📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 আদর্শবত্তা

📄 আদর্শবত্তা


চরিত্রবান নারী-পুরুষ হয় সমাজ-আকাশের তারকা। তাদেরকে দেখে সাধারণ লোকেরা সঠিক পথের দিশা পায়। তারা অপরের জন্য আদর্শ ও নমুনা হয়। তারা স্ববিরোধী হয় না। তারা অপরকে ভালো শিক্ষা দিয়ে নিজেরা মন্দ কাজ করে না অথবা অপরকে মন্দ থেকে দূরে থাকতে বলে নিজেরা তার ভিতরে থাকে না। মহানবী বলেন,
مَثَلُ الَّذِي يُعَلِّمُ النَّاسَ الْخَيْرَ وَيَنْسَى نَفْسَهُ، مَثَلُ الْفَتِيلَةِ تُضِيءُ لِلنَّاسِ، وَتُحْرِقُ نَفْسَهَا
"যে ব্যক্তি লোকেদেরকে ভালো শিক্ষা দেয় এবং নিজেকে ভুলে বসে সেই ব্যক্তির উদাহরণ একটি (প্রদীপের) পলিতার মত; যে লোকেদেরকে আলো দান করে, কিন্তু নিজেকে জ্বালিয়ে ধ্বংস করে!" ৪২৭
আর মহান আল্লাহর কাছেও তা পছন্দনীয় নয়। তিনি বলেছেন,
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنسَوْنَ أَنفُسَكُمْ وَأَنتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
অর্থাৎ, কী আশ্চর্য! তোমরা নিজেদের বিস্মৃত হয়ে মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দাও, অথচ তোমরা কিতাব (গ্রন্থ) অধ্যয়ন কর, তবে কি তোমরা বুঝ না? ৪২৮
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ - كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা যা কর না, তা বল কেন? তোমরা যা কর না, তোমাদের তা বলা আল্লাহর নিকট অতিশয় অসন্তোষজনক। ৪২৯
সুতরাং স্ববিরোধিতা একটি মহা অপরাধ। আর তার জন্যই পরকালে তার বিশেষ শাস্তি রাখা হয়েছে। আল্লাহর রসূল বলেছেন,
يُؤْتَى بِالرَّجُلِ يَوْمَ القِيَامَةِ فَيُلْقَى فِي النَّارِ ، فَتَنْدَلِقُ أَقْتَابُ بَطْنِهِ فَيَدُورُ بِهَا كَمَا يَدُورُ الحِمَارُ فِي الرَّحَى ، فَيَجْتَمِعُ إِلَيْهِ أَهْلُ النَّارِ ، فَيَقُولُونَ : يَا فُلانُ ، مَا لَكَ ؟ أَلَمْ تَكُ تَأْمُرُ بالمَعْرُوفِ وَتَنهَى عَنِ المُنْكَرِ ؟ فَيَقُولُ : بَلَى ، كُنْتُ آمُرُ بِالْمَعْرُوفِ ولا آتِيهِ ، وَأَنْهَى عَنِ الْمُنْكَرِ وَآتِيهِ
"কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সেখানে তার নাড়ি-ভুঁড়ি বের হয়ে যাবে এবং সে তার চারিপাশে এমনভাবে ঘুরতে থাকবে, যেমন গাধা তার চাকির চারিপাশে ঘুরতে থাকে। তখন জাহান্নামীরা তার কাছে একত্রিত হয়ে তাকে বলবে, 'ওহে অমুক! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি না (আমাদেরকে) সৎ কাজের আদেশ, আর অসৎ কাজে বাধা দান করতে?' সে বলবে, 'অবশ্যই। আমি (তোমাদেরকে) সৎকাজের আদেশ দিতাম; কিন্তু আমি তা নিজে করতাম না এবং অসৎ কাজে বাধা দান করতাম; অথচ আমি নিজেই তা করতাম!"৪৩০
তিনি আরো বলেছেন,
مَرَرْتُ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي عَلَى قَوْمٍ تُقْرَضُ شِفَاهُهُمْ بِمَقَارِيضَ مِنْ نَارٍ قُلْتُ مَا هَؤُلَاءِ قَالَ هَؤُلَاءِ خُطَبَاءُ أُمَّتِكَ مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا كَانُوا يَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَيَنْسَوْنَ أَنْفُسَهُمْ وَهُمْ يَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا يَعْقِلُونَ
"আমি মি'রাজের রাতে এমন একদল লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছি যারা আগুনের কাঁইচি দ্বারা নিজেদের ঠোঁট কাটছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'হে জিবরীল! ওরা কারা?' তিনি বললেন, 'ওরা আপনার উম্মতের বক্তাদল; যারা নিজেদের বিস্মৃত হয়ে মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দিত, অথচ ওরা কিতাব (গ্রন্থ) অধ্যয়ন করত, তবে কি ওরা বুঝত না।” ৪৩১
কোন কাজ শুরু করতে নিজে শুরু করা চরিত্রবানের আলামত। তাতে দেখাদেখি অন্যেরাও কাজ শুরু করে। অনেকে লজ্জায় পড়ে সত্বর কাজে লেগে পড়ে। সুতরাং প্রত্যেক কাজে আদর্শবানদের জন্য অপরের পরিচালক হওয়া বাঞ্ছনীয়। বাড়ির মুরুব্বী হবে বাড়ির লোকের জন্য আদর্শ। দাদা, নানা, শ্বশুর ও বাবা হবে সন্তান বা জামাইয়ের জন্য আদর্শ। দাদী, নানী, শাশুড়ী ও মা হবে মেয়ে ও বউদের জন্য আদর্শ। তা না হলে, শাশুড়ী যদি দাঁড়িয়ে মুতে, বউরা মুতবে ঘুরপাক দিয়ে---এটাই স্বাভাবিক।
চরিত্রবান হবে সর্ব-কল্যাণের ইমাম। সে হবে রহমানের সেই বান্দা, যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ক'রে বলে,
وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
অর্থাৎ, যারা (প্রার্থনা ক'রে) বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদেরকে আমাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর কর এবং আমাদেরকে সাবধানীদের জন্য আদর্শস্বরূপ কর। ১৪৩২

টিকাঃ
৪২৭. বায্যার, সহীহ তারগীব ১৩০
৪২৮. সূরা বাক্বারাহ-২: ৪৪
৪২৯. সাফ: ২-৩
৪৩০. বুখারী ৩২৬৭, মুসলিম ৭৬৭৪
৪৩১. আহমাদ ১২২১১, ১২৮৫৬ প্রভৃতি, ইবনে হিব্বان ৫৩, ত্বাবারানীর আওসাত্ব ২৮৩২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭৭৩, আবু য়‍্যা'লা ৩৯৯২, সহীহ তারগীব ১২৫
৪৩২. ফুরক্বান: ৭৪

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 অল্পে তুষ্টি

📄 অল্পে তুষ্টি


চরিত্রবান মানুষ পার্থিব ব্যাপারে নিজের ভাগ্য ও ভাগ নিয়ে তুষ্ট থাকে। যে দেশে ও যেমন পরিবারে তার জন্ম হয়েছে, যে সম্পদ সে লাভ করেছে, যে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ি তার ভাগ্যে জুটেছে, তাই নিয়ে সে সন্তুষ্ট থাকে।
চরিত্রবানের ভিতরে লোভ-লালসা থাকে না। অতিরিক্ত বিষয়াসক্তি তাকে অসৎ পথে নামায় না। সে ধনী না হলেও তার হৃদয়-মনে থাকে ধনবত্তা। আর মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ الغِنَى عَن كَثرَةِ العَرَضِ ، وَلَكِنَّ الغِنَى غِنَى النَّفْسِ
"বিষয় সম্পদের আধিক্য ধনবত্তা নয়, প্রকৃত ধনবত্তা হল অন্তরের ধনবত্তা।”৪৩৩
যা পেয়েছে তাতেই যদি মানুষ তুষ্ট হয়, তাহলে সেই হয় আসল সুখী, আসল ধনী ও সফল মানুষ। মহানবী বলেছেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ أَسْلَمَ ، وَكَانَ رِزْقُهُ كَفَافاً ، وَقَنَّعَهُ اللَّهُ بِمَا آتَاهُ
"সে ব্যক্তি সফলকাম, যে ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাকে পরিমিত রুযী দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তাতে তাকে তুষ্ট করেছেন।” ৪৩৪
আসল রাজা ও সারা দুনিয়ার মালিক কে জানেন? রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمْ آمِنًا فِي سِرْبِهِ مُعَافَى فِي جَسَدِهِ عِنْدَهُ قُوتُ يَوْمِهِ فَكَأَنَّمَا حِيزَتْ لَهُ الدُّنْيا بحذافيرها
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ঘরে অথবা গোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপদে ও সুস্থ শরীরে সকাল করেছে এবং তার কাছে প্রতি দিনের খাবার আছে, তাকে যেন পার্থিব সমস্ত সম্পদ দান করা হয়েছে।"৪৩৫
চরিত্রবান নিজের যা কিছু, তাই নিয়েই ক্ষান্ত হয়। তার মানে চেষ্টা যে চালায় না, তা নয়। কিন্তু চেষ্টার পরেও না পেলে আফসোস করে না। যে পেয়েছে, তার দেখে হিংসা করে না। যার আছে, তার দেখে লোভ করে না। কারণ তাতে মহান আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে তুচ্ছজ্ঞান করা হয় এবং দুঃখ ও মনঃকষ্ট ছাড়া কিছু লাভ হয় না। এই জন্য মহানবী বলেছেন,
اُنْظُرُوا إِلَى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ فَهُوَ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ
“তোমাদের উপরে যারা তাদের দিকে দেখো না; বরং তোমার নিচে যারা তাদের দিকে দেখ। যাতে তোমাদের প্রতি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে তুচ্ছজ্ঞান না কর।”৪৩৬
যে নারী বা পুরুষ নিজের ভাগ্য ও ভাগ নিয়ে তুষ্ট, সেই আসলে সবার চাইতে বড় ধনী। সেই আসলে সবার চাইতে বড় কৃতজ্ঞ। মহানবী আবূ হুরাইরা কে অসিয়ত ক'রে বলেছিলেন,
اتَّقِ الْمَحَارِمَ تَكُنْ أَعْبَدَ النَّاسِ وَارْضَ بِمَا قَسَمَ اللَّهُ لَكَ تَكُنْ أَغْنَى النَّاسِ وَأَحْسِنُ إِلَى جَارِكَ تَكُنْ مُؤْمِنًا وَأَحِبَّ لِلنَّاسِ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ تَكُنْ مُسْلِمًا وَلَا تُكْثِرُ الضَّحِكَ فَإِنَّ كَثْرَةَ الضَّحِكِ تُمِيتُ الْقَلْبَ
"নিষিদ্ধ ও হারাম জিনিস থেকে বেঁচে থাক, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সব চেয়ে বড় আ'বেদ (ইবাদতকারী) গণ্য হবে। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন, তাতেই পরিতুষ্ট থাক, তবে তুমিই মানুষের মধ্যে সব চেয়ে বড় ধনী হবে। প্রতিবেশীর প্রতি অনুগ্রহ কর, তাহলে তুমি একজন (খাঁটি) মু'মিন বিবেচিত হবে। মানুষের জন্যও তা-ই পছন্দ কর, যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ কর, তাহলে তুমি একজন (খাঁটি) মুসলিম গণ্য হবে। আর খুব বেশী হাসবে না, কারণ, অধিক হাসি অন্তরকে মেরে দেয়।"৪৩৭
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
يَا أَبَا هُرَيْرَةَ كُنْ وَرِعًا تَكُنْ أَعْبَدَ النَّاسِ ، وَكُنْ قَنِعًا تَكُنْ أَشْكَرَ النَّاسِ ، وَأَحِبَّ لِلنَّاسِ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ تَكُنْ مُؤْمِنًا، وَأَحَسِنُ جِوَارَ مَنْ جَاوَرَكَ تَكُنْ مُسْلِمًا ، وَأَقِلَّ الضَّحِكَ ، فَإِنَّ كَثْرَةَ الضَّحِكِ تُمِيتُ الْقَلْبَ
"হে আবু হুরাইরা! তুমি নিজের মধ্যে আল্লাহভীরুতা নিয়ে এস, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় আবেদ হয়ে যাবে। আর অল্পে পরিতুষ্ট হও, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সব থেকে বেশী কৃতজ্ঞ হয়ে যাবে। মানুষের জন্যও তা-ই পছন্দ কর, যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ কর, তাহলে তুমি একজন (খাঁটি) মু'মিন গণ্য হবে। তোমার প্রতিবেশীর প্রতি সদ্ব্যবহার কর, তাহলে তুমি একজন (খাঁটি) মুসলিম বিবেচিত হবে। আর হাসি কম কর, কারণ, অধিক হাসি অন্তরকে মেরে দেয়।”৪৩৮
যাকে অল্প তুষ্ট করতে পারে না, তাকে অধিকও সন্তুষ্ট করতে পারবে না। ধনী হওয়ার পরেও মনের লোভ, আশা ও আকাঙ্ক্ষা তাকে দরিদ্র বানিয়ে রাখবে। আসলে ধনের ধনী ধনী নয়, মনের ধনীই ধনী। অল্পে তুষ্ট হৃদয় দরিয়া থেকেও বিশাল, ধনীর থেকেও বড় ধনী।
অল্প তুষ্ট হওয়া আমানতের দলীল। যে মানুষের ভিতরে আধিক্যের লোভ নেই, সে কোনদিন খিয়ানত করে না। আর স্বভাবতই সে চরিত্রবান হয়।
বলা বাহুল্য, জীবনে কী পেলাম, আর কী পেলাম না, তার হিসাব-নিকাশ না ক'রে, যা পেয়েছি ও পাচ্ছি তাতেই সন্তুষ্ট থাকা বুদ্ধিমানের কাজ।
অতিরিক্ত পাওয়ার লোভে অসৎ উপায় অবলম্বন করে না চরিত্রবান। যেমন যা নেই, তা পাওয়ার জন্য ভিক্ষাবৃত্তির পথ অবলম্বন করে না সুন্দর চরিত্রের অধিকারী। মহানবী বলেছেন,
اليَدُ العُلْيَا خَيْرٌ مِنَ اليَدِ السُّفْلَى ، وَابْدَأَ بِمَنْ تَعُولُ ، وَخَيْرُ الصَّدَقَةِ مَا كَانَ عَنْ ظَهْرِ غِنى ، وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَّهُ اللَّهُ ، وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللَّهُ
"উপরের (দাতা) হাত নিচের (গ্রহীতা) হাত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। যাদের ভরণ- পোষণ তোমার দায়িত্বে আছে তাদেরকে আগে দাও। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থেকে সাদকাহ করা উত্তম। যে ব্যক্তি (হারাম ও ভিক্ষা করা থেকে পবিত্র থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখেন এবং যে পরমুখাপেক্ষিতা থেকে বেঁচে থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে অভাবশূন্য ক'রে দেন।”৪৩৯

টিকাঃ
৪৩৩. বুখারী ৬৪৪৬, মুসলিম ২৪৬৭
৪৩৪. মুসলিম ২৪৭৩
৪৩৫. তিরমিযী ২৩৪৬, ইবনে মাজাহ ৪১৪১
৪৩৬. বুখারী ৬৪৯০ ভিন্ন শব্দে, মুসলিম ৭৬১৯
৪৩৭. আহমাদ ৮০৯৫, তিরমিযী ২৩০৫, সহীহুল জামে ৪৫৮০, ৭৮৩৩
৪৩৮. বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ ২৫২, ইবনে মাজা ৪২১৭
৪৩৯. বুখারী ১৪২৭, মুসলিম ২৪৩৩

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা

📄 পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা


সুচরিত্রবান মানুষের একটি গুণ হল, মনের দিক দিয়ে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থেকে দেহের দিক দিয়েও পবিত্র-পরিচ্ছন্ন থাকা।
যৌনাচার করার পর অথবা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হওয়ার জন্য গোসল করা।
প্রস্রাব-পায়খানার পর বিশেষ ক্ষেত্রে ওযু করা। দাঁত-মুখ পরিষ্কার করা। লেবাস-পোশাক পরিষ্কার করা। বাড়ি ও তার সম্মুখভাগ পরিষ্কার রাখা। ইত্যাদি।
এতে তার সুন্দর চরিত্রের বিকাশ ঘটে এবং লোকমাঝে সে সভ্য ও ভদ্র বলে পরিচিত হয়।
মহিলাদের ঋতুস্রাব এক প্রকার অশুচিতা। তা পালন করার বিধান রয়েছে ইসলামে। আর সেই সাথে বিশেষ নির্দেশ রয়েছে তাদের স্বামীদের প্রতি। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَзِلُوا النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
"লোকে তোমাকে রজঃস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বল, তা অশুচি। সুতরাং তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রীসঙ্গ বর্জন কর এবং যতদিন না তারা পবিত্র হয়, (সহবাসের জন্য) তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হয়, তখন তাদের নিকট ঠিক সেইভাবে গমন কর, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থিগণকে এবং যারা পবিত্র থাকে, তাদেরকে পছন্দ করেন।"৪৪০
প্রত্যহ কমসে-কম পাঁচবার মহান আল্লাহর বিশেষ স্মরণের সময় পবিত্রতার বিশেষ বিধান দিয়ে তিনি বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُؤُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَينِ وَإِن كُنتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا وَإِن كُنتُم مَّرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاء أَحَدٌ مَّنكُم مِّنَ الْغَائِطِ أَوْ لَا مَسْتُمُ النِّسَاءِ فَلَمْ تَجِدُوا مَاء فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُم مِّنْهُ مَا يُرِيدُ اللهِ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍ وَلَكِن يُرِيدُ لِيُطَهَّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
"হে বিশ্বাসিগণ! যখন তোমরা স্বলাতের জন্য প্রস্তুত হবে, তখন তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর এবং তোমাদের মাথা মাসাহ কর এবং পা গ্রন্থি পর্যন্ত ধৌত কর। আর যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তাহলে বিশেষভাবে (গোসল ক'রে) পবিত্র হও। যদি তোমরা পীড়িত হও অথবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা হতে আগমন করে, অথবা তোমরা স্ত্রী-সহবাস কর এবং পানি না পাও, তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম কর; তা দিয়ে তোমাদের মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় মাসাহ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে কোন প্রকার কষ্ট দিতে চান না, বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান ও তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।"৪৪১
লেবাস-পোশাককে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেছেন,
وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ - وَالرُّجْزَ فَاهْجُرُ
"তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ এবং অপবিত্রতা বর্জন কর।"৪৪২
যারা পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসে, মহান প্রতিপালক তাদেরকে ভালোবাসেন। এ ব্যাপারে কুবাবাসীর প্রশংসা ক'রে তিনি বলেছেন,
فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَن يَتَطَهَّرُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ
"সেখানে এমন সব লোক রয়েছে, যারা উত্তমরূপে পবিত্র হওয়াকে পছন্দ করে। আর আল্লাহ উত্তমরূপে পবিত্রতা সম্পাদনকারীদেরকে পছন্দ করেন।"৪৩৩
পত্রিতার বিশাল গুরুত্বারোপ ক'রে মহানবী বলেছেন,
الطُّهُورُ شَطَرُ الإِيمَانِ
")বাহ্যিক) পবিত্রতা অর্জন করা হল অর্ধেক ঈমান।"৪৪৪
তিনি অতিরিক্ত পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার বিধান দিয়ে বলেছেন,
عَشْرٌ مِنَ الفِطْرَةِ : قَصُّ الشَّارِبِ ، وَإِعْفَاءُ اللَّحْيَةِ ، وَالسَّوَاكُ ، وَاسْتِنْشَاقُ المَاءِ ، وَقَصُّ الأَظْفَارِ ، وَغَسْلُ البَرَاجِمِ ، وَنَتفُ الإِبْطِ ، وَحَلْقُ العَانَةِ ، وَانْتِقَاصُ المَاءِ والمَضمَضَةُ
"দশটি কাজ প্রকৃতিগত আচরণ; (১) গোঁফ ছেঁটে ফেলা। (২) দাড়ি বাড়ানো। (৩) দাঁতন করা। (৪) নাকে পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করা। (৫) নখ কাটা। (৬) আঙ্গুলের জোড়সমূহ ধোয়া। (৭) বগলের লোম তুলে ফেলা। (৮) গুপ্তাঙ্গের লোম পরিষ্কার করা। (৯) পানি দ্বারা ইস্তেঞ্জা (শৌচকর্ম) করা। এবং (১০) কুল্লি করা।”৪৪৫
লক্ষণীয় যে, ইসলামে প্রকৃতিগত আচরণ লম্বা মোছ ও নখ রাখা নয়। বরং আনাস (রাঃ) বলেছেন, 'মোছ ছাঁটা, নখ কাটা, নাভির নিচের লোম চাঁছা এবং বোগলের লোম তুলে ফেলার ব্যাপারে আমাদেরকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে; যাতে আমরা সে সব চল্লিশ দিনের বেশী ছেড়ে না রাখি।'৪৪৬
আপনার মুখের দুর্গন্ধের কারণে আপনার নিকট থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। ফলে আপনি তার নিকট অসভ্য তথা ছোট হয়ে যেতে পারেন। তাই দাঁত মাজার বিধান রয়েছে ইসলামে। মহানবী ﷺ বলেছেন,
السَّوَاكُ مَظْهَرَةٌ لِلْفَمِ مَرْضَاةٌ للرَّبِّ
"দাঁতন মুখ পবিত্র রাখার ও প্রভুর সন্তুষ্টি লাভের উপকরণ।"৪৪৭
মানুষ যখন কোন স্থলে একত্রিত জমায়েত হয়, তখন তার পরিচ্ছন্নতার বেশি প্রয়োজন পড়ে। শরীরে দুর্গন্ধ থাকলে, পরিশ্রমজনিত কারণে দেহ ঘর্মাক্ত থাকলে গোসলের অতি প্রয়োজন হয়। তা না হলে সভা বা সমাবেশে ছোট হতে হয়। এই জন্য জুমআর সমাবেশের দিন গোসল করা এবং সাধ্যমতো সুগন্ধি ব্যবহার করা আবশ্যক। মহানবী ﷺ বলেছেন,
غُسْلُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ عَلَى كُلِّ مُحْتَلِمٍ وَسِوَاكَ وَيَمَسُّ مِنَ الطَّيبِ مَا قَدَرَ عَلَيْهِ
"প্রত্যেক সাবালকের জন্য জুমআর দিন গোসল করা, মিসওয়াক করা এবং যথাসাধ্য সুগন্ধি ব্যবহার করা কর্তব্য। "৪৪৮
বাহ্যিক বেশভূষাতেও সভ্য ও ভদ্র থাকতে হয় মুসলিমকে। মাথার চুল পরিষ্কার ক'রে ও আঁচড়ে রাখা এবং নতুন না হলেও পরিষ্কার পোশাক পরিধান করা আবশ্যক।
জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, একদা আল্লাহর রসূল ﷺ আমাদের নিকট এসে এক ব্যক্তির মাথায় আলুথালু চুল দেখে বললেন,
أَمَا كَانَ يَجِدُ هَذَا مَا يُسَكِّنُ بِهِ شَعْرَهُ
"এর কি এমন কিছুও নেই, যার দ্বারা মাথার এলোমেলো চুলগুলোকে সোজা করে (আঁচড়ে) নেয়?!"
আর এক ব্যক্তির পরনে ময়লা কাপড় দেখে বললেন,
أَمَا كَانَ هَذَا يَجِدُ مَاءً يَغْسِلُ بِهِ ثَوْبَهُ
"এর কি এমন কিছুও নেই, যার দ্বারা ময়লা কাপড়কে পরিষ্কার করে নেয়?!"৪৪৯
সাধ্যে কুলালে সুন্দর পোশাক ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয় ভদ্র মানুষের জন্য। ধনী হয়েও কার্পণ্য ক'রে ভালো লেবাস না পরে নিজেকে গরীবের মতো প্রদর্শন ও প্রকাশ করা সভ্য মানুষের আচরণ নয়। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الجمال ويحبُّ أنْ يَرَى أَثَرَ نِعْمَتِهِ عَلَى عَبْدِهِ وَيَبْغُضُ البؤس والتَّباؤُسَ
"অবশ্যই আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। বান্দাকে তিনি যে নেয়ামত দান করেছেন তার চিহ্ন (তার দেহে) দেখতে পছন্দ করেন। আর তিনি দারিদ্র ও (লোকচক্ষে) দরিদ্র সাজাকে ঘৃণা করেন।"৪৫০
আবুল আহওয়াসের পিতা বলেন, একদা আমি আল্লাহর রসূল এর নিকট এলাম। আমার পরনে ছিল নেহাতই নিম্নমানের কাপড়। তিনি তা দেখে আমাকে বললেন, "তোমার কি মাল-ধন আছে?” আমি বললাম, 'জী হ্যাঁ।' বললেন, "কোন্ শ্রেণীর মাল আছে?” আমি বললাম, 'সকল শ্রেণীরই মাল আমার নিকট মজুদ। আল্লাহ আমাকে উট, গরু, ছাগল, ভেড়া, ঘোড়া ও ক্রীতদাস দান করেছেন।' তিনি বললেন,
فَإِذَا أَتَاكَ اللهُ مَالاً فَلْيُرَ أَثَرُ نِعْمَةِ اللَّهِ عَلَيْكَ وَكَرَامَتِهِ
"আল্লাহ যখন তোমাকে এত মাল দান করেছেন, তখন আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত ও অনুগ্রহ তোমার বেশ-ভূষায় প্রকাশ পাওয়া উচিত।"৪৫১
আমভাবে একজন মুসলিম হবে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও সভ্য। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
إِنَّ الْهَدْيَ الصَّالِحَ وَالسَّمْتَ الصَّالِحَ وَالاِقْتِصَادَ جُزْءٌ مِنْ خَمْسَةٍ وَعِشْرِينَ جُزْءًا مِنَ النُّبُوَّةِ
"উত্তম আদর্শ, উত্তম বেশভূষা এবং মিতাচারিতা নবুঅতের ২৫ অংশের অন্যতম অংশ।"৪৫২
সর্বাঙ্গসুন্দর দ্বীন-এ-ইসলাম, সুন্দর তার সবকিছু, সুন্দর তার অনুসারী সকল নর ও নারী।

টিকাঃ
৪৪০. সূরা বাক্বারাহ-২: ২২২
৪৪১. সূরা মায়িদাহ: ৬
৪৪২. সূরা মুদ্দাষির: ৪-৫
৪৩৩. সূরা তাওবাহ: ১০৮
৪৪৪. মুসলিম ৫৫৬
৪৪৫. মুসলিম ৬২৭
৪৪৬. মুসলিম ৬২২
৪৪৭. আহমাদ ২৪২০৩, নাসাঈ ৫, ইবনে খুযাইমাহ ১৩৫, দারেমী ৬৮৪, বুখারী বিনা সনদে, সহীহ তারগীব ২০২
৪৪৮. বুখারী ৮৮০, মুসলিম ১৯৯৭
৪৪৯. আহমাদ ১৪৮৫০, আবু দাউদ ৪০৬৪, নাসাঈ, মিশকাত ৪৩৫১
৪৫০. বাইহাকক্সীর আবুল ঈমান ৬২০১, সহীহুল জামে' ১৭৪২
৪৫১. আহমাদ ১৫৮৮৭, আবু দাউদ ৪০৬৫, নাসাঈ ৫২২৪, মিশকাত ৪৩৫২
৪৫২. আহমাদ ২৬৯৮, আবু দাউদ ৪৭৭৮, সহীহুল জামে' ১৯৯৩

সুচরিত্রবান মানুষের একটি গুণ হল, মনের দিক দিয়ে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থেকে দেহের দিক দিয়েও পবিত্র-পরিচ্ছন্ন থাকা।
যৌনাচার করার পর অথবা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হওয়ার জন্য গোসল করা।
প্রস্রাব-পায়খানার পর বিশেষ ক্ষেত্রে ওযু করা। দাঁত-মুখ পরিষ্কার করা। লেবাস-পোশাক পরিষ্কার করা। বাড়ি ও তার সম্মুখভাগ পরিষ্কার রাখা। ইত্যাদি।
এতে তার সুন্দর চরিত্রের বিকাশ ঘটে এবং লোকমাঝে সে সভ্য ও ভদ্র বলে পরিচিত হয়।
মহিলাদের ঋতুস্রাব এক প্রকার অশুচিতা। তা পালন করার বিধান রয়েছে ইসলামে। আর সেই সাথে বিশেষ নির্দেশ রয়েছে তাদের স্বামীদের প্রতি। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَзِلُوا النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
"লোকে তোমাকে রজঃস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বল, তা অশুচি। সুতরাং তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রীসঙ্গ বর্জন কর এবং যতদিন না তারা পবিত্র হয়, (সহবাসের জন্য) তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হয়, তখন তাদের নিকট ঠিক সেইভাবে গমন কর, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থিগণকে এবং যারা পবিত্র থাকে, তাদেরকে পছন্দ করেন।"৪৪০
প্রত্যহ কমসে-কম পাঁচবার মহান আল্লাহর বিশেষ স্মরণের সময় পবিত্রতার বিশেষ বিধান দিয়ে তিনি বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُؤُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَينِ وَإِن كُنتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا وَإِن كُنتُم مَّرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاء أَحَدٌ مَّنكُم مِّنَ الْغَائِطِ أَوْ لَا مَسْتُمُ النِّسَاءِ فَلَمْ تَجِدُوا مَاء فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُم مِّنْهُ مَا يُرِيدُ اللهِ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍ وَلَكِن يُرِيدُ لِيُطَهَّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
"হে বিশ্বাসিগণ! যখন তোমরা স্বলাতের জন্য প্রস্তুত হবে, তখন তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর এবং তোমাদের মাথা মাসাহ কর এবং পা গ্রন্থি পর্যন্ত ধৌত কর। আর যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তাহলে বিশেষভাবে (গোসল ক'রে) পবিত্র হও। যদি তোমরা পীড়িত হও অথবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা হতে আগমন করে, অথবা তোমরা স্ত্রী-সহবাস কর এবং পানি না পাও, তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম কর; তা দিয়ে তোমাদের মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় মাসাহ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে কোন প্রকার কষ্ট দিতে চান না, বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান ও তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।"৪৪১
লেবাস-পোশাককে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেছেন,
وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ - وَالرُّجْزَ فَاهْجُرُ
"তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ এবং অপবিত্রতা বর্জন কর।"৪৪২
যারা পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসে, মহান প্রতিপালক তাদেরকে ভালোবাসেন। এ ব্যাপারে কুবাবাসীর প্রশংসা ক'রে তিনি বলেছেন,
فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَن يَتَطَهَّرُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ
"সেখানে এমন সব লোক রয়েছে, যারা উত্তমরূপে পবিত্র হওয়াকে পছন্দ করে। আর আল্লাহ উত্তমরূপে পবিত্রতা সম্পাদনকারীদেরকে পছন্দ করেন।"৪৩৩
পত্রিতার বিশাল গুরুত্বারোপ ক'রে মহানবী বলেছেন,
الطُّهُورُ شَطَرُ الإِيمَانِ
")বাহ্যিক) পবিত্রতা অর্জন করা হল অর্ধেক ঈমান।"৪৪৪
তিনি অতিরিক্ত পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার বিধান দিয়ে বলেছেন,
عَشْرٌ مِنَ الفِطْرَةِ : قَصُّ الشَّارِبِ ، وَإِعْفَاءُ اللَّحْيَةِ ، وَالسَّوَاكُ ، وَاسْتِنْشَاقُ المَاءِ ، وَقَصُّ الأَظْفَارِ ، وَغَسْلُ البَرَاجِمِ ، وَنَتفُ الإِبْطِ ، وَحَلْقُ العَانَةِ ، وَانْتِقَاصُ المَاءِ والمَضمَضَةُ
"দশটি কাজ প্রকৃতিগত আচরণ; (১) গোঁফ ছেঁটে ফেলা। (২) দাড়ি বাড়ানো। (৩) দাঁতন করা। (৪) নাকে পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করা। (৫) নখ কাটা। (৬) আঙ্গুলের জোড়সমূহ ধোয়া। (৭) বগলের লোম তুলে ফেলা। (৮) গুপ্তাঙ্গের লোম পরিষ্কার করা। (৯) পানি দ্বারা ইস্তেঞ্জা (শৌচকর্ম) করা। এবং (১০) কুল্লি করা।”৪৪৫
লক্ষণীয় যে, ইসলামে প্রকৃতিগত আচরণ লম্বা মোছ ও নখ রাখা নয়। বরং আনাস (রাঃ) বলেছেন, 'মোছ ছাঁটা, নখ কাটা, নাভির নিচের লোম চাঁছা এবং বোগলের লোম তুলে ফেলার ব্যাপারে আমাদেরকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে; যাতে আমরা সে সব চল্লিশ দিনের বেশী ছেড়ে না রাখি।'৪৪৬
আপনার মুখের দুর্গন্ধের কারণে আপনার নিকট থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। ফলে আপনি তার নিকট অসভ্য তথা ছোট হয়ে যেতে পারেন। তাই দাঁত মাজার বিধান রয়েছে ইসলামে। মহানবী ﷺ বলেছেন,
السَّوَاكُ مَظْهَرَةٌ لِلْفَمِ مَرْضَاةٌ للرَّبِّ
"দাঁতন মুখ পবিত্র রাখার ও প্রভুর সন্তুষ্টি লাভের উপকরণ।"৪৪৭
মানুষ যখন কোন স্থলে একত্রিত জমায়েত হয়, তখন তার পরিচ্ছন্নতার বেশি প্রয়োজন পড়ে। শরীরে দুর্গন্ধ থাকলে, পরিশ্রমজনিত কারণে দেহ ঘর্মাক্ত থাকলে গোসলের অতি প্রয়োজন হয়। তা না হলে সভা বা সমাবেশে ছোট হতে হয়। এই জন্য জুমআর সমাবেশের দিন গোসল করা এবং সাধ্যমতো সুগন্ধি ব্যবহার করা আবশ্যক। মহানবী ﷺ বলেছেন,
غُسْلُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ عَلَى كُلِّ مُحْتَلِمٍ وَسِوَاكَ وَيَمَسُّ مِنَ الطَّيبِ مَا قَدَرَ عَلَيْهِ
"প্রত্যেক সাবালকের জন্য জুমআর দিন গোসল করা, মিসওয়াক করা এবং যথাসাধ্য সুগন্ধি ব্যবহার করা কর্তব্য। "৪৪৮
বাহ্যিক বেশভূষাতেও সভ্য ও ভদ্র থাকতে হয় মুসলিমকে। মাথার চুল পরিষ্কার ক'রে ও আঁচড়ে রাখা এবং নতুন না হলেও পরিষ্কার পোশাক পরিধান করা আবশ্যক।
জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, একদা আল্লাহর রসূল ﷺ আমাদের নিকট এসে এক ব্যক্তির মাথায় আলুথালু চুল দেখে বললেন,
أَمَا كَانَ يَجِدُ هَذَا مَا يُسَكِّنُ بِهِ شَعْرَهُ
"এর কি এমন কিছুও নেই, যার দ্বারা মাথার এলোমেলো চুলগুলোকে সোজা করে (আঁচড়ে) নেয়?!"
আর এক ব্যক্তির পরনে ময়লা কাপড় দেখে বললেন,
أَمَا كَانَ هَذَا يَجِدُ مَاءً يَغْسِلُ بِهِ ثَوْبَهُ
"এর কি এমন কিছুও নেই, যার দ্বারা ময়লা কাপড়কে পরিষ্কার করে নেয়?!"৪৪৯
সাধ্যে কুলালে সুন্দর পোশাক ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয় ভদ্র মানুষের জন্য। ধনী হয়েও কার্পণ্য ক'রে ভালো লেবাস না পরে নিজেকে গরীবের মতো প্রদর্শন ও প্রকাশ করা সভ্য মানুষের আচরণ নয়। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الجمال ويحبُّ أنْ يَرَى أَثَرَ نِعْمَتِهِ عَلَى عَبْدِهِ وَيَبْغُضُ البؤس والتَّباؤُسَ
"অবশ্যই আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। বান্দাকে তিনি যে নেয়ামত দান করেছেন তার চিহ্ন (তার দেহে) দেখতে পছন্দ করেন। আর তিনি দারিদ্র ও (লোকচক্ষে) দরিদ্র সাজাকে ঘৃণা করেন।"৪৫০
আবুল আহওয়াসের পিতা বলেন, একদা আমি আল্লাহর রসূল এর নিকট এলাম। আমার পরনে ছিল নেহাতই নিম্নমানের কাপড়। তিনি তা দেখে আমাকে বললেন, "তোমার কি মাল-ধন আছে?” আমি বললাম, 'জী হ্যাঁ।' বললেন, "কোন্ শ্রেণীর মাল আছে?” আমি বললাম, 'সকল শ্রেণীরই মাল আমার নিকট মজুদ। আল্লাহ আমাকে উট, গরু, ছাগল, ভেড়া, ঘোড়া ও ক্রীতদাস দান করেছেন।' তিনি বললেন,
فَإِذَا أَتَاكَ اللهُ مَالاً فَلْيُرَ أَثَرُ نِعْمَةِ اللَّهِ عَلَيْكَ وَكَرَامَتِهِ
"আল্লাহ যখন তোমাকে এত মাল দান করেছেন, তখন আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত ও অনুগ্রহ তোমার বেশ-ভূষায় প্রকাশ পাওয়া উচিত।"৪৫১
আমভাবে একজন মুসলিম হবে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও সভ্য। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
إِنَّ الْهَدْيَ الصَّالِحَ وَالسَّمْتَ الصَّالِحَ وَالاِقْتِصَادَ جُزْءٌ مِنْ خَمْسَةٍ وَعِشْرِينَ جُزْءًا مِنَ النُّبُوَّةِ
"উত্তম আদর্শ, উত্তম বেশভূষা এবং মিতাচারিতা নবুঅতের ২৫ অংশের অন্যতম অংশ।"৪৫২
সর্বাঙ্গসুন্দর দ্বীন-এ-ইসলাম, সুন্দর তার সবকিছু, সুন্দর তার অনুসারী সকল নর ও নারী।

টিকাঃ
৪৪০. সূরা বাক্বারাহ-২: ২২২
৪৪১. সূরা মায়িদাহ: ৬
৪৪২. সূরা মুদ্দাষির: ৪-৫
৪৩৩. সূরা তাওবাহ: ১০৮
৪৪৪. মুসলিম ৫৫৬
৪৪৫. মুসলিম ৬২৭
৪৪৬. মুসলিম ৬২২
৪৪৭. আহমাদ ২৪২০৩, নাসাঈ ৫, ইবনে খুযাইমাহ ১৩৫, দারেমী ৬৮৪, বুখারী বিনা সনদে, সহীহ তারগীব ২০২
৪৪৮. বুখারী ৮৮০, মুসলিম ১৯৯৭
৪৪৯. আহমাদ ১৪৮৫০, আবু দাউদ ৪০৬৪, নাসাঈ, মিশকাত ৪৩৫১
৪৫০. বাইহাকক্সীর আবুল ঈমান ৬২০১, সহীহুল জামে' ১৭৪২
৪৫১. আহমাদ ১৫৮৮৭, আবু দাউদ ৪০৬৫, নাসাঈ ৫২২৪, মিশকাত ৪৩৫২
৪৫২. আহমাদ ২৬৯৮, আবু দাউদ ৪৭৭৮, সহীহুল জামে' ১৯৯৩

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 প্রতিশ্রুতি পালন

📄 প্রতিশ্রুতি পালন


মহান আল্লাহকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করা মানুষের চরিত্রগত একটি মহৎ গুণ, বরং সব চাইতে বড় সচ্চরিত্রতা। যেহেতু তা সব চাইতে মহান সত্ত্বার সাথে প্রতিশ্রুতি, অঙ্গীকার ও চুক্তি। কুরআন কারীমের বিভিন্ন জায়গায় তার তাকীদ এসেছে। যেমন যারা সে প্রতিশ্রুতি পালন করে, তিনি তাদের প্রশংসা ক'রে বলেছেন,
أَفَمَن يَعْلَمُ أَنَّمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَبِّكَ الْحَقُّ كَمَنْ هُوَ أَعْمَى إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُوا الأَلْبَابِ - الَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَلَا يَنقُضُونَ الْمِيثَاقَ
"তোমার প্রতিপালক হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা যে ব্যক্তি সত্য বলে জানে সে আর অন্ধ কি সমান? কেবলমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই উপদেশ গ্রহণ ক'রে থাকে। যারা আল্লাহকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং চুক্তি ভঙ্গ করে না।”৪৫৩
যারা মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না, তাদের নিন্দা ক'রে তিনি বলেছেন,
وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَاسِقِينَ - الَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ
"বস্তুতঃ তিনি সৎপথ পরিত্যাগীদের ছাড়া আর কাউকেও তার দ্বারা বিভ্রান্ত করেন না। যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।”৪৫৪
যারা মহান আল্লাহর অঙ্গীকার পালন করে না, তারা অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য পরকালে রয়েছে মন্দ আবাস। তিনি বলেছেন,
وَالَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللهُ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهِ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُوْلَئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ
"যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য আছে অভিসম্পাত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস। ৪৫৫
তুচ্ছ কোন পার্থিব স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে তিনি নিষেধ করেছেন,
وَلَا تَشْتَرُوا بِعَهْدِ اللهِ ثَمَنًا قَلِيلاً إِنَّمَا عِنْدَ اللهِ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
“তোমরা আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করো না। আল্লাহর কাছে তা উত্তম; যদি তোমরা জানতে।”৪৫৬
এরূপ যারা করে, তাদের নেহাতই মন্দ পরিণামের কথা উল্লেখ ক'রে তিনি বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلاً أُوْلَئِكَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ وَلَا يَنظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
“যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে স্বল্প মূল্যে বিক্রয় করে, পরকালে তাদের কোন অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, আর তাদের দিকে চেয়ে দেখবেন না এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।”৪৫৭
মহান আল্লাহকে দেওয়া মানুষের সে প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার কী?
সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার পালন হল, তাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন করা এবং তার তাওহীদকে প্রতিষ্ঠা করা।
আর সে অঙ্গীকার ভঙ্গ করা বা বিক্রয় করার অর্থ হল, তাঁকে অবিশ্বাস করা অথবা তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করা।
মহান প্রতিপালক যুগে যুগে নবী-রসূল (আলাইহিমুস সালাম) গণের মাধ্যমে মানুষের নিকট তাঁর যে নির্দেশ পাঠিয়েছেন, তা পালন করা হল তাঁর অঙ্গীকার পালন করা। আর তাঁর আদেশ ও নিষেধ লংঘন করার মানে হল, তাঁর অঙ্গীকার ভঙ্গ করা।
মানুষের হয়তো মনে নেই, সে কিন্তু মহান আল্লাহর কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নবীগণ এসে সে কথা স্মরণ করিয়েছেন এবং বলেছেন,
وَأَوْفُوا بِعَهْدِي أُوفِ بِعَهْدِكُمْ وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ
“আমার সঙ্গে তোমাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ কর, আমিও তোমাদের সঙ্গে আমার কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করব। আর তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।”৪৫৮
মানুষের হয়তো বিস্মৃত হয়েছে সে মহা অঙ্গীকার। কিন্তু মহান আল্লাহ তা স্মরণ করিয়ে বলেছেন,
وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِن بَنِي آدَمَ مِن ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا أَن تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِينَ
“স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ হতে তাদের সন্তান-সন্ততি বাহির করেন এবং তাদের নিজেদের সম্বন্ধে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলে, ‘নিশ্চয়ই। আমরা সাক্ষী রইলাম।’ (এ স্বীকৃতি গ্রহণ) এ জন্য যে, তোমরা যেন কিয়ামতের দিন না বল, ‘আমরা তো এ বিষয়ে জানতাম না।’ ”৪৫৯
হাদীসে এসেছে, আরাফার দিনে নু'মান নামক জায়গায় মহান আল্লাহ আদম-সন্তান হতে অঙ্গীকার নিয়েছেন। সেদিন তিনি আদম আলাইহিস সালাম -এর সকল সন্তানকে তার পৃষ্ঠদেশ হতে বের করলেন এবং তাদেরকে নিজের সামনে (পিঁপড়ের আকারে) ছড়িয়ে দিলেন ও তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমি কি তোমাদের রব (প্রতিপালক) নই।’ সকলে বলেছিল, بَلَى شَهِدْنَا অবশ্যই, আমরা সকলেই আপনার রব হওয়ার সাক্ষ্য দিচ্ছি। ৪৬০
মানুষ বিস্মৃত হলেও আল্লাহর রব হওয়ার সাক্ষ্য প্রত্যেক মানুষের প্রকৃতিতে সন্নিবিষ্ট আছে। এই ভাবার্থকেই আল্লাহর রসূল ﷺ এইভাবে বর্ণনা করেছেন, “প্রতিটি শিশু (ইসলামী ধর্মবোধের) প্রকৃতি নিয়ে জন্ম নেয়। পরে তার মাতা-পিতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজক বানিয়ে নেয়। যেমন জন্তুর বাচ্চা সম্পূর্ণ জন্ম হয়, তার নাক ও কান কাটা থাকে না। ”৪৬১
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন, 'আমি আমার বান্দাদেরকে একনিষ্ঠ (একমাত্র ইসলামের প্রতি অনুগত) রূপে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর শয়তান তাদেরকে ইসলামী প্রকৃতি হতে পথভ্রষ্ট ক'রে দেয়। '৪৬২
এই প্রকৃতিই আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর অবতীর্ণকৃত শরীয়ত। যা এখন ইসলাম নামে সংরক্ষিত। ৪৬৩
বলা বাহুল্য, যে ইসলাম প্রত্যখ্যান করে, সে আসলে মহান সৃষ্টিকর্তার সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে। মহান আল্লাহর আরও একটি ব্যাপক নির্দেশ হল,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা অঙ্গীকার (ও চুক্তিসমূহ) পূর্ণ কর।"৪৬৪
যায়দ বিন আসলাম বলেছেন, 'তা ছয় প্রকারঃ (১) আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার, (২) মৈত্রী-চুক্তি, (৩) শরীকানার চুক্তি, (৪) ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি, (৫) বিবাহ-বন্ধন এবং (৬) আল্লাহর নামে কৃত শপথ বা কসমের অঙ্গীকার।'
উক্ত ৬ প্রকার চুক্তি বা অঙ্গীকার পালন করা আবশ্যক। যেমন মহান আল্লাহর নামে নযর মানাও এক প্রকার অঙ্গীকার। আর তাও পালন করা ওয়াজেব। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাগণের গুণ বর্ণনায় বলেছেন,
يُوفُونَ بِالنَّذْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ شَرُّهُ مُسْتَطِيرًا
"তারা মানত পূর্ণ করে এবং সেদিনের ভয় করে, যেদিনের বিপত্তি হবে ব্যাপক।"৪৬৫
তিনি আরো বলেছেন,
وَأَوْفُوا بِعَهْدِ اللهِ إِذَا عَاهَدتُّمْ وَلَا تَنقُضُوا الأَيْمَانَ بَعْدَ تَوْكِيدِهَا وَقَدْ جَعَلْتُمُ اللهَ عَلَيْكُمْ كَفِيلاً إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ
"তোমরা যখন পরস্পর অঙ্গীকার কর তখন আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করো এবং আল্লাহকে তোমাদের যামিন ক'রে শপথ দৃঢ় করবার পর তোমরা তা ভঙ্গ করো না; তোমরা যা কর, অবশ্যই আল্লাহ তা জানেন।"৪৬৬
রাষ্ট্রনেতাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করাও জরুরী। জিহাদ ও আনুগত্যের যে বায়আত করা হয়, তা ভঙ্গ না করা মুসলিমের কর্তব্য। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللهَ يَدُ اللهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ فَمَن نَّكَثَ فَإِنَّمَا يَنكُثُ عَلَى نَفْسِهِ وَمَنْ أَوْفَى بِمَا عَاهَدَ عَلَيْهِ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
"নিশ্চয় যারা তোমার বায়আত গ্রহণ করে, তারা তো আল্লাহরই বায়আত গ্রহণ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর। সুতরাং যে তা ভঙ্গ করে, তা ভঙ্গ করবার পরিণাম তাকেই ভোগ করতে হবে এবং যে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার পূর্ণ করে, তিনি তাকে মহা পুরস্কার দেন।” ৪৬৭
নিশ্চয়ই সেনাপতির মাধ্যমে তাঁর অঙ্গীকার পালন না করলে তিনি কিয়ামতে ঐ ভঙ্গকারীকে প্রশ্ন করবেন। তিনি বলেছেন,
وَلَقَدْ كَانُوا عَاهَدُوا اللهَ مِن قَبْلُ لَا يُوَلُّونَ الْأَدْبَارَ وَكَانَ عَهْدُ اللَّهِ مَسْؤُولًا
"তারা তো পূর্বেই আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। তাদেরকে আল্লাহর সাথে কৃত এ অঙ্গীকার সম্বন্ধে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে। ৪৬৮
আল্লাহর রসূল বলেছেন,
ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَومَ القِيَامَةِ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ ، وَلَا يُزَكِّيهِمْ ، وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ: (منهم) رَجُلٌ بَايَعَ إِمَاماً لاَ يُبَايِعُهُ إِلَّا لِدُنْيَا فَإِنْ أَعْطَاهُ مِنْهَا وَفَى وَإِنْ لَمْ يُعْطِهِ مِنْهَا لَمْ يَفِ
"তিন শ্রেণীর মানুষের সাথে কিয়ামতের দিনে আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের দিকে (দয়ার দৃষ্টিতে) তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্রও করবেন না এবং তাদের জন্য হবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (তাদের মধ্যে একজন হল,) যে কেবলমাত্র পার্থিব স্বার্থে রাষ্ট্রনেতার হাতে বায়আত করে। সুতরাং সে যদি তাকে পার্থিব সম্পদ প্রদান করে, তাহলে সে (তার বায়আত) পূর্ণ করে। আর যদি প্রদান না করে, তাহলে বায়আত পূর্ণ করে না।"৪৬৯
রাষ্ট্রনেতার হাতে কৃত বায়আত ভঙ্গ করা যাবে না। সাধ্যমতো তার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। মহানবী এর নির্দেশ হল,
وَمَنْ بَايَعَ إِمَامًا فَأَعْطَاهُ صَفْقَةَ يَدِهِ وَثَمَرَةَ قَلْبِهِ فَلْيُطِعْهُ إِنِ اسْتَطَاعَ فَإِنْ جَاءَ آخَرُ يُنَازِعُهُ فَاضْرِبُوا عُنُقَ الْآخَرِ
"যে ব্যক্তি কোন রাষ্ট্রনায়কের হাতে বায়আত করল এবং এতে তাকে নিজ প্রতিশ্রুতি ও অন্তস্তল থেকে অঙ্গীকার প্রদান করল তার উচিত, যথাসাধ্য তার (সেই নায়কের সৎবিষয়ে) আনুগত্য করা। এরপর যদি অন্য এক (নায়ক) তার ক্ষমতা দখল করতে চায়, তাহলে ঐ দ্বিতীয় নায়কের গর্দান উড়িয়ে দাও।"৪৭০
চরিত্রবান মুসলিমকে রক্ষা করতে হবে মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْؤُولاً
"সাবালক না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্যে ছাড়া এতীমের সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না। আর প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।"৪৭১
মহানবী বলেছেন,
اضْمَنُوا لِي سِرًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنْ لَكُمُ الْجَنَّةَ : اصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ وَأَوْفُوا إِذَا وَعَدْتُمْ وَأَدُّوا إِذَا اؤْتُمِنْتُمْ وَاحْفَظُوا فُرُوجَكُمْ وَغُضُّوا أَبْصَارَكُمْ وَكُفُّوا أَيْدِيَكُمْ
"তোমরা নিজেদের তরফ থেকে আমার জন্য ছয়টি জিনিসের যামিন হয়ে যাও, আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের যামিন হয়ে যাব; কথা বললে সত্য কথা বল, ওয়াদা করলে পূরণ কর, তোমাদের নিকট আমানত রাখা হলে তা আদায় কর, লজ্জাস্থানের হিফাযত কর, চক্ষু অবনত কর এবং হাতকে সংযত রাখ।"৪৭২
চরিত্রবানের কাজ ওয়াদার খিলাপ না করা। আসলে কথা দিয়ে কথা না রাখার এ কদর্য আচরণ মুনাফিকের। কোন মুসলিমের মধ্যে থাকলে তা মুনাফিকের লক্ষণ হিসাবে থাকবে। মহানবী বলেছেন,
آيَةُ المُنَافِقِ ثَلَاثُ : إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ زَادَ فِي رِوَايَةٍ لمسلم : وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ
আবূ হুরাইরা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "মুনাফিকের চিহ্ন হল তিনটি (১) কথা বললে মিথ্যা বলে। (২) ওয়াদা করলে তা খেলাপ করে। এবং (৩) আমানত রাখা হলে তাতে খিয়ানত করে।"৪৭৩
মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, "যদিও সে সিয়াম রাখে এবং স্বলাত পড়ে ও ধারণা করে যে, সে মুসলিম।"
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقاً خَالِصاً ، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَها : إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ
"চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকবে সে খাঁটি মুনাফিক্ব গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তির মাঝে তার মধ্য হতে একটি স্বভাব থাকবে, তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকদের একটি স্বভাব থেকে যাবে। (সে স্বভাবগুলি হল,) ১। তার কাছে আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে। ২। কথা বললে মিথ্যা বলে। ৩। ওয়াদাহ করলে তা ভঙ্গ করে এবং ৪। ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল ভাষা বলে।"৪৭৪
শেষ বিচারের দিন চুক্তি ভঙ্গকারীর প্রতিবাদী খোদ মহান আল্লাহ। মহানবী বলেছেন,
قَالَ الله تَعَالَى: ثَلَاثَةٌ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ القِيَامَةِ : رَجُلٌ أَعْطَى بِي ثُمَّ غَدَرَ، وَرَجُلٌ بَاعَ حُرَّاً فَأَكَلَ ثَمَنَهُ، وَرَجُلٌ اسْتَأْجَرَ أَجِيراً، فَاسْتَوْفَى مِنْهُ، وَلَمْ يُعْطِهِ أَجْرَهُ
"মহান আল্লাহ বলেছেন, তিন প্রকার লোক এমন আছে, কিয়ামতের দিন যাদের প্রতিবাদী স্বয়ং আমি; (১) সে ব্যক্তি, যে আমার নামে অঙ্গীকারাবদ্ধ হল, পরে তা ভঙ্গ করল। (২) সে ব্যক্তি, যে স্বাধীন মানুষকে (প্রতারণা দিয়ে) বিক্রি ক'রে তার মূল্য ভক্ষণ করল। (৩) সে ব্যক্তি, যে কোন মজুরকে খাটিয়ে তার নিকট থেকে পুরাপুরি কাজ নিল, কিন্তু তার মজুরী দিল না।"৪৭৫
আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূলুল্লাহ স্বলাতের শেষ বৈঠকে সালাম ফিরার পূর্বে বিভিন্ন প্রার্থনা করার সময় ঋণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনাও করতেন। এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি তো ঋণ থেকে খুব বেশী আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকেন। (তার কারণ কী?) প্রত্যুত্তরে মহানবী বললেন,
إِنَّ الرَّجُلَ إِذَا غَرِمَ حَدَّثَ فَكَذَبَ وَوَعَدَ فَأَخْلَفَ
"কারণ, মানুষ যখন ঋণগ্রস্ত হয়, তখন কথা বললে মিথ্যা বলে এবং অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে (ওয়াদা-খেলাফী করে)। "৪৭৬
বলা বাহুল্য, এমন কাজেও জড়িত হওয়া উচিত নয় চরিত্রবানের, যে কাজে সে ওয়াদা ঠিক রাখতে পারবে না।
কুরআন কারীমে নবী ইসমাঈল প্রতিশ্রুতি পালনকারী রূপে প্রসিদ্ধ আছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَّبِيًّا
"এই কিতাবে (উল্লিখিত) ইসমাঈলের কথা বর্ণনা কর, সে ছিল একজন প্রতিশ্রুতি পালনকারী এবং সে ছিল রসূল, নবী।"৪৭৭
যেহেতু তিনি তাঁকে যবেহ করার ব্যাপারে ধৈর্যধারণের যে প্রতিশ্রুতি পিতাকে দিয়েছিলেন, তা পালন করেছিলেন। আরো বলা হয় যে, একজনের সাথে কোন জায়গায় সাক্ষাৎ করার ওয়াদা করলে সে ভুলে যায়। কিন্তু তিনি তার জন্য পুরো দিন অপেক্ষা করেছিলেন।
আর বাস্তব কথা এই যে, ধোঁকাবাজির এই দুনিয়ায় প্রতারকের সংসর্গে সংসার করা বড় কঠিন। বিশেষ ক'রে আপনজন যদি কথা দিয়ে কথা না রাখে, তাহলে তার আঘাত সহ্য করার মতো ক্ষমতা থাকে না মানুষের।
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন,
سلام على الدنيا إذا لم يكن بها + صديق صدوق صادق الوعد منصفا
অর্থাৎ, দুনিয়াকে সালাম জানাও (বিদায় দাও), যদি না তথায় কোন সত্যবাদী, ওয়াদা পালনকারী (বিশ্বস্ত) ও ন্যায়পরায়ণ বন্ধু থাকে।

টিকাঃ
৪৫৩. রা'দ: ১৯-২০
৪৫৪. সূরা বাক্বারাহ-২: ২৭
৪৫৫. রা'দ: ২৫
৪৫৬. সূরা নাহল: ৯৫
৪৫৭. আলে ইমরান-৩: ৭৭
৪৫৮. সূরা বাক্বারাহ-২: ৪০
৪৫৯. আ'রাফ: ১৭২
৪৬০. মুসনাদে আহমাদ, হাকেম ২/৫৪8, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৬২৩
৪৬১. বুখারী ১৩৫৮, মুসলিম ৬৯২৬
৪৬২. মুসলিম ৭৩৮৬
৪৬৩. আহসানুল বায়ান
৪৬৪. সূরা মায়িদাহ: ১
৪৬৫. সূরা দাহর: ৭
৪৬৬. সূরা নাহল: ৯১
৪৬৭. সূরা ফাতহ: ১০
৪৬৮. সূরা আহযাব: ১৫
৪৬৯. বুখারী ৭২১২, মুসলিম ৩১০
৪৭০. মুসলিম ৪৮৮২নং প্রমুখ
৪৭১. সূরা বানী ইস্রাঈল: ৩৪
৪৭২. আহমাদ ২২৭৫৭, হাকেম, সহীহুল জামে' ১৮৯৮
৪৭৩. বুখারী ৩৩, মুসলিম ২২০-২২২
৪৭৪. বুখারী ৩৪, ২৪৫৯, মুসলিম ২১৯
৪৭৫. বুখারী ২২২৭, ২২৭০
৪৭৬. বুখারী ৮৩২, মুসলিম ৫৮৯
৪৭৭. মারয়‍্যাম: ৫৪

মহান আল্লাহকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করা মানুষের চরিত্রগত একটি মহৎ গুণ, বরং সব চাইতে বড় সচ্চরিত্রতা। যেহেতু তা সব চাইতে মহান সত্ত্বার সাথে প্রতিশ্রুতি, অঙ্গীকার ও চুক্তি। কুরআন কারীমের বিভিন্ন জায়গায় তার তাকীদ এসেছে। যেমন যারা সে প্রতিশ্রুতি পালন করে, তিনি তাদের প্রশংসা ক'রে বলেছেন,
أَفَمَن يَعْلَمُ أَنَّمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَبِّكَ الْحَقُّ كَمَنْ هُوَ أَعْمَى إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُوا الأَلْبَابِ - الَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَلَا يَنقُضُونَ الْمِيثَاقَ
"তোমার প্রতিপালক হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা যে ব্যক্তি সত্য বলে জানে সে আর অন্ধ কি সমান? কেবলমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই উপদেশ গ্রহণ ক'রে থাকে। যারা আল্লাহকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং চুক্তি ভঙ্গ করে না।”৪৫৩
যারা মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না, তাদের নিন্দা ক'রে তিনি বলেছেন,
وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَاسِقِينَ - الَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ
"বস্তুতঃ তিনি সৎপথ পরিত্যাগীদের ছাড়া আর কাউকেও তার দ্বারা বিভ্রান্ত করেন না। যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।”৪৫৪
যারা মহান আল্লাহর অঙ্গীকার পালন করে না, তারা অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য পরকালে রয়েছে মন্দ আবাস। তিনি বলেছেন,
وَالَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللهُ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهِ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُوْلَئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ
"যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য আছে অভিসম্পাত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস। ৪৫৫
তুচ্ছ কোন পার্থিব স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে তিনি নিষেধ করেছেন,
وَلَا تَشْتَرُوا بِعَهْدِ اللهِ ثَمَنًا قَلِيلاً إِنَّمَا عِنْدَ اللهِ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
“তোমরা আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করো না। আল্লাহর কাছে তা উত্তম; যদি তোমরা জানতে।”৪৫৬
এরূপ যারা করে, তাদের নেহাতই মন্দ পরিণামের কথা উল্লেখ ক'রে তিনি বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلاً أُوْلَئِكَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ وَلَا يَنظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
“যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে স্বল্প মূল্যে বিক্রয় করে, পরকালে তাদের কোন অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, আর তাদের দিকে চেয়ে দেখবেন না এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।”৪৫৭
মহান আল্লাহকে দেওয়া মানুষের সে প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার কী?
সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার পালন হল, তাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন করা এবং তার তাওহীদকে প্রতিষ্ঠা করা।
আর সে অঙ্গীকার ভঙ্গ করা বা বিক্রয় করার অর্থ হল, তাঁকে অবিশ্বাস করা অথবা তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করা।
মহান প্রতিপালক যুগে যুগে নবী-রসূল (আলাইহিমুস সালাম) গণের মাধ্যমে মানুষের নিকট তাঁর যে নির্দেশ পাঠিয়েছেন, তা পালন করা হল তাঁর অঙ্গীকার পালন করা। আর তাঁর আদেশ ও নিষেধ লংঘন করার মানে হল, তাঁর অঙ্গীকার ভঙ্গ করা।
মানুষের হয়তো মনে নেই, সে কিন্তু মহান আল্লাহর কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নবীগণ এসে সে কথা স্মরণ করিয়েছেন এবং বলেছেন,
وَأَوْفُوا بِعَهْدِي أُوفِ بِعَهْدِكُمْ وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ
“আমার সঙ্গে তোমাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ কর, আমিও তোমাদের সঙ্গে আমার কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করব। আর তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।”৪৫৮
মানুষের হয়তো বিস্মৃত হয়েছে সে মহা অঙ্গীকার। কিন্তু মহান আল্লাহ তা স্মরণ করিয়ে বলেছেন,
وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِن بَنِي آدَمَ مِن ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا أَن تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِينَ
“স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ হতে তাদের সন্তান-সন্ততি বাহির করেন এবং তাদের নিজেদের সম্বন্ধে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলে, ‘নিশ্চয়ই। আমরা সাক্ষী রইলাম।’ (এ স্বীকৃতি গ্রহণ) এ জন্য যে, তোমরা যেন কিয়ামতের দিন না বল, ‘আমরা তো এ বিষয়ে জানতাম না।’ ”৪৫৯
হাদীসে এসেছে, আরাফার দিনে নু'মান নামক জায়গায় মহান আল্লাহ আদম-সন্তান হতে অঙ্গীকার নিয়েছেন। সেদিন তিনি আদম আলাইহিস সালাম -এর সকল সন্তানকে তার পৃষ্ঠদেশ হতে বের করলেন এবং তাদেরকে নিজের সামনে (পিঁপড়ের আকারে) ছড়িয়ে দিলেন ও তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমি কি তোমাদের রব (প্রতিপালক) নই।’ সকলে বলেছিল, بَلَى شَهِدْنَا অবশ্যই, আমরা সকলেই আপনার রব হওয়ার সাক্ষ্য দিচ্ছি। ৪৬০
মানুষ বিস্মৃত হলেও আল্লাহর রব হওয়ার সাক্ষ্য প্রত্যেক মানুষের প্রকৃতিতে সন্নিবিষ্ট আছে। এই ভাবার্থকেই আল্লাহর রসূল ﷺ এইভাবে বর্ণনা করেছেন, “প্রতিটি শিশু (ইসলামী ধর্মবোধের) প্রকৃতি নিয়ে জন্ম নেয়। পরে তার মাতা-পিতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজক বানিয়ে নেয়। যেমন জন্তুর বাচ্চা সম্পূর্ণ জন্ম হয়, তার নাক ও কান কাটা থাকে না। ”৪৬১
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন, 'আমি আমার বান্দাদেরকে একনিষ্ঠ (একমাত্র ইসলামের প্রতি অনুগত) রূপে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর শয়তান তাদেরকে ইসলামী প্রকৃতি হতে পথভ্রষ্ট ক'রে দেয়। '৪৬২
এই প্রকৃতিই আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর অবতীর্ণকৃত শরীয়ত। যা এখন ইসলাম নামে সংরক্ষিত। ৪৬৩
বলা বাহুল্য, যে ইসলাম প্রত্যখ্যান করে, সে আসলে মহান সৃষ্টিকর্তার সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে। মহান আল্লাহর আরও একটি ব্যাপক নির্দেশ হল,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা অঙ্গীকার (ও চুক্তিসমূহ) পূর্ণ কর।"৪৬৪
যায়দ বিন আসলাম বলেছেন, 'তা ছয় প্রকারঃ (১) আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার, (২) মৈত্রী-চুক্তি, (৩) শরীকানার চুক্তি, (৪) ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি, (৫) বিবাহ-বন্ধন এবং (৬) আল্লাহর নামে কৃত শপথ বা কসমের অঙ্গীকার।'
উক্ত ৬ প্রকার চুক্তি বা অঙ্গীকার পালন করা আবশ্যক। যেমন মহান আল্লাহর নামে নযর মানাও এক প্রকার অঙ্গীকার। আর তাও পালন করা ওয়াজেব। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাগণের গুণ বর্ণনায় বলেছেন,
يُوفُونَ بِالنَّذْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ شَرُّهُ مُسْتَطِيرًا
"তারা মানত পূর্ণ করে এবং সেদিনের ভয় করে, যেদিনের বিপত্তি হবে ব্যাপক।"৪৬৫
তিনি আরো বলেছেন,
وَأَوْفُوا بِعَهْدِ اللهِ إِذَا عَاهَدتُّمْ وَلَا تَنقُضُوا الأَيْمَانَ بَعْدَ تَوْكِيدِهَا وَقَدْ جَعَلْتُمُ اللهَ عَلَيْكُمْ كَفِيلاً إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ
"তোমরা যখন পরস্পর অঙ্গীকার কর তখন আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করো এবং আল্লাহকে তোমাদের যামিন ক'রে শপথ দৃঢ় করবার পর তোমরা তা ভঙ্গ করো না; তোমরা যা কর, অবশ্যই আল্লাহ তা জানেন।"৪৬৬
রাষ্ট্রনেতাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করাও জরুরী। জিহাদ ও আনুগত্যের যে বায়আত করা হয়, তা ভঙ্গ না করা মুসলিমের কর্তব্য। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللهَ يَدُ اللهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ فَمَن نَّكَثَ فَإِنَّمَا يَنكُثُ عَلَى نَفْسِهِ وَمَنْ أَوْفَى بِمَا عَاهَدَ عَلَيْهِ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
"নিশ্চয় যারা তোমার বায়আত গ্রহণ করে, তারা তো আল্লাহরই বায়আত গ্রহণ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর। সুতরাং যে তা ভঙ্গ করে, তা ভঙ্গ করবার পরিণাম তাকেই ভোগ করতে হবে এবং যে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার পূর্ণ করে, তিনি তাকে মহা পুরস্কার দেন।” ৪৬৭
নিশ্চয়ই সেনাপতির মাধ্যমে তাঁর অঙ্গীকার পালন না করলে তিনি কিয়ামতে ঐ ভঙ্গকারীকে প্রশ্ন করবেন। তিনি বলেছেন,
وَلَقَدْ كَانُوا عَاهَدُوا اللهَ مِن قَبْلُ لَا يُوَلُّونَ الْأَدْبَارَ وَكَانَ عَهْدُ اللَّهِ مَسْؤُولًا
"তারা তো পূর্বেই আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। তাদেরকে আল্লাহর সাথে কৃত এ অঙ্গীকার সম্বন্ধে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে। ৪৬৮
আল্লাহর রসূল বলেছেন,
ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَومَ القِيَامَةِ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ ، وَلَا يُزَكِّيهِمْ ، وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ: (منهم) رَجُلٌ بَايَعَ إِمَاماً لاَ يُبَايِعُهُ إِلَّا لِدُنْيَا فَإِنْ أَعْطَاهُ مِنْهَا وَفَى وَإِنْ لَمْ يُعْطِهِ مِنْهَا لَمْ يَفِ
"তিন শ্রেণীর মানুষের সাথে কিয়ামতের দিনে আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের দিকে (দয়ার দৃষ্টিতে) তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্রও করবেন না এবং তাদের জন্য হবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (তাদের মধ্যে একজন হল,) যে কেবলমাত্র পার্থিব স্বার্থে রাষ্ট্রনেতার হাতে বায়আত করে। সুতরাং সে যদি তাকে পার্থিব সম্পদ প্রদান করে, তাহলে সে (তার বায়আত) পূর্ণ করে। আর যদি প্রদান না করে, তাহলে বায়আত পূর্ণ করে না।"৪৬৯
রাষ্ট্রনেতার হাতে কৃত বায়আত ভঙ্গ করা যাবে না। সাধ্যমতো তার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। মহানবী এর নির্দেশ হল,
وَمَنْ بَايَعَ إِمَامًا فَأَعْطَاهُ صَفْقَةَ يَدِهِ وَثَمَرَةَ قَلْبِهِ فَلْيُطِعْهُ إِنِ اسْتَطَاعَ فَإِنْ جَاءَ آخَرُ يُنَازِعُهُ فَاضْرِبُوا عُنُقَ الْآخَرِ
"যে ব্যক্তি কোন রাষ্ট্রনায়কের হাতে বায়আত করল এবং এতে তাকে নিজ প্রতিশ্রুতি ও অন্তস্তল থেকে অঙ্গীকার প্রদান করল তার উচিত, যথাসাধ্য তার (সেই নায়কের সৎবিষয়ে) আনুগত্য করা। এরপর যদি অন্য এক (নায়ক) তার ক্ষমতা দখল করতে চায়, তাহলে ঐ দ্বিতীয় নায়কের গর্দান উড়িয়ে দাও।"৪৭০
চরিত্রবান মুসলিমকে রক্ষা করতে হবে মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْؤُولاً
"সাবালক না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্যে ছাড়া এতীমের সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না। আর প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।"৪৭১
মহানবী বলেছেন,
اضْمَنُوا لِي سِرًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنْ لَكُمُ الْجَنَّةَ : اصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ وَأَوْفُوا إِذَا وَعَدْتُمْ وَأَدُّوا إِذَا اؤْتُمِنْتُمْ وَاحْفَظُوا فُرُوجَكُمْ وَغُضُّوا أَبْصَارَكُمْ وَكُفُّوا أَيْدِيَكُمْ
"তোমরা নিজেদের তরফ থেকে আমার জন্য ছয়টি জিনিসের যামিন হয়ে যাও, আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের যামিন হয়ে যাব; কথা বললে সত্য কথা বল, ওয়াদা করলে পূরণ কর, তোমাদের নিকট আমানত রাখা হলে তা আদায় কর, লজ্জাস্থানের হিফাযত কর, চক্ষু অবনত কর এবং হাতকে সংযত রাখ।"৪৭২
চরিত্রবানের কাজ ওয়াদার খিলাপ না করা। আসলে কথা দিয়ে কথা না রাখার এ কদর্য আচরণ মুনাফিকের। কোন মুসলিমের মধ্যে থাকলে তা মুনাফিকের লক্ষণ হিসাবে থাকবে। মহানবী বলেছেন,
آيَةُ المُنَافِقِ ثَلَاثُ : إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ زَادَ فِي رِوَايَةٍ لمسلم : وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ
আবূ হুরাইরা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "মুনাফিকের চিহ্ন হল তিনটি (১) কথা বললে মিথ্যা বলে। (২) ওয়াদা করলে তা খেলাপ করে। এবং (৩) আমানত রাখা হলে তাতে খিয়ানত করে।"৪৭৩
মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, "যদিও সে সিয়াম রাখে এবং স্বলাত পড়ে ও ধারণা করে যে, সে মুসলিম।"
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقاً خَالِصاً ، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَها : إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ
"চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকবে সে খাঁটি মুনাফিক্ব গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তির মাঝে তার মধ্য হতে একটি স্বভাব থাকবে, তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকদের একটি স্বভাব থেকে যাবে। (সে স্বভাবগুলি হল,) ১। তার কাছে আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে। ২। কথা বললে মিথ্যা বলে। ৩। ওয়াদাহ করলে তা ভঙ্গ করে এবং ৪। ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল ভাষা বলে।"৪৭৪
শেষ বিচারের দিন চুক্তি ভঙ্গকারীর প্রতিবাদী খোদ মহান আল্লাহ। মহানবী বলেছেন,
قَالَ الله تَعَالَى: ثَلَاثَةٌ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ القِيَامَةِ : رَجُلٌ أَعْطَى بِي ثُمَّ غَدَرَ، وَرَجُلٌ بَاعَ حُرَّاً فَأَكَلَ ثَمَنَهُ، وَرَجُلٌ اسْتَأْجَرَ أَجِيراً، فَاسْتَوْفَى مِنْهُ، وَلَمْ يُعْطِهِ أَجْرَهُ
"মহান আল্লাহ বলেছেন, তিন প্রকার লোক এমন আছে, কিয়ামতের দিন যাদের প্রতিবাদী স্বয়ং আমি; (১) সে ব্যক্তি, যে আমার নামে অঙ্গীকারাবদ্ধ হল, পরে তা ভঙ্গ করল। (২) সে ব্যক্তি, যে স্বাধীন মানুষকে (প্রতারণা দিয়ে) বিক্রি ক'রে তার মূল্য ভক্ষণ করল। (৩) সে ব্যক্তি, যে কোন মজুরকে খাটিয়ে তার নিকট থেকে পুরাপুরি কাজ নিল, কিন্তু তার মজুরী দিল না।"৪৭৫
আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূলুল্লাহ স্বলাতের শেষ বৈঠকে সালাম ফিরার পূর্বে বিভিন্ন প্রার্থনা করার সময় ঋণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনাও করতেন। এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি তো ঋণ থেকে খুব বেশী আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকেন। (তার কারণ কী?) প্রত্যুত্তরে মহানবী বললেন,
إِنَّ الرَّجُلَ إِذَا غَرِمَ حَدَّثَ فَكَذَبَ وَوَعَدَ فَأَخْلَفَ
"কারণ, মানুষ যখন ঋণগ্রস্ত হয়, তখন কথা বললে মিথ্যা বলে এবং অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে (ওয়াদা-খেলাফী করে)। "৪৭৬
বলা বাহুল্য, এমন কাজেও জড়িত হওয়া উচিত নয় চরিত্রবানের, যে কাজে সে ওয়াদা ঠিক রাখতে পারবে না।
কুরআন কারীমে নবী ইসমাঈল প্রতিশ্রুতি পালনকারী রূপে প্রসিদ্ধ আছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَّبِيًّا
"এই কিতাবে (উল্লিখিত) ইসমাঈলের কথা বর্ণনা কর, সে ছিল একজন প্রতিশ্রুতি পালনকারী এবং সে ছিল রসূল, নবী।"৪৭৭
যেহেতু তিনি তাঁকে যবেহ করার ব্যাপারে ধৈর্যধারণের যে প্রতিশ্রুতি পিতাকে দিয়েছিলেন, তা পালন করেছিলেন। আরো বলা হয় যে, একজনের সাথে কোন জায়গায় সাক্ষাৎ করার ওয়াদা করলে সে ভুলে যায়। কিন্তু তিনি তার জন্য পুরো দিন অপেক্ষা করেছিলেন।
আর বাস্তব কথা এই যে, ধোঁকাবাজির এই দুনিয়ায় প্রতারকের সংসর্গে সংসার করা বড় কঠিন। বিশেষ ক'রে আপনজন যদি কথা দিয়ে কথা না রাখে, তাহলে তার আঘাত সহ্য করার মতো ক্ষমতা থাকে না মানুষের।
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন,
سلام على الدنيا إذا لم يكن بها + صديق صدوق صادق الوعد منصفا
অর্থাৎ, দুনিয়াকে সালাম জানাও (বিদায় দাও), যদি না তথায় কোন সত্যবাদী, ওয়াদা পালনকারী (বিশ্বস্ত) ও ন্যায়পরায়ণ বন্ধু থাকে।

টিকাঃ
৪৫৩. রা'দ: ১৯-২০
৪৫৪. সূরা বাক্বারাহ-২: ২৭
৪৫৫. রা'দ: ২৫
৪৫৬. সূরা নাহল: ৯৫
৪৫৭. আলে ইমরান-৩: ৭৭
৪৫৮. সূরা বাক্বারাহ-২: ৪০
৪৫৯. আ'রাফ: ১৭২
৪৬০. মুসনাদে আহমাদ, হাকেম ২/৫৪8, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৬২৩
৪৬১. বুখারী ১৩৫৮, মুসলিম ৬৯২৬
৪৬২. মুসলিম ৭৩৮৬
৪৬৩. আহসানুল বায়ান
৪৬৪. সূরা মায়িদাহ: ১
৪৬৫. সূরা দাহর: ৭
৪৬৬. সূরা নাহল: ৯১
৪৬৭. সূরা ফাতহ: ১০
৪৬৮. সূরা আহযাব: ১৫
৪৬৯. বুখারী ৭২১২, মুসলিম ৩১০
৪৭০. মুসলিম ৪৮৮২নং প্রমুখ
৪৭১. সূরা বানী ইস্রাঈল: ৩৪
৪৭২. আহমাদ ২২৭৫৭, হাকেম, সহীহুল জামে' ১৮৯৮
৪৭৩. বুখারী ৩৩, মুসলিম ২২০-২২২
৪৭৪. বুখারী ৩৪, ২৪৫৯, মুসলিম ২১৯
৪৭৫. বুখারী ২২২৭, ২২৭০
৪৭৬. বুখারী ৮৩২, মুসলিম ৫৮৯
৪৭৭. মারয়‍্যাম: ৫৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00