📄 নিজের সাথে সচ্চরিত্রতা
নিজের জীবনে মানুষ চরিত্রবান হবে আপদে-বিপদে ধৈর্যধারণ করে। অধৈর্য হয়ে কোন অনৈতিক কাজ না ক'রে, সহনশীল হয়ে, কর্মে নৈপুণ্য প্রদর্শন ক'রে, কাজ করতে গিয়ে তাড়াহুড়া না ক'রে, কাজে হিকমত অবলম্বন ক'রে ইত্যাদি। বৈয়াক্তিক জীবনকে নানা সদাচরণ দ্বারা প্রশংসা-সমৃদ্ধ ক'রে গড়ে তোলা নিজের সাথে সচ্চরিত্রতা প্রয়োগ করার শামিল। ৬৩৪
অনুরূপ নিজের মান নিজে রক্ষা করা, নিজেকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করা, নিজের সাথে সচ্চরিত্রতা প্রয়োগ করার অন্তর্ভুক্ত।
টিকাঃ
৬৩৪. মাকারিমুল আখলাক্ব ২১৭,
নিজের জীবনে মানুষ চরিত্রবান হবে আপদে-বিপদে ধৈর্যধারণ করে। অধৈর্য হয়ে কোন অনৈতিক কাজ না ক'রে, সহনশীল হয়ে, কর্মে নৈপুণ্য প্রদর্শন ক'রে, কাজ করতে গিয়ে তাড়াহুড়া না ক'রে, কাজে হিকমত অবলম্বন ক'রে ইত্যাদি। বৈয়াক্তিক জীবনকে নানা সদাচরণ দ্বারা প্রশংসা-সমৃদ্ধ ক'রে গড়ে তোলা নিজের সাথে সচ্চরিত্রতা প্রয়োগ করার শামিল। ৬৩৪
অনুরূপ নিজের মান নিজে রক্ষা করা, নিজেকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করা, নিজের সাথে সচ্চরিত্রতা প্রয়োগ করার অন্তর্ভুক্ত।
টিকাঃ
৬৩৪. মাকারিমুল আখলাক্ব ২১৭,
📄 আল্লাহর সাথে সচ্চরিত্রতা
মানুষের প্রতি সম্মান ও ভক্তি প্রকাশ করা চরিত্রবান মানুষের গুণ। তাহলে মহান প্রতিপালককে বিশ্বাস করা, তাঁকে ভয় করা, তাঁর নবী ও কিতাবকে বিশ্বাস করা মানুষের সচ্চরিত্রতার লক্ষণ অবশ্যই। আল্লাহর সাথে সচ্চরিত্রতার বহিঃপ্রকাশ প্রধানতঃ কয়েকভাবে হয়ে থাকে:-
১. তাঁর দেওয়া সকল খবরে বিশ্বাস রাখা, তাঁর খবরে কোন প্রকার সন্দেহ পোষণ না করা। যেহেতু মহান সৃষ্টিকর্তা অপেক্ষা বেশি সত্যবাদী আর কে হতে পারে? তিনি বলেছেন, (وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا - وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلاً) "কথায় আল্লাহ অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী কে আছে?”৬৩৫
২. তাঁর সকল আদেশ-নিষেধকে নির্দ্বিধায় পালন করা। সুতরাং কেউ যদি তাঁর কোন আদেশ প্রত্যাখ্যান বা উল্লংঘন করে অথবা কোন নিষেধ অবজ্ঞা বা উপেক্ষা করে, সে চরিত্রবান হতে পারে না।
৩. তাঁর বিধির বিধানকে সন্তুষ্ট চিত্তে ও ধৈর্যের সাথে বরণ করা। চরিত্রবানের কাজ হল, সে তাঁর ভাগ্য-বিধানের কাছে আত্মসমর্পণ করবে, তাতে কোন প্রকার অভিযোগ আনবে না। তাতে ধৈর্যধারণ করবে, অসন্তোষ বা ক্ষোভ প্রকাশ করবে না। তাতে কোন মঙ্গল আছে জানবে, হা-হুতাশ করবে না ও নিরাশ হবে না।
নিজ ভাগ ও ভাগ্যের ব্যাপারে তাঁর চূড়ান্ত ফায়সালাকে মাথা পেতে মেনে নেওয়া হল তাঁর সাথে সচ্চরিত্রতা প্রদর্শন করার অন্তর্ভুক্ত।
নিশ্চয় সে চরিত্রবান নয়, যে মহান প্রতিপালকের অবাধ্যাচরণে লিপ্ত থাকে। যাঁর খায়-পরে, তাঁর অবাধ্যাচরণ করা কি সুচরিত্রবানের লক্ষণ হতে পারে। যে অন্নদাতার কৃতঘ্নতা করে, তাঁর আনুগত্যে অহংকার প্রদর্শন করে এবং নিজ খেয়ালখুশী অনুযায়ী চলে সে কি চরিত্রবান হতে পারে? আদৌ না।
মহান আল্লাহ বলেছেন, (الَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَالَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالآخِرَةِ قُلُوبُهُم مُّنكِرَةٌ وَهُم مُّسْتَكْبِرُونَ) "তোমাদের উপাস্য একক উপাস্য; সুতরাং যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর সত্য বিমুখ এবং তারা অহংকারী।"৬৩৬
তাহলে তারা কি চরিত্রবান হতে পারে? মোটেই না।
টিকাঃ
৬৩৫. সূরা নিসা: ৮৭, ১২২
৬৩৬. সূরা নাহল: ২২
মানুষের প্রতি সম্মান ও ভক্তি প্রকাশ করা চরিত্রবান মানুষের গুণ। তাহলে মহান প্রতিপালককে বিশ্বাস করা, তাঁকে ভয় করা, তাঁর নবী ও কিতাবকে বিশ্বাস করা মানুষের সচ্চরিত্রতার লক্ষণ অবশ্যই। আল্লাহর সাথে সচ্চরিত্রতার বহিঃপ্রকাশ প্রধানতঃ কয়েকভাবে হয়ে থাকে:-
১. তাঁর দেওয়া সকল খবরে বিশ্বাস রাখা, তাঁর খবরে কোন প্রকার সন্দেহ পোষণ না করা। যেহেতু মহান সৃষ্টিকর্তা অপেক্ষা বেশি সত্যবাদী আর কে হতে পারে? তিনি বলেছেন, (وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا - وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلاً) "কথায় আল্লাহ অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী কে আছে?”৬৩৫
২. তাঁর সকল আদেশ-নিষেধকে নির্দ্বিধায় পালন করা। সুতরাং কেউ যদি তাঁর কোন আদেশ প্রত্যাখ্যান বা উল্লংঘন করে অথবা কোন নিষেধ অবজ্ঞা বা উপেক্ষা করে, সে চরিত্রবান হতে পারে না।
৩. তাঁর বিধির বিধানকে সন্তুষ্ট চিত্তে ও ধৈর্যের সাথে বরণ করা। চরিত্রবানের কাজ হল, সে তাঁর ভাগ্য-বিধানের কাছে আত্মসমর্পণ করবে, তাতে কোন প্রকার অভিযোগ আনবে না। তাতে ধৈর্যধারণ করবে, অসন্তোষ বা ক্ষোভ প্রকাশ করবে না। তাতে কোন মঙ্গল আছে জানবে, হা-হুতাশ করবে না ও নিরাশ হবে না।
নিজ ভাগ ও ভাগ্যের ব্যাপারে তাঁর চূড়ান্ত ফায়সালাকে মাথা পেতে মেনে নেওয়া হল তাঁর সাথে সচ্চরিত্রতা প্রদর্শন করার অন্তর্ভুক্ত।
নিশ্চয় সে চরিত্রবান নয়, যে মহান প্রতিপালকের অবাধ্যাচরণে লিপ্ত থাকে। যাঁর খায়-পরে, তাঁর অবাধ্যাচরণ করা কি সুচরিত্রবানের লক্ষণ হতে পারে। যে অন্নদাতার কৃতঘ্নতা করে, তাঁর আনুগত্যে অহংকার প্রদর্শন করে এবং নিজ খেয়ালখুশী অনুযায়ী চলে সে কি চরিত্রবান হতে পারে? আদৌ না।
মহান আল্লাহ বলেছেন, (الَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَالَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالآخِرَةِ قُلُوبُهُم مُّنكِرَةٌ وَهُم مُّسْتَكْبِرُونَ) "তোমাদের উপাস্য একক উপাস্য; সুতরাং যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর সত্য বিমুখ এবং তারা অহংকারী।"৬৩৬
তাহলে তারা কি চরিত্রবান হতে পারে? মোটেই না।
টিকাঃ
৬৩৫. সূরা নিসা: ৮৭, ১২২
৬৩৬. সূরা নাহল: ২২
📄 পিতামাতার সাথে সদাচরণ
চরিত্রবান নারী-পুরুষের একটি লক্ষণ হল, পিতামাতার সাথে সদাচরণ ও সদ্ব্যবহার করা। আর এর নির্দেশ দিয়েছেন খোদ মহান প্রতিপালক। তিনি বলেছেন, (وَوَصَّيْنَا الْأَنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْناً) অর্থাৎ, আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছি। ৬৩৭
তিনি আরো বলেন, (وَقَضَى رَبُّكَ أَلا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَاناً إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلاهُمَا فَلا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلاً كَرِيماً وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيراً )
অর্থাৎ, তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে; তাদের এক জন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে বিরক্তিসূচক কিছু বলো না এবং তাদেরকে ভর্ৎসনা করো না; বরং তাদের সাথে বলো সম্মানসূচক নম্র কথা। অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো এবং বলো, 'হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া কর; যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছে।'৬৩৮
উক্ত নির্দেশ-বাণী থেকে স্পষ্ট হয়, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। তাদেরকে বিরক্তিসূচক কথা বলা যাবে না। কোন ভুল ক'রে ফেললেও কোন প্রকার ভর্ৎসনা করা যাবে না। তাদের সাথে ভদ্রভাবে ও নম্রসুরে কথা বলতে হবে। তাদের মুখের উপর মুখ দেওয়া যাবে না। ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে তাদের নিকট বিনয়াবনত থাকতে হবে। তাদের জন্য দুআ করতে হবে। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে হবে। তাদের নিমকহারামি করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
﴿ وَوَصَّيْنَا الْأَنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ ﴾
অর্থাৎ, আমি তো মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। জননী কষ্টের পর কষ্ট বরণ ক'রে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে এবং তার স্তন্যপান ছাড়াতে দু'বছর অতিবাহিত হয়। সুতরাং তুমি আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।৬৩৯
পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার চরিত্রবানের সচ্চরিত্রতা কেন হবে না? তা যে মহান আল্লাহর ইবাদতের পর সর্বশ্রেষ্ঠ আমল। এমনকি নফল জিহাদের চাইতেও শ্রেষ্ঠ কর্ম।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, আমি নবী কে জিজ্ঞেস করলাম, 'কোন আমল আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়?' তিনি বললেন, "যথা সময়ে স্বলাত আদায় করা।” আমি বললাম, 'তারপর কোন্টি?' তিনি বললেন, "পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করা।” আমি বললাম, 'তারপর কোন্টি?' তিনি বললেন, "আল্লাহর পথে জিহাদ করা। "৬৪০
পিতামাতার সাথে দুর্ব্যবহার দুশ্চরিত্র সন্তানের অসদাচরণ কেন হবে না? তা যে মহান আল্লাহর ইবাদতে শির্ক করার পর সর্বনিকৃষ্ট আমল ও মহাপাপ। এমনকি প্রাণ হত্যার চাইতেও নিকৃষ্ট কর্ম ও মহা অপরাধ। মহানবী বলেছেন,
الكبَائِرُ : الإِشْرَاكُ بِاللهِ ، وَعُقُوقُ الوَالِدَيْنِ ، وَقَتْلُ النَّفْسِ ، وَاليَمِينُ الغَمُوسُ
"কাবীরাহ গুনাহসমূহ হচ্ছে, আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, প্রাণ হত্যা করা এবং মিথ্যা কসম খাওয়া।”৬৪১
আর সেই গুনাহ ও অপরাধের শাস্তি চরিত্রহীন সন্তান কিয়ামতের পূর্বে দুনিয়াতেও পেতে পারে। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
بَابَانِ مُعَجَّلانِ عُقُوبَتُهُما في الدُّنْيا البَغْيُ والعُقُوقُ
"দুটি (পাপ) দরজা এমন রয়েছে, যার শাস্তি দুনিয়াতেই ত্বরান্বিত করা হয়; বিদ্রোহ ও পিতা-মাতার অবাধ্যাচরণ।"৬৪২
হ্যাঁ, দুনিয়াতেই অবাধ্য সন্তানের সন্তানরা তার অবাধ্যতা করবে। যেমন কর্ম, তেমন ফললাভ করবে সে নিজের শেষ জীবনেও।
এক ব্যক্তির বাপ ছিল বৃদ্ধাশ্রমে। মৃত্যু-শয্যায় সে শেষ বারের মতো দেখার জন্য ছেলেকে ডেকে পাঠাল। ছেলে বাপের শেষ ইচ্ছা কিছু আছে কি না জিজ্ঞাসা করলে সে বলল, 'আমার রুমের এই ফ্যানটা খারাপ হয়ে গেছে বাবা, ঠিক ক'রে দিয়ো।' ছেলে বলল, 'তুমি তো চলেই যাবে, তবে আবার ফ্যান ঠিক ক'রে কী হবে?' বাপ বলল, 'কারণ তোমাকেও এসে থাকতে হবে তো, তাই বলে চললাম!'
আর পরকালে পিতামাতার অবাধ্য সন্তান বেহেস্তে যাবে না। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
وثَلاثَةٌ لا يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ العاقُ لِوَالِدَيْهِ والمُدْمِنُ الْخَمْرَ والمَنَّانُ بِمَا أَعْطَى
"তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না; পিতা-মাতার নাফরমান ছেলে, মদপানে অভ্যাসী মাতাল এবং দান করার পর যে বলে ও গর্ব করে বেড়ায় এমন খোঁটাদানকারী ব্যক্তি। "৬৪৩
বড় হতভাগা সে সন্তান, যে জান্নাত কাছে পেয়েও প্রবেশ করতে পারল না। জান্নাতের দরজা চিনতে ভুল করল অথবা উঠতি যৌবনের উন্মাদনা অথবা অন্য কিছু বা কেউ তাকে জান্নাতের দরজা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল। মহানবী বলেছেন,
رَغِمَ أَنفُ ، ثُمَّ رَغِمَ أنْفُ ، ثُمَّ رَغِمَ أنْفُ مَنْ أَدْرَكَ أَبَوِيهِ عِنْدَ الكِبَرِ ، أَحَدُهُما أَوْ كِلِيهِمَا فَلَمْ يَدْخُلِ الجَنَّةَ
"তার নাক ধূলিধূসরিত হোক, অতঃপর তার নাক ধূলিধূসরিত হোক, অতঃপর তার নাক ধূলিধূসরিত হোক, যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে বৃদ্ধ অবস্থায় পেল; একজনকে অথবা দু'জনকেই। অতঃপর সে (তাদের খিদমত ক'রে) জান্নাত যেতে পারল না।"
وَمَنْ أَدْرَكَ وَالِدَيْهِ أَوْ أَحَدَهُمَا فَدَخَلَ النَّارَ فَأَبْعَدَهُ اللَّهُ
'যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে অথবা তাদের একজনকে জীবিতাবস্থায় পেল অথচ তাকে দোযখে যেতে হবে, আল্লাহ তাকেও দূর করুন। '৬৪৪
হ্যাঁ, পিতামাতার বাধ্য থাকলে তবেই জান্নাত লাভ হবে সন্তানের। যদিও তাদের আনুগত্য করতে গিয়ে নিজের স্বার্থে ঘা পড়ে, সম্পদের ক্ষতি হয়, বন্ধুত্বে বাধা পড়ে, স্ত্রীর সুখ-সন্তুষ্টির ক্ষতি হয়।
মুআয বিন জাবাল বলেন, একদা এক ব্যক্তি নবী এর নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাকে এমন আমল শিখিয়ে দেন; যা করলে আমি জান্নাত প্রবেশ করতে পারব।' তিনি বললেন,
لا تُشْرِكْ بِاللهِ شَيْئًا وَإِنْ عُذِّبْتَ وَحُرِّقْتَ، وَأَطِعْ وَالِدَيْكَ وَإِنْ أَخْرَجَاكَ مِنْ مَالِكَ وَمِنْ كُلِّ شَيْءٍ هُوَ لَكَ، لَا تَتْرُكِ الصَّلَاةَ مُتَعَمِّدًا فَإِنَّهُ مَنْ تَرَكَ الصَّلَاةَ مُتَعَمِّدًا بَرِئَتْ مِنْهُ ذِمَّةُ اللَّهِ،
"তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক (অংশী) করো না; যদিও তোমাকে সে ব্যাপারে শাস্তি দেওয়া হয় এবং পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়। তোমার মাতা-পিতার আনুগত্য কর; যদিও তারা তোমাকে তোমার ধন-সম্পদ এবং সমস্ত কিছু থেকে দূর করতে চায়। আর ইচ্ছাকৃত স্বলাত ত্যাগ করো না; কারণ, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত স্বলাত ত্যাগ করে তার উপর থেকে আল্লাহর দায়িত্ব উঠে যায়। "৬৪৫
পিতামাতার উপরে স্ত্রীকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। সেই কঠিন মুহূর্তের সময় চরিত্রবান ছেলেকে ঈমানী পরীক্ষা দিয়ে পিতামাতার সাথে সদাচরণ করতে হবে এবং স্ত্রীর সাথেও ইনসাফ করতে হবে। স্ত্রী হকের প্রতিকূলে হলে তাকে প্রয়োজনে বর্জনও করতে হবে।
এক ব্যক্তি আবু দারদা এর নিকট এসে বলল, 'আমার এক স্ত্রী আছে। আমার মা তাকে ত্বালাক দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন।' আবু দার্দা বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি,
الوالد أوسط أبواب الجنة ، فإن شئت ، فأضع ذلك الباب ، أو احفظه
"পিতা-মাতা জান্নাতের দুয়ারসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দুয়ার। সুতরাং তুমি যদি চাও, তাহলে এ দুয়ারকে নষ্ট কর অথবা তার রক্ষণাবেক্ষণ কর।”৬৪৬
তবে আনুগত্যের ক্ষেত্রে মহানবী এর এ নির্দেশ অবশ্যই মনে রাখতে হবে,
لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق
"স্রষ্টার অবাধ্যতা করে কোন সৃষ্টির আনুগত্য নেই।”৬৪৭
সুতরাং ইনসাফে পিতামাতার দোষ থাকলে অবশ্যই স্ত্রীকে বর্জন করা যাবে না। আর তখনই সন্তানকে লাঠি মাঝখানে ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। নচেৎ পিতামাতা কষ্ট পেলে তারা যদি সন্তানের উপর বদ্দুআ করে, তাহলে জেনে রাখা ভালো যে, তা অবশ্যই ফলবে। যেহেতু রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
« ثلاث دعوات مستجابات لا شك فيهنَّ دعوة الوالد ودعوة المسافر ودعوة المظلوم »
"তিন জনের দুআ সন্দেহাতীতভাবে গৃহীত হয়: (১) নির্যাতিত ব্যক্তির দুআ, (২) মুসাফিরের দুআ এবং (৩) ছেলের জন্য মাতা-পিতার (দুআ বা) বদ্দুআ।"৬৪৮
কেন নয়? পিতামাতা সন্তানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে যে মহান প্রতিপালকও তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন। আর তারা অসন্তুষ্ট থাকলে তিনিও অসন্তুষ্ট থাকেন। মহানবী বলেছেন,
رضى الرب تبارك وتعالى في رضى الوالد ، وسخط الرب في سخط الوالد
“পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে রয়েছে আল্লাহ তাবারাকা অতাআলার সন্তুষ্টি, আর তাদের অসন্তুষ্টিতে রয়েছে তাঁর অসন্তুষ্টি।” ৬৪৯
অবশ্য আব্বার তুলনায় আম্মার মর্যাদা বেশি সন্তানের কাছে। আম্মা যে সন্তান পালনে বেশি কষ্ট করে। আম্মাই সন্তানের প্রতি বেশি মায়া করে। তাই আব্বার তুলনায় আম্মার রয়েছে ৩ গুণ বেশি মর্যাদা।
একটি লোক রাসূলুল্লাহ এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার কাছ থেকে সদ্ব্যবহার পাওয়ার বেশী হকদার কে?' তিনি বললেন, "তোমার মা।” সে বলল, 'তারপর কে?' তিনি বললেন, "তোমার মা।” সে বলল, 'তারপর কে?' তিনি বললেন, "তোমার মা।” সে বলল, 'তারপর কে?' তিনি বললেন, "তোমার বাপ। "৬৫০
ইসলাম রক্ষার জন্য জিহাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। কিন্তু তা নফল হলে তার তুলনায় পিতামাতার সেবা হল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মুআবিয়া বিন জাহেমাহ সুলামী বলেন, একদা জাহেমাহ নবী এর নিকট এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমি জিহাদ করব মনস্থ করেছি, তাই আপনার নিকট পরামর্শ নিতে এসেছি।' এ কথা শুনে তিনি বললেন, "তোমার মা আছে কি?" জাহেমাহ বললেন, 'হ্যাঁ'। তিনি বললেন,
فَالْزَمُهَا فَإِنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ رِجْلَيْهَا
"তাহলে তুমি তার খিদমতে অবিচল থাক। কারণ, তার পদতলে তোমার জান্নাত রয়েছে।"৬৫১
মা-বাপ কাফের হলে দ্বীনের ব্যাপারে তাদের আনুগত্য করা যাবে না। কিন্তু তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَإِن جَاهَدَاكَ عَلَى أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ)
"তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার অংশী করতে পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মান্য করো না, তবে পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস কর এবং যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অবলম্বন কর, অতঃপর আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে অবহিত করব।”৬৫২
আসমা বিন্তে আবূ বাক্ সিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, নবী এর যুগে আমার অমুসলিম মা আমার কাছে এল। আমি নবী কে জিজ্ঞেস করলাম; বললাম, 'আমার মা (ইসলাম) অপছন্দ করা অবস্থায় (আমার সম্পদের লোভ রেখে) আমার নিকট এসেছে, আমি তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখব কি?' তিনি বললেন, "হ্যাঁ, তুমি তোমার মায়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ।"৬৫৩
বাপ-মায়ের মাঝে কোন বিবাদে কোন এক পক্ষের কথা শুনে তার পক্ষ অবলম্বন করা এবং অপর পক্ষকে দোষারোপ করা উচিত নয় সন্তানের। যেহেতু বিবাদের কারণ এমন গোপন হতে পারে, যা সন্তানের কাছে প্রকাশ পাওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। আর সেই ক্ষেত্রে অন্য পক্ষকে কটু কথা বলা অথবা তার গীবত করা অথবা উভয়ের মাঝে চুগলী করা বৈধ নয়।
বর্তমানের ছেলেমেয়েরা সরাসরি মা-বাপকে গালি দেয়। সে যুগে দিত না। আব্দুল্লাহ ইবনে আম্র ইবনে আস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ বললেন, "কাবীরাহ গুনাহসমূহের একটি হল আপন পিতা-মাতাকে গালি দেওয়া।" জিজ্ঞেস করা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপন পিতা-মাতাকে কি কোন ব্যক্তি গালি দেয়?' তিনি বললেন,
نَعَمْ ، يَسُبُّ أَبَا الرَّجُلِ ، فَيَسُبُّ أَبَاهُ ، وَيَسُبُّ أُمَّهُ ، فَيَسُبُّ أُمَّهُ
"হ্যাঁ, সে লোকের পিতাকে গালি-গালাজ করে, তখন সেও তার পিতাকে গালি-গালাজ ক'রে থাকে এবং সে অন্যের মা-কে গালি দেয়, সুতরাং সেও তার মা-কে গালি দেয়। "৬৫৪
সুতরাং চরিত্রবান সন্তান পিতামাতাকে সরাসরি গালি তো দেয়ই না, পরন্তু অপরের পিতামাতাকে গালাগালি ক'রে তাদেরকে গালি খাওয়ায় না।
অনেক সময় তরবিয়ত-বিরোধী কাজ করে ছেলে-মেয়েরা। ফলে লোকেরা তা দেখে তাদের পিতামাতাকে গালি দেয়। সে খেয়ালও করা উচিত চরিত্রবান ছেলে-মেয়েদের।
পিতামাতার ইন্তিকালের পর তাঁদের আত্মীয়-বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও চরিত্রবান নেক সন্তানের কর্তব্য। এই জন্য সৎ-মা বা সৎ-বাপকে ভালোবাসা এবং তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও চরিত্রবানের সুন্দর আচরণ। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ أَبَرَّ البِرِّ أَنْ يَصِلَ الرَّجُلُ وُدَّ أَبِيهِ
"পিতার মৃত্যুর পর তার বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা সবচেয়ে বড় নেকীর কাজ।"৬৫৫
তাঁদের গত হওয়ার পর তাঁদের নামে সদকা করা চরিত্রবান সুসন্তানের কাজ। যেমন সাহাবী সা'দ বিন উবাদাহ তাঁর মিখরাফের বাগান নিজ মায়ের নামে সদকাহ করেছিলেন।৬৫৬
চরিত্রবান ছেলের আচরণ এ হতে পারে না যে, সে তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভালো বাড়িতে সুখে বাস করবে এবং তার বৃদ্ধ পিতামাতাকে অচল বাড়িতে রাখবে অথবা বৃদ্ধ-খোঁয়াড়ে রেখে আসবে।
সে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখে থাকবে এবং জন্মদাতা ও পালনকর্তা পিতামাতা শেষ বয়সেও রুযীর সন্ধানে পরিশ্রম ক'রে বেড়াবে অথবা ভিক্ষা ক'রে বেড়াবে।
ইমাম ইবনে হায্য (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'পিতামাতার এর থেকে বড় নাফরমানি আর কী হতে পারে যে, ছেলে ধনী হবে, আর তার বাপ, দাদা বা নানাকে লোকের বাথরুম পরিষ্কার করতে অথবা পশু-পালন করতে অথবা রাস্তা ঝাড়ু দিতে অথবা কাপড় ধুতে বাধ্য করবে। তার মা, দাদী বা নানীকে লোকের ঘরে পাট করতে অথবা রাস্তায় পানি (বা অন্য কিছু) বিক্রি করতে বাধ্য করবে।
এ কাজে নিশ্চয় সে সন্তান মহান আল্লাহর এই নির্দেশের বিরোধী, যাতে বলা হয়েছে, "অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থাকবে।"৬৫৭
মহান আল্লাহর নির্দেশ হল, সন্তান মা-বাপের বাধ্য ও অনুগত থাকবে। আর সে নির্দেশ পালন করলে তবেই সে চরিত্রবান সন্তান হবে। ছেলেদের চাইতে মেয়েরা অবশ্যই দুর্বল, তাই তারাই বেশী মা-বাপের বাধ্য থাকে। বাপের অনুমতি ছাড়া তাদের বিবাহ হয় না। কিন্তু সেই মেয়েদের ব্যাপারে কী বলবেন, যারা পালনকর্তা মা-বাপের বুকে লাথি মেরে এবং গালে চুন-কালি দিয়ে চোরের মতো পালিয়ে গিয়ে রসিক নাগরের সাথে ব্যভিচারের ঘর বাঁধে?
টিকাঃ
৬৩৭. সূরা আনকাবূত ৮
৬৩৮. সূরা বানী ইস্রাঈল ২৩-২৪
৬৩৯. সূরা লুকমান ১৪
৬৪০. বুখারী ৫২৭, মুসলিম ২৬২, তিরমিযী, নাসাঈ
৬৪১. বুখারী ৬৬৭৫, ৬৮৭০
৬৪২. হাকেম ৭৩৫০, সহীহুল জামে' ২৮১০
৬৪৩. আহমাদ ৬১৮০, নাসাঈর কুবরা ২৩৪৩, হাকেম ২৫৬২, সহীহুল জামে' ৩০৭১
৬৪৪. ইবনে হিব্বান ৯০৭, সহীহ তারগীব ৯৯৬
৬৪৫. ত্বাবারানীর আউসাত্ব ৭৯৫৬, সহীহ তারগীব ৫৬৯
৬৪৬. তিরমিযী ১৯০০
৬৪৭. তাবারানী ১৪৭৯৫, আহমাদ ২০৬৫৩
৬৪৮. আবু দাউদ ১৫৩৮, তিরমিযী ১৯০৫, ৩৪৪৮, ইবনে মাজাহ ৩৮৬২, সিলসিলাহ সহীহাহ ৫৯৬
৬৪৯. তিরমিযী ১৮৯৯, হাকেম ৭২৪৯, বাযযার ২৩৯৪, ত্বাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহ ৫১৬
৬৫০. বুখারী ৫৯৭১, মুসলিম ৬৬৬৪
৬৫১. আহমাদ ১৫৫৩৮, নাসাঈ ৩১০৪, ইবনে মাজাহ ২৭৮১, বাইহাক্বী ১৮২৮৮, হাকেম ২৫০২
৬৫২. লুকুমান: ১৫
৬৫৩. বুখারী ২৬২০, ৩১৮৩, ৫৯৭৯, মুসলিম ২৩৭১-২৩৭২
৬৫৪. বুখারী ৫৯৭৩, মুসলিম ২৭৩
৬৫৫. মুসলিম ৬৬৭৭-৬৬৭৯
৬৫৬. বুখারী ২৭৫৬নং প্রমুখ
৬৫৭. আল-মুহাল্লা ১০/১০৮
চরিত্রবান নারী-পুরুষের একটি লক্ষণ হল, পিতামাতার সাথে সদাচরণ ও সদ্ব্যবহার করা। আর এর নির্দেশ দিয়েছেন খোদ মহান প্রতিপালক। তিনি বলেছেন, (وَوَصَّيْنَا الْأَنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْناً) অর্থাৎ, আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছি। ৬৩৭
তিনি আরো বলেন, (وَقَضَى رَبُّكَ أَلا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَاناً إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلاهُمَا فَلا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلاً كَرِيماً وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيراً )
অর্থাৎ, তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে; তাদের এক জন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে বিরক্তিসূচক কিছু বলো না এবং তাদেরকে ভর্ৎসনা করো না; বরং তাদের সাথে বলো সম্মানসূচক নম্র কথা। অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো এবং বলো, 'হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া কর; যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছে।'৬৩৮
উক্ত নির্দেশ-বাণী থেকে স্পষ্ট হয়, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। তাদেরকে বিরক্তিসূচক কথা বলা যাবে না। কোন ভুল ক'রে ফেললেও কোন প্রকার ভর্ৎসনা করা যাবে না। তাদের সাথে ভদ্রভাবে ও নম্রসুরে কথা বলতে হবে। তাদের মুখের উপর মুখ দেওয়া যাবে না। ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে তাদের নিকট বিনয়াবনত থাকতে হবে। তাদের জন্য দুআ করতে হবে। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে হবে। তাদের নিমকহারামি করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
﴿ وَوَصَّيْنَا الْأَنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ ﴾
অর্থাৎ, আমি তো মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। জননী কষ্টের পর কষ্ট বরণ ক'রে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে এবং তার স্তন্যপান ছাড়াতে দু'বছর অতিবাহিত হয়। সুতরাং তুমি আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।৬৩৯
পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার চরিত্রবানের সচ্চরিত্রতা কেন হবে না? তা যে মহান আল্লাহর ইবাদতের পর সর্বশ্রেষ্ঠ আমল। এমনকি নফল জিহাদের চাইতেও শ্রেষ্ঠ কর্ম।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, আমি নবী কে জিজ্ঞেস করলাম, 'কোন আমল আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়?' তিনি বললেন, "যথা সময়ে স্বলাত আদায় করা।” আমি বললাম, 'তারপর কোন্টি?' তিনি বললেন, "পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করা।” আমি বললাম, 'তারপর কোন্টি?' তিনি বললেন, "আল্লাহর পথে জিহাদ করা। "৬৪০
পিতামাতার সাথে দুর্ব্যবহার দুশ্চরিত্র সন্তানের অসদাচরণ কেন হবে না? তা যে মহান আল্লাহর ইবাদতে শির্ক করার পর সর্বনিকৃষ্ট আমল ও মহাপাপ। এমনকি প্রাণ হত্যার চাইতেও নিকৃষ্ট কর্ম ও মহা অপরাধ। মহানবী বলেছেন,
الكبَائِرُ : الإِشْرَاكُ بِاللهِ ، وَعُقُوقُ الوَالِدَيْنِ ، وَقَتْلُ النَّفْسِ ، وَاليَمِينُ الغَمُوسُ
"কাবীরাহ গুনাহসমূহ হচ্ছে, আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, প্রাণ হত্যা করা এবং মিথ্যা কসম খাওয়া।”৬৪১
আর সেই গুনাহ ও অপরাধের শাস্তি চরিত্রহীন সন্তান কিয়ামতের পূর্বে দুনিয়াতেও পেতে পারে। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
بَابَانِ مُعَجَّلانِ عُقُوبَتُهُما في الدُّنْيا البَغْيُ والعُقُوقُ
"দুটি (পাপ) দরজা এমন রয়েছে, যার শাস্তি দুনিয়াতেই ত্বরান্বিত করা হয়; বিদ্রোহ ও পিতা-মাতার অবাধ্যাচরণ।"৬৪২
হ্যাঁ, দুনিয়াতেই অবাধ্য সন্তানের সন্তানরা তার অবাধ্যতা করবে। যেমন কর্ম, তেমন ফললাভ করবে সে নিজের শেষ জীবনেও।
এক ব্যক্তির বাপ ছিল বৃদ্ধাশ্রমে। মৃত্যু-শয্যায় সে শেষ বারের মতো দেখার জন্য ছেলেকে ডেকে পাঠাল। ছেলে বাপের শেষ ইচ্ছা কিছু আছে কি না জিজ্ঞাসা করলে সে বলল, 'আমার রুমের এই ফ্যানটা খারাপ হয়ে গেছে বাবা, ঠিক ক'রে দিয়ো।' ছেলে বলল, 'তুমি তো চলেই যাবে, তবে আবার ফ্যান ঠিক ক'রে কী হবে?' বাপ বলল, 'কারণ তোমাকেও এসে থাকতে হবে তো, তাই বলে চললাম!'
আর পরকালে পিতামাতার অবাধ্য সন্তান বেহেস্তে যাবে না। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
وثَلاثَةٌ لا يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ العاقُ لِوَالِدَيْهِ والمُدْمِنُ الْخَمْرَ والمَنَّانُ بِمَا أَعْطَى
"তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না; পিতা-মাতার নাফরমান ছেলে, মদপানে অভ্যাসী মাতাল এবং দান করার পর যে বলে ও গর্ব করে বেড়ায় এমন খোঁটাদানকারী ব্যক্তি। "৬৪৩
বড় হতভাগা সে সন্তান, যে জান্নাত কাছে পেয়েও প্রবেশ করতে পারল না। জান্নাতের দরজা চিনতে ভুল করল অথবা উঠতি যৌবনের উন্মাদনা অথবা অন্য কিছু বা কেউ তাকে জান্নাতের দরজা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল। মহানবী বলেছেন,
رَغِمَ أَنفُ ، ثُمَّ رَغِمَ أنْفُ ، ثُمَّ رَغِمَ أنْفُ مَنْ أَدْرَكَ أَبَوِيهِ عِنْدَ الكِبَرِ ، أَحَدُهُما أَوْ كِلِيهِمَا فَلَمْ يَدْخُلِ الجَنَّةَ
"তার নাক ধূলিধূসরিত হোক, অতঃপর তার নাক ধূলিধূসরিত হোক, অতঃপর তার নাক ধূলিধূসরিত হোক, যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে বৃদ্ধ অবস্থায় পেল; একজনকে অথবা দু'জনকেই। অতঃপর সে (তাদের খিদমত ক'রে) জান্নাত যেতে পারল না।"
وَمَنْ أَدْرَكَ وَالِدَيْهِ أَوْ أَحَدَهُمَا فَدَخَلَ النَّارَ فَأَبْعَدَهُ اللَّهُ
'যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে অথবা তাদের একজনকে জীবিতাবস্থায় পেল অথচ তাকে দোযখে যেতে হবে, আল্লাহ তাকেও দূর করুন। '৬৪৪
হ্যাঁ, পিতামাতার বাধ্য থাকলে তবেই জান্নাত লাভ হবে সন্তানের। যদিও তাদের আনুগত্য করতে গিয়ে নিজের স্বার্থে ঘা পড়ে, সম্পদের ক্ষতি হয়, বন্ধুত্বে বাধা পড়ে, স্ত্রীর সুখ-সন্তুষ্টির ক্ষতি হয়।
মুআয বিন জাবাল বলেন, একদা এক ব্যক্তি নবী এর নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাকে এমন আমল শিখিয়ে দেন; যা করলে আমি জান্নাত প্রবেশ করতে পারব।' তিনি বললেন,
لا تُشْرِكْ بِاللهِ شَيْئًا وَإِنْ عُذِّبْتَ وَحُرِّقْتَ، وَأَطِعْ وَالِدَيْكَ وَإِنْ أَخْرَجَاكَ مِنْ مَالِكَ وَمِنْ كُلِّ شَيْءٍ هُوَ لَكَ، لَا تَتْرُكِ الصَّلَاةَ مُتَعَمِّدًا فَإِنَّهُ مَنْ تَرَكَ الصَّلَاةَ مُتَعَمِّدًا بَرِئَتْ مِنْهُ ذِمَّةُ اللَّهِ،
"তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক (অংশী) করো না; যদিও তোমাকে সে ব্যাপারে শাস্তি দেওয়া হয় এবং পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়। তোমার মাতা-পিতার আনুগত্য কর; যদিও তারা তোমাকে তোমার ধন-সম্পদ এবং সমস্ত কিছু থেকে দূর করতে চায়। আর ইচ্ছাকৃত স্বলাত ত্যাগ করো না; কারণ, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত স্বলাত ত্যাগ করে তার উপর থেকে আল্লাহর দায়িত্ব উঠে যায়। "৬৪৫
পিতামাতার উপরে স্ত্রীকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। সেই কঠিন মুহূর্তের সময় চরিত্রবান ছেলেকে ঈমানী পরীক্ষা দিয়ে পিতামাতার সাথে সদাচরণ করতে হবে এবং স্ত্রীর সাথেও ইনসাফ করতে হবে। স্ত্রী হকের প্রতিকূলে হলে তাকে প্রয়োজনে বর্জনও করতে হবে।
এক ব্যক্তি আবু দারদা এর নিকট এসে বলল, 'আমার এক স্ত্রী আছে। আমার মা তাকে ত্বালাক দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন।' আবু দার্দা বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি,
الوالد أوسط أبواب الجنة ، فإن شئت ، فأضع ذلك الباب ، أو احفظه
"পিতা-মাতা জান্নাতের দুয়ারসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দুয়ার। সুতরাং তুমি যদি চাও, তাহলে এ দুয়ারকে নষ্ট কর অথবা তার রক্ষণাবেক্ষণ কর।”৬৪৬
তবে আনুগত্যের ক্ষেত্রে মহানবী এর এ নির্দেশ অবশ্যই মনে রাখতে হবে,
لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق
"স্রষ্টার অবাধ্যতা করে কোন সৃষ্টির আনুগত্য নেই।”৬৪৭
সুতরাং ইনসাফে পিতামাতার দোষ থাকলে অবশ্যই স্ত্রীকে বর্জন করা যাবে না। আর তখনই সন্তানকে লাঠি মাঝখানে ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। নচেৎ পিতামাতা কষ্ট পেলে তারা যদি সন্তানের উপর বদ্দুআ করে, তাহলে জেনে রাখা ভালো যে, তা অবশ্যই ফলবে। যেহেতু রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
« ثلاث دعوات مستجابات لا شك فيهنَّ دعوة الوالد ودعوة المسافر ودعوة المظلوم »
"তিন জনের দুআ সন্দেহাতীতভাবে গৃহীত হয়: (১) নির্যাতিত ব্যক্তির দুআ, (২) মুসাফিরের দুআ এবং (৩) ছেলের জন্য মাতা-পিতার (দুআ বা) বদ্দুআ।"৬৪৮
কেন নয়? পিতামাতা সন্তানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে যে মহান প্রতিপালকও তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন। আর তারা অসন্তুষ্ট থাকলে তিনিও অসন্তুষ্ট থাকেন। মহানবী বলেছেন,
رضى الرب تبارك وتعالى في رضى الوالد ، وسخط الرب في سخط الوالد
“পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে রয়েছে আল্লাহ তাবারাকা অতাআলার সন্তুষ্টি, আর তাদের অসন্তুষ্টিতে রয়েছে তাঁর অসন্তুষ্টি।” ৬৪৯
অবশ্য আব্বার তুলনায় আম্মার মর্যাদা বেশি সন্তানের কাছে। আম্মা যে সন্তান পালনে বেশি কষ্ট করে। আম্মাই সন্তানের প্রতি বেশি মায়া করে। তাই আব্বার তুলনায় আম্মার রয়েছে ৩ গুণ বেশি মর্যাদা।
একটি লোক রাসূলুল্লাহ এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার কাছ থেকে সদ্ব্যবহার পাওয়ার বেশী হকদার কে?' তিনি বললেন, "তোমার মা।” সে বলল, 'তারপর কে?' তিনি বললেন, "তোমার মা।” সে বলল, 'তারপর কে?' তিনি বললেন, "তোমার মা।” সে বলল, 'তারপর কে?' তিনি বললেন, "তোমার বাপ। "৬৫০
ইসলাম রক্ষার জন্য জিহাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। কিন্তু তা নফল হলে তার তুলনায় পিতামাতার সেবা হল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মুআবিয়া বিন জাহেমাহ সুলামী বলেন, একদা জাহেমাহ নবী এর নিকট এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমি জিহাদ করব মনস্থ করেছি, তাই আপনার নিকট পরামর্শ নিতে এসেছি।' এ কথা শুনে তিনি বললেন, "তোমার মা আছে কি?" জাহেমাহ বললেন, 'হ্যাঁ'। তিনি বললেন,
فَالْزَمُهَا فَإِنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ رِجْلَيْهَا
"তাহলে তুমি তার খিদমতে অবিচল থাক। কারণ, তার পদতলে তোমার জান্নাত রয়েছে।"৬৫১
মা-বাপ কাফের হলে দ্বীনের ব্যাপারে তাদের আনুগত্য করা যাবে না। কিন্তু তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَإِن جَاهَدَاكَ عَلَى أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ)
"তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার অংশী করতে পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মান্য করো না, তবে পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস কর এবং যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অবলম্বন কর, অতঃপর আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে অবহিত করব।”৬৫২
আসমা বিন্তে আবূ বাক্ সিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, নবী এর যুগে আমার অমুসলিম মা আমার কাছে এল। আমি নবী কে জিজ্ঞেস করলাম; বললাম, 'আমার মা (ইসলাম) অপছন্দ করা অবস্থায় (আমার সম্পদের লোভ রেখে) আমার নিকট এসেছে, আমি তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখব কি?' তিনি বললেন, "হ্যাঁ, তুমি তোমার মায়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ।"৬৫৩
বাপ-মায়ের মাঝে কোন বিবাদে কোন এক পক্ষের কথা শুনে তার পক্ষ অবলম্বন করা এবং অপর পক্ষকে দোষারোপ করা উচিত নয় সন্তানের। যেহেতু বিবাদের কারণ এমন গোপন হতে পারে, যা সন্তানের কাছে প্রকাশ পাওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। আর সেই ক্ষেত্রে অন্য পক্ষকে কটু কথা বলা অথবা তার গীবত করা অথবা উভয়ের মাঝে চুগলী করা বৈধ নয়।
বর্তমানের ছেলেমেয়েরা সরাসরি মা-বাপকে গালি দেয়। সে যুগে দিত না। আব্দুল্লাহ ইবনে আম্র ইবনে আস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ বললেন, "কাবীরাহ গুনাহসমূহের একটি হল আপন পিতা-মাতাকে গালি দেওয়া।" জিজ্ঞেস করা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপন পিতা-মাতাকে কি কোন ব্যক্তি গালি দেয়?' তিনি বললেন,
نَعَمْ ، يَسُبُّ أَبَا الرَّجُلِ ، فَيَسُبُّ أَبَاهُ ، وَيَسُبُّ أُمَّهُ ، فَيَسُبُّ أُمَّهُ
"হ্যাঁ, সে লোকের পিতাকে গালি-গালাজ করে, তখন সেও তার পিতাকে গালি-গালাজ ক'রে থাকে এবং সে অন্যের মা-কে গালি দেয়, সুতরাং সেও তার মা-কে গালি দেয়। "৬৫৪
সুতরাং চরিত্রবান সন্তান পিতামাতাকে সরাসরি গালি তো দেয়ই না, পরন্তু অপরের পিতামাতাকে গালাগালি ক'রে তাদেরকে গালি খাওয়ায় না।
অনেক সময় তরবিয়ত-বিরোধী কাজ করে ছেলে-মেয়েরা। ফলে লোকেরা তা দেখে তাদের পিতামাতাকে গালি দেয়। সে খেয়ালও করা উচিত চরিত্রবান ছেলে-মেয়েদের।
পিতামাতার ইন্তিকালের পর তাঁদের আত্মীয়-বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও চরিত্রবান নেক সন্তানের কর্তব্য। এই জন্য সৎ-মা বা সৎ-বাপকে ভালোবাসা এবং তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও চরিত্রবানের সুন্দর আচরণ। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ أَبَرَّ البِرِّ أَنْ يَصِلَ الرَّجُلُ وُدَّ أَبِيهِ
"পিতার মৃত্যুর পর তার বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা সবচেয়ে বড় নেকীর কাজ।"৬৫৫
তাঁদের গত হওয়ার পর তাঁদের নামে সদকা করা চরিত্রবান সুসন্তানের কাজ। যেমন সাহাবী সা'দ বিন উবাদাহ তাঁর মিখরাফের বাগান নিজ মায়ের নামে সদকাহ করেছিলেন।৬৫৬
চরিত্রবান ছেলের আচরণ এ হতে পারে না যে, সে তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভালো বাড়িতে সুখে বাস করবে এবং তার বৃদ্ধ পিতামাতাকে অচল বাড়িতে রাখবে অথবা বৃদ্ধ-খোঁয়াড়ে রেখে আসবে।
সে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখে থাকবে এবং জন্মদাতা ও পালনকর্তা পিতামাতা শেষ বয়সেও রুযীর সন্ধানে পরিশ্রম ক'রে বেড়াবে অথবা ভিক্ষা ক'রে বেড়াবে।
ইমাম ইবনে হায্য (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'পিতামাতার এর থেকে বড় নাফরমানি আর কী হতে পারে যে, ছেলে ধনী হবে, আর তার বাপ, দাদা বা নানাকে লোকের বাথরুম পরিষ্কার করতে অথবা পশু-পালন করতে অথবা রাস্তা ঝাড়ু দিতে অথবা কাপড় ধুতে বাধ্য করবে। তার মা, দাদী বা নানীকে লোকের ঘরে পাট করতে অথবা রাস্তায় পানি (বা অন্য কিছু) বিক্রি করতে বাধ্য করবে।
এ কাজে নিশ্চয় সে সন্তান মহান আল্লাহর এই নির্দেশের বিরোধী, যাতে বলা হয়েছে, "অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থাকবে।"৬৫৭
মহান আল্লাহর নির্দেশ হল, সন্তান মা-বাপের বাধ্য ও অনুগত থাকবে। আর সে নির্দেশ পালন করলে তবেই সে চরিত্রবান সন্তান হবে। ছেলেদের চাইতে মেয়েরা অবশ্যই দুর্বল, তাই তারাই বেশী মা-বাপের বাধ্য থাকে। বাপের অনুমতি ছাড়া তাদের বিবাহ হয় না। কিন্তু সেই মেয়েদের ব্যাপারে কী বলবেন, যারা পালনকর্তা মা-বাপের বুকে লাথি মেরে এবং গালে চুন-কালি দিয়ে চোরের মতো পালিয়ে গিয়ে রসিক নাগরের সাথে ব্যভিচারের ঘর বাঁধে?
টিকাঃ
৬৩৭. সূরা আনকাবূত ৮
৬৩৮. সূরা বানী ইস্রাঈল ২৩-২৪
৬৩৯. সূরা লুকমান ১৪
৬৪০. বুখারী ৫২৭, মুসলিম ২৬২, তিরমিযী, নাসাঈ
৬৪১. বুখারী ৬৬৭৫, ৬৮৭০
৬৪২. হাকেম ৭৩৫০, সহীহুল জামে' ২৮১০
৬৪৩. আহমাদ ৬১৮০, নাসাঈর কুবরা ২৩৪৩, হাকেম ২৫৬২, সহীহুল জামে' ৩০৭১
৬৪৪. ইবনে হিব্বান ৯০৭, সহীহ তারগীব ৯৯৬
৬৪৫. ত্বাবারানীর আউসাত্ব ৭৯৫৬, সহীহ তারগীব ৫৬৯
৬৪৬. তিরমিযী ১৯০০
৬৪৭. তাবারানী ১৪৭৯৫, আহমাদ ২০৬৫৩
৬৪৮. আবু দাউদ ১৫৩৮, তিরমিযী ১৯০৫, ৩৪৪৮, ইবনে মাজাহ ৩৮৬২, সিলসিলাহ সহীহাহ ৫৯৬
৬৪৯. তিরমিযী ১৮৯৯, হাকেম ৭২৪৯, বাযযার ২৩৯৪, ত্বাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহ ৫১৬
৬৫০. বুখারী ৫৯৭১, মুসলিম ৬৬৬৪
৬৫১. আহমাদ ১৫৫৩৮, নাসাঈ ৩১০৪, ইবনে মাজাহ ২৭৮১, বাইহাক্বী ১৮২৮৮, হাকেম ২৫০২
৬৫২. লুকুমান: ১৫
৬৫৩. বুখারী ২৬২০, ৩১৮৩, ৫৯৭৯, মুসলিম ২৩৭১-২৩৭২
৬৫৪. বুখারী ৫৯৭৩, মুসলিম ২৭৩
৬৫৫. মুসলিম ৬৬৭৭-৬৬৭৯
৬৫৬. বুখারী ২৭৫৬নং প্রমুখ
৬৫৭. আল-মুহাল্লা ১০/১০৮
📄 সন্তানের সাথে সদাচরণ
সন্তানের সাথে সদ্ব্যবহার করা চরিত্রবান পিতামাতার অন্যতম মহৎ কর্তব্য। সন্তানকে সুসন্তানরূপে গড়ে তুলতে হবে। আল্লাহর আদেশক্রমে সন্তান-সন্ততিকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ )
"হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন হতে রক্ষা কর, যার ইন্ধন মানুষ ও পাথর, যার নিয়ন্ত্রণভার অর্পিত আছে নির্মম-হৃদয় কঠোর-স্বভাব ফিরিস্তাগণের উপর, যারা আল্লাহ তাদেরকে যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদিষ্ট হয় তাই করে।"৬৫৮
তাছাড়া আমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। আর সন্তানের দায়িত্বশীলতা সম্পর্কে কিয়ামতে প্রশ্ন করা হবে। তাই সদাচারী হয়ে সন্তানকেও চরিত্রবান বানাবার গুরু-दायিত্ব সুন্দরভাবে পালন করতে হবে পিতামাতাকে। আর তার জন্য নিম্নোক্ত উপদেশমালা মেনে চলুনঃ
১. সন্তানের সুন্দর দেখে নাম রাখুন। অসুন্দর নাম রেখে ছেলে-মেয়েকে লজ্জা দেবেন না।
২. যথাসময়ে ছেলের তরফ থেকে ২টি ও মেয়ের তরফ থেকে ১টি পশু আকীকা করুন।
৩. যথাসময়ে ছেলের খতনা করান।
৪. উর্ধ্বপক্ষে পূর্ণ ২ বছর তাকে মায়ের দুধ পান করান। মায়ের দুধের কোন বিকল্প নেই।
৫. সর্বপ্রথম তাকে কালেমা শিখিয়ে দিন এবং ঈমানী বীজ বপন করুন তার হৃদয়-মনে।
৬. সাত বছর বয়স হলে তাকে স্বলাতের আদেশ করুন। দশ বছরে স্বলাতের জন্য প্রহার করুন এবং ছেলে-মেয়ের বিছানা পৃথক করে দিন।
৭. সুন্দর চরিত্র শিক্ষা দিন। শিশুর প্রকৃতি বড় স্বচ্ছ ও অনুকরণ-প্রিয়। সে আপনাদের পরিবেশ ও চরিত্র অনুযায়ী গড়ে উঠবে সে খেয়াল রাখবেন।
৮. সকল প্রকার অসচ্চরিত্রতা থেকে দূরে রাখবেন।
৬. সন্তানের জন্য কথায় কথায়; খুশী অথবা রাগের সময় হিদায়াতের দুআ করুন। আর কোন সময়ই বদ্দুআ করবেন না। কারণ সন্তানের হক্কে মা-বাপের দুআ কবুল হয়। আর তাতে আপনাদের নিজেরই ক্ষতি।
৭. ছেলেদের সামনে মার্জিত কথাবার্তা বলবেন। কারণ, তারা তো আপনাদের ভাষা শুনেই কথা বলতে শিখবে। নোংরা কথা বলবেন না। তাদের সামনে স্বামী-স্ত্রী ঝগড়াও করবেন না খারাপ কথা বলে। তাদের সাথে মিথ্যা কথা বলবেন না।
৮. সন্তানের জন্য নিজে আদর্শ ও নমুনা হন। আর জেনে রাখুন, ‘দুধ গুণে ঘি, মা গুণে ঝি। আটা গুণে রুটি, মা গুণে বেটি। যেই মত কোদাল হবে সেই মত চাপ, সেই মত বেটা হবে যেই মত বাপ।’ সাধারণতঃ এরূপই হয়ে থাকে।
৯. ছেলেদের সামনে স্ববিরোধিতা থেকে দূরে থাকুন। আপনি যেটা করেন, তা করতে সন্তানকে নিষেধ করলে ফলপ্রসূ হবে না।
১০. তাদের সাথে কোন ওয়াদা করলে ওয়াদা পূরণ করুন। কখনো ওয়াদা ভঙ্গ করবেন না।
১১. ঘর থেকে সকল প্রকার অশ্লীলতা দূর করুন। অশ্লীল ছবি, ভিডিও, টিভি ইত্যাদি ঘরে রাখবেন না। বাইরেও দেখতে দেবেন না। নচেৎ, তাতে তাদের পড়াশোনা যাবে, চরিত্রও যাবে।
১২. পারলে শ্লীলতাপূর্ণ সিডি বা ক্যাসেট এনে রাখতে পারেন। গান-বাজনা ও অশ্লীলতা-বর্জিত সিডি-ক্যাসেট হল বর্তমানে মুসলিমদের বিকল্প বস্তু।
১৩. যৌন-চেতনার সাথে সাথে যৌন অপরাধ থেকে দূরে রাখার শতভাবে চেষ্টা করুন। খেয়াল রাখুন, যাতে তারা নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার না হয়ে পড়ে।
১৪. তাদেরকে মেহনতী ও কর্মঠ হতে অভ্যাসী বানান। খাওয়া-পরাতে মধ্যম ধরনের জীবনযাপনে অভ্যাস করান। সকল প্রকার বিলাসিতা থেকে দূরে রাখুন।
১৫. তাদের বয়স অনুযায়ী ব্যবহার পরিবর্তন করুন। ছেলে বড় হলে তার সাথে তেমনি ব্যবহার করুন, যেমন করেন ভাইয়ের সাথে।
১৬. তাদের ব্যাপারে উদাসীন হবেন না। তাদের খোঁজ-খবর নিন। কোথায় যায়-আসে, কোথায় রাত্রিবাস করে, তাদের বন্ধু কে ইত্যাদি তদন্ত ক'রে দেখুন। তবে হ্যাঁ, তাদের প্রতি বিশ্বাস হারাবেন না এবং বেশী বিশ্বাসও ক'রে বসবেন না।
১৭. সন্তানের ছোট ভুলকে বড় ক'রে দেখবেন না। যত পারেন, ক্ষমা প্রদর্শন করুন।
১৮. যেমন ভুল, ঠিক তেমনি শাস্তি প্রয়োগ করুন। ‘লঘু পাপে গুরু দণ্ড’ ব্যবহার করবেন না। মশা মারতে কামান দাগবেন না। নচেৎ, 'বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো' হয়ে যাবে। হ্যাঁ, যেমন দুনিয়ার কাজের জন্য তাদেরকে মারধর করেন, তেমনি দ্বীনের কাজের জন্যও সমান খেয়াল রাখবেন।
১৯. খবরদার শাসনের ব্যাপারে তাদেরকে প্রশ্রয় দেবেন না। স্ত্রীরও উচিত নয়, আপনি শাসন করলে তার প্রশ্রয় দেওয়া অথবা ছেলে-মেয়ের কোন পাপ গোপন করা। তেমনি স্ত্রী শাসন করলে আপনারও আশকারা দেওয়া উচিত নয়।
২০. তাদের পড়াশোনার জন্য ভালো স্কুল বেছে নিন। খবরদার এমন স্কুলে দেবেন না, যেখানে তাদের আকীদা বেদ্বীনের বা বিজাতির আকীদা হয়ে যায়।
২১. যথাসম্ভব ছেলেমেয়ের সাথে বাস করুন এবং তাদের থেকে দূরে থাকবেন না। নানা কাজের ঝামেলা ও ব্যস্ততার মাঝে তাদের জন্যও আপনার কিছু সময় ব্যয় করুন।
২২. মসজিদ, জালসা ও ইল্মী মজলিসে তাদেরকে সাথে নিয়ে উপস্থিত হন।
২৩. বিয়ের বয়স হলে ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিন। নচেৎ তারা কোন পাপ ক'রে বসলে আপনাদেরও পাপ হবে।
২৪. ভরণ-পোষণ, স্নেহ-প্রীতি, উপহার ও দানে সকলের মাঝে ইনসাফ বজায় রাখুন। সন্তান এক স্ত্রীর হোক অথবা একাধিক স্ত্রীর, পিতার কাছে সকলেই সমান।
২৫. তাদের প্রতি স্নেহশীল হন। মমতা প্রদর্শন করুন।
২৬. কন্যা সন্তান প্রতিপালনে বেশি যত্ন নিন। যাতে তার কোন পদস্খলন না ঘটে যায় এবং সুপাত্র তার ভাগ্যে জোটে। এর জন্য রয়েছে বিশাল মাহাত্ম্য। মহানবী বলেছেন,
مَنْ عَالَ ابْنَتَيْنِ أَوْ ثَلَاثَ بَنَاتٍ أَوْ أُخْتَيْنِ أَوْ ثَلَاثَ أَخَوَاتٍ حَتَّى يَمُتُنَ أَوْ يَمُوتَ عَنْهُنَّ كُنْتُ أَنَا وَهُوَ كَهَاتَيْنِ وَأَشَارَ بِأَصْبُعَيْهِ السَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى
"যে ব্যক্তি দুটি অথবা তিনটি কন্যা, কিংবা দুটি অথবা তিনটি বোন তাদের মৃত্যু অথবা বিবাহ, অথবা সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত, কিংবা ঐ ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত যথার্থ প্রতিপালন করে, সে ব্যক্তি আর আমি (পরকালে) তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলিদ্বয়ের মত পাশাপাশি অবস্থান করব।”৬৫৯
টিকাঃ
৬৫৮. তাহরীম: ৬
৬৫৯. আহমাদ ১২৪৯৮, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৯৬
সন্তানের সাথে সদ্ব্যবহার করা চরিত্রবান পিতামাতার অন্যতম মহৎ কর্তব্য। সন্তানকে সুসন্তানরূপে গড়ে তুলতে হবে। আল্লাহর আদেশক্রমে সন্তান-সন্ততিকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ )
"হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন হতে রক্ষা কর, যার ইন্ধন মানুষ ও পাথর, যার নিয়ন্ত্রণভার অর্পিত আছে নির্মম-হৃদয় কঠোর-স্বভাব ফিরিস্তাগণের উপর, যারা আল্লাহ তাদেরকে যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদিষ্ট হয় তাই করে।"৬৫৮
তাছাড়া আমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। আর সন্তানের দায়িত্বশীলতা সম্পর্কে কিয়ামতে প্রশ্ন করা হবে। তাই সদাচারী হয়ে সন্তানকেও চরিত্রবান বানাবার গুরু-दायিত্ব সুন্দরভাবে পালন করতে হবে পিতামাতাকে। আর তার জন্য নিম্নোক্ত উপদেশমালা মেনে চলুনঃ
১. সন্তানের সুন্দর দেখে নাম রাখুন। অসুন্দর নাম রেখে ছেলে-মেয়েকে লজ্জা দেবেন না।
২. যথাসময়ে ছেলের তরফ থেকে ২টি ও মেয়ের তরফ থেকে ১টি পশু আকীকা করুন।
৩. যথাসময়ে ছেলের খতনা করান।
৪. উর্ধ্বপক্ষে পূর্ণ ২ বছর তাকে মায়ের দুধ পান করান। মায়ের দুধের কোন বিকল্প নেই।
৫. সর্বপ্রথম তাকে কালেমা শিখিয়ে দিন এবং ঈমানী বীজ বপন করুন তার হৃদয়-মনে।
৬. সাত বছর বয়স হলে তাকে স্বলাতের আদেশ করুন। দশ বছরে স্বলাতের জন্য প্রহার করুন এবং ছেলে-মেয়ের বিছানা পৃথক করে দিন।
৭. সুন্দর চরিত্র শিক্ষা দিন। শিশুর প্রকৃতি বড় স্বচ্ছ ও অনুকরণ-প্রিয়। সে আপনাদের পরিবেশ ও চরিত্র অনুযায়ী গড়ে উঠবে সে খেয়াল রাখবেন।
৮. সকল প্রকার অসচ্চরিত্রতা থেকে দূরে রাখবেন।
৬. সন্তানের জন্য কথায় কথায়; খুশী অথবা রাগের সময় হিদায়াতের দুআ করুন। আর কোন সময়ই বদ্দুআ করবেন না। কারণ সন্তানের হক্কে মা-বাপের দুআ কবুল হয়। আর তাতে আপনাদের নিজেরই ক্ষতি।
৭. ছেলেদের সামনে মার্জিত কথাবার্তা বলবেন। কারণ, তারা তো আপনাদের ভাষা শুনেই কথা বলতে শিখবে। নোংরা কথা বলবেন না। তাদের সামনে স্বামী-স্ত্রী ঝগড়াও করবেন না খারাপ কথা বলে। তাদের সাথে মিথ্যা কথা বলবেন না।
৮. সন্তানের জন্য নিজে আদর্শ ও নমুনা হন। আর জেনে রাখুন, ‘দুধ গুণে ঘি, মা গুণে ঝি। আটা গুণে রুটি, মা গুণে বেটি। যেই মত কোদাল হবে সেই মত চাপ, সেই মত বেটা হবে যেই মত বাপ।’ সাধারণতঃ এরূপই হয়ে থাকে।
৯. ছেলেদের সামনে স্ববিরোধিতা থেকে দূরে থাকুন। আপনি যেটা করেন, তা করতে সন্তানকে নিষেধ করলে ফলপ্রসূ হবে না।
১০. তাদের সাথে কোন ওয়াদা করলে ওয়াদা পূরণ করুন। কখনো ওয়াদা ভঙ্গ করবেন না।
১১. ঘর থেকে সকল প্রকার অশ্লীলতা দূর করুন। অশ্লীল ছবি, ভিডিও, টিভি ইত্যাদি ঘরে রাখবেন না। বাইরেও দেখতে দেবেন না। নচেৎ, তাতে তাদের পড়াশোনা যাবে, চরিত্রও যাবে।
১২. পারলে শ্লীলতাপূর্ণ সিডি বা ক্যাসেট এনে রাখতে পারেন। গান-বাজনা ও অশ্লীলতা-বর্জিত সিডি-ক্যাসেট হল বর্তমানে মুসলিমদের বিকল্প বস্তু।
১৩. যৌন-চেতনার সাথে সাথে যৌন অপরাধ থেকে দূরে রাখার শতভাবে চেষ্টা করুন। খেয়াল রাখুন, যাতে তারা নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার না হয়ে পড়ে।
১৪. তাদেরকে মেহনতী ও কর্মঠ হতে অভ্যাসী বানান। খাওয়া-পরাতে মধ্যম ধরনের জীবনযাপনে অভ্যাস করান। সকল প্রকার বিলাসিতা থেকে দূরে রাখুন।
১৫. তাদের বয়স অনুযায়ী ব্যবহার পরিবর্তন করুন। ছেলে বড় হলে তার সাথে তেমনি ব্যবহার করুন, যেমন করেন ভাইয়ের সাথে।
১৬. তাদের ব্যাপারে উদাসীন হবেন না। তাদের খোঁজ-খবর নিন। কোথায় যায়-আসে, কোথায় রাত্রিবাস করে, তাদের বন্ধু কে ইত্যাদি তদন্ত ক'রে দেখুন। তবে হ্যাঁ, তাদের প্রতি বিশ্বাস হারাবেন না এবং বেশী বিশ্বাসও ক'রে বসবেন না।
১৭. সন্তানের ছোট ভুলকে বড় ক'রে দেখবেন না। যত পারেন, ক্ষমা প্রদর্শন করুন।
১৮. যেমন ভুল, ঠিক তেমনি শাস্তি প্রয়োগ করুন। ‘লঘু পাপে গুরু দণ্ড’ ব্যবহার করবেন না। মশা মারতে কামান দাগবেন না। নচেৎ, 'বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো' হয়ে যাবে। হ্যাঁ, যেমন দুনিয়ার কাজের জন্য তাদেরকে মারধর করেন, তেমনি দ্বীনের কাজের জন্যও সমান খেয়াল রাখবেন।
১৯. খবরদার শাসনের ব্যাপারে তাদেরকে প্রশ্রয় দেবেন না। স্ত্রীরও উচিত নয়, আপনি শাসন করলে তার প্রশ্রয় দেওয়া অথবা ছেলে-মেয়ের কোন পাপ গোপন করা। তেমনি স্ত্রী শাসন করলে আপনারও আশকারা দেওয়া উচিত নয়।
২০. তাদের পড়াশোনার জন্য ভালো স্কুল বেছে নিন। খবরদার এমন স্কুলে দেবেন না, যেখানে তাদের আকীদা বেদ্বীনের বা বিজাতির আকীদা হয়ে যায়।
২১. যথাসম্ভব ছেলেমেয়ের সাথে বাস করুন এবং তাদের থেকে দূরে থাকবেন না। নানা কাজের ঝামেলা ও ব্যস্ততার মাঝে তাদের জন্যও আপনার কিছু সময় ব্যয় করুন।
২২. মসজিদ, জালসা ও ইল্মী মজলিসে তাদেরকে সাথে নিয়ে উপস্থিত হন।
২৩. বিয়ের বয়স হলে ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিন। নচেৎ তারা কোন পাপ ক'রে বসলে আপনাদেরও পাপ হবে।
২৪. ভরণ-পোষণ, স্নেহ-প্রীতি, উপহার ও দানে সকলের মাঝে ইনসাফ বজায় রাখুন। সন্তান এক স্ত্রীর হোক অথবা একাধিক স্ত্রীর, পিতার কাছে সকলেই সমান।
২৫. তাদের প্রতি স্নেহশীল হন। মমতা প্রদর্শন করুন।
২৬. কন্যা সন্তান প্রতিপালনে বেশি যত্ন নিন। যাতে তার কোন পদস্খলন না ঘটে যায় এবং সুপাত্র তার ভাগ্যে জোটে। এর জন্য রয়েছে বিশাল মাহাত্ম্য। মহানবী বলেছেন,
مَنْ عَالَ ابْنَتَيْنِ أَوْ ثَلَاثَ بَنَاتٍ أَوْ أُخْتَيْنِ أَوْ ثَلَاثَ أَخَوَاتٍ حَتَّى يَمُتُنَ أَوْ يَمُوتَ عَنْهُنَّ كُنْتُ أَنَا وَهُوَ كَهَاتَيْنِ وَأَشَارَ بِأَصْبُعَيْهِ السَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى
"যে ব্যক্তি দুটি অথবা তিনটি কন্যা, কিংবা দুটি অথবা তিনটি বোন তাদের মৃত্যু অথবা বিবাহ, অথবা সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত, কিংবা ঐ ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত যথার্থ প্রতিপালন করে, সে ব্যক্তি আর আমি (পরকালে) তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলিদ্বয়ের মত পাশাপাশি অবস্থান করব।”৬৫৯
টিকাঃ
৬৫৮. তাহরীম: ৬
৬৫৯. আহমাদ ১২৪৯৮, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৯৬