📄 পরোপকারিতা
পরের উপকারে আসব, কিন্তু করব না। চরিত্রবান মানুষের এমন হওয়া উচিত নয়। অনেক সময় অনেক মানুষ দ্বারা ছোট উপকারের জন্য বড় মানুষকে তার খোশামদি করতে হয়। কিন্তু সে পাত্তা দেয় না। মুখ তুলে কথা বলে না, ফোনে জবাব দেয় না অথবা ব্যস্ততা প্রকাশ করে। তখন সেই ছোট মনের অনুদার মানুষের ভাবখানা শিয়ালের মতো হয়। 'শিয়ালের গু কাজে লাগে, শিয়াল গিয়ে পর্বতে হাগে।'
চরিত্রবান মানুষ এমন হয় না। বরং সে কারো উপকারে আসলে, তাতে সে আনন্দিত হয় এবং সানন্দ-চিত্তে সেই উপকার সাধন করতে পেরে মনে-প্রাণে তৃপ্তি লাভ করে। যেহেতু পরের উপকার করতে পেরে যে আনন্দ লাভ হয়, তার মতো বড় আনন্দ আর অন্য কিছুতে নেই। আর পরের উপকার যে করে, তার চেয়ে বড় ভালো মানুষ আর অন্য কেউ হতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
خَيْرُ النَّاسِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ
“সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।”৫৮২
কোনও উপলক্ষ্যে কাউকে একটা উপহার দিয়ে আনন্দ দেওয়া যায়। তা শ্রেষ্ঠ কাজ।
কাউকে ঋণ দিয়ে উপকার করা যায়। আর তাতে সে আনন্দিত হয় এবং ঋণদাতার দেওয়া টাকার অর্ধেক টাকা সদকা করার সমান সওয়াব লাভ হয়।
কারো ঋণ পরিশোধ ক'রে দিয়ে তাকে স্বস্তি দেওয়া যায় এবং উপকৃত করা যায়।
কোন ক্ষুধার্থকে অন্নদান ক'রে আনন্দিত ও পরিতৃপ্ত করা যায়। এতে তার অনেক দুআ পাওয়া যায়। আর সওয়াব তো আছেই।
উক্ত সকল কাজ নিশ্চয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ। মহানবী বলেছেন,
أفْضَلُ الأَعْمالِ أنْ تُدْخِلَ على أخِيكَ المُؤْمِنِ سُرُوراً أَوْ تَقْضِيَ عَنهُ دَيْناً أَوْ تُطْعِمَهُ خُبْزاً
"সর্বশ্রেষ্ঠ আমল হল, (মু'মিন) মুসলিমের মনে তোমার আনন্দ ভরে দেওয়া, অথবা তার ঋণ পরিশোধ ক'রে দেওয়া অথবা তাকে রুটি খাওয়ানো।"৫৮৩
আর এ কথা পূর্বেই জেনেছি যে, যে ব্যক্তি মানুষের জন্য উপকারী, সে মহান প্রতিপালকের নিকট সবার চাইতে বেশি প্রিয় এবং কোনও ভাবে কোন মুসলিমকে খোশ করাও তাঁর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল। মহানবী বলেছেন,
أَحَبُّ النَّاسِ إلى الله أَنْفَعُهُمْ وأَحَبُّ الأَعْمَالِ إلى الله عَزَّ وَجَلَّ سُرُورٌ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ
"আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম মানুষ সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশী উপকারী এবং আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম আমল সেই আমল, যা ক'রে একজন মুসলিমকে আনন্দ দেওয়া যায়।"৫৮৪
অবশ্যই সে উপকার নিজ সাধ্যমতো করা যাবে। নচেৎ মহান আল্লাহ
(لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا)
"আল্লাহ কাউকেও তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না।"৫৮৫
(لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا مَا آتَاهَا )
"আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তার চেয়ে গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না। ৫৮৬
অতএব চরিত্রবানের উচিত, যদি সে কারো সুখের গল্প লেখার পেন্সিল হতে না পারে, তাহলে যেন কারো দুঃখ মোছার রবার হয়ে যায়। লোহা দিয়ে সোনার গয়না তৈরী হয় না ঠিকই, কিন্তু সোনার গয়না তৈরী করতে লোহার হাতুড়ির দরকার হয়। সুতরাং সোনা না হতে পারলেও লোহা হওয়া উচিত।
উপকার করলে উপকৃত মানুষ উপকারীর দাসে পরিণত হয়। যেহেতু প্রতি দানই প্রতিদান চায়। ফলে সে উপকারের বিনিময়ে অনুরূপ উপকার না করতে পারলে উপকারীর অনুগত হয়ে যায়। মুলহাব বিন আবী সাফরাহ বলেন, 'আমি দেখে অবাক হই যে, লোকেরা নিজ মাল দিয়ে গোলাম ক্রয় করে, অথচ উপকারিতা দিয়ে স্বাধীন মানুষ ক্রয় করে না।'
সতর্কতার বিষয় যে, অনেকে উপকার করতে গিয়ে অপকার ক'রে বসে। বহু নির্বোধ বা আবেগী মানুষ দ্বারা এমন উল্টা কাজ ঘটে যেতে পারে। যেমন- নদীর জোয়ারে একটি বড় মাছ বালুচরে আটকে গিয়ে লাফাতে থাকে। কিছু বানর তাকে দেখে দয়া হলে তাকে পাড়ে তুলে দেয়, যাতে পানিতে পড়ে প্রাণ না হারায়!
একজন বিধবার উপকার করতে গিয়ে তার গায়ে কলঙ্কের ছাপ লেগে যায়।
একজন তরুণীকে দ্বীন শিখাতে গিয়ে সে তার প্রেমে পড়ে দ্বীনদারি নষ্ট ক'রে বসে।
কোন বিবাহিতার উপকার করতে গিয়ে সে যেন নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু না করে। মনে রাখতে হবে মহানবী এর সতর্কবাণী,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ خَبَّبَ امْرَأَةً عَلَى زَوْجِهَا أَوْ عَبْدًا عَلَى سَيِّدِهِ
"যে ব্যক্তি কারো স্ত্রী অথবা ক্রীতদাসকে তার (স্বামী বা প্রভুর বিরুদ্ধে) প্ররোচিত করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”৫৮৭
অনেকে অনেকের বাতের ব্যথা ভালো করতে গিয়ে কুষ্ঠব্যাধি সৃষ্টি ক'রে বসে। অতএব সাবধান সকলে।
টিকাঃ
৫৮২. সঃ জামে' ৩২৮৯, দারাকুতুনী, সিঃ সহীহাহ ৪২৬
৫৮৩. বাইহাক্বী ৭৬৭৮, ইবনে আবিদ দুনয়া, সিঃ সহীহাহ ১৪৯৪
৫৮৪. তাবারানী ১৩৪৬৮, ইবনে আবিদ দুনয়া, সহীহ তারগীব ২০৯০, সিলসিলাহ সহীহাহ ৯০৬, সহীহুল জামে' ১৭৬
৫৮৫. সূরা বাক্বারাহ-২: ২৮৬
৫৮৬. ত্বালাক্ব: ৭
৫৮৭. আহমাদ ৯১৫৭, আবু দাউদ ২১৭৭, হাকেম ২৭৯৫, ইবনে হিব্বান ৫৫৬০
পরের উপকারে আসব, কিন্তু করব না। চরিত্রবান মানুষের এমন হওয়া উচিত নয়। অনেক সময় অনেক মানুষ দ্বারা ছোট উপকারের জন্য বড় মানুষকে তার খোশামদি করতে হয়। কিন্তু সে পাত্তা দেয় না। মুখ তুলে কথা বলে না, ফোনে জবাব দেয় না অথবা ব্যস্ততা প্রকাশ করে। তখন সেই ছোট মনের অনুদার মানুষের ভাবখানা শিয়ালের মতো হয়। 'শিয়ালের গু কাজে লাগে, শিয়াল গিয়ে পর্বতে হাগে।'
চরিত্রবান মানুষ এমন হয় না। বরং সে কারো উপকারে আসলে, তাতে সে আনন্দিত হয় এবং সানন্দ-চিত্তে সেই উপকার সাধন করতে পেরে মনে-প্রাণে তৃপ্তি লাভ করে। যেহেতু পরের উপকার করতে পেরে যে আনন্দ লাভ হয়, তার মতো বড় আনন্দ আর অন্য কিছুতে নেই। আর পরের উপকার যে করে, তার চেয়ে বড় ভালো মানুষ আর অন্য কেউ হতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
خَيْرُ النَّاسِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ
“সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।”৫৮২
কোনও উপলক্ষ্যে কাউকে একটা উপহার দিয়ে আনন্দ দেওয়া যায়। তা শ্রেষ্ঠ কাজ।
কাউকে ঋণ দিয়ে উপকার করা যায়। আর তাতে সে আনন্দিত হয় এবং ঋণদাতার দেওয়া টাকার অর্ধেক টাকা সদকা করার সমান সওয়াব লাভ হয়।
কারো ঋণ পরিশোধ ক'রে দিয়ে তাকে স্বস্তি দেওয়া যায় এবং উপকৃত করা যায়।
কোন ক্ষুধার্থকে অন্নদান ক'রে আনন্দিত ও পরিতৃপ্ত করা যায়। এতে তার অনেক দুআ পাওয়া যায়। আর সওয়াব তো আছেই।
উক্ত সকল কাজ নিশ্চয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ। মহানবী বলেছেন,
أفْضَلُ الأَعْمالِ أنْ تُدْخِلَ على أخِيكَ المُؤْمِنِ سُرُوراً أَوْ تَقْضِيَ عَنهُ دَيْناً أَوْ تُطْعِمَهُ خُبْزاً
"সর্বশ্রেষ্ঠ আমল হল, (মু'মিন) মুসলিমের মনে তোমার আনন্দ ভরে দেওয়া, অথবা তার ঋণ পরিশোধ ক'রে দেওয়া অথবা তাকে রুটি খাওয়ানো।"৫৮৩
আর এ কথা পূর্বেই জেনেছি যে, যে ব্যক্তি মানুষের জন্য উপকারী, সে মহান প্রতিপালকের নিকট সবার চাইতে বেশি প্রিয় এবং কোনও ভাবে কোন মুসলিমকে খোশ করাও তাঁর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল। মহানবী বলেছেন,
أَحَبُّ النَّاسِ إلى الله أَنْفَعُهُمْ وأَحَبُّ الأَعْمَالِ إلى الله عَزَّ وَجَلَّ سُرُورٌ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ
"আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম মানুষ সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশী উপকারী এবং আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম আমল সেই আমল, যা ক'রে একজন মুসলিমকে আনন্দ দেওয়া যায়।"৫৮৪
অবশ্যই সে উপকার নিজ সাধ্যমতো করা যাবে। নচেৎ মহান আল্লাহ
(لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا)
"আল্লাহ কাউকেও তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না।"৫৮৫
(لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا مَا آتَاهَا )
"আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তার চেয়ে গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না। ৫৮৬
অতএব চরিত্রবানের উচিত, যদি সে কারো সুখের গল্প লেখার পেন্সিল হতে না পারে, তাহলে যেন কারো দুঃখ মোছার রবার হয়ে যায়। লোহা দিয়ে সোনার গয়না তৈরী হয় না ঠিকই, কিন্তু সোনার গয়না তৈরী করতে লোহার হাতুড়ির দরকার হয়। সুতরাং সোনা না হতে পারলেও লোহা হওয়া উচিত।
উপকার করলে উপকৃত মানুষ উপকারীর দাসে পরিণত হয়। যেহেতু প্রতি দানই প্রতিদান চায়। ফলে সে উপকারের বিনিময়ে অনুরূপ উপকার না করতে পারলে উপকারীর অনুগত হয়ে যায়। মুলহাব বিন আবী সাফরাহ বলেন, 'আমি দেখে অবাক হই যে, লোকেরা নিজ মাল দিয়ে গোলাম ক্রয় করে, অথচ উপকারিতা দিয়ে স্বাধীন মানুষ ক্রয় করে না।'
সতর্কতার বিষয় যে, অনেকে উপকার করতে গিয়ে অপকার ক'রে বসে। বহু নির্বোধ বা আবেগী মানুষ দ্বারা এমন উল্টা কাজ ঘটে যেতে পারে। যেমন- নদীর জোয়ারে একটি বড় মাছ বালুচরে আটকে গিয়ে লাফাতে থাকে। কিছু বানর তাকে দেখে দয়া হলে তাকে পাড়ে তুলে দেয়, যাতে পানিতে পড়ে প্রাণ না হারায়!
একজন বিধবার উপকার করতে গিয়ে তার গায়ে কলঙ্কের ছাপ লেগে যায়।
একজন তরুণীকে দ্বীন শিখাতে গিয়ে সে তার প্রেমে পড়ে দ্বীনদারি নষ্ট ক'রে বসে।
কোন বিবাহিতার উপকার করতে গিয়ে সে যেন নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু না করে। মনে রাখতে হবে মহানবী এর সতর্কবাণী,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ خَبَّبَ امْرَأَةً عَلَى زَوْجِهَا أَوْ عَبْدًا عَلَى سَيِّدِهِ
"যে ব্যক্তি কারো স্ত্রী অথবা ক্রীতদাসকে তার (স্বামী বা প্রভুর বিরুদ্ধে) প্ররোচিত করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”৫৮৭
অনেকে অনেকের বাতের ব্যথা ভালো করতে গিয়ে কুষ্ঠব্যাধি সৃষ্টি ক'রে বসে। অতএব সাবধান সকলে।
টিকাঃ
৫৮২. সঃ জামে' ৩২৮৯, দারাকুতুনী, সিঃ সহীহাহ ৪২৬
৫৮৩. বাইহাক্বী ৭৬৭৮, ইবনে আবিদ দুনয়া, সিঃ সহীহাহ ১৪৯৪
৫৮৪. তাবারানী ১৩৪৬৮, ইবনে আবিদ দুনয়া, সহীহ তারগীব ২০৯০, সিলসিলাহ সহীহাহ ৯০৬, সহীহুল জামে' ১৭৬
৫৮৫. সূরা বাক্বারাহ-২: ২৮৬
৫৮৬. ত্বালাক্ব: ৭
৫৮৭. আহমাদ ৯১৫৭, আবু দাউদ ২১৭৭, হাকেম ২৭৯৫, ইবনে হিব্বান ৫৫৬০
📄 দানের প্রতিদান
প্রতি দানই প্রতিদান চায়, এটাই সচ্চরিত্রতার রীতি। অভিজ্ঞরা বলেন, 'পৃথিবীটা চলছে কমার্সিয়াল লেন-দেনের উপর। লেনদেন ঠিক রাখলে পৃথিবীটা প্রেমে হাবুডুবু খাবে।'
আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
هَلْ جَزَاء الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ)
"উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরস্কার ব্যতীত আর কী হতে পারে?"৫৮৮
হ্যাঁ, সচ্চরিত্রতার এই রীতি ভদ্র সমাজে প্রচলিত আছে, কেউ আপনার উপকার করলে, বিনিময়ে আপনি তার উপকার করবেন। অবশ্য তার মানে এই নয় যে, কেউ উপকার করলে, তবেই আপনি তার উপকার করবেন, নচেৎ করবেন না।
এটাই রীতি, কেউ আপনাকে কোন উপহার দিলে, আপনি বিনিময়ে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন, তার প্রশংসা করবেন এবং তার জন্য দুআ করবেন। আর সেই সাথে সক্ষম হলে আপনি তাকে অনুরূপ উপহার দেবেন।
দান দিয়ে মানুষকে দাস বানানো যায়, তেমনি প্রতিদান দিয়ে মানুষের মন-জয় করা যায়।
পক্ষান্তরে দান পেয়ে প্রতিদান দিতে না পারলে, দাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না ক'রে উল্টা তার বদনাম করা অথবা অপকার ও ক্ষতি সাধন করা হীন মানসিকতার নেমকহারামের আচরণ।
কিন্তু সচ্চরিত্রতা হল, 'যার নুন খাও, তার গুণ গাও।' শরীয়ত আমাদেরকে সে রীতি শিক্ষা দিয়েছে। মহানবী বলেছেন,
مَنْ صُنِعَ إِلَيْهِ مَعْرُوفٌ فَلْيَجْزِهِ ، فَإِنْ لَمْ يَجِدُ مَا يَجْزِيهِ ، فَلْيُثْنِ عَلَيْهِ ، فَإِنَّهُ إِذَا أَثْنَى عَلَيْهِ فَقَدْ شَكَرَهُ ، وَإِنْ كَتَمَهُ فَقَدْ كَفَرَهُ ، وَمَنْ تَحَلَّى بِمَا لَمْ يُعْطَ ، فَكَأَنَّمَا لَبِسَ ثَوْبَي زُورٍ
"যে ব্যক্তিকে কোন উপহার দান করা হয় সে ব্যক্তির উচিত, দেওয়ার মত কিছু পেলে তা দিয়ে তার প্রতিদান (প্রত্যুপহার) দেওয়া। দেওয়ার মত কিছু না পেলে দাতার প্রশংসা করা উচিত। কারণ, যে ব্যক্তি (দাতার) প্রশংসা করে সে তার কৃতজ্ঞতা (বা শুকরিয়া) আদায় করে দেয়, যে ব্যক্তি (উপহার) গোপন করে (প্রতিদান দেয় না বা শুক্র আদায় করে না) সে কৃতঘ্নতা (বা নাশুক্রী) করে। আর যে ব্যক্তি এমন কিছু প্রকাশ করে যা তাকে দেওয়া হয়নি, সে ব্যক্তি দু'টি মিথ্যা লেবাস পরিধানকারীর মতো।”৫৮৯
তিনি আরো বলেছেন,
مَنِ اسْتَعَاذَ بِاللهِ ، فَأَعِيذُوهُ، وَمَنْ سَأَلَ بِاللهِ ، فَأَعْطُوهُ ، وَمَنْ دَعَاكُمْ ، فَأَجِيبُوهُ ، وَمَنْ صَنَعَ إِلَيْكُمْ مَعْرُوفاً فَكَافِئُوهُ ، فَإِنْ لَمْ تَجِدُوا مَا تُكَافِئُونَهُ بِهِ فَادْعُوا لَهُ حَتَّى تَرَوْا أَنَّكُمْ قَد كَافَأْتُمُوهُ
"কেউ আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করলে, তাকে আশ্রয় দাও। আর যে আল্লাহর নামে যাঞা করবে, তাকে দান কর। যে তোমাদেরকে নিমন্ত্রণ দেবে, তোমরা তার নিমন্ত্রণ গ্রহণ কর। যে তোমাদের উপকার করবে, তোমরা তার (যথোচিত) প্রতিদান দাও। আর যদি তোমরা তার (যথার্থ) প্রতিদানযোগ্য কিছু না পাও, তাহলে তার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত দুআ করতে থাক, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের এ ধারণা বদ্ধমূল হবে যে, তোমরা তার (সঠিক) প্রতিদান আদায় ক'রে দিয়েছ। ৫৯০
চেষ্টা সত্ত্বেও প্রতিদান দিতে না পারলে কম-সে-কম দাতার শুকরিয়া আদায় করা কর্তব্য। যেহেতু তা না করলে সে মহান প্রতিপালকের নিকটেও অকৃতজ্ঞ থেকে যাবে। মহানবী বলেছেন,
مَنْ لَمْ يَشْكُرِ النَّاسَ ، لَمْ يَشْكُرِ اللَّهِ
“যে ব্যক্তি (উপকারী) মানুষের শুক্র করল না, সে আল্লাহর শুক্র করল না।”৫৯১
যদিও আপনি জানেন, উপকারী বা দাতার নাম করলে আপনার নাম ক্ষয়প্রাপ্ত হবে, তবুও সে দাতা। আপনাকে দান দিয়েছে, বিনিময়ে তাকে প্রতিদান দিতে না পারলেও তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। যার আলো পেয়ে আপনি আলোকিত হয়েছেন, তার ঋণ অপরিশোধ্য হলেও, তার প্রতি প্রভাতের চাঁদের মতো ব্যবহার প্রদর্শন করা কর্তব্য। মহতের মাহাত্ম্য স্বীকার করা উচিত। তবেই না আপনি চরিত্রবান। কবি বলেছেন, 'তপন-উদয়ে হবে মহিমার ক্ষয়, তবু প্রভাতের চাঁদ শান্তমুখে কয়, অপেক্ষা করিয়া আছি অস্তসিন্ধুতীরে প্রণাম করিয়া যাব উদিত রবিরে।'
টিকাঃ
৫৮৮. রাহমান: ৬০
৫৮৯. তিরমিযী ২০৩৪, আবু দাউদ ৪৮-১৩, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, সহীহ তারগীব ৯৫৪
৫৯০. আবু দাউদ ১৬৭৪, নাসায়ী ২৫৬৭
৫৯১. আহমাদ ১১২৮০, তিরমিযী ১৯৫৫
প্রতি দানই প্রতিদান চায়, এটাই সচ্চরিত্রতার রীতি। অভিজ্ঞরা বলেন, 'পৃথিবীটা চলছে কমার্সিয়াল লেন-দেনের উপর। লেনদেন ঠিক রাখলে পৃথিবীটা প্রেমে হাবুডুবু খাবে।'
আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
هَلْ جَزَاء الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ)
"উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরস্কার ব্যতীত আর কী হতে পারে?"৫৮৮
হ্যাঁ, সচ্চরিত্রতার এই রীতি ভদ্র সমাজে প্রচলিত আছে, কেউ আপনার উপকার করলে, বিনিময়ে আপনি তার উপকার করবেন। অবশ্য তার মানে এই নয় যে, কেউ উপকার করলে, তবেই আপনি তার উপকার করবেন, নচেৎ করবেন না।
এটাই রীতি, কেউ আপনাকে কোন উপহার দিলে, আপনি বিনিময়ে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন, তার প্রশংসা করবেন এবং তার জন্য দুআ করবেন। আর সেই সাথে সক্ষম হলে আপনি তাকে অনুরূপ উপহার দেবেন।
দান দিয়ে মানুষকে দাস বানানো যায়, তেমনি প্রতিদান দিয়ে মানুষের মন-জয় করা যায়।
পক্ষান্তরে দান পেয়ে প্রতিদান দিতে না পারলে, দাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না ক'রে উল্টা তার বদনাম করা অথবা অপকার ও ক্ষতি সাধন করা হীন মানসিকতার নেমকহারামের আচরণ।
কিন্তু সচ্চরিত্রতা হল, 'যার নুন খাও, তার গুণ গাও।' শরীয়ত আমাদেরকে সে রীতি শিক্ষা দিয়েছে। মহানবী বলেছেন,
مَنْ صُنِعَ إِلَيْهِ مَعْرُوفٌ فَلْيَجْزِهِ ، فَإِنْ لَمْ يَجِدُ مَا يَجْزِيهِ ، فَلْيُثْنِ عَلَيْهِ ، فَإِنَّهُ إِذَا أَثْنَى عَلَيْهِ فَقَدْ شَكَرَهُ ، وَإِنْ كَتَمَهُ فَقَدْ كَفَرَهُ ، وَمَنْ تَحَلَّى بِمَا لَمْ يُعْطَ ، فَكَأَنَّمَا لَبِسَ ثَوْبَي زُورٍ
"যে ব্যক্তিকে কোন উপহার দান করা হয় সে ব্যক্তির উচিত, দেওয়ার মত কিছু পেলে তা দিয়ে তার প্রতিদান (প্রত্যুপহার) দেওয়া। দেওয়ার মত কিছু না পেলে দাতার প্রশংসা করা উচিত। কারণ, যে ব্যক্তি (দাতার) প্রশংসা করে সে তার কৃতজ্ঞতা (বা শুকরিয়া) আদায় করে দেয়, যে ব্যক্তি (উপহার) গোপন করে (প্রতিদান দেয় না বা শুক্র আদায় করে না) সে কৃতঘ্নতা (বা নাশুক্রী) করে। আর যে ব্যক্তি এমন কিছু প্রকাশ করে যা তাকে দেওয়া হয়নি, সে ব্যক্তি দু'টি মিথ্যা লেবাস পরিধানকারীর মতো।”৫৮৯
তিনি আরো বলেছেন,
مَنِ اسْتَعَاذَ بِاللهِ ، فَأَعِيذُوهُ، وَمَنْ سَأَلَ بِاللهِ ، فَأَعْطُوهُ ، وَمَنْ دَعَاكُمْ ، فَأَجِيبُوهُ ، وَمَنْ صَنَعَ إِلَيْكُمْ مَعْرُوفاً فَكَافِئُوهُ ، فَإِنْ لَمْ تَجِدُوا مَا تُكَافِئُونَهُ بِهِ فَادْعُوا لَهُ حَتَّى تَرَوْا أَنَّكُمْ قَد كَافَأْتُمُوهُ
"কেউ আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করলে, তাকে আশ্রয় দাও। আর যে আল্লাহর নামে যাঞা করবে, তাকে দান কর। যে তোমাদেরকে নিমন্ত্রণ দেবে, তোমরা তার নিমন্ত্রণ গ্রহণ কর। যে তোমাদের উপকার করবে, তোমরা তার (যথোচিত) প্রতিদান দাও। আর যদি তোমরা তার (যথার্থ) প্রতিদানযোগ্য কিছু না পাও, তাহলে তার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত দুআ করতে থাক, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের এ ধারণা বদ্ধমূল হবে যে, তোমরা তার (সঠিক) প্রতিদান আদায় ক'রে দিয়েছ। ৫৯০
চেষ্টা সত্ত্বেও প্রতিদান দিতে না পারলে কম-সে-কম দাতার শুকরিয়া আদায় করা কর্তব্য। যেহেতু তা না করলে সে মহান প্রতিপালকের নিকটেও অকৃতজ্ঞ থেকে যাবে। মহানবী বলেছেন,
مَنْ لَمْ يَشْكُرِ النَّاسَ ، لَمْ يَشْكُرِ اللَّهِ
“যে ব্যক্তি (উপকারী) মানুষের শুক্র করল না, সে আল্লাহর শুক্র করল না।”৫৯১
যদিও আপনি জানেন, উপকারী বা দাতার নাম করলে আপনার নাম ক্ষয়প্রাপ্ত হবে, তবুও সে দাতা। আপনাকে দান দিয়েছে, বিনিময়ে তাকে প্রতিদান দিতে না পারলেও তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। যার আলো পেয়ে আপনি আলোকিত হয়েছেন, তার ঋণ অপরিশোধ্য হলেও, তার প্রতি প্রভাতের চাঁদের মতো ব্যবহার প্রদর্শন করা কর্তব্য। মহতের মাহাত্ম্য স্বীকার করা উচিত। তবেই না আপনি চরিত্রবান। কবি বলেছেন, 'তপন-উদয়ে হবে মহিমার ক্ষয়, তবু প্রভাতের চাঁদ শান্তমুখে কয়, অপেক্ষা করিয়া আছি অস্তসিন্ধুতীরে প্রণাম করিয়া যাব উদিত রবিরে।'
টিকাঃ
৫৮৮. রাহমান: ৬০
৫৮৯. তিরমিযী ২০৩৪, আবু দাউদ ৪৮-১৩, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, সহীহ তারগীব ৯৫৪
৫৯০. আবু দাউদ ১৬৭৪, নাসায়ী ২৫৬৭
৫৯১. আহমাদ ১১২৮০, তিরমিযী ১৯৫৫
📄 চারিত্রিক সাদাকাহ্
যারা সাদকাহ করার মতো কোন অর্থ পায় না, তারা চারিত্রিক বহু কর্ম দ্বারা সাদকার সওয়াব অর্জন করতে পারে। যেহেতু প্রত্যেক সৎকার্যই সাদকাহ। তার মানে যে কোন ভালো কাজ করলেই সাদকাহ বা দান করার সওয়াব লাভ হয়। নিঃস্ব হয়েও সাদকাহ করার সওয়াব অর্জন করা যায়।
এমনকি নিজ স্ত্রীর ভরণ-পোষণ করবেন, নিজের যৌনক্ষুধা মিটানোর জন্য তার সাথে মিলন করবেন, তাতেও সাদকাহ। আল্লাহু আকবার!
একদা কিছু সাহাবা বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! ধনীরাই তো বেশী নেকীর অধিকারী হয়ে গেল। তারা স্বলাত পড়ছে যেমন আমরা স্বলাত পড়ছি, তারা সিয়াম রাখছে যেমন আমরা রাখছি এবং (আমাদের চেয়ে তারা অতিরিক্ত কাজ এই করছে যে,) নিজেদের প্রয়োজন-অতিরিক্ত মাল থেকে তারা সাদকাহ করছে।' তিনি বললেন,
أَوَلَيسَ قَدْ جَعَلَ اللهُ لَكُمْ مَا تَصَدَّقُونَ بِهِ : إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلُّ تكبيرة صَدَقَةً ، وَكُلُّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلُّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةً ، وَأَمْرُ بِالمَعْرُوفِ صَدَقَةٌ ، وَنَهِي عَنِ المُنْكَرِ صَدَقَةٌ ، وفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ
"আল্লাহ কি তোমাদের জন্য সাদকাহ করার মত জিনিস দান করেননি? নিঃসন্দেহে প্রত্যেক তাসবীহ সাদকাহ, প্রত্যেক তাকবীর সাদকাহ, প্রত্যেক তাহলীল সাদকাহ, ভাল কাজের নির্দেশ দেওয়া সাদকাহ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা সাদকাহ এবং তোমাদের স্ত্রী-মিলন করাও সাদকাহ।”
সাহাবাগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ স্ত্রী-মিলন ক'রে নিজের যৌনক্ষুধা নিবারণ করে, তবে এতেও কি তার পুণ্য হবে?' তিনি বললেন,
أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي حَرامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ وِزْرُ ؟ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الحَلالِ كَانَ لَهُ أَجْرٌ
"কী রায় তোমাদের, যদি কেউ অবৈধভাবে যৌন-মিলন করে, তাহলে কি তার পাপ হবে? (নিশ্চয় হবে।) অনুরূপ সে যদি বৈধভাবে (স্ত্রী-মিলন করে) নিজের কামক্ষুধা নিবারণ করে, তাহলে তাতে তার পুণ্য হবে।"৫৯২
তিনি বলেছেন,
كُلُّ سَلامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ ، كُلَّ يَومٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ : تَعْدِلُ بَينَ الاثنينِ صَدَقَةٌ ، وتُعِينُ الرَّجُلَ فِي دَابَّتِهِ ، فَتَحْمِلُهُ عَلَيْهَا أَوْ تَرفَعُ لَهُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ ، وَالكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ ، وبكلِّ خَطْوَةٍ تَمشيهَا إِلَى الصَّلاةِ صَدَقَةٌ ، وتميط الأذى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
"প্রতিদিন যাতে সূর্য উদয় হয় (অর্থাৎ প্রত্যেক দিন) মানুষের প্রত্যেক গ্রন্থির পক্ষ থেকে প্রদেয় একটি ক'রে সাদকাহ রয়েছে। (আর সাদকাহ শুধু মাল খরচ করাকেই বলে না; বরং) দু'জন মানুষের মধ্যে তোমার মীমাংসা ক'রে দেওয়াটাও সাদকাহ, কোন মানুষকে নিজ সওয়ারীর উপর বসানো অথবা তার উপর তার সামান উঠিয়ে নিয়ে সাহায্য করাও সাদকাহ, ভাল কথা বলা সাদকাহ, স্বলাতের জন্য কৃত প্রত্যেক পদক্ষেপ সাদকাহ এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস দূরীভূত করাও সাদকাহ।"৫৯৩
অন্য এক হাদীসে আছে,
تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ وَأَمْرُكَ بِالْمَعْرُوفِ وَنَهْيُكَ عَنْ الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ وَإِرْشَادُكَ الرَّجُلَ فِي أَرْضِ الضَّلَالِ لَكَ صَدَقَةٌ وَبَصَرُكَ لِلرَّجُلِ الرَّدِيءِ الْبَصَرِ لَكَ صَدَقَةٌ وَإِمَاطَتُكَ الْحَجَرَ وَالشَّوْكَةَ وَالْعَظْمَ عَنْ الطَّرِيقِ لَكَ صَدَقَةٌ وَإِفْرَاغُكَ مِنْ دَلْوِكَ فِي دَلْوِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ
"তোমার ভাইয়ের সম্মুখে মুচকি হাসা তোমার জন্য সাদকাহ। ভাল কাজের নির্দেশ দেওয়া ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা তোমার জন্য সাদকাহ। পথ-ভোলা মানুষকে পথ বলে দেওয়া তোমার জন্য সাদকাহ। অন্ধ মানুষকে পথ দেখানো তোমার জন্য সাদকাহ। পথ থেকে পাথর, কাঁটা ও হাড় সরিয়ে ফেলা তোমার জন্য সাদকাহ। এবং তোমার বালতি দ্বারা তোমার ভাইয়ের বালতি ভরে দেওয়া তোমার জন্য সাদকা।"৫৯৪
টিকাঃ
৫৯২. মুসলিম ২৩৭৬
৫৯৩. বুখারী ২৯৮৯, মুসলিম ২৩৭৭, ২৩৮২
৫৯৪. তিরমিযী ১৯৫৬
যারা সাদকাহ করার মতো কোন অর্থ পায় না, তারা চারিত্রিক বহু কর্ম দ্বারা সাদকার সওয়াব অর্জন করতে পারে। যেহেতু প্রত্যেক সৎকার্যই সাদকাহ। তার মানে যে কোন ভালো কাজ করলেই সাদকাহ বা দান করার সওয়াব লাভ হয়। নিঃস্ব হয়েও সাদকাহ করার সওয়াব অর্জন করা যায়।
এমনকি নিজ স্ত্রীর ভরণ-পোষণ করবেন, নিজের যৌনক্ষুধা মিটানোর জন্য তার সাথে মিলন করবেন, তাতেও সাদকাহ। আল্লাহু আকবার!
একদা কিছু সাহাবা বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! ধনীরাই তো বেশী নেকীর অধিকারী হয়ে গেল। তারা স্বলাত পড়ছে যেমন আমরা স্বলাত পড়ছি, তারা সিয়াম রাখছে যেমন আমরা রাখছি এবং (আমাদের চেয়ে তারা অতিরিক্ত কাজ এই করছে যে,) নিজেদের প্রয়োজন-অতিরিক্ত মাল থেকে তারা সাদকাহ করছে।' তিনি বললেন,
أَوَلَيسَ قَدْ جَعَلَ اللهُ لَكُمْ مَا تَصَدَّقُونَ بِهِ : إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلُّ تكبيرة صَدَقَةً ، وَكُلُّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلُّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةً ، وَأَمْرُ بِالمَعْرُوفِ صَدَقَةٌ ، وَنَهِي عَنِ المُنْكَرِ صَدَقَةٌ ، وفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ
"আল্লাহ কি তোমাদের জন্য সাদকাহ করার মত জিনিস দান করেননি? নিঃসন্দেহে প্রত্যেক তাসবীহ সাদকাহ, প্রত্যেক তাকবীর সাদকাহ, প্রত্যেক তাহলীল সাদকাহ, ভাল কাজের নির্দেশ দেওয়া সাদকাহ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা সাদকাহ এবং তোমাদের স্ত্রী-মিলন করাও সাদকাহ।”
সাহাবাগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ স্ত্রী-মিলন ক'রে নিজের যৌনক্ষুধা নিবারণ করে, তবে এতেও কি তার পুণ্য হবে?' তিনি বললেন,
أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي حَرامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ وِزْرُ ؟ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الحَلالِ كَانَ لَهُ أَجْرٌ
"কী রায় তোমাদের, যদি কেউ অবৈধভাবে যৌন-মিলন করে, তাহলে কি তার পাপ হবে? (নিশ্চয় হবে।) অনুরূপ সে যদি বৈধভাবে (স্ত্রী-মিলন করে) নিজের কামক্ষুধা নিবারণ করে, তাহলে তাতে তার পুণ্য হবে।"৫৯২
তিনি বলেছেন,
كُلُّ سَلامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ ، كُلَّ يَومٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ : تَعْدِلُ بَينَ الاثنينِ صَدَقَةٌ ، وتُعِينُ الرَّجُلَ فِي دَابَّتِهِ ، فَتَحْمِلُهُ عَلَيْهَا أَوْ تَرفَعُ لَهُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ ، وَالكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ ، وبكلِّ خَطْوَةٍ تَمشيهَا إِلَى الصَّلاةِ صَدَقَةٌ ، وتميط الأذى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
"প্রতিদিন যাতে সূর্য উদয় হয় (অর্থাৎ প্রত্যেক দিন) মানুষের প্রত্যেক গ্রন্থির পক্ষ থেকে প্রদেয় একটি ক'রে সাদকাহ রয়েছে। (আর সাদকাহ শুধু মাল খরচ করাকেই বলে না; বরং) দু'জন মানুষের মধ্যে তোমার মীমাংসা ক'রে দেওয়াটাও সাদকাহ, কোন মানুষকে নিজ সওয়ারীর উপর বসানো অথবা তার উপর তার সামান উঠিয়ে নিয়ে সাহায্য করাও সাদকাহ, ভাল কথা বলা সাদকাহ, স্বলাতের জন্য কৃত প্রত্যেক পদক্ষেপ সাদকাহ এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস দূরীভূত করাও সাদকাহ।"৫৯৩
অন্য এক হাদীসে আছে,
تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ وَأَمْرُكَ بِالْمَعْرُوفِ وَنَهْيُكَ عَنْ الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ وَإِرْشَادُكَ الرَّجُلَ فِي أَرْضِ الضَّلَالِ لَكَ صَدَقَةٌ وَبَصَرُكَ لِلرَّجُلِ الرَّدِيءِ الْبَصَرِ لَكَ صَدَقَةٌ وَإِمَاطَتُكَ الْحَجَرَ وَالشَّوْكَةَ وَالْعَظْمَ عَنْ الطَّرِيقِ لَكَ صَدَقَةٌ وَإِفْرَاغُكَ مِنْ دَلْوِكَ فِي دَلْوِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ
"তোমার ভাইয়ের সম্মুখে মুচকি হাসা তোমার জন্য সাদকাহ। ভাল কাজের নির্দেশ দেওয়া ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা তোমার জন্য সাদকাহ। পথ-ভোলা মানুষকে পথ বলে দেওয়া তোমার জন্য সাদকাহ। অন্ধ মানুষকে পথ দেখানো তোমার জন্য সাদকাহ। পথ থেকে পাথর, কাঁটা ও হাড় সরিয়ে ফেলা তোমার জন্য সাদকাহ। এবং তোমার বালতি দ্বারা তোমার ভাইয়ের বালতি ভরে দেওয়া তোমার জন্য সাদকা।"৫৯৪
টিকাঃ
৫৯২. মুসলিম ২৩৭৬
৫৯৩. বুখারী ২৯৮৯, মুসলিম ২৩৭৭, ২৩৮২
৫৯৪. তিরমিযী ১৯৫৬
📄 কতিপয় সাধারণ সচ্চরিত্রতার কর্ম
১. সাক্ষাৎকালে সালাম, মুসাফাহা ও মুআনাকা করা।
সাক্ষাৎকালে সালাম মুসাফাহাহ করা চরিত্রবানদের আদর্শ। দায়সারা সালাম নয়, আন্তরিক সালাম ও মুসাফাহাহ এবং সফর থেকে এলে মুআনাকা করার বিধান রয়েছে ইসলামে।
যেহেতু “মুসলিমের উপর মুসলিমের ৬টি হক রয়েছে। তার মধ্যে একটি হল, যখন তার সাথে দেখা হবে, তখন তাকে সালাম দেবে।---”৫৯৫
শরীয়ত মুসলিমকে সালাম প্রচার করতে নির্দেশ দেয়। মহানবী বলেন, “হে মানুষ! তোমরা সালাম প্রচার কর, অন্নদান কর, জ্ঞাতি-বন্ধন অক্ষুন্ন রাখ এবং লোকেরা যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন তোমরা স্বলাত পড়। এতে তোমরা নির্বিঘ্নে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।”৫৯৬
সালাম এক প্রকার দুআ। সালাম দিলে বরকত আসে। আনাস বলেন, একদা আল্লাহর রসূল আমাকে বললেন, “বেটা! তুমি তোমার পরিবারে প্রবেশ করলে সালাম দিও; এতে তোমার ও তোমার পরিবারের জন্য বরকত হবে।”৫৯৭
বেছে বেছে খাস খাস লোককে ও স্বার্থের তরে বিশেষ সালাম নয়। আমভাবে সালাম দেওয়া চরিত্রবানের কাজ। যেহেতু তা উত্তম ও সুন্দর ইসলামের পরিচায়ক। এক ব্যক্তি আল্লাহর রসূল কে জিজ্ঞাসা করল যে, 'কোন্ ইসলাম উত্তম? (ইসলামের কোন্ কোন্ কাজ উত্তম কাজ?) উত্তরে তিনি বললেন, “(অভাবীকে) খাদ্যদান করা এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেওয়া।”৫৯৮
সালামে সম্প্রীতি কায়েম হয়, আর তার ফলে দারুস সালাম বেহেস্ত লাভ হয়। আল্লাহর রসূল বলেন, “তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না মু'মিন হয়েছ; আর ততক্ষণ পর্যন্ত মু'মিন হতেও পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আপোসে সম্প্রীতি কায়েম করেছ। আমি কি তোমাদেরকে এমন এক কাজের সংবাদ দেব না, যা করলে তোমাদের আপোসে সম্প্রীতি কায়েম হবে? তোমরা আপোসের মধ্যে সালাম প্রচার কর।”৫৯৯
দেবার মতো কোন জিনিস দিতে কার্পণ্য করা সচ্চরিত্রতার আলামত নয়। যে সালাম দিতে কার্পণ্য করে, সে সবচেয়ে বড় কৃপণ। মহানবী বলেন, "সবচেয়ে বড় চোর সে, যে স্বলাত চুরি করে এবং সবচেয়ে বড় বখীল সে, যে সালাম দিতে বখীলি করে।"৬০০
তিনি আরো বলেন, "সবচেয়ে বড় অক্ষম সে, যে দুআ করতে অক্ষমতা প্রকাশ করে এবং সবচেয়ে বড় কৃপণ সে, যে সালাম দিতে কৃপণতা করে।”৬০২
চরিত্রবান সালামে সুন্নাত খেয়াল রাখে। সুতরাং সে উট, ঘোড়া, সাইকেল বা গাড়ির উপর সওয়ার থাকলে পায়ে হেঁটে যাওয়া লোককে, পায়ে হেঁটে গেলে বসে থাকা লোককে, অল্প সংখ্যক হলে বেশী সংখ্যক লোককে, বয়সে ছোট হলে অপেক্ষাকৃত বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষকে সালাম দেয়। ৬০২
কিন্তু এর বিপরীতভাবে সালাম দিলে দোষের নয়। তবে অবশ্যই তা সুন্নাহ ও আফযলের খিলাপ কাজ হবে। আর সেই ব্যক্তি হবে উত্তম, যে প্রথমে সালাম দিয়ে থাকে। ৬০০
মহিলা কোন মাহরাম হলে অথবা গায়র মাহরাম বৃদ্ধা হলে তাকে সালাম দেওয়া বৈধ। নচেৎ গায়র মাহরাম কোন যুবতী মহিলাকে---বিশেষ করে ফিতনার ভয় থাকলে---তাকে সালাম দেওয়া এবং তার মুখ খোলানো চরিত্রবানের জন্য বৈধ নয়। শিশু হলেও তাকে সালাম দেয় চরিত্রবান। আর তা বিনয়ের একটি নিদর্শন। আমাদের মহানবী পথে চলাকালে ছোট শিশুদেরকে সালাম দিতেন। ৬০৪
জ্ঞাতব্য যে, উত্তমভাবে সালামের উত্তর দেওয়া ওয়াজেব। আর সালামের পর ও বিদায়কালে এক হাতে মুসাফাহাহ করা সুন্নত। আল্লাহর রসূল বলেন, "যখনই কোন দুই মুমিন ব্যক্তি সাক্ষাৎ ক'রে আপোসে মুসাফাহাহ করে, (কেবল আল্লাহর ওয়াস্তে একে অন্যের হাত ধরে), তখনই তাদের পৃথক হয়ে প্রস্থান করার পূর্বেই উভয়কেই ক্ষমা ক'রে দেওয়া হয়।”৬০৫
তা'যীমের জন্য নয়, বরং নিজের জায়গায় বসানোর জন্য, সহযোগিতা করার জন্য আগন্তুকের প্রতি উঠে দাঁড়ানো সুন্দর চরিত্রের পরিচায়ক।
আর সফর থেকে ফিরে সাক্ষাতের সময় পরস্পরকে মুআনাকা করা বিধেয়। আনাস বলেন, 'নবী এর সাহাবাগণ যখন আপোসে সাক্ষাৎ করতেন, তখন মুসাফাহাহ করতেন এবং যখন সফর থেকে ফিরে আসতেন, তখন মুআনাকা করতেন। '৬০৬
২. অপরের বাড়ি প্রবেশে অনুমতি নেওয়া
অপরের বাড়ি প্রবেশ করতে হলে তার অনুমতি নিতে হবে। মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবের সূরা নূর ২৭-২৮ আয়াতে এর বিধান দিয়েছেন। উচিত নয়, কারো বাড়ির দরজার সোজাসুজি দাঁড়ানো। কারো বাড়ির ভিতর দৃষ্টিপাত করা অথবা উঁকিঝুঁকি মেরে দেখা চরিত্রবানের কাজ নয়। দরজা অথবা জানালা দিয়ে, রাস্তা থেকে অথবা অন্য বাড়ির ছাদ বা জানালা থেকে, গাছ বা গাড়ির উপর থেকে কারো বাড়ির ভিতরে নজর দিলে নজরবাজের চোখ ফুটিয়ে দেওয়া বৈধ করা হয়েছে। আল্লাহর রসূল বলেন, “যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের গৃহে তাদের অনুমতি না নিয়ে উঁকি মেরে দেখে সে ব্যক্তির চোখে (ঢিল ছুঁড়ে) তাকে কানা ক'রে দেওয়া তাদের জন্য বৈধ হয়ে যায়। "৬০৭
৩. রাস্তা চলার আদব
১. যমীনে চলাফেরা করার সময় অহংকার প্রদর্শন করা, নিজেকে হিরো ও অপরকে জিরো এবং গুরুকে গরু মনে করে অবজ্ঞার সাথে বিচরণ করা অভদ্র, অসভ্য ও গোঁয়ার লোকের নিদর্শন। আসলে একজন মুসলিম হয় ভদ্র ও বিনয়ী। মহান আল্লাহ তার চলার গুণ বর্ণনা করে বলেন,
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
অর্থাৎ, আর তারা রহমানের বান্দা, যারা যমীনের বুকে নম্রভাবে চলা-ফিরা করে এবং অজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদেরকে সম্বোধন করলে (উপেক্ষা করে) বলে, সালাম।৬০৮
পক্ষান্তরে চরিত্রশূন্য অহংকারীরা ঔদ্ধত্যের সাথে রাস্তা চলে, হাসিমুখে কথা বলে না, গোমড়া মুখ প্রদর্শন করে, পথে কাউকে সালাম দিতে চায় না এবং সালামের উত্তর দিতেও আগ্রহ দেখায় না। মহান আল্লাহ লুকমান হাকীমের উপদেশ উল্লেখ ক'রে বলেন,
وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
অর্থাৎ, তুমি (অহংকারবশে) মানুষকে মুখ বাঁকায়ো না (অবজ্ঞা করো না) এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক দাম্ভিক অহংকারীকে ভালোবাসেন না। ৬০৯
তিনি আরো বলেছেন,
وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَن تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَن تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولاً
"ভূ-পৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না, তুমি তো কখনোই পদভারে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বত-প্রমাণ হতে পারবে না।”৬১০
আল্লাহর রসূল বলেন, "একদা (পূর্ববর্তী উম্মতের) এক ব্যক্তি একজোড়া পোশাক পরে, গর্বভরে, মাথা আঁচড়ে অহংকারের সাথে চলা-ফেরা করছিল। ইত্যবসরে আল্লাহ তার (পায়ের নীচের মাটিকে) ধসিয়ে দিলেন। সুতরাং সে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত মাটির গভীরে নেমে যেতেই থাকবে।”৬১১
তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি মনে মনে গর্বিত হবে অথবা চলনে অহমিকা প্রকাশ করবে, সে ব্যক্তি যখন আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন তিনি তার উপর ক্রোধান্বিত থাকবেন। "৬১২
বহু মানুষ আছে, যারা অহংকারের সাথে নিজ লুঙ্গি, পায়জামা বা প্যান্ট গাঁটের নিচে ঝুলিয়ে পরে রাস্তায় ছেঁচড়ে নিয়ে বেড়ায়, তাদের ব্যাপারে মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তি অহংকারের সাথে তার কাপড় (মাটিতে) ছেঁচড়ায় তার দিকে আল্লাহ তাকিয়ে দেখবেন না।"৬১৩
৪. রোগী দেখতে যাওয়া
আল্লাহর রসূল বলেছেন, "মুসলিমের উপর মুসলিমের ৫টি অধিকার রয়েছে; (তার মধ্যে একটা হল,) রোগীকে সাক্ষাৎ ক'রে সান্ত্বনা দেওয়া।”৬১৪
রোগীকে সাক্ষাৎ করতে গেলে মহান আল্লাহকে সাক্ষাৎ করা হয়। ৬১৫
আল্লাহর রসূল বলেন, “যে ব্যক্তি কোন রোগীকে সাক্ষাৎ ক'রে জিজ্ঞাসাবাদ করে অথবা তার কোন লিল্লাহী (আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ভ্রাতৃত্বস্থাপন করে সেই) ভাইকে সাক্ষাৎ করে, সে ব্যক্তিকে এক (গায়বী) আহবানকারী আহবান করে বলে, 'সুখী হও তুমি, সুখকর হোক তোমার ঐ যাত্রা (সাক্ষাতের জন্য যাওয়া)। আর তোমার স্থান হোক জান্নাতের প্রাসাদে। "৬১৬
তিনি আরো বলেন, "যখনই কোন ব্যক্তি সন্ধ্যাবেলায় কোন রোগীকে সাক্ষাৎ করতে যায়, তখনই তার সাথে ৭০ হাজার ফিরিস্তা বের হয়ে সকাল পর্যন্ত তার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। আর যে ব্যক্তি সকালবেলায় রোগীকে দেখা করতে আসে সে ব্যক্তির সাথে ও ৭০ হাজার ফিরিস্তা বের হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে।" ৬১৭
তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি রোগীকে সাক্ষাৎ করতে যায়, সে আসলে ফিরে না আসা পর্যন্ত জান্নাতের ফল তুলতে থাকে।”৬১৮
তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি রোগীকে সাক্ষাৎ করতে যায়, সে আসলে রহমতে বিচরণ করতে থাকে। অতঃপর সে যখন (রোগীর নিকটে) বসে যায়, তখন রহমতে স্থায়ী হয়ে যায়।"৬১৯
তাহলে এমন কাজ কি কোন চরিত্রবানের না হয়?
৫. জানাযায় অংশগ্রহণ করা
চরিত্রবান পুরুষের একটি সচ্চরিত্রতা হল, কেউ মারা গেলে তার জানাযায় অংশ গ্রহণ করে। যেহেতু আল্লাহর রসূল বলেন, "মুসলিমের উপর মুসলিমের ৫টি অধিকার রয়েছে; (তার মধ্যে একটা হল,) জানাযায় অংশগ্রহণ করা।”৬২০
জানাযায় অংশগ্রহণ করলে পরকাল স্মরণ হয়। আর চরিত্রবানের একটা আচরণ হল পরকালকে সদাসর্বদা স্মরণে রাখা। পরন্তু সেই অংশগ্রহণে রয়েছে বিশাল সওয়াব। আল্লাহর রসূল বলেন,
مَنْ اتَّبَعَ جَنَازَةَ مُسْلِمٍ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا وَكَانَ مَعَهُ حَتَّى يُصَلَّى عَلَيْهَا وَيَفْرُغَ مِنْ دَفْنِهَا فَإِنَّه يَرْجِعُ مِنَ الْأَجْرِ بِقِيرَاطَيْنِ كُلُّ قِيرَاطٍ مِثْلُ أُحُدٍ وَمَنْ صَلَّى عَلَيْهَا ثُمَّ رَجَعَ قَبْلَ أَنْ تُدْفَنَ فَإِنَّهُ يَرْجِعُ بِقِيرَاطٍ
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং নেকী লাভের আশায় জানাযার অনুগমন করে তার স্বলাত ও দাফন হওয়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকে, সে ব্যক্তি দুই ক্বীরাত সওয়াব নিয়ে ফিরে আসে। প্রত্যেক ক্বীরাত উহুদ পাহাড় সমতুল্য। আর যে ব্যক্তি তার স্বলাত পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে, সে ব্যক্তি এক ক্বীরাত সওয়াব নিয়ে ফিরে আসে।”৬২১
৬. মজলিসের আদব
চরিত্রবান সর্বদা ভালো মজলিসে বসে। আর যখন কোন মজলিসে বসে, তখন আল্লাহর যিক্র করতে ও তাঁর নবী এর উপর দরূদ পড়তে ভুল করে না।
চরিত্রবান সর্বদা ভালো লোকের সাথী হয়। চরিত্রবান সাথীর সাথে উঠা-বসা করে। কারণ মানুষ যার সাথে উঠা-বসা করবে, সে অবশ্যই তার দ্বারা কিছু না কিছু প্রভাবান্বিত হবে। আর সে জন্যই কারো কাছে বসার আগে জেনে নেওয়া উচিত, সে ভালো লোক কি না?
আল্লাহর রসূল বলেন, "মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের অনুসারী হয়। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকের দেখা উচিত যে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।”৬২২
চরিত্রবান এমন জায়গায় বসে না, যেখানে বসলে পাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে। মহানবী বলেন, “খবরদার! তোমরা রাস্তার ধারে বসো না। আর একান্তই যদি বসতেই হয়, তাহলে তার হক আদায় করো।" লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, 'রাস্তার হক কি? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "দৃষ্টি সংযত রাখা, কাউকে কষ্ট দেওয়া হতে বিরত থাকা, সালামের জবাব দেওয়া, সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা দান করা (এবং পথভ্রষ্টকে পথ বলে দেওয়া)। "৬২৩
অনুরূপ বাড়ির ছাদে বা এমন উঁচু জায়গায় বসতেও নিষেধ করেছেন আমাদের আদর্শ নবী মুহাম্মাদ। ৬২৪
চরিত্রবান মজলিসে এসে কাউকে উঠিয়ে তার জায়গায় বসে না, কাউকে বসায় না। মজলিসে দুটি লোক (আত্মীয় বা বন্ধু) একত্রে বসে থাকলে, সে গিয়ে তাদের মাঝে বসে উভয়ের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে না।
ভদ্র মানুষ মজলিসে উপস্থিত হয়ে যেখানে মজলিস শেষ হয়েছে, সেখানেই বসে যান। ঘাড় ডিঙিয়ে মানুষকে কষ্ট দেয় না।
চরিত্রবান পরকীয় কথায় কানাচি পাতে না। কারণ তা করলে কিয়ামতের দিন তার কানে গলিত সীসা ঢালা হবে। ৬২৫
মজলিসে প্রগল্ভ হয়ে প্রায় সর্বদা সব কথাতে, হাসির কথাতে এবং অহাসির কথাতেও 'হো-হো, হা-হা' করে হাসা বৈধ নয়। মহানবী বলেন, "তোমরা বেশী বেশী হেসো না। কারণ, অধিক হাসিতে হৃদয় মারা যায়। "৬২৬
মজলিসে থাকাকালে ঘেউ ঘেউ করে ঢেকুর তোলা উচিত নয়। ঢেকুর এলে যথাসম্ভব শব্দ দমন করা উচিত। যেহেতু লোকেরা তা পছন্দ করে না। ঢেকুরের সাথে এমন গ্যাস বের হতে পারে, যা লোকেদের নাকে খারাপ লাগে।
মজলিসে বসার সময় আদবের সাথে থাকুন। যাতে লোকে আপনাকে খারাপ ভাবে সে রকম কাজ করবেন না। যেমন কারো দিকে পা করে বা পা মেলে বসবেন না। দুজনের জায়গা একা নিয়ে বসবেন না। সীট বা টেবিলের উপর পা তুলে বসবেন না। দাঁত বা নাক খুঁটবেন না। হাওয়া ছাড়বেন না। কারো হাওয়া ছাড়া শুনে হাসবেন না। যেহেতু মহানবী কারো হাওয়া ছাড়া শুনে হাসতে নিষেধ করেছেন। ৬২৭
তিনি বলেছেন, "তোমাদের কেউ যে কাজ নিজেও করে সে কাজে হাসে কেন?”৬২৮
মজলিস থেকে উঠে চলে যাওয়ার সময় সালাম দিয়ে যান।
৭. হাই ও হাঁচির আদব
মহানবী বলেন, "নিশ্চয় আল্লাহ হাঁচিকে পছন্দ এবং হাইকে অপছন্দ করেন। সুতরাং তোমাদের মধ্যে কেউ যখন হাঁচি মেরে 'আলহামদু লিল্লাহ' বলে, তখন প্রত্যেক সেই মুসলিমের উচিত, যে সেই হাম্দ শোনে সে যেন তার উদ্দেশ্যে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলে। পক্ষান্তরে হাই হল শয়তানেরই তরফ থেকে। সুতরাং তোমাদের যে কেউ যখন হাই তোলে, তখন সে যেন তা যথাসাধ্য দমন করে। যেহেতু তোমাদের কেউ যখন হাই তোলে, তখন শয়তান হাসে।" অন্য এক বর্ণনায় আছে, "তোমাদের কেউ যখন 'হা-হা' বলে, তখন শয়তান হাসে। "৬২৯
তিনি আরো বলেন, "তোমাদের কেউ যখন হাই তোলে, তখন সে যেন নিজ মুখের উপর হাত রেখে নেয়। কেননা শয়তান তাতে প্রবেশ করে থাকে।”৬৩০
৮. আধুনিক জীবনের কিছু আদব
১. টেলিফোন বা মোবাইলের রিং সাধারণ রাখুন। অবশ্যই কোন প্রকার মিউজিক বা গান লাগিয়ে রাখবেন না। আযান ও কুরআনও লাগাবেন না। কারণ তা অপবিত্র জায়গায় বেজে উটতে পারে। এ ছাড়া মসজিদে বা দর্সে গেলে রিং বন্ধ রাখুন। আপনার মোবাইল দ্বারা অপরকে কষ্ট দিবেন না বা নিজ তথা অপরের ইবাদতের মনোযোগ ও একাগ্রতা নষ্ট করবেন না।
পরন্তু ইবাদতের জায়গায় যদি রিং বন্ধ করতে ভুলেই যান, তাহলে প্রথম রিং হওয়া মাত্র সাথে সাথে বন্ধ করে ফেলুন। স্বলাত অবস্থায় হলেও তা ছেড়ে রাখবেন না। কারণ, তাতে আপনার সাথে প্রায় সকল মুস্বাল্লীর মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে।
২. রেডিও শুনুন, কিন্তু গান-বাজনা শোনা থেকে অবশ্যই দূরে থাকুন। টিভি দেখুন, কিন্তু গান-বাজনা শুনবেন না। অবৈধ কিছু দেখবেন না। ভিডিও ক্যামেরা, ভিসিয়ার, ভিসিডি ইত্যাদি যন্ত্র খুব সাবধানে ব্যবহার করুন। এসব যন্ত্রকে দাওয়াতি কাজে ব্যবহার করুন। তবে সাবধান থাকবেন, যাতে 'বাত ভালো করতে গিয়ে কুষ্ঠব্যাধি' না হয়ে বসে।
৩. আধুনিক যুগে কম্পিউটার একটি আশ্চর্য জিনিস। এটিকেও আপনি আপনার উপকারে ব্যবহার করুন। তবে ইন্টারনেট ব্যবহার করুন খুব সতর্কতার সাথে। যেহেতু তাতে মধুও আছে এবং বিষও।
৪. গাড়ি চালালে অতি সাবধানতার সাথে চালান। ট্রাফিক আইন অবশ্যই মেনে চলুন। অপর সাইডে কোন গাড়ি থাক্ বা না-ই থাক্ আপনার শিগ্ন্যাল গ্রীন না হলে আপনি তা অতিক্রম করবেন না। অবশ্য গ্রীন হলেও অন্য সাইড ভালোভাবে দেখেই পার হন, কারণ আইন ভঙ্গকারী মানুষের অভাব নেই। মাত্রাধিক স্পীডে গাড়ি চালিয়ে নিজের তথা অপরের জীবনকে মরণের দিকে ঠেলে দিবেন না।
রোডে অপর গাড়ি বা পথচারীর খেয়াল অবশ্যই রাখবেন। পথের অধিকার সকলকেই যথোচিতভাবে প্রদান করবেন। উচিতভাবে সাইড দেবেন। খবরদার রোডে কারো সাথে প্রতিযোগিতার মনোভাব নিয়ে আগে যেতে চেষ্টা করবেন না। আপনার গাড়ির হর্নে ঘুমন্ত, রোগগ্রস্ত বা ইবাদতরত কোন ব্যক্তির ডিস্টার্ব করবেন না। রাতে সামনে গাড়ি থাকলে হেড-লাইট জ্বালিয়ে রাখবেন না।
গাড়ি চালানো একটি নেহাতই টেনশনের কাজ। সুতরাং অপরের ভুলের সাথে আপনার প্রচুর ধৈর্যের দরকার।
একজন মুসলিম হবে এতই আদর্শবান যে, তার মাধ্যমে অন্য লোকে কোন প্রকার কষ্ট পাবে না।
বলা বাহুল্য, গাড়ি চালানো খুবই সতর্কতা ও বড় সচ্চরিত্রতার কাজ।
টিকাঃ
৫৯৫. মুসলিম ২ ১৬২
৫৯৬. তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, হাকেম, সহীহ তারগীব ৬১০
৫৯৭. তিরমিযী ২৬৯৮
৫৯৮. বুখারী ৬২৩৬, মুসলিম ৩৯
৫৯৯. মুসলিম ৫৪
৬০০. সহীহুল জামে' ৯৬৬
৬০১. সহীহুল জামে' ৯৬৬
৬০২. বুখারী ৬২৩১-৬২৩২, মুসলিম ২১৬০
৬০৩. বুখারী ৬০৭৭, সিলসিলাহ সহীহাহ ১১৪৬
৬০৪. বুখারী ৬২৪৭, মুসলিম ২১৬৮
৬০৫. তিরমিযী, সহীহ আবু দাউদ ৪৩৪৩
৬০৬. তাবারানী, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৮/৩৬
৬০৭. বুখারী ৬৮৮৮, মুসলিম ২১৫৮, আবু দাউদ, নাসাঈ
৬০৮. সূরা ফুরকান ৬৩
৬০৯. সূরা লুকুমান ১৮
৬১০. সূরা বানী ইস্রাঈল: ৩৭
৬১১. বুখারী ৫৭৮৯, মুসলিম ২০৮৮
৬১২. আহমদ, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ, হাকেম ১/১৬০, সহীহুল জামে' ৬১৫৭
৬১৩. বুখারী ৫৭৮৪, মুসলিম ২০৮৫
৬১৪. বুখারী ১২৪০, মুসলিম ২১৬২
৬১৫. মুসলিম ৬৭২১
৬১৬. তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, সহীহ তিরমিযী ১৬৩৩
৬১৭. আহমাদ, ইবনে মাজাহ, বাইহাকী, প্রমুখ, সহীহুল জামে' ৫৭১৭
৬১৮. আহমাদ ২১৮৬৮, মুসলিম ২৫৬৮, তিরমিযী ৯৬৭
৬১৯. আল-আদাবুল মুফরাদ ৫২২
৬২০. বুখারী ১২৪০, মুসলিম ২১৬২
৬২১. বুখারী ৪৭
৬২২. আহমাদ ৭৯৬৮, আবু দাউদ ৪৮৩৩, তিরমিযী ২৩৭৮, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ৯২৭
৬২৩. আহমাদ, বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, সহীহুল জামে' ২৬৭৫
৬২৪. সিলসিলাহ সহীহাহ ৬/১৪-১৫
৬২৫. বুখারী ৭০৪২
৬২৬. ইবনে মাজাহ ৪১৯৩
৬২৭. সহীহুল জামে' ৬৮৯৬
৬২৮. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৩২৪২
৬২৯. বুখারী ৬২২৩, ৬২২৬, মুসলিম ২৯৯৪
৬৩০. মুসলিম ২৯৯৫
১. সাক্ষাৎকালে সালাম, মুসাফাহা ও মুআনাকা করা।
সাক্ষাৎকালে সালাম মুসাফাহাহ করা চরিত্রবানদের আদর্শ। দায়সারা সালাম নয়, আন্তরিক সালাম ও মুসাফাহাহ এবং সফর থেকে এলে মুআনাকা করার বিধান রয়েছে ইসলামে।
যেহেতু “মুসলিমের উপর মুসলিমের ৬টি হক রয়েছে। তার মধ্যে একটি হল, যখন তার সাথে দেখা হবে, তখন তাকে সালাম দেবে।---”৫৯৫
শরীয়ত মুসলিমকে সালাম প্রচার করতে নির্দেশ দেয়। মহানবী বলেন, “হে মানুষ! তোমরা সালাম প্রচার কর, অন্নদান কর, জ্ঞাতি-বন্ধন অক্ষুন্ন রাখ এবং লোকেরা যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন তোমরা স্বলাত পড়। এতে তোমরা নির্বিঘ্নে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।”৫৯৬
সালাম এক প্রকার দুআ। সালাম দিলে বরকত আসে। আনাস বলেন, একদা আল্লাহর রসূল আমাকে বললেন, “বেটা! তুমি তোমার পরিবারে প্রবেশ করলে সালাম দিও; এতে তোমার ও তোমার পরিবারের জন্য বরকত হবে।”৫৯৭
বেছে বেছে খাস খাস লোককে ও স্বার্থের তরে বিশেষ সালাম নয়। আমভাবে সালাম দেওয়া চরিত্রবানের কাজ। যেহেতু তা উত্তম ও সুন্দর ইসলামের পরিচায়ক। এক ব্যক্তি আল্লাহর রসূল কে জিজ্ঞাসা করল যে, 'কোন্ ইসলাম উত্তম? (ইসলামের কোন্ কোন্ কাজ উত্তম কাজ?) উত্তরে তিনি বললেন, “(অভাবীকে) খাদ্যদান করা এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেওয়া।”৫৯৮
সালামে সম্প্রীতি কায়েম হয়, আর তার ফলে দারুস সালাম বেহেস্ত লাভ হয়। আল্লাহর রসূল বলেন, “তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না মু'মিন হয়েছ; আর ততক্ষণ পর্যন্ত মু'মিন হতেও পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আপোসে সম্প্রীতি কায়েম করেছ। আমি কি তোমাদেরকে এমন এক কাজের সংবাদ দেব না, যা করলে তোমাদের আপোসে সম্প্রীতি কায়েম হবে? তোমরা আপোসের মধ্যে সালাম প্রচার কর।”৫৯৯
দেবার মতো কোন জিনিস দিতে কার্পণ্য করা সচ্চরিত্রতার আলামত নয়। যে সালাম দিতে কার্পণ্য করে, সে সবচেয়ে বড় কৃপণ। মহানবী বলেন, "সবচেয়ে বড় চোর সে, যে স্বলাত চুরি করে এবং সবচেয়ে বড় বখীল সে, যে সালাম দিতে বখীলি করে।"৬০০
তিনি আরো বলেন, "সবচেয়ে বড় অক্ষম সে, যে দুআ করতে অক্ষমতা প্রকাশ করে এবং সবচেয়ে বড় কৃপণ সে, যে সালাম দিতে কৃপণতা করে।”৬০২
চরিত্রবান সালামে সুন্নাত খেয়াল রাখে। সুতরাং সে উট, ঘোড়া, সাইকেল বা গাড়ির উপর সওয়ার থাকলে পায়ে হেঁটে যাওয়া লোককে, পায়ে হেঁটে গেলে বসে থাকা লোককে, অল্প সংখ্যক হলে বেশী সংখ্যক লোককে, বয়সে ছোট হলে অপেক্ষাকৃত বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষকে সালাম দেয়। ৬০২
কিন্তু এর বিপরীতভাবে সালাম দিলে দোষের নয়। তবে অবশ্যই তা সুন্নাহ ও আফযলের খিলাপ কাজ হবে। আর সেই ব্যক্তি হবে উত্তম, যে প্রথমে সালাম দিয়ে থাকে। ৬০০
মহিলা কোন মাহরাম হলে অথবা গায়র মাহরাম বৃদ্ধা হলে তাকে সালাম দেওয়া বৈধ। নচেৎ গায়র মাহরাম কোন যুবতী মহিলাকে---বিশেষ করে ফিতনার ভয় থাকলে---তাকে সালাম দেওয়া এবং তার মুখ খোলানো চরিত্রবানের জন্য বৈধ নয়। শিশু হলেও তাকে সালাম দেয় চরিত্রবান। আর তা বিনয়ের একটি নিদর্শন। আমাদের মহানবী পথে চলাকালে ছোট শিশুদেরকে সালাম দিতেন। ৬০৪
জ্ঞাতব্য যে, উত্তমভাবে সালামের উত্তর দেওয়া ওয়াজেব। আর সালামের পর ও বিদায়কালে এক হাতে মুসাফাহাহ করা সুন্নত। আল্লাহর রসূল বলেন, "যখনই কোন দুই মুমিন ব্যক্তি সাক্ষাৎ ক'রে আপোসে মুসাফাহাহ করে, (কেবল আল্লাহর ওয়াস্তে একে অন্যের হাত ধরে), তখনই তাদের পৃথক হয়ে প্রস্থান করার পূর্বেই উভয়কেই ক্ষমা ক'রে দেওয়া হয়।”৬০৫
তা'যীমের জন্য নয়, বরং নিজের জায়গায় বসানোর জন্য, সহযোগিতা করার জন্য আগন্তুকের প্রতি উঠে দাঁড়ানো সুন্দর চরিত্রের পরিচায়ক।
আর সফর থেকে ফিরে সাক্ষাতের সময় পরস্পরকে মুআনাকা করা বিধেয়। আনাস বলেন, 'নবী এর সাহাবাগণ যখন আপোসে সাক্ষাৎ করতেন, তখন মুসাফাহাহ করতেন এবং যখন সফর থেকে ফিরে আসতেন, তখন মুআনাকা করতেন। '৬০৬
২. অপরের বাড়ি প্রবেশে অনুমতি নেওয়া
অপরের বাড়ি প্রবেশ করতে হলে তার অনুমতি নিতে হবে। মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবের সূরা নূর ২৭-২৮ আয়াতে এর বিধান দিয়েছেন। উচিত নয়, কারো বাড়ির দরজার সোজাসুজি দাঁড়ানো। কারো বাড়ির ভিতর দৃষ্টিপাত করা অথবা উঁকিঝুঁকি মেরে দেখা চরিত্রবানের কাজ নয়। দরজা অথবা জানালা দিয়ে, রাস্তা থেকে অথবা অন্য বাড়ির ছাদ বা জানালা থেকে, গাছ বা গাড়ির উপর থেকে কারো বাড়ির ভিতরে নজর দিলে নজরবাজের চোখ ফুটিয়ে দেওয়া বৈধ করা হয়েছে। আল্লাহর রসূল বলেন, “যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের গৃহে তাদের অনুমতি না নিয়ে উঁকি মেরে দেখে সে ব্যক্তির চোখে (ঢিল ছুঁড়ে) তাকে কানা ক'রে দেওয়া তাদের জন্য বৈধ হয়ে যায়। "৬০৭
৩. রাস্তা চলার আদব
১. যমীনে চলাফেরা করার সময় অহংকার প্রদর্শন করা, নিজেকে হিরো ও অপরকে জিরো এবং গুরুকে গরু মনে করে অবজ্ঞার সাথে বিচরণ করা অভদ্র, অসভ্য ও গোঁয়ার লোকের নিদর্শন। আসলে একজন মুসলিম হয় ভদ্র ও বিনয়ী। মহান আল্লাহ তার চলার গুণ বর্ণনা করে বলেন,
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
অর্থাৎ, আর তারা রহমানের বান্দা, যারা যমীনের বুকে নম্রভাবে চলা-ফিরা করে এবং অজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদেরকে সম্বোধন করলে (উপেক্ষা করে) বলে, সালাম।৬০৮
পক্ষান্তরে চরিত্রশূন্য অহংকারীরা ঔদ্ধত্যের সাথে রাস্তা চলে, হাসিমুখে কথা বলে না, গোমড়া মুখ প্রদর্শন করে, পথে কাউকে সালাম দিতে চায় না এবং সালামের উত্তর দিতেও আগ্রহ দেখায় না। মহান আল্লাহ লুকমান হাকীমের উপদেশ উল্লেখ ক'রে বলেন,
وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
অর্থাৎ, তুমি (অহংকারবশে) মানুষকে মুখ বাঁকায়ো না (অবজ্ঞা করো না) এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক দাম্ভিক অহংকারীকে ভালোবাসেন না। ৬০৯
তিনি আরো বলেছেন,
وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَن تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَن تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولاً
"ভূ-পৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না, তুমি তো কখনোই পদভারে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বত-প্রমাণ হতে পারবে না।”৬১০
আল্লাহর রসূল বলেন, "একদা (পূর্ববর্তী উম্মতের) এক ব্যক্তি একজোড়া পোশাক পরে, গর্বভরে, মাথা আঁচড়ে অহংকারের সাথে চলা-ফেরা করছিল। ইত্যবসরে আল্লাহ তার (পায়ের নীচের মাটিকে) ধসিয়ে দিলেন। সুতরাং সে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত মাটির গভীরে নেমে যেতেই থাকবে।”৬১১
তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি মনে মনে গর্বিত হবে অথবা চলনে অহমিকা প্রকাশ করবে, সে ব্যক্তি যখন আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন তিনি তার উপর ক্রোধান্বিত থাকবেন। "৬১২
বহু মানুষ আছে, যারা অহংকারের সাথে নিজ লুঙ্গি, পায়জামা বা প্যান্ট গাঁটের নিচে ঝুলিয়ে পরে রাস্তায় ছেঁচড়ে নিয়ে বেড়ায়, তাদের ব্যাপারে মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তি অহংকারের সাথে তার কাপড় (মাটিতে) ছেঁচড়ায় তার দিকে আল্লাহ তাকিয়ে দেখবেন না।"৬১৩
৪. রোগী দেখতে যাওয়া
আল্লাহর রসূল বলেছেন, "মুসলিমের উপর মুসলিমের ৫টি অধিকার রয়েছে; (তার মধ্যে একটা হল,) রোগীকে সাক্ষাৎ ক'রে সান্ত্বনা দেওয়া।”৬১৪
রোগীকে সাক্ষাৎ করতে গেলে মহান আল্লাহকে সাক্ষাৎ করা হয়। ৬১৫
আল্লাহর রসূল বলেন, “যে ব্যক্তি কোন রোগীকে সাক্ষাৎ ক'রে জিজ্ঞাসাবাদ করে অথবা তার কোন লিল্লাহী (আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ভ্রাতৃত্বস্থাপন করে সেই) ভাইকে সাক্ষাৎ করে, সে ব্যক্তিকে এক (গায়বী) আহবানকারী আহবান করে বলে, 'সুখী হও তুমি, সুখকর হোক তোমার ঐ যাত্রা (সাক্ষাতের জন্য যাওয়া)। আর তোমার স্থান হোক জান্নাতের প্রাসাদে। "৬১৬
তিনি আরো বলেন, "যখনই কোন ব্যক্তি সন্ধ্যাবেলায় কোন রোগীকে সাক্ষাৎ করতে যায়, তখনই তার সাথে ৭০ হাজার ফিরিস্তা বের হয়ে সকাল পর্যন্ত তার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। আর যে ব্যক্তি সকালবেলায় রোগীকে দেখা করতে আসে সে ব্যক্তির সাথে ও ৭০ হাজার ফিরিস্তা বের হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে।" ৬১৭
তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি রোগীকে সাক্ষাৎ করতে যায়, সে আসলে ফিরে না আসা পর্যন্ত জান্নাতের ফল তুলতে থাকে।”৬১৮
তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি রোগীকে সাক্ষাৎ করতে যায়, সে আসলে রহমতে বিচরণ করতে থাকে। অতঃপর সে যখন (রোগীর নিকটে) বসে যায়, তখন রহমতে স্থায়ী হয়ে যায়।"৬১৯
তাহলে এমন কাজ কি কোন চরিত্রবানের না হয়?
৫. জানাযায় অংশগ্রহণ করা
চরিত্রবান পুরুষের একটি সচ্চরিত্রতা হল, কেউ মারা গেলে তার জানাযায় অংশ গ্রহণ করে। যেহেতু আল্লাহর রসূল বলেন, "মুসলিমের উপর মুসলিমের ৫টি অধিকার রয়েছে; (তার মধ্যে একটা হল,) জানাযায় অংশগ্রহণ করা।”৬২০
জানাযায় অংশগ্রহণ করলে পরকাল স্মরণ হয়। আর চরিত্রবানের একটা আচরণ হল পরকালকে সদাসর্বদা স্মরণে রাখা। পরন্তু সেই অংশগ্রহণে রয়েছে বিশাল সওয়াব। আল্লাহর রসূল বলেন,
مَنْ اتَّبَعَ جَنَازَةَ مُسْلِمٍ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا وَكَانَ مَعَهُ حَتَّى يُصَلَّى عَلَيْهَا وَيَفْرُغَ مِنْ دَفْنِهَا فَإِنَّه يَرْجِعُ مِنَ الْأَجْرِ بِقِيرَاطَيْنِ كُلُّ قِيرَاطٍ مِثْلُ أُحُدٍ وَمَنْ صَلَّى عَلَيْهَا ثُمَّ رَجَعَ قَبْلَ أَنْ تُدْفَنَ فَإِنَّهُ يَرْجِعُ بِقِيرَاطٍ
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং নেকী লাভের আশায় জানাযার অনুগমন করে তার স্বলাত ও দাফন হওয়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকে, সে ব্যক্তি দুই ক্বীরাত সওয়াব নিয়ে ফিরে আসে। প্রত্যেক ক্বীরাত উহুদ পাহাড় সমতুল্য। আর যে ব্যক্তি তার স্বলাত পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে, সে ব্যক্তি এক ক্বীরাত সওয়াব নিয়ে ফিরে আসে।”৬২১
৬. মজলিসের আদব
চরিত্রবান সর্বদা ভালো মজলিসে বসে। আর যখন কোন মজলিসে বসে, তখন আল্লাহর যিক্র করতে ও তাঁর নবী এর উপর দরূদ পড়তে ভুল করে না।
চরিত্রবান সর্বদা ভালো লোকের সাথী হয়। চরিত্রবান সাথীর সাথে উঠা-বসা করে। কারণ মানুষ যার সাথে উঠা-বসা করবে, সে অবশ্যই তার দ্বারা কিছু না কিছু প্রভাবান্বিত হবে। আর সে জন্যই কারো কাছে বসার আগে জেনে নেওয়া উচিত, সে ভালো লোক কি না?
আল্লাহর রসূল বলেন, "মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের অনুসারী হয়। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকের দেখা উচিত যে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।”৬২২
চরিত্রবান এমন জায়গায় বসে না, যেখানে বসলে পাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে। মহানবী বলেন, “খবরদার! তোমরা রাস্তার ধারে বসো না। আর একান্তই যদি বসতেই হয়, তাহলে তার হক আদায় করো।" লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, 'রাস্তার হক কি? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "দৃষ্টি সংযত রাখা, কাউকে কষ্ট দেওয়া হতে বিরত থাকা, সালামের জবাব দেওয়া, সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা দান করা (এবং পথভ্রষ্টকে পথ বলে দেওয়া)। "৬২৩
অনুরূপ বাড়ির ছাদে বা এমন উঁচু জায়গায় বসতেও নিষেধ করেছেন আমাদের আদর্শ নবী মুহাম্মাদ। ৬২৪
চরিত্রবান মজলিসে এসে কাউকে উঠিয়ে তার জায়গায় বসে না, কাউকে বসায় না। মজলিসে দুটি লোক (আত্মীয় বা বন্ধু) একত্রে বসে থাকলে, সে গিয়ে তাদের মাঝে বসে উভয়ের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে না।
ভদ্র মানুষ মজলিসে উপস্থিত হয়ে যেখানে মজলিস শেষ হয়েছে, সেখানেই বসে যান। ঘাড় ডিঙিয়ে মানুষকে কষ্ট দেয় না।
চরিত্রবান পরকীয় কথায় কানাচি পাতে না। কারণ তা করলে কিয়ামতের দিন তার কানে গলিত সীসা ঢালা হবে। ৬২৫
মজলিসে প্রগল্ভ হয়ে প্রায় সর্বদা সব কথাতে, হাসির কথাতে এবং অহাসির কথাতেও 'হো-হো, হা-হা' করে হাসা বৈধ নয়। মহানবী বলেন, "তোমরা বেশী বেশী হেসো না। কারণ, অধিক হাসিতে হৃদয় মারা যায়। "৬২৬
মজলিসে থাকাকালে ঘেউ ঘেউ করে ঢেকুর তোলা উচিত নয়। ঢেকুর এলে যথাসম্ভব শব্দ দমন করা উচিত। যেহেতু লোকেরা তা পছন্দ করে না। ঢেকুরের সাথে এমন গ্যাস বের হতে পারে, যা লোকেদের নাকে খারাপ লাগে।
মজলিসে বসার সময় আদবের সাথে থাকুন। যাতে লোকে আপনাকে খারাপ ভাবে সে রকম কাজ করবেন না। যেমন কারো দিকে পা করে বা পা মেলে বসবেন না। দুজনের জায়গা একা নিয়ে বসবেন না। সীট বা টেবিলের উপর পা তুলে বসবেন না। দাঁত বা নাক খুঁটবেন না। হাওয়া ছাড়বেন না। কারো হাওয়া ছাড়া শুনে হাসবেন না। যেহেতু মহানবী কারো হাওয়া ছাড়া শুনে হাসতে নিষেধ করেছেন। ৬২৭
তিনি বলেছেন, "তোমাদের কেউ যে কাজ নিজেও করে সে কাজে হাসে কেন?”৬২৮
মজলিস থেকে উঠে চলে যাওয়ার সময় সালাম দিয়ে যান।
৭. হাই ও হাঁচির আদব
মহানবী বলেন, "নিশ্চয় আল্লাহ হাঁচিকে পছন্দ এবং হাইকে অপছন্দ করেন। সুতরাং তোমাদের মধ্যে কেউ যখন হাঁচি মেরে 'আলহামদু লিল্লাহ' বলে, তখন প্রত্যেক সেই মুসলিমের উচিত, যে সেই হাম্দ শোনে সে যেন তার উদ্দেশ্যে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলে। পক্ষান্তরে হাই হল শয়তানেরই তরফ থেকে। সুতরাং তোমাদের যে কেউ যখন হাই তোলে, তখন সে যেন তা যথাসাধ্য দমন করে। যেহেতু তোমাদের কেউ যখন হাই তোলে, তখন শয়তান হাসে।" অন্য এক বর্ণনায় আছে, "তোমাদের কেউ যখন 'হা-হা' বলে, তখন শয়তান হাসে। "৬২৯
তিনি আরো বলেন, "তোমাদের কেউ যখন হাই তোলে, তখন সে যেন নিজ মুখের উপর হাত রেখে নেয়। কেননা শয়তান তাতে প্রবেশ করে থাকে।”৬৩০
৮. আধুনিক জীবনের কিছু আদব
১. টেলিফোন বা মোবাইলের রিং সাধারণ রাখুন। অবশ্যই কোন প্রকার মিউজিক বা গান লাগিয়ে রাখবেন না। আযান ও কুরআনও লাগাবেন না। কারণ তা অপবিত্র জায়গায় বেজে উটতে পারে। এ ছাড়া মসজিদে বা দর্সে গেলে রিং বন্ধ রাখুন। আপনার মোবাইল দ্বারা অপরকে কষ্ট দিবেন না বা নিজ তথা অপরের ইবাদতের মনোযোগ ও একাগ্রতা নষ্ট করবেন না।
পরন্তু ইবাদতের জায়গায় যদি রিং বন্ধ করতে ভুলেই যান, তাহলে প্রথম রিং হওয়া মাত্র সাথে সাথে বন্ধ করে ফেলুন। স্বলাত অবস্থায় হলেও তা ছেড়ে রাখবেন না। কারণ, তাতে আপনার সাথে প্রায় সকল মুস্বাল্লীর মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে।
২. রেডিও শুনুন, কিন্তু গান-বাজনা শোনা থেকে অবশ্যই দূরে থাকুন। টিভি দেখুন, কিন্তু গান-বাজনা শুনবেন না। অবৈধ কিছু দেখবেন না। ভিডিও ক্যামেরা, ভিসিয়ার, ভিসিডি ইত্যাদি যন্ত্র খুব সাবধানে ব্যবহার করুন। এসব যন্ত্রকে দাওয়াতি কাজে ব্যবহার করুন। তবে সাবধান থাকবেন, যাতে 'বাত ভালো করতে গিয়ে কুষ্ঠব্যাধি' না হয়ে বসে।
৩. আধুনিক যুগে কম্পিউটার একটি আশ্চর্য জিনিস। এটিকেও আপনি আপনার উপকারে ব্যবহার করুন। তবে ইন্টারনেট ব্যবহার করুন খুব সতর্কতার সাথে। যেহেতু তাতে মধুও আছে এবং বিষও।
৪. গাড়ি চালালে অতি সাবধানতার সাথে চালান। ট্রাফিক আইন অবশ্যই মেনে চলুন। অপর সাইডে কোন গাড়ি থাক্ বা না-ই থাক্ আপনার শিগ্ন্যাল গ্রীন না হলে আপনি তা অতিক্রম করবেন না। অবশ্য গ্রীন হলেও অন্য সাইড ভালোভাবে দেখেই পার হন, কারণ আইন ভঙ্গকারী মানুষের অভাব নেই। মাত্রাধিক স্পীডে গাড়ি চালিয়ে নিজের তথা অপরের জীবনকে মরণের দিকে ঠেলে দিবেন না।
রোডে অপর গাড়ি বা পথচারীর খেয়াল অবশ্যই রাখবেন। পথের অধিকার সকলকেই যথোচিতভাবে প্রদান করবেন। উচিতভাবে সাইড দেবেন। খবরদার রোডে কারো সাথে প্রতিযোগিতার মনোভাব নিয়ে আগে যেতে চেষ্টা করবেন না। আপনার গাড়ির হর্নে ঘুমন্ত, রোগগ্রস্ত বা ইবাদতরত কোন ব্যক্তির ডিস্টার্ব করবেন না। রাতে সামনে গাড়ি থাকলে হেড-লাইট জ্বালিয়ে রাখবেন না।
গাড়ি চালানো একটি নেহাতই টেনশনের কাজ। সুতরাং অপরের ভুলের সাথে আপনার প্রচুর ধৈর্যের দরকার।
একজন মুসলিম হবে এতই আদর্শবান যে, তার মাধ্যমে অন্য লোকে কোন প্রকার কষ্ট পাবে না।
বলা বাহুল্য, গাড়ি চালানো খুবই সতর্কতা ও বড় সচ্চরিত্রতার কাজ।
টিকাঃ
৫৯৫. মুসলিম ২ ১৬২
৫৯৬. তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, হাকেম, সহীহ তারগীব ৬১০
৫৯৭. তিরমিযী ২৬৯৮
৫৯৮. বুখারী ৬২৩৬, মুসলিম ৩৯
৫৯৯. মুসলিম ৫৪
৬০০. সহীহুল জামে' ৯৬৬
৬০১. সহীহুল জামে' ৯৬৬
৬০২. বুখারী ৬২৩১-৬২৩২, মুসলিম ২১৬০
৬০৩. বুখারী ৬০৭৭, সিলসিলাহ সহীহাহ ১১৪৬
৬০৪. বুখারী ৬২৪৭, মুসলিম ২১৬৮
৬০৫. তিরমিযী, সহীহ আবু দাউদ ৪৩৪৩
৬০৬. তাবারানী, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৮/৩৬
৬০৭. বুখারী ৬৮৮৮, মুসলিম ২১৫৮, আবু দাউদ, নাসাঈ
৬০৮. সূরা ফুরকান ৬৩
৬০৯. সূরা লুকুমান ১৮
৬১০. সূরা বানী ইস্রাঈল: ৩৭
৬১১. বুখারী ৫৭৮৯, মুসলিম ২০৮৮
৬১২. আহমদ, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ, হাকেম ১/১৬০, সহীহুল জামে' ৬১৫৭
৬১৩. বুখারী ৫৭৮৪, মুসলিম ২০৮৫
৬১৪. বুখারী ১২৪০, মুসলিম ২১৬২
৬১৫. মুসলিম ৬৭২১
৬১৬. তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, সহীহ তিরমিযী ১৬৩৩
৬১৭. আহমাদ, ইবনে মাজাহ, বাইহাকী, প্রমুখ, সহীহুল জামে' ৫৭১৭
৬১৮. আহমাদ ২১৮৬৮, মুসলিম ২৫৬৮, তিরমিযী ৯৬৭
৬১৯. আল-আদাবুল মুফরাদ ৫২২
৬২০. বুখারী ১২৪০, মুসলিম ২১৬২
৬২১. বুখারী ৪৭
৬২২. আহমাদ ৭৯৬৮, আবু দাউদ ৪৮৩৩, তিরমিযী ২৩৭৮, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ৯২৭
৬২৩. আহমাদ, বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, সহীহুল জামে' ২৬৭৫
৬২৪. সিলসিলাহ সহীহাহ ৬/১৪-১৫
৬২৫. বুখারী ৭০৪২
৬২৬. ইবনে মাজাহ ৪১৯৩
৬২৭. সহীহুল জামে' ৬৮৯৬
৬২৮. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৩২৪২
৬২৯. বুখারী ৬২২৩, ৬২২৬, মুসলিম ২৯৯৪
৬৩০. মুসলিম ২৯৯৫