📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 সংক্ষিপ্তন

📄 সংক্ষিপ্তন


চরিত্রবান মানুষ শান্তি পছন্দ করে, শান্তির পরিবেশ ভালোবাসে, অশান্ত সমাজে শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা করে।
সমাজে পাশাপাশি বসবাস করার সময় আপোসে দ্বন্দ-কলহ বেধে যেতেই পারে। সে ক্ষেত্রে শত্রুতা ও বিদ্বেষ পর্যায়ে পৌঁছনোর আগে আগে সন্ধিস্থাপনের মাধ্যমে মিলন সংসাধন করা কর্তব্য মুসলিমদের। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَالصُّلْحُ خَيْرٌ
অর্থাৎ, বস্তুতঃ আপোস করা অতি উত্তম।৩৭৮
তিনি অন্যত্র বলেছেন,
فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ
অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন কর। ৩৭৯
তিনি আরো বলেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ
অর্থাৎ, সকল মু'মিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই, সুতরাং তোমরা তোমাদের দুই ভাই-এর মধ্যে সন্ধি স্থাপন কর। ৩৮০
সন্ধিস্থাপনে কিছু লোকের অগ্রণী ভূমিকার প্রয়োজন থাকে। যারা সালিসী ও মধ্যস্থতা ক'রে দুই বিবদমান গোষ্ঠীর মাঝে মিলন সংসাধন করে। আর তাদের কাজ বিশাল মহৎ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
لا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِنْ نَجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ
অর্থাৎ, তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোন কল্যাণ নেই, তবে যে (তার পরামর্শে) দান খয়রাত, সৎকাজ ও মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের নির্দেশ দেয় (তাতে) কল্যাণ আছে। ৩৮১
মানুষের মাঝে মনোমালিন্য দূরীভূত হোক, তারা আপোসে মিলেমিশে বসবাস করুক, পরস্পরের হৃদয়-মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষ বিলীন হয়ে যাক, গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে বিবাদ-বিসংবাদ মুছে যাক, এমন সৎ প্রচেষ্টা যাদের, তারা কি সওয়াবপ্রাপ্ত না হয়?
মহানবী বলেছেন,
كُلُّ سُلامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ ، كُلَّ يَومٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ : تَعْدِلُ بَينَ الاثنينِ صَدَقَةٌ ، وتُعِينُ الرَّجُلَ فِي دَابَّتِهِ ، فَتَحْمِلُهُ عَلَيْهَا أَوْ تَرفَعُ لَهُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ ، وَالكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ ، وبكلِّ خَطْوَةٍ تَمشِيهَا إِلَى الصَّلاةِ صَدَقَةٌ ، وتميط الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
"প্রতিদিন যাতে সূর্য উদয় হয় (অর্থাৎ প্রত্যেক দিন) মানুষের প্রত্যেক গ্রন্থির পক্ষ থেকে প্রদেয় একটি করে সাদকাহ রয়েছে। (আর সাদকাহ শুধু মাল খরচ করাকেই বলে না; বরং) দু'জন মানুষের মধ্যে তোমার মীমাংসা ক'রে দেওয়াটাও সাদকাহ, কোন মানুষকে নিজ সওয়ারীর উপর বসানো অথবা তার উপর তার সামান উঠিয়ে নিয়ে সাহায্য করাও সাদকাহ, ভাল কথা বলা সাদকাহ, স্বলাতের জন্য কৃত প্রত্যেক পদক্ষেপ সাদকাহ এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস দূরীভূত করাও সাদকাহ।"৩৮২
সন্ধিস্থাপন ও বিবদমান দুই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাঝে মিলন সৃষ্টি করা এমন একটি মহান চরিত্রের কাজ, যার জন্য মিথ্যা বলাকেও বৈধ করা হয়েছে। বৃহত্তর কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে শরীয়ত মিথ্যা বা অবাস্তব কথা বলার অনুমতি দিয়েছে, যাতে দুই পক্ষের মাঝে প্রীতি সৃষ্টি হয়, উভয়ের হৃদয় থেকে বিভেদ দূর হয়ে যায়, দূর হতে থাকা বিপরীতগামী দুই মন যেন একে অন্যের নিকট হতে থাকে। সেটা আসলে মিথ্যা নয়, যে বলে, সে মিথ্যাবাদী নয়। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ وَيَقُولُ خَيْرًا وَيَنْمِي خَيْرًا
"লোকের মধ্যে সন্ধি স্থাপনকারী মিথ্যাবাদী নয়। সে হয় ভাল কথা পৌঁছায়, না হয় ভাল কথা বলে।"৩৮৩
ঠিক এরই বিপরীত কিছু অসৎ প্রকৃতির লোক আছে, যারা সম্প্রীতিশীল মানুষের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতে চায় এবং দুই গোষ্ঠীর মাঝে ঝগড়া বাধাতে চায়। তাদের ব্যাপারে মহানবী বলেছেন,
إِنَّ خِيَارَ أُمَّتِي الَّذِينَ إِذَا رُءُوا ذُكِرَ اللهُ ، وَإِنَّ شِرَارَ أُمَّتِي الْمَشَّاءُونَ بِالنَّمِيمَةِ الْمُفَرِّقُونَ بَيْنَ الأَحِبَّةِ الْبَاغُونَ الْبُرَاءَ الْعَنَتَ
"আমার উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি তারা, যাদেরকে দেখলে আল্লাহ স্মরণ হয়। আর আমার উম্মতের সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তি হল তারা, যারা চুগলখোরি ক'রে বেড়ায়, বন্ধুদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা ঘটায় এবং নির্দোষ লোকেদের মাঝে দোষ (বা কষ্ট) খুঁজে বেড়ায়।"৩৮৪

টিকাঃ
৩৭৮. ঐ ১২৮
৩৭৯. সূরা আনফাল ১
৩৮০. সূরা হুজুরাত ১০
৩৮১. সুরা নিসা ১১৪
৩৮২. বুখারী ২৯৮৯, মুসলিম ২৩৮২
৩৮৩. বুখারী ২৬৯২, মুসলিম ৬৭৯৯
৩৮৪. আহমাদ, বাইহাক্বী, সিঃ সহীহাহ ২৮৪৯

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 ন্যায়পরায়ণতা

📄 ন্যায়পরায়ণতা


মহান আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ বাদশা, তিনি ন্যায়পরায়ণকে ভালোবাসেন। সুতরাং ন্যায়পরায়ণ হল একজন সুচরিত্রবান মানুষ। এমনই সচ্চরিত্রতার আদেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
"নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালংঘন করা হতে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন; যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।"৩৮৫
রাগ ও শান্তির সময় উচিত ও ন্যায্য কথা বলা আবশ্যক। বিরোধী হলেও তার সাথে সচ্চরিত্রতা তথা ইনসাফ বজায় রাখা কর্তব্য। আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও তার সাথে ইনসাফ বজায় রাখা সচ্চরিত্রতার লক্ষণ।
আপনার ভাষাভাষী নয় বলে, আপনি তার সাথে ন্যায় ব্যবহার করেন না, তাহলে আপনি সুচরিত্রবান হতে পারেন না।
আপনার স্বদেশী নয় বলে আপনি তার সাথে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখবেন না, তাকে স্বদেশী সমান মর্যাদা দেবেন না, ভালো কাজে তার সহযোগিতা করবেন না, তার বিপদে সাহায্য করবেন না, তাহলে আপনি সচ্চরিত্রের অধিকারী হতে পারবেন না।
আপনার স্বজাতি নয় বলে আপনি তার ন্যায্য অধিকার দেবেন না, তাহলে আপনি সুন্দর চরিত্রের মালিক হতে পারবেন না।
আপনার গায়ের রঙের সাথে মিলে না, তার সাথে আপনি ইনসাফপূর্ণ আচরণ করবেন না, তাহলে আপনি বর্ণ-বৈষম্যের শিকার, আপনি চরিত্রবান নন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاء بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে (হকের উপর) দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত (এবং) ন্যায়পরায়ণতার সাথে সাক্ষ্যদাতা হও। কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনও সুবিচার না করাতে প্ররোচিত না করে। সুবিচার কর, এটা আত্মসংযমের নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন। ৩৮৬
গঠনমূলক সমালোচনার ক্ষেত্রেও চরিত্রবান সচ্চরিত্রতা বজায় রাখে। সেখানেও সে ন্যায়পরায়ণতার ভারসাম্য রক্ষা ক'রে কথা বলে। কোন ব্যক্তি, জামাআত, মযহাব, দল, বই ইত্যাদির সমালোচনা করার ক্ষেত্রে অন্যায়ভাবে মুখ খোলা চরিত্রবানের উচিত নয়।
নিজের স্বার্থে ঘা লাগলে অসৎ লোকেরা ইনসাফের নিক্তি ঠিক রাখতে পারে না। আপনজনের পাতে ঝোল টানার ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতার নীতি ধ্বংস ক'রে বসে।
দেওয়া-নেওয়ার সময়, কথা বলার সময় বা মন্তব্য করার সময় আপন খেয়াল-খুশীর অনুবর্তী না হয়ে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখে প্রত্যেক মুসলিম। যেহেতু তা মহান আল্লাহর নির্দেশ,
وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى وَبِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا ذَلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
"যখন তোমরা কথা বলবে, তখন স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায় কথা বল এবং আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ কর। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।"৩৮৭
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاء لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالأَقْرَبِينَ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَفَقِيرًا فَالله أَوْلَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَن تَعْدِلُوا وَإِن تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ন্যায় বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাক, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দাও; যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। সে বিত্তবান হোক অথবা বিত্তহীনই হোক, আল্লাহ উভয়েরই যোগ্যতর অভিভাবক। সুতরাং তোমরা ন্যায়-বিচার করতে খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয়ো না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল অথবা পাশ কেটে চল, তাহলে (জেনে রাখ) যে, তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন। "৩৮৮
অতএব কেউ আপনার কোন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে বলে আপনি তার প্রতি সদ্ব্যবহার বা ন্যায়াচরণ করবেন না, তা উচিত নয়।
আপনার পণ্য নেয় না বলে, আপনার গাড়ি ভাড়া নেয় না বলে আপনি কারো প্রতি ইনসাফ করবেন না, তা সচ্চরিত্রতা নয়।
আপনার প্রশংসা করেনি বলে, যদিও আপনার নিন্দা করেনি, তবুও আপনি তাকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন, তা বৈধ নয়।
আপনাকে দাওয়াত দেয়নি বলে আপনি তাকে তার ন্যায়াধিকার প্রদান করবেন না, তা হয় না।
আপনার বা আপনার কোন আত্মীয়র বিরুদ্ধে বিচার করেছে বলে, যদিও সেটা ন্যায় বিচার ছিল, তবুও তার প্রতি অন্যায়াচরণ করবেন, তাহলে সচ্চরিত্রের মালিক হতে পারবেন না।
আপনার সুবিধা করেনি বলে, আপনার ভুল ধরেছে বলে, আপনাকে কোন মন্দ কাজে বাধা দিয়েছে বলে, আপনার কাছে ন্যায্য অধিকার দাবি করেছে বলে, আপনার কাছে শরীক হিসাবে সঠিক ভাগ চেয়েছে বলে, আপনার কাছে ঋণ পরিশোধ চেয়েছে বলে, সে খারাপ হয়ে গেল। এতদিন যে ‘ভালো’ ছিল, নিজের অধিকার চাওয়ার ফলে সে ‘কালো’ হয়ে গেল। এমন আচরণ চরিত্রবানের হতে পারে না।
কথা বললে, সঠিক কথা বলতে হবে, স্পষ্ট কথায় কষ্ট যেন না হয়, হক কথা বলতে যেন স্বার্থপরতার শিকার না হন। তবেই আপনি সৎ লোক, চরিত্রবান লোক। নচেৎ আপনার শ্লোগান যদি, ‘সুবিধাবাদ, জিন্দাবাদ’ হয় তাহলে- 'স্বার্থের বালাই তরে কহিতে উচিত কথা কুণ্ঠিত যারা তারা সৎলোক নহে, যেদিকে পেটের সেবা সেই দিকে বলে কথা যেমতো সুবিধা দেখে সেই মতো কহে।'
অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا
"হে বিশ্বাসিগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল।"৩৮৯
আর মহানবী বলেছেন,
صِلْ مَنْ qَطَعَكَ وَأَحْسِنُ إِلَى مَنْ أَسَاءَ إِلَيْكَ وَقُلِ الْحَقَّ وَلَوْ عَلَى نَفْسِكَ
"তুমি তার সাথে সুসম্পর্ক জুড়ে চল যে তোমার সাথে তা নষ্ট করতে চায়, তার প্রতি সদ্ব্যবহার কর যে তোমার সাথে দুর্ব্যবহার করে এবং হক কথা বল; যদিও তা নিজের বিরুদ্ধে হয়।"৩৯০

টিকাঃ
৩৮৫. সূরা নাহল: ৯০
৩৮৬. সূরা মায়িদাহ: ৮
৩৮৭. সূরা আনআম: ১৫২
৩৮৮. সূরা নিসা: ১৩৫
৩৮৯. সূরা আহযাব: ৭০
৩৯০. ইবনে নাজ্জার, সহীহুল জামে ৩৭৬৯

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 সভ্য পোশাক পরিধান

📄 সভ্য পোশাক পরিধান


সভ্য ও ভালো পোশাক পরিধান চরিত্রবান নারী-পুরুষের পরিচয়। মহান স্রষ্টা সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। সুতরাং সুন্দর থাকা সুন্দর চরিত্রের মানুষের আচরণ অবশ্যই হবে।
কিন্তু সভ্য পোশাক বলে কাকে?
আমরা সাধারণভাবে জানি, আমাদের বিবেক যেটাকে সভ্য বা ভালো বলে, সেটাই কিন্তু সভ্য বা ভালো নয়। তাছাড়া যত মানুষ, তত রকমের মন, তত রকমের বিবেক। বিবেকে-বিবেকে ও পছন্দে-পছন্দে তফাৎ আছে। তাই আমাদের সৃষ্টিকর্তা তথা শরীয়ত যেটাকে ভালো বলে, সেটাকেই ভালো বলে মেনে নিতে হয়। আর শরীয়তে সভ্য ও ভালো লেবাস-পোশাকের কিছু শর্ত আছে।
মহিলাদের পোশাকে শর্ত হল,
১। লেবাস যেন (বেগানার সামনে) দেহের সর্বাঙ্গকে ঢেকে রাখে।
২। লেবাস যেন এমন পাতলা না হয়, যাতে কাপড়ের উপর থেকেও ভিতরের চামড়া নজরে আসে।
৩। পোশাক যেন এমন আঁট-সাঁট (টাইটফিট) না হয়, যাতে দেহের উঁচু-নিচু ব্যক্ত হয়।
৪। লেবাস যেন কোন কাফের মহিলার অনুকৃত না হয়।
৫। তা যেন পুরুষদের লেবাসের অনুরূপ না হয়।
৬। লেবাস যেন জাঁকজমকপূর্ণ প্রসিদ্ধিজনক না হয়।
৭। যে লেবাস মহিলা পরিধান করবে সেটাই যেন (বেগানা পুরুষের সামনে) সৌন্দর্যময় ও দৃষ্টি-আকর্ষী না হয়।
৮। তা যেন সুগন্ধিত না হয়।
আর পুরুষদের লেবাসের শর্তাবলী হল,
১। লেবাস যেন নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ অবশ্যই আবৃত রাখে।
২। এমন পাতলা না হয়, যাতে ভিতরের চামড়া নজরে আসে।
৩। এমন আঁট-সাঁট না হয়, যাতে দেহের উঁচু-নিচু ব্যক্ত হয়।
৪। কাফেরদের লেবাসের অনুকৃত না হয়।
৫। মহিলাদের লেবাসের অনুরূপ না হয়।
৬। জাঁকজমকপূর্ণ প্রসিদ্ধিজনক না হয়।
৭। গাঢ় হলুদ বা জাফরানী রঙের না হয়।
৮। লেবাস যেন রেশমী কাপড়ের না হয়।
৯। পরিহিত লেবাস (পায়জামা, প্যান্ট, লুঙ্গি, কামীস প্রভৃতি) যেন পায়ের গাঁটের নিচে না যায়।
উক্ত শর্তাবলী পালন ক'রে যে নারী-পুরুষ পোশাক পরিধান করবে, তাদেরকে চরিত্রবান বলে গণ্য করা হবে।
তবে এ কথাও ঠিক যে, পোশাক-পরিচ্ছদ হচ্ছে, মানুষের মনের দর্পণ। মন যে প্রকৃতির হবে, তার ছাপ ফুটে উঠবে দেহের পোশাকে। মনে পরহেযগারি না থাকলে, কেউ পরহেযগারের পোশাক পরিধান করতে পারে না। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْءَاتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ
“হে বনী আদম! (হে মানবজাতি) তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকার ও বেশভূষার উদ্দেশ্যে আমি তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ অবতীর্ণ করেছি। আর সংযমশীলতার পরিচ্ছদই সর্বোৎকৃষ্ট। ৩৯১
অবশ্য ঢঙ ও সঙ করার নিমিত্তে অনেকে ভালো সাজার ভালো লেবাস পরতে পারে। কিন্তু আচরণে প্রকাশ পেয়ে যাবে তাদের আসল পরিচয়।
সভ্য ও ভদ্র মানুষের পরিচয় পাওয়া যাবে ভদ্র ও শালীন পোশাকের ভিতরে। যেমন অসভ্য ও অভদ্র লোকের পরিচয় পাওয়া যাবে তার অসভ্য ও অশালীন পোশাকের ভিতরে।
দৃষ্টি আকর্ষণ করার বহুবিদ পন্থার মধ্যে অশালীন পোশাক পরিধান করা অন্যতম। মহান আল্লাহ তাই বিধান দিয়েছেন, যাতে নারী-পুরুষ সুসভ্য পোশাক পরিধান করে এবং উভয়েই নিজ নিজ দৃষ্টি সংযত রাখে। নারীর জন্য বিধান দিয়েছেন পর্দার। পর্দা হল পবিত্রতা ও শালীনতার পরিচয়। অবশ্যই সেই সাথে শর্ত হল মনের পর্দা ও পবিত্রতা।

টিকাঃ
৩৯১. সূরা আ'রাফ: ২৬

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 দৃষ্টি-সংযম

📄 দৃষ্টি-সংযম


অবৈধ নারী অথবা সুদর্শন বালকের প্রতি পুরুষের এবং অবৈধ পুরুষের প্রতি নারীর সকাম দৃষ্টিপাত অসচ্চরিত্রতার অন্যতম লক্ষণ। এই জন্য মহান আল্লাহর মু'মিনদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে স্বীয় নবী কে আদেশ দিলেন,
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ - وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ
"বিশ্বাসীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে; এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। বিশ্বাসী নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে।"৩৯৮
আর মহানবী এর নির্দেশ হল,
لا يَنْظُرُ الرَّجُلُ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ ، وَلاَ المَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ المَرْأَةِ ، وَلَا يُفْضِي الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ فِي ثَوْبِ وَاحِدٍ، وَلاَ تُفْضِي المَرْأَةُ إِلَى المَرْأَةِ فِي الثَّوْبِ الوَاحِدِ
"কোন পুরুষ অন্য পুরুষের গুপ্তাঙ্গের দিকে যেন না তাকায়। কোন নারী অন্য নারীর গুপ্তস্থানের দিকে যেন না তাকায়। কোন পুরুষ অন্য পুরুষের সঙ্গে একই কাপড়ে যেন (উলঙ্গ) শয়ন না করে। (অনুরূপভাবে) কোন নারী, অন্য নারীর সাথে একই কাপড়ে যেন (উলঙ্গ) শয়ন না করে।"৩৯৯
যেখানে গেলে বা বসলে অবৈধ দৃষ্টিপাত হতে পারে, সে জায়গায় যাওয়া বা বসা উচিত নয়। যাতে নজরাগ্নির সামান্য স্ফুলিঙ্গ থেকে বিশাল অগ্নিকাণ্ড ঘটে না বসে এবং আঁখির বাঁকা ছুরি দ্বারা কারো হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত না হয়ে যায়। আবু সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত, একদা নবী বললেন, "তোমরা রাস্তায় বসা থেকে বিরত থাক।" লোকেরা বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! ওখানে আমাদের বসা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। আমরা (ওখানে) বসে বাক্যালাপ করি।' রাসূলুল্লাহ বললেন, "যদি তোমরা রাস্তায় বসা ছাড়া থাকতে না পার, তাহলে রাস্তার হক আদায় কর।" তারা নিবেদন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! রাস্তার হক কী?' তিনি বললেন,
غَضُّ البَصَرِ، وَكَفُّ الأذى، وَرَدُّ السَّلامِ ، وَالأَمرُ بِالْمَعْرُوفِ ، وَالنَّهْي عَنِ الْمُنْكَرِ
"দৃষ্টি অবনত রাখা, (অপরকে) কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা, সালামের জবাব দেওয়া এবং ভাল কাজের আদেশ দেওয়া ও মন্দ কাজে বাধা প্রদান করা।"৪০০
ব্যভিচার করা দুশ্চরিত্র লম্পটের কাজ। মূল ব্যভিচারের বহু ভূমিকা আছে। তার মধ্যে তার প্রাথমিক পর্যায়ের ভূমিকা হল সকাম দৃষ্টিপাত। আর তা হল চক্ষুর ব্যভিচার। মহানবী বলেছেন,
كُتِبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ نَصِيبُهُ مِنَ الزِّنَا مُدْرِكُ ذَلِكَ لَا مَحَالَةَ : العَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ، وَالْأَذْنَانِ زِنَاهُمَا الاسْتِمَاعُ ، وَاللَّسَانُ زِنَاهُ الكَلَامُ، وَاليَدُ زِنَاهَا البَطْشُ، وَالرَّجُلُ زِنَاهَا الخطا ، وَالقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى ، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ أَوْ يُكَذِّبُهُ
"নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আদম সন্তানের জন্য ব্যভিচারের অংশ লিখে দিয়েছেন; যা সে অবশ্যই পাবে। সুতরাং চক্ষুদ্বয়ের ব্যভিচার (সকাম অবৈধ) দর্শন। কর্ণদ্বয়ের ব্যভিচার (অবৈধ যৌনকথা) শ্রবণ, জিভের ব্যভিচার (সকাম অবৈধ) কথন, হাতের ব্যভিচার (সকাম অবৈধ) ধারণ এবং পায়ের ব্যভিচার (সকাম অবৈধ পথে) গমন। আর হৃদয় কামনা ও বাসনা করে এবং জননেন্দ্রিয় তা সত্য বা মিথ্যায় পরিণত করে।"৪০১
বলা বাহুল্য, চরিত্রবান নারী-পুরুষ স্বেচ্ছায় অবৈধ কিছু তাকিয়ে দেখে না। কিন্তু দেখার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও যদি চোখ পড়ে যায়, তাহলে কী করার আছে? জারীর বিন আব্দুল্লাহ বলেন, 'আচমকা দৃষ্টি সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহ কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাকে আদেশ করলেন, যেন আমি আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিই।'৪০২
রাসূলুল্লাহ (সা.) আলী (রা.)-কে বলেছিলেন,
يَا عَلِيُّ لَا تُتْبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ
“হে আলী! একবার নজর পড়ে গেলে আর দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখো না। প্রথমবারের (অনিচ্ছাকৃত) নজর তোমার জন্য বৈধ। কিন্তু দ্বিতীয়বারের নজর বৈধ নয়। ৪০০
প্রকাশ থাকে যে, যা দেখা হারাম, তার ছবি দেখা হারাম। বিশেষ ক'রে নগ্ন ও অশ্লীল ছবি দর্শন কোন চরিত্রবান নারী-পুরুষের অভ্যাস হতে পারে না। কারণ পর্ণগ্রাফী দর্শন মাদকদ্রব্য সেবনের মতো তীব্র নেশায় পরিণত হয়। মাদকদ্রব্য সেবন না ক'রে যেমন অভ্যাসীর স্বস্তি আসে না, শান্তি আসে না, ঠিক তেমনই অবস্থা ঘটে পর্ণগ্রাফী দর্শনে অভ্যাসীর।
মাদকাসক্তরা যতটা আসক্তি মাদকদ্রব্যের প্রতি রাখে, তার থেকে বেশি আসক্তি আসে নগ্ন নারীদেহ ও অভিনীত যৌন-মিলন দর্শনের প্রতি। মাদকদ্রব্য মাদকাসক্তদের যতটা ক্ষতি করে, তার থেকে বেশি ক্ষতি করে নগ্ন নারীদেহ ও যৌনমিলন দর্শনের মাধ্যমে উষ্ণ তৃপ্তি গ্রহণকারীদের। কিন্তু নেশার ঘোরে ক্ষতিগ্রস্তরা সে ক্ষতির কথা অনুভবও করতে পারে না। পরিশেষে সর্বনাশই তাদের ভাগ্য হয়।
বলা বাহুল্য, অশ্লীল সেক্সী ছবি দর্শনে অভ্যাসী হওয়ার ফলে যে সকল ভয়ঙ্কর ক্ষতি রয়েছে, তার মধ্যে কতিপয় নিম্নরূপ :
> সেক্সী ফ্লিম্ দেখার অভ্যাস করার ফলে অপরাধীর স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে থাকে।
> নগ্ন ছবি দেখার ফলে মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ নষ্ট হয়ে যায়।
> সেক্সী ফ্লিম্ দেখার অভ্যাস করার ফলে অপরাধীর দাম্পত্য জীবন ধ্বংস হয়ে যায়।
> সেক্সী ফ্লিম্ দেখার অভ্যাস করার ফলে অপরাধী ব্যভিচারের মতো বড় পাপ ঘটায়।
> সেক্সী ফ্লিম্ দেখার অভ্যাস করার ফলে অপরাধী ধর্ষণের মতো বড় পাপ ঘটায়।
> সেক্সী ফ্লিম্ দেখার অভ্যাস করার ফলে নাবালক শিশুদের ভবিষ্যৎ বরবাদ হয়ে যায়।
> সেক্সী ফ্লিম্ দেখার অভ্যাস করার ফলে অপরাধীর নানা রোগ সৃষ্টি হতে পারে। সুতরাং সে অবৈধ দর্শনে অভ্যাসী কি কোন চরিত্রবান নারী-পুরুষ হতে পারে? কক্ষনো না।

টিকাঃ
৩৯৮. সূরা নূর: ৩০-৩১
৩৯৯. মুসলিম ৭৯৪
৪০০. বুখারী ৬২২৯, মুসলিম ৫৬৮৫
৪০১. মুসলিম ৬৯২৫, বুখারী ৬২৪৩, ৬৬১২
৪০২. মুসলিম ৫৭৭০
৪০০. আহমাদ, আবু দাউদ ২১৫১, তিরমিযী ২৭৭৭, হাকেম ২৭৮৮, বাইহাক্বী ১৩২৯৩, সহীহুল জামে' ৭৯৫৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00