📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 মনের সুস্থতা

📄 মনের সুস্থতা


কিয়ামতের বিভীষিকাময় ময়দান। জান্নাত-জাহান্নামের অনিশ্চয়তা নিয়ে সকল মানুষ চিন্তিত। সেখানে সাহায্যকারী কেউ নেই; না স্বজন-বন্ধু, না অর্থ-সম্পদ। কেউ কারো উপকার করবে না। অবশ্য উপকারী হবে মানুষের সুস্থ অন্তর। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ)
"যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না; সেদিন উপকৃত হবে কেবল সেই; যে আল্লাহর নিকট সুস্থ অন্তঃকরণ নিয়ে উপস্থিত হবে।”৫৪৯
সুস্থ মনঃ যে মন সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা ও অসদাচরণ; যেমন হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, বিদ্বেষ, কুধারণা ইত্যাদি থেকে পরিচ্ছন্ন।
সুস্থ মন: যাতে কোন প্রকার এমন প্রবৃত্তি নেই, যা মহান প্রতিপালকের আদেশ ও নিষেধের বিরোধিতা করে। কোন প্রকার এমন সন্দেহ নেই, যা তাঁর বাণীকে অবিশ্বাস করে।
সুস্থ মনঃ যে মন মানুষের মঙ্গল কামনা করে। যে মন পরের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়। এই মনের মানুষই কিয়ামতে সহী-সালামতে অবস্থান করবে। এ মনের মানুষই জান্নাতের অধিকারী হবে।
সুফিয়ান বিন দীনার বলেন, আমি আলীর অন্যতম শিষ্য আবূ বাশীরকে বললাম, 'আমাদের পূর্ববর্তীদের আমল সম্বন্ধে আমাকে কিছু বলুন।' তিনি বললেন, 'তাঁরা সামান্য আমল করতেন, কিন্তু অসামান্য সওয়াব অর্জন করতেন।' আমি বললাম, 'তা কী কারণে?' তিনি বললেন, 'তাঁদের বক্ষস্থল সুস্থ থাকার কারণে?'
আবু দুজানা অসুস্থ ছিলেন। তাঁর মুখমণ্ডল চাঁদের মতো হাস্যোজ্জ্বল ছিল। তাঁকে বলা হল, 'কী কারণে আপনার চেহারা চাঁদের মতো এত ঝলমল করছে?' তিনি বললেন, 'আমার নিকট দুটি আমল অপেক্ষা অন্য কিছু নির্ভরযোগ্য নেই; প্রথম এই যে, আমি সে বিষয়ে মুখ খুলতাম না, যে বিষয় আমার সাথে সম্পৃক্ত নয়। আর দ্বিতীয় এই যে, মুসলিমদের জন্য আমার হৃদয় পরিষ্কার ছিল।'
কাসেম জুয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'দ্বীনের মৌলিক বিষয় হল সংযম। সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত হল রাত্রি জাগরণ করা এবং বেহেস্তের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ হল বক্ষস্থলকে পরিষ্কার রাখা।'
এতে কোন প্রকার সন্দেহ নেই যে, যার মন সত্যিকারে পরিষ্কার, তার চরিত্র সবার চাইতে শ্রেষ্ঠ এবং সে সব চাইতে ভালো লোক। আব্দুল্লাহ বিন আম্র বলেন, একদা মহানবী কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ লোক কে?' উত্তরে তিনি বললেন,
كُلُّ مَحْمُومِ الْقَلْبِ صَدُوقِ اللِّسَانِ
"সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ লোক হল সেই, যার হৃদয় হল পরিষ্কার এবং জিভ হল সত্যবাদী।"
জিজ্ঞাসা করা হল, 'পরিষ্কার হৃদয়ের অর্থ কী?' বললেন,
هُوَ التَّقِيُّ النَّقِيُّ لَا إِثْمَ فِيهِ وَلَا بَغْيَ وَلَا غِلَّ وَلَا حَسَدَ
"যে হৃদয় সংযমশীল, নির্মল, যাতে কোন পাপ নেই, অন্যায় নেই, ঈর্ষা ও হিংসা নেই।"
জিজ্ঞাসা করা হল, 'তারপর কে?' তিনি বললেন, "যে দুনিয়াকে ঘৃণা করে এবং আখেরাতকে ভালোবাসে।"
জিজ্ঞাসা করা হল, 'তারপর কে?' বললেন, "সুন্দর চরিত্রের মুমিন।"৫৫০
পক্ষান্তরে অসুস্থ মন?
সে মন পরের শ্রী দেখে কাতর হয়। অন্যের ঋদ্ধি-বৃদ্ধি দেখে হিংসা করে। অন্যের আয়-উন্নতি দেখে ধ্বংস-কামনা করে। অন্যের প্রতি অকারণে বিদ্বেষ ও ঘৃণা পোষণ করে। অন্যের প্রশংসা শুনে তার গা-জ্বালা করে। নিজে যেমন ধ্বংসপ্রাপ্ত, তেমনি অন্যকেও সেই রূপ হওয়ার আশা করে। বেশ্যা চায়, সারা বিশ্বের মহিলারা সবাই বেশ্যা হোক। আমার বদনাম হয়েছে, তেমনি সবারই হোক।
এমন মনের মানুষরা নিশ্চয় চরিত্রবান নয়, ভালো লোক নয়। যারা চরিত্রবান, যাদের হৃদয় সাদা ও স্বচ্ছ, যাদের মনে কোন কূট ও টেরামি নেই, তারা পূর্বাপর কোন মুসলিমের প্রতি তাদের মনে কোন প্রকার অপরিচ্ছন্নতা রাখে না। আর তারা দুআ ক'রে বলে,
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ )
'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং বিশ্বাসে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা কর এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তো দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু। ১৫৫১

টিকাঃ
৫৪৯. শুআ'রা: ৮৮-৮৯
৫৫০. ইবনে মাজাহ ৪২১৬, সহীহুল জামে ৩২৯১
৫৫১. হাশ্র: ১০

কিয়ামতের বিভীষিকাময় ময়দান। জান্নাত-জাহান্নামের অনিশ্চয়তা নিয়ে সকল মানুষ চিন্তিত। সেখানে সাহায্যকারী কেউ নেই; না স্বজন-বন্ধু, না অর্থ-সম্পদ। কেউ কারো উপকার করবে না। অবশ্য উপকারী হবে মানুষের সুস্থ অন্তর। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ)
"যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না; সেদিন উপকৃত হবে কেবল সেই; যে আল্লাহর নিকট সুস্থ অন্তঃকরণ নিয়ে উপস্থিত হবে।”৫৪৯
সুস্থ মনঃ যে মন সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা ও অসদাচরণ; যেমন হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, বিদ্বেষ, কুধারণা ইত্যাদি থেকে পরিচ্ছন্ন।
সুস্থ মন: যাতে কোন প্রকার এমন প্রবৃত্তি নেই, যা মহান প্রতিপালকের আদেশ ও নিষেধের বিরোধিতা করে। কোন প্রকার এমন সন্দেহ নেই, যা তাঁর বাণীকে অবিশ্বাস করে।
সুস্থ মনঃ যে মন মানুষের মঙ্গল কামনা করে। যে মন পরের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়। এই মনের মানুষই কিয়ামতে সহী-সালামতে অবস্থান করবে। এ মনের মানুষই জান্নাতের অধিকারী হবে।
সুফিয়ান বিন দীনার বলেন, আমি আলীর অন্যতম শিষ্য আবূ বাশীরকে বললাম, 'আমাদের পূর্ববর্তীদের আমল সম্বন্ধে আমাকে কিছু বলুন।' তিনি বললেন, 'তাঁরা সামান্য আমল করতেন, কিন্তু অসামান্য সওয়াব অর্জন করতেন।' আমি বললাম, 'তা কী কারণে?' তিনি বললেন, 'তাঁদের বক্ষস্থল সুস্থ থাকার কারণে?'
আবু দুজানা অসুস্থ ছিলেন। তাঁর মুখমণ্ডল চাঁদের মতো হাস্যোজ্জ্বল ছিল। তাঁকে বলা হল, 'কী কারণে আপনার চেহারা চাঁদের মতো এত ঝলমল করছে?' তিনি বললেন, 'আমার নিকট দুটি আমল অপেক্ষা অন্য কিছু নির্ভরযোগ্য নেই; প্রথম এই যে, আমি সে বিষয়ে মুখ খুলতাম না, যে বিষয় আমার সাথে সম্পৃক্ত নয়। আর দ্বিতীয় এই যে, মুসলিমদের জন্য আমার হৃদয় পরিষ্কার ছিল।'
কাসেম জুয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'দ্বীনের মৌলিক বিষয় হল সংযম। সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত হল রাত্রি জাগরণ করা এবং বেহেস্তের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ হল বক্ষস্থলকে পরিষ্কার রাখা।'
এতে কোন প্রকার সন্দেহ নেই যে, যার মন সত্যিকারে পরিষ্কার, তার চরিত্র সবার চাইতে শ্রেষ্ঠ এবং সে সব চাইতে ভালো লোক। আব্দুল্লাহ বিন আম্র বলেন, একদা মহানবী কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ লোক কে?' উত্তরে তিনি বললেন,
كُلُّ مَحْمُومِ الْقَلْبِ صَدُوقِ اللِّسَانِ
"সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ লোক হল সেই, যার হৃদয় হল পরিষ্কার এবং জিভ হল সত্যবাদী।"
জিজ্ঞাসা করা হল, 'পরিষ্কার হৃদয়ের অর্থ কী?' বললেন,
هُوَ التَّقِيُّ النَّقِيُّ لَا إِثْمَ فِيهِ وَلَا بَغْيَ وَلَا غِلَّ وَلَا حَسَدَ
"যে হৃদয় সংযমশীল, নির্মল, যাতে কোন পাপ নেই, অন্যায় নেই, ঈর্ষা ও হিংসা নেই।"
জিজ্ঞাসা করা হল, 'তারপর কে?' তিনি বললেন, "যে দুনিয়াকে ঘৃণা করে এবং আখেরাতকে ভালোবাসে।"
জিজ্ঞাসা করা হল, 'তারপর কে?' বললেন, "সুন্দর চরিত্রের মুমিন।"৫৫০
পক্ষান্তরে অসুস্থ মন?
সে মন পরের শ্রী দেখে কাতর হয়। অন্যের ঋদ্ধি-বৃদ্ধি দেখে হিংসা করে। অন্যের আয়-উন্নতি দেখে ধ্বংস-কামনা করে। অন্যের প্রতি অকারণে বিদ্বেষ ও ঘৃণা পোষণ করে। অন্যের প্রশংসা শুনে তার গা-জ্বালা করে। নিজে যেমন ধ্বংসপ্রাপ্ত, তেমনি অন্যকেও সেই রূপ হওয়ার আশা করে। বেশ্যা চায়, সারা বিশ্বের মহিলারা সবাই বেশ্যা হোক। আমার বদনাম হয়েছে, তেমনি সবারই হোক।
এমন মনের মানুষরা নিশ্চয় চরিত্রবান নয়, ভালো লোক নয়। যারা চরিত্রবান, যাদের হৃদয় সাদা ও স্বচ্ছ, যাদের মনে কোন কূট ও টেরামি নেই, তারা পূর্বাপর কোন মুসলিমের প্রতি তাদের মনে কোন প্রকার অপরিচ্ছন্নতা রাখে না। আর তারা দুআ ক'রে বলে,
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ )
'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং বিশ্বাসে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা কর এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তো দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু। ১৫৫১

টিকাঃ
৫৪৯. শুআ'রা: ৮৮-৮৯
৫৫০. ইবনে মাজাহ ৪২১৬, সহীহুল জামে ৩২৯১
৫৫১. হাশ্র: ১০

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 আল্লাহর পথে নিন্দুকের নিন্দাকে উপেক্ষা

📄 আল্লাহর পথে নিন্দুকের নিন্দাকে উপেক্ষা


চরিত্রবান মুসলিম নারী-পুরুষের একটি গুণ হল, তারা আল্লাহর পথে কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করে না। তাঁর দ্বীন জানতে, মানতে ও প্রচার করতে কোন বাধাদানকারীর বাধাকে পরোয়া করে না। কাফেরদের রক্তচক্ষুকে ভয় ক'রে আল্লাহর দ্বীন থেকে বৈমুখ হয় না। যেহেতু মহান আল্লাহর নির্দেশ,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةً عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ الله وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ ذَلِكَ فَضْلُ الله يُؤْتِيهِ مَن يَشَاء وَاللَّهِ وَاسِعٌ عَلِيمٌ)
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ ধর্ম হতে ফিরে গেলে আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনয়ন করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন ও যারা তাঁকে ভালবাসবে, তারা হবে বিশ্বাসীদের প্রতি কোমল ও অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দায় ভয় করবে না, এ আল্লাহর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা তিনি দান করেন। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়।" ৫৫২
আবূ যার বলেছেন, 'আমাকে আমার বন্ধু সাতটি কাজের অসিয়ত করে গেছেন; (১) আমি যেন মিসকীনদেরকে ভালোবাসি এবং তাদের নিকটবর্তী হই (বসি), (২) আমার থেকে যারা নিম্নমানের তাদের প্রতি লক্ষ্য (করে উপদেশ বা সান্ত্বনা গ্রহণ) করি ও আমার থেকে যে ঊর্ধ্বে তার প্রতি লক্ষ্য না করি, (৩) আমার প্রতি অন্যায় করা হলেও আমি আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখি, (৪) বেশী বেশী 'লা হাউলা অলা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' বলি, (৫) তিক্ত হলেও যেন হক কথা বলি, (৬) আল্লাহর ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দা-ভয় যেন আমাকে না ধরে এবং (৭) লোকেদের কাছে যেন কিছুও না চাই। ১৫৫৩
মানুষের ভয়ে বা লজ্জায় হক বলা থেকে বিরত থাকা চরিত্রবানের কাজ হতে পারে না। আল্লাহর ব্যাপারে প্রশাসনকেও ভয় নেই। যেহেতু তাঁর অবাধ্যাচরণ ক'রে কোন প্রশাসনের আনুগত্য বৈধ নয়। সে ক্ষেত্রেও হক কথা বলতে কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করা চরিত্রবান মুসলিমের কাজ নয়।
আবূ অলীদ উবাদাহ ইবনে সামেত বলেন, 'আমরা রাসূলুল্লাহ এর কাছে এই মর্মে বাইয়াত করলাম যে, দুঃখে-সুখে, আরামে ও কষ্টে এবং আমাদের উপর (অন্যদেরকে) প্রাধান্য দেওয়ার অবস্থায় আমরা তাঁর পূর্ণ আনুগত্য করব। রাষ্ট্রনেতার বিরুদ্ধে তার নিকট থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার লড়াই করব না; যতক্ষণ না তোমরা (তার মধ্যে) প্রকাশ্য কুফরী দেখ, যে ব্যাপারে তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে দলীল রয়েছে। আর আমরা সর্বদা সত্য কথা বলব এবং আল্লাহর ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করব না। ১৫৫৪
হ্যাঁ, হক কথা সূর্যের মতো। মেঘ চিরে তা প্রকাশ পায়। ঢাকা থাকলেও বেশি ক্ষণ বা দিন ঢাকা থাকে না। আর মহানবী বলেছেন,
أَفْضَلُ الْجِهَادِ كَلِمَةُ عَدْلٍ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ
"অত্যাচারী বাদশাহর নিকট হক কথা বলা সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ।”৫৫৫
তবে খেয়াল রাখতে হবে, প্রশাসনের কাছে, একান্তে তার কর্ণকুহরে। প্রকাশ্যে লোক মাঝে নয়, জনসভা ও মিম্বরে নয়। কারণ তাও এক প্রকার নিষিদ্ধ বিদ্রোহ।
সত্য বলতে ভয় নেই। হিকমতের সাথে সত্য বলতে দোষ নেই। বাধা এলে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে বাধাকে উল্লংঘন করা কর্তব্য চরিত্রবান দাঈর।
কবি বলেছেন, 'বিধির বিধান মানতে গিয়ে নিষেধ যদি দেয় আগল, বিশ্ব যদি কয় পাগল আছেন সত্য মাথার 'পর বেপরোয়া তুই সত্য বল, বুক ঠুকে তুই সত্য বল। (তখন) তোর পথেরই মশাল হয়ে জ্বলবে বিধির রুদ্র চোখ, বিধির বিধান সত্য হোক। বিধির বিধান সত্য হোক।'

টিকাঃ
৫৫২. সূরা মায়িদাহ: ৫৪
৫৫৩. আহমাদ ২১৪১৫, ত্বাবারানী ১৬২৬, সহীহ তারগীব ৮১১
৫৫৪. বুখারী ৭২০০, মুসলিম ৪৮৭৪
৫৫৫. আবু দাউদ ৪৩৪৬, তিরমিযী ২১৭৪, ইবনে মাজাহ ৪০১১

চরিত্রবান মুসলিম নারী-পুরুষের একটি গুণ হল, তারা আল্লাহর পথে কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করে না। তাঁর দ্বীন জানতে, মানতে ও প্রচার করতে কোন বাধাদানকারীর বাধাকে পরোয়া করে না। কাফেরদের রক্তচক্ষুকে ভয় ক'রে আল্লাহর দ্বীন থেকে বৈমুখ হয় না। যেহেতু মহান আল্লাহর নির্দেশ,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةً عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ الله وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ ذَلِكَ فَضْلُ الله يُؤْتِيهِ مَن يَشَاء وَاللَّهِ وَاسِعٌ عَلِيمٌ)
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ ধর্ম হতে ফিরে গেলে আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনয়ন করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন ও যারা তাঁকে ভালবাসবে, তারা হবে বিশ্বাসীদের প্রতি কোমল ও অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দায় ভয় করবে না, এ আল্লাহর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা তিনি দান করেন। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়।" ৫৫২
আবূ যার বলেছেন, 'আমাকে আমার বন্ধু সাতটি কাজের অসিয়ত করে গেছেন; (১) আমি যেন মিসকীনদেরকে ভালোবাসি এবং তাদের নিকটবর্তী হই (বসি), (২) আমার থেকে যারা নিম্নমানের তাদের প্রতি লক্ষ্য (করে উপদেশ বা সান্ত্বনা গ্রহণ) করি ও আমার থেকে যে ঊর্ধ্বে তার প্রতি লক্ষ্য না করি, (৩) আমার প্রতি অন্যায় করা হলেও আমি আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখি, (৪) বেশী বেশী 'লা হাউলা অলা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' বলি, (৫) তিক্ত হলেও যেন হক কথা বলি, (৬) আল্লাহর ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দা-ভয় যেন আমাকে না ধরে এবং (৭) লোকেদের কাছে যেন কিছুও না চাই। ১৫৫৩
মানুষের ভয়ে বা লজ্জায় হক বলা থেকে বিরত থাকা চরিত্রবানের কাজ হতে পারে না। আল্লাহর ব্যাপারে প্রশাসনকেও ভয় নেই। যেহেতু তাঁর অবাধ্যাচরণ ক'রে কোন প্রশাসনের আনুগত্য বৈধ নয়। সে ক্ষেত্রেও হক কথা বলতে কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করা চরিত্রবান মুসলিমের কাজ নয়।
আবূ অলীদ উবাদাহ ইবনে সামেত বলেন, 'আমরা রাসূলুল্লাহ এর কাছে এই মর্মে বাইয়াত করলাম যে, দুঃখে-সুখে, আরামে ও কষ্টে এবং আমাদের উপর (অন্যদেরকে) প্রাধান্য দেওয়ার অবস্থায় আমরা তাঁর পূর্ণ আনুগত্য করব। রাষ্ট্রনেতার বিরুদ্ধে তার নিকট থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার লড়াই করব না; যতক্ষণ না তোমরা (তার মধ্যে) প্রকাশ্য কুফরী দেখ, যে ব্যাপারে তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে দলীল রয়েছে। আর আমরা সর্বদা সত্য কথা বলব এবং আল্লাহর ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করব না। ১৫৫৪
হ্যাঁ, হক কথা সূর্যের মতো। মেঘ চিরে তা প্রকাশ পায়। ঢাকা থাকলেও বেশি ক্ষণ বা দিন ঢাকা থাকে না। আর মহানবী বলেছেন,
أَفْضَلُ الْجِهَادِ كَلِمَةُ عَدْلٍ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ
"অত্যাচারী বাদশাহর নিকট হক কথা বলা সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ।”৫৫৫
তবে খেয়াল রাখতে হবে, প্রশাসনের কাছে, একান্তে তার কর্ণকুহরে। প্রকাশ্যে লোক মাঝে নয়, জনসভা ও মিম্বরে নয়। কারণ তাও এক প্রকার নিষিদ্ধ বিদ্রোহ।
সত্য বলতে ভয় নেই। হিকমতের সাথে সত্য বলতে দোষ নেই। বাধা এলে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে বাধাকে উল্লংঘন করা কর্তব্য চরিত্রবান দাঈর।
কবি বলেছেন, 'বিধির বিধান মানতে গিয়ে নিষেধ যদি দেয় আগল, বিশ্ব যদি কয় পাগল আছেন সত্য মাথার 'পর বেপরোয়া তুই সত্য বল, বুক ঠুকে তুই সত্য বল। (তখন) তোর পথেরই মশাল হয়ে জ্বলবে বিধির রুদ্র চোখ, বিধির বিধান সত্য হোক। বিধির বিধান সত্য হোক।'

টিকাঃ
৫৫২. সূরা মায়িদাহ: ৫৪
৫৫৩. আহমাদ ২১৪১৫, ত্বাবারানী ১৬২৬, সহীহ তারগীব ৮১১
৫৫৪. বুখারী ৭২০০, মুসলিম ৪৮৭৪
৫৫৫. আবু দাউদ ৪৩৪৬, তিরমিযী ২১৭৪, ইবনে মাজাহ ৪০১১

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 রাগ দমন

📄 রাগ দমন


ভদ্র ও সুশীল মানুষের একটি লক্ষণ হল রাগ দমন করা। ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রিত করা।
হযরত উমার বলেন, 'কারো সচ্চরিত্রতার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ো না, যতক্ষণ না তাকে রাগের সময় পরীক্ষা করে নিয়েছ।'
রাগের কথায় রাগ হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে যে লোক রাগতে জানে না সে মূর্খ, কিন্তু যে রাগ করে না সে বুদ্ধিমান।
ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, 'রাগের কথায় যে রাগে না সে আসলে গাধা, আর রাগ মানালে যে মানে না সে আসলে শয়তান। ৫৫৬
নিয়ন্ত্রণহারা আগুন, পানি ইত্যাদি যেমন মানুষের শত্রু, তেমনি অতিরিক্ত রাগ বা ক্রোধও তার ষড়রিপুর অন্যতম।
যে ক্রোধ আত্মপর মর্যাদা বিস্মৃত করে এবং যাবতীয় উপকার সমাধিস্থ করে।
যে ক্রোধ সভ্য মানুষকেও হিংস্র জন্তুতে পরিণত করে।
যে ক্রোধ হল এমন ঝোড়ো হাওয়ার মত, যা নিমেষে বুদ্ধিমান মানুষের বুদ্ধির প্রদীপকে নিভিয়ে দেয়।
মানুষ যখন খুব রেগে যায়, তখন তার দিগ্বিদিক জ্ঞান থাকে না। মনে থাকে না তার নিজের আত্মসম্মানের কথা, ধর্মের কথা। তাই সে তখন কারো খাতির রাখতে চায় না; এমন কি অনেক সময় ক্রোধবশে নিজের ক্ষতি নিজেই ক'রে বসে।
আসলে ক্রোধের প্রথমটা পাগলামি এবং শেষটা লাঞ্ছনা। রাগ বোকামি থেকে উৎপত্তি হয়, কিন্তু অনুতাপে শেষ হয়। ক্রোধ দূর হলেই অনুতাপ আসে।
এই জন্য মহান চরিত্রের আদর্শ নবী মানুষকে রাগ না করতে উপদেশ দিয়েছেন। আবূ হুরাইরা বলেন, এক ব্যক্তি নবী কে বলল, 'আপনি আমাকে কিছু অসিয়ত করুন!' তিনি বললেন, "তুমি রাগান্বিত হয়ো না।” সে ব্যক্তি এ কথাটি কয়েকবার বলল। তিনি (প্রত্যেক বারেই একই কথা) বললেন, "তুমি রাগান্বিত হয়ো না।"৫৫৭
বলা বাহুল্য, ক্রোধ দমন করা সচ্চরিত্রতার একটি অঙ্গ। মহান সৃষ্টিকর্তা যাদের জন্য বেহেস্ত প্রস্তুত রেখেছেন, তাদের মধ্যে এক শ্রেণীর মানুষ হল তারা, যারা নিজেদের ক্রোধ সংবরণ করে। তিনি বলেছেন,
(وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ)
অর্থাৎ, (সেই ধর্মভীরুদের জন্য জান্নাত প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় দান করে,) ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা ক'রে থাকে। ৫৫৮
সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তি সেই, যে তার গুপ্ত ভেদ গোপন রাখতে অক্ষম। আর সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হল সেই, যে তার ক্রোধ দমন করতে পারে। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ
"শক্তিশালী (বা বীর) সে নয় যে কুশীতে জয়লাভ করে। বরং প্রকৃত শক্তিশালী (বা বীর) হল সেই ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় নিজেকে সামলে নিতে পারে।"৫৫৯
উক্ত বিজয়ী বীরের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। মহানবী বলেছেন,
مَنْ كَظَمَ غَيْظًا - وَهُوَ قَادِرٌ عَلَى أَنْ يُنْفِذَهُ - دَعَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُخَيَّرَهُ اللَّهُ مِنَ الْحُورِ مَا شَاءَ
"যে ব্যক্তি কোন প্রকার ক্রোধ সংবরণ করে, যা সে প্রয়োগ করতে সমর্থ, আল্লাহ তাকে সৃষ্টির মাঝে আহবান করবেন এবং তার ইচ্ছামত (বেহেস্তের) সুনয়না হুরী গ্রহণ করতে এখতিয়ার দেবেন।"৫৬০
রাগ দমন করবেন কীভাবে? রাগ দমনের জন্য যেমন প্রয়োজন ক্ষমাশীলতার, তেমনি প্রয়োজন সহিষ্ণুতা ও ধৈর্যশীলতার। ইউনুস নবী (আ)-এর নিজ জাতির ব্যাপারে ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছিল। ফলে তিনি তাদের প্রতি রাগান্বিত হয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর মতো না হতে আদেশ করেছেন তাঁর সর্বশেষ নবী কে,
فَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ وَلَا تَكُن كَصَاحِبِ الْحُوتِ إِذْ نَادَى وَهُوَ مَكْظُومٌ
"অতএব তুমি ধৈর্যধারণ কর তোমার প্রতিপালকের নির্দেশের অপেক্ষায়, তুমি তিমি-ওয়ালা (ইউনুস) এর মত অধৈর্য হয়ো না, যখন সে বিষাদ আচ্ছন্ন অবস্থায় কাতর প্রার্থনা করেছিল।"৫৬১
যার প্রতি রাগ করা হয়, সে রাগের আগুনকে নিভাতে পারে। গরম মানুষকে নরম উত্তর দিলে রাগ পানি হয়ে যায়।
জ্ঞানিগণ বলেন, 'রাগের সবচেয়ে বড় প্রতিকার হল, বিলম্ব করা।' 'ক্রোধের একমাত্র ঔষধ হল নীরবতা অবলম্বন করা।' কারণ রাগের পরে পরেই সত্বর কোন কাজ করলে তা ভুল হতে পারে এবং ক্রোধের সময় কথা বললে মুখ থেকে অসঙ্গত কথা বের হতে পারে।
ক্রোধ দমনের আরো একটি চিকিৎসা হল নবী এর নির্দেশ,
إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ قَائِمٌ فَلْيَجْلِسُ فَإِنْ ذَهَبَ عَنْهُ الْغَضَبُ وَإِلا فَلْيَضْطَجِعُ
"তোমাদের মধ্যে যখন কেউ রেগে যাবে, তখন সে দাঁড়িয়ে থাকলে যেন বসে যায়। এতে তার রাগ দূরীভূত হলে ভাল, নচেৎ সে যেন শুয়ে যায়।"৫৬২
রাগ অনেক সময় শয়তান উদ্রেক করে। সেই জন্য রাগ দমনের একটি চিকিৎসা হল, শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা।
সুলাইমান বিন সুরাদ বলেন, একদা আমি নবী এর কাছে বসে ছিলাম। এমন সময় দুই ব্যক্তি গালাগালি করলে ওদের মধ্যে একজনের রাগ চরমে উঠে সে লাল হয়ে গেল। তিনি বললেন,
إِنِّي لَأَعْلَمُ كَلِمَةً لَوْ قَالَهَا ذَهَبَ عَنْهُ مَا يَجِدُ لَوْ قَالَ أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ ذَهَبَ عَنْهُ مَا يَجِدُ
"আমি এমন একটি মন্ত্র জানি, তা পাঠ করলে ওর রাগ দূর হয়ে যাবে। 'আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাজীম' পড়লে তার রাগ দূর হয়ে যাবে।" লোকটি বলে উঠল, 'আপনি কি আমাকে পাগল মনে করেন?' তা শুনে তিনি পাঠ করলেন,
وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
"যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তাহলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।"৫৬৩

টিকাঃ
৫৫৬. বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৯১৬৪
৫৫৭. বুখারী ৬১১৬
৫৫৮. সূরা আলে ইমরান ১৩৪
৫৫৯. আহমাদ, বুখারী ৬১১৪, মুসলিম ৬৮০৯, মিশকাত ৫১০৫
৫৬০. তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, সহীহ আবু দাউদ ৩৯৯৭
৫৬১. সূরা ক্বালাম: ৪৮
৫৬২. আহমাদ ২১৩৪৮, আবু দাউদ ৪৭৮৪, ইবনে হিব্বান, সহীহুল জামে ৬৯৪
৫৬৩. সূরা আ'রাফ: ২০০, বুখারী ৩২৮২, মুসলিম ৬৮-১২, হাকেম ৩৬৪৯

ভদ্র ও সুশীল মানুষের একটি লক্ষণ হল রাগ দমন করা। ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রিত করা।
হযরত উমার বলেন, 'কারো সচ্চরিত্রতার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ো না, যতক্ষণ না তাকে রাগের সময় পরীক্ষা করে নিয়েছ।'
রাগের কথায় রাগ হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে যে লোক রাগতে জানে না সে মূর্খ, কিন্তু যে রাগ করে না সে বুদ্ধিমান।
ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, 'রাগের কথায় যে রাগে না সে আসলে গাধা, আর রাগ মানালে যে মানে না সে আসলে শয়তান। ৫৫৬
নিয়ন্ত্রণহারা আগুন, পানি ইত্যাদি যেমন মানুষের শত্রু, তেমনি অতিরিক্ত রাগ বা ক্রোধও তার ষড়রিপুর অন্যতম।
যে ক্রোধ আত্মপর মর্যাদা বিস্মৃত করে এবং যাবতীয় উপকার সমাধিস্থ করে।
যে ক্রোধ সভ্য মানুষকেও হিংস্র জন্তুতে পরিণত করে।
যে ক্রোধ হল এমন ঝোড়ো হাওয়ার মত, যা নিমেষে বুদ্ধিমান মানুষের বুদ্ধির প্রদীপকে নিভিয়ে দেয়।
মানুষ যখন খুব রেগে যায়, তখন তার দিগ্বিদিক জ্ঞান থাকে না। মনে থাকে না তার নিজের আত্মসম্মানের কথা, ধর্মের কথা। তাই সে তখন কারো খাতির রাখতে চায় না; এমন কি অনেক সময় ক্রোধবশে নিজের ক্ষতি নিজেই ক'রে বসে।
আসলে ক্রোধের প্রথমটা পাগলামি এবং শেষটা লাঞ্ছনা। রাগ বোকামি থেকে উৎপত্তি হয়, কিন্তু অনুতাপে শেষ হয়। ক্রোধ দূর হলেই অনুতাপ আসে।
এই জন্য মহান চরিত্রের আদর্শ নবী মানুষকে রাগ না করতে উপদেশ দিয়েছেন। আবূ হুরাইরা বলেন, এক ব্যক্তি নবী কে বলল, 'আপনি আমাকে কিছু অসিয়ত করুন!' তিনি বললেন, "তুমি রাগান্বিত হয়ো না।” সে ব্যক্তি এ কথাটি কয়েকবার বলল। তিনি (প্রত্যেক বারেই একই কথা) বললেন, "তুমি রাগান্বিত হয়ো না।"৫৫৭
বলা বাহুল্য, ক্রোধ দমন করা সচ্চরিত্রতার একটি অঙ্গ। মহান সৃষ্টিকর্তা যাদের জন্য বেহেস্ত প্রস্তুত রেখেছেন, তাদের মধ্যে এক শ্রেণীর মানুষ হল তারা, যারা নিজেদের ক্রোধ সংবরণ করে। তিনি বলেছেন,
(وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ)
অর্থাৎ, (সেই ধর্মভীরুদের জন্য জান্নাত প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় দান করে,) ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা ক'রে থাকে। ৫৫৮
সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তি সেই, যে তার গুপ্ত ভেদ গোপন রাখতে অক্ষম। আর সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হল সেই, যে তার ক্রোধ দমন করতে পারে। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ
"শক্তিশালী (বা বীর) সে নয় যে কুশীতে জয়লাভ করে। বরং প্রকৃত শক্তিশালী (বা বীর) হল সেই ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় নিজেকে সামলে নিতে পারে।"৫৫৯
উক্ত বিজয়ী বীরের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। মহানবী বলেছেন,
مَنْ كَظَمَ غَيْظًا - وَهُوَ قَادِرٌ عَلَى أَنْ يُنْفِذَهُ - دَعَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُخَيَّرَهُ اللَّهُ مِنَ الْحُورِ مَا شَاءَ
"যে ব্যক্তি কোন প্রকার ক্রোধ সংবরণ করে, যা সে প্রয়োগ করতে সমর্থ, আল্লাহ তাকে সৃষ্টির মাঝে আহবান করবেন এবং তার ইচ্ছামত (বেহেস্তের) সুনয়না হুরী গ্রহণ করতে এখতিয়ার দেবেন।"৫৬০
রাগ দমন করবেন কীভাবে? রাগ দমনের জন্য যেমন প্রয়োজন ক্ষমাশীলতার, তেমনি প্রয়োজন সহিষ্ণুতা ও ধৈর্যশীলতার। ইউনুস নবী (আ)-এর নিজ জাতির ব্যাপারে ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছিল। ফলে তিনি তাদের প্রতি রাগান্বিত হয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর মতো না হতে আদেশ করেছেন তাঁর সর্বশেষ নবী কে,
فَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ وَلَا تَكُن كَصَاحِبِ الْحُوتِ إِذْ نَادَى وَهُوَ مَكْظُومٌ
"অতএব তুমি ধৈর্যধারণ কর তোমার প্রতিপালকের নির্দেশের অপেক্ষায়, তুমি তিমি-ওয়ালা (ইউনুস) এর মত অধৈর্য হয়ো না, যখন সে বিষাদ আচ্ছন্ন অবস্থায় কাতর প্রার্থনা করেছিল।"৫৬১
যার প্রতি রাগ করা হয়, সে রাগের আগুনকে নিভাতে পারে। গরম মানুষকে নরম উত্তর দিলে রাগ পানি হয়ে যায়।
জ্ঞানিগণ বলেন, 'রাগের সবচেয়ে বড় প্রতিকার হল, বিলম্ব করা।' 'ক্রোধের একমাত্র ঔষধ হল নীরবতা অবলম্বন করা।' কারণ রাগের পরে পরেই সত্বর কোন কাজ করলে তা ভুল হতে পারে এবং ক্রোধের সময় কথা বললে মুখ থেকে অসঙ্গত কথা বের হতে পারে।
ক্রোধ দমনের আরো একটি চিকিৎসা হল নবী এর নির্দেশ,
إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ قَائِمٌ فَلْيَجْلِسُ فَإِنْ ذَهَبَ عَنْهُ الْغَضَبُ وَإِلا فَلْيَضْطَجِعُ
"তোমাদের মধ্যে যখন কেউ রেগে যাবে, তখন সে দাঁড়িয়ে থাকলে যেন বসে যায়। এতে তার রাগ দূরীভূত হলে ভাল, নচেৎ সে যেন শুয়ে যায়।"৫৬২
রাগ অনেক সময় শয়তান উদ্রেক করে। সেই জন্য রাগ দমনের একটি চিকিৎসা হল, শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা।
সুলাইমান বিন সুরাদ বলেন, একদা আমি নবী এর কাছে বসে ছিলাম। এমন সময় দুই ব্যক্তি গালাগালি করলে ওদের মধ্যে একজনের রাগ চরমে উঠে সে লাল হয়ে গেল। তিনি বললেন,
إِنِّي لَأَعْلَمُ كَلِمَةً لَوْ قَالَهَا ذَهَبَ عَنْهُ مَا يَجِدُ لَوْ قَالَ أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ ذَهَبَ عَنْهُ مَا يَجِدُ
"আমি এমন একটি মন্ত্র জানি, তা পাঠ করলে ওর রাগ দূর হয়ে যাবে। 'আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাজীম' পড়লে তার রাগ দূর হয়ে যাবে।" লোকটি বলে উঠল, 'আপনি কি আমাকে পাগল মনে করেন?' তা শুনে তিনি পাঠ করলেন,
وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
"যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তাহলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।"৫৬৩

টিকাঃ
৫৫৬. বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৯১৬৪
৫৫৭. বুখারী ৬১১৬
৫৫৮. সূরা আলে ইমরান ১৩৪
৫৫৯. আহমাদ, বুখারী ৬১১৪, মুসলিম ৬৮০৯, মিশকাত ৫১০৫
৫৬০. তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, সহীহ আবু দাউদ ৩৯৯৭
৫৬১. সূরা ক্বালাম: ৪৮
৫৬২. আহমাদ ২১৩৪৮, আবু দাউদ ৪৭৮৪, ইবনে হিব্বান, সহীহুল জামে ৬৯৪
৫৬৩. সূরা আ'রাফ: ২০০, বুখারী ৩২৮২, মুসলিম ৬৮-১২, হাকেম ৩৬৪৯

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 কষ্টদানে বিরত থাকা

📄 কষ্টদানে বিরত থাকা


ইমাম আব্দুল্লাহ বিন মুবারক (রাহিমাহুল্লাহ) হতে সচ্চরিত্রতার ব্যাখ্যা বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন,
هُوَ بسط الوجه ( طَلاقَةُ الوجه ) ، وَبَذْلُ المَعْرُوفِ ، وَكَفُ الأَذَى
'তা হল, সর্বদা হাসিমুখ থাকা, মানুষের উপকার করা এবং কাউকে কষ্ট না দেওয়া। ১৫৬৪
হ্যাঁ, মানুষকে কোনভাবে কষ্ট না দেওয়া অথবা তার দেহ-মন থেকে কষ্ট দূরীভূত করা সচ্চরিত্রতার একটি মহৎ গুণ। বরং তা বেহেস্তী মানুষের একটি সদাচরণ। মহানবী বলেছেন,
اضْمَنُوا لِي سِرًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنْ لَكُمُ الْجَنَّةَ اصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ وَأَوْفُوا إِذَا وَعَدْتُمْ وَأَدُّوا إِذَا اؤْتُمِنْتُمْ وَاحْفَظُوا فُرُوجَكُمْ وَغُضُّوا أَبْصَارَكُمْ وَكُفُوا أَيْدِيَكُمْ
"তোমরা তোমাদের তরফ থেকে আমার জন্য ছয়টি বিষয়ের জামিন হও, আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের জামিন হয়ে যাব; কথা বললে সত্য বল, অঙ্গীকার করলে তা পালন কর, তোমাদের নিকটে কোন আমানত রাখা হলে তা আদায় কর, তোমাদের যৌনাঙ্গের হিফাযত কর, তোমাদের চক্ষুকে (অবৈধ কিছু দেখা হতে) অবনত রাখ, আর তোমাদের হাতকে (কষ্টদানে) বিরত রাখ।"৫৬৫
ইচ্ছাকৃত কষ্ট দেওয়া তো বৈধই নয়, বরং অনিচ্ছাকৃতভাবে কাউকে কষ্ট দেওয়ার ব্যাপারেও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে চরিত্রবান মুসলিমকে। মহানবী বলেছেন,
مَنْ مَرَّ فِي شَيْءٍ مِنْ مَسَاجِدِنَا ، أَوْ أَسْوَاقِنَا ، وَمَعَهُ نَبْلٌ فَلْيُمْسِكُ ، أَوْ لِيَقْبِضُ عَلَى نِصَالِهَا بكَفّه ؛ أنْ يُصِيبَ أحَداً مِنَ الْمُسْلِمِينَ مِنْهَا بِشَيْء
"যে ব্যক্তি তীর সঙ্গে নিয়ে আমাদের কোন মসজিদ অথবা কোন বাজারের ভিতর দিয়ে অতিক্রম করবে, তার উচিত হবে, হাতের চেটো দ্বারা তার ফলাকে ধরে নেওয়া। যাতে কোন মুসলিম তার দ্বারা কোন প্রকার কষ্ট না পায়।"৫৬৬
সেই চরিত্রবানই তো প্রকৃত মু'মিন, যার দ্বারা কোন মু'মিন দৈহিক বা মানসিকভাবে কোন আঘাত পায় না। যার কোন আচরণে কোন মুসলিম কোন প্রকার কষ্ট পায় না ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
أَلا أُخْبِرُكُمْ بِالْمُؤْمِنِ؟ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ، وَالْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ، وَالْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ فِي طَاعَةِ اللهِ، وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ الْخَطَايَا وَالذُّنُوبَ
"আমি কি তোমাদেরকে 'মুমিন' কে---তা বলে দেব না? (প্রকৃত মুমিন হল সেই), যার (অত্যাচার) থেকে লোকেরা নিজেদের জান-মালের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করতে পারে। (প্রকৃত) মুসলিম হল সেই ব্যক্তি, যার জিব ও হাত হতে লোকেরা শান্তি লাভ করতে পারে। (প্রকৃত) মুজাহিদ হল সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর আনুগত্য করতে নিজের মনের বিরুদ্ধে জিহাদ করে। আর (প্রকৃত) মুহাজির (হিজরতকারী) হল সেই ব্যক্তি, যে সমস্ত পাপাচরণকে হিজরত (বর্জন) করে।”৫৬৭
প্রকৃত মুসলিম কোনদিন কোন মুসলিমের চরিত্রেও আঘাত করে না। তার মান-সম্মানের ব্যাপারে তাকে কোন প্রকার কষ্ট দেয় না। আসলে এমন কাজ তো মুনাফিকদের। মহানবী তাদেরকেই সম্বোধন ক'রে বলেছেন,
يَا مَعْشَرَ مَنْ قَدْ أَسْلَمَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يُفْضِ الإِيمَانُ إِلَى قَلْبِهِ لَا تُؤْذُوا الْمُسْلِمِينَ وَلَا تُعَيَّرُوهُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنْ تَتَبَّعَ عَوْرَةَ أَخِيهِ الْمُسْلِمِ تَتَبَّعَ اللهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ تَتَبَّعَ اللهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ وَلَوْ فِي جَوْفِ رَحْلِهِ
"হে (মুনাফেকের দল!) যারা মুখে মুসলমান হয়েছ এবং যাদের অন্তরে এখনও ঈমান প্রবেশ করেনি (তারা শোন), তোমরা মুসলিমদেরকে কষ্ট দিয়ো না, তাদেরকে লাঞ্ছিত করো না ও তাদের ছিদ্রান্বেষণ করো না। যেহেতু যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ অনুসন্ধান করে আল্লাহ তার দোষ অনুসন্ধান করেন। আর আল্লাহ যার দোষ অনুসন্ধান করেন (অর্থাৎ গোপন না করেন) তিনি তাকে অপদস্থ করেন; যদিও সে নিজ গৃহাভ্যন্তরে থাকে। "৫৬৮
জবান দ্বারা কষ্ট দেওয়া, গালি-গালাজ ক'রে মানুষকে আঘাত দেওয়া, অশালীন মন্তব্য ক'রে অপরকে বিব্রত করা, লাগামহীন কথা বলে অপরকে উত্ত্যক্ত করা, কথায় কথায় প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার কাজ কি বেহেশতী মানুষের হতে পারে? কক্ষনো না।
আবূ হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! অমুক মহিলা বেশী বেশী (নফল) স্বলাত পড়ে, সিয়াম রাখে ও দান-খয়রাত করে বলে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু সে নিজ জিভ দ্বারা (অসভ্য কথা বলে বা গালি দিয়ে) প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। (তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?)' তিনি বললেন, “সে দোযখে যাবে।” লোকটি আবার বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! অমুক মহিলা অল্প (নফল) স্বলাত পড়ে, সিয়াম রাখে ও দান-খয়রাত করে বলে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু সে নিজ জিভ দ্বারা (অসভ্য কথা বলে বা গালি দিয়ে) প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। (তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?)' তিনি বললেন, "সে জান্নাতে যাবে।"৫৬৯
চরিত্রবান নিজ দেহ, মুখ বা লেবাস-পোশাকের দুর্গন্ধ দ্বারাও কাউকে কষ্ট দেয় না। ঘামের দুর্গন্ধ, নোংরা কাপড়ের দুর্গন্ধ অথবা পরিষ্কার না করার ফলে অথবা কোন গন্ধযুক্ত খাবার খেয়ে মুখের দুর্গন্ধ দ্বারা পাশের মানুষকে অতিষ্ঠ ক'রে তোলে না। মহানবী বলেছেন,
مَنْ أَكَلَ ثُوماً أَوْ بَصَلاً فَلْيَعْتَزِلنا، أو فَلْيَعْتَزِلُ مَسْجِدَنَا متفق عَلَيْهِ ، وَفِي رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ : مَنْ أَكَلَ البَصَلَ ، وَالنُّومَ ، وَالكُرَّاثَ ، فَلَا يَقْرَبَنَّ مَسْجِدَنَا ، فَإِنَّ المَلَائِكَةَ تَتَأَذَى مِمَّا يَتَأَذَى مِنْهُ بَنُو آدَمَ
"যে ব্যক্তি (কাঁচা) রসূন অথবা পিঁয়াজ খায়, সে যেন আমাদের নিকট হতে দূরে অবস্থান করে অথবা আমাদের মসজিদ থেকে দূরে থাকে।"৫৭০
মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, "যে ব্যক্তি (কাঁচা) পিঁয়াজ, রসূন এবং লীক পাতা খায়, সে যেন অবশ্যই আমাদের মসজিদের নিকটবর্তী না হয়। কেননা, ফিরিস্তাগণ সেই জিনিসে কষ্ট পান, যাতে আদম-সন্তান কষ্ট পায়।”৫৭১
পিঁয়াজ-রসূন তো হালাল জিনিস, তা কাঁচা অবস্থায় খেয়ে মুখে দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে আসে মানা। কারণ তাতে মসজিদে উপস্থিত ফিরিস্তা ও মুস্বাল্লীগণ কষ্ট পাবেন তাই। তাহলে যে জিনিস হালাল নয়, সে জিনিস খাওয়া বা পান করা কি কোন চরিত্রবান মুসলিমের অভ্যাস হতে পারে? আবার তা খেয়ে বা পান ক'রে মুখের দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে বা জামাআতে এসে ফিরিস্তা ও মানুষকে কষ্ট দেওয়া কোন চরিত্রবান মু'মিনের আচরণ হতে পারে? নিশ্চয়ই না।
মুসলিমদের রাস্তার ব্যাপারে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকাও চরিত্রবান মুসলিমের কর্তব্য। পথে-ঘাটে পেসাব-পায়খানা না ক'রে, বাড়ির বাথরুমের পানি রাস্তায় না ছেড়ে, রাস্তায় নোংরা বা কোন কষ্টদায়ক বস্তু না ফেলে, গাড়ি বা অন্য কোন সামগ্রী রেখে পথ অবরোধ বা সংকীর্ণ না ক'রে মানুষকে কষ্টদানে বিরত থাকা এবং কষ্ট-পাওয়া লোকমুখে অভিশাপ না নেওয়া চরিত্রবান নারী-পুরুষের কর্তব্য। মহানবী বলেছেন,
اتَّقُوا الْمَلاعِنَ الثَّلَاثَ الْبَرَازَ فِي الْمَوَارِدِ وَقَارِعَةِ الطَّرِيقِ وَالظَّلِّ
"তোমরা তিনটি অভিশাপ আনয়নকারী কর্ম থেকে বাঁচ; আর তা হল, ঘাটে, মাঝ-রাস্তায় এবং ছায়ায় পায়খানা করা।"৫৭২
তিনি আরো বলেছেন,
مَنْ آذَى الْمُسْلِمِينَ فِي طُرُقِهِمْ وَجَبَتْ عَلَيْهِ لَعْنَتُهُمْ
“যে ব্যক্তি রাস্তার ব্যাপারে মুসলিমদেরকে কষ্ট দেয়, সে ব্যক্তির উপরে তাদের অভিশাপ অনিবার্য হয়ে যায়।"৫৭৩
বরং চরিত্রবান মুসলিমের কর্তব্য, রাস্তা পরিষ্কার রাখা, তাতে পড়ে থাকা কষ্টদায়ক বস্তু দূর ক'রে পথিকদের সহজভাবে পথ চলতে সহায়তা করা। যেহেতু মু'মিনের ঈমান তাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। মহানবী বলেছেন,
الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ أَوْ بِضْعٌ وَسِتُونَ شُعْبَةٌ فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ
"ঈমান সত্তর বা ষাটের অধিক শাখাবিশিষ্ট; যার উত্তম (ও প্রধান) শাখা 'লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই) বলা এবং সবচেয়ে ক্ষুদ্র শাখা পথ হতে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের অন্যতম শাখা। ৫৭৪
ঈমানের আলোকে আলোকিত মনের মানুষ অপরের কষ্ট সইতে পারে না। তাই তো সে পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূরীকরণে অনুপ্রাণিত হয়। আর নিশ্চয়ই সেটা ভালো কাজ। মহানবী বলেছেন,
عُرِضَتْ عَلَى أَعْمَالُ أُمَّتِي حَسَنُهَا وَسَيَّتُهَا فَوَجَدْتُ فِي مَحَاسِنِ أَعْمَالِهَا الْأَذَى يُمَاطُ عَنِ الطَّريقِ ، وَوَجَدْتُ في مَسَاوِيءِ أَعْمَالِهَا النُّخَاعَةَ تَكُونُ فِي المَسْجِدِ لَا تُدْفَنُ
"আমার উম্মতের ভালমন্দ কর্ম আমার কাছে পেশ করা হল। সুতরাং আমি তাদের ভাল কাজের মধ্যে ঐ কষ্টদায়ক জিনিসও পেলাম, যা রাস্তা থেকে সরানো হয়। আর তাদের মন্দ কর্মসমূহের তালিকায় মসজিদে ঐ কফও পেলাম, যার উপর মাটি চাপা দেওয়া হয়নি।"৫৭৫
একদা আবূ বার্যাহ বললেন, 'হে আল্লাহর নবী! আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন, যার দ্বারা আমি উপকৃত হতে পারব।' তিনি বললেন,
اعزِلِ الْأَذَى عَنْ طَرِيقِ الْمُسْلِمِينَ
"মুসলিমদের রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর কর।"৫৭৬
হ্যাঁ, সে কাজ বড় উপকারী। যেহেতু সে কাজে মানুষ উপকৃত হয় এবং তার ফলে সর্বোচ্চ মূল্যের পুরস্কার লাভ হয়। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
لَقَدْ رَأَيْتُ رَجُلاً يَتَقَلَّبُ في الجَنَّةِ في شَجَرَةٍ قَطَعَهَا مِنْ ظَهْرِ الطَرِيقِ كانَتْ تُؤْذِي المُسْلِمِينَ
"আমি এক ব্যক্তিকে জান্নাতে ঘোরাফেরা করতে দেখলাম। যে (পৃথিবীতে) রাস্তার মধ্য হতে একটি গাছ কেটে সরিয়ে দিয়েছিল, যেটি মুসলিমদেরকে কষ্ট দিচ্ছিল।"৫৭৭

টিকাঃ
৫৬৪. তিরমিযী ২০০৫
৫৬৫. আহমাদ ২২৭৫৭, ত্বাবারানী, ইবনে খুযাইমাহ, ইবনে হিব্বان, হাকেম, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৪৭০
৫৬৬. বুখারী ৪৫২, মুসলিম ৬৮৩১
৫৬৭. আহমাদ ৬/২১, হাকেম ২৪, ত্বাবারানী ১৫১৯১, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান, সিলসিলাহ সহীহহাহ ৫৪৯
৫৬৮. তিরমিযী ২০৩২
৫৬৯. আহমাদ ৯৬৭৫, ইবনে হিব্বান ৫৭৬৪, হাকেম ৭৩০৫, সহীহ তারগীব ২৫৬০
৫৭০. বুখারী ৮৫৫, মুসলিম ১২৮১
৫৭১. মুসলিম ১২৮২
৫৭২. আবু দাউদ ২৬, ইবনে মাজাহ ৩২৮, সহীহ তারগীব ১৪১
৫৭৩. তাবারানী কাবীর ২৯৭৮. সহীহ তারগীব ১৪৩
৫৭৪. মুসলিম ১৬২
৫৭৫. মুসলিম ১২৬১
৫৭৬. মুসলিম ৬৮৩৯
৫৭৭. মুসলিম ৬৮৩৫-৬৮৩৮

ইমাম আব্দুল্লাহ বিন মুবারক (রাহিমাহুল্লাহ) হতে সচ্চরিত্রতার ব্যাখ্যা বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন,
هُوَ بسط الوجه ( طَلاقَةُ الوجه ) ، وَبَذْلُ المَعْرُوفِ ، وَكَفُ الأَذَى
'তা হল, সর্বদা হাসিমুখ থাকা, মানুষের উপকার করা এবং কাউকে কষ্ট না দেওয়া। ১৫৬৪
হ্যাঁ, মানুষকে কোনভাবে কষ্ট না দেওয়া অথবা তার দেহ-মন থেকে কষ্ট দূরীভূত করা সচ্চরিত্রতার একটি মহৎ গুণ। বরং তা বেহেস্তী মানুষের একটি সদাচরণ। মহানবী বলেছেন,
اضْمَنُوا لِي سِرًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنْ لَكُمُ الْجَنَّةَ اصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ وَأَوْفُوا إِذَا وَعَدْتُمْ وَأَدُّوا إِذَا اؤْتُمِنْتُمْ وَاحْفَظُوا فُرُوجَكُمْ وَغُضُّوا أَبْصَارَكُمْ وَكُفُوا أَيْدِيَكُمْ
"তোমরা তোমাদের তরফ থেকে আমার জন্য ছয়টি বিষয়ের জামিন হও, আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের জামিন হয়ে যাব; কথা বললে সত্য বল, অঙ্গীকার করলে তা পালন কর, তোমাদের নিকটে কোন আমানত রাখা হলে তা আদায় কর, তোমাদের যৌনাঙ্গের হিফাযত কর, তোমাদের চক্ষুকে (অবৈধ কিছু দেখা হতে) অবনত রাখ, আর তোমাদের হাতকে (কষ্টদানে) বিরত রাখ।"৫৬৫
ইচ্ছাকৃত কষ্ট দেওয়া তো বৈধই নয়, বরং অনিচ্ছাকৃতভাবে কাউকে কষ্ট দেওয়ার ব্যাপারেও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে চরিত্রবান মুসলিমকে। মহানবী বলেছেন,
مَنْ مَرَّ فِي شَيْءٍ مِنْ مَسَاجِدِنَا ، أَوْ أَسْوَاقِنَا ، وَمَعَهُ نَبْلٌ فَلْيُمْسِكُ ، أَوْ لِيَقْبِضُ عَلَى نِصَالِهَا بكَفّه ؛ أنْ يُصِيبَ أحَداً مِنَ الْمُسْلِمِينَ مِنْهَا بِشَيْء
"যে ব্যক্তি তীর সঙ্গে নিয়ে আমাদের কোন মসজিদ অথবা কোন বাজারের ভিতর দিয়ে অতিক্রম করবে, তার উচিত হবে, হাতের চেটো দ্বারা তার ফলাকে ধরে নেওয়া। যাতে কোন মুসলিম তার দ্বারা কোন প্রকার কষ্ট না পায়।"৫৬৬
সেই চরিত্রবানই তো প্রকৃত মু'মিন, যার দ্বারা কোন মু'মিন দৈহিক বা মানসিকভাবে কোন আঘাত পায় না। যার কোন আচরণে কোন মুসলিম কোন প্রকার কষ্ট পায় না ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
أَلا أُخْبِرُكُمْ بِالْمُؤْمِنِ؟ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ، وَالْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ، وَالْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ فِي طَاعَةِ اللهِ، وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ الْخَطَايَا وَالذُّنُوبَ
"আমি কি তোমাদেরকে 'মুমিন' কে---তা বলে দেব না? (প্রকৃত মুমিন হল সেই), যার (অত্যাচার) থেকে লোকেরা নিজেদের জান-মালের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করতে পারে। (প্রকৃত) মুসলিম হল সেই ব্যক্তি, যার জিব ও হাত হতে লোকেরা শান্তি লাভ করতে পারে। (প্রকৃত) মুজাহিদ হল সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর আনুগত্য করতে নিজের মনের বিরুদ্ধে জিহাদ করে। আর (প্রকৃত) মুহাজির (হিজরতকারী) হল সেই ব্যক্তি, যে সমস্ত পাপাচরণকে হিজরত (বর্জন) করে।”৫৬৭
প্রকৃত মুসলিম কোনদিন কোন মুসলিমের চরিত্রেও আঘাত করে না। তার মান-সম্মানের ব্যাপারে তাকে কোন প্রকার কষ্ট দেয় না। আসলে এমন কাজ তো মুনাফিকদের। মহানবী তাদেরকেই সম্বোধন ক'রে বলেছেন,
يَا مَعْشَرَ مَنْ قَدْ أَسْلَمَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يُفْضِ الإِيمَانُ إِلَى قَلْبِهِ لَا تُؤْذُوا الْمُسْلِمِينَ وَلَا تُعَيَّرُوهُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنْ تَتَبَّعَ عَوْرَةَ أَخِيهِ الْمُسْلِمِ تَتَبَّعَ اللهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ تَتَبَّعَ اللهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ وَلَوْ فِي جَوْفِ رَحْلِهِ
"হে (মুনাফেকের দল!) যারা মুখে মুসলমান হয়েছ এবং যাদের অন্তরে এখনও ঈমান প্রবেশ করেনি (তারা শোন), তোমরা মুসলিমদেরকে কষ্ট দিয়ো না, তাদেরকে লাঞ্ছিত করো না ও তাদের ছিদ্রান্বেষণ করো না। যেহেতু যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ অনুসন্ধান করে আল্লাহ তার দোষ অনুসন্ধান করেন। আর আল্লাহ যার দোষ অনুসন্ধান করেন (অর্থাৎ গোপন না করেন) তিনি তাকে অপদস্থ করেন; যদিও সে নিজ গৃহাভ্যন্তরে থাকে। "৫৬৮
জবান দ্বারা কষ্ট দেওয়া, গালি-গালাজ ক'রে মানুষকে আঘাত দেওয়া, অশালীন মন্তব্য ক'রে অপরকে বিব্রত করা, লাগামহীন কথা বলে অপরকে উত্ত্যক্ত করা, কথায় কথায় প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার কাজ কি বেহেশতী মানুষের হতে পারে? কক্ষনো না।
আবূ হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! অমুক মহিলা বেশী বেশী (নফল) স্বলাত পড়ে, সিয়াম রাখে ও দান-খয়রাত করে বলে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু সে নিজ জিভ দ্বারা (অসভ্য কথা বলে বা গালি দিয়ে) প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। (তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?)' তিনি বললেন, “সে দোযখে যাবে।” লোকটি আবার বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! অমুক মহিলা অল্প (নফল) স্বলাত পড়ে, সিয়াম রাখে ও দান-খয়রাত করে বলে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু সে নিজ জিভ দ্বারা (অসভ্য কথা বলে বা গালি দিয়ে) প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। (তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?)' তিনি বললেন, "সে জান্নাতে যাবে।"৫৬৯
চরিত্রবান নিজ দেহ, মুখ বা লেবাস-পোশাকের দুর্গন্ধ দ্বারাও কাউকে কষ্ট দেয় না। ঘামের দুর্গন্ধ, নোংরা কাপড়ের দুর্গন্ধ অথবা পরিষ্কার না করার ফলে অথবা কোন গন্ধযুক্ত খাবার খেয়ে মুখের দুর্গন্ধ দ্বারা পাশের মানুষকে অতিষ্ঠ ক'রে তোলে না। মহানবী বলেছেন,
مَنْ أَكَلَ ثُوماً أَوْ بَصَلاً فَلْيَعْتَزِلنا، أو فَلْيَعْتَزِلُ مَسْجِدَنَا متفق عَلَيْهِ ، وَفِي رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ : مَنْ أَكَلَ البَصَلَ ، وَالنُّومَ ، وَالكُرَّاثَ ، فَلَا يَقْرَبَنَّ مَسْجِدَنَا ، فَإِنَّ المَلَائِكَةَ تَتَأَذَى مِمَّا يَتَأَذَى مِنْهُ بَنُو آدَمَ
"যে ব্যক্তি (কাঁচা) রসূন অথবা পিঁয়াজ খায়, সে যেন আমাদের নিকট হতে দূরে অবস্থান করে অথবা আমাদের মসজিদ থেকে দূরে থাকে।"৫৭০
মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, "যে ব্যক্তি (কাঁচা) পিঁয়াজ, রসূন এবং লীক পাতা খায়, সে যেন অবশ্যই আমাদের মসজিদের নিকটবর্তী না হয়। কেননা, ফিরিস্তাগণ সেই জিনিসে কষ্ট পান, যাতে আদম-সন্তান কষ্ট পায়।”৫৭১
পিঁয়াজ-রসূন তো হালাল জিনিস, তা কাঁচা অবস্থায় খেয়ে মুখে দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে আসে মানা। কারণ তাতে মসজিদে উপস্থিত ফিরিস্তা ও মুস্বাল্লীগণ কষ্ট পাবেন তাই। তাহলে যে জিনিস হালাল নয়, সে জিনিস খাওয়া বা পান করা কি কোন চরিত্রবান মুসলিমের অভ্যাস হতে পারে? আবার তা খেয়ে বা পান ক'রে মুখের দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে বা জামাআতে এসে ফিরিস্তা ও মানুষকে কষ্ট দেওয়া কোন চরিত্রবান মু'মিনের আচরণ হতে পারে? নিশ্চয়ই না।
মুসলিমদের রাস্তার ব্যাপারে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকাও চরিত্রবান মুসলিমের কর্তব্য। পথে-ঘাটে পেসাব-পায়খানা না ক'রে, বাড়ির বাথরুমের পানি রাস্তায় না ছেড়ে, রাস্তায় নোংরা বা কোন কষ্টদায়ক বস্তু না ফেলে, গাড়ি বা অন্য কোন সামগ্রী রেখে পথ অবরোধ বা সংকীর্ণ না ক'রে মানুষকে কষ্টদানে বিরত থাকা এবং কষ্ট-পাওয়া লোকমুখে অভিশাপ না নেওয়া চরিত্রবান নারী-পুরুষের কর্তব্য। মহানবী বলেছেন,
اتَّقُوا الْمَلاعِنَ الثَّلَاثَ الْبَرَازَ فِي الْمَوَارِدِ وَقَارِعَةِ الطَّرِيقِ وَالظَّلِّ
"তোমরা তিনটি অভিশাপ আনয়নকারী কর্ম থেকে বাঁচ; আর তা হল, ঘাটে, মাঝ-রাস্তায় এবং ছায়ায় পায়খানা করা।"৫৭২
তিনি আরো বলেছেন,
مَنْ آذَى الْمُسْلِمِينَ فِي طُرُقِهِمْ وَجَبَتْ عَلَيْهِ لَعْنَتُهُمْ
“যে ব্যক্তি রাস্তার ব্যাপারে মুসলিমদেরকে কষ্ট দেয়, সে ব্যক্তির উপরে তাদের অভিশাপ অনিবার্য হয়ে যায়।"৫৭৩
বরং চরিত্রবান মুসলিমের কর্তব্য, রাস্তা পরিষ্কার রাখা, তাতে পড়ে থাকা কষ্টদায়ক বস্তু দূর ক'রে পথিকদের সহজভাবে পথ চলতে সহায়তা করা। যেহেতু মু'মিনের ঈমান তাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। মহানবী বলেছেন,
الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ أَوْ بِضْعٌ وَسِتُونَ شُعْبَةٌ فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ
"ঈমান সত্তর বা ষাটের অধিক শাখাবিশিষ্ট; যার উত্তম (ও প্রধান) শাখা 'লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই) বলা এবং সবচেয়ে ক্ষুদ্র শাখা পথ হতে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের অন্যতম শাখা। ৫৭৪
ঈমানের আলোকে আলোকিত মনের মানুষ অপরের কষ্ট সইতে পারে না। তাই তো সে পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূরীকরণে অনুপ্রাণিত হয়। আর নিশ্চয়ই সেটা ভালো কাজ। মহানবী বলেছেন,
عُرِضَتْ عَلَى أَعْمَالُ أُمَّتِي حَسَنُهَا وَسَيَّتُهَا فَوَجَدْتُ فِي مَحَاسِنِ أَعْمَالِهَا الْأَذَى يُمَاطُ عَنِ الطَّريقِ ، وَوَجَدْتُ في مَسَاوِيءِ أَعْمَالِهَا النُّخَاعَةَ تَكُونُ فِي المَسْجِدِ لَا تُدْفَنُ
"আমার উম্মতের ভালমন্দ কর্ম আমার কাছে পেশ করা হল। সুতরাং আমি তাদের ভাল কাজের মধ্যে ঐ কষ্টদায়ক জিনিসও পেলাম, যা রাস্তা থেকে সরানো হয়। আর তাদের মন্দ কর্মসমূহের তালিকায় মসজিদে ঐ কফও পেলাম, যার উপর মাটি চাপা দেওয়া হয়নি।"৫৭৫
একদা আবূ বার্যাহ বললেন, 'হে আল্লাহর নবী! আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন, যার দ্বারা আমি উপকৃত হতে পারব।' তিনি বললেন,
اعزِلِ الْأَذَى عَنْ طَرِيقِ الْمُسْلِمِينَ
"মুসলিমদের রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর কর।"৫৭৬
হ্যাঁ, সে কাজ বড় উপকারী। যেহেতু সে কাজে মানুষ উপকৃত হয় এবং তার ফলে সর্বোচ্চ মূল্যের পুরস্কার লাভ হয়। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
لَقَدْ رَأَيْتُ رَجُلاً يَتَقَلَّبُ في الجَنَّةِ في شَجَرَةٍ قَطَعَهَا مِنْ ظَهْرِ الطَرِيقِ كانَتْ تُؤْذِي المُسْلِمِينَ
"আমি এক ব্যক্তিকে জান্নাতে ঘোরাফেরা করতে দেখলাম। যে (পৃথিবীতে) রাস্তার মধ্য হতে একটি গাছ কেটে সরিয়ে দিয়েছিল, যেটি মুসলিমদেরকে কষ্ট দিচ্ছিল।"৫৭৭

টিকাঃ
৫৬৪. তিরমিযী ২০০৫
৫৬৫. আহমাদ ২২৭৫৭, ত্বাবারানী, ইবনে খুযাইমাহ, ইবনে হিব্বان, হাকেম, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৪৭০
৫৬৬. বুখারী ৪৫২, মুসলিম ৬৮৩১
৫৬৭. আহমাদ ৬/২১, হাকেম ২৪, ত্বাবারানী ১৫১৯১, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান, সিলসিলাহ সহীহহাহ ৫৪৯
৫৬৮. তিরমিযী ২০৩২
৫৬৯. আহমাদ ৯৬৭৫, ইবনে হিব্বান ৫৭৬৪, হাকেম ৭৩০৫, সহীহ তারগীব ২৫৬০
৫৭০. বুখারী ৮৫৫, মুসলিম ১২৮১
৫৭১. মুসলিম ১২৮২
৫৭২. আবু দাউদ ২৬, ইবনে মাজাহ ৩২৮, সহীহ তারগীব ১৪১
৫৭৩. তাবারানী কাবীর ২৯৭৮. সহীহ তারগীব ১৪৩
৫৭৪. মুসলিম ১৬২
৫৭৫. মুসলিম ১২৬১
৫৭৬. মুসলিম ৬৮৩৯
৫৭৭. মুসলিম ৬৮৩৫-৬৮৩৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00