📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 প্রতিশ্রুতি পালন

📄 প্রতিশ্রুতি পালন


মহান আল্লাহকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করা মানুষের চরিত্রগত একটি মহৎ গুণ, বরং সব চাইতে বড় সচ্চরিত্রতা। যেহেতু তা সব চাইতে মহান সত্ত্বার সাথে প্রতিশ্রুতি, অঙ্গীকার ও চুক্তি। কুরআন কারীমের বিভিন্ন জায়গায় তার তাকীদ এসেছে। যেমন যারা সে প্রতিশ্রুতি পালন করে, তিনি তাদের প্রশংসা ক'রে বলেছেন,
أَفَمَن يَعْلَمُ أَنَّمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَبِّكَ الْحَقُّ كَمَنْ هُوَ أَعْمَى إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُوا الأَلْبَابِ - الَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَلَا يَنقُضُونَ الْمِيثَاقَ
"তোমার প্রতিপালক হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা যে ব্যক্তি সত্য বলে জানে সে আর অন্ধ কি সমান? কেবলমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই উপদেশ গ্রহণ ক'রে থাকে। যারা আল্লাহকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং চুক্তি ভঙ্গ করে না।”৪৫৩
যারা মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না, তাদের নিন্দা ক'রে তিনি বলেছেন,
وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَاسِقِينَ - الَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ
"বস্তুতঃ তিনি সৎপথ পরিত্যাগীদের ছাড়া আর কাউকেও তার দ্বারা বিভ্রান্ত করেন না। যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।”৪৫৪
যারা মহান আল্লাহর অঙ্গীকার পালন করে না, তারা অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য পরকালে রয়েছে মন্দ আবাস। তিনি বলেছেন,
وَالَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللهُ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهِ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُوْلَئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ
"যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য আছে অভিসম্পাত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস। ৪৫৫
তুচ্ছ কোন পার্থিব স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে তিনি নিষেধ করেছেন,
وَلَا تَشْتَرُوا بِعَهْدِ اللهِ ثَمَنًا قَلِيلاً إِنَّمَا عِنْدَ اللهِ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
“তোমরা আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করো না। আল্লাহর কাছে তা উত্তম; যদি তোমরা জানতে।”৪৫৬
এরূপ যারা করে, তাদের নেহাতই মন্দ পরিণামের কথা উল্লেখ ক'রে তিনি বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلاً أُوْلَئِكَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ وَلَا يَنظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
“যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে স্বল্প মূল্যে বিক্রয় করে, পরকালে তাদের কোন অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, আর তাদের দিকে চেয়ে দেখবেন না এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।”৪৫৭
মহান আল্লাহকে দেওয়া মানুষের সে প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার কী?
সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার পালন হল, তাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন করা এবং তার তাওহীদকে প্রতিষ্ঠা করা।
আর সে অঙ্গীকার ভঙ্গ করা বা বিক্রয় করার অর্থ হল, তাঁকে অবিশ্বাস করা অথবা তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করা।
মহান প্রতিপালক যুগে যুগে নবী-রসূল (আলাইহিমুস সালাম) গণের মাধ্যমে মানুষের নিকট তাঁর যে নির্দেশ পাঠিয়েছেন, তা পালন করা হল তাঁর অঙ্গীকার পালন করা। আর তাঁর আদেশ ও নিষেধ লংঘন করার মানে হল, তাঁর অঙ্গীকার ভঙ্গ করা।
মানুষের হয়তো মনে নেই, সে কিন্তু মহান আল্লাহর কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নবীগণ এসে সে কথা স্মরণ করিয়েছেন এবং বলেছেন,
وَأَوْفُوا بِعَهْدِي أُوفِ بِعَهْدِكُمْ وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ
“আমার সঙ্গে তোমাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ কর, আমিও তোমাদের সঙ্গে আমার কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করব। আর তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।”৪৫৮
মানুষের হয়তো বিস্মৃত হয়েছে সে মহা অঙ্গীকার। কিন্তু মহান আল্লাহ তা স্মরণ করিয়ে বলেছেন,
وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِن بَنِي آدَمَ مِن ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا أَن تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِينَ
“স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ হতে তাদের সন্তান-সন্ততি বাহির করেন এবং তাদের নিজেদের সম্বন্ধে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলে, ‘নিশ্চয়ই। আমরা সাক্ষী রইলাম।’ (এ স্বীকৃতি গ্রহণ) এ জন্য যে, তোমরা যেন কিয়ামতের দিন না বল, ‘আমরা তো এ বিষয়ে জানতাম না।’ ”৪৫৯
হাদীসে এসেছে, আরাফার দিনে নু'মান নামক জায়গায় মহান আল্লাহ আদম-সন্তান হতে অঙ্গীকার নিয়েছেন। সেদিন তিনি আদম আলাইহিস সালাম -এর সকল সন্তানকে তার পৃষ্ঠদেশ হতে বের করলেন এবং তাদেরকে নিজের সামনে (পিঁপড়ের আকারে) ছড়িয়ে দিলেন ও তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমি কি তোমাদের রব (প্রতিপালক) নই।’ সকলে বলেছিল, بَلَى شَهِدْنَا অবশ্যই, আমরা সকলেই আপনার রব হওয়ার সাক্ষ্য দিচ্ছি। ৪৬০
মানুষ বিস্মৃত হলেও আল্লাহর রব হওয়ার সাক্ষ্য প্রত্যেক মানুষের প্রকৃতিতে সন্নিবিষ্ট আছে। এই ভাবার্থকেই আল্লাহর রসূল ﷺ এইভাবে বর্ণনা করেছেন, “প্রতিটি শিশু (ইসলামী ধর্মবোধের) প্রকৃতি নিয়ে জন্ম নেয়। পরে তার মাতা-পিতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজক বানিয়ে নেয়। যেমন জন্তুর বাচ্চা সম্পূর্ণ জন্ম হয়, তার নাক ও কান কাটা থাকে না। ”৪৬১
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন, 'আমি আমার বান্দাদেরকে একনিষ্ঠ (একমাত্র ইসলামের প্রতি অনুগত) রূপে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর শয়তান তাদেরকে ইসলামী প্রকৃতি হতে পথভ্রষ্ট ক'রে দেয়। '৪৬২
এই প্রকৃতিই আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর অবতীর্ণকৃত শরীয়ত। যা এখন ইসলাম নামে সংরক্ষিত। ৪৬৩
বলা বাহুল্য, যে ইসলাম প্রত্যখ্যান করে, সে আসলে মহান সৃষ্টিকর্তার সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে। মহান আল্লাহর আরও একটি ব্যাপক নির্দেশ হল,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা অঙ্গীকার (ও চুক্তিসমূহ) পূর্ণ কর।"৪৬৪
যায়দ বিন আসলাম বলেছেন, 'তা ছয় প্রকারঃ (১) আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার, (২) মৈত্রী-চুক্তি, (৩) শরীকানার চুক্তি, (৪) ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি, (৫) বিবাহ-বন্ধন এবং (৬) আল্লাহর নামে কৃত শপথ বা কসমের অঙ্গীকার।'
উক্ত ৬ প্রকার চুক্তি বা অঙ্গীকার পালন করা আবশ্যক। যেমন মহান আল্লাহর নামে নযর মানাও এক প্রকার অঙ্গীকার। আর তাও পালন করা ওয়াজেব। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাগণের গুণ বর্ণনায় বলেছেন,
يُوفُونَ بِالنَّذْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ شَرُّهُ مُسْتَطِيرًا
"তারা মানত পূর্ণ করে এবং সেদিনের ভয় করে, যেদিনের বিপত্তি হবে ব্যাপক।"৪৬৫
তিনি আরো বলেছেন,
وَأَوْفُوا بِعَهْدِ اللهِ إِذَا عَاهَدتُّمْ وَلَا تَنقُضُوا الأَيْمَانَ بَعْدَ تَوْكِيدِهَا وَقَدْ جَعَلْتُمُ اللهَ عَلَيْكُمْ كَفِيلاً إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ
"তোমরা যখন পরস্পর অঙ্গীকার কর তখন আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করো এবং আল্লাহকে তোমাদের যামিন ক'রে শপথ দৃঢ় করবার পর তোমরা তা ভঙ্গ করো না; তোমরা যা কর, অবশ্যই আল্লাহ তা জানেন।"৪৬৬
রাষ্ট্রনেতাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করাও জরুরী। জিহাদ ও আনুগত্যের যে বায়আত করা হয়, তা ভঙ্গ না করা মুসলিমের কর্তব্য। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللهَ يَدُ اللهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ فَمَن نَّكَثَ فَإِنَّمَا يَنكُثُ عَلَى نَفْسِهِ وَمَنْ أَوْفَى بِمَا عَاهَدَ عَلَيْهِ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
"নিশ্চয় যারা তোমার বায়আত গ্রহণ করে, তারা তো আল্লাহরই বায়আত গ্রহণ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর। সুতরাং যে তা ভঙ্গ করে, তা ভঙ্গ করবার পরিণাম তাকেই ভোগ করতে হবে এবং যে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার পূর্ণ করে, তিনি তাকে মহা পুরস্কার দেন।” ৪৬৭
নিশ্চয়ই সেনাপতির মাধ্যমে তাঁর অঙ্গীকার পালন না করলে তিনি কিয়ামতে ঐ ভঙ্গকারীকে প্রশ্ন করবেন। তিনি বলেছেন,
وَلَقَدْ كَانُوا عَاهَدُوا اللهَ مِن قَبْلُ لَا يُوَلُّونَ الْأَدْبَارَ وَكَانَ عَهْدُ اللَّهِ مَسْؤُولًا
"তারা তো পূর্বেই আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। তাদেরকে আল্লাহর সাথে কৃত এ অঙ্গীকার সম্বন্ধে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে। ৪৬৮
আল্লাহর রসূল বলেছেন,
ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَومَ القِيَامَةِ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ ، وَلَا يُزَكِّيهِمْ ، وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ: (منهم) رَجُلٌ بَايَعَ إِمَاماً لاَ يُبَايِعُهُ إِلَّا لِدُنْيَا فَإِنْ أَعْطَاهُ مِنْهَا وَفَى وَإِنْ لَمْ يُعْطِهِ مِنْهَا لَمْ يَفِ
"তিন শ্রেণীর মানুষের সাথে কিয়ামতের দিনে আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের দিকে (দয়ার দৃষ্টিতে) তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্রও করবেন না এবং তাদের জন্য হবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (তাদের মধ্যে একজন হল,) যে কেবলমাত্র পার্থিব স্বার্থে রাষ্ট্রনেতার হাতে বায়আত করে। সুতরাং সে যদি তাকে পার্থিব সম্পদ প্রদান করে, তাহলে সে (তার বায়আত) পূর্ণ করে। আর যদি প্রদান না করে, তাহলে বায়আত পূর্ণ করে না।"৪৬৯
রাষ্ট্রনেতার হাতে কৃত বায়আত ভঙ্গ করা যাবে না। সাধ্যমতো তার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। মহানবী এর নির্দেশ হল,
وَمَنْ بَايَعَ إِمَامًا فَأَعْطَاهُ صَفْقَةَ يَدِهِ وَثَمَرَةَ قَلْبِهِ فَلْيُطِعْهُ إِنِ اسْتَطَاعَ فَإِنْ جَاءَ آخَرُ يُنَازِعُهُ فَاضْرِبُوا عُنُقَ الْآخَرِ
"যে ব্যক্তি কোন রাষ্ট্রনায়কের হাতে বায়আত করল এবং এতে তাকে নিজ প্রতিশ্রুতি ও অন্তস্তল থেকে অঙ্গীকার প্রদান করল তার উচিত, যথাসাধ্য তার (সেই নায়কের সৎবিষয়ে) আনুগত্য করা। এরপর যদি অন্য এক (নায়ক) তার ক্ষমতা দখল করতে চায়, তাহলে ঐ দ্বিতীয় নায়কের গর্দান উড়িয়ে দাও।"৪৭০
চরিত্রবান মুসলিমকে রক্ষা করতে হবে মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْؤُولاً
"সাবালক না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্যে ছাড়া এতীমের সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না। আর প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।"৪৭১
মহানবী বলেছেন,
اضْمَنُوا لِي سِرًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنْ لَكُمُ الْجَنَّةَ : اصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ وَأَوْفُوا إِذَا وَعَدْتُمْ وَأَدُّوا إِذَا اؤْتُمِنْتُمْ وَاحْفَظُوا فُرُوجَكُمْ وَغُضُّوا أَبْصَارَكُمْ وَكُفُّوا أَيْدِيَكُمْ
"তোমরা নিজেদের তরফ থেকে আমার জন্য ছয়টি জিনিসের যামিন হয়ে যাও, আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের যামিন হয়ে যাব; কথা বললে সত্য কথা বল, ওয়াদা করলে পূরণ কর, তোমাদের নিকট আমানত রাখা হলে তা আদায় কর, লজ্জাস্থানের হিফাযত কর, চক্ষু অবনত কর এবং হাতকে সংযত রাখ।"৪৭২
চরিত্রবানের কাজ ওয়াদার খিলাপ না করা। আসলে কথা দিয়ে কথা না রাখার এ কদর্য আচরণ মুনাফিকের। কোন মুসলিমের মধ্যে থাকলে তা মুনাফিকের লক্ষণ হিসাবে থাকবে। মহানবী বলেছেন,
آيَةُ المُنَافِقِ ثَلَاثُ : إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ زَادَ فِي رِوَايَةٍ لمسلم : وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ
আবূ হুরাইরা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "মুনাফিকের চিহ্ন হল তিনটি (১) কথা বললে মিথ্যা বলে। (২) ওয়াদা করলে তা খেলাপ করে। এবং (৩) আমানত রাখা হলে তাতে খিয়ানত করে।"৪৭৩
মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, "যদিও সে সিয়াম রাখে এবং স্বলাত পড়ে ও ধারণা করে যে, সে মুসলিম।"
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقاً خَالِصاً ، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَها : إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ
"চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকবে সে খাঁটি মুনাফিক্ব গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তির মাঝে তার মধ্য হতে একটি স্বভাব থাকবে, তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকদের একটি স্বভাব থেকে যাবে। (সে স্বভাবগুলি হল,) ১। তার কাছে আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে। ২। কথা বললে মিথ্যা বলে। ৩। ওয়াদাহ করলে তা ভঙ্গ করে এবং ৪। ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল ভাষা বলে।"৪৭৪
শেষ বিচারের দিন চুক্তি ভঙ্গকারীর প্রতিবাদী খোদ মহান আল্লাহ। মহানবী বলেছেন,
قَالَ الله تَعَالَى: ثَلَاثَةٌ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ القِيَامَةِ : رَجُلٌ أَعْطَى بِي ثُمَّ غَدَرَ، وَرَجُلٌ بَاعَ حُرَّاً فَأَكَلَ ثَمَنَهُ، وَرَجُلٌ اسْتَأْجَرَ أَجِيراً، فَاسْتَوْفَى مِنْهُ، وَلَمْ يُعْطِهِ أَجْرَهُ
"মহান আল্লাহ বলেছেন, তিন প্রকার লোক এমন আছে, কিয়ামতের দিন যাদের প্রতিবাদী স্বয়ং আমি; (১) সে ব্যক্তি, যে আমার নামে অঙ্গীকারাবদ্ধ হল, পরে তা ভঙ্গ করল। (২) সে ব্যক্তি, যে স্বাধীন মানুষকে (প্রতারণা দিয়ে) বিক্রি ক'রে তার মূল্য ভক্ষণ করল। (৩) সে ব্যক্তি, যে কোন মজুরকে খাটিয়ে তার নিকট থেকে পুরাপুরি কাজ নিল, কিন্তু তার মজুরী দিল না।"৪৭৫
আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূলুল্লাহ স্বলাতের শেষ বৈঠকে সালাম ফিরার পূর্বে বিভিন্ন প্রার্থনা করার সময় ঋণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনাও করতেন। এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি তো ঋণ থেকে খুব বেশী আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকেন। (তার কারণ কী?) প্রত্যুত্তরে মহানবী বললেন,
إِنَّ الرَّجُلَ إِذَا غَرِمَ حَدَّثَ فَكَذَبَ وَوَعَدَ فَأَخْلَفَ
"কারণ, মানুষ যখন ঋণগ্রস্ত হয়, তখন কথা বললে মিথ্যা বলে এবং অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে (ওয়াদা-খেলাফী করে)। "৪৭৬
বলা বাহুল্য, এমন কাজেও জড়িত হওয়া উচিত নয় চরিত্রবানের, যে কাজে সে ওয়াদা ঠিক রাখতে পারবে না।
কুরআন কারীমে নবী ইসমাঈল প্রতিশ্রুতি পালনকারী রূপে প্রসিদ্ধ আছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَّبِيًّا
"এই কিতাবে (উল্লিখিত) ইসমাঈলের কথা বর্ণনা কর, সে ছিল একজন প্রতিশ্রুতি পালনকারী এবং সে ছিল রসূল, নবী।"৪৭৭
যেহেতু তিনি তাঁকে যবেহ করার ব্যাপারে ধৈর্যধারণের যে প্রতিশ্রুতি পিতাকে দিয়েছিলেন, তা পালন করেছিলেন। আরো বলা হয় যে, একজনের সাথে কোন জায়গায় সাক্ষাৎ করার ওয়াদা করলে সে ভুলে যায়। কিন্তু তিনি তার জন্য পুরো দিন অপেক্ষা করেছিলেন।
আর বাস্তব কথা এই যে, ধোঁকাবাজির এই দুনিয়ায় প্রতারকের সংসর্গে সংসার করা বড় কঠিন। বিশেষ ক'রে আপনজন যদি কথা দিয়ে কথা না রাখে, তাহলে তার আঘাত সহ্য করার মতো ক্ষমতা থাকে না মানুষের।
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন,
سلام على الدنيا إذا لم يكن بها + صديق صدوق صادق الوعد منصفا
অর্থাৎ, দুনিয়াকে সালাম জানাও (বিদায় দাও), যদি না তথায় কোন সত্যবাদী, ওয়াদা পালনকারী (বিশ্বস্ত) ও ন্যায়পরায়ণ বন্ধু থাকে।

টিকাঃ
৪৫৩. রা'দ: ১৯-২০
৪৫৪. সূরা বাক্বারাহ-২: ২৭
৪৫৫. রা'দ: ২৫
৪৫৬. সূরা নাহল: ৯৫
৪৫৭. আলে ইমরান-৩: ৭৭
৪৫৮. সূরা বাক্বারাহ-২: ৪০
৪৫৯. আ'রাফ: ১৭২
৪৬০. মুসনাদে আহমাদ, হাকেম ২/৫৪8, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৬২৩
৪৬১. বুখারী ১৩৫৮, মুসলিম ৬৯২৬
৪৬২. মুসলিম ৭৩৮৬
৪৬৩. আহসানুল বায়ান
৪৬৪. সূরা মায়িদাহ: ১
৪৬৫. সূরা দাহর: ৭
৪৬৬. সূরা নাহল: ৯১
৪৬৭. সূরা ফাতহ: ১০
৪৬৮. সূরা আহযাব: ১৫
৪৬৯. বুখারী ৭২১২, মুসলিম ৩১০
৪৭০. মুসলিম ৪৮৮২নং প্রমুখ
৪৭১. সূরা বানী ইস্রাঈল: ৩৪
৪৭২. আহমাদ ২২৭৫৭, হাকেম, সহীহুল জামে' ১৮৯৮
৪৭৩. বুখারী ৩৩, মুসলিম ২২০-২২২
৪৭৪. বুখারী ৩৪, ২৪৫৯, মুসলিম ২১৯
৪৭৫. বুখারী ২২২৭, ২২৭০
৪৭৬. বুখারী ৮৩২, মুসলিম ৫৮৯
৪৭৭. মারয়‍্যাম: ৫৪

মহান আল্লাহকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করা মানুষের চরিত্রগত একটি মহৎ গুণ, বরং সব চাইতে বড় সচ্চরিত্রতা। যেহেতু তা সব চাইতে মহান সত্ত্বার সাথে প্রতিশ্রুতি, অঙ্গীকার ও চুক্তি। কুরআন কারীমের বিভিন্ন জায়গায় তার তাকীদ এসেছে। যেমন যারা সে প্রতিশ্রুতি পালন করে, তিনি তাদের প্রশংসা ক'রে বলেছেন,
أَفَمَن يَعْلَمُ أَنَّمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَبِّكَ الْحَقُّ كَمَنْ هُوَ أَعْمَى إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُوا الأَلْبَابِ - الَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَلَا يَنقُضُونَ الْمِيثَاقَ
"তোমার প্রতিপালক হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা যে ব্যক্তি সত্য বলে জানে সে আর অন্ধ কি সমান? কেবলমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই উপদেশ গ্রহণ ক'রে থাকে। যারা আল্লাহকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং চুক্তি ভঙ্গ করে না।”৪৫৩
যারা মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না, তাদের নিন্দা ক'রে তিনি বলেছেন,
وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَاسِقِينَ - الَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ
"বস্তুতঃ তিনি সৎপথ পরিত্যাগীদের ছাড়া আর কাউকেও তার দ্বারা বিভ্রান্ত করেন না। যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।”৪৫৪
যারা মহান আল্লাহর অঙ্গীকার পালন করে না, তারা অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য পরকালে রয়েছে মন্দ আবাস। তিনি বলেছেন,
وَالَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللهُ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهِ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُوْلَئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ
"যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য আছে অভিসম্পাত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস। ৪৫৫
তুচ্ছ কোন পার্থিব স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে তিনি নিষেধ করেছেন,
وَلَا تَشْتَرُوا بِعَهْدِ اللهِ ثَمَنًا قَلِيلاً إِنَّمَا عِنْدَ اللهِ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
“তোমরা আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করো না। আল্লাহর কাছে তা উত্তম; যদি তোমরা জানতে।”৪৫৬
এরূপ যারা করে, তাদের নেহাতই মন্দ পরিণামের কথা উল্লেখ ক'রে তিনি বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلاً أُوْلَئِكَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ وَلَا يَنظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
“যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে স্বল্প মূল্যে বিক্রয় করে, পরকালে তাদের কোন অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, আর তাদের দিকে চেয়ে দেখবেন না এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।”৪৫৭
মহান আল্লাহকে দেওয়া মানুষের সে প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার কী?
সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার পালন হল, তাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন করা এবং তার তাওহীদকে প্রতিষ্ঠা করা।
আর সে অঙ্গীকার ভঙ্গ করা বা বিক্রয় করার অর্থ হল, তাঁকে অবিশ্বাস করা অথবা তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করা।
মহান প্রতিপালক যুগে যুগে নবী-রসূল (আলাইহিমুস সালাম) গণের মাধ্যমে মানুষের নিকট তাঁর যে নির্দেশ পাঠিয়েছেন, তা পালন করা হল তাঁর অঙ্গীকার পালন করা। আর তাঁর আদেশ ও নিষেধ লংঘন করার মানে হল, তাঁর অঙ্গীকার ভঙ্গ করা।
মানুষের হয়তো মনে নেই, সে কিন্তু মহান আল্লাহর কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নবীগণ এসে সে কথা স্মরণ করিয়েছেন এবং বলেছেন,
وَأَوْفُوا بِعَهْدِي أُوفِ بِعَهْدِكُمْ وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ
“আমার সঙ্গে তোমাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ কর, আমিও তোমাদের সঙ্গে আমার কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করব। আর তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।”৪৫৮
মানুষের হয়তো বিস্মৃত হয়েছে সে মহা অঙ্গীকার। কিন্তু মহান আল্লাহ তা স্মরণ করিয়ে বলেছেন,
وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِن بَنِي آدَمَ مِن ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا أَن تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِينَ
“স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ হতে তাদের সন্তান-সন্ততি বাহির করেন এবং তাদের নিজেদের সম্বন্ধে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলে, ‘নিশ্চয়ই। আমরা সাক্ষী রইলাম।’ (এ স্বীকৃতি গ্রহণ) এ জন্য যে, তোমরা যেন কিয়ামতের দিন না বল, ‘আমরা তো এ বিষয়ে জানতাম না।’ ”৪৫৯
হাদীসে এসেছে, আরাফার দিনে নু'মান নামক জায়গায় মহান আল্লাহ আদম-সন্তান হতে অঙ্গীকার নিয়েছেন। সেদিন তিনি আদম আলাইহিস সালাম -এর সকল সন্তানকে তার পৃষ্ঠদেশ হতে বের করলেন এবং তাদেরকে নিজের সামনে (পিঁপড়ের আকারে) ছড়িয়ে দিলেন ও তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমি কি তোমাদের রব (প্রতিপালক) নই।’ সকলে বলেছিল, بَلَى شَهِدْنَا অবশ্যই, আমরা সকলেই আপনার রব হওয়ার সাক্ষ্য দিচ্ছি। ৪৬০
মানুষ বিস্মৃত হলেও আল্লাহর রব হওয়ার সাক্ষ্য প্রত্যেক মানুষের প্রকৃতিতে সন্নিবিষ্ট আছে। এই ভাবার্থকেই আল্লাহর রসূল ﷺ এইভাবে বর্ণনা করেছেন, “প্রতিটি শিশু (ইসলামী ধর্মবোধের) প্রকৃতি নিয়ে জন্ম নেয়। পরে তার মাতা-পিতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজক বানিয়ে নেয়। যেমন জন্তুর বাচ্চা সম্পূর্ণ জন্ম হয়, তার নাক ও কান কাটা থাকে না। ”৪৬১
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন, 'আমি আমার বান্দাদেরকে একনিষ্ঠ (একমাত্র ইসলামের প্রতি অনুগত) রূপে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর শয়তান তাদেরকে ইসলামী প্রকৃতি হতে পথভ্রষ্ট ক'রে দেয়। '৪৬২
এই প্রকৃতিই আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর অবতীর্ণকৃত শরীয়ত। যা এখন ইসলাম নামে সংরক্ষিত। ৪৬৩
বলা বাহুল্য, যে ইসলাম প্রত্যখ্যান করে, সে আসলে মহান সৃষ্টিকর্তার সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে। মহান আল্লাহর আরও একটি ব্যাপক নির্দেশ হল,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা অঙ্গীকার (ও চুক্তিসমূহ) পূর্ণ কর।"৪৬৪
যায়দ বিন আসলাম বলেছেন, 'তা ছয় প্রকারঃ (১) আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার, (২) মৈত্রী-চুক্তি, (৩) শরীকানার চুক্তি, (৪) ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি, (৫) বিবাহ-বন্ধন এবং (৬) আল্লাহর নামে কৃত শপথ বা কসমের অঙ্গীকার।'
উক্ত ৬ প্রকার চুক্তি বা অঙ্গীকার পালন করা আবশ্যক। যেমন মহান আল্লাহর নামে নযর মানাও এক প্রকার অঙ্গীকার। আর তাও পালন করা ওয়াজেব। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাগণের গুণ বর্ণনায় বলেছেন,
يُوفُونَ بِالنَّذْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ شَرُّهُ مُسْتَطِيرًا
"তারা মানত পূর্ণ করে এবং সেদিনের ভয় করে, যেদিনের বিপত্তি হবে ব্যাপক।"৪৬৫
তিনি আরো বলেছেন,
وَأَوْفُوا بِعَهْدِ اللهِ إِذَا عَاهَدتُّمْ وَلَا تَنقُضُوا الأَيْمَانَ بَعْدَ تَوْكِيدِهَا وَقَدْ جَعَلْتُمُ اللهَ عَلَيْكُمْ كَفِيلاً إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ
"তোমরা যখন পরস্পর অঙ্গীকার কর তখন আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করো এবং আল্লাহকে তোমাদের যামিন ক'রে শপথ দৃঢ় করবার পর তোমরা তা ভঙ্গ করো না; তোমরা যা কর, অবশ্যই আল্লাহ তা জানেন।"৪৬৬
রাষ্ট্রনেতাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করাও জরুরী। জিহাদ ও আনুগত্যের যে বায়আত করা হয়, তা ভঙ্গ না করা মুসলিমের কর্তব্য। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللهَ يَدُ اللهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ فَمَن نَّكَثَ فَإِنَّمَا يَنكُثُ عَلَى نَفْسِهِ وَمَنْ أَوْفَى بِمَا عَاهَدَ عَلَيْهِ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
"নিশ্চয় যারা তোমার বায়আত গ্রহণ করে, তারা তো আল্লাহরই বায়আত গ্রহণ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর। সুতরাং যে তা ভঙ্গ করে, তা ভঙ্গ করবার পরিণাম তাকেই ভোগ করতে হবে এবং যে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার পূর্ণ করে, তিনি তাকে মহা পুরস্কার দেন।” ৪৬৭
নিশ্চয়ই সেনাপতির মাধ্যমে তাঁর অঙ্গীকার পালন না করলে তিনি কিয়ামতে ঐ ভঙ্গকারীকে প্রশ্ন করবেন। তিনি বলেছেন,
وَلَقَدْ كَانُوا عَاهَدُوا اللهَ مِن قَبْلُ لَا يُوَلُّونَ الْأَدْبَارَ وَكَانَ عَهْدُ اللَّهِ مَسْؤُولًا
"তারা তো পূর্বেই আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। তাদেরকে আল্লাহর সাথে কৃত এ অঙ্গীকার সম্বন্ধে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে। ৪৬৮
আল্লাহর রসূল বলেছেন,
ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَومَ القِيَامَةِ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ ، وَلَا يُزَكِّيهِمْ ، وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ: (منهم) رَجُلٌ بَايَعَ إِمَاماً لاَ يُبَايِعُهُ إِلَّا لِدُنْيَا فَإِنْ أَعْطَاهُ مِنْهَا وَفَى وَإِنْ لَمْ يُعْطِهِ مِنْهَا لَمْ يَفِ
"তিন শ্রেণীর মানুষের সাথে কিয়ামতের দিনে আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের দিকে (দয়ার দৃষ্টিতে) তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্রও করবেন না এবং তাদের জন্য হবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (তাদের মধ্যে একজন হল,) যে কেবলমাত্র পার্থিব স্বার্থে রাষ্ট্রনেতার হাতে বায়আত করে। সুতরাং সে যদি তাকে পার্থিব সম্পদ প্রদান করে, তাহলে সে (তার বায়আত) পূর্ণ করে। আর যদি প্রদান না করে, তাহলে বায়আত পূর্ণ করে না।"৪৬৯
রাষ্ট্রনেতার হাতে কৃত বায়আত ভঙ্গ করা যাবে না। সাধ্যমতো তার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। মহানবী এর নির্দেশ হল,
وَمَنْ بَايَعَ إِمَامًا فَأَعْطَاهُ صَفْقَةَ يَدِهِ وَثَمَرَةَ قَلْبِهِ فَلْيُطِعْهُ إِنِ اسْتَطَاعَ فَإِنْ جَاءَ آخَرُ يُنَازِعُهُ فَاضْرِبُوا عُنُقَ الْآخَرِ
"যে ব্যক্তি কোন রাষ্ট্রনায়কের হাতে বায়আত করল এবং এতে তাকে নিজ প্রতিশ্রুতি ও অন্তস্তল থেকে অঙ্গীকার প্রদান করল তার উচিত, যথাসাধ্য তার (সেই নায়কের সৎবিষয়ে) আনুগত্য করা। এরপর যদি অন্য এক (নায়ক) তার ক্ষমতা দখল করতে চায়, তাহলে ঐ দ্বিতীয় নায়কের গর্দান উড়িয়ে দাও।"৪৭০
চরিত্রবান মুসলিমকে রক্ষা করতে হবে মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْؤُولاً
"সাবালক না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্যে ছাড়া এতীমের সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না। আর প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।"৪৭১
মহানবী বলেছেন,
اضْمَنُوا لِي سِرًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنْ لَكُمُ الْجَنَّةَ : اصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ وَأَوْفُوا إِذَا وَعَدْتُمْ وَأَدُّوا إِذَا اؤْتُمِنْتُمْ وَاحْفَظُوا فُرُوجَكُمْ وَغُضُّوا أَبْصَارَكُمْ وَكُفُّوا أَيْدِيَكُمْ
"তোমরা নিজেদের তরফ থেকে আমার জন্য ছয়টি জিনিসের যামিন হয়ে যাও, আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের যামিন হয়ে যাব; কথা বললে সত্য কথা বল, ওয়াদা করলে পূরণ কর, তোমাদের নিকট আমানত রাখা হলে তা আদায় কর, লজ্জাস্থানের হিফাযত কর, চক্ষু অবনত কর এবং হাতকে সংযত রাখ।"৪৭২
চরিত্রবানের কাজ ওয়াদার খিলাপ না করা। আসলে কথা দিয়ে কথা না রাখার এ কদর্য আচরণ মুনাফিকের। কোন মুসলিমের মধ্যে থাকলে তা মুনাফিকের লক্ষণ হিসাবে থাকবে। মহানবী বলেছেন,
آيَةُ المُنَافِقِ ثَلَاثُ : إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ زَادَ فِي رِوَايَةٍ لمسلم : وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ
আবূ হুরাইরা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "মুনাফিকের চিহ্ন হল তিনটি (১) কথা বললে মিথ্যা বলে। (২) ওয়াদা করলে তা খেলাপ করে। এবং (৩) আমানত রাখা হলে তাতে খিয়ানত করে।"৪৭৩
মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, "যদিও সে সিয়াম রাখে এবং স্বলাত পড়ে ও ধারণা করে যে, সে মুসলিম।"
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقاً خَالِصاً ، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَها : إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ
"চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকবে সে খাঁটি মুনাফিক্ব গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তির মাঝে তার মধ্য হতে একটি স্বভাব থাকবে, তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকদের একটি স্বভাব থেকে যাবে। (সে স্বভাবগুলি হল,) ১। তার কাছে আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে। ২। কথা বললে মিথ্যা বলে। ৩। ওয়াদাহ করলে তা ভঙ্গ করে এবং ৪। ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল ভাষা বলে।"৪৭৪
শেষ বিচারের দিন চুক্তি ভঙ্গকারীর প্রতিবাদী খোদ মহান আল্লাহ। মহানবী বলেছেন,
قَالَ الله تَعَالَى: ثَلَاثَةٌ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ القِيَامَةِ : رَجُلٌ أَعْطَى بِي ثُمَّ غَدَرَ، وَرَجُلٌ بَاعَ حُرَّاً فَأَكَلَ ثَمَنَهُ، وَرَجُلٌ اسْتَأْجَرَ أَجِيراً، فَاسْتَوْفَى مِنْهُ، وَلَمْ يُعْطِهِ أَجْرَهُ
"মহান আল্লাহ বলেছেন, তিন প্রকার লোক এমন আছে, কিয়ামতের দিন যাদের প্রতিবাদী স্বয়ং আমি; (১) সে ব্যক্তি, যে আমার নামে অঙ্গীকারাবদ্ধ হল, পরে তা ভঙ্গ করল। (২) সে ব্যক্তি, যে স্বাধীন মানুষকে (প্রতারণা দিয়ে) বিক্রি ক'রে তার মূল্য ভক্ষণ করল। (৩) সে ব্যক্তি, যে কোন মজুরকে খাটিয়ে তার নিকট থেকে পুরাপুরি কাজ নিল, কিন্তু তার মজুরী দিল না।"৪৭৫
আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূলুল্লাহ স্বলাতের শেষ বৈঠকে সালাম ফিরার পূর্বে বিভিন্ন প্রার্থনা করার সময় ঋণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনাও করতেন। এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি তো ঋণ থেকে খুব বেশী আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকেন। (তার কারণ কী?) প্রত্যুত্তরে মহানবী বললেন,
إِنَّ الرَّجُلَ إِذَا غَرِمَ حَدَّثَ فَكَذَبَ وَوَعَدَ فَأَخْلَفَ
"কারণ, মানুষ যখন ঋণগ্রস্ত হয়, তখন কথা বললে মিথ্যা বলে এবং অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে (ওয়াদা-খেলাফী করে)। "৪৭৬
বলা বাহুল্য, এমন কাজেও জড়িত হওয়া উচিত নয় চরিত্রবানের, যে কাজে সে ওয়াদা ঠিক রাখতে পারবে না।
কুরআন কারীমে নবী ইসমাঈল প্রতিশ্রুতি পালনকারী রূপে প্রসিদ্ধ আছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَّبِيًّا
"এই কিতাবে (উল্লিখিত) ইসমাঈলের কথা বর্ণনা কর, সে ছিল একজন প্রতিশ্রুতি পালনকারী এবং সে ছিল রসূল, নবী।"৪৭৭
যেহেতু তিনি তাঁকে যবেহ করার ব্যাপারে ধৈর্যধারণের যে প্রতিশ্রুতি পিতাকে দিয়েছিলেন, তা পালন করেছিলেন। আরো বলা হয় যে, একজনের সাথে কোন জায়গায় সাক্ষাৎ করার ওয়াদা করলে সে ভুলে যায়। কিন্তু তিনি তার জন্য পুরো দিন অপেক্ষা করেছিলেন।
আর বাস্তব কথা এই যে, ধোঁকাবাজির এই দুনিয়ায় প্রতারকের সংসর্গে সংসার করা বড় কঠিন। বিশেষ ক'রে আপনজন যদি কথা দিয়ে কথা না রাখে, তাহলে তার আঘাত সহ্য করার মতো ক্ষমতা থাকে না মানুষের।
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন,
سلام على الدنيا إذا لم يكن بها + صديق صدوق صادق الوعد منصفا
অর্থাৎ, দুনিয়াকে সালাম জানাও (বিদায় দাও), যদি না তথায় কোন সত্যবাদী, ওয়াদা পালনকারী (বিশ্বস্ত) ও ন্যায়পরায়ণ বন্ধু থাকে।

টিকাঃ
৪৫৩. রা'দ: ১৯-২০
৪৫৪. সূরা বাক্বারাহ-২: ২৭
৪৫৫. রা'দ: ২৫
৪৫৬. সূরা নাহল: ৯৫
৪৫৭. আলে ইমরান-৩: ৭৭
৪৫৮. সূরা বাক্বারাহ-২: ৪০
৪৫৯. আ'রাফ: ১৭২
৪৬০. মুসনাদে আহমাদ, হাকেম ২/৫৪8, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৬২৩
৪৬১. বুখারী ১৩৫৮, মুসলিম ৬৯২৬
৪৬২. মুসলিম ৭৩৮৬
৪৬৩. আহসানুল বায়ান
৪৬৪. সূরা মায়িদাহ: ১
৪৬৫. সূরা দাহর: ৭
৪৬৬. সূরা নাহল: ৯১
৪৬৭. সূরা ফাতহ: ১০
৪৬৮. সূরা আহযাব: ১৫
৪৬৯. বুখারী ৭২১২, মুসলিম ৩১০
৪৭০. মুসলিম ৪৮৮২নং প্রমুখ
৪৭১. সূরা বানী ইস্রাঈল: ৩৪
৪৭২. আহমাদ ২২৭৫৭, হাকেম, সহীহুল জামে' ১৮৯৮
৪৭৩. বুখারী ৩৩, মুসলিম ২২০-২২২
৪৭৪. বুখারী ৩৪, ২৪৫৯, মুসলিম ২১৯
৪৭৫. বুখারী ২২২৭, ২২৭০
৪৭৬. বুখারী ৮৩২, মুসলিম ৫৮৯
৪৭৭. মারয়‍্যাম: ৫৪

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 অনর্থক কথা ও কাজ বর্জন

📄 অনর্থক কথা ও কাজ বর্জন


মানুষের জীবনে দুই শ্রেণীর কথা ও কাজ থাকে: এক: যা নিজের বিষয়ীভূত, প্রয়োজনীয় ও উপকারী। দুই: যা নিজের বিষয়-বহির্ভূত, অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক। উক্ত কথা ও কাজ মানুষ চারভাবে সম্পাদন ক'রে থাকে:
১. যা নিজের বিষয়ীভূত, প্রয়োজনীয় ও উপকারী, তা করে এবং যা নিজের বিষয়-বহির্ভূত, অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক, তা বর্জন করে। এ মানুষ সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিচক্ষণ, হুঁশিয়ার ও সুন্দর চরিত্রবান।
২. যা নিজের বিষয়ীভূত, প্রয়োজনীয় ও উপকারী, তা করে না এবং যা নিজের বিষয়-বহির্ভূত, অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক, তা বর্জন করে না। এ মানুষ সর্বনিম্ন পর্যায়ের অকর্মণ্য ও বেকার।
৩. যা নিজের বিষয়ীভূত, প্রয়োজনীয় ও উপকারী, তা করে না, কিন্তু যা নিজের বিষয়-বহির্ভূত, অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক, তা বর্জন করে।
৪. যা নিজের বিষয়ীভূত, প্রয়োজনীয় ও উপকারী, তা করে, কিন্তু যা নিজের বিষয়-বহির্ভূত, অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক, তা বর্জন করে না। এ মানুষদ্বয়ের মধ্যে কিছু হলেও কল্যাণ আছে। কিন্তু এরা পূর্ণ চরিত্রবান ও সফল মানুষ নয়।
জ্ঞানী ও চরিত্রবান মানুষ কোনদিন সে কথায় বা কাজে নিজের সময় ব্যয় ও আয়ু ক্ষয় করে না, যাতে তার কোন প্রকার উপকার নেই; তা ইহলৌকিক, আর না পারলৌকিক।
পরন্তু যখনই কোন মানুষ অনর্থক বিষয়ে সময় ব্যয় করে, তখনই তার উপকারী বিষয় নষ্ট হতে বাধ্য। আর যদি কেউ তার সময়কে সার্থক ও উপকারী বিষয়ে ব্যয় করার চেষ্টা করে, তাহলে তার অনর্থক কোন বিষয়ে ব্যয় করার মতো সময় অবশিষ্ট থাকবে না।
একজন সচ্চরিত্র মানুষের আচরণ বড় সুন্দর। আপনি দেখবেন, সে সুন্দর মুসলিম হয়।
দেখবেন, সে প্রত্যেক হারাম জিনিস থেকে দূরে থাকছে এবং মাকরূহ ও অপ্রয়োজনীয় বৈধ বস্তুও বর্জন করছে।
দেখবেন, প্রত্যেক সেই কথা, কাজ, চিন্তা বা গবেষণা, যা নিজের বিশেষত্ব নয়, তা এড়িয়ে চলছে।
প্রত্যেক সেই কথা ও কাজ, যা নিজের দ্বীন বা দুনিয়ার জন্য উপকারী নয় অথবা অনর্থক, তা পরিহার করছে।
প্রত্যেক সেই কথা ও কাজ, যা নিজের দ্বীন বা দুনিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নয়, তা উপেক্ষা করছে।
প্রত্যেক সেই কথা ও কাজ, যা নিজের বিষয়ীভূত নয়, নিজের বিশেষত্ব নয়, তাতে কথা বলা, হস্তক্ষেপ করা, মন্তব্য করা ও টপকে পড়া হতে দূরে থাকছে।
দেখবেন, সে পরকীয় কথায় থাকতে পছন্দ করে না, সাধারণ মানুষ হয়ে রাজনীতির কথা বলে না, ভাণ্ডারী হয়ে ডাক্তারীর কথা বলে না, কবিরাজ হয়ে মহারাজের কথা বলে না, আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খোঁজ নেয় না। যে বোঝ বহিতে নারো বহ সেই বোঝ, আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খোঁজ?
সে ফালতু বা বাজে কথায় সময় ব্যয় করে না, খেলার খবর, বিশ্ব-সুন্দরী প্রতিযোগিতা ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় খবর রাখতে সময় খরচ করে না।
তাকে দেখবেন, সে অপ্রয়োজনীয় অনর্থক প্রশ্ন করে না, যেমন 'মূসা নবীর নানীর নাম কী' ইত্যাদি প্রশ্ন, যা দরকারী নয়, তার উত্তর খোঁজার জন্য সময় ব্যয় করে না।
কাউকে ব্যক্তিগত অসঙ্গত বিব্রতকর প্রশ্ন করে না। যেমন তার স্ত্রী-মিলন বিষয়ক প্রশ্ন, তার ব্যভিচার, যৌনাচার, পাপ ইত্যাদি গোপন বিষয়ক প্রশ্ন অথবা সন্তান কম হওয়ার কারণ জেনে প্রশ্ন ক'রে তাকে অস্বস্তিতে ফেলে না।
সূরা ফাতিহায় কয়টা অক্ষর নেই এবং কেন নেই, 'কোন্ সূরায় নয় মীম, কোন সূরায় নাই মীম', বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলোর অর্থ কী ইত্যাদি বিষয় নিয়ে, মহান আল্লাহর বিভিন্ন গুণাবলীর আকার-আকৃতি নিয়ে, সাহাবাদের ভুল ও আপোসের যুদ্ধ-বিগ্রহ নিয়ে বিচার-বিবেক করতে গিয়েও বিভ্রাটে পড়তে চায় না।
কোনও ফালতো বিষয়ে জড়ায় না সুন্দর চরিত্রবান ও সুন্দর মুসলিম। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ المَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
"মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য (অর্থাৎ তার উত্তম মুসলমান হওয়ার একটি চিহ্ন) হল অনর্থক (কথা ও কাজ) বর্জন করা।”৪৭৮
কা'ব বিন উজরাহ কর্তৃক বর্ণিত, একদা নবী তাঁকে না দেখতে পেয়ে তাঁর ব্যাপারে লোকেদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন। লোকেরা বলল, 'তিনি অসুস্থ।' সুতরাং তিনি বের হয়ে পায়ে হেঁটে তাঁর কাছে এসে বললেন, "কা'ব! তুমি সুসংবাদ নাও।" তাঁর মা তাঁর উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, 'হে কা'ব! তোমার জন্য জান্নাত মোবারক হোক।' তা শুনে তিনি বললেন, "কে এ আল্লাহর ব্যাপারে কসম খেয়ে (নিশ্চয়তা দিচ্ছে)? কা'ব বললেন, 'ও আমার মা, হে আল্লাহর রসূল!' তিনি তাঁর মায়ের উদ্দেশ্যে বললেন,
وَمَا يُدْرِيكَ يَا أُمَّ كَعْبٍ ؟ لَعَلَّ كَعْبًا قَالَ مَا لَا يَعْنِيهِ أَوْ مَنَعَ مَا لَا يُغْنِيهِ
"হে কা'বের মা! কীভাবে জানলে তুমি (সে জান্নাতী)? হয়তো-বা কা'ব এমন কথাবার্তা বলেছে, যা তার বিষয়ীভূত নয় এবং এমন কিছু দানে বিরত থেকেছে, যা তাকে অভাবমুক্ত করত না।"৪৭৯
লোকমান হাকীমকে বলা হল, 'আপনি তো হাসহাস গোত্রের দাস। তাহলে আপনি এমন হাকীম (পণ্ডিত) হলেন কীভাবে?' তিনি বললেন, 'সত্য কথা বলে, আমানতদারী রক্ষা ক'রে এবং অনর্থক কথা ও কাজ বর্জন ক'রে। '৪৮০
ইমাম শাফেয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'তিনটি কর্ম বুদ্ধি বৃদ্ধি করে: বিদ্যানদের সাথে ওঠা-বসা, সৎলোকদের সংসর্গে থাকা এবং অনর্থক কথা বর্জন করা।'
তিনি আরো বলেছেন, 'যে ব্যক্তি চায় যে, আল্লাহ তার হৃদয়কে আলোকিত করুন, তাহলে সে যেন অনর্থক কথা বর্জন করে।'
হাসান বাসরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'বান্দার প্রতি আল্লাহর বৈমুখ হওয়ার অন্যতম লক্ষণ হল, তিনি তাকে অনর্থক কাজে ব্যস্ত ক'রে দেন।'
মালেক বিন দীনার বলেছেন, 'যদি তুমি তোমার হৃদয়ে কঠোরতা, দেহে দুর্বলতা এবং রুযীতে বঞ্চনা অনুভব কর, তাহলে জেনে নিয়ো, তুমি অনর্থক বিষয়ে কথাবার্তা বলেছ।'
সতর্কতার বিষয় যে, অপরকে সৎকার্যের আদেশ ও মন্দকার্যে বাধা দান করা পরকীয় বিষয়ে অনর্থক হস্তক্ষেপ নয়। যেহেতু আপত্তিকর বিষয়ে প্রতিবাদ জানানো ফালতো বিষয় নয়। আর এক মু'মিন অপর মু'মিনের অভিভাবক; স্বঘোষিত নয়, বরং প্রতিপালক-ঘোষিত।

টিকাঃ
৪৭৮. আহমাদ; ১৭৩৭, তিরমিযী ২৩১৮, ত্বাবারানী, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৪৯৮৭
৪৭৯. ইবনে আবিদ দুনয়া ১১০, ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৭১৫৭, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩১০৩
৪৮০. আল-ইস্তিযকার ৮/২৭৬

মানুষের জীবনে দুই শ্রেণীর কথা ও কাজ থাকে: এক: যা নিজের বিষয়ীভূত, প্রয়োজনীয় ও উপকারী। দুই: যা নিজের বিষয়-বহির্ভূত, অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক। উক্ত কথা ও কাজ মানুষ চারভাবে সম্পাদন ক'রে থাকে:
১. যা নিজের বিষয়ীভূত, প্রয়োজনীয় ও উপকারী, তা করে এবং যা নিজের বিষয়-বহির্ভূত, অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক, তা বর্জন করে। এ মানুষ সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিচক্ষণ, হুঁশিয়ার ও সুন্দর চরিত্রবান।
২. যা নিজের বিষয়ীভূত, প্রয়োজনীয় ও উপকারী, তা করে না এবং যা নিজের বিষয়-বহির্ভূত, অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক, তা বর্জন করে না। এ মানুষ সর্বনিম্ন পর্যায়ের অকর্মণ্য ও বেকার।
৩. যা নিজের বিষয়ীভূত, প্রয়োজনীয় ও উপকারী, তা করে না, কিন্তু যা নিজের বিষয়-বহির্ভূত, অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক, তা বর্জন করে।
৪. যা নিজের বিষয়ীভূত, প্রয়োজনীয় ও উপকারী, তা করে, কিন্তু যা নিজের বিষয়-বহির্ভূত, অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক, তা বর্জন করে না। এ মানুষদ্বয়ের মধ্যে কিছু হলেও কল্যাণ আছে। কিন্তু এরা পূর্ণ চরিত্রবান ও সফল মানুষ নয়।
জ্ঞানী ও চরিত্রবান মানুষ কোনদিন সে কথায় বা কাজে নিজের সময় ব্যয় ও আয়ু ক্ষয় করে না, যাতে তার কোন প্রকার উপকার নেই; তা ইহলৌকিক, আর না পারলৌকিক।
পরন্তু যখনই কোন মানুষ অনর্থক বিষয়ে সময় ব্যয় করে, তখনই তার উপকারী বিষয় নষ্ট হতে বাধ্য। আর যদি কেউ তার সময়কে সার্থক ও উপকারী বিষয়ে ব্যয় করার চেষ্টা করে, তাহলে তার অনর্থক কোন বিষয়ে ব্যয় করার মতো সময় অবশিষ্ট থাকবে না।
একজন সচ্চরিত্র মানুষের আচরণ বড় সুন্দর। আপনি দেখবেন, সে সুন্দর মুসলিম হয়।
দেখবেন, সে প্রত্যেক হারাম জিনিস থেকে দূরে থাকছে এবং মাকরূহ ও অপ্রয়োজনীয় বৈধ বস্তুও বর্জন করছে।
দেখবেন, প্রত্যেক সেই কথা, কাজ, চিন্তা বা গবেষণা, যা নিজের বিশেষত্ব নয়, তা এড়িয়ে চলছে।
প্রত্যেক সেই কথা ও কাজ, যা নিজের দ্বীন বা দুনিয়ার জন্য উপকারী নয় অথবা অনর্থক, তা পরিহার করছে।
প্রত্যেক সেই কথা ও কাজ, যা নিজের দ্বীন বা দুনিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নয়, তা উপেক্ষা করছে।
প্রত্যেক সেই কথা ও কাজ, যা নিজের বিষয়ীভূত নয়, নিজের বিশেষত্ব নয়, তাতে কথা বলা, হস্তক্ষেপ করা, মন্তব্য করা ও টপকে পড়া হতে দূরে থাকছে।
দেখবেন, সে পরকীয় কথায় থাকতে পছন্দ করে না, সাধারণ মানুষ হয়ে রাজনীতির কথা বলে না, ভাণ্ডারী হয়ে ডাক্তারীর কথা বলে না, কবিরাজ হয়ে মহারাজের কথা বলে না, আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খোঁজ নেয় না। যে বোঝ বহিতে নারো বহ সেই বোঝ, আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খোঁজ?
সে ফালতু বা বাজে কথায় সময় ব্যয় করে না, খেলার খবর, বিশ্ব-সুন্দরী প্রতিযোগিতা ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় খবর রাখতে সময় খরচ করে না।
তাকে দেখবেন, সে অপ্রয়োজনীয় অনর্থক প্রশ্ন করে না, যেমন 'মূসা নবীর নানীর নাম কী' ইত্যাদি প্রশ্ন, যা দরকারী নয়, তার উত্তর খোঁজার জন্য সময় ব্যয় করে না।
কাউকে ব্যক্তিগত অসঙ্গত বিব্রতকর প্রশ্ন করে না। যেমন তার স্ত্রী-মিলন বিষয়ক প্রশ্ন, তার ব্যভিচার, যৌনাচার, পাপ ইত্যাদি গোপন বিষয়ক প্রশ্ন অথবা সন্তান কম হওয়ার কারণ জেনে প্রশ্ন ক'রে তাকে অস্বস্তিতে ফেলে না।
সূরা ফাতিহায় কয়টা অক্ষর নেই এবং কেন নেই, 'কোন্ সূরায় নয় মীম, কোন সূরায় নাই মীম', বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলোর অর্থ কী ইত্যাদি বিষয় নিয়ে, মহান আল্লাহর বিভিন্ন গুণাবলীর আকার-আকৃতি নিয়ে, সাহাবাদের ভুল ও আপোসের যুদ্ধ-বিগ্রহ নিয়ে বিচার-বিবেক করতে গিয়েও বিভ্রাটে পড়তে চায় না।
কোনও ফালতো বিষয়ে জড়ায় না সুন্দর চরিত্রবান ও সুন্দর মুসলিম। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ المَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
"মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য (অর্থাৎ তার উত্তম মুসলমান হওয়ার একটি চিহ্ন) হল অনর্থক (কথা ও কাজ) বর্জন করা।”৪৭৮
কা'ব বিন উজরাহ কর্তৃক বর্ণিত, একদা নবী তাঁকে না দেখতে পেয়ে তাঁর ব্যাপারে লোকেদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন। লোকেরা বলল, 'তিনি অসুস্থ।' সুতরাং তিনি বের হয়ে পায়ে হেঁটে তাঁর কাছে এসে বললেন, "কা'ব! তুমি সুসংবাদ নাও।" তাঁর মা তাঁর উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, 'হে কা'ব! তোমার জন্য জান্নাত মোবারক হোক।' তা শুনে তিনি বললেন, "কে এ আল্লাহর ব্যাপারে কসম খেয়ে (নিশ্চয়তা দিচ্ছে)? কা'ব বললেন, 'ও আমার মা, হে আল্লাহর রসূল!' তিনি তাঁর মায়ের উদ্দেশ্যে বললেন,
وَمَا يُدْرِيكَ يَا أُمَّ كَعْبٍ ؟ لَعَلَّ كَعْبًا قَالَ مَا لَا يَعْنِيهِ أَوْ مَنَعَ مَا لَا يُغْنِيهِ
"হে কা'বের মা! কীভাবে জানলে তুমি (সে জান্নাতী)? হয়তো-বা কা'ব এমন কথাবার্তা বলেছে, যা তার বিষয়ীভূত নয় এবং এমন কিছু দানে বিরত থেকেছে, যা তাকে অভাবমুক্ত করত না।"৪৭৯
লোকমান হাকীমকে বলা হল, 'আপনি তো হাসহাস গোত্রের দাস। তাহলে আপনি এমন হাকীম (পণ্ডিত) হলেন কীভাবে?' তিনি বললেন, 'সত্য কথা বলে, আমানতদারী রক্ষা ক'রে এবং অনর্থক কথা ও কাজ বর্জন ক'রে। '৪৮০
ইমাম শাফেয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'তিনটি কর্ম বুদ্ধি বৃদ্ধি করে: বিদ্যানদের সাথে ওঠা-বসা, সৎলোকদের সংসর্গে থাকা এবং অনর্থক কথা বর্জন করা।'
তিনি আরো বলেছেন, 'যে ব্যক্তি চায় যে, আল্লাহ তার হৃদয়কে আলোকিত করুন, তাহলে সে যেন অনর্থক কথা বর্জন করে।'
হাসান বাসরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'বান্দার প্রতি আল্লাহর বৈমুখ হওয়ার অন্যতম লক্ষণ হল, তিনি তাকে অনর্থক কাজে ব্যস্ত ক'রে দেন।'
মালেক বিন দীনার বলেছেন, 'যদি তুমি তোমার হৃদয়ে কঠোরতা, দেহে দুর্বলতা এবং রুযীতে বঞ্চনা অনুভব কর, তাহলে জেনে নিয়ো, তুমি অনর্থক বিষয়ে কথাবার্তা বলেছ।'
সতর্কতার বিষয় যে, অপরকে সৎকার্যের আদেশ ও মন্দকার্যে বাধা দান করা পরকীয় বিষয়ে অনর্থক হস্তক্ষেপ নয়। যেহেতু আপত্তিকর বিষয়ে প্রতিবাদ জানানো ফালতো বিষয় নয়। আর এক মু'মিন অপর মু'মিনের অভিভাবক; স্বঘোষিত নয়, বরং প্রতিপালক-ঘোষিত।

টিকাঃ
৪৭৮. আহমাদ; ১৭৩৭, তিরমিযী ২৩১৮, ত্বাবারানী, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৪৯৮৭
৪৭৯. ইবনে আবিদ দুনয়া ১১০, ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৭১৫৭, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩১০৩
৪৮০. আল-ইস্তিযকার ৮/২৭৬

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 আত্মপ্রশংসা ও তোষামদ বর্জন

📄 আত্মপ্রশংসা ও তোষামদ বর্জন


আত্মশ্লাঘা বা আত্মপ্রশংসা করা কোন চরিত্রবানের কাজ নয়। নিজেকে 'হিরো' ও অপরকে 'জিরো' বানানো এবং কথায় কথায় আমিত্ব প্রকাশে আত্মগর্ব থাকে। আর সেটা হল অহংকারীর আলামত।
প্রশংসার যোগ্য হলেও নিজের প্রশংসা নিজে করা সুশীল মানুষের কাজ নয়। আর ধারণাবশে নিজেকে প্রশংসাযোগ্য বলে প্রকাশ করলে তো, সেটা আরো খারাপ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى)
"তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না। তিনিই সম্যক জানেন আল্লাহভীরু কে।” ৪৮১
এক জনের নাম বারাহ (পুণ্যময়ী) রাখা হলে তিনি বলেন,
لَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمُ اللَّهُ أَعْلَمُ بِأَهْلِ الْبِرِّ مِنْكُمْ ، سَمُّوهَا زَيْنَبَ
"তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না। কারণ আল্লাহই সম্যক্ জানেন তোমাদের মধ্যে পূণ্যময়ী কে। বরং ওর নাম যয়নাব রাখ।” ৪৮২
অনেক সময় পরচর্চা বা অপরের সমালোচনা ক'রে নিজের প্রশংসা জাহির করা হয়। আর হাসান বাসরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'প্রকাশ্যে নিজের বদনাম করার মানেই হল, মনে মনে নিজের প্রশংসা করা।'
অবশ্য কোন স্থলে কাউকে অপবাদ দিয়ে অপদস্থ করা হলে, সে ক্ষেত্রে নিজের সাফাই পেশ করা আত্মপ্রশংসার পর্যায়ভুক্ত নয়।
উপর্যুক্ত আয়াতের অন্য একটি ব্যাখ্যা হল, তোমরা অন্যের প্রশংসা করো না। যেমন হাদীসে নাম রাখার ব্যাপারে স্পষ্ট। সেটা নিজের প্রশংসা ছিল না, প্রশংসা ছিল শিশুকন্যার। বড় হয়ে সে নিজ নাম নিয়ে গর্বিতা হতে পারত, তাই তার নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল।
বিশেষ ক'রে কারো মিথ্যা প্রশংসার সাথে তোষামদ ও মনোরঞ্জন করা একটি ঘৃণিত আচরণ। আর যখন 'আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হওয়ার' ভয় থাকে, তখন ঐরূপ প্রশংসা সর্বনাশী। যেমন কোন মানুষের ভিতরের খবর না জেনে বাইরের অবস্থা দেখে প্রশংসা করলেও অনুমান প্রসূত কথা হয়ে যায়।
আবূ বাকরাহ থেকে বর্ণিত, নবী এর নিকট এক ব্যক্তি অন্য একজনের (তার সামনে) ভাল প্রশংসা করলে নবী বললেন, 'হায় হায়! তুমি তোমার সাথীর গর্দান কেটে ফেললে!' এরূপ বার-বার বলার পর তিনি বললেন,
إِنْ كَانَ أَحَدُكُمْ مَادِحاً لاَ مَحَالَةَ فَلْيَقُلْ : أَحْسِبُ كَذَا وَكَذَا إِنْ كَانَ يَرَى أَنَّهُ كَذَلِكَ وَحَسِيبُهُ اللَّهُ ، وَلَا يُزَكِّى عَلَى اللَّهِ أَحَدٌ
"তোমাদের মধ্যে যদি কাউকে একান্তই তার সাথীর প্রংশসা করতে হয়, তাহলে সে যেন বলে, 'আমি ওকে এরূপ মনে করি'-যদি জানে যে, সে প্রকৃতই এরূপ--- 'এবং আল্লাহ ওর হিসাব গ্রহণকারী। আর আল্লাহর (জ্ঞানের) সামনে কাউকে নিষ্কলুষ ও পবিত্র ঘোষণা করা যায় না।”৪৮৩
সামনাসামনি কারো প্রশংসা করলে সে গর্বিত হতে পারে এবং তার মনে অহংকার বাসা বাঁধলে তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। তাই মহানবী বলেছেন,
إِيَّاكُمْ وَالتَّمَادُحَ فَإِنَّهُ الذَّبْحُ
"মুখোমুখি প্রশংসা করা ও নেওয়া হতে দূরে থাক, কারণ তা যবাই। "৪৮৪
সাধারণতঃ স্বার্থসিদ্ধি লাভের উদ্দেশ্যে যারা অপরের মুখোমুখি প্রশংসা করে, তাদের সে আচরণ ভালো নয়। তোষামুদে মানুষের অভ্যাস, অপরের প্রশংসার মাধ্যমে নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়া। তাই সেটা নিন্দনীয় এবং এমন প্রশংসাকারী অপমানিত হওয়ার উপযুক্ত।
এক ব্যক্তি উষমান এর সামনেই তাঁর প্রশংসা শুরু করলে মিকদাদ হাঁটুর উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে তার মুখে কাঁকর ছিটাতে শুরু করলেন। তখন উষমান তাঁকে বললেন, 'কী ব্যাপার তোমার?' তিনি বললেন, 'রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِذَا رَأَيْتُمُ المَدَّاحِينَ ، فَاحْثُوا فِي وُجُوهِهِمُ التَّرَابَ
"তোমরা (মুখোমুখি) প্রশংসাকারীদের দেখলে তাদের মুখে ধুলো ছিটিয়ে দিয়ো।”৪৮৫
অবশ্য প্রয়োজনে যথোচিত প্রশংসা করা নিন্দনীয় নয়। কোন কর্মে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা প্রদানার্থে অপরের একটু তারীফ করা বৈধ এবং ফলপ্রসূ। বিশেষ ক'রে যদি প্রশংসিত ব্যক্তি পূর্ণ ঈমান ও ইয়াকীনের অধিকারী হয়, আত্মা অনুশীলনী ও পূর্ণ জ্ঞান লাভে ধন্য হয়, যার ফলে সে কারো প্রশংসা শুনে ফিতনা ও ধোঁকার শিকার না হয় এবং তার মন তাকে প্রতারিত না করে, তাহলে এ ধরনের লোকের মুখোমুখি প্রশংসা, না হারাম, আর না মাকরূহ। অন্যথা যদি কারো ক্ষেত্রে উক্ত বিষয়াদির কিছুর আশংকা বোধ হয়, তবে তা ঘোর অপছন্দনীয়।
একদা আল্লাহর রসূল আবু বাক্স কে বলেছিলেন; “আমার আশা এই যে, তুমিও তাদের একজন হবে।" অর্থাৎ সেই সৌভাগ্যবানদের একজন হবে, যাদেরকে জান্নাতের সমস্ত দ্বার থেকে আহবান জানানো হবে। ৪৮৬
অন্য এক সময় তিনি তাঁকে বলেছিলেন; "তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও।” অর্থাৎ, ঐসব লোকেদের অন্তর্ভুক্ত নও যারা অহংকারবশতঃ লুঙ্গী-পায়জামা গাঁটের নীচে ঝুলিয়ে পরে।
একদা তিনি উমার কে বলেছিলেন, "শয়তান তোমাকে যে পথে চলতে দেখে, সে পথ ত্যাগ ক'রে সে অন্য পথ ধরে।”৪৮৭

টিকাঃ
৪৮১. নাজম: ৩২
৪৮২. মুসলিম ৫৭৩৩, আল-আদাবুল মুফরাদ বুখারী, আবু দাউদ ৪৯৫৩, সিলসিলাহ সহীহাহ ২১০
৪৮৩. বুখারী ৬০৬১, মুসলিম ৭৬৯৩-৭৬৯৪
৪৮৪. আহমাদ ১৬৮৩৭, ইবনে মাজাহ ৩৭৪৩, ত্বাবারানী ১৬১৭২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১০৩০৭, সহীহুল জামে ২৬৭৪
৪৮৫. মুসলিম ৭৬৯৮
৪৮৬. বুখারী ১৮৯৭, ৩৬৬৬, মুসলিম ২৪১৮
৪৮৭. বুখারী ৩২৯৪, ৬৩৫৫, দ্রঃ শরহে মুসলিম ও রিয়াযুস স্বালিহীন, ইমাম নাওয়াবী

আত্মশ্লাঘা বা আত্মপ্রশংসা করা কোন চরিত্রবানের কাজ নয়। নিজেকে 'হিরো' ও অপরকে 'জিরো' বানানো এবং কথায় কথায় আমিত্ব প্রকাশে আত্মগর্ব থাকে। আর সেটা হল অহংকারীর আলামত।
প্রশংসার যোগ্য হলেও নিজের প্রশংসা নিজে করা সুশীল মানুষের কাজ নয়। আর ধারণাবশে নিজেকে প্রশংসাযোগ্য বলে প্রকাশ করলে তো, সেটা আরো খারাপ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى)
"তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না। তিনিই সম্যক জানেন আল্লাহভীরু কে।” ৪৮১
এক জনের নাম বারাহ (পুণ্যময়ী) রাখা হলে তিনি বলেন,
لَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمُ اللَّهُ أَعْلَمُ بِأَهْلِ الْبِرِّ مِنْكُمْ ، سَمُّوهَا زَيْنَبَ
"তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না। কারণ আল্লাহই সম্যক্ জানেন তোমাদের মধ্যে পূণ্যময়ী কে। বরং ওর নাম যয়নাব রাখ।” ৪৮২
অনেক সময় পরচর্চা বা অপরের সমালোচনা ক'রে নিজের প্রশংসা জাহির করা হয়। আর হাসান বাসরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'প্রকাশ্যে নিজের বদনাম করার মানেই হল, মনে মনে নিজের প্রশংসা করা।'
অবশ্য কোন স্থলে কাউকে অপবাদ দিয়ে অপদস্থ করা হলে, সে ক্ষেত্রে নিজের সাফাই পেশ করা আত্মপ্রশংসার পর্যায়ভুক্ত নয়।
উপর্যুক্ত আয়াতের অন্য একটি ব্যাখ্যা হল, তোমরা অন্যের প্রশংসা করো না। যেমন হাদীসে নাম রাখার ব্যাপারে স্পষ্ট। সেটা নিজের প্রশংসা ছিল না, প্রশংসা ছিল শিশুকন্যার। বড় হয়ে সে নিজ নাম নিয়ে গর্বিতা হতে পারত, তাই তার নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল।
বিশেষ ক'রে কারো মিথ্যা প্রশংসার সাথে তোষামদ ও মনোরঞ্জন করা একটি ঘৃণিত আচরণ। আর যখন 'আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হওয়ার' ভয় থাকে, তখন ঐরূপ প্রশংসা সর্বনাশী। যেমন কোন মানুষের ভিতরের খবর না জেনে বাইরের অবস্থা দেখে প্রশংসা করলেও অনুমান প্রসূত কথা হয়ে যায়।
আবূ বাকরাহ থেকে বর্ণিত, নবী এর নিকট এক ব্যক্তি অন্য একজনের (তার সামনে) ভাল প্রশংসা করলে নবী বললেন, 'হায় হায়! তুমি তোমার সাথীর গর্দান কেটে ফেললে!' এরূপ বার-বার বলার পর তিনি বললেন,
إِنْ كَانَ أَحَدُكُمْ مَادِحاً لاَ مَحَالَةَ فَلْيَقُلْ : أَحْسِبُ كَذَا وَكَذَا إِنْ كَانَ يَرَى أَنَّهُ كَذَلِكَ وَحَسِيبُهُ اللَّهُ ، وَلَا يُزَكِّى عَلَى اللَّهِ أَحَدٌ
"তোমাদের মধ্যে যদি কাউকে একান্তই তার সাথীর প্রংশসা করতে হয়, তাহলে সে যেন বলে, 'আমি ওকে এরূপ মনে করি'-যদি জানে যে, সে প্রকৃতই এরূপ--- 'এবং আল্লাহ ওর হিসাব গ্রহণকারী। আর আল্লাহর (জ্ঞানের) সামনে কাউকে নিষ্কলুষ ও পবিত্র ঘোষণা করা যায় না।”৪৮৩
সামনাসামনি কারো প্রশংসা করলে সে গর্বিত হতে পারে এবং তার মনে অহংকার বাসা বাঁধলে তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। তাই মহানবী বলেছেন,
إِيَّاكُمْ وَالتَّمَادُحَ فَإِنَّهُ الذَّبْحُ
"মুখোমুখি প্রশংসা করা ও নেওয়া হতে দূরে থাক, কারণ তা যবাই। "৪৮৪
সাধারণতঃ স্বার্থসিদ্ধি লাভের উদ্দেশ্যে যারা অপরের মুখোমুখি প্রশংসা করে, তাদের সে আচরণ ভালো নয়। তোষামুদে মানুষের অভ্যাস, অপরের প্রশংসার মাধ্যমে নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়া। তাই সেটা নিন্দনীয় এবং এমন প্রশংসাকারী অপমানিত হওয়ার উপযুক্ত।
এক ব্যক্তি উষমান এর সামনেই তাঁর প্রশংসা শুরু করলে মিকদাদ হাঁটুর উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে তার মুখে কাঁকর ছিটাতে শুরু করলেন। তখন উষমান তাঁকে বললেন, 'কী ব্যাপার তোমার?' তিনি বললেন, 'রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِذَا رَأَيْتُمُ المَدَّاحِينَ ، فَاحْثُوا فِي وُجُوهِهِمُ التَّرَابَ
"তোমরা (মুখোমুখি) প্রশংসাকারীদের দেখলে তাদের মুখে ধুলো ছিটিয়ে দিয়ো।”৪৮৫
অবশ্য প্রয়োজনে যথোচিত প্রশংসা করা নিন্দনীয় নয়। কোন কর্মে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা প্রদানার্থে অপরের একটু তারীফ করা বৈধ এবং ফলপ্রসূ। বিশেষ ক'রে যদি প্রশংসিত ব্যক্তি পূর্ণ ঈমান ও ইয়াকীনের অধিকারী হয়, আত্মা অনুশীলনী ও পূর্ণ জ্ঞান লাভে ধন্য হয়, যার ফলে সে কারো প্রশংসা শুনে ফিতনা ও ধোঁকার শিকার না হয় এবং তার মন তাকে প্রতারিত না করে, তাহলে এ ধরনের লোকের মুখোমুখি প্রশংসা, না হারাম, আর না মাকরূহ। অন্যথা যদি কারো ক্ষেত্রে উক্ত বিষয়াদির কিছুর আশংকা বোধ হয়, তবে তা ঘোর অপছন্দনীয়।
একদা আল্লাহর রসূল আবু বাক্স কে বলেছিলেন; “আমার আশা এই যে, তুমিও তাদের একজন হবে।" অর্থাৎ সেই সৌভাগ্যবানদের একজন হবে, যাদেরকে জান্নাতের সমস্ত দ্বার থেকে আহবান জানানো হবে। ৪৮৬
অন্য এক সময় তিনি তাঁকে বলেছিলেন; "তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও।” অর্থাৎ, ঐসব লোকেদের অন্তর্ভুক্ত নও যারা অহংকারবশতঃ লুঙ্গী-পায়জামা গাঁটের নীচে ঝুলিয়ে পরে।
একদা তিনি উমার কে বলেছিলেন, "শয়তান তোমাকে যে পথে চলতে দেখে, সে পথ ত্যাগ ক'রে সে অন্য পথ ধরে।”৪৮৭

টিকাঃ
৪৮১. নাজম: ৩২
৪৮২. মুসলিম ৫৭৩৩, আল-আদাবুল মুফরাদ বুখারী, আবু দাউদ ৪৯৫৩, সিলসিলাহ সহীহাহ ২১০
৪৮৩. বুখারী ৬০৬১, মুসলিম ৭৬৯৩-৭৬৯৪
৪৮৪. আহমাদ ১৬৮৩৭, ইবনে মাজাহ ৩৭৪৩, ত্বাবারানী ১৬১৭২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১০৩০৭, সহীহুল জামে ২৬৭৪
৪৮৫. মুসলিম ৭৬৯৮
৪৮৬. বুখারী ১৮৯৭, ৩৬৬৬, মুসলিম ২৪১৮
৪৮৭. বুখারী ৩২৯৪, ৬৩৫৫, দ্রঃ শরহে মুসলিম ও রিয়াযুস স্বালিহীন, ইমাম নাওয়াবী

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 বড়দেরকে শ্রদ্ধা ও ছোটদেরকে স্নেহ

📄 বড়দেরকে শ্রদ্ধা ও ছোটদেরকে স্নেহ


সুচরিত্রবানের একটি সুন্দর আচরণ, সে বড়দেরকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করে এবং ছোটদেরকে স্নেহ করে।
বড় বলতে বয়োজ্যেষ্ঠ, আপনার থেকে বয়সে বড়, জ্ঞানে-বিদ্যায় বড়, সম্মানে বড় এমন মানুষকে সম্মান প্রদর্শন করা আপনার কর্তব্য।
বাড়িতে দাদা-দাদী, নানা-নানী, বাপ-মা, চাচা-চাচী, মামা-মামী, ফুফু-ফোফা, খালা-খালু, বড় ভাই-ভাবী, বড় বোন-বুনাই, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ী, সকল বড় আত্মীয়র প্রতি ছোটদের শ্রদ্ধা করা চরিত্রবানের কর্তব্য।
গ্রাম বা জামাআতের মোড়ল-মাতবর, মুরুব্বী, মসজিদের ইমাম, আলেম-হাফেয, শিক্ষক-মাস্টার প্রভৃতি বড়দেরকে সম্মান করা সচ্চরিত্রতার লক্ষণ।
কর্মস্থলে মালিক, ম্যানেজার, সুপারভাইজার, ইঞ্জিনিয়ার, পরিচালক, সভাপতি, সম্পাদক, সদর বা হেড শ্রেণীর মানুষকে সম্মান জানানো চরিত্রবানের কর্তব্য।
কর্তব্য তাদেরকে সালাম দেওয়া, (পা ছুঁয়ে সালাম বা প্রণাম নয়,) এগানা হলে মুসাফাহা করা, মাথা বা হাত চুম্বন করা, সশ্রদ্ধ বাক্যালাপ করা।
বড়দের জন্য আসন ছেড়ে দেওয়া, তাদের বসার জায়গা থেকে উঁচু জায়গায় না বসা, তাদেরকে পিছন ক'রে না বসা, তাদের সামনে বেআদবি না করা, হৈ-হুল্লোড়, চেঁচামেচি বা গোলমাল না করা, তাদের বোঝা বইয়ে দেওয়া ইত্যাদি ছোটদের কর্তব্য।
আর বড়দের কর্তব্য ছোটদেরকে স্নেহ করা, তাদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন না করা, তাদেরকে তুচ্ছজ্ঞান না করা, শিশুদের মাথায় হাত বুলানো ইত্যাদি।
এ আচরণ চরিত্রবানের, এ কাজ মুসলিমের এবং মুহাম্মাদী উম্মতের। এ রীতির বাইরে যারা, তারা পরিপূর্ণ উম্মতী বলে গণ্য নয়। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَمْ يُجِلَّ كَبِيرَنَا وَيَرْحَمُ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا حَقَّهُ
"সে ব্যক্তি আমার উম্মতের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি আমাদের বড়দেরকে সম্মান দেয় না, ছোটদেরকে স্নেহ করে না এবং আলেমের অধিকার চেনে না।”৪৮৮

টিকাঃ
৪৮৮. আহমাদ ২২৭৫৫, ত্বাবারানী, হাকেম, সহীহ তারগীব ৯৫

সুচরিত্রবানের একটি সুন্দর আচরণ, সে বড়দেরকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করে এবং ছোটদেরকে স্নেহ করে।
বড় বলতে বয়োজ্যেষ্ঠ, আপনার থেকে বয়সে বড়, জ্ঞানে-বিদ্যায় বড়, সম্মানে বড় এমন মানুষকে সম্মান প্রদর্শন করা আপনার কর্তব্য।
বাড়িতে দাদা-দাদী, নানা-নানী, বাপ-মা, চাচা-চাচী, মামা-মামী, ফুফু-ফোফা, খালা-খালু, বড় ভাই-ভাবী, বড় বোন-বুনাই, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ী, সকল বড় আত্মীয়র প্রতি ছোটদের শ্রদ্ধা করা চরিত্রবানের কর্তব্য।
গ্রাম বা জামাআতের মোড়ল-মাতবর, মুরুব্বী, মসজিদের ইমাম, আলেম-হাফেয, শিক্ষক-মাস্টার প্রভৃতি বড়দেরকে সম্মান করা সচ্চরিত্রতার লক্ষণ।
কর্মস্থলে মালিক, ম্যানেজার, সুপারভাইজার, ইঞ্জিনিয়ার, পরিচালক, সভাপতি, সম্পাদক, সদর বা হেড শ্রেণীর মানুষকে সম্মান জানানো চরিত্রবানের কর্তব্য।
কর্তব্য তাদেরকে সালাম দেওয়া, (পা ছুঁয়ে সালাম বা প্রণাম নয়,) এগানা হলে মুসাফাহা করা, মাথা বা হাত চুম্বন করা, সশ্রদ্ধ বাক্যালাপ করা।
বড়দের জন্য আসন ছেড়ে দেওয়া, তাদের বসার জায়গা থেকে উঁচু জায়গায় না বসা, তাদেরকে পিছন ক'রে না বসা, তাদের সামনে বেআদবি না করা, হৈ-হুল্লোড়, চেঁচামেচি বা গোলমাল না করা, তাদের বোঝা বইয়ে দেওয়া ইত্যাদি ছোটদের কর্তব্য।
আর বড়দের কর্তব্য ছোটদেরকে স্নেহ করা, তাদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন না করা, তাদেরকে তুচ্ছজ্ঞান না করা, শিশুদের মাথায় হাত বুলানো ইত্যাদি।
এ আচরণ চরিত্রবানের, এ কাজ মুসলিমের এবং মুহাম্মাদী উম্মতের। এ রীতির বাইরে যারা, তারা পরিপূর্ণ উম্মতী বলে গণ্য নয়। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَمْ يُجِلَّ كَبِيرَنَا وَيَرْحَمُ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا حَقَّهُ
"সে ব্যক্তি আমার উম্মতের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি আমাদের বড়দেরকে সম্মান দেয় না, ছোটদেরকে স্নেহ করে না এবং আলেমের অধিকার চেনে না।”৪৮৮

টিকাঃ
৪৮৮. আহমাদ ২২৭৫৫, ত্বাবারানী, হাকেম, সহীহ তারগীব ৯৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00