন্তানের উপর রাগ না ঝাড়া, গালিমন্দ, বদ্দুআ ও মারধর না করা স্ত্রীর আদবের পরিচয়। মহানবী বলেছেন,
(كُلُّكُم رَاعٍ ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ: وَالْأَمِيرُ رَاعٍ ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ ، وَالمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ زَوْجِهَا وَوَلَدِهِ ، فَكُلُّكُمْ رَاعٍ ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
“প্রতিটি মানুষই দায়িত্বশীল। সুতরাং প্রত্যেকেই অবশ্যই তার অধীনস্থদের দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। দেশের শাসক জনগণের দায়িত্বশীল। সে তার দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জবাবদিহী করবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। অতএব সে তার দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামী ও সন্তানের দায়িত্বশীলা। কাজেই সে তার দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিতা হবে। তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। অতএব প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনস্থের দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।”৬৮৩
১৫. চরিত্রবতী স্ত্রী স্বামীর মুখের উপর মুখ চালায় না, ধমক দিয়ে কথা বলে না, একটা কথা শুনে একশ'টা কথা শোনায় না, লজ্জা বা গালি দিয়ে ভর্ৎসনা করে না, অপরের সামনে কটু কথা শুনিয়ে তাকে লাঞ্ছিত করে না।
মহানবী বলেছেন, “সৌভাগ্যের স্ত্রী সেই; যাকে দেখে স্বামী মুগ্ধ হয়। সংসার ছেড়ে বাইরে গেলে স্ত্রী ও তার সম্পদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকে। আর দুর্ভাগার স্ত্রী হল সেই; যাকে দেখে স্বামীর মন তিক্ত হয়, যে স্বামীর উপর জিভ লম্বা করে (লানতান করে) এবং সংসার ছেড়ে বাইরে গেলে ঐ স্ত্রী ও তার সম্পদের ব্যাপারে সে নিশ্চিন্ত হতে পারে না।”৬৮৪
যে স্ত্রী স্বামীর উপর মুখ চালায়, সম্পদ বা আভিজাত্যের অহংকারবশতঃ স্বামীকে নিজের অযোগ্য মনে করে, বুড়ো হওয়ার আগেই তাকে 'বুড়ো' বানায়, সে স্ত্রী চরিত্রবতী নয়। সেই শ্রেণীর স্ত্রী থেকে আল্লাহর আশ্রয় কামনা করা উচিত। মহানবী তাই করতেন, তিনি বলতেন,
(اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ جَارِ السُّوءِ، وَمِنْ زَوجٍ تُشَيِّبُنِي قَبْلَ الْمَشِيبِ، وَمِنْ وَلَدٍ يَكُونُ عَلَيَّ رَبِّاً، وَمِنْ مَالٍ يَكُونُ عَلَيَّ عَذَاباً، وَمِنْ خَلِيلٍ مَاكِرٍ عَيْنُهُ تَرَانِي ، وَقَلْبُهُ يَرْعَانِي إِنْ رَأَى حَسَنَةً دَفَنَهَا، وَإِنْ رَأَى سَيِّئَةً أَذَاعَهَا)
অর্থাৎ, হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি মন্দ প্রতিবেশী থেকে, এমন স্ত্রী থেকে, যে বৃদ্ধ হওয়ার আগেই আমাকে বৃদ্ধ বানাবে, এমন সন্তান থেকে, যে আমার প্রভু হতে চাইবে, এমন মাল থেকে, যা আমার জন্য আযাব হবে, এবং এমন ধূর্ত বন্ধু থেকে, যার চোখ আমাকে দেখে এবং তার হৃদয় আমার প্রতি লক্ষ্য রাখে, অতঃপর ভাল কিছু দেখলে তা পুঁতে ফেলে এবং খারাপ কিছু দেখলে তা প্রচার করে। ৬৮৫
১৬. চরিত্রবতী স্ত্রী স্বামীর কোন রহস্য বা গোপন কথা প্রকাশ করে না; না সাংসারিক কোন কথা, আর না-ই যৌন-মিলন সংক্রান্ত কোন কথা। যেহেতু তা এক আমানত। আর আমানতে খিয়ানত করা বৈধ নয়। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا
"কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট মানের দিক থেকে সবচেয়ে জঘন্য মানের ব্যক্তি হল সে, যে স্বামী স্ত্রী-মিলন করে এবং যে স্ত্রী স্বামী-মিলন করে, অতঃপর একে অন্যের মিলন-রহস্য (অপরের নিকট) প্রচার করে।"৬৮৬
১৭. স্বামী-সংসারে যতই কষ্ট হোক, চরিত্রবতী স্ত্রী ধৈর্যধারণ করে, স্বামীর ভুলকে ক্ষমা করে এবং শরীয়ত-সম্মত কারণ ছাড়া কথায় কথায় তালাক বা বিবাহ-বিচ্ছেদ চায় না। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
أَيُّمَا امْرَأَةٍ سَأَلَتْ زَوْجَهَا الطَّلَاقَ مِنْ غَيْرِ مَا بَأْسٍ فَحَرَامٌ عَلَيْهَا رَائِحَةُ الْجَنَّةِ
"যে স্ত্রীলোক অকারণে তার স্বামীর নিকট থেকে তালাক চাইবে সে স্ত্রীলোকের জন্য জান্নাতের সুগন্ধও হারাম হয়ে যাবে।”৬৮৭
الْمُخْتَلِعَاتُ وَالْمُنْتَزِعَاتُ هُنَّ الْمُنَافِقَاتُ
নবী বলেন, "খোলা তালাক প্রার্থিনী এবং বিবাহ-বন্ধন ছিন্নকারিণীরা মুনাফিক মেয়ে।"৬৮৮

টিকাঃ
৬৬০. তাবারানী, ইবনে হিব্বান, আহমাদ প্রভৃতি, মিশকাত ৩২৫৪
৬৬১. আহমাদ, নাসাঈ, হাকেম, সিঃ সহীহাহ ১৮৩৮
৬৬২. ত্বাবারানী ১৪৭৯৫, আহমাদ ২০৬৫৩
৬৬৩. সূরা নিসা: ৩৪
৬৬৪. তিরমিযী, মিশকাত ৩২৫৫
৬৬৫. ইবনে আবী শাইবাহ, নাসাঈ, ত্বাবারানী, হাকেম, প্রভৃতি, আদাবুয যিফাফ ২৮৫পৃঃ
৬৬৬. হাকেম, ইবনে হিব্বان, ইবনে আবী শাইবাহ, সঃ জামে' ৩১৪৮
৬৬৭. ত্বাবারানী, সঃ জামে' ৫২৫৯
৬৬৮. ইবনে মাজাহ, আহমাদ, ইবনে হিব্বান
৬৬৯. ত্বাবারানী, হাকেম, সিঃ সহীহাহ ২৬৮
৬৭০. ইবনে খুযাইমা ১৫১৮, সিঃ সহীহাহ ৬৫০
৬৭১. মুসলিম ১৪৩৬
৬৭২. বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, আহমাদ, প্রভৃতি
৬৭৩. বুখারী ৫১৯৫, মুসলিম ২৪১৭নং প্রমুখ
৬৭৪. সূরা নিসা: ৩৪
৬৭৫
৬৭৬. বুখারী, মুসলিম
৬৭৭. নাসাঈ, সিঃ সহীহাহ ২৮৯
৬৭৮. আহমাদ ১১২৮০, তিরমিযী ১৯৫৫
৬৭৯. তিরমিযী, সহীহ তারগীব ৯৪৩
৬৮০. আহকামুন নিসা ১/২৭৫-২৭৬
৬৮১. ত্বাবারানী, দারাকুত্বনী, সিঃ সহীহাহ ২৮৭
৬৮২. মুসলিম ৬৭৯৯
৬৮৩. বুখারী ও মুসলিম
৬৮৪. হাকেম ২৬৮৪, সিলসিলাহ সহীহাহ ১০৪৭
৬৮৫. ত্বাবারানী, সিঃ সহীহাহ ৩১৩৭
৬৮৬. মুসলিম ৩৬১৫, আবু দাউদ ৪৮৭০
৬৮৭. আহমাদ ২২৩৭৯, আবু দাউদ ২২২৬, তিরমিযী ১১৮৭, ইবনে মাজাহ ২০৫৫, ইবনে হিব্বান, বাইহাকী ৭/৩১৬, সহীহুল জামে' ২৭০৬
৬৮৮. আহমাদ ৯৩৫৮, নাসাঈ ৩৪৬১, বাইহাকী, সিলসিলাহ সহীহাহ ৬৩২

চরিত্রবতী স্বামী-সোহাগিনী নারী স্বামীর সাথে সদ্ব্যবহার করে। যত সুন্দর চরিত্র-গুণ আছে স্বামীর সাথে প্রয়োগ করে।
১. চরিত্রবতী স্ত্রী স্বামীর আদেশ পালন করে। তার মনের বিরোধিতা করে না। সে যেমন বলে, তেমন চলে। অবশ্য বৈধ বিষয়ে, অবৈধ বিষয়ে নয়। স্বামীর অনুগতা হওয়া বেহেস্তী স্ত্রীর পরিচয়। প্রিয় নবী বলেন,
إِذَا صَلَّتِ الْمَرْأَةُ خَمْسَهَا، وَصَامَتْ شَهْرَهَا ، وَحَصَّنَتْ فَرْجَهَا، وَأَطَاعَتْ بَعْلَهَا، دَخَلَتْ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شَاءَتْ
"রমণী তার পাঁচ ওয়াক্তের স্বলাত পড়লে, রমযানের সিয়াম পালন করলে, ইজ্জতের হিফাযত করলে ও স্বামীর তাবেদারী করলে জান্নাতের যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছামত প্রবেশ করতে পারবে।”৬৬০
এমন গুণবতী হল সর্বশ্রেষ্ঠ স্ত্রী। মহানবী বলেছেন,
خَيْرُ النِّسَاءِ الَّتِي تَسُرُّهُ إِذا نَظَرَ وَتُطِيعُهُ إِذا أَمَرَ ولا تُخَالِفُهُ فِي نَفْسِها ولا مالها بِمَا يَكْرَهُ
"সর্বশ্রেষ্ঠ রমণী সেই, যার প্রতি তার স্বামী দৃকপাত করলে সে তাকে খোশ করে দেয়, কোন আদেশ করলে তা পালন করে এবং তার জীবন ও সম্পদে স্বামীর অপছন্দনীয় বিরুদ্ধাচরণ করে না। ৬৬১
তবে আনুগত্যের ক্ষেত্রে মহানবী এর এ নির্দেশ অবশ্যই মনে রাখতে হবে,
لا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ
"স্রষ্টার অবাধ্যতা করে কোন সৃষ্টির আনুগত্য নেই। "৬৬২
২. চরিত্রবতী স্ত্রী স্বামীকে যেমন ভালোবাসে, তেমনি শ্রদ্ধাও করে। যেহেতু স্ত্রীর নিকট স্বামীর মর্যাদা বিরাট। এই মর্যাদার কথা ইসলাম নিজে ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاء بِمَا فَضَّل الله بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
অর্থাৎ, পুরুষ নারীর কর্তা। কারণ, আল্লাহ তাদের এককে রের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এ জন্য যে পুরুষ (তাদের জন্য) ধন ব্যয় করে। ৬৬৩
স্বামী শুধু স্ত্রীর কর্তাই নয়, বরং সে তার সিজদাযোগ্য শ্রদ্ধেয় ও মাননীয়। তবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা যেহেতু হারাম, তাই ইসলামে তাকে সিজদা করতে আদেশ দেওয়া হয়নি। মহানবী বলেছেন,
لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا
"যদি আমি কাউকে কারো জন্য সিজদা করতে আদেশ করতাম, তাহলে নারীকে আদেশ করতাম, সে যেন তার স্বামীকে সিজদা করে।”৬৬৪
প্রিয় নবী বলেন, "স্ত্রীর জন্য স্বামী তার জান্নাত অথবা জাহান্নাম।"৬৬৫
অর্থাৎ, স্ত্রী স্বামীর অবাধ্য হলে পরকালে তার স্থান হবে জাহান্নামে। আর বাধ্য হয়ে তাকে খোশ রাখতে পারলে তার স্থান হবে জান্নাতে।
স্ত্রীর উপর স্বামীর এত বড় মর্যাদা ও অধিকার রয়েছে যে, যতই সে তা প্রাণপণ দিয়ে আদায় করার চেষ্টা করুক, পরিপূর্ণরূপে তা আদায় করতে সক্ষম নয়। 'অত পারি না' বলে যে স্ত্রীরা মুখ ঘুরায়, নাক বাঁকায় অথবা কোন ওজুহাতে বা ছলবাহানা করে স্বামীর খিদমতে ফাঁকি দেয়, তারা চরিত্রবতী স্ত্রী নয়। মহানবী বলেছেন,
مِن حَقِّ الزَّوجِ عَلَى زَوجَتِهِ إِن سَالَ دَماً وَقَيحاً وَصَدِيداً فَلَحَسَتَهُ بِلِسَانِهَا مَا أَدَّتْ حَقَّهُ
"স্ত্রীর কাছে স্বামীর এমন অধিকার আছে যে, স্ত্রী যদি স্বামীর দেহের ঘা চেঁটেও থাকে, তবুও সে তার যথার্থ হক আদায় করতে পারবে না। "৬৬৬
অন্য এক হাদীসে তিনি বলেছেন,
(فَإِنَّ الْمَرْأَةَ لَوْ تَعْلَمُ مَا حَقٌّ زَوْجِهَا ، لَمْ تَزَلْ قَائِمَةً مَا حَضَرَ غَدَاؤُهُ وَعَشَاؤُهُ
"মহিলা যদি নিজ স্বামীর হক (যথার্থরূপে) জানতো, তাহলে তার দুপুর অথবা রাতের খাবার খেয়ে শেষ না করা পর্যন্ত সে (তার পাশে) দাঁড়িয়ে থাকতো। "৬৬৭
প্রেম-ভালোবাসার মাঝেই এত বড় প্রাপ্য অধিকার স্বামীর। আধুনিকারা তা স্বীকার না করলেও সে অধিকার আদায় না করা পর্যন্ত নিজ সৃষ্টিকর্তার অধিকার আদায় করতে পারবে না কোন নারী। সে অধিকার লংঘিত হলে এবং স্বামী ক্ষমা না করলে মহান আল্লাহ স্ত্রীকে ক্ষমা করবেন না। এমন মেয়েদের দ্বারা আপন প্রতিপালকের হক আদায় হয় না। মহানবী বলেছেন,
(وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لاَ تُؤَدِّي المَرْأَةُ حَقَّ رَبِّهَا حَتَّى تُؤدِّيَ حَقَّ زَوْجِهَا كُلَّهُ حَتَّى لَوْ سَأَلَهَا نَفْسَهَا وَهِيَ عَلَى قَتَبٍ لَمْ تَمْنَعُهُ
"তাঁর শপথ যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ আছে! নারী তার প্রতিপালকের হক ততক্ষণ পর্যন্ত আদায় করতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার স্বামীর হক আদায় করেছে। সওয়ারীর পিঠে থাকলেও যদি স্বামী তার মিলন চায়, তবে সে বাধা দিতে পারবে না।"৬৬৮
৩. চরিত্রবতী স্ত্রী স্বামীকে সর্বতোভাবে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করে এবং তাকে কোন প্রকার কষ্ট দেয় না।
অনেক স্ত্রী ধনী বলে ধনের গর্বে স্বামীকে পাত্তা দেয় না। সময়ে খিদমত করে না, প্রয়োজনে মিলন দেয় না।
স্ত্রী অধিক শিক্ষিতা বলে অথবা চাকরি করে বলে স্বামীকে চাকর বানিয়ে রাখে।
স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করেছে বলে স্ত্রী তাকে 'স্বামী' না ভেবে 'আসামী' ভাবে।
নিজের ছেলেমেয়ে বড় হয়ে পায়ের তলায় মাটি হয়েছে বলে স্বামীর কোন মর্যাদা রক্ষা করে না। তার কোন অধিকার আছে বলেও মনে করে না।
স্বামী অসুস্থ অথবা যৌবনহারা হলে স্ত্রী আর তাকে গুরুত্ব দেয় না। অনেক স্ত্রী তাকে ঘৃণা করে, বর্জন করে এবং অন্য পুরুষের দিকে আকৃষ্টা হয়।
অনেক স্ত্রী নিজ ভাই, ছেলে বা জামাইয়ের সহযোগিতায় নিরীহ স্বামীকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করে!
একই বাড়িতে বসবাস ক'রে পৃথক খাওয়া-শোওয়ার কথাও শোনা যায় অনেক স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারে।
এমন স্ত্রীরা যে চরিত্রবতী স্ত্রী নয়, তা বলাই বাহুল্য।
বান্দার হক আদায় না করা পর্যন্ত আল্লাহর হক আদায় করা সম্ভব নয়। বান্দার হক বিনষ্ট করলে আল্লাহ তাঁর আদায়কৃত হক গ্রহণ করেন না। কোন ক্রীতদাস নিজ প্রভুর অবাধ্য হলে মহান প্রভুরও অবাধ্যতা হয়। কোন স্ত্রী নিজ স্বামীকে খোশ করতে না পারলে তার প্রতি মহান স্বামীও নাখোশ থাকেন।
কোন সতী পতিকে সন্তুষ্ট না করতে পারলে বিশ্বাধিপতিও তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন। তার প্রাত্যহিকী ইবাদত রদ করে থাকেন। মহানবী বলেছেন,
اثْنَانِ لَا تُجَاوِزُ صَلَاتُهُمَا رُءُوسَهُمَا : عَبْدٌ آبِقٌ مِنْ مَوَالِيهِ حَتَّى يَرْجِعَ إِلَيْهِمْ ، وَامْرَأَةٌ عَصَتْ زَوْجَهَا حَتَّى تَرْجِعَ
"দুই ব্যক্তির স্বলাত তাদের মাথা অতিক্রম করে না (কবুল হয় না); সেই ক্রীতদাস যে তার প্রভুর নিকট থেকে পলায়ন করেছে, সে তার নিকট ফিরে না আসা পর্যন্ত এবং যে স্ত্রী তার স্বামীর অবাধ্যাচরণ করেছে, সে তার বাধ্য না হওয়া পর্যন্ত (স্বলাত কবুল হয় না।)”৬৬৯
(ثَلاثَةٌ لا يُقبَلُ منهم صَلاةٌ وَلَا تَصْعَدُ إِلَى السَّمَاءِ وَلَا تَجَاوِزُ رُءُوسُهُم : رَجُلٌ أَمَّ قَوْماً وَهُم لَه كَارِهُونَ ، وَرَجُلٌ صَلَّى عَلَى جَنَازَةٍ وَلَمْ يُؤْمَرٍ ، وَامْرَأَةُ دَعَاهَا زَوجُهَا من اللَّيْلِ فَأَبَتْ عَلَيْهِ
"তিন ব্যক্তির স্বলাত কবুল হয় না, আকাশের দিকে উঠে না; মাথার উপরে যায় না; এমন ইমাম যার ইমামতি (অধিকাংশ) লোকে অপছন্দ করে, বিনা আদেশে যে কারো জানাযা পড়ায়, এবং রাত্রে সঙ্গমের উদ্দেশ্যে স্বামী ডাকলে যে স্ত্রী তাতে অসম্মত হয়। ৬৭০
৪. চরিত্রবতী স্ত্রী স্বামীর যৌন-আহবানে সত্বর সাড়া দেয়। যৌন-বাজারে স্বামী-স্ত্রী চার শ্রেণীর হয়ে থাকে। তার মধ্যে স্বামী গরম ও স্ত্রী ঠাণ্ডা হলেও যথাসাধ্য স্বামীকে পরিতৃপ্ত করা চরিত্রবতী স্ত্রীর আচরণ। যেহেতু স্বামীর বিছানার অধিকার একটি বড় অধিকার। শয্যাসঙ্গিনী না হয়ে স্বামীকে অসন্তুষ্ট রাখলে, বিশ্বস্বামীও অসন্তুষ্ট থাকেন। মহানবী বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا مِنْ رَجُلٍ يَدْعُو امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهَا فَتَأْبَى عَلَيْهِ إِلَّا كَانَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ سَاخِطًا عَلَيْهَا حَتَّى يَرْضَى عَنْهَا »
"সেই আল্লাহর কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! কোন স্বামী তার স্ত্রীকে নিজ বিছানার দিকে আহবান করার পর সে আসতে অস্বীকার করলে যিনি আকাশে আছেন তিনি (আল্লাহ) তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন, যে পর্যন্ত না স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যায়।”৬৭১
বিবাহের একটি মহান উদ্দেশ্য যৌনক্ষুধা নিবারণ করা। অনেক সময় স্বামীর চাহিদা বেশী থাকে, কিন্তু স্ত্রীর থাকে না। হয়তো স্বামীর অতি সহবাসের ফলে তার নিজের সীমিত চাহিদা পূরণ হয়ে যায়। অথবা গোসল ইত্যাদি অন্য কোন ওজুহাত দেখিয়ে স্বামীর অভিসারের ইঙ্গিত সে এড়িয়ে চলে। এতে স্বামীর অধিকার লংঘন হয়। কোন শারীরিক অসুবিধা না থাকলে স্ত্রীর তাতে অসম্মত হওয়া বৈধ নয়। কারণ সে যদি অকারণে সে অধিকার আদায় না ক'রে স্বামীকে রাগান্বিত রাখে, তাহলে ফিরিস্তাবর্গও তাকে অভিশাপ করেন। মহানবী বলেছেন,
(إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إلى فِراشِهِ فَأَبَتْ فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا لَعَنَتُهَا المَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ
"স্বামী যখন তার স্ত্রীকে নিজ বিছানার দিকে (সঙ্গম করতে) আহ্বান করে, তখন যদি স্ত্রী আসতে অস্বীকার করে, অতঃপর সে তার উপর রাগান্বিত অবস্থায় রাত্রি কাটায়, তবে সকাল পর্যন্ত ফিরিস্তাবর্গ তার উপর অভিশাপ করতে থাকেন।"৬৭২
(إذا باتتِ المَرْأةُ هاجِرَةً فِراشَ زَوْجِهَا لَعَنَتْهَا المَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ
"যখন স্ত্রী নিজ স্বামীর বিছানা ত্যাগ করে (অন্যত্র) রাত্রিযাপন করে, তখন ফিরিস্তাবর্গ সকাল পর্যন্ত তাকে অভিশাপ দিতে থাকেন।"
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
(لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تَرْجِعَ
"যতক্ষণ পর্যন্ত না স্বামীর বিছানায় ফিরে এসেছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ফিরিস্তাগণ তার উপর অভিশাপ করতে থাকেন।"
চরিত্রবতী স্ত্রী যেমন নিজ প্রতিপালককে সন্তুষ্ট রাখে, তেমনই সন্তুষ্ট রাখে নিজ প্রাণপতিকে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতিপালকের নফল ইবাদতের তুলনায় স্বামীকে পরিতৃপ্ত রাখার গুরুত্ব বেশি। তাই কোন স্ত্রী তার স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ব্যতীত নফল সিয়াম রাখতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
لَا يَحِلُّ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَصُومَ وَزَوْجُهَا شَاهِدٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ وَلَا تَأْذَنَ فِي بَيْتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ
"মহিলার জন্য এ হালাল নয় যে, তার স্বামী (ঘরে) উপস্থিত থাকাকালে তার বিনা অনুমতিকে সে (নফল) সিয়াম রাখে এবং তার বিনা অনুমতিতে স্বামীর ঘরে প্রবেশ করতে কাউকে অনুমতি দেয়।"৬৭৩
বলাই বাহুল্য যে, অধিকাংশ তালাক ও দ্বিতীয় বিবাহের কারণ হল স্বামীর আহ্বানে স্ত্রীর যথাসময়ে সাড়া না দেওয়া। উক্ত অধিকার পালনেই স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন মজবুত ও মধুর থাকে, নচেৎ দাম্পত্যের মধু কদুতে পরিণত হয়। সে ক্ষেত্রে দেহের ভালোবাসা দিয়েই চালাক স্ত্রী স্বামীর মনকে বন্দী রাখে।
৫. স্বামীর অভিপ্রায় ও চাহিদার খেয়াল রাখা গুণবতী স্ত্রীর কর্তব্য। স্বামী বাইরে থেকে এসে যেন অপ্রীতিকর কিছু দেখতে, শুনতে, শুঁকতে বা অনুভব করতে না পারে। পুরুষ বাইরে কর্মব্যস্ততায় জ্বলে-পুড়ে বাড়িতে এসে যদি স্ত্রীর হাসিমুখ ও দেহ-সংসারের পারিপাট্য না পেল, তাহলে তার আর সুখ কোথায়? সংসারে তার মত দুর্ভাগা ব্যক্তি আর কেউ নেই, যাকে বাইরে মেহনতে জ্বলে এসে বাড়িতে স্ত্রীর তাপেও জ্বলতে হয়।
৬. স্বামীর দ্বীন ও ইজ্জতের খেয়াল করা ওয়াজেব। বেপর্দা, টো-টো কোম্পানী হয়ে, পাড়াকুঁদুলী হয়ে, দরজা, জানালা বা ছাদ হতে উঁকি ঝুঁকি মেরে, স্বামীর অবর্তমানে কোন বেগানার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করে, অন্য পুরুষের সাথে গোপন সম্পর্ক কায়েম করে এবং তার সাথে মোবাইলে বা নেটে কথা বলে, ম্যাসেজ দিয়ে অথবা ভিডিও-চ্যাট ক'রে অথবা কোথাও গেয়ে-এসে নিজের তথা স্বামীর বদনাম করা এবং আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করা মোটেই বৈধ নয়। স্বামী-গৃহে হিফাযতের সাথে থেকে তার মন মতো চলা এক আমানত। এই আমানতের খিয়ানত স্বামীর অবর্তমানে করলে নিশ্চয়ই সে সাধ্বী, সতী ও চরিত্রবতী নারী নয়। মহান আল্লাহ বলেন,
فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ الله
"সাধ্বী নারীরা অনুগতা এবং পুরুষের অনুপস্থিতিতে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিজেদের ইজ্জত রক্ষাকারিণী। আল্লাহর হিফাযতে তারা তা হিফাযত করে।"৬৭৪
স্বামীর নিকট স্বামীর ভয়ে বা তাকে প্রদর্শন ক'রে পর্দাবিবি বা হিফাযতকারিণী সেজে তার অবর্তমানে গোপনে আল্লাহকে ভয় না ক'রে হাট-বাজার, কুটুমবাড়ি, বিয়েবাড়ি, চিত্তবিনোদন কেন্দ্র প্রভৃতি গিয়ে অথবা শ্বশুরবাড়িতে পর্দানশীন সেজে এবং বাপের বাড়িতে বেপর্দা হয়ে নিজের মন ও খেয়াল-খুশীর তাবেদারী ক'রে থাকলে সে নারী নিশ্চয় বড় ধোঁকাবাজ। প্রিয় নবী বলেন,
(ثَلاَثَةٌ لَا تَسْأَلُ عَنْهُمْ رَجُلٌ فَارَقَ الجَمَاعَةَ وعَصَى إِمَامَهُ ومات عاصياً وأمَةٌ أوْ عَبْدٌ أَبقَ مِنْ سَيِّدِهِ فَمَاتَ وامْرَأَةٌ غاب عنها زَوْجَهَا وقد كفاها مَوْنَةَ الدُّنْيا فَتَبَرَّجَتْ بَعْدَهُ فَلَا تَسْأَلُ عَنْهُمْ
"তিন ব্যক্তি সম্পর্কে কোন প্রশ্নই করো না; যে জামাআত ত্যাগ করে ইমামের অবাধ্য হয়ে মারা যায়, যে ক্রীতদাস বা দাসী প্রভু থেকে পলায়ন করে মারা যায়, এবং সেই নারী যার স্বামী অনুপস্থিত থাকলে---তার সাংসারিক সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিস বন্দোবস্ত করে দেওয়া সত্ত্বেও---তার অনুপস্থিতিতে বেপর্দায় বাইরে যায়।" ৬৭৫
৭. স্বামীর বৈয়াক্তিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিও বিশেষ খেয়াল রাখা চরিত্রবতী স্ত্রীর কর্তব্য। সুতরাং তার ব্যক্তিগত কাজ-কারবার, পড়াশোনা প্রভৃতিতে ডিস্টার্ব করা বা বাধা দেওয়া হিতাকাঙ্কিনী স্ত্রীর অভ্যাস হতে পারে না।
৮. স্বামীর ঘর সংসার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং সাজিয়ে গুছিয়ে পরিপাটি ক'রে রাখা গুণবতী স্ত্রীর কর্তব্য। স্বামীর যাবতীয় খিদমত করা, ছেলে-মেয়েদেরকে পরিষ্কার ও সভ্য করে রাখাও তার দায়িত্ব। সর্বকাজ নিজের হাতে করাই উত্তম। তবুও কাজের চাপ বেশি হলে এমন দাসী ব্যবহার করতে পারে, যা তার জন্য অথবা সংসারের আর কারো জন্য সর্বনাশ বয়ে না আনে।
যেমন চরিত্রবতী স্ত্রী কেবল স্বামীর জন্য সাজ-সজ্জা ও প্রসাধন ব্যবহার করে। স্বামীর কাছে নেড়িখেড়ি থাকা ও তার অন্যান্য আত্মীয়ের কাছে প্রসাধিকা সুন্দরী সাজার অভ্যাস চরিত্রবতী স্ত্রীর হতে পারে না।
৯. স্বামীর কৃতজ্ঞতা করা। স্বামী তার স্ত্রীকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে থাকে। যথাসাধ্য উত্তম আহার-বসনের ব্যবস্থা ক'রে থাকে। তবুও ত্রুটি স্বাভাবিক। কিন্তু সামান্য ত্রুটি দেখে সমস্ত উপকার, উপহার ও প্রীতি-ভালোবাসাকে ভুলে যাওয়া নারীর সহজাত প্রকৃতি। কিছু শিক্ষা বা শাসনের কথা বললে মনে করে, স্বামী তাকে কোনদিন ভালোবাসে না। স্বামীর অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তার মনে নিদারুণ ব্যথা দিয়ে থাকে। এটি এমন একটি কর্ম যার জন্যও মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে অধিক সংখ্যায় জাহান্নামবাসিনী হবে। মহানবী বলেন, “আমি দেখলাম, জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসিনী হল মহিলা।” সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, 'তা কীসের জন্য হে আল্লাহর রসূল?' তিনি বললেন, "তাদের কুফরীর জন্য।" তাঁরা বললেন, 'আল্লাহর সাথে কুফরী?' তিনি বললেন,
(يَكْفُرْنَ الْعَشِيرَ وَيَكْفُرْنَ الإِحْسَانَ لَوْ أَحْسَنْتَ إِلَى إِحْدَاهُنَّ الدَّهْرَ ثُمَّ رَأَتْ مِنْكَ شَيْئًا قَالَتْ مَا رَأَيْتُ مِنْكَ خَيْرًا قَط
"(না,) তারা স্বামীর কুফরী (অকৃতজ্ঞতা) ও নিমকহারামি করে। তাদের কারো প্রতি যদি সারা জীবন এহসানী কর, অতঃপর সে যদি তোমার নিকট সামান্য ত্রুটি লক্ষ্য করে, তাহলে ব'লে বসে, 'তোমার নিকট কোন মঙ্গল দেখলাম না আমি!"৬৭৬
বড় দুঃখের বিষয় যে, স্ত্রী স্বামীর নিকট থেকে যা পায়, তা কেবল নিজের প্রাপ্য ভেবেই গ্রহণ করে। এই জন্যই আধুনিক যুগের নীতি হল, 'ভালোবাসায় নো থ্যাংক, নো সোরি।' কিন্তু ইসলাম বলে, ভালোবাসার ফুল যদি কৃতজ্ঞতার শিশিরে ভিজা থাকে, তাহলে বেশি সুন্দর দেখায়। নচেৎ অবেলায় শুকিয়ে যায়। প্রিয় নবী বলেন,
(لَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَى امْرَأَةٍ لَا تَشْكُرُ لِزَوْجِهَا ، وَهِيَ لَا تَسْتَغْنِي عَنْهُ
"আল্লাহ সেই রমণীর দিকে তাকিয়েও দেখেন না (দেখবেন না) যে তার স্বামীর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না, অথচ সে স্বামীর অমুখাপেক্ষিনী নয়।”৬৭৭
যে মহিলা নিজ স্বামীর প্রতি কৃতঘ্ন, সে চরিত্রবতী নয়, সে মহান প্রতিপালকের প্রতিও কৃতজ্ঞ হতে পারে না। কারণ মহানবী বলেছেন,
مَنْ لَمْ يَشْكُرِ النَّاسَ ، لَمْ يَشْكُرِ اللَّهِ
"যে ব্যক্তি (উপকারী) মানুষের শুক্র করল না, সে আল্লাহর শুক্র করল না। ৬৭৮
স্বামীর কৃতজ্ঞতা আদায় করার জন্য তার প্রশংসা করে গুণবতী স্ত্রী। তবে তার প্রতিপক্ষে অন্য কোন পুরুষের প্রশংসা তার সম্মুখে করে না। যেহেতু পরোক্ষভাবে তাতে তাকে গালি দেওয়া হয়। আর তাতে ফল মন্দ হতে পারে।
১০. স্ত্রী হয় সংসারের রানী। স্বামীর ধন-সম্পদ সর্বংসহা হয় তার রাজত্ব এবং স্বামীর আমানতও। তাই তার যথার্থ হিফাযত করা এবং যথাস্থানে সঠিকভাবে তা ব্যয় করা গুণবতী স্ত্রীর কর্তব্য। অন্যায়ভাবে গোপনে ব্যয় করা, তার বিনা অনুমতিতে দান করা বা আত্মীয়-স্বজনকে উপঢৌকন দেওয়া আমানতের খিয়ানত। এমন স্ত্রী পুণ্যময়ী নয়; বরং খিয়ানতকারিণী। মহানবী বলেন,
(لَا تُنْفِقِ امْرَأَةٌ شَيْئاً مِنْ بَيْتِ زَوْجِهَا إِلَّا بِإِذْنِ زَوْجِهَا
"স্বামীর অনুমতি ছাড়া কোন স্ত্রী যেন তার ঘর থেকে কোন কিছু দান না করে।" বলা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! খাবারও দান করতে পারে না কি?' তিনি বললেন, "খাবার তো আমাদের সর্বোত্তম মাল।”৬৭৯
১১. স্বামীর বিনা অনুমতিতে বাইরে, মার্কেট, বিয়েবাড়ি, মড়াবাড়ি ইত্যাদি না যাওয়া পতিভক্তির পরিচয়। এমনকি মসজিদে (ইমামের পশ্চাতে মহিলা জামাআতে) স্বলাত পড়তে গেলেও স্বামীর অনুমতি চাই। ৬৮০
আর এই পরাধীনতায় আছে মুক্তির পরম স্বাদ। মাতৃক্রোড় উপেক্ষা করে ঝড়-বৃষ্টি, শীত-গ্রীষ্মে যেমন শিশু নিজেকে বিপদে ফেলে, তা-এর কোল ছেড়ে ডিম যেমন ঘোলা হয়ে যায়, সুতো ছিঁড়ে স্বাধীন হয়ে ঘুড়ি যেমন ক্ষণিক উড়ে ধ্বংস হয়ে যায়, রাডার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিমান যেমন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, ঠিক তেমনি নারীও স্বামীর এই স্নেহ-সীমা ও বন্ধনকে উল্লংঘন করে নিজের দ্বীন ও দুনিয়া বরবাদ করে।
১২. কোন বিষয়ে স্বামী রাগান্বিত হলে চরিত্রবতী স্ত্রী বিনীতা হয়ে নীরব থাকে। নচেৎ ইটের বদলে পাটকেল ছুঁড়লে আগুনে পেট্রল পড়ে। যে সোহাগ করে, তার শাসন করার অধিকার আছে। আর এ শাসন স্ত্রী ঘাড় পেতে মেনে নিতে বাধ্য। ভুল হলে ক্ষমা চাইবে। যেহেতু স্বামী বয়সে ও মর্যাদায় বড়। ক্ষমা প্রার্থনায় অপমান নয়; বরং মানুষের মান বর্ধমান হয়; ইহকালে এবং পরকালেও। তাছাড়া অহংকার ও ঔদ্ধত্যের সাথে 'বেশ করেছি, অত পারি না' ইত্যাদি বলে অনমনীয়তা প্রকাশ গুণবতী সতী নারীর ধর্ম নয়। সুতরাং স্বামীর রাগের আগুনকে অহংকার ও ঔদ্ধত্যের পেট্রল দ্বারা নয় বরং বিনয়ের পানি দ্বারা নির্বাপিত করা উচিত। প্রিয় নবী বলেন,
( وَنِسَاؤُكُمْ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ الْوَدُودُ الوَلُودُ العَؤُودُ عَلَى زَوْجِهَا الَّتِي إِذَا غَضِبَ جَاءَتْ حَتَّى تَضَعَ يَدَهَا فِي يَدِ زَوْجِهَا ، وَتَقُولُ : لَا أُذُوقُ غَيْضاً حَتَّى تَرْضَى
"তোমাদের স্ত্রীরাও জান্নাতী হবে; যে স্ত্রী অধিক প্রণয়িণী, সন্তানদাত্রী, বার- বার ভুল করে বার-বার স্বামীর নিকট আত্মসমর্পণকারিণী, যার স্বামী রাগ করলে সে তার নিকট এসে তার হাতে হাত রেখে বলে, আপনি রাজি (ঠাণ্ডা) না হওয়া পর্যন্ত আমি ঘুমাবই না।”৬৮১
স্বামীকে সন্তুষ্ট ও রাজী করবার জন্য ইসলাম এক প্রকার মিথ্যা বলাকেও স্ত্রীর জন্য বৈধ করেছে।
উম্মে কুলসুম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'আমি নবী কে কেবলমাত্র তিন অবস্থায় মিথ্যা বলার অনুমতি দিতে শুনেছি : যুদ্ধের ব্যাপারে, লোকের মধ্যে আপোস-মীমাংসা করার সময় এবং স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের (প্রেম) আলাপ-আলোচনায়। '৬৮২
'ললনার ছলনা' যদিও মন্দ বলে প্রসিদ্ধ, তবুও স্বামীর মনকে ভোলানোর জন্য, তাকে খোশ করার জন্য, তার মনকে নিজের মনোকারাগারে চিরবন্দী করে রাখার জন্য ছলনা করা এবং প্রেমের অভিনয় করা বড় ফলপ্রসূ। প্রেমের শিশমহল বড় ভঙ্গুর। সুতরাং ভাঙ্গা প্রেমের মহল বহাল রাখতে ছলনা ও প্রেমের অভিনয় যদি কাজে দেয়, তাহলে চরিত্রবতী স্ত্রীকে তা করা উচিত।
১৩. স্বামীর সংসারে তার পিতামাতা ও বোনদের সাথে সদ্ব্যবহার করা গুণবতী স্ত্রীর অন্যতম কর্তব্য। স্বামীর মা-বাপ ও বোনকে নিজের মা-বাপ ও বোন ধারণা করে সংসারের প্রত্যেক কাজ তাদের পরামর্শ নিয়ে করা, যথাসাধ্য তাদের খিদমত করা এবং তাদের (বৈধ) আদেশ-নিষেধ মেনে চলা পুণ্যময়ী সাধ্বী নারীর কর্তব্য।
১৪. নিজের এবং অনুরূপ স্বামীর সন্তান-সন্ততির লালন-পালন, তরবিয়ত ও শিক্ষা দেওয়া স্ত্রীর শিরোধার্য কর্তব্য। এর জন্য তাকে ধৈর্য, স্থৈর্য, করুণা ও স্নেহের পথ অবলম্বন করা একান্ত উচিত। বিশেষ করে স্বামীর সামনে সন্তানের উপর রাগ না ঝাড়া, গালিমন্দ, বদ্দুআ ও মারধর না করা স্ত্রীর আদবের পরিচয়। মহানবী বলেছেন,
(كُلُّكُم رَاعٍ ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ: وَالْأَمِيرُ رَاعٍ ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ ، وَالمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ زَوْجِهَا وَوَلَدِهِ ، فَكُلُّكُمْ رَاعٍ ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
“প্রতিটি মানুষই দায়িত্বশীল। সুতরাং প্রত্যেকেই অবশ্যই তার অধীনস্থদের দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। দেশের শাসক জনগণের দায়িত্বশীল। সে তার দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জবাবদিহী করবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। অতএব সে তার দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামী ও সন্তানের দায়িত্বশীলা। কাজেই সে তার দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিতা হবে। তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। অতএব প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনস্থের দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।”৬৮৩
১৫. চরিত্রবতী স্ত্রী স্বামীর মুখের উপর মুখ চালায় না, ধমক দিয়ে কথা বলে না, একটা কথা শুনে একশ'টা কথা শোনায় না, লজ্জা বা গালি দিয়ে ভর্ৎসনা করে না, অপরের সামনে কটু কথা শুনিয়ে তাকে লাঞ্ছিত করে না।
মহানবী বলেছেন, “সৌভাগ্যের স্ত্রী সেই; যাকে দেখে স্বামী মুগ্ধ হয়। সংসার ছেড়ে বাইরে গেলে স্ত্রী ও তার সম্পদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকে। আর দুর্ভাগার স্ত্রী হল সেই; যাকে দেখে স্বামীর মন তিক্ত হয়, যে স্বামীর উপর জিভ লম্বা করে (লানতান করে) এবং সংসার ছেড়ে বাইরে গেলে ঐ স্ত্রী ও তার সম্পদের ব্যাপারে সে নিশ্চিন্ত হতে পারে না।”৬৮৪
যে স্ত্রী স্বামীর উপর মুখ চালায়, সম্পদ বা আভিজাত্যের অহংকারবশতঃ স্বামীকে নিজের অযোগ্য মনে করে, বুড়ো হওয়ার আগেই তাকে 'বুড়ো' বানায়, সে স্ত্রী চরিত্রবতী নয়। সেই শ্রেণীর স্ত্রী থেকে আল্লাহর আশ্রয় কামনা করা উচিত। মহানবী তাই করতেন, তিনি বলতেন,
(اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ جَارِ السُّوءِ، وَمِنْ زَوجٍ تُشَيِّبُنِي قَبْلَ الْمَشِيبِ، وَمِنْ وَلَدٍ يَكُونُ عَلَيَّ رَبِّاً، وَمِنْ مَالٍ يَكُونُ عَلَيَّ عَذَاباً، وَمِنْ خَلِيلٍ مَاكِرٍ عَيْنُهُ تَرَانِي ، وَقَلْبُهُ يَرْعَانِي إِنْ رَأَى حَسَنَةً دَفَنَهَا، وَإِنْ رَأَى سَيِّئَةً أَذَاعَهَا)
অর্থাৎ, হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি মন্দ প্রতিবেশী থেকে, এমন স্ত্রী থেকে, যে বৃদ্ধ হওয়ার আগেই আমাকে বৃদ্ধ বানাবে, এমন সন্তান থেকে, যে আমার প্রভু হতে চাইবে, এমন মাল থেকে, যা আমার জন্য আযাব হবে, এবং এমন ধূর্ত বন্ধু থেকে, যার চোখ আমাকে দেখে এবং তার হৃদয় আমার প্রতি লক্ষ্য রাখে, অতঃপর ভাল কিছু দেখলে তা পুঁতে ফেলে এবং খারাপ কিছু দেখলে তা প্রচার করে। ৬৮৫
১৬. চরিত্রবতী স্ত্রী স্বামীর কোন রহস্য বা গোপন কথা প্রকাশ করে না; না সাংসারিক কোন কথা, আর না-ই যৌন-মিলন সংক্রান্ত কোন কথা। যেহেতু তা এক আমানত। আর আমানতে খিয়ানত করা বৈধ নয়। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا
"কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট মানের দিক থেকে সবচেয়ে জঘন্য মানের ব্যক্তি হল সে, যে স্বামী স্ত্রী-মিলন করে এবং যে স্ত্রী স্বামী-মিলন করে, অতঃপর একে অন্যের মিলন-রহস্য (অপরের নিকট) প্রচার করে।"৬৮৬
১৭. স্বামী-সংসারে যতই কষ্ট হোক, চরিত্রবতী স্ত্রী ধৈর্যধারণ করে, স্বামীর ভুলকে ক্ষমা করে এবং শরীয়ত-সম্মত কারণ ছাড়া কথায় কথায় তালাক বা বিবাহ-বিচ্ছেদ চায় না। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
أَيُّمَا امْرَأَةٍ سَأَلَتْ زَوْجَهَا الطَّلَاقَ مِنْ غَيْرِ مَا بَأْسٍ فَحَرَامٌ عَلَيْهَا رَائِحَةُ الْجَنَّةِ
"যে স্ত্রীলোক অকারণে তার স্বামীর নিকট থেকে তালাক চাইবে সে স্ত্রীলোকের জন্য জান্নাতের সুগন্ধও হারাম হয়ে যাবে।”৬৮৭
الْمُخْتَلِعَاتُ وَالْمُنْتَزِعَاتُ هُنَّ الْمُنَافِقَاتُ
নবী বলেন, "খোলা তালাক প্রার্থিনী এবং বিবাহ-বন্ধন ছিন্নকারিণীরা মুনাফিক মেয়ে।"৬৮৮

টিকাঃ
৬৬০. তাবারানী, ইবনে হিব্বান, আহমাদ প্রভৃতি, মিশকাত ৩২৫৪
৬৬১. আহমাদ, নাসাঈ, হাকেম, সিঃ সহীহাহ ১৮৩৮
৬৬২. ত্বাবারানী ১৪৭৯৫, আহমাদ ২০৬৫৩
৬৬৩. সূরা নিসা: ৩৪
৬৬৪. তিরমিযী, মিশকাত ৩২৫৫
৬৬৫. ইবনে আবী শাইবাহ, নাসাঈ, ত্বাবারানী, হাকেম, প্রভৃতি, আদাবুয যিফাফ ২৮৫পৃঃ
৬৬৬. হাকেম, ইবনে হিব্বان, ইবনে আবী শাইবাহ, সঃ জামে' ৩১৪৮
৬৬৭. ত্বাবারানী, সঃ জামে' ৫২৫৯
৬৬৮. ইবনে মাজাহ, আহমাদ, ইবনে হিব্বান
৬৬৯. ত্বাবারানী, হাকেম, সিঃ সহীহাহ ২৬৮
৬৭০. ইবনে খুযাইমা ১৫১৮, সিঃ সহীহাহ ৬৫০
৬৭১. মুসলিম ১৪৩৬
৬৭২. বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, আহমাদ, প্রভৃতি
৬৭৩. বুখারী ৫১৯৫, মুসলিম ২৪১৭নং প্রমুখ
৬৭৪. সূরা নিসা: ৩৪
৬৭৫
৬৭৬. বুখারী, মুসলিম
৬৭৭. নাসাঈ, সিঃ সহীহাহ ২৮৯
৬৭৮. আহমাদ ১১২৮০, তিরমিযী ১৯৫৫
৬৭৯. তিরমিযী, সহীহ তারগীব ৯৪৩
৬৮০. আহকামুন নিসা ১/২৭৫-২৭৬
৬৮১. ত্বাবারানী, দারাকুত্বনী, সিঃ সহীহাহ ২৮৭
৬৮২. মুসলিম ৬৭৯৯
৬৮৩. বুখারী ও মুসলিম
৬৮৪. হাকেম ২৬৮৪, সিলসিলাহ সহীহাহ ১০৪৭
৬৮৫. ত্বাবারানী, সিঃ সহীহাহ ৩১৩৭
৬৮৬. মুসলিম ৩৬১৫, আবু দাউদ ৪৮৭০
৬৮৭. আহমাদ ২২৩৭৯, আবু দাউদ ২২২৬, তিরমিযী ১১৮৭, ইবনে মাজাহ ২০৫৫, ইবনে হিব্বান, বাইহাকী ৭/৩১৬, সহীহুল জামে' ২৭০৬
৬৮৮. আহমাদ ৯৩৫৮, নাসাঈ ৩৪৬১, বাইহাকী, সিলসিলাহ সহীহাহ ৬৩২

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 স্ত্রীর সাথে সচ্চরিত্রতা

📄 স্ত্রীর সাথে সচ্চরিত্রতা


চরিত্রবান স্বামী স্ত্রীর প্রতি কোন কর্তব্য পালনে ত্রুটি করে না। যেহেতু যা মহান আল্লাহর নির্দেশ তা তাকে পালন করতেই হবে। সেই সাথে কিছু এমন কাজ আছে, যা করলে স্বামী-স্ত্রীর সংসার সুখময় হয়ে ওঠে। আমরা শুরু করি ফরয কাজগুলি দিয়ে।
১. স্ত্রীর মোহর আদায় দেওয়া স্বামীর জন্য আবশ্যক। যেহেতু মহান আল্লাহর নির্দেশ,
وَآتُوا النِّسَاء صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً فَإِن طِبْنَ لَكُمْ عَن شَيْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَّرِيئًا
অর্থাৎ, তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্ট মনে দিয়ে দাও, পরে তারা খুশী মনে ওর (মোহরের) কিয়দংশ ছেড়ে দিলে, তোমরা তা স্বচ্ছন্দে ভোগ কর। ৬৮৯
আর মহানবী বলেছেন,
إِنَّ أَحَقَّ الشَّرْطِ أَنْ يُوفَى بِهِ مَا اسْتَحْلَلْتُمْ بِهِ الْفُرُوجَ
"যে সকল শর্ত তোমাদের জন্য পালন করা জরুরী, তন্মধ্যে সব চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল তাই---যার দ্বারা তোমরা তোমাদের (পরস্পরের) গোপনাঙ্গ হালাল ক'রে থাক।" ৬৯০
নগদ মোহর না দিয়ে তাতে ফাঁকি দিতে চেষ্টা করা অথবা মনে মনে পরিশোধ করার নিয়ত না রাখা অথবা তা মাফ ক'রে দিতে স্ত্রীকে চাপ দেওয়া চরিত্রবান স্বামীর জন্য বৈধ নয়। দেনমোহর স্ত্রীর কাছে পরিশোধ্য ঋণ। আর ঋণ নিয়ে পরিশোধ করার নিয়ত না থাকলে কী হয় পড়ুন, মহানবী বলেছেন,
أَيُّمَا رَجُلٍ يَدَيَّنُ دَيْنًا وَهُوَ مُجْمِعُ أَنْ لَا يُوَفِّيَهُ إِيَّاهُ لَقِيَ اللَّهُ سَارِقًا
"যে ব্যক্তি ঋণ করার পর তার মনে পাকা এই সংকল্প রাখে যে, সে তা পরিশোধ করবে না, সে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে 'চোর' হয়ে সাক্ষাৎ করবে।" ৬৯১
আর দেনমোহর আদায় না ক'রে তালাক দিলে বিশাল পাপী হয় স্বামী। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ أَعْظَمَ الذُّنُوبِ عِنْدَ اللهِ رَجُلٌ تَزَوَّجَ امْرَأَةً فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ مِنْهَا طَلَّقَهَا
"আল্লাহর নিকট সব চাইতে বড় পাপিষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যে কোন মহিলাকে বিবাহ করে, অতঃপর তার নিকট থেকে মজা লুটে নিয়ে তাকে তালাক দেয় এবং তার মোহরও আত্মসাৎ করে। (দ্বিতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে কোন লোককে মজুর খাটায়, অতঃপর তার মজুরী আত্মসাৎ করে এবং (তৃতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে খামোখা পশু হত্যা করে।"৬৯২
এমন পাপিষ্ঠ স্বামী নিশ্চয়ই চরিত্রবান নয়। তাহলে সেই স্বামীর জন্য কী বলবেন, যে মোহর দেওয়ার জায়গায় নিজে গ্রহণ ক'রে থাকে? পণ বা যৌতুক নিয়ে বিয়ে ক'রে থাকে এবং অনাদায়ে বধূনির্যাতন চালায়?
২. আর্থিক অবস্থানুযায়ী স্ত্রীর ভরণ-পোষণ করা আবশ্যক। স্বামী নিজে যা খাবে, তাকে খাওয়াবে এবং যা পরিধান করবে, ঠিক সেই সমমানের লেবাস তাঁকেও পরিধান করাবে।
মুআবিয়াহ ইবনে হাইদাহ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কারো স্ত্রীর অধিকার স্বামীর উপর কতটুকু?' তিনি বললেন,
أَنْ تُطْعِمَهَا إِذَا طَعِمْتَ ، وَتَكْسُوهَا إِذَا اكْتَسَيْتَ ، وَلَا تَضْرِبَ الوَجْهَ ، وَلا تُقَبِّحُ ، وَلَا تَهْجُرُ إِلَّا فِي البَيْتِ
"তুমি খেলে তাকে খাওয়াবে এবং তুমি পরলে তাকে পরাবে। (তার) চেহারায় মারবে না, তাকে 'কুৎসিত হ' বলে বদ্দুআ দেবে না এবং তার থেকে পৃথক থাকলে বাড়ীর ভিতরেই থাকবে। ৬৯৩
এই খরচে স্বামী সওয়াবপ্রাপ্তও হবে। মহানবী বলেছেন,
إِذَا أَنْفَقَ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِهِ نَفَقَةً يَحْتَسِبُهَا فَهِيَ لَهُ صَدَقَةٌ
"সওয়াবের আশায় কোন মুসলমান যখন তার পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করে, তখন তা সাদকাহ হিসাবে গণ্য হয়।”৬৯৪
পক্ষান্তরে যে হতভাগা স্বামী নিজ স্ত্রীকে ঠিকমতো খেতে-পরতে দেয় না, সে গোনাহগার। যার কাছে সে প্রয়োজনে প্রেম ভিক্ষা করে, তাকে খেতে-পরতে দেয় না, এ আবার পাপী না হয়? মহানবী বলেছেন,
كَفَى بِالمَرْءِ إِثْمَا أَنْ يُضَيِّعَ مَنْ يَقُوتُ
"একটি মানুষের পাপী হওয়ার জন্য এটা যথেষ্ট যে, সে তাদের (অধিকার) নষ্ট করবে (অর্থাৎ, তাদের ভরণ-পোষণে কার্পণ্য করবে) যাদের জীবিকার জন্য সে দায়িত্বশীল।"৬৯৫
كَفَى بِالمَرْءِ إِثْماً أَنْ يُحْبِسَ عَمَّنْ يَمْلِكُ قُوتَهُ
"মানুষের পাপী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যার খাদ্যের মালিক, তার খাদ্য সে আটকে রাখে।"৬৯৬
আর এমন স্বামী কি চরিত্রবান হতে পারে? কক্ষনো নয়।
৩. স্ত্রীর সাথে সদ্ভাবে বসবাস করা কর্তব্য চরিত্রবান স্বামীর। স্ত্রীকে ভালোবাসার পাত্রী জ্ঞান ক'রে স্নেহ করা ও ভালোবাসা তার কর্তব্য। আর কোন কারণে তাকে ভালো না বাসতে পারলেও তার প্রতি অন্যায় ও অত্যাচার করা উচিত নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهِ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
অর্থাৎ, স্ত্রীদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন কর; তোমরা যদি তাদেরকে ঘৃণা কর, তাহলে এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকে ঘৃণা করছ। ৬৯৭
আর মহানবী বলেছেন,
لا يَفْرَكُ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقاً رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
"কোন ঈমানদার পুরুষ যেন কোন ঈমানদার নারী (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। যদি সে তার একটি আচরণে অসন্তুষ্ট হয়, তবে অন্য আচরণে সন্তুষ্ট হবে।"৬৯৮
দাম্পত্য জীবনে স্ত্রী হল ঠুনকো কাঁচের তৈরি পাত্র। খুব সাবধানে ব্যবহার করতে হয় তাকে। নচেৎ বেশি ঠুকাঠুকি করলেই ভেঙ্গে যেতে পারে।
প্রিয় নবী বলেন,
(اسْتَوْصُوا بالنِّساءِ خَيْراً فَإِنَّ المَرأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلعٍ أَعْوَجَ وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ في الضلع أعلاهُ فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمَهُ كَسَرْتَهُ وإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلُ أَعْوَجَ فَاسْتَوْصُوا بالنِّساءِ خَيْراً
"তোমরা নারীদের জন্য হিতাকাঙ্ক্ষী হও। কারণ, নারী জাতি বঙ্কিম পঞ্জরাস্থি হতে সৃষ্ট। আর তার উপরের অংশ বেশী টেরা। (সুতরাং তাদের প্রকৃতিই বঙ্কিম ও টেরা।) অতএব তুমি সোজা করতে গেলে হয়তো তা ভেঙ্গেই ফেলবে। আর নিজের অবস্থায় উপেক্ষা করলে বাঁকা থেকেই যাবে। অতএব তাদের জন্য মঙ্গলকামী হও।"৬৯৯
হ্যাঁ, সংসারের ঝামেলা কখনো কখনো অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। তবে শরীয়ত-সম্মত কারণ ছাড়া তালাক দেওয়া চরিত্রবান স্বামীর উচিত নয়। ব্যবহারে সদ্ভাব প্রকাশ ক'রে স্ত্রীর সাথে প্রেমমাখা স্বরে কথা বলা চরিত্রবান স্বামীর কর্তব্য। ভালো ভাষা প্রয়োগ না করলে দাম্পত্যে ভালোবাসার বসন্তে বৈশাখ আসে।
৪. তার সাথে হাস্য-রসিকতা করা, সব সময় পৌরুষ মেজাজ না রেখে কোন কোন সময় তার সাথে বৈধ খেলা করা, শরীরচর্চা বা ব্যায়ামাদি করা ইত্যাদিও স্বামীর কর্তব্য। প্রিয় নবী স্ত্রী আয়েশার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা ক'রে একবার হেরেছিলেন ও পরে আর একবারে তিনি জিতেছিলেন। ৭০০
তদনুরূপ স্ত্রীকে কোন বৈধ খেলা দেখতে সুযোগ দেওয়াও দূষণীয় নয়। যেহেতু এ হল সদ্ভাবে বসবাস। তবে এসব কিছু হবে একান্ত নির্জনে, পর্দা-সীমার ভিতরে।
৫. স্ত্রী ভালো খাবার তৈরী করলে, সাজগোজ করলে বা কোন ভালো কাজ করলে তার প্রশংসা করবে স্বামী। এমনকি স্ত্রীর হৃদয়কে লুটে নেওয়ার জন্য ইসলাম মিথ্যা বলাকেও বৈধ করেছে। ৭০১
তবে যে মিথ্যা তার অধিকার হরণ করে ও তাকে ধোঁকা দেয়, সে মিথ্যা নয়। উল্লেখ্য যে, স্ত্রীর প্রতিপক্ষে কোন অন্য মহিলার প্রশংসা তার সামনে করা আসলে তাকে ছোট করা। এমনটি করা কোন আদর্শবান স্বামীর উচিত নয়। যেমন উচিত নয়, স্ত্রীর রূপ-সৌন্দর্য বা সদ্গুণ নিয়ে কোন অন্য পুরুষের কাছে প্রশংসা করা। কারণ তাতে তাকে তাদের মানসপটের ছবি নির্মাণ ক'রে দেওয়া হবে, যার পরিণাম অশুভ হতে পারে।
৬. স্বামী নিজ স্ত্রীর গৃহস্থালি কর্মেও সহযোগিতা করবে। এতে স্ত্রীর মন স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রেমে আরো পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রিয় নবী ; যিনি দুজাহানের সর্দার তিনিও সংসারের কাজ করতেন। স্ত্রীদের সহায়তা করতেন, অতঃপর স্বলাতের সময় হলেই মসজিদের দিকে রওনা হতেন। ৭০২
তিনি অন্যান্য মানুষের মত একজন মানুষ ছিলেন; স্বহস্তে কাপড় পরিষ্কার করতেন, দুধ দোয়াতেন এবং নিজের খিদমত নিজেই করতেন। ৭০৩
৭. স্বামী যেমন স্ত্রীকে সুন্দরী দেখতে পছন্দ করে, তেমনি স্ত্রীও স্বামীকে সুন্দর ও সুসজ্জিত দেখতে ভালোবাসে। এটাই হল মানুষের প্রকৃতি। সুতরাং স্বামীরও উচিত স্ত্রীকে খোশ করার জন্য সাজগোজ করা। যাতে তারও নজর অন্য পুরুষের (স্বামীর কোন পরিচ্ছন্ন আত্মীয়ের) পদ্ধতি আকৃষ্ট না হয়। ইবনে আব্বাস বলেন, 'আমি আমার স্ত্রীর জন্য সাজসজ্জা করি, যেমন সে আমার জন্য সাজসজ্জা করে। '৭০৪
৮. স্ত্রীকে বিভিন্ন উপলক্ষে (যেমন ঈদ, কুরবানী প্রভৃতিতে) ছোটখাট উপহার দেওয়াও সম্ভাবে বাস করার পর্যায়ভুক্ত। এতেও স্ত্রীর হৃদয় চিরবন্দী হয় স্বামীর হৃদয় কারাগারে।
৯. স্ত্রীকে কথায় ও খরচে কষ্ট না দেওয়া স্বামীর কর্তব্য। কোনও দোষে মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া, মারধর করা শোভনীয় নয় চরিত্রবান স্বামীর জন্য।
স্ত্রীর সাথে বাস তো প্রেমিকার সাথে বাস। সর্বতোভাবে তাকে খোশ রাখা মানুষের প্রকৃতিগত স্বভাব। প্রেমিকাকে কষ্ট দেওয়া কোন মুসলিম, কোন মানুষের, বরং কোন পশুরও কাজ নয়।
চরিত্রবান পুরুষ তার ভালো স্ত্রীর কাছে ভালো হয়। আর সেই হয় পূর্ণ ঈমানদার। প্রিয় নবী বলেন,
( خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
"তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি সেই, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম। আর আমি নিজ স্ত্রীর নিকট তোমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তি। "৭০৫
(أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِكُمْ
"সবার চেয়ে পূর্ণ ঈমানদার ব্যক্তি সে, যার চরিত্র সবার চেয়ে সুন্দর এবং তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি সেই, যে তোমাদের স্ত্রীদের নিকট উত্তম।”৭০৬
১০. তাকে সর্বতোভাবে হিফাযতে রাখার চেষ্টা করবে চরিত্রবান স্বামী। বিপদ-আপদ থেকে তাকে রক্ষা করবে। স্ত্রীকে রক্ষা করতে গিয়ে যদি স্বামী শত্রুর হাতে মারা যায়, তবে সে শহীদের মর্যাদা লাভ করবে। মহানবী বলেন,
(مَنْ قُتِلَ دُونَ مَالِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ ، وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دَمِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ ، وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دِينِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ ، وَمَنْ قُتِلَ دُونَ أَهْلِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ
"যে ব্যক্তি তার মাল-ধন রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সে শহীদ। যে ব্যক্তি নিজ রক্ত (প্রাণ) রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সে শহীদ। যে তার দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সে শহীদ এবং যে তার পরিবার রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সেও শহীদ।"৭০৭
অনুরূপ স্ত্রীকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করাও তার এক বড় দায়িত্ব। তাকে দ্বীন, আক্বীদা, পবিত্রতা, ইবাদত, হারাম, হালাল, অধিকার ও ব্যবহার প্রভৃতি শিক্ষা দিয়ে সৎকাজ করতে আদেশ ও অসৎকাজে বাধা দিয়ে আল্লাহর আযাব থেকে রেহাই দেবে স্বামী। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজ পরিবারকে জাহান্নام থেকে বাঁচাও; যার ইন্ধন মানুষ ও পাথর --।"৭০৮
১১. স্ত্রীকে সুশিক্ষা দেওয়া, ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করা ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া স্বামীর কর্তব্য। সে অনুমতি চাইলে তাকে মসজিদে যেতে বাধা না দেওয়া উচিত চরিত্রবান পুরুষের। যেহেতু সেখানেও সুশিক্ষা লাভ করার সুযোগ আছে। মহানবী বলেছেন,
لا تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللهِ مَسَاجِدَ اللهِ وَلَكِنْ لِيَخْرُجْنَ وَهُنَّ تَفِلاَتٌ
"আল্লাহর বান্দীদেরকে মসজিদে আসতে বারণ করো না, তবে তারা যেন খোশবু ব্যবহার না ক'রে সাদাসিধাভাবে আসে।”৭০৯
১২. স্ত্রীর ধর্ম, দেহ, যৌবন ও মর্যাদায় ঈর্ষাবান হওয়া এবং এ সবে কোন প্রকার কলঙ্ক লাগতে না দেওয়া স্বামীর উপর তার এক অধিকার। সুতরাং স্ত্রী এক উত্তম সংরক্ষণীয় ও হিফাজতের জিনিস। লোকের মুখে-মুখে, পরপুরুষদের চোখে-চোখে ও যুবকদের মনে- মনে বিচরণ করতে না দেওয়া; যাকে দেখা দেওয়া তার স্ত্রীর পক্ষে হারাম, তাকে সাধারণ অনুমতি দিয়ে বাড়ি আসতে-যেতে না দেওয়া সুপুরুষের কর্ম। মহানবী বলেছেন,
(ثلاثة لا يَنظُرُ الله إِلَيْهِمْ يَوْمَ القِيامَةِ العاقِ والمَرْأَةُ المُتَرَجُلَةِ المُتَشَبِّهَةُ بالرجال والديوث
"তিন ব্যক্তির দিকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকিয়ে দেখবেন না; পিতা- মাতার অবাধ্য সন্তান, পুরুষের বেশধারী মহিলা এবং মেড়া (স্ত্রী-কন্যার পর্দাহীনতা ও নোংরামীর ব্যাপারে ঈর্ষাহীন) পুরুষ।"৭১০
(ثلاثة لا يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ العاقُ لِوالِدَيْهِ وَالدَّيُوتُ وَرَجِلَةُ النِّسَاءِ
"তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, ভেড়া পুরুষ এবং পুরুষের বেশধারী মহিলা। "৭১১
১৩. গুণধর স্বামী নিজ স্ত্রীর কোন রহস্য বা গোপন কথা অপরের কাছে প্রকাশ করে না। যেমন স্ত্রীর রূপ-যৌবন ও তার সংসর্গে যৌনসুখের কথাও অন্য পুরুষের কাছে উল্লেখ ক'রে তৃপ্তি ও মজা নেয় না। যেহেতু তা ঈর্ষাহীন পুরুষদের অভ্যাস।
১৪. স্ত্রীর যৌন-আহবানে সত্বর সাড়া দেওয়া উচিত চরিত্রবান স্বামীর। নারীর মন ও যৌবন ধীর ও শান্ত প্রকৃতির। যৌন ব্যাপারে পুরুষের মতো তৎপর নয়। কিন্তু ভাগ্যক্রমে অনেক স্বামী এ বাজারে গরম হয়, স্ত্রী হয় ঠাণ্ডা। অনেক স্বামী ঠাণ্ডা হয়, স্ত্রী হয় গরম। তবুও স্ত্রী শান্ত থাকে। পুরুষ ধৈর্য রাখতে পারে না, স্ত্রী পারে। কিন্তু স্বামী ঠাণ্ডা প্রকৃতির হলে, পরিশ্রমী হলে অথবা বৈরাগ্য-সাধনে সওয়াব আছে মনে করলে স্ত্রীর অবস্থা বিধবার মতো হয়।
পরহেযগার সাহেব অধিকারীর অধিকার নষ্ট করে। সে সওয়াবের চিন্তায় থাকে, কিন্তু সে জানে না যে, স্ত্রীর পরশেও সওয়াব আছে। সে মা-কে প্রাধান্য দেয়, কিন্তু জানে না যে, একজনের হক ছিনিয়ে অপরকে দান করলে চুরিকৃত টাকা দান করা হয়। আল্লাহ, দ্বীন, মা-বাপ, স্ত্রী, সন্তান, বন্ধুবান্ধব, মেহমান প্রভৃতি প্রত্যেকের নিজ নিজ হক আছে, আর যথার্থভাবে প্রত্যেকের হক আদায় করতে হয়। একজনের ভাগ কেটে অন্যকে দিলে অন্যায় হয়।
(إِنَّ لِرَبِّكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا فَأَعْطِ كُلَّ ذِي حَقٌّ حَقَّهُ
'নিশ্চয় তোমার উপর তোমার প্রভুর অধিকার রয়েছে। তোমার প্রতি তোমার আত্মারও অধিকার আছে এবং তোমার প্রতি তোমার পরিবারেরও অধিকার রয়েছে। অতএব তুমি প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার প্রদান কর। '৭১২
স্ত্রীর রূপ-যৌবনের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে সওয়াবের আশা করে অনেক হতভাগ্য পুরুষ? অথচ তাতেও যে সওয়াব আছে, তা হয়তো জানে না অথবা মানে না সে। মহানবী বলেছেন,
أَوَلَيْسَ قَدْ جَعَلَ اللهُ لَكُمْ مَا تَصَدَّقُونَ بِهِ : إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلَّ تَكْبِيرَةٍ صَدَقَةً، وَكُلِّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلِّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةً ، وَأَمْرُ بِالمَعْرُوفِ صَدَقَةٌ ، وَنَهْي عَنِ الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ، وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ
"আল্লাহ কি তোমাদের জন্য সাদকাহ করার মত জিনিস দান করেননি? নিঃসন্দেহে প্রত্যেক তাসবীহ সাদকাহ, প্রত্যেক তাকবীর সাদকাহ, প্রত্যেক তাহলীল সাদকাহ, ভাল কাজের নির্দেশ দেওয়া সাদকাহ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা সাদকাহ এবং তোমাদের স্ত্রী-মিলন করাও সাদকাহ।”
সাহাবাগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ স্ত্রী-মিলন ক'রে নিজের যৌনক্ষুধা নিবারণ করে, তবে এতেও কি তার পুণ্য হবে?' তিনি বললেন,
أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا في حَرامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ وِزْرٌ ؟ فكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الحَلالِ كَانَ لَهُ أَجْرٌ
"কী রায় তোমাদের, যদি কেউ অবৈধভাবে যৌন-মিলন করে, তাহলে কি তার পাপ হবে? (নিশ্চয় হবে।) অনুরূপ সে যদি বৈধভাবে (স্ত্রী-মিলন করে) নিজের কামক্ষুধা নিবারণ করে, তাহলে তাতে তার পুণ্য হবে। "৭১৩
স্ত্রীর প্রতি উদাসীন হলে সে পরকীয় প্রেমে ফেঁসে যেতে পারে। আর তাতে পাপ হয় স্বামীর। যেমন তার সম্মতি ছাড়া বাড়ি ছেড়ে বাইরে বা বিদেশে থাকা অবস্থায় সে পাপ করলেও স্বামীর পাপ হবে।
১৫. একাধিক স্ত্রী হলে মনের ভালোবাসাকে ভাগ ক'রে দিতে না পারলেও দেহের পরশকে ভাগ ক'রে দিতে হবে। তা না পারলে আল্লাহর রসূল বলেছেন,
مَنْ كَانَت لَهُ امْرَأَتَانِ ، فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا جَاءَ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَشِقُه مَائِل "
"যে ব্যক্তির দু'টি স্ত্রী আছে, কিন্তু সে তন্মধ্যে একটির দিকে ঝুঁকে যায়, এরূপ ব্যক্তি কিয়ামতের দিন তার অর্ধদেহ ধসা অবস্থায় উপস্থিত হবে। "৭১৪
১৬. ধনলোভী স্বামীর স্ত্রীধনে লোভ থাকে। ফলে তার পৃথক ধন-সম্পত্তি থাকলে অথবা চাকরির বেতন থাকলে তা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। অনেকে সে ধন হাতে করে অসহায় স্ত্রীর খাস অধিকার নষ্ট করে। অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)। আর নিজেদেরকে হত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। ৭১৫
অতএব অনুমতি ছাড়া তার অর্থ ব্যয় করা অথবা সংসারে নিজে ব্যয় করতে কার্পণ্য ক'রে স্ত্রীকে ব্যয় করতে বাধ্য করা চরিত্রবান স্বামীর কাজ হতে পারে না।
১৭. ভুল নিয়েই মানুষের জীবন। কিন্তু সে ভুলের সংশোধন হওয়া প্রয়োজন। ভুলের মাসুলের জায়গায় যদি ক্ষমা হয়, তাহলেই সংসার সুখময় হয়ে ওঠে। সুতরাং মহান আল্লাহর এই বাণী প্রত্যেক স্বামীর মনে রাখা উচিত; তিনি বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ وَإِن تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (١٤)
"হে মুমিনগণ! নিশ্চয় তোমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের (পার্থিব ও পারলৌকিক বিষয়ের) শত্রু। অতএব তাদের ব্যাপারে তোমরা সতর্ক থেকো। অবশ্য (দ্বীনী বিষয়ে অন্যায় থেকে তওবা করলে ও পার্থিব বিষয়ক অন্যায়ে) তোমরা যদি ওদেরকে মার্জনা কর, ওদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা কর এবং ওদেরকে ক্ষমা করে দাও তাহলে জেনে রাখ যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"৭১৬
স্ত্রীর ছোটখাট ভুলে ধৈর্যধারণ করা চরিত্রবান আদর্শ স্বামীর কর্তব্য। ভালোবাসা কুরবানী চায়, কুরবানী দিতে না পারলে ভালোবাসা অনির্বাণ থাকে না।

টিকাঃ
৬৮৯. সূরা নিসা: ৪
৬৯০. বুখারী ২৭২১, ৫১৫১, মুসলিম ৩৫৩৭, মিশকাত ৩১৪৩
৬৯১. ইবনে মাজাহ ২৪১০
৬৯২. হাকেম ২৭৪৩, বাইহাকী ১৪৭৮১, সহীহুল জামে' ১৫৬৭
৬৯৩. আহমাদ ২০০৮৯, আবু দাউদ ২১৪২
৬৯৪. বুখারী ৫৫, মুসলিম ২৩৬৮
৬৯৫. আহমাদ, আবু দাউদ ১৬৯২, হাকেম, বাইহাকী, সহীহুল জামে' ৪৪৮১
৬৯৬. মুসলিম ২৩৫৯
৬৯৭. সূরা নিসা: ১৯
৬৯৮. মুসলিম ১৪৬৯
৬৯৯. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৩২৩৮
৭০০. আহমাদ ২৬২৭৭, আবু দাউদ ২৫৮০, নাসাঈ প্রমুখ
৭০১. বুখারী, মুসলিম, সিঃ সহীহাহ ৫৪৫
৭০২. বুখারী, তিরমিযী, আদাবুয যিফাফ ২৯০পৃ
৭০৩. সিঃ সহীহাহ ৬৭০, আদাবুয যিফাফ ২৯১পৃঃ
৭০৪. বাইহাক্বী ১৪৫০৫, ইবনে আবী শাইবা ১৯২৬৩
৭০৫. তিরমিযী ৩৮৯৫, ইবনে মাজাহ ১৯৭৭, তাবারানী, ইবনে হিব্বান, সঃ জামে' ৩৩১৪
৭০৬. আহমাদ ১০১০৬, তিরমিযী ১১৬২, ইবনে হিব্বان, সহীহুল জামে' ১২৩২
৭০৭. আহমাদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ, মিশকাত ৩৫২৯
৭০৮. তাহরীম: ৬
৭০৯
৭১০. আহমাদ, নাসাঈ ২৫৬১
৭১১. নাসাঈ ২১৫৫৫, বাযযার, হাকেম ১/৭২, সহীহুল জামে' ৩০৬৩
৭১২. বুখারী ১৯৬৮
৭১৩. মুসলিম ২৩৭৬
৭১৪. আহমাদ ২/৩৪৭, আসহাবে সুনান, হাকেম ২/১৮৬, ইবনে হিব্বান ৪১৯৪
৭১৫. সূরা নিসা: ২৯
৭১৬. সূরা তাগাবুন ১৪

চরিত্রবান স্বামী স্ত্রীর প্রতি কোন কর্তব্য পালনে ত্রুটি করে না। যেহেতু যা মহান আল্লাহর নির্দেশ তা তাকে পালন করতেই হবে। সেই সাথে কিছু এমন কাজ আছে, যা করলে স্বামী-স্ত্রীর সংসার সুখময় হয়ে ওঠে। আমরা শুরু করি ফরয কাজগুলি দিয়ে।
১. স্ত্রীর মোহর আদায় দেওয়া স্বামীর জন্য আবশ্যক। যেহেতু মহান আল্লাহর নির্দেশ,
وَآتُوا النِّسَاء صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً فَإِن طِبْنَ لَكُمْ عَن شَيْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَّرِيئًا
অর্থাৎ, তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্ট মনে দিয়ে দাও, পরে তারা খুশী মনে ওর (মোহরের) কিয়দংশ ছেড়ে দিলে, তোমরা তা স্বচ্ছন্দে ভোগ কর। ৬৮৯
আর মহানবী বলেছেন,
إِنَّ أَحَقَّ الشَّرْطِ أَنْ يُوفَى بِهِ مَا اسْتَحْلَلْتُمْ بِهِ الْفُرُوجَ
"যে সকল শর্ত তোমাদের জন্য পালন করা জরুরী, তন্মধ্যে সব চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল তাই---যার দ্বারা তোমরা তোমাদের (পরস্পরের) গোপনাঙ্গ হালাল ক'রে থাক।" ৬৯০
নগদ মোহর না দিয়ে তাতে ফাঁকি দিতে চেষ্টা করা অথবা মনে মনে পরিশোধ করার নিয়ত না রাখা অথবা তা মাফ ক'রে দিতে স্ত্রীকে চাপ দেওয়া চরিত্রবান স্বামীর জন্য বৈধ নয়। দেনমোহর স্ত্রীর কাছে পরিশোধ্য ঋণ। আর ঋণ নিয়ে পরিশোধ করার নিয়ত না থাকলে কী হয় পড়ুন, মহানবী বলেছেন,
أَيُّمَا رَجُلٍ يَدَيَّنُ دَيْنًا وَهُوَ مُجْمِعُ أَنْ لَا يُوَفِّيَهُ إِيَّاهُ لَقِيَ اللَّهُ سَارِقًا
"যে ব্যক্তি ঋণ করার পর তার মনে পাকা এই সংকল্প রাখে যে, সে তা পরিশোধ করবে না, সে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে 'চোর' হয়ে সাক্ষাৎ করবে।" ৬৯১
আর দেনমোহর আদায় না ক'রে তালাক দিলে বিশাল পাপী হয় স্বামী। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ أَعْظَمَ الذُّنُوبِ عِنْدَ اللهِ رَجُلٌ تَزَوَّجَ امْرَأَةً فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ مِنْهَا طَلَّقَهَا
"আল্লাহর নিকট সব চাইতে বড় পাপিষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যে কোন মহিলাকে বিবাহ করে, অতঃপর তার নিকট থেকে মজা লুটে নিয়ে তাকে তালাক দেয় এবং তার মোহরও আত্মসাৎ করে। (দ্বিতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে কোন লোককে মজুর খাটায়, অতঃপর তার মজুরী আত্মসাৎ করে এবং (তৃতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে খামোখা পশু হত্যা করে।"৬৯২
এমন পাপিষ্ঠ স্বামী নিশ্চয়ই চরিত্রবান নয়। তাহলে সেই স্বামীর জন্য কী বলবেন, যে মোহর দেওয়ার জায়গায় নিজে গ্রহণ ক'রে থাকে? পণ বা যৌতুক নিয়ে বিয়ে ক'রে থাকে এবং অনাদায়ে বধূনির্যাতন চালায়?
২. আর্থিক অবস্থানুযায়ী স্ত্রীর ভরণ-পোষণ করা আবশ্যক। স্বামী নিজে যা খাবে, তাকে খাওয়াবে এবং যা পরিধান করবে, ঠিক সেই সমমানের লেবাস তাঁকেও পরিধান করাবে।
মুআবিয়াহ ইবনে হাইদাহ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কারো স্ত্রীর অধিকার স্বামীর উপর কতটুকু?' তিনি বললেন,
أَنْ تُطْعِمَهَا إِذَا طَعِمْتَ ، وَتَكْسُوهَا إِذَا اكْتَسَيْتَ ، وَلَا تَضْرِبَ الوَجْهَ ، وَلا تُقَبِّحُ ، وَلَا تَهْجُرُ إِلَّا فِي البَيْتِ
"তুমি খেলে তাকে খাওয়াবে এবং তুমি পরলে তাকে পরাবে। (তার) চেহারায় মারবে না, তাকে 'কুৎসিত হ' বলে বদ্দুআ দেবে না এবং তার থেকে পৃথক থাকলে বাড়ীর ভিতরেই থাকবে। ৬৯৩
এই খরচে স্বামী সওয়াবপ্রাপ্তও হবে। মহানবী বলেছেন,
إِذَا أَنْفَقَ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِهِ نَفَقَةً يَحْتَسِبُهَا فَهِيَ لَهُ صَدَقَةٌ
"সওয়াবের আশায় কোন মুসলমান যখন তার পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করে, তখন তা সাদকাহ হিসাবে গণ্য হয়।”৬৯৪
পক্ষান্তরে যে হতভাগা স্বামী নিজ স্ত্রীকে ঠিকমতো খেতে-পরতে দেয় না, সে গোনাহগার। যার কাছে সে প্রয়োজনে প্রেম ভিক্ষা করে, তাকে খেতে-পরতে দেয় না, এ আবার পাপী না হয়? মহানবী বলেছেন,
كَفَى بِالمَرْءِ إِثْمَا أَنْ يُضَيِّعَ مَنْ يَقُوتُ
"একটি মানুষের পাপী হওয়ার জন্য এটা যথেষ্ট যে, সে তাদের (অধিকার) নষ্ট করবে (অর্থাৎ, তাদের ভরণ-পোষণে কার্পণ্য করবে) যাদের জীবিকার জন্য সে দায়িত্বশীল।"৬৯৫
كَفَى بِالمَرْءِ إِثْماً أَنْ يُحْبِسَ عَمَّنْ يَمْلِكُ قُوتَهُ
"মানুষের পাপী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যার খাদ্যের মালিক, তার খাদ্য সে আটকে রাখে।"৬৯৬
আর এমন স্বামী কি চরিত্রবান হতে পারে? কক্ষনো নয়।
৩. স্ত্রীর সাথে সদ্ভাবে বসবাস করা কর্তব্য চরিত্রবান স্বামীর। স্ত্রীকে ভালোবাসার পাত্রী জ্ঞান ক'রে স্নেহ করা ও ভালোবাসা তার কর্তব্য। আর কোন কারণে তাকে ভালো না বাসতে পারলেও তার প্রতি অন্যায় ও অত্যাচার করা উচিত নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهِ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
অর্থাৎ, স্ত্রীদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন কর; তোমরা যদি তাদেরকে ঘৃণা কর, তাহলে এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকে ঘৃণা করছ। ৬৯৭
আর মহানবী বলেছেন,
لا يَفْرَكُ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقاً رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
"কোন ঈমানদার পুরুষ যেন কোন ঈমানদার নারী (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। যদি সে তার একটি আচরণে অসন্তুষ্ট হয়, তবে অন্য আচরণে সন্তুষ্ট হবে।"৬৯৮
দাম্পত্য জীবনে স্ত্রী হল ঠুনকো কাঁচের তৈরি পাত্র। খুব সাবধানে ব্যবহার করতে হয় তাকে। নচেৎ বেশি ঠুকাঠুকি করলেই ভেঙ্গে যেতে পারে।
প্রিয় নবী বলেন,
(اسْتَوْصُوا بالنِّساءِ خَيْراً فَإِنَّ المَرأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلعٍ أَعْوَجَ وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ في الضلع أعلاهُ فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمَهُ كَسَرْتَهُ وإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلُ أَعْوَجَ فَاسْتَوْصُوا بالنِّساءِ خَيْراً
"তোমরা নারীদের জন্য হিতাকাঙ্ক্ষী হও। কারণ, নারী জাতি বঙ্কিম পঞ্জরাস্থি হতে সৃষ্ট। আর তার উপরের অংশ বেশী টেরা। (সুতরাং তাদের প্রকৃতিই বঙ্কিম ও টেরা।) অতএব তুমি সোজা করতে গেলে হয়তো তা ভেঙ্গেই ফেলবে। আর নিজের অবস্থায় উপেক্ষা করলে বাঁকা থেকেই যাবে। অতএব তাদের জন্য মঙ্গলকামী হও।"৬৯৯
হ্যাঁ, সংসারের ঝামেলা কখনো কখনো অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। তবে শরীয়ত-সম্মত কারণ ছাড়া তালাক দেওয়া চরিত্রবান স্বামীর উচিত নয়। ব্যবহারে সদ্ভাব প্রকাশ ক'রে স্ত্রীর সাথে প্রেমমাখা স্বরে কথা বলা চরিত্রবান স্বামীর কর্তব্য। ভালো ভাষা প্রয়োগ না করলে দাম্পত্যে ভালোবাসার বসন্তে বৈশাখ আসে।
৪. তার সাথে হাস্য-রসিকতা করা, সব সময় পৌরুষ মেজাজ না রেখে কোন কোন সময় তার সাথে বৈধ খেলা করা, শরীরচর্চা বা ব্যায়ামাদি করা ইত্যাদিও স্বামীর কর্তব্য। প্রিয় নবী স্ত্রী আয়েশার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা ক'রে একবার হেরেছিলেন ও পরে আর একবারে তিনি জিতেছিলেন। ৭০০
তদনুরূপ স্ত্রীকে কোন বৈধ খেলা দেখতে সুযোগ দেওয়াও দূষণীয় নয়। যেহেতু এ হল সদ্ভাবে বসবাস। তবে এসব কিছু হবে একান্ত নির্জনে, পর্দা-সীমার ভিতরে।
৫. স্ত্রী ভালো খাবার তৈরী করলে, সাজগোজ করলে বা কোন ভালো কাজ করলে তার প্রশংসা করবে স্বামী। এমনকি স্ত্রীর হৃদয়কে লুটে নেওয়ার জন্য ইসলাম মিথ্যা বলাকেও বৈধ করেছে। ৭০১
তবে যে মিথ্যা তার অধিকার হরণ করে ও তাকে ধোঁকা দেয়, সে মিথ্যা নয়। উল্লেখ্য যে, স্ত্রীর প্রতিপক্ষে কোন অন্য মহিলার প্রশংসা তার সামনে করা আসলে তাকে ছোট করা। এমনটি করা কোন আদর্শবান স্বামীর উচিত নয়। যেমন উচিত নয়, স্ত্রীর রূপ-সৌন্দর্য বা সদ্গুণ নিয়ে কোন অন্য পুরুষের কাছে প্রশংসা করা। কারণ তাতে তাকে তাদের মানসপটের ছবি নির্মাণ ক'রে দেওয়া হবে, যার পরিণাম অশুভ হতে পারে।
৬. স্বামী নিজ স্ত্রীর গৃহস্থালি কর্মেও সহযোগিতা করবে। এতে স্ত্রীর মন স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রেমে আরো পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রিয় নবী ; যিনি দুজাহানের সর্দার তিনিও সংসারের কাজ করতেন। স্ত্রীদের সহায়তা করতেন, অতঃপর স্বলাতের সময় হলেই মসজিদের দিকে রওনা হতেন। ৭০২
তিনি অন্যান্য মানুষের মত একজন মানুষ ছিলেন; স্বহস্তে কাপড় পরিষ্কার করতেন, দুধ দোয়াতেন এবং নিজের খিদমত নিজেই করতেন। ৭০৩
৭. স্বামী যেমন স্ত্রীকে সুন্দরী দেখতে পছন্দ করে, তেমনি স্ত্রীও স্বামীকে সুন্দর ও সুসজ্জিত দেখতে ভালোবাসে। এটাই হল মানুষের প্রকৃতি। সুতরাং স্বামীরও উচিত স্ত্রীকে খোশ করার জন্য সাজগোজ করা। যাতে তারও নজর অন্য পুরুষের (স্বামীর কোন পরিচ্ছন্ন আত্মীয়ের) পদ্ধতি আকৃষ্ট না হয়। ইবনে আব্বাস বলেন, 'আমি আমার স্ত্রীর জন্য সাজসজ্জা করি, যেমন সে আমার জন্য সাজসজ্জা করে। '৭০৪
৮. স্ত্রীকে বিভিন্ন উপলক্ষে (যেমন ঈদ, কুরবানী প্রভৃতিতে) ছোটখাট উপহার দেওয়াও সম্ভাবে বাস করার পর্যায়ভুক্ত। এতেও স্ত্রীর হৃদয় চিরবন্দী হয় স্বামীর হৃদয় কারাগারে।
৯. স্ত্রীকে কথায় ও খরচে কষ্ট না দেওয়া স্বামীর কর্তব্য। কোনও দোষে মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া, মারধর করা শোভনীয় নয় চরিত্রবান স্বামীর জন্য।
স্ত্রীর সাথে বাস তো প্রেমিকার সাথে বাস। সর্বতোভাবে তাকে খোশ রাখা মানুষের প্রকৃতিগত স্বভাব। প্রেমিকাকে কষ্ট দেওয়া কোন মুসলিম, কোন মানুষের, বরং কোন পশুরও কাজ নয়।
চরিত্রবান পুরুষ তার ভালো স্ত্রীর কাছে ভালো হয়। আর সেই হয় পূর্ণ ঈমানদার। প্রিয় নবী বলেন,
( خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
"তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি সেই, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম। আর আমি নিজ স্ত্রীর নিকট তোমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তি। "৭০৫
(أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِكُمْ
"সবার চেয়ে পূর্ণ ঈমানদার ব্যক্তি সে, যার চরিত্র সবার চেয়ে সুন্দর এবং তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি সেই, যে তোমাদের স্ত্রীদের নিকট উত্তম।”৭০৬
১০. তাকে সর্বতোভাবে হিফাযতে রাখার চেষ্টা করবে চরিত্রবান স্বামী। বিপদ-আপদ থেকে তাকে রক্ষা করবে। স্ত্রীকে রক্ষা করতে গিয়ে যদি স্বামী শত্রুর হাতে মারা যায়, তবে সে শহীদের মর্যাদা লাভ করবে। মহানবী বলেন,
(مَنْ قُتِلَ دُونَ مَالِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ ، وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دَمِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ ، وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دِينِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ ، وَمَنْ قُتِلَ دُونَ أَهْلِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ
"যে ব্যক্তি তার মাল-ধন রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সে শহীদ। যে ব্যক্তি নিজ রক্ত (প্রাণ) রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সে শহীদ। যে তার দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সে শহীদ এবং যে তার পরিবার রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়, সেও শহীদ।"৭০৭
অনুরূপ স্ত্রীকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করাও তার এক বড় দায়িত্ব। তাকে দ্বীন, আক্বীদা, পবিত্রতা, ইবাদত, হারাম, হালাল, অধিকার ও ব্যবহার প্রভৃতি শিক্ষা দিয়ে সৎকাজ করতে আদেশ ও অসৎকাজে বাধা দিয়ে আল্লাহর আযাব থেকে রেহাই দেবে স্বামী। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজ পরিবারকে জাহান্নام থেকে বাঁচাও; যার ইন্ধন মানুষ ও পাথর --।"৭০৮
১১. স্ত্রীকে সুশিক্ষা দেওয়া, ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করা ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া স্বামীর কর্তব্য। সে অনুমতি চাইলে তাকে মসজিদে যেতে বাধা না দেওয়া উচিত চরিত্রবান পুরুষের। যেহেতু সেখানেও সুশিক্ষা লাভ করার সুযোগ আছে। মহানবী বলেছেন,
لا تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللهِ مَسَاجِدَ اللهِ وَلَكِنْ لِيَخْرُجْنَ وَهُنَّ تَفِلاَتٌ
"আল্লাহর বান্দীদেরকে মসজিদে আসতে বারণ করো না, তবে তারা যেন খোশবু ব্যবহার না ক'রে সাদাসিধাভাবে আসে।”৭০৯
১২. স্ত্রীর ধর্ম, দেহ, যৌবন ও মর্যাদায় ঈর্ষাবান হওয়া এবং এ সবে কোন প্রকার কলঙ্ক লাগতে না দেওয়া স্বামীর উপর তার এক অধিকার। সুতরাং স্ত্রী এক উত্তম সংরক্ষণীয় ও হিফাজতের জিনিস। লোকের মুখে-মুখে, পরপুরুষদের চোখে-চোখে ও যুবকদের মনে- মনে বিচরণ করতে না দেওয়া; যাকে দেখা দেওয়া তার স্ত্রীর পক্ষে হারাম, তাকে সাধারণ অনুমতি দিয়ে বাড়ি আসতে-যেতে না দেওয়া সুপুরুষের কর্ম। মহানবী বলেছেন,
(ثلاثة لا يَنظُرُ الله إِلَيْهِمْ يَوْمَ القِيامَةِ العاقِ والمَرْأَةُ المُتَرَجُلَةِ المُتَشَبِّهَةُ بالرجال والديوث
"তিন ব্যক্তির দিকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকিয়ে দেখবেন না; পিতা- মাতার অবাধ্য সন্তান, পুরুষের বেশধারী মহিলা এবং মেড়া (স্ত্রী-কন্যার পর্দাহীনতা ও নোংরামীর ব্যাপারে ঈর্ষাহীন) পুরুষ।"৭১০
(ثلاثة لا يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ العاقُ لِوالِدَيْهِ وَالدَّيُوتُ وَرَجِلَةُ النِّسَاءِ
"তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, ভেড়া পুরুষ এবং পুরুষের বেশধারী মহিলা। "৭১১
১৩. গুণধর স্বামী নিজ স্ত্রীর কোন রহস্য বা গোপন কথা অপরের কাছে প্রকাশ করে না। যেমন স্ত্রীর রূপ-যৌবন ও তার সংসর্গে যৌনসুখের কথাও অন্য পুরুষের কাছে উল্লেখ ক'রে তৃপ্তি ও মজা নেয় না। যেহেতু তা ঈর্ষাহীন পুরুষদের অভ্যাস।
১৪. স্ত্রীর যৌন-আহবানে সত্বর সাড়া দেওয়া উচিত চরিত্রবান স্বামীর। নারীর মন ও যৌবন ধীর ও শান্ত প্রকৃতির। যৌন ব্যাপারে পুরুষের মতো তৎপর নয়। কিন্তু ভাগ্যক্রমে অনেক স্বামী এ বাজারে গরম হয়, স্ত্রী হয় ঠাণ্ডা। অনেক স্বামী ঠাণ্ডা হয়, স্ত্রী হয় গরম। তবুও স্ত্রী শান্ত থাকে। পুরুষ ধৈর্য রাখতে পারে না, স্ত্রী পারে। কিন্তু স্বামী ঠাণ্ডা প্রকৃতির হলে, পরিশ্রমী হলে অথবা বৈরাগ্য-সাধনে সওয়াব আছে মনে করলে স্ত্রীর অবস্থা বিধবার মতো হয়।
পরহেযগার সাহেব অধিকারীর অধিকার নষ্ট করে। সে সওয়াবের চিন্তায় থাকে, কিন্তু সে জানে না যে, স্ত্রীর পরশেও সওয়াব আছে। সে মা-কে প্রাধান্য দেয়, কিন্তু জানে না যে, একজনের হক ছিনিয়ে অপরকে দান করলে চুরিকৃত টাকা দান করা হয়। আল্লাহ, দ্বীন, মা-বাপ, স্ত্রী, সন্তান, বন্ধুবান্ধব, মেহমান প্রভৃতি প্রত্যেকের নিজ নিজ হক আছে, আর যথার্থভাবে প্রত্যেকের হক আদায় করতে হয়। একজনের ভাগ কেটে অন্যকে দিলে অন্যায় হয়।
(إِنَّ لِرَبِّكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا فَأَعْطِ كُلَّ ذِي حَقٌّ حَقَّهُ
'নিশ্চয় তোমার উপর তোমার প্রভুর অধিকার রয়েছে। তোমার প্রতি তোমার আত্মারও অধিকার আছে এবং তোমার প্রতি তোমার পরিবারেরও অধিকার রয়েছে। অতএব তুমি প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার প্রদান কর। '৭১২
স্ত্রীর রূপ-যৌবনের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে সওয়াবের আশা করে অনেক হতভাগ্য পুরুষ? অথচ তাতেও যে সওয়াব আছে, তা হয়তো জানে না অথবা মানে না সে। মহানবী বলেছেন,
أَوَلَيْسَ قَدْ جَعَلَ اللهُ لَكُمْ مَا تَصَدَّقُونَ بِهِ : إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلَّ تَكْبِيرَةٍ صَدَقَةً، وَكُلِّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلِّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةً ، وَأَمْرُ بِالمَعْرُوفِ صَدَقَةٌ ، وَنَهْي عَنِ الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ، وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ
"আল্লাহ কি তোমাদের জন্য সাদকাহ করার মত জিনিস দান করেননি? নিঃসন্দেহে প্রত্যেক তাসবীহ সাদকাহ, প্রত্যেক তাকবীর সাদকাহ, প্রত্যেক তাহলীল সাদকাহ, ভাল কাজের নির্দেশ দেওয়া সাদকাহ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা সাদকাহ এবং তোমাদের স্ত্রী-মিলন করাও সাদকাহ।”
সাহাবাগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ স্ত্রী-মিলন ক'রে নিজের যৌনক্ষুধা নিবারণ করে, তবে এতেও কি তার পুণ্য হবে?' তিনি বললেন,
أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا في حَرامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ وِزْرٌ ؟ فكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الحَلالِ كَانَ لَهُ أَجْرٌ
"কী রায় তোমাদের, যদি কেউ অবৈধভাবে যৌন-মিলন করে, তাহলে কি তার পাপ হবে? (নিশ্চয় হবে।) অনুরূপ সে যদি বৈধভাবে (স্ত্রী-মিলন করে) নিজের কামক্ষুধা নিবারণ করে, তাহলে তাতে তার পুণ্য হবে। "৭১৩
স্ত্রীর প্রতি উদাসীন হলে সে পরকীয় প্রেমে ফেঁসে যেতে পারে। আর তাতে পাপ হয় স্বামীর। যেমন তার সম্মতি ছাড়া বাড়ি ছেড়ে বাইরে বা বিদেশে থাকা অবস্থায় সে পাপ করলেও স্বামীর পাপ হবে।
১৫. একাধিক স্ত্রী হলে মনের ভালোবাসাকে ভাগ ক'রে দিতে না পারলেও দেহের পরশকে ভাগ ক'রে দিতে হবে। তা না পারলে আল্লাহর রসূল বলেছেন,
مَنْ كَانَت لَهُ امْرَأَتَانِ ، فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا جَاءَ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَشِقُه مَائِل "
"যে ব্যক্তির দু'টি স্ত্রী আছে, কিন্তু সে তন্মধ্যে একটির দিকে ঝুঁকে যায়, এরূপ ব্যক্তি কিয়ামতের দিন তার অর্ধদেহ ধসা অবস্থায় উপস্থিত হবে। "৭১৪
১৬. ধনলোভী স্বামীর স্ত্রীধনে লোভ থাকে। ফলে তার পৃথক ধন-সম্পত্তি থাকলে অথবা চাকরির বেতন থাকলে তা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। অনেকে সে ধন হাতে করে অসহায় স্ত্রীর খাস অধিকার নষ্ট করে। অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)। আর নিজেদেরকে হত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। ৭১৫
অতএব অনুমতি ছাড়া তার অর্থ ব্যয় করা অথবা সংসারে নিজে ব্যয় করতে কার্পণ্য ক'রে স্ত্রীকে ব্যয় করতে বাধ্য করা চরিত্রবান স্বামীর কাজ হতে পারে না।
১৭. ভুল নিয়েই মানুষের জীবন। কিন্তু সে ভুলের সংশোধন হওয়া প্রয়োজন। ভুলের মাসুলের জায়গায় যদি ক্ষমা হয়, তাহলেই সংসার সুখময় হয়ে ওঠে। সুতরাং মহান আল্লাহর এই বাণী প্রত্যেক স্বামীর মনে রাখা উচিত; তিনি বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ وَإِن تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (١٤)
"হে মুমিনগণ! নিশ্চয় তোমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের (পার্থিব ও পারলৌকিক বিষয়ের) শত্রু। অতএব তাদের ব্যাপারে তোমরা সতর্ক থেকো। অবশ্য (দ্বীনী বিষয়ে অন্যায় থেকে তওবা করলে ও পার্থিব বিষয়ক অন্যায়ে) তোমরা যদি ওদেরকে মার্জনা কর, ওদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা কর এবং ওদেরকে ক্ষমা করে দাও তাহলে জেনে রাখ যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"৭১৬
স্ত্রীর ছোটখাট ভুলে ধৈর্যধারণ করা চরিত্রবান আদর্শ স্বামীর কর্তব্য। ভালোবাসা কুরবানী চায়, কুরবানী দিতে না পারলে ভালোবাসা অনির্বাণ থাকে না।

টিকাঃ
৬৮৯. সূরা নিসা: ৪
৬৯০. বুখারী ২৭২১, ৫১৫১, মুসলিম ৩৫৩৭, মিশকাত ৩১৪৩
৬৯১. ইবনে মাজাহ ২৪১০
৬৯২. হাকেম ২৭৪৩, বাইহাকী ১৪৭৮১, সহীহুল জামে' ১৫৬৭
৬৯৩. আহমাদ ২০০৮৯, আবু দাউদ ২১৪২
৬৯৪. বুখারী ৫৫, মুসলিম ২৩৬৮
৬৯৫. আহমাদ, আবু দাউদ ১৬৯২, হাকেম, বাইহাকী, সহীহুল জামে' ৪৪৮১
৬৯৬. মুসলিম ২৩৫৯
৬৯৭. সূরা নিসা: ১৯
৬৯৮. মুসলিম ১৪৬৯
৬৯৯. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৩২৩৮
৭০০. আহমাদ ২৬২৭৭, আবু দাউদ ২৫৮০, নাসাঈ প্রমুখ
৭০১. বুখারী, মুসলিম, সিঃ সহীহাহ ৫৪৫
৭০২. বুখারী, তিরমিযী, আদাবুয যিফাফ ২৯০পৃ
৭০৩. সিঃ সহীহাহ ৬৭০, আদাবুয যিফাফ ২৯১পৃঃ
৭০৪. বাইহাক্বী ১৪৫০৫, ইবনে আবী শাইবা ১৯২৬৩
৭০৫. তিরমিযী ৩৮৯৫, ইবনে মাজাহ ১৯৭৭, তাবারানী, ইবনে হিব্বান, সঃ জামে' ৩৩১৪
৭০৬. আহমাদ ১০১০৬, তিরমিযী ১১৬২, ইবনে হিব্বان, সহীহুল জামে' ১২৩২
৭০৭. আহমাদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ, মিশকাত ৩৫২৯
৭০৮. তাহরীম: ৬
৭০৯
৭১০. আহমাদ, নাসাঈ ২৫৬১
৭১১. নাসাঈ ২১৫৫৫, বাযযার, হাকেম ১/৭২, সহীহুল জামে' ৩০৬৩
৭১২. বুখারী ১৯৬৮
৭১৩. মুসলিম ২৩৭৬
৭১৪. আহমাদ ২/৩৪৭, আসহাবে সুনান, হাকেম ২/১৮৬, ইবনে হিব্বান ৪১৯৪
৭১৫. সূরা নিসা: ২৯
৭১৬. সূরা তাগাবুন ১৪

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 আত্মীয়র সাথে সচ্চরিত্রতা

📄 আত্মীয়র সাথে সচ্চরিত্রতা


আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং সচ্চরিত্রতার আচরণ করা একটি জরুরী বিষয়। যেহেতু মহান আল্লাহর নির্দেশ তাই। মহানবী এর আদেশ তাই। ঈমানের দাবী তাই।
যেহেতু আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করলে আল্লাহ সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
যেহেতু জ্ঞাতিবন্ধন বজায় রাখা আল্লাহর নিকট প্রিয় কাজ এবং জ্ঞাতিবন্ধন ছিন্ন করা আল্লাহর নিকট ঘৃণ্য কাজ।
আত্মীয় যদি আত্মীয়তা বজায় না রাখতে চায়, তবুও তার সাথে নিজের কর্তব্য হিসাবে বন্ধন বজায় রাখার চেষ্টা ক'রে যেতে হবে। সে না এলেও আপনাকে যেতে হবে। সে না দিলেও আপনাকে দিতে হবে। সে দাওয়াত না দিলেও আপনাকে দিতে হবে। আপনার অসুখে সে দেখা করতে না এলেও আপনাকে তার অসুখে দেখা করতে যেতে হবে। সে অধম হলে আপনাকে উত্তম হতে হবে। তবেই আপনি চরিত্রবান মানুষ। তবেই আপনি ভালো মানুষ। তাতে আপনার আয়ু বাড়বে, আপনার বয়সে বরকত হবে। আপনার রুযী-রোযগারেও বরকত হবে।
আত্মীয়কে বিশেষ উপলক্ষ্যে দাওয়াত দিন। তার বিপদে সাহায্য করুন। তার অভাবে দান করুন। যেহেতু আত্মীয়কে দান করলে ডবল সওয়াব লাভ হয়।
মাঝে-মধ্যে যিয়ারত করুন। সময়াভাবে যাওয়া-আসা না করতে পারলেও ফোনের মাধ্যমে খোঁজ-খবর নিন।
তবে মনে রাখবেন, আত্মীয়তার বন্ধন অপেক্ষা ঈমানের বন্ধন বেশি মজবুত। আশা করি তা বুঝিয়ে বলার দরকার হবে না। যেহেতু আপনি এ কাজ করবেন আল্লাহর ওয়াস্তে। আর আত্মীয় যদি আল্লাহর দুশমন হয়, তাহলে আল্লাহর দুশমনের সাথে আপনার সম্পর্ক কীসের?
পারলে আত্মীয়র বন্ধুর সাথেও সম্পর্ক বজায় রাখুন। যেহেতু 'দোস্ত কা দোস্ত, দোস্ত হোতা হ্যায়।'
আর জেনে রাখবেন, আত্মীয়তার বন্ধন ছেদন করার শাস্তি দুনিয়াতেও পাওয়া যায়। আর আখেরাতেও আছে। সেখানে আত্মীয়তার বন্ধন ছেদনকারীর স্থান জাহান্নামে। আর আত্মীয়তার বন্ধন বজায়কারী জান্নাত লাভে ধন্য হবে। আল্লাহ করুন, আপনি চরিত্রবান হন এবং জান্নাতলাভে ধন্য হন।

আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং সচ্চরিত্রতার আচরণ করা একটি জরুরী বিষয়। যেহেতু মহান আল্লাহর নির্দেশ তাই। মহানবী এর আদেশ তাই। ঈমানের দাবী তাই।
যেহেতু আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করলে আল্লাহ সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
যেহেতু জ্ঞাতিবন্ধন বজায় রাখা আল্লাহর নিকট প্রিয় কাজ এবং জ্ঞাতিবন্ধন ছিন্ন করা আল্লাহর নিকট ঘৃণ্য কাজ।
আত্মীয় যদি আত্মীয়তা বজায় না রাখতে চায়, তবুও তার সাথে নিজের কর্তব্য হিসাবে বন্ধন বজায় রাখার চেষ্টা ক'রে যেতে হবে। সে না এলেও আপনাকে যেতে হবে। সে না দিলেও আপনাকে দিতে হবে। সে দাওয়াত না দিলেও আপনাকে দিতে হবে। আপনার অসুখে সে দেখা করতে না এলেও আপনাকে তার অসুখে দেখা করতে যেতে হবে। সে অধম হলে আপনাকে উত্তম হতে হবে। তবেই আপনি চরিত্রবান মানুষ। তবেই আপনি ভালো মানুষ। তাতে আপনার আয়ু বাড়বে, আপনার বয়সে বরকত হবে। আপনার রুযী-রোযগারেও বরকত হবে।
আত্মীয়কে বিশেষ উপলক্ষ্যে দাওয়াত দিন। তার বিপদে সাহায্য করুন। তার অভাবে দান করুন। যেহেতু আত্মীয়কে দান করলে ডবল সওয়াব লাভ হয়।
মাঝে-মধ্যে যিয়ারত করুন। সময়াভাবে যাওয়া-আসা না করতে পারলেও ফোনের মাধ্যমে খোঁজ-খবর নিন।
তবে মনে রাখবেন, আত্মীয়তার বন্ধন অপেক্ষা ঈমানের বন্ধন বেশি মজবুত। আশা করি তা বুঝিয়ে বলার দরকার হবে না। যেহেতু আপনি এ কাজ করবেন আল্লাহর ওয়াস্তে। আর আত্মীয় যদি আল্লাহর দুশমন হয়, তাহলে আল্লাহর দুশমনের সাথে আপনার সম্পর্ক কীসের?
পারলে আত্মীয়র বন্ধুর সাথেও সম্পর্ক বজায় রাখুন। যেহেতু 'দোস্ত কা দোস্ত, দোস্ত হোতা হ্যায়।'
আর জেনে রাখবেন, আত্মীয়তার বন্ধন ছেদন করার শাস্তি দুনিয়াতেও পাওয়া যায়। আর আখেরাতেও আছে। সেখানে আত্মীয়তার বন্ধন ছেদনকারীর স্থান জাহান্নামে। আর আত্মীয়তার বন্ধন বজায়কারী জান্নাত লাভে ধন্য হবে। আল্লাহ করুন, আপনি চরিত্রবান হন এবং জান্নাতলাভে ধন্য হন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00