📄 রসিকতা
হাস্য-রসিকতা করা খোশ-মেজাজের লক্ষণ। সঙ্গী-সাথীদের সাথে রহস্য ও মস্করা করা আমুদে লোকের আলামত। যে মানুষ নিজে আনন্দে থাকে, সে অপরকে আনন্দ বিতরণ করতে পারে। আর সে মানুষ নিশ্চয় সুচরিত্রবান। তবে হাস্য-রসিকতা মানে বক্কানি বা ঢেটামি নয়। যেহেতু মু'মিনের চিত্ত হয় ভাবময়, রূপ হয় গাম্ভির্যপূর্ণ। অপরকে হাসাবার উদ্দেশ্যে মিথ্যা বলে রসিকতা করা, মিথ্যা কৌতুক বা গল্প বানিয়ে অপরকে হাসানো সুচরিত্রবানের লক্ষণ নয়। যেহেতু রসূল বলেন,
وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ فَيَكْذِبُ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمَ وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ
"দুর্ভোগ সেই ব্যক্তির, যে মিথ্যা বলে লোকেদেরকে হাসায়। দুর্ভোগ তার জন্য, দুর্ভোগ তার জন্য।"৫০৩
বলা বাহুল্য, রসিকতা ও মস্করায় মিথ্যা ও অশ্লীল কথা থাকবে না। রসূল সত্য কথার মাধ্যমেই মস্করা করেছেন। যেমন, আবু উমাইর নামক এক শিশুর খেলনা পাখী (নুগাইর) মারা গেলে সে দুঃখিত হয়। তা দেখে তিনি তাকে খোশ করার জন্য মস্করা করে বললেন, 'এই যে উমাইর! কি করেছে নুগাইর?”৫০৪
একদা এক ব্যক্তি তাঁর নিকট সওয়ারী উঁট চাইলে তিনি বললেন, "তোমাকে একটি উটনীর বাচ্চা দেব।" লোকটি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! বাচ্চা নিয়ে কী করব?' তিনি বললেন, "উটনী ছাড়া কি উট আর কেউ জন্ম দেয়?” (অর্থাৎ প্রত্যেক উটই তো তার মায়ের বাচ্চা।) ৫০৫
একদা এক বৃদ্ধা এসে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি দুআ করে দিন যাতে আল্লাহ আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।' তিনি মস্করা করে বললেন, 'বৃদ্ধারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" তা শুনে বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে প্রস্থান করল। তিনি সাহাবাদেরকে বললেন, "ওকে বলে দাও যে, বৃদ্ধাবস্থায় সে জান্নাতে যাবে না।” (বরং সে যুবতী হয়ে যাবে।) ৫০৬
টিকাঃ
৫০৩. আবু দাউদ ৪৯৯২, তিরমিযী ২৩১৫, সহীহুল জামে' ৭০১৩
৫০৪. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৪৮৮৪
৫০৫. আবুদাউদ, তিরমিযী, মিশকাত ৪৮৮৬
৫০৬. শামায়েলুত তিরমিযী, রাযীন, গায়াতুল মারাম, মিশকাত ৪৮৮৮
হাস্য-রসিকতা করা খোশ-মেজাজের লক্ষণ। সঙ্গী-সাথীদের সাথে রহস্য ও মস্করা করা আমুদে লোকের আলামত। যে মানুষ নিজে আনন্দে থাকে, সে অপরকে আনন্দ বিতরণ করতে পারে। আর সে মানুষ নিশ্চয় সুচরিত্রবান। তবে হাস্য-রসিকতা মানে বক্কানি বা ঢেটামি নয়। যেহেতু মু'মিনের চিত্ত হয় ভাবময়, রূপ হয় গাম্ভির্যপূর্ণ। অপরকে হাসাবার উদ্দেশ্যে মিথ্যা বলে রসিকতা করা, মিথ্যা কৌতুক বা গল্প বানিয়ে অপরকে হাসানো সুচরিত্রবানের লক্ষণ নয়। যেহেতু রসূল বলেন,
وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ فَيَكْذِبُ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمَ وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ
"দুর্ভোগ সেই ব্যক্তির, যে মিথ্যা বলে লোকেদেরকে হাসায়। দুর্ভোগ তার জন্য, দুর্ভোগ তার জন্য।"৫০৩
বলা বাহুল্য, রসিকতা ও মস্করায় মিথ্যা ও অশ্লীল কথা থাকবে না। রসূল সত্য কথার মাধ্যমেই মস্করা করেছেন। যেমন, আবু উমাইর নামক এক শিশুর খেলনা পাখী (নুগাইর) মারা গেলে সে দুঃখিত হয়। তা দেখে তিনি তাকে খোশ করার জন্য মস্করা করে বললেন, 'এই যে উমাইর! কি করেছে নুগাইর?”৫০৪
একদা এক ব্যক্তি তাঁর নিকট সওয়ারী উঁট চাইলে তিনি বললেন, "তোমাকে একটি উটনীর বাচ্চা দেব।" লোকটি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! বাচ্চা নিয়ে কী করব?' তিনি বললেন, "উটনী ছাড়া কি উট আর কেউ জন্ম দেয়?” (অর্থাৎ প্রত্যেক উটই তো তার মায়ের বাচ্চা।) ৫০৫
একদা এক বৃদ্ধা এসে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি দুআ করে দিন যাতে আল্লাহ আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।' তিনি মস্করা করে বললেন, 'বৃদ্ধারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" তা শুনে বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে প্রস্থান করল। তিনি সাহাবাদেরকে বললেন, "ওকে বলে দাও যে, বৃদ্ধাবস্থায় সে জান্নাতে যাবে না।” (বরং সে যুবতী হয়ে যাবে।) ৫০৬
টিকাঃ
৫০৩. আবু দাউদ ৪৯৯২, তিরমিযী ২৩১৫, সহীহুল জামে' ৭০১৩
৫০৪. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৪৮৮৪
৫০৫. আবুদাউদ, তিরমিযী, মিশকাত ৪৮৮৬
৫০৬. শামায়েলুত তিরমিযী, রাযীন, গায়াতুল মারাম, মিশকাত ৪৮৮৮
📄 মুচকি হাসি
সাক্ষাতে মুচকি হাসি একটি সম্মোহনী সুচরিত্র। যাদের মাঝে দেখা-সাক্ষাৎ ও হাসি বিনিময় বৈধ আছে, তাদের মাঝে মুচকি হাসির ঝিলিক মনকে হৃদয়ের কারাগারে বন্দী ক'রে ফেলে।
পক্ষান্তরে সাক্ষাতে গোমড়া-মুখ হয়ে থাকা অন্তরে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। তাই স্বভাবতঃ হাসমুখ না হলেও ভাইয়ের সাক্ষাতে মৃদু হাস্য করা সচ্চরিত্র মানুষের লক্ষণ। আর সেটা একটা পুণ্যের কাজ ও সাদকা। মহানবী বলেছেন,
لَا تَحْقِرنَّ مِنَ المَعْرُوفِ شَيئاً وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ
"তুমি পুণ্যের কোন কাজকে তুচ্ছ মনে করো না। যদিও তুমি তোমার (মুসলিম) ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করতে পার।” (অর্থাৎ হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও পুণ্যের কাজ)। ৫০৭
সুচরিত্রবান যেন প্রত্যেক মানুষের ক্যামেরার সামনে থাকে এবং মুচকি হাসি প্রদর্শন করে, ফলে সকলের কাছে তার ছবি সুন্দর লাগে।
অবৈধ প্রেম জগতে এ কথা অবিদিত নয় যে, মুচকি হাসি বিদ্যুত অপেক্ষা খরচে কম, কিন্তু চমকে অনেক বেশী। সুচরিত্রবান সেই চমক বৈধ সম্প্রীতি স্থাপনে ব্যবহার করে।
তরবারি দ্বারা জয় অপেক্ষা হাসি দ্বারা জয়ের মান ও স্থায়িত্ব অনেক বেশী। তাই তো হাসমুখ ব্যক্তি অধিকাংশ মানুষের মন জয় করে।
কারো সাথে মনোমালিন্য হতেই পারে। কারো প্রতি রাগ হতেই পারে। কিন্তু হাসমুখ ব্যক্তির প্রতি দীর্ঘক্ষণ রাগান্বিত থাকা যায় না। যেহেতু তার মৃদু হাসির বরিষণ রাগের তাপকে শীতল ক'রে দেয়।
অবশ্য কথায়-কথায় ফিক্কিক্, হাঃ-হাঃ, হোঃ-হোঃ, হিঃহিঃ ক'রে বেশি হাস্য করা সচ্চরিত্রতার লক্ষণ নয়। প্রগলভ বা ঢিটে মানুষ সুচরিত্রের অধিকারী হতে পারে না। তাছাড়া মহানবী বলেছেন,
لَا تُكْثِرُوا الضَّحِكَ فَإِنَّ كَثْرَةَ الضَّحِكِ تُمِيتُ الْقَلْبَ
"তোমরা বেশী বেশী হেসো না। কারণ, বেশী হাসার ফলে হৃদয় মারা যায়।"৫০৮
আর দুশ্চরিত্রের লক্ষণ হল হাসির মাঝে ফাঁসি দিয়ে অবৈধ প্রণয় সৃষ্টি করা। প্রথম সাক্ষাতের ঐ হাসি প্রশাসনের অথবা আত্মহত্যার ফাঁসি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
টিকাঃ
৫০৭. মুসলিম ৬৮৫৭
৫০৮. আহমাদ, ইবনে মাজাহ ৪১৯৩. সহীহুল জামে' ৭৪৩৫
সাক্ষাতে মুচকি হাসি একটি সম্মোহনী সুচরিত্র। যাদের মাঝে দেখা-সাক্ষাৎ ও হাসি বিনিময় বৈধ আছে, তাদের মাঝে মুচকি হাসির ঝিলিক মনকে হৃদয়ের কারাগারে বন্দী ক'রে ফেলে।
পক্ষান্তরে সাক্ষাতে গোমড়া-মুখ হয়ে থাকা অন্তরে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। তাই স্বভাবতঃ হাসমুখ না হলেও ভাইয়ের সাক্ষাতে মৃদু হাস্য করা সচ্চরিত্র মানুষের লক্ষণ। আর সেটা একটা পুণ্যের কাজ ও সাদকা। মহানবী বলেছেন,
لَا تَحْقِرنَّ مِنَ المَعْرُوفِ شَيئاً وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ
"তুমি পুণ্যের কোন কাজকে তুচ্ছ মনে করো না। যদিও তুমি তোমার (মুসলিম) ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করতে পার।” (অর্থাৎ হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও পুণ্যের কাজ)। ৫০৭
সুচরিত্রবান যেন প্রত্যেক মানুষের ক্যামেরার সামনে থাকে এবং মুচকি হাসি প্রদর্শন করে, ফলে সকলের কাছে তার ছবি সুন্দর লাগে।
অবৈধ প্রেম জগতে এ কথা অবিদিত নয় যে, মুচকি হাসি বিদ্যুত অপেক্ষা খরচে কম, কিন্তু চমকে অনেক বেশী। সুচরিত্রবান সেই চমক বৈধ সম্প্রীতি স্থাপনে ব্যবহার করে।
তরবারি দ্বারা জয় অপেক্ষা হাসি দ্বারা জয়ের মান ও স্থায়িত্ব অনেক বেশী। তাই তো হাসমুখ ব্যক্তি অধিকাংশ মানুষের মন জয় করে।
কারো সাথে মনোমালিন্য হতেই পারে। কারো প্রতি রাগ হতেই পারে। কিন্তু হাসমুখ ব্যক্তির প্রতি দীর্ঘক্ষণ রাগান্বিত থাকা যায় না। যেহেতু তার মৃদু হাসির বরিষণ রাগের তাপকে শীতল ক'রে দেয়।
অবশ্য কথায়-কথায় ফিক্কিক্, হাঃ-হাঃ, হোঃ-হোঃ, হিঃহিঃ ক'রে বেশি হাস্য করা সচ্চরিত্রতার লক্ষণ নয়। প্রগলভ বা ঢিটে মানুষ সুচরিত্রের অধিকারী হতে পারে না। তাছাড়া মহানবী বলেছেন,
لَا تُكْثِرُوا الضَّحِكَ فَإِنَّ كَثْرَةَ الضَّحِكِ تُمِيتُ الْقَلْبَ
"তোমরা বেশী বেশী হেসো না। কারণ, বেশী হাসার ফলে হৃদয় মারা যায়।"৫০৮
আর দুশ্চরিত্রের লক্ষণ হল হাসির মাঝে ফাঁসি দিয়ে অবৈধ প্রণয় সৃষ্টি করা। প্রথম সাক্ষাতের ঐ হাসি প্রশাসনের অথবা আত্মহত্যার ফাঁসি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
টিকাঃ
৫০৭. মুসলিম ৬৮৫৭
৫০৮. আহমাদ, ইবনে মাজাহ ৪১৯৩. সহীহুল জামে' ৭৪৩৫
📄 হাসিমুখে সাক্ষাৎ
সুচরিত্রবান মানুষের সাথে সাক্ষাৎকালে মুচকি হাসে, দেখা হলে হাসিমুখে স্বাগত জানায়, সুচরিত্রবতী নিজ মাহরাম, স্বামী বা কোন মহিলার সাথে সাক্ষাৎকালে মুখে হাসি দেখায়। যেহেতু হাসিতে আছে ভালোবাসার যাদু। আর সম্প্রীতি ও বৈধ ভালোবাসার জন্য হাসির ঝিলিক খুবই প্রতিক্রিয়াশীল।
যদিও এটা খুব ছোট্ট কাজ। এ কাজে তেমন কিছু ব্যয় করতে হয় না। তবুও তা একটি সদাচরণ, একটি পুণ্যকাজ। মহানবী বলেছেন,
لَا تَحْقِرنَّ مِنَ المَعْرُوفِ شَيْئاً وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ
"তুমি পুণ্যের কোন কাজকে তুচ্ছ মনে করো না। যদিও তুমি তোমার (মুসলিম) ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করতে পার।” (অর্থাৎ হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও পুণ্যের কাজ)। ৫০৯
তিনি আরো বলেছেন,
كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةٌ وَإِنَّ مِنْ الْمَعْرُوفِ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ وَأَنْ تُفْرِغَ مِنْ دَلُوكَ فِي إِنَاءِ أَخِيكَ
"প্রত্যেক কল্যাণমূলক কর্মই হল সদকাহ (করার সমতুল্য)। আর তোমার ভাইয়ের সাথে তোমার হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা এবং তোমার বালতির সাহায্যে (কুয়ো থেকে পানি তুলে) তোমার ভাইয়ের পাত্র (কলসী ইত্যাদি) ভরে দেওয়াও কল্যাণমূলক (সৎ) কর্মের পর্যায়ভুক্ত।”৫১০
পক্ষান্তরে যারা সুচরিত্রবান নয়, তারা এ কাজকে তুচ্ছজ্ঞান করে। ফলে অপরের সাথে সাক্ষাতের সময় মুখ ভার ক'রে থাকে। বাংলা পাঁচের মতো মুখটাকে বাঁকিয়ে রাখে। খুব প্রয়োজন ছাড়া সৌজন্যমূলক কোন কথা বলে না। ভালোভাবে সালামের জবাব দেয় না। ভালোভাবে মুসাফাহা করে না। সফর থেকে এলে মুআনাকা করে না। আসলে তাদের মন বড় সংকীর্ণ ও অনুদার। তাদের হৃদয়ে অপরের সাক্ষাৎ কল্যাণ বয়ে আনে না। তাদের কাছে কারো সাক্ষাৎ ও আপ্যায়ন ভারী মনে হয়। অবাঞ্ছিত লোক না হলেও তারা মনকে প্রশস্ত করতে পারে না। নিশ্চয় এমন আচরণ সচ্চরিত্রবান নারী-পুরুষের নয়।
অবাঞ্ছিত অভদ্র লোক হলেও তার সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করার বিধান রয়েছে ইসলামে। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, এক অভদ্র ব্যক্তি আল্লাহর নবী এর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইল। নবী এর কাছে খবর গেলে তিনি বললেন,
ائْذَنُوا لَهُ فَلَبِئْسَ ابْنُ الْعَشِيرَةِ أَوْ بِئْسَ رَجُلُ الْعَشِيرَةِ
"ওকে অনুমতি দাও। বাজে লোক ওটা!"
তারপর তাকে প্রবেশ করার অনুমতি দিলেন। সে যখন বসল, তখন নবী তার সামনে খুশী প্রকাশ করলেন এবং নম্রভাবে কথা বলতে লাগলেন। অতঃপর লোকটি চলে গেলে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তাঁকে বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি তার সম্পর্কে এই এই (কুমন্তব্য) করলেন। তারপর সে যখন ভিতরে এল, তখন তার সামনে খুশী প্রকাশ করলেন এবং নম্রভাবে কথা বলতে লাগলেন!' আল্লাহর রসূল বললেন,
يَا عَائِشَةُ إِنَّ شَرَّ النَّاسِ مَنْزِلَةً عِنْدَ اللهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ وَدَعَهُ أَوْ تَرَكَهُ النَّاسُ اتَّقَاءَ فُحْشِهِ
"হে আয়েশা! কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্টমানের ব্যক্তি সেই হবে, যাকে মানুষ তার অশ্লীলতা থেকে বাঁচার জন্য বর্জন ক'রে থাকে। "৫১১
টিকাঃ
৫০৯. মুসলিম ৬৮৫৭
৫১০. আহমাদ ১৪৮৭৭, তিরমিযী, হাকেম, সহীহুল জামে' ৪৫৫৭
৫১১. বুখারী ৬০৫৪, ৬১৩১, মুসলিম ৬৭৬১
সুচরিত্রবান মানুষের সাথে সাক্ষাৎকালে মুচকি হাসে, দেখা হলে হাসিমুখে স্বাগত জানায়, সুচরিত্রবতী নিজ মাহরাম, স্বামী বা কোন মহিলার সাথে সাক্ষাৎকালে মুখে হাসি দেখায়। যেহেতু হাসিতে আছে ভালোবাসার যাদু। আর সম্প্রীতি ও বৈধ ভালোবাসার জন্য হাসির ঝিলিক খুবই প্রতিক্রিয়াশীল।
যদিও এটা খুব ছোট্ট কাজ। এ কাজে তেমন কিছু ব্যয় করতে হয় না। তবুও তা একটি সদাচরণ, একটি পুণ্যকাজ। মহানবী বলেছেন,
لَا تَحْقِرنَّ مِنَ المَعْرُوفِ شَيْئاً وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ
"তুমি পুণ্যের কোন কাজকে তুচ্ছ মনে করো না। যদিও তুমি তোমার (মুসলিম) ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করতে পার।” (অর্থাৎ হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও পুণ্যের কাজ)। ৫০৯
তিনি আরো বলেছেন,
كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةٌ وَإِنَّ مِنْ الْمَعْرُوفِ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ وَأَنْ تُفْرِغَ مِنْ دَلُوكَ فِي إِنَاءِ أَخِيكَ
"প্রত্যেক কল্যাণমূলক কর্মই হল সদকাহ (করার সমতুল্য)। আর তোমার ভাইয়ের সাথে তোমার হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা এবং তোমার বালতির সাহায্যে (কুয়ো থেকে পানি তুলে) তোমার ভাইয়ের পাত্র (কলসী ইত্যাদি) ভরে দেওয়াও কল্যাণমূলক (সৎ) কর্মের পর্যায়ভুক্ত।”৫১০
পক্ষান্তরে যারা সুচরিত্রবান নয়, তারা এ কাজকে তুচ্ছজ্ঞান করে। ফলে অপরের সাথে সাক্ষাতের সময় মুখ ভার ক'রে থাকে। বাংলা পাঁচের মতো মুখটাকে বাঁকিয়ে রাখে। খুব প্রয়োজন ছাড়া সৌজন্যমূলক কোন কথা বলে না। ভালোভাবে সালামের জবাব দেয় না। ভালোভাবে মুসাফাহা করে না। সফর থেকে এলে মুআনাকা করে না। আসলে তাদের মন বড় সংকীর্ণ ও অনুদার। তাদের হৃদয়ে অপরের সাক্ষাৎ কল্যাণ বয়ে আনে না। তাদের কাছে কারো সাক্ষাৎ ও আপ্যায়ন ভারী মনে হয়। অবাঞ্ছিত লোক না হলেও তারা মনকে প্রশস্ত করতে পারে না। নিশ্চয় এমন আচরণ সচ্চরিত্রবান নারী-পুরুষের নয়।
অবাঞ্ছিত অভদ্র লোক হলেও তার সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করার বিধান রয়েছে ইসলামে। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, এক অভদ্র ব্যক্তি আল্লাহর নবী এর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইল। নবী এর কাছে খবর গেলে তিনি বললেন,
ائْذَنُوا لَهُ فَلَبِئْسَ ابْنُ الْعَشِيرَةِ أَوْ بِئْسَ رَجُلُ الْعَشِيرَةِ
"ওকে অনুমতি দাও। বাজে লোক ওটা!"
তারপর তাকে প্রবেশ করার অনুমতি দিলেন। সে যখন বসল, তখন নবী তার সামনে খুশী প্রকাশ করলেন এবং নম্রভাবে কথা বলতে লাগলেন। অতঃপর লোকটি চলে গেলে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তাঁকে বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি তার সম্পর্কে এই এই (কুমন্তব্য) করলেন। তারপর সে যখন ভিতরে এল, তখন তার সামনে খুশী প্রকাশ করলেন এবং নম্রভাবে কথা বলতে লাগলেন!' আল্লাহর রসূল বললেন,
يَا عَائِشَةُ إِنَّ شَرَّ النَّاسِ مَنْزِلَةً عِنْدَ اللهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ وَدَعَهُ أَوْ تَرَكَهُ النَّاسُ اتَّقَاءَ فُحْشِهِ
"হে আয়েশা! কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্টমানের ব্যক্তি সেই হবে, যাকে মানুষ তার অশ্লীলতা থেকে বাঁচার জন্য বর্জন ক'রে থাকে। "৫১১
টিকাঃ
৫০৯. মুসলিম ৬৮৫৭
৫১০. আহমাদ ১৪৮৭৭, তিরমিযী, হাকেম, সহীহুল জামে' ৪৫৫৭
৫১১. বুখারী ৬০৫৪, ৬১৩১, মুসলিম ৬৭৬১
📄 গিল্লাতী ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও দ্বীনী ভাইয়ের খিয়ারত
এ পৃথিবীতে আপন আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও এমন কিছু ভাই-বন্ধু থাকে, যাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ক'রে কুশল বিনিময় করতে হয়। যাদের সাথে রক্ত, দুগ্ধ, বিবাহ, সম্পদ, স্বার্থ বা অন্য কোন সম্পর্কের বন্ধন থাকে না, থাকে শুধু দ্বীন ও ঈমানের বন্ধন, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশার আকর্ষণ। সুচরিত্রবান লোকেরা এই সম্পর্ক স্থাপন ক'রে থাকে। মহান আল্লাহর তুষ্টি বিধানের উদ্দেশ্যে আপোসে সম্প্রীতি কায়েম করে।
এই সম্প্রীতির প্রতি গুরুত্ব আরোপ ক'রে মহানবী বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَا تَدْخُلُوا الجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا، وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا، أولَا أَدُلُّكُمْ عَلَى شَيْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ ؟ أَفْشُوا السَّلامَ بينكم
“সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে! তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না; যতক্ষণ না তোমরা মু'মিন হবে। এবং তোমরা মু'মিন হতে পারবে না; যে পর্যন্ত না তোমরা পরস্পরে ভালবাসা রাখবে। আমি কি তোমাদেরকে এমন কাজ বলে দেব না, যখন তোমরা তা করবে, তখন তোমরা একে অপরকে ভালবাসতে লাগবে? তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালাম প্রচার কর।”৫১২
এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কায়েমে রয়েছে ঈমানের স্বাদ। প্রকৃত ঈমানদারীর অনুভূতি। ঈমানী মিষ্টতার আস্বাদন। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَجِدَ طَعْمَ الْإِيمَانِ فَلْيُحِبُّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
“যে ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পেতে পছন্দ করে, সে ব্যক্তি কেবল সুমহান আল্লাহর উদ্দেশ্যেই অপরকে ভালবাসুক।”৫১৩
ثَلاثُ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلاوَةَ الإِيمَانِ : أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سَوَاهُمَا ، وَأَنْ يُحِبّ المَرْءَ لاَ يُحِبُّهُ إِلا لِلَّهِ ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الكُفْرِ بَعْدَ أَنْ أَنْقَذَهُ الله مِنْهُ ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ
“যার মধ্যে তিনটি গুণ থাকে, সে ঈমানের মিষ্টতা লাভ ক'রে থাকে। আল্লাহ ও তাঁর রসূল তার কাছে অন্য সব কিছু থেকে অধিক প্রিয় হবে; কাউকে ভালোবাসলে কেবল আল্লাহ'র জন্যই ভালবাসবে। আর কুফরী থেকে তাকে আল্লাহর বাঁচানোর পর পুনরায় তাতে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করবে, যেমন সে নিজেকে আগুনে নিক্ষিপ্ত করাকে অপছন্দ করে।"৫১৪
লিল্লাহী ভালোবাসা স্থাপনকারীরা আসলে আল্লাহর আওলিয়া। তাদের এমন মর্যাদা রয়েছে, যা দেখে নবী ও শহীদগণও ঈর্ষা করবেন! আল্লাহু আকবার! মহানবী বলেছেন,
إِنَّ مِنْ عِبَادِ اللهِ لأُنَاسًا مَا هُمْ بِأَنْبِيَاءَ وَلَا شُهَدَاءَ يَغْبِطُهُمُ الْأَنْبِيَاءُ وَالشُّهَدَاءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِمَكَانِهِمْ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى
"কিছু লোক আছে যারা নবী নয়, শহীদও নয়। অথচ নবী ও শহীদগণ আল্লাহর নিকট তাদের মর্যাদা দেখে ঈর্ষা করবেন।" লোকেরা বলল, 'হে আল্লাহর রসূল, আমাদেরকে বলে দিন, তারা কারা?' তিনি বললেন,
هُمْ قَوْمٌ تَحَابُّوا بِرُوحِ اللَّهِ عَلَى غَيْرِ أَرْحَامٍ بَيْنَهُمْ وَلَا أَمْوَالٍ يَتَعَاطَوْنَهَا فَوَاللَّهِ إِنَّ وُجُوهَهُمْ لَنُورٌ وَإِنَّهُمْ عَلَى نُورٍ لاَ يَخَافُونَ إِذَا خَافَ النَّاسُ وَلَا يَحْزَنُونَ إِذَا حَزِنَ النَّاسُ
"ঐ লোক হল তারা, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আপোসে বন্ধুত্ব কায়েম করে; যাদের মাঝে কোন আত্মীয়তার বন্ধন থাকে না এবং থাকে না কোন অর্থের লেনদেন। আল্লাহর কসম! তাদের মুখমণ্ডল হবে জ্যোতির্ময়। তারা নূরের মাঝে অবস্থান করবে। লোকেরা যখন ভীত-সন্ত্রস্ত হবে, তখন তারা কোন ভয় পাবে না এবং লোকেরা যখন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবে, তখন তাদের কোন দুশ্চিন্তা থাকবে না।" অতঃপর তিনি পাঠ করলেন,
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ - الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ - لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الآخِرَةِ لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ)
'সতর্ক হও! নিশ্চয় যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের কোন ভয় নেই। তারা দুঃখিতও হবে না। যারা মুমিন এবং পরহেযগার। তাদের জন্য ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনে রয়েছে সুসংবাদ। আল্লাহর বাক্যাবলীর কোন পরিবর্তন নেই। এটাই হল মহাসাফল্য।”৫১৫
তাদের মুখমণ্ডল হবে জ্যোতির্ময়, তারা অবস্থান করবে জ্যোতির মেম্বরে। মহানবী বলেছেন,
قَالَ اللهُ - عَزَّ وَجَلَّ : المُتَحَابُّونَ فِي جَلالِي ، لَهُمْ مَنَابِرُ مِنْ نُورٍ يَغْبِطُهُمُ النَّبِيُّونَ وَالشُّهَدَاءُ
"আল্লাহ আয্যা অজাল্ল বলেন, 'আমার মর্যাদার ওয়াস্তে যারা আপোসে ভালবাসা স্থাপন করবে, তাদের (বসার) জন্য হবে নূরের মেম্বর; যা দেখে নবী ও শহীদগণ ঈর্ষা করবেন।"৫১৬
আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্ব স্থাপনে রয়েছে আরো একটি পুরস্কার কিয়ামতের ছায়াহীন ময়দানে, মহা পুরস্কার। মহানবী বলেছেন,
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلا ظِلُّهُ : (منهم) رَجُلَانِ تَحَابًا فِي اللهِ اجْتَمَعًا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ
"আল্লাহ সাত ব্যক্তিকে সেই দিনে তাঁর (আরশের) ছায়া দান করবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া থাকবে না; (তাদের মধ্যে হল,) সেই দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে বন্ধুত্ব ও ভালবাসা স্থাপন করে; যারা এই ভালবাসার উপর মিলিত হয় এবং এই ভালবাসার উপরেই চিরবিচ্ছিন্ন (তাদের মৃত্যু) হয়।”৫১৭
إِنَّ الله تَعَالَى يَقُولُ يَوْمَ القِيَامَةِ : أَيْنَ المُتَحَابُّونَ بِجَلَالِي ؟ اليَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِي ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّي
"আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন বলবেন, 'আমার মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্বের জন্য পরস্পরকে যারা ভালবেসেছিল তারা কোথায়? আজকের দিন আমি তাদেরকে আমার ছায়ায় আশ্রয় দেব, যেদিন আমার (আরশের) ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া নেই। "৫১৮
আল্লাহু আকবার! কোনও সুচরিত্রবান পুরুষ কি এমন বন্ধুত্ব স্থাপনে কুণ্ঠাবোধ করতে পারে, কোনও সুচরিত্রবতী মহিলা কি এমন বান্ধবীর অনুসন্ধান না ক'রে জীবন অতিবাহিত করতে পারে?
চরিত্রবান মুসলিম চরিত্রবান মুসলিমের সাথে লিল্লাহী ভ্রাতৃত্ব কায়েম করে এবং চরিত্রবতী সুশীলা চরিত্রবতী সুশীলার সাথে লিল্লাহী বোন হিসাবে নির্বাচন ক'রে থাকে। আর এই সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য তারা আপোসে যিয়ারত ক'রে থাকে।
এই যিয়ারতে গিয়ে তারা সুখ-দুঃখের কথা বলে।
মহান আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার কথা বলে।
একে অপরকে সদুপদেশ দান করে।
দ্বীনের ব্যাপারে পরস্পর সহযোগিতার কথা বলে।
পরস্পরের দুরবস্থায় সাহায্য-সহযোগিতা করে।
রোগে-দুঃখে-শোকে পরস্পরকে সান্ত্বনা দেয়।
সৎপথে প্রতিষ্ঠিত থাকার ব্যাপারে অথবা সাংসারিক কোন সুবিধা-অসুবিধার ব্যাপারে শলাপরামর্শ করে। ইত্যাদি।
লিল্লাহী এই যিয়ারতের মাহাত্ম্য রয়েছে ইসলামে।
আবূ ইদ্রীস খাওলানী (রঃ) বলেন, আমি দিমাঙ্কের মসজিদে প্রবেশ ক'রে এক যুবককে দেখতে পেলাম, তাঁর সামনের দাঁতগুলি খুবই চকচকে এবং তাঁর সঙ্গে কিছু লোকও (বসে) রয়েছে। যখন তারা কোন বিষয়ে মতভেদ করছে, তখন (সিদ্ধান্তের জন্য) তাঁর দিকে রুজু করছে এবং তাঁর মত গ্রহণ করছে। সুতরাং আমি তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম (যে, ইনি কে)? (আমাকে) বলা হল যে, 'ইনি মুআয বিন জাবাল।' অতঃপর আগামী কাল আমি আগেভাগেই মসজিদে গেলাম। কিন্তু দেখলাম সেই (যুবকটি) আমার আগেই পৌঁছে গেছেন এবং তাঁকে স্বলাতরত অবস্থায় পেলাম। সুতরাং তাঁর স্বলাত শেষ হওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করলাম। অতঃপর আমি তাঁর সামনে এসে তাঁকে সালাম দিলাম। তারপর বললাম, 'আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসি।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম?' আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম।' পুনরায় তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম?' আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম।' অতঃপর তিনি আমার চাদরের আঁচল ধরে আমাকে তাঁর দিকে টানলেন, তারপর বললেন, 'সুসংবাদ নাও।' কারণ, আমি রাসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি,
قَالَ الله تَعَالَى : وَجَبَتْ مَحَبَّتِي لِلْمُتَحَابِّيْنَ فِيَّ ، وَالمُتَجَالِسِينَ فِي ، وَالمُتَزَاوِرِينَ فِي وَالمُتَبَاذِلِينَ فِي
'আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য যারা পরস্পরের মধ্যে মহব্বত রাখে, একে অপরের সঙ্গে বসে, একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং একে অপরের জন্য খরচ করে, তাদের জন্য আমার মহব্বত ও ভালবাসা ওয়াজেব হয়ে যায়।”৫১৯
মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কাউকে ভালোবাসলে এবং সে কথা তাকে জানালে আল্লাহর ভালোবাসার দুআ পাওয়া যায়।
আনাস বলেন, এক ব্যক্তি নবী এর নিকট (বসে) ছিল। অতঃপর এক ব্যক্তি তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করল। (যে বসেছিল) সে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! নিঃসন্দেহে আমি একে ভালবাসি।' (এ কথা শুনে) নবী তাকে বললেন, "তুমি কি (এ কথা) তাকে জানিয়েছ?” সে বলল, 'না।' তিনি বললেন, "তাকে জানিয়ে দাও।" সুতরাং সে (দ্রুত) তার পিছনে গিয়ে (তাকে) বলল, 'আমি আল্লাহর ওয়াস্তে তোমাকে ভালবাসি।' সে বলল, 'যাঁর ওয়াস্তে তুমি আমাকে ভালবাসো, তিনি তোমাকে ভালবাসুন। ৫২০
হ্যাঁ, আল্লাহর উদ্দেশ্যে কাউকে ভালোবাসলে আল্লাহর ভালোবাসা লাভ হয়। কর্মের অনুরূপ এমন সুফল লাভ করে চরিত্রবানেরা। মহানবী বলেছেন,
أَنَّ رَجُلاً زَارَ أَخَاً لَهُ فِي قَرْيَةٍ أُخْرَى ، فَأَرْصَدَ اللَّهُ تَعَالَى عَلَى مَدْرَجَتِهِ مَلَكاً ، فَلَمَّا أَتَى عَلَيْهِ ، قَالَ : أَيْنَ تُرِيدُ ؟ قَالَ : أُريدُ أخاً لي في هذِهِ الْقَرْيَةِ | قَالَ : هَلْ لَكَ عَلَيْهِ مِنْ نِعْمَةٍ تَرُبُّهَا عَلَيْهِ ؟ قَالَ : لا ، غَيْرَ أَنِّي أَحْبَبْتُهُ فِي الله تَعَالَى ، قَالَ : فَإِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكَ بِأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّكَ كَمَا أَحْبَبْتَهُ فِيهِ
"এক ব্যক্তি অন্য কোন গ্রামে তার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য বের হল। আল্লাহ তাআলা তার রাস্তায় এক ফিরিস্তাকে বসিয়ে দিলেন, তিনি তার অপেক্ষা করতে থাকলেন। যখন সে তাঁর কাছে পৌঁছল, তখন তিনি তাকে বললেন, 'তুমি কোথায় যাচ্ছ?' সে বলল, 'এ লোকালয়ে আমার এক ভাই আছে, আমি তার কাছে যাচ্ছি।' ফিরিস্তা জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার প্রতি কি তার কোন অনুগ্রহ রয়েছে, যার বিনিময় দেওয়ার জন্য তুমি যাচ্ছ?' সে বলল, 'না, আমি তার নিকট কেবলমাত্র এই জন্য যাচ্ছি যে, আমি তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসি।' ফিরিস্তা বললেন, '(তাহলে শোনো) আমি তোমার নিকট আল্লাহর দূত হিসাবে (এ কথা জানাবার জন্য) এসেছি যে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে ভালবাসেন; যেমন তুমি তাকে আল্লাহর জন্য ভালবাস।”৫২১
এমন ভালোবাসার ফলে আপোসের যিয়ারত-যাত্রায় ফিরিশতার দুআ লাভ হয়। এমন বন্ধুত্বের সাক্ষাৎ হল সুখময়, এমন ভ্রাতৃত্বের পরিণামে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে চলার পথ হল বেহেস্তের পথ। মহানবী বলেছেন,
مَنْ عَادَ مَرِيضاً أَوْ زَارَ أخاً لَهُ فِي اللهِ ، نَادَاهُ مُنَادٍ : بِأَنْ طِبْتَ ، وَطَابَ مَمْشَاكَ ، وَتَبَوَّأْتَ مِنَ الْجَنَّةِ مَنْزِلاً
"যে ব্যক্তি কোন রোগীকে সাক্ষাৎ করে জিজ্ঞাসাবাদ করে অথবা তার কোন লিল্লাহী ভাইকে সাক্ষাৎ করে, সে ব্যক্তিকে এক (গায়বী) আহবানকারী আহবান ক'রে বলে, 'সুখী হও তুমি, সুখকর হোক তোমার ঐ যাত্রা (সাক্ষাতের জন্য যাওয়া)। আর তোমার স্থান হোক জান্নাতের প্রাসাদে।"৫২২
এরই বিপরীত প্রবাহে ভেবে দেখতে পারেন দুশ্চরিত্র যুবক-যুবতী প্রেমিক-প্রেমিকাদের কথা, যাদের ভালোবাসা আল্লাহর ওয়াস্তে নয়। যাদের ভালোবাসা হয় বিপরীতমুখী, যুবক-যুবতীর মাঝে অবৈধ ভালোবাসা, যৌবনের উন্মাদনা, রূপমুগ্ধতা অথবা অর্থলোভ তাদের ভালোবাসার কারণ হয়। তারা অবৈধভাবে মেলামিশা করে, লুকোচুরি ক'রে দেখা-সাক্ষাৎ করে অথবা নির্লজ্জ হয়ে প্রকাশ্যে কোন পার্ক, বনভূমি বা সমুদ্র-সৈকতে মিলিত হয়। তারা চায় তাদের চরিত্র যাক, কিন্তু ভালোবাসা অনির্বান হোক। তাদের ভালোবাসা হয় নিজেদের মনের খেয়ালখুশীকে বিজয়মাল্য দান করার জন্য। সুতরাং ধিক্ তাদেরকে শত ধিক্!
টিকাঃ
৫১২. মুসলিম ২০০
৫১৩. আহমাদ, হাকেম ৩, ৭৩১২, সহীহুল জামে' ৫৯৫৮
৫১৪. বুখারী ১৬, মুসলিম ১৭৪
৫১৫. সূরা ইউনুস ৬২-৬৪ আয়াত, আবু দাউদ ৩৫২৯
৫১৬. তিরমিযী ২৩৯০. আহমাদ ২২০৮০
৫১৭. বুখারী ৬৬০, মুসলিম ২৪২৭
৫১৮. মুসলিম ৬৭১৩
৫১৯. আহমাদ ২২০৩০, মুঅত্তা ১৭৭৯, ত্বাবারানী, হাকেম, সহীহুল জামে' ৪৩৩১
৫২০. আবু দাউদ ৫১২৭
৫২১. মুসলিম ৬৭১৪
৫২২. তিরমিযী ২০০৮
এ পৃথিবীতে আপন আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও এমন কিছু ভাই-বন্ধু থাকে, যাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ক'রে কুশল বিনিময় করতে হয়। যাদের সাথে রক্ত, দুগ্ধ, বিবাহ, সম্পদ, স্বার্থ বা অন্য কোন সম্পর্কের বন্ধন থাকে না, থাকে শুধু দ্বীন ও ঈমানের বন্ধন, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশার আকর্ষণ। সুচরিত্রবান লোকেরা এই সম্পর্ক স্থাপন ক'রে থাকে। মহান আল্লাহর তুষ্টি বিধানের উদ্দেশ্যে আপোসে সম্প্রীতি কায়েম করে।
এই সম্প্রীতির প্রতি গুরুত্ব আরোপ ক'রে মহানবী বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَا تَدْخُلُوا الجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا، وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا، أولَا أَدُلُّكُمْ عَلَى شَيْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ ؟ أَفْشُوا السَّلامَ بينكم
“সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে! তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না; যতক্ষণ না তোমরা মু'মিন হবে। এবং তোমরা মু'মিন হতে পারবে না; যে পর্যন্ত না তোমরা পরস্পরে ভালবাসা রাখবে। আমি কি তোমাদেরকে এমন কাজ বলে দেব না, যখন তোমরা তা করবে, তখন তোমরা একে অপরকে ভালবাসতে লাগবে? তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালাম প্রচার কর।”৫১২
এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কায়েমে রয়েছে ঈমানের স্বাদ। প্রকৃত ঈমানদারীর অনুভূতি। ঈমানী মিষ্টতার আস্বাদন। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَجِدَ طَعْمَ الْإِيمَانِ فَلْيُحِبُّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
“যে ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পেতে পছন্দ করে, সে ব্যক্তি কেবল সুমহান আল্লাহর উদ্দেশ্যেই অপরকে ভালবাসুক।”৫১৩
ثَلاثُ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلاوَةَ الإِيمَانِ : أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سَوَاهُمَا ، وَأَنْ يُحِبّ المَرْءَ لاَ يُحِبُّهُ إِلا لِلَّهِ ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الكُفْرِ بَعْدَ أَنْ أَنْقَذَهُ الله مِنْهُ ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ
“যার মধ্যে তিনটি গুণ থাকে, সে ঈমানের মিষ্টতা লাভ ক'রে থাকে। আল্লাহ ও তাঁর রসূল তার কাছে অন্য সব কিছু থেকে অধিক প্রিয় হবে; কাউকে ভালোবাসলে কেবল আল্লাহ'র জন্যই ভালবাসবে। আর কুফরী থেকে তাকে আল্লাহর বাঁচানোর পর পুনরায় তাতে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করবে, যেমন সে নিজেকে আগুনে নিক্ষিপ্ত করাকে অপছন্দ করে।"৫১৪
লিল্লাহী ভালোবাসা স্থাপনকারীরা আসলে আল্লাহর আওলিয়া। তাদের এমন মর্যাদা রয়েছে, যা দেখে নবী ও শহীদগণও ঈর্ষা করবেন! আল্লাহু আকবার! মহানবী বলেছেন,
إِنَّ مِنْ عِبَادِ اللهِ لأُنَاسًا مَا هُمْ بِأَنْبِيَاءَ وَلَا شُهَدَاءَ يَغْبِطُهُمُ الْأَنْبِيَاءُ وَالشُّهَدَاءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِمَكَانِهِمْ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى
"কিছু লোক আছে যারা নবী নয়, শহীদও নয়। অথচ নবী ও শহীদগণ আল্লাহর নিকট তাদের মর্যাদা দেখে ঈর্ষা করবেন।" লোকেরা বলল, 'হে আল্লাহর রসূল, আমাদেরকে বলে দিন, তারা কারা?' তিনি বললেন,
هُمْ قَوْمٌ تَحَابُّوا بِرُوحِ اللَّهِ عَلَى غَيْرِ أَرْحَامٍ بَيْنَهُمْ وَلَا أَمْوَالٍ يَتَعَاطَوْنَهَا فَوَاللَّهِ إِنَّ وُجُوهَهُمْ لَنُورٌ وَإِنَّهُمْ عَلَى نُورٍ لاَ يَخَافُونَ إِذَا خَافَ النَّاسُ وَلَا يَحْزَنُونَ إِذَا حَزِنَ النَّاسُ
"ঐ লোক হল তারা, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আপোসে বন্ধুত্ব কায়েম করে; যাদের মাঝে কোন আত্মীয়তার বন্ধন থাকে না এবং থাকে না কোন অর্থের লেনদেন। আল্লাহর কসম! তাদের মুখমণ্ডল হবে জ্যোতির্ময়। তারা নূরের মাঝে অবস্থান করবে। লোকেরা যখন ভীত-সন্ত্রস্ত হবে, তখন তারা কোন ভয় পাবে না এবং লোকেরা যখন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবে, তখন তাদের কোন দুশ্চিন্তা থাকবে না।" অতঃপর তিনি পাঠ করলেন,
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ - الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ - لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الآخِرَةِ لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ)
'সতর্ক হও! নিশ্চয় যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের কোন ভয় নেই। তারা দুঃখিতও হবে না। যারা মুমিন এবং পরহেযগার। তাদের জন্য ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনে রয়েছে সুসংবাদ। আল্লাহর বাক্যাবলীর কোন পরিবর্তন নেই। এটাই হল মহাসাফল্য।”৫১৫
তাদের মুখমণ্ডল হবে জ্যোতির্ময়, তারা অবস্থান করবে জ্যোতির মেম্বরে। মহানবী বলেছেন,
قَالَ اللهُ - عَزَّ وَجَلَّ : المُتَحَابُّونَ فِي جَلالِي ، لَهُمْ مَنَابِرُ مِنْ نُورٍ يَغْبِطُهُمُ النَّبِيُّونَ وَالشُّهَدَاءُ
"আল্লাহ আয্যা অজাল্ল বলেন, 'আমার মর্যাদার ওয়াস্তে যারা আপোসে ভালবাসা স্থাপন করবে, তাদের (বসার) জন্য হবে নূরের মেম্বর; যা দেখে নবী ও শহীদগণ ঈর্ষা করবেন।"৫১৬
আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্ব স্থাপনে রয়েছে আরো একটি পুরস্কার কিয়ামতের ছায়াহীন ময়দানে, মহা পুরস্কার। মহানবী বলেছেন,
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلا ظِلُّهُ : (منهم) رَجُلَانِ تَحَابًا فِي اللهِ اجْتَمَعًا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ
"আল্লাহ সাত ব্যক্তিকে সেই দিনে তাঁর (আরশের) ছায়া দান করবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া থাকবে না; (তাদের মধ্যে হল,) সেই দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে বন্ধুত্ব ও ভালবাসা স্থাপন করে; যারা এই ভালবাসার উপর মিলিত হয় এবং এই ভালবাসার উপরেই চিরবিচ্ছিন্ন (তাদের মৃত্যু) হয়।”৫১৭
إِنَّ الله تَعَالَى يَقُولُ يَوْمَ القِيَامَةِ : أَيْنَ المُتَحَابُّونَ بِجَلَالِي ؟ اليَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِي ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّي
"আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন বলবেন, 'আমার মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্বের জন্য পরস্পরকে যারা ভালবেসেছিল তারা কোথায়? আজকের দিন আমি তাদেরকে আমার ছায়ায় আশ্রয় দেব, যেদিন আমার (আরশের) ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া নেই। "৫১৮
আল্লাহু আকবার! কোনও সুচরিত্রবান পুরুষ কি এমন বন্ধুত্ব স্থাপনে কুণ্ঠাবোধ করতে পারে, কোনও সুচরিত্রবতী মহিলা কি এমন বান্ধবীর অনুসন্ধান না ক'রে জীবন অতিবাহিত করতে পারে?
চরিত্রবান মুসলিম চরিত্রবান মুসলিমের সাথে লিল্লাহী ভ্রাতৃত্ব কায়েম করে এবং চরিত্রবতী সুশীলা চরিত্রবতী সুশীলার সাথে লিল্লাহী বোন হিসাবে নির্বাচন ক'রে থাকে। আর এই সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য তারা আপোসে যিয়ারত ক'রে থাকে।
এই যিয়ারতে গিয়ে তারা সুখ-দুঃখের কথা বলে।
মহান আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার কথা বলে।
একে অপরকে সদুপদেশ দান করে।
দ্বীনের ব্যাপারে পরস্পর সহযোগিতার কথা বলে।
পরস্পরের দুরবস্থায় সাহায্য-সহযোগিতা করে।
রোগে-দুঃখে-শোকে পরস্পরকে সান্ত্বনা দেয়।
সৎপথে প্রতিষ্ঠিত থাকার ব্যাপারে অথবা সাংসারিক কোন সুবিধা-অসুবিধার ব্যাপারে শলাপরামর্শ করে। ইত্যাদি।
লিল্লাহী এই যিয়ারতের মাহাত্ম্য রয়েছে ইসলামে।
আবূ ইদ্রীস খাওলানী (রঃ) বলেন, আমি দিমাঙ্কের মসজিদে প্রবেশ ক'রে এক যুবককে দেখতে পেলাম, তাঁর সামনের দাঁতগুলি খুবই চকচকে এবং তাঁর সঙ্গে কিছু লোকও (বসে) রয়েছে। যখন তারা কোন বিষয়ে মতভেদ করছে, তখন (সিদ্ধান্তের জন্য) তাঁর দিকে রুজু করছে এবং তাঁর মত গ্রহণ করছে। সুতরাং আমি তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম (যে, ইনি কে)? (আমাকে) বলা হল যে, 'ইনি মুআয বিন জাবাল।' অতঃপর আগামী কাল আমি আগেভাগেই মসজিদে গেলাম। কিন্তু দেখলাম সেই (যুবকটি) আমার আগেই পৌঁছে গেছেন এবং তাঁকে স্বলাতরত অবস্থায় পেলাম। সুতরাং তাঁর স্বলাত শেষ হওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করলাম। অতঃপর আমি তাঁর সামনে এসে তাঁকে সালাম দিলাম। তারপর বললাম, 'আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসি।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম?' আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম।' পুনরায় তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম?' আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম।' অতঃপর তিনি আমার চাদরের আঁচল ধরে আমাকে তাঁর দিকে টানলেন, তারপর বললেন, 'সুসংবাদ নাও।' কারণ, আমি রাসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি,
قَالَ الله تَعَالَى : وَجَبَتْ مَحَبَّتِي لِلْمُتَحَابِّيْنَ فِيَّ ، وَالمُتَجَالِسِينَ فِي ، وَالمُتَزَاوِرِينَ فِي وَالمُتَبَاذِلِينَ فِي
'আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য যারা পরস্পরের মধ্যে মহব্বত রাখে, একে অপরের সঙ্গে বসে, একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং একে অপরের জন্য খরচ করে, তাদের জন্য আমার মহব্বত ও ভালবাসা ওয়াজেব হয়ে যায়।”৫১৯
মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কাউকে ভালোবাসলে এবং সে কথা তাকে জানালে আল্লাহর ভালোবাসার দুআ পাওয়া যায়।
আনাস বলেন, এক ব্যক্তি নবী এর নিকট (বসে) ছিল। অতঃপর এক ব্যক্তি তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করল। (যে বসেছিল) সে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! নিঃসন্দেহে আমি একে ভালবাসি।' (এ কথা শুনে) নবী তাকে বললেন, "তুমি কি (এ কথা) তাকে জানিয়েছ?” সে বলল, 'না।' তিনি বললেন, "তাকে জানিয়ে দাও।" সুতরাং সে (দ্রুত) তার পিছনে গিয়ে (তাকে) বলল, 'আমি আল্লাহর ওয়াস্তে তোমাকে ভালবাসি।' সে বলল, 'যাঁর ওয়াস্তে তুমি আমাকে ভালবাসো, তিনি তোমাকে ভালবাসুন। ৫২০
হ্যাঁ, আল্লাহর উদ্দেশ্যে কাউকে ভালোবাসলে আল্লাহর ভালোবাসা লাভ হয়। কর্মের অনুরূপ এমন সুফল লাভ করে চরিত্রবানেরা। মহানবী বলেছেন,
أَنَّ رَجُلاً زَارَ أَخَاً لَهُ فِي قَرْيَةٍ أُخْرَى ، فَأَرْصَدَ اللَّهُ تَعَالَى عَلَى مَدْرَجَتِهِ مَلَكاً ، فَلَمَّا أَتَى عَلَيْهِ ، قَالَ : أَيْنَ تُرِيدُ ؟ قَالَ : أُريدُ أخاً لي في هذِهِ الْقَرْيَةِ | قَالَ : هَلْ لَكَ عَلَيْهِ مِنْ نِعْمَةٍ تَرُبُّهَا عَلَيْهِ ؟ قَالَ : لا ، غَيْرَ أَنِّي أَحْبَبْتُهُ فِي الله تَعَالَى ، قَالَ : فَإِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكَ بِأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّكَ كَمَا أَحْبَبْتَهُ فِيهِ
"এক ব্যক্তি অন্য কোন গ্রামে তার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য বের হল। আল্লাহ তাআলা তার রাস্তায় এক ফিরিস্তাকে বসিয়ে দিলেন, তিনি তার অপেক্ষা করতে থাকলেন। যখন সে তাঁর কাছে পৌঁছল, তখন তিনি তাকে বললেন, 'তুমি কোথায় যাচ্ছ?' সে বলল, 'এ লোকালয়ে আমার এক ভাই আছে, আমি তার কাছে যাচ্ছি।' ফিরিস্তা জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার প্রতি কি তার কোন অনুগ্রহ রয়েছে, যার বিনিময় দেওয়ার জন্য তুমি যাচ্ছ?' সে বলল, 'না, আমি তার নিকট কেবলমাত্র এই জন্য যাচ্ছি যে, আমি তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসি।' ফিরিস্তা বললেন, '(তাহলে শোনো) আমি তোমার নিকট আল্লাহর দূত হিসাবে (এ কথা জানাবার জন্য) এসেছি যে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে ভালবাসেন; যেমন তুমি তাকে আল্লাহর জন্য ভালবাস।”৫২১
এমন ভালোবাসার ফলে আপোসের যিয়ারত-যাত্রায় ফিরিশতার দুআ লাভ হয়। এমন বন্ধুত্বের সাক্ষাৎ হল সুখময়, এমন ভ্রাতৃত্বের পরিণামে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে চলার পথ হল বেহেস্তের পথ। মহানবী বলেছেন,
مَنْ عَادَ مَرِيضاً أَوْ زَارَ أخاً لَهُ فِي اللهِ ، نَادَاهُ مُنَادٍ : بِأَنْ طِبْتَ ، وَطَابَ مَمْشَاكَ ، وَتَبَوَّأْتَ مِنَ الْجَنَّةِ مَنْزِلاً
"যে ব্যক্তি কোন রোগীকে সাক্ষাৎ করে জিজ্ঞাসাবাদ করে অথবা তার কোন লিল্লাহী ভাইকে সাক্ষাৎ করে, সে ব্যক্তিকে এক (গায়বী) আহবানকারী আহবান ক'রে বলে, 'সুখী হও তুমি, সুখকর হোক তোমার ঐ যাত্রা (সাক্ষাতের জন্য যাওয়া)। আর তোমার স্থান হোক জান্নাতের প্রাসাদে।"৫২২
এরই বিপরীত প্রবাহে ভেবে দেখতে পারেন দুশ্চরিত্র যুবক-যুবতী প্রেমিক-প্রেমিকাদের কথা, যাদের ভালোবাসা আল্লাহর ওয়াস্তে নয়। যাদের ভালোবাসা হয় বিপরীতমুখী, যুবক-যুবতীর মাঝে অবৈধ ভালোবাসা, যৌবনের উন্মাদনা, রূপমুগ্ধতা অথবা অর্থলোভ তাদের ভালোবাসার কারণ হয়। তারা অবৈধভাবে মেলামিশা করে, লুকোচুরি ক'রে দেখা-সাক্ষাৎ করে অথবা নির্লজ্জ হয়ে প্রকাশ্যে কোন পার্ক, বনভূমি বা সমুদ্র-সৈকতে মিলিত হয়। তারা চায় তাদের চরিত্র যাক, কিন্তু ভালোবাসা অনির্বান হোক। তাদের ভালোবাসা হয় নিজেদের মনের খেয়ালখুশীকে বিজয়মাল্য দান করার জন্য। সুতরাং ধিক্ তাদেরকে শত ধিক্!
টিকাঃ
৫১২. মুসলিম ২০০
৫১৩. আহমাদ, হাকেম ৩, ৭৩১২, সহীহুল জামে' ৫৯৫৮
৫১৪. বুখারী ১৬, মুসলিম ১৭৪
৫১৫. সূরা ইউনুস ৬২-৬৪ আয়াত, আবু দাউদ ৩৫২৯
৫১৬. তিরমিযী ২৩৯০. আহমাদ ২২০৮০
৫১৭. বুখারী ৬৬০, মুসলিম ২৪২৭
৫১৮. মুসলিম ৬৭১৩
৫১৯. আহমাদ ২২০৩০, মুঅত্তা ১৭৭৯, ত্বাবারানী, হাকেম, সহীহুল জামে' ৪৩৩১
৫২০. আবু দাউদ ৫১২৭
৫২১. মুসলিম ৬৭১৪
৫২২. তিরমিযী ২০০৮