📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 লজ্জাস্থানের হিফাযত

📄 লজ্জাস্থানের হিফাযত


চরিত্রবান পুরুষ ও চরিত্রবতী নারী নিজেদের গোপনাঙ্গের হিফাযত করে।
একজন পুরুষ তার সারা দেহ কেবল নিজ স্ত্রীকে দেখাতে পারে। অন্যান্যের কাছে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অবশ্যই ঢেকে রাখে।
একজন নারী তার সারা দেহ কেবল স্বামীকে দেখাতে পারে। এ ছাড়া মাথা, হাত-পা মাহরাম বা এগানা অথবা মহিলাকে দেখাতে পারে। বেগানা পুরুষের কাছে মহিলার সর্বাঙ্গ গোপনাঙ্গ। মহান আল্লাহর নির্দেশ হল,
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ - وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاء بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاء بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطَّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاء وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
"বিশ্বাসীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে; এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। বিশ্বাসী নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে। তারা যা সাধারণততঃ প্রকাশ থাকে তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য যেন প্রদর্শন না করে, তারা তাদের বক্ষঃস্থল যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত রাখে। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগিনী পুত্র, তাদের নারীগণ, নিজ অধিকারভুক্ত দাস, যৌনকামনা-রহিত অনুচর পুরুষ অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত কারও নিকট তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন এমন সজোরে পদক্ষেপ না করে, যাতে তাদের গোপন আভরণ প্রকাশ পেয়ে যায়। হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।৪০৪
বাহ্য বিন হাকীমের দাদা একদা বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের গোপনাঙ্গ কী গোপন করব, আর কী বর্জন করব?' তিনি বললেন, "তুমি তোমার স্ত্রী ও ক্রীতদাসী ছাড়া অন্যের নিকটে লজ্জাস্থানের হিফাযত কর।” সাহাবী বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! লোকেরা আপোসে এক জায়গায় থাকলে?' তিনি বললেন, "যথাসাধ্য চেষ্টা করবে, কেউ যেন তা মোটেই দেখতে না পায়।" সাহাবী বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! কেউ যদি নির্জনে থাকে?' তিনি বললেন,
اللهُ أَحَقُّ أَنْ يُسْتَحْيَا مِنْهُ مِنَ النَّاسِ
"মানুষ অপেক্ষা আল্লাহ এর বেশী হকদার যে, তাঁকে লজ্জা করা হবে।"৪০৫
হ্যাঁ, একাকী থাকলেও নগ্ন থাকা উচিত নয়। এমনকি গোসলের সময়েও উলঙ্গ হওয়া উচিত নয়। বন্ধ বাথরুমের ভিতরকার কথা অবশ্য আলাদা। তবুও সেখানে লজ্জাস্থানে কাপড় রেখে গোসল করা উচিত। যেহেতু সেখানে কেউ না দেখলে মহান প্রতিপালক দেখছেন। সুতরাং তাঁকে লজ্জা করা উচিত। মহানবী বলেন,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حَيٌّ سِتِّيرٌ يُحِبُّ الْحَيَاءَ وَالسَّتْرَ فَإِذَا اغْتَسَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْتَتِرُ
"নিশ্চয় আল্লাহ আয্যা অজাল্লু লজ্জাশীল, গোপনকারী। তিনি লজ্জাশীলতা ও গোপনীয়তাকে পছন্দ করেন। সুতরাং যখন তোমাদের কেউ গোসল করবে, তখন সে যেন গোপনীয়তা অবলম্বন করে (পর্দার সাথে করে)।"৪০৬
আর মহিলা? তার ব্যাপারে মহানবী বলেন,
المَرْأَةُ عَوْرَةٌ فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ
"মেয়ে মানুষ (সবটাই) লজ্জাস্থান (গোপনীয়)। আর সে যখন বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে সুশোভন করে তোলে।"৪০৭
"মহিলা হল গোপনীয় জিনিস। বাইরে বের হলে শয়তান তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে নির্নিমেষ তাকিয়ে দেখতে থাকে।"৪০৮
এই জন্য আম গোসলখানা, পুকুর, নদী, হ্রদ, ঝিল বা সমুদ্র ঘাটে বা তীরে গোসল করা কোন মহিলার জন্য জায়েয নয়। কারণ সেখানে জ্বিন ও মানুষ শয়তানের দৃষ্টি তার দেহে পড়ে। মহানবী বলেন,
وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يُدْخِلُ حَلِيلَتَهُ الْحَمَّامَ
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে সে যেন তার স্ত্রীকে সাধারণ গোসলখানায় প্রবেশ করতে না দেয়।"৪০৯
উম্মে দারদা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, একদা আমি সাধারণ গোসলখানা হতে বের হলাম। ইত্যবসরে নবী এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে তিনি আমাকে বললেন, "কোথেকে, হে উম্মে দারদা?!" আমি বললাম, 'গোসলখানা থেকে।' তিনি বললেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا مِنْ امْرَأَةٍ تَضَعُ ثِيَابَهَا فِي غَيْرِ بَيْتِ أَحَدٍ مِنْ أُمَّهَاتِهَا إِلَّا وَهِيَ هَاتِكَةٌ كُلَّ سِتْرِ بَيْنَهَا وَبَيْنَ الرَّحْمَنِ
"সেই সত্তার শপথ; যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! যে কোনও মহিলা তার কোন মায়ের ঘর ছাড়া অন্য স্থানে নিজের কাপড় খোলে, সে তার ও পরম দয়াময় (আল্লাহর) মাঝে প্রত্যেক পর্দা বিদীর্ণ করে ফেলে।”৪১০
নারীর জন্য বৈধ নয় কোন কলেজ বা ক্লাবে শরীরচর্চার নামে নিজ পোশাক খোলা। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
أَيُّمَا امْرَأَةٍ نَزَعَتْ ثِيَابَهَا فِي غَيْرِ بَيْتِهَا خَرَقَ اللَّهُ عَنْهَا سِتْرًا
"যে নারী স্বগৃহ ছাড়া অন্য স্থানে নিজের পর্দা রাখে (কাপড় খোলে) আল্লাহ তার পর্দা ও লজ্জাশীলতাকে বিদীর্ণ করে দেন। (অথবা সে নিজে করে দেয়। ৪১১
أَيُّمَا امْرَأَةٍ نَزَعَتْ ثِيَابَهَا فِي غَيْرِ بَيْتِ زَوْجِهَا هَتَكَتْ سِتْرَ مَا بَيْنَهَا وَبَيْنَ رَبِّهَا
"যে মহিলা নিজের স্বামীগৃহ ছাড়া অন্য গৃহে নিজের কাপড় খোলে, সে আল্লাহ আয্যা অজাল্লা ও তার নিজের মাঝে পর্দা বিদীর্ণ করে ফেলে।"৪১২
তাহলে বলুন, বেপর্দা নারী কি সুচরিত্রবতী হতে পারে? চরিত্রহীনা, অসতী, ভ্রষ্টা বা নষ্টা না হলেও বাইরে কাপড় খোলা মেয়ের সচ্চরিত্রতা কি পবিত্র থাকতে পারে?
যে আলোকপ্রাপ্তাদের দেহে পরপুরুষদের চোখের সামনে সূর্যের আলো পড়ে, তারা কি আদৌ চরিত্রবতী থাকতে পারে?
যারা বোরকার আঁধারও ও হেরেম ছেড়ে বাইরে এসে পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলায়, তাদের চরিত্র ও সতীত্ব কি নির্মল থাকতে পারে? উত্তর আপনার কাছে। রুচি আপন আপন।

টিকাঃ
৪০৪. সূরা নূর: ৩০-৩১
৪০৫. আবু দাউদ ৪০১৯, তিরমিযী ২৭৯৪, ইবনে মাজাহ ১৯২০, মিশকাত ৩১১৭
৪০৬. আবু দাউদ, নাসাঈ ৪০৬, মিশকাত ৪৪৭
৪০৭. তিরমিযী ১১৭৩, মিশকাত ৩১০৯
৪০৮. ত্বাবারানী, ইবনে হিব্বান, ইবনে খুযাইমা, সহীহ তারগীব ৩৩৯, ৩৪১, ৩৪২
৪০৯. আহমাদ ১৪৬৫১, সহীহ তারগীব ১৬০
৪১০. আহমাদ ২৭০৩৮, ত্বাবারানীর কাবীর, সহীহ তারগীব ১৬২
৪১১. আহমাদ ২৬৬১১, তাবারানী ৭১০, হাকেম ৭৭৮২, শুআবুল ঈমান বাইহাক্বী ৭৭৭৪
৪১২. আহমাদ ২৪১৪০, তিরমিযী ২৮০৩, ইবনে মাজাহ ৩৭৫০, হাকেম, সঃ জামে' ২৭১০

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 যৌন সচ্চরিত্রতা

📄 যৌন সচ্চরিত্রতা


চরিত্রবান মানুষ বলতে আমরা সাধারণত সেই মানুষকে বুঝি, যে কোন প্রকার অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত হয় না অথবা তার নিকটবর্তী কোন কাজে জড়িত হয় না।
যে মানুষ অবৈধ প্রেম-পীরিতে জড়ায় না।
যে দাম্পত্য জীবনে পরকীয় প্রেমে খেয়ানত করে না।
এমনকি বন্ধু-বন্ধু, ভাই-বোন, মা-বেটা, বাপ-বেটি, ধর্মের বাপ অথবা দ্বীনী ভাই-বোনের নামেও কোন অবৈধ বা সন্দিগ্ধ সম্পর্কে লিপ্ত হয় না।
চরিত্রবান কোন প্রকার অশ্লীলতা বা নারী ও যৌন সংক্রান্ত কোন অবৈধ আচরণের নিকটবর্তী হয় না। নগ্নতা ও বেলেল্লাপনাকে সমর্থন করে না।
নচেৎ চরিত্র ধ্বংসের মূল কারণ হল অবৈধ যৌনতা। আর যুবক-যুবতীকে চরিত্রহীন করার মূল প্রবৃত্তি হল যৌবনের উন্মাদনা। যৌবনকাল বড় উন্মত্ততার। যৌবনের পথ বড় পিচ্ছিল। এখানেই তাদের পদস্খলন ঘটে। মন বড় মন্দপ্রবণ। যুবক-যুবতীর আকর্ষণ বড় শক্তিশালী। তাদের মাঝে সহায়ক শয়তান বড় তৎপর। যৌনতৃষ্ণা নিবারণ করার বৈধ পন্থা আছে, কিন্তু তা অতি সহজ নয়। এই জন্য মহানবী বলেছেন,
إِنَّ مِمَّا أَخْشَى عَلَيْكُمْ شَهَوَاتِ الْغَيِّ فِي بُطُونِكُمْ وَفُرُوجِكُمْ وَمُضِلَّاتِ الْفِتَنِ
“আমি তোমাদের জন্য যে সকল জিনিস ভয় করি, তার মধ্যে অন্যতম হল তোমাদের উদর ও যৌন-সংক্রান্ত ভ্রষ্টকারী কুপ্রবৃত্তি এবং ভ্রষ্টকারী ফিতনা।”৪১৩
চরিত্রহীনতার সব চাইতে বড় অশ্লীলতা হল বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের জেরে যৌন-মিলন বা সহবাসে লিপ্ত হয়ে পড়া। আর এমন মহাপাপে কোন মু'মিন নারী-পুরুষ লিপ্ত হতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
لا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَسْرِقُ السَّارِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ
"কোন ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে ব্যভিচার করতে পারে না। কোন চোর যখন চুরি করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে চুরি করতে পারে না এবং কোন মদ্যপায়ী যখন মদ্যপান করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে মদ্যপান করতে পারে না।"৪১৪
ব্যভিচার এমন একটি অপরাধ যা অবিবাহিত অবস্থায় করলে একশত চাবুক ও এক বছর দেশান্তরের শাস্তি ভুগতে হয়। আর বিবাহিত অবস্থায় করলে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার নষ্ট হয়ে যায়। চরিত্রহীন ব্যভিচারীদের জন্য মধ্যজগতে অপেক্ষা করছে আগুনের চুল্লি, যেখানে তারা উলঙ্গ অবস্থায় আগুনের দহন-প্রবাহে উঠানামা করবে! পরন্তু তার স্থান হবে জাহান্নামে। কিন্তু মহানবী বলেছেন,
مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحَيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ
"যে ব্যক্তি দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী (অঙ্গ জিভ) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী (অঙ্গ গুপ্তাঙ্গ) সম্বন্ধে নিশ্চয়তা দেবে, আমি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব। ৪১৫
মহান আল্লাহ ব্যভিচারকে হারাম করেছেন। হারাম করেছেন তার নিকটবর্তী হতে। তিনি বলেছেন,
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً
"তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।”৪১৬
ব্যভিচারের বহু ভূমিকা আছে। আর তার মাধ্যমেই ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয় যুবক-যুবতী। যেমন মেয়েদের বেপর্দা হয়ে চলাফেরা করা, নির্জনতা অবলম্বন করা, সরাসরি অথবা কোন যন্ত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা ক'রে চলা, অবৈধ সম্পর্ক কায়েম করা, প্রেম-ভালোবাসার জাল সৃষ্টি করা, যৌন-কথা বলা, কামদৃষ্টিতে দেখাদেখি করা, একে অন্যের ছবি বিনিময় করা, অবাধে মিলামেশা করা, ভ্রমণ করা, একে অন্যের দেহ স্পর্শ করা ইত্যাদি। মহানবী বলেছেন,
كُتِبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ نَصِيبُهُ مِنَ الزِّنَا مُدْرِكُ ذَلِكَ لَا مَحَالَةَ: العَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ، وَالْأُذْنَانِ زِنَاهُمَا الاسْتِمَاعُ، وَالنِّسَانُ زِنَاهُ الكَلَامُ، وَاليَدُ زِنَاهَا البَطْشُ، وَالرَّجُلُ زِنَاهَا الخطا ، وَالقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى ، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ أَوْ يُكَذِّبُهُ
"নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আদম সন্তানের জন্য ব্যভিচারের অংশ লিখে দিয়েছেন; যা সে অবশ্যই পাবে। সুতরাং চক্ষুদ্বয়ের ব্যভিচার (সকাম অবৈধ) দর্শন। কর্ণদ্বয়ের ব্যভিচার (অবৈধ যৌনকথা) শ্রবণ, জিভের ব্যভিচার (সকাম অবৈধ) কথন, হাতের ব্যভিচার (সকাম অবৈধ) ধারণ এবং পায়ের ব্যভিচার (সকাম অবৈধ পথে) গমন। আর হৃদয় কামনা ও বাসনা করে এবং জননেন্দ্রিয় তা সত্য বা মিথ্যায় পরিণত করে।” ৪১৭
ব্যভিচারের কোন ভূমিকাতেই চরিত্রবান থাকতে পারে না। কোন চরিত্রবান অভিসারিকার অভিসারে সাড়া দিতে পারে না; যদিও তা কঠিন। বিশেষ ক'রে যুবতী সম্ভ্রান্তা ও সুন্দরী হলে। আর কঠিন বলেই এহেন ক্ষেত্রে নিজের চরিত্র পবিত্র রাখার মহাপুরস্কার রয়েছে কিয়ামতে। মহানবী বলেছেন,
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ في ظِلَّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلا ظِلُّهُ وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنصَبٍ وَجَمَالٍ ، فَقَالَ : إِنِّي أَخَافُ الله
"সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাঁর (আরশের) ছায়া দান করবেন যেদিন তাঁর (ঐ) ছায়া ভিন্ন অন্য কোন ছায়া থাকবে না; তন্মধ্যে--- একজন সেই ব্যক্তি যাকে কোন সম্ভান্তা সুন্দরী (ব্যভিচারের উদ্দেশ্যে) আহ্বান করে কিন্তু সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি। ৪১৮
চরিত্রবান যুবক-যুবতী কোন সন্ধিগ্ধ বিবাহের ফাঁদে পড়ে সহবাসকে বৈধ মনে করে না। যেমন মুতা (সাময়িক চুক্তির) বিবাহ, অভিভাবকহীন বিবাহ বা মন্দিরের সামনে বিবাহের অনুকরণে মসজিদের সামনে বিবাহ ক'রে সহবাস করে না।
কোনও মুসলিম বিকৃত যৌনাচারেও লিপ্ত হতে পারে না। দুধের স্বাদ ঘোলে মিটানোর উদ্দেশ্যে কোন বিরল প্রকৃতির যৌনাচারে নিজের পিপাসা নিবারণ করে না। একমাত্র চরিত্রহীনেরাই তা করতে পারে। আর তার শাস্তিও চরম ইসলামের সংবিধানে।
দুশ্চরিত্র পশুগমনকারীদের ব্যাপারে নির্দেশ হল,
مَنْ وَجَدْتُمُوهُ وَقَعَ عَلَى بَهِيمَةٍ فَاقْتُلُوهُ وَاقْتُلُوا الْبَهِيمَةَ مَعَهُ
"যে ব্যক্তিকে কোন পশু-সঙ্গমে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও সে পশুকে তোমরা হত্যা করে ফেলবে। ৪১৯
চরিত্রহীন সমকামীদের ব্যাপারে নির্দেশ হল,
مَنْ وَجَدْتُمُوهُ يَعْمَلُ عَمَلَ قَوْمِ لُوطٍ فَاقْتُلُوا الْفَاعِلَ وَالْمَفْعُولَ بِهِ
"তোমরা যে ব্যক্তিকে লুত নবীর উম্মতের মত সমকামে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও তার সহকর্মীকে হত্যা করে ফেলো। ৪২০
নিজের বিয়ে করা বউয়ের সাথেও বিকৃত রুচির যৌনাচার করা যাবে না। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
لَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَى رَجُلٍ أَتَى رَجُلًا أَوْ امْرَأَةً فِي الدُّبُرِ
“আল্লাহ (কিয়ামতের দিন) সেই ব্যক্তির দিকে চেয়েও দেখবেন না, যে ব্যক্তি কোন পুরুষের মলদ্বারে অথবা কোন স্ত্রীর পায়খানা-দ্বারে সঙ্গম করে।”৪২১
তিনি আরো বলেছেন,
مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوْ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ فَقَدْ بَرِئَ مِمَّا أُنْزِلَ اللَّهُ عَلَى مُحَمَّدٍ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ
“যে ব্যক্তি কোন ঋতুমতী স্ত্রী (মাসিক অবস্থায়) সঙ্গম করে অথবা কোন স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে, অথবা কোন গণকের নিকট উপস্থিত হয়ে (সে যা বলে তা) বিশ্বাস করে, সে ব্যক্তি মুহাম্মাদ এর অবতীর্ণ কুরআনের সাথে কুফরী করে।” (অর্থাৎ কুরআনকেই সে অবিশ্বাস ও অমান্য করে। কারণ, কুরআনে এ সব কুকর্মকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।) ৪২২
যেহেতু কুরআনে বলা হয়েছে,
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
“লোকে তোমাকে রজঃস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বল, তা অশুচি। সুতরাং তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রীসঙ্গ বর্জন কর এবং যতদিন না তারা পবিত্র হয়, (সহবাসের জন্য) তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হয়, তখন তাদের নিকট ঠিক সেইভাবে গমন কর, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থিগণকে এবং যারা পবিত্র থাকে, তাদেরকে পছন্দ করেন। ৪২৩
আর বলেছেন,
قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ وَمَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ
"বল, 'আল্লাহ ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে কেউই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না এবং ওরা কখন পুনরুত্থিত হবে (তাও) ওরা জানে না।”৪২৪
এ ছাড়া এক প্রকার বিকৃত যৌনাচার হল হস্তমৈথুন করা। চরিত্রবান যুবক-যুবতী তা করে না এবং অন্যান্য সকল প্রকার অস্বাভাবিক যৌনাচারে লিপ্ত হয় না। যেহেতু মহান আল্লাহ মু'মিনদের গুণ বর্ণনায় বলেছেন,
وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ - إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ - فَمَنْ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ -
"যারা নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখে। নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত; এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। সুতরাং কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে, তারা হবে সীমালংঘনকারী।"৪২৫
চরিত্রবান অবিবাহিত যুবক-যুবতী অথবা দূরে থাকা স্বামী-স্ত্রী যৌন-পীড়নে পীড়িত হলে মহান প্রতিপালককে ভয় করে এবং অতিরিক্ত উত্তেজনা দমনের উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন করে। নচেৎ আমভাবে তারা জানে, গোপনে এমন কিছুতে লিপ্ত থেকে মানুষের চক্ষুকে ফাঁকি দেওয়া গেলেও প্রতিপালকের চক্ষুকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়। আর এমনও হতে পারে যে, শাস্তি স্বরূপ দুনিয়াতেই তার দেহে সংক্রমিত হতে পারে এমন রোগ, যার নাম সে ইতিপূর্বে কখনো শোনেনি। মহানবী সাহাবাগণকে সতর্ক ক'রে বলেছিলেন,
يَا مَعْشَرَ الْمُهَاجِرِينَ خَمْسٌ إِذَا ابْتُلِيتُمْ بِهِنَّ وَأَعُوذُ بِاللَّهِ أَنْ تُدْرِكُوهُنَّ لَمْ تَظْهَرِ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ حَتَّى يُعْلِنُوا بِهَا إِلَّا فَشَا فِيهِمُ الطَّاعُونُ وَالْأَوْجَاعُ الَّتِي لَمْ تَكُنْ مَضَتْ فِي أَسْلَافِهِمُ الَّذِينَ مَضَوْا
"হে মুহাজিরদল! পাঁচটি কর্ম এমন রয়েছে যাতে তোমরা লিপ্ত হয়ে পড়লে (উপযুক্ত শাস্তি তোমাদেরকে গ্রাস করবে)। আমি আল্লাহর নিকট পানাহ চাই, যাতে তোমরা তা প্রত্যক্ষ না কর।
(তার মধ্যে একটি হল,) যখনই কোন জাতির মধ্যে অশ্লীলতা (ব্যভিচার) প্রকাশ্যভাবে ব্যাপক হবে, তখনই সেই জাতির মধ্যে প্লেগ এবং এমন মহামারী ব্যাপক হবে যা তাদের পূর্বপুরুষদের মাঝে ছিল না।” ৪২৬
আশা করি, কোন মানুষই এ ভবিষ্যৎ-বাণীর সত্যতা অস্বীকার করতে পারে না।

টিকাঃ
৪১৩. আহমাদ ১৯৭৭২
৪১৪. বুখারী ২৪৭৫, মুসলিম ২১১, আসহাবে সুনান
৪১৫. বুখারী ৬৪৭৪
৪১৬. সূরা বানী ইস্রাঈল: ৩২
৪১৭. মুসলিম ৬৯২৫, বুখারী ৬২৪৩, ৬৬১২
৪১৮. বুখারী ৬৬০, মুসলিম ২৪২৭
৪১৯. তিরমিযী ১৪৫৫, ইবনে মাজাহ ২৫৬৪, বাইহাক্বী ১৭৪৯১, ১৭৪৯২, সহীহুল জামে' ৬৫৮৮
৪২০. আহমাদ ২৭৩২, আবু দাউদ ৪৪৬৪, তিরমিযী ১৪৫৬, ইবনে মাজাহ ২৫৬১, সহীহুল জামে' ৬৫৮৯
৪২১. তিরমিযী ১১৬৫, নাসাঈর কুবরা ৯০০১, ইবনে হিব্বান ৪৪১৮, সহীহুল জামে' ৭৮০১
৪২২. আহমাদ ৯২৯০, আবু দাউদ ৩৯০৬, তিরমিযী ১৩৫, ইবনে মাজাহ ৬৩৯, বাইহাক্বী ১৪৫০৪
৪২৩. সূরা বাক্বারাহ-২: ২২২
৪২৪. সূরা নামল: ৬৫
৪২৫. সূরা মু'মিনূন: ৫-৭, মাআরিজ ২৯-৩১
৪২৬. বাইহাকী, ইবনে মাজাহ ৪০১৯, সহীহ তারগীব ৭৬৪

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 আদর্শবত্তা

📄 আদর্শবত্তা


চরিত্রবান নারী-পুরুষ হয় সমাজ-আকাশের তারকা। তাদেরকে দেখে সাধারণ লোকেরা সঠিক পথের দিশা পায়। তারা অপরের জন্য আদর্শ ও নমুনা হয়। তারা স্ববিরোধী হয় না। তারা অপরকে ভালো শিক্ষা দিয়ে নিজেরা মন্দ কাজ করে না অথবা অপরকে মন্দ থেকে দূরে থাকতে বলে নিজেরা তার ভিতরে থাকে না। মহানবী বলেন,
مَثَلُ الَّذِي يُعَلِّمُ النَّاسَ الْخَيْرَ وَيَنْسَى نَفْسَهُ، مَثَلُ الْفَتِيلَةِ تُضِيءُ لِلنَّاسِ، وَتُحْرِقُ نَفْسَهَا
"যে ব্যক্তি লোকেদেরকে ভালো শিক্ষা দেয় এবং নিজেকে ভুলে বসে সেই ব্যক্তির উদাহরণ একটি (প্রদীপের) পলিতার মত; যে লোকেদেরকে আলো দান করে, কিন্তু নিজেকে জ্বালিয়ে ধ্বংস করে!" ৪২৭
আর মহান আল্লাহর কাছেও তা পছন্দনীয় নয়। তিনি বলেছেন,
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنسَوْنَ أَنفُسَكُمْ وَأَنتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
অর্থাৎ, কী আশ্চর্য! তোমরা নিজেদের বিস্মৃত হয়ে মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দাও, অথচ তোমরা কিতাব (গ্রন্থ) অধ্যয়ন কর, তবে কি তোমরা বুঝ না? ৪২৮
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ - كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা যা কর না, তা বল কেন? তোমরা যা কর না, তোমাদের তা বলা আল্লাহর নিকট অতিশয় অসন্তোষজনক। ৪২৯
সুতরাং স্ববিরোধিতা একটি মহা অপরাধ। আর তার জন্যই পরকালে তার বিশেষ শাস্তি রাখা হয়েছে। আল্লাহর রসূল বলেছেন,
يُؤْتَى بِالرَّجُلِ يَوْمَ القِيَامَةِ فَيُلْقَى فِي النَّارِ ، فَتَنْدَلِقُ أَقْتَابُ بَطْنِهِ فَيَدُورُ بِهَا كَمَا يَدُورُ الحِمَارُ فِي الرَّحَى ، فَيَجْتَمِعُ إِلَيْهِ أَهْلُ النَّارِ ، فَيَقُولُونَ : يَا فُلانُ ، مَا لَكَ ؟ أَلَمْ تَكُ تَأْمُرُ بالمَعْرُوفِ وَتَنهَى عَنِ المُنْكَرِ ؟ فَيَقُولُ : بَلَى ، كُنْتُ آمُرُ بِالْمَعْرُوفِ ولا آتِيهِ ، وَأَنْهَى عَنِ الْمُنْكَرِ وَآتِيهِ
"কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সেখানে তার নাড়ি-ভুঁড়ি বের হয়ে যাবে এবং সে তার চারিপাশে এমনভাবে ঘুরতে থাকবে, যেমন গাধা তার চাকির চারিপাশে ঘুরতে থাকে। তখন জাহান্নামীরা তার কাছে একত্রিত হয়ে তাকে বলবে, 'ওহে অমুক! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি না (আমাদেরকে) সৎ কাজের আদেশ, আর অসৎ কাজে বাধা দান করতে?' সে বলবে, 'অবশ্যই। আমি (তোমাদেরকে) সৎকাজের আদেশ দিতাম; কিন্তু আমি তা নিজে করতাম না এবং অসৎ কাজে বাধা দান করতাম; অথচ আমি নিজেই তা করতাম!"৪৩০
তিনি আরো বলেছেন,
مَرَرْتُ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي عَلَى قَوْمٍ تُقْرَضُ شِفَاهُهُمْ بِمَقَارِيضَ مِنْ نَارٍ قُلْتُ مَا هَؤُلَاءِ قَالَ هَؤُلَاءِ خُطَبَاءُ أُمَّتِكَ مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا كَانُوا يَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَيَنْسَوْنَ أَنْفُسَهُمْ وَهُمْ يَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا يَعْقِلُونَ
"আমি মি'রাজের রাতে এমন একদল লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছি যারা আগুনের কাঁইচি দ্বারা নিজেদের ঠোঁট কাটছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'হে জিবরীল! ওরা কারা?' তিনি বললেন, 'ওরা আপনার উম্মতের বক্তাদল; যারা নিজেদের বিস্মৃত হয়ে মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দিত, অথচ ওরা কিতাব (গ্রন্থ) অধ্যয়ন করত, তবে কি ওরা বুঝত না।” ৪৩১
কোন কাজ শুরু করতে নিজে শুরু করা চরিত্রবানের আলামত। তাতে দেখাদেখি অন্যেরাও কাজ শুরু করে। অনেকে লজ্জায় পড়ে সত্বর কাজে লেগে পড়ে। সুতরাং প্রত্যেক কাজে আদর্শবানদের জন্য অপরের পরিচালক হওয়া বাঞ্ছনীয়। বাড়ির মুরুব্বী হবে বাড়ির লোকের জন্য আদর্শ। দাদা, নানা, শ্বশুর ও বাবা হবে সন্তান বা জামাইয়ের জন্য আদর্শ। দাদী, নানী, শাশুড়ী ও মা হবে মেয়ে ও বউদের জন্য আদর্শ। তা না হলে, শাশুড়ী যদি দাঁড়িয়ে মুতে, বউরা মুতবে ঘুরপাক দিয়ে---এটাই স্বাভাবিক।
চরিত্রবান হবে সর্ব-কল্যাণের ইমাম। সে হবে রহমানের সেই বান্দা, যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ক'রে বলে,
وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
অর্থাৎ, যারা (প্রার্থনা ক'রে) বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদেরকে আমাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর কর এবং আমাদেরকে সাবধানীদের জন্য আদর্শস্বরূপ কর। ১৪৩২

টিকাঃ
৪২৭. বায্যার, সহীহ তারগীব ১৩০
৪২৮. সূরা বাক্বারাহ-২: ৪৪
৪২৯. সাফ: ২-৩
৪৩০. বুখারী ৩২৬৭, মুসলিম ৭৬৭৪
৪৩১. আহমাদ ১২২১১, ১২৮৫৬ প্রভৃতি, ইবনে হিব্বان ৫৩, ত্বাবারানীর আওসাত্ব ২৮৩২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭৭৩, আবু য়‍্যা'লা ৩৯৯২, সহীহ তারগীব ১২৫
৪৩২. ফুরক্বান: ৭৪

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 অল্পে তুষ্টি

📄 অল্পে তুষ্টি


চরিত্রবান মানুষ পার্থিব ব্যাপারে নিজের ভাগ্য ও ভাগ নিয়ে তুষ্ট থাকে। যে দেশে ও যেমন পরিবারে তার জন্ম হয়েছে, যে সম্পদ সে লাভ করেছে, যে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ি তার ভাগ্যে জুটেছে, তাই নিয়ে সে সন্তুষ্ট থাকে।
চরিত্রবানের ভিতরে লোভ-লালসা থাকে না। অতিরিক্ত বিষয়াসক্তি তাকে অসৎ পথে নামায় না। সে ধনী না হলেও তার হৃদয়-মনে থাকে ধনবত্তা। আর মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ الغِنَى عَن كَثرَةِ العَرَضِ ، وَلَكِنَّ الغِنَى غِنَى النَّفْسِ
"বিষয় সম্পদের আধিক্য ধনবত্তা নয়, প্রকৃত ধনবত্তা হল অন্তরের ধনবত্তা।”৪৩৩
যা পেয়েছে তাতেই যদি মানুষ তুষ্ট হয়, তাহলে সেই হয় আসল সুখী, আসল ধনী ও সফল মানুষ। মহানবী বলেছেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ أَسْلَمَ ، وَكَانَ رِزْقُهُ كَفَافاً ، وَقَنَّعَهُ اللَّهُ بِمَا آتَاهُ
"সে ব্যক্তি সফলকাম, যে ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাকে পরিমিত রুযী দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তাতে তাকে তুষ্ট করেছেন।” ৪৩৪
আসল রাজা ও সারা দুনিয়ার মালিক কে জানেন? রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمْ آمِنًا فِي سِرْبِهِ مُعَافَى فِي جَسَدِهِ عِنْدَهُ قُوتُ يَوْمِهِ فَكَأَنَّمَا حِيزَتْ لَهُ الدُّنْيا بحذافيرها
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ঘরে অথবা গোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপদে ও সুস্থ শরীরে সকাল করেছে এবং তার কাছে প্রতি দিনের খাবার আছে, তাকে যেন পার্থিব সমস্ত সম্পদ দান করা হয়েছে।"৪৩৫
চরিত্রবান নিজের যা কিছু, তাই নিয়েই ক্ষান্ত হয়। তার মানে চেষ্টা যে চালায় না, তা নয়। কিন্তু চেষ্টার পরেও না পেলে আফসোস করে না। যে পেয়েছে, তার দেখে হিংসা করে না। যার আছে, তার দেখে লোভ করে না। কারণ তাতে মহান আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে তুচ্ছজ্ঞান করা হয় এবং দুঃখ ও মনঃকষ্ট ছাড়া কিছু লাভ হয় না। এই জন্য মহানবী বলেছেন,
اُنْظُرُوا إِلَى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ فَهُوَ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ
“তোমাদের উপরে যারা তাদের দিকে দেখো না; বরং তোমার নিচে যারা তাদের দিকে দেখ। যাতে তোমাদের প্রতি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে তুচ্ছজ্ঞান না কর।”৪৩৬
যে নারী বা পুরুষ নিজের ভাগ্য ও ভাগ নিয়ে তুষ্ট, সেই আসলে সবার চাইতে বড় ধনী। সেই আসলে সবার চাইতে বড় কৃতজ্ঞ। মহানবী আবূ হুরাইরা কে অসিয়ত ক'রে বলেছিলেন,
اتَّقِ الْمَحَارِمَ تَكُنْ أَعْبَدَ النَّاسِ وَارْضَ بِمَا قَسَمَ اللَّهُ لَكَ تَكُنْ أَغْنَى النَّاسِ وَأَحْسِنُ إِلَى جَارِكَ تَكُنْ مُؤْمِنًا وَأَحِبَّ لِلنَّاسِ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ تَكُنْ مُسْلِمًا وَلَا تُكْثِرُ الضَّحِكَ فَإِنَّ كَثْرَةَ الضَّحِكِ تُمِيتُ الْقَلْبَ
"নিষিদ্ধ ও হারাম জিনিস থেকে বেঁচে থাক, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সব চেয়ে বড় আ'বেদ (ইবাদতকারী) গণ্য হবে। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন, তাতেই পরিতুষ্ট থাক, তবে তুমিই মানুষের মধ্যে সব চেয়ে বড় ধনী হবে। প্রতিবেশীর প্রতি অনুগ্রহ কর, তাহলে তুমি একজন (খাঁটি) মু'মিন বিবেচিত হবে। মানুষের জন্যও তা-ই পছন্দ কর, যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ কর, তাহলে তুমি একজন (খাঁটি) মুসলিম গণ্য হবে। আর খুব বেশী হাসবে না, কারণ, অধিক হাসি অন্তরকে মেরে দেয়।"৪৩৭
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
يَا أَبَا هُرَيْرَةَ كُنْ وَرِعًا تَكُنْ أَعْبَدَ النَّاسِ ، وَكُنْ قَنِعًا تَكُنْ أَشْكَرَ النَّاسِ ، وَأَحِبَّ لِلنَّاسِ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ تَكُنْ مُؤْمِنًا، وَأَحَسِنُ جِوَارَ مَنْ جَاوَرَكَ تَكُنْ مُسْلِمًا ، وَأَقِلَّ الضَّحِكَ ، فَإِنَّ كَثْرَةَ الضَّحِكِ تُمِيتُ الْقَلْبَ
"হে আবু হুরাইরা! তুমি নিজের মধ্যে আল্লাহভীরুতা নিয়ে এস, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় আবেদ হয়ে যাবে। আর অল্পে পরিতুষ্ট হও, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সব থেকে বেশী কৃতজ্ঞ হয়ে যাবে। মানুষের জন্যও তা-ই পছন্দ কর, যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ কর, তাহলে তুমি একজন (খাঁটি) মু'মিন গণ্য হবে। তোমার প্রতিবেশীর প্রতি সদ্ব্যবহার কর, তাহলে তুমি একজন (খাঁটি) মুসলিম বিবেচিত হবে। আর হাসি কম কর, কারণ, অধিক হাসি অন্তরকে মেরে দেয়।”৪৩৮
যাকে অল্প তুষ্ট করতে পারে না, তাকে অধিকও সন্তুষ্ট করতে পারবে না। ধনী হওয়ার পরেও মনের লোভ, আশা ও আকাঙ্ক্ষা তাকে দরিদ্র বানিয়ে রাখবে। আসলে ধনের ধনী ধনী নয়, মনের ধনীই ধনী। অল্পে তুষ্ট হৃদয় দরিয়া থেকেও বিশাল, ধনীর থেকেও বড় ধনী।
অল্প তুষ্ট হওয়া আমানতের দলীল। যে মানুষের ভিতরে আধিক্যের লোভ নেই, সে কোনদিন খিয়ানত করে না। আর স্বভাবতই সে চরিত্রবান হয়।
বলা বাহুল্য, জীবনে কী পেলাম, আর কী পেলাম না, তার হিসাব-নিকাশ না ক'রে, যা পেয়েছি ও পাচ্ছি তাতেই সন্তুষ্ট থাকা বুদ্ধিমানের কাজ।
অতিরিক্ত পাওয়ার লোভে অসৎ উপায় অবলম্বন করে না চরিত্রবান। যেমন যা নেই, তা পাওয়ার জন্য ভিক্ষাবৃত্তির পথ অবলম্বন করে না সুন্দর চরিত্রের অধিকারী। মহানবী বলেছেন,
اليَدُ العُلْيَا خَيْرٌ مِنَ اليَدِ السُّفْلَى ، وَابْدَأَ بِمَنْ تَعُولُ ، وَخَيْرُ الصَّدَقَةِ مَا كَانَ عَنْ ظَهْرِ غِنى ، وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَّهُ اللَّهُ ، وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللَّهُ
"উপরের (দাতা) হাত নিচের (গ্রহীতা) হাত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। যাদের ভরণ- পোষণ তোমার দায়িত্বে আছে তাদেরকে আগে দাও। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থেকে সাদকাহ করা উত্তম। যে ব্যক্তি (হারাম ও ভিক্ষা করা থেকে পবিত্র থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখেন এবং যে পরমুখাপেক্ষিতা থেকে বেঁচে থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে অভাবশূন্য ক'রে দেন।”৪৩৯

টিকাঃ
৪৩৩. বুখারী ৬৪৪৬, মুসলিম ২৪৬৭
৪৩৪. মুসলিম ২৪৭৩
৪৩৫. তিরমিযী ২৩৪৬, ইবনে মাজাহ ৪১৪১
৪৩৬. বুখারী ৬৪৯০ ভিন্ন শব্দে, মুসলিম ৭৬১৯
৪৩৭. আহমাদ ৮০৯৫, তিরমিযী ২৩০৫, সহীহুল জামে ৪৫৮০, ৭৮৩৩
৪৩৮. বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ ২৫২, ইবনে মাজা ৪২১৭
৪৩৯. বুখারী ১৪২৭, মুসলিম ২৪৩৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00