📄 কথায় সচ্চরিত্রতা
সুচরিত্রবান নর-নারী নিজের কাজে যেমন সুন্দর আচরণ প্রদর্শন করে, তেমনি নিজ কথাতেও সভ্য আচরণ প্রকাশ ক'রে থাকে।
সুতরাং একজন চরিত্রবান কাউকে গালাগালি করে না। কারণ মুসলিমকে গালাগালি করা ফাসেকী। গালি দেয় না কোন মৃতকে, গালি দেয় না কোন কাফেরকে, গালি দেয় না পশুকে, গালি দেয় না ঝড়-বাতাস, মেঘ-বাদল বা প্রাকৃতিক কোন অবস্থাকে, গালি দেয় না যুগ-যামানাকে। কারণ এমন গালি দেওয়াতে মহান আল্লাহকে গালি দেওয়া হয়।
সে কোন রোগ-বালা বা জ্বরকে গালি দেয় না। কারণ তা তার জন্য উপকারী। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় বলে গালি দেয় না মোরগকে।
সে পরের পিতা-মাতাকে গালি দেয় না। কারণ তাতে পরোক্ষভাবে নিজের পিতামাতাকে গালি দেওয়া হয়।
তেমনি সে পরের বাপকে বাপ বলে দাবি করে না, কারণ তাতে নিজের মাকে ভ্রষ্টা বানানো হয়।
কোন আক্ষেপে নিজ পরিবার, সন্তান-সন্ততি বা কোন আত্মীয়কে কোন প্রকার অভিশাপ বা বদ্দুআ দেয় না, যেমন নিজ গৃহপালিত কোন পশুকেও অভিশাপ দেয় না। কারণ তাতে তার নিজেরই ক্ষতি হয়।
চরিত্রবান মুসলিম নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিকে অভিসম্পাত করে না, নির্দিষ্ট কোন জীবিত ব্যক্তিকে জাহান্নামী বলে না, যেমন সে কোন নির্দিষ্ট মুসলিমকে 'কাফের' বলে না।
সে কোন মানুষকে 'পশু' বলে গালি দেয় না, কারণ তা স্পষ্ট মিথ্যা কথা।
সে কোন সম্মানীর মানহানি করে না, কোন সম্ভ্রান্তের সম্ভ্রম লুটে না। কারণ তা সবচেয়ে বড় সূদের পাপ।
চরিত্রবান-চরিত্রবতী মিথ্যা কথা বলে না। মিথ্যা কসম খায় না। মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না। মিথ্যা অঙ্গীকার করে না। মিথ্যা স্বপ্ন গড়ে বলে না। কারো চরিত্রে মিথ্যা অপবাদ দেয় না। কারো প্রতি মিথ্যা দোষারোপ করে না। কারণ এগুলি এক-একটি মহাপাপ।
সে কারো রহস্য প্রকাশ করে না, কারো কাছে নিজ পাপ রহস্য প্রকাশ করে না, স্বামী-স্ত্রীর মিলন রহস্য প্রকাশ ক'রে তৃপ্তি নেয় না।
চরিত্রবতী মেয়ে পরস্ত্রীর সৌন্দর্য নিজ স্বামীর নিকট প্রকাশ করে না। পর-পুরুষের সাথে মোহনীয় কণ্ঠে কথোপকথন করে না এবং কথার আকর্ষণ-জালে পর-পুরুষকে আবদ্ধ করে না।
চরিত্রবান ও চরিত্রবতী কারো চুগলী করে না, কারো গীবত বা পরচর্চা করে না। দু' মুখে কথা বলে না। কারো কান ভাঙ্গায় না, কোন সন্তানকে তার পিতামাতার বিরুদ্ধে অথবা কোন পিতামাতাকে তার বউ-বেটার বিরুদ্ধে, কোন স্বামীকে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অথবা কোন স্ত্রীকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে, কোন দাসকে তার প্রভুর বিরুদ্ধে অথবা কোন মালিককে তার চাকরের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে না।
চরিত্রবান-চরিত্রবতী কোন মানুষকে নিয়ে, তার দ্বীনদারী নিয়ে, দৈহিক গঠন, আকৃতি-প্রকৃতি বা চারিত্রিক গুণ নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে না। অযথা কাউকে তার দোষ ধরে লজ্জা দেয় না। কথায় কথায় ভুল ধরে মানুষকে নাজেহাল করে না। সুচরিত্রের অধিকারী কাউকে মন্দ খেতাব দিয়ে ডাকে না অথবা তার নামের বিকৃতি ঘটায় না।
কেউ কথা বললে নিজে টপকে পড়ে তার কথা কাটে না। বড়দের মুখের উপর মুখ দেয় না।
চরিত্রবান-চরিত্রবতী প্রগল্ভ হয় না, ঢেটা বা ঢেটী হয় না। কথায় কথায় 'হোঃ-হোঃ, হাঃ-হাঃ, হিঃ-হিঃ' হাস্য-কৌতুক, মজাক-মস্করা ও ঠাট্টা-উপহাস করে না এবং সে সব করতে গিয়ে মিথ্যাও বলে না। সাধারণতঃ সচ্চরিত্র লোকেরা গম্ভীর হয়।
চরিত্রবান নর-নারীর মিথ্যা ঠাট-বাট থাকে না। যা আছে, তার থেকে বেশি কিছু প্রকাশ করে না, তা নিয়ে দম্ভ করে না। যেমন বড়লোকি প্রদর্শন করে না, তেমনি দারিদ্রেরও ভান করে না।
কোন বিষয়ে হকের সপক্ষে থেকেও বিতর্কে জড়ায় না। তর্ক করা সুচরিত্রবান লোকের নিদর্শন নয়। না চাইতেও কোন বিতর্কে জড়িয়ে গেলে সে সময় সে অশ্লীল বলে না। কারণ এটা মুনাফিকের লক্ষণ।
সুচরিত্রবান নেতৃত্ব প্রার্থনা করে না। কারণ তা এমন জিনিস, যাতে চরিত্রে দাগ লাগতে পারে এবং তা এক প্রকার আমানত। আর তাতে খিয়ানত হলে কিয়ামতের দিন তা অপমান ও অনুতাপের কারণ হবে।
কেউ পরামর্শ চাইলে চরিত্রবান নারী-পুরুষ পরামর্শদানে অহিতৈষা প্রদর্শন করে না। কারণ সেটাও এক প্রকার আমানত।
ইসলামই হল সবচেয়ে উচ্চ বংশের পরিচয়। সুতরাং চরিত্রবান নারী-পুরুষ উচ্চ বংশীয় হলে অপরের বংশে খোঁটা দেয় না এবং নিজেদের বংশ নিয়ে গর্ব করে না। কারণ এ হল অজ্ঞ যুগের অজ্ঞ মানুষদের আচরণ।
চরিত্রবান মুসলিম পুরুষ-মহিলা অশ্লীলতা থেকে যেমন শতক্রোশ দূরে থাকে, তেমনি মুখে নোংরা কথা বলা থেকেও সতত বিরত থাকে। অশ্লীলভাষী সুচরিত্রের অধিকারী হতে পারে না।
চরিত্রবান যুবক-যুবতী যেমন (ভালোবাসার নামে) ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয় না, তেমনি সর্বদা তারা জিহ্বার ব্যভিচার থেকেও সুদূরে থাকে। যেমন কান, চোখ, হাত ও পায়ের ব্যভিচার থেকেও অনেক তফাতে থাকে।
চরিত্রবান নারী-পুরুষ কর্কশভাষী হয় না, বরং মিষ্টভাষী হয়। তবে বেশি মিষ্টি দিয়ে নারী পুরুষকে আকর্ষণ করে না।
পরকীয় কথায় থাকা সচ্চরিত্র মানুষের কর্ম নয়। নিজের বিষয়ীভূত নয়, এমন কথা বলে নিজেকে বিতর্কে ফেলে না। অবশ্য মু'মিন নারী-পুরুষ একে অন্যের অভিভাবক। তারা পরস্পরকে সৎকর্মে আদেশ ও অসৎকর্মে বাধাদান ক'রে থাকে।
কোন গুজব রটানো চরিত্রবানের কাজ নয়। কোন রটিত গুজবে থাকাও তার জন্য শোভনীয় নয়।
সন্দিগ্ধ কথা বর্ণনা করা চরিত্রবানের উচিত নয়। কারণ তাতে সে মিথ্যুক প্রমাণিত হয়ে লাঞ্ছিত হতে পারে।
সুচরিত্রের অধিকারী কারো প্রতি কোন উপকার বা অনুগ্রহ ক'রে তা অন্যের কাছে প্রকাশ করে না। কারণ তাতে তার সওয়াব বাতিল হয়ে যায়। অবশ্য কোন অকৃতজ্ঞ নেমকহারামের কথা প্রয়োজনে উল্লেখ করার কথা আলাদা।
চরিত্রবান নারী-পুরুষ কথা বলে আদবের সাথে। তাদের কথায় গর্ব ও অহংকার প্রকাশ পায় না, কথায় কথায় তারা দম্ভ প্রকাশ করে না, আত্মপ্রশংসা করে না, ভঙ্গিপূর্ণ কথা বলে না। 'কাজে কুঁড়ে খেতে দেড়ে, বচনে মারে তেড়ে ফুঁড়ে।' অথবা 'বাক্যেতে পর্বত, কিন্তু কার্যে তুলাকার।' সুচরিত্রের মুকুটধারী এমন হতে পারে না।
চরিত্রবান নারী-পুরুষ রাগান্বিত হলে, তা সংবরণ করে। ক্রোধের সময় কথা বলা বন্ধ রেখে নিজেকে নিরাপদ করে। যেমন অন্যের ক্রোধের সময়েও কথা বলে তার ক্রোধবৃদ্ধি করে না।
সুন্দর চরিত্রের অধিকারী নারী-পুরুষ উপদেশ দেয় ও নেয়। অন্যের উপদেশ গ্রহণে কোন প্রকার ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে না।
সচ্চরিত্র মানুষ কারো জন্য অন্যায় সুপারিশ করে না, কাউকে অন্যায়ের পথ বলে না।
চরিত্রবান পুরুষ মসজিদে গিয়ে স্বলাত আদায় করে, সেখানে আল্লাহর যিক্র করে এবং সাংসারিক গল্প-গুজব করে না।
সুচরিত্রের অধিকারী নারী-পুরুষ কোন অবৈধ কাজে অনুমতিদান করে না।
কথায় কথায় কসম খায় না। কারণ তাতে সন্দেহ বাড়ে এবং আল্লাহর নামের তাযীম হাস পায়।
চরিত্রবান নারী-পুরুষ কম কথা বলে, প্রয়োজনে বলে এবং অসঙ্গত কথা আদৌ বলে না। আর কথা বললে অকপটে বলে, মনে কূট রাখে না।
📄 সুন্দর কথা বলা
যার চরিত্র সুন্দর, তার কথা কেন সুন্দর হবে না? অবশ্যই। চরিত্রবানের কথায় খোঁটা থাকবে না, খোঁচা থাকবে না, অহংকার থাকবে না, উদ্ভট ভঙ্গি থাকবে না। তার ভাষা কর্কশ হবে না, অশ্লীল হবে না, অসভ্য হবে না।
আব্দুল্লাহ বিন আম্র হতে বর্ণিত, একদা নবী বললেন,
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ غُرْفَةً يُرَى ظَاهِرُهَا مِنْ بَاطِنِهَا وَبَاطِنُهَا مِنْ ظَاهِرِهَا
"জান্নাতের মধ্যে এমন একটি কক্ষ আছে, যার বাহিরের অংশ ভিতর থেকে এবং ভিতরের অংশ বাহির থেকে দেখা যাবে।"
তা শুনে আবু মালেক আশআরী বললেন, 'সে কক্ষ কার জন্য হবে, হে আল্লাহর রসূল?' তিনি বললেন,
لِمَنْ أَلَانَ الْكَلَامَ وَأَطْعَمَ الطَّعَامَ وَبَاتَ لِلَّهِ قَائِمًا وَالنَّاسُ نِيَامٌ
"যে ব্যক্তি নরম কথা বলে, অন্নদান করে ও লোকেরা যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন স্বলাতে রত হয়; তার জন্য। "৩৭৪
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
لِمَنْ أَطَابَ الْكَلَامَ وَأَطْعَمَ الطَّعَامَ وَأَدَامَ الصِّيَامَ وَصَلَّى لِلَّهِ بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ
"যে ব্যক্তি সুন্দর কথা বলে, অন্নদান করে, বরাবর সিয়াম রাখে ও লোকেরা যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন স্বলাতে রত হয়; তার জন্য। "৩৭৫
আবূ ত্বালহা যায়েদ ইবনে সাহল বলেন, একদা আমরা ঘরের বাইরে অবস্থিত প্রাঙ্গনে বসে কথাবার্তায় রত ছিলাম। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (সেখানে) এসে আমাদের নিকট দাঁড়িয়ে বললেন,
مَا لَكُمْ وَلِمَجَالِسِ الصُّعُدَاتِ ؟ اِجْتَنِبُوا مَجَالِسَ الصُّعُدَاتِ
"তোমরা রাস্তায় বৈঠক করছ? তোমরা রাস্তায় বসা থেকে বিরত থাক।"
আমরা নিবেদন করলাম, 'আমরা তো এখানে এমন উদ্দেশ্যে বসেছি, যাতে (শরীয়তের দৃষ্টিতে) কোন আপত্তি নেই। আমরা এখানে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করা ও কথাবার্তা বলার জন্য বসেছি।' তিনি বললেন,
إِمَّا لَا فَأَدُّوا حَقَّهَا : غَضُّ البَصَرِ ، وَرَدُّ السَّلَامِ، وَحُسْنُ الكَلامِ
"যদি রাস্তায় বসা ত্যাগ না কর, তাহলে তার হক আদায় কর। আর তা হল, দৃষ্টি সংযত রাখা, সালামের উত্তর দেওয়া এবং সুন্দরভাবে কথাবার্তা বলা।"৩৭৬
কথা সুন্দর বলতে পারলে সুন্দরীর সুন্দরতায় বৃদ্ধি লাভ হয়। তবে বেগানা পুরুষের সাথে কথা বলতে হলে সেই সৌন্দর্য চুরি যাওয়ার আশঙ্কায় তাকে মহান আল্লাহর নির্দেশ মনে রেখে বলতে হবে। তিনি মহিলাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,
إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا
"যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। (স্বাভাবিকভাবে কথা বল।)৩৭৭
টিকাঃ
৩৭৪. আহমাদ ৬৬১৫, ত্বাবারানী ৩৩৮৮, হাকেম ২৭০, ১২০০, শুআবুল ঈমান বাইহাক্বী ৩০৯০, সহীহ তারগীব ৬১৭
৩৭৫. তিরমিযী ১৯৮৪, ২৫২৭
৩৭৬. মুসলিম ৫৭৭৩
৩৭৭. সূরা আহযাব: ৩২
📄 সংক্ষিপ্তন
চরিত্রবান মানুষ শান্তি পছন্দ করে, শান্তির পরিবেশ ভালোবাসে, অশান্ত সমাজে শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা করে।
সমাজে পাশাপাশি বসবাস করার সময় আপোসে দ্বন্দ-কলহ বেধে যেতেই পারে। সে ক্ষেত্রে শত্রুতা ও বিদ্বেষ পর্যায়ে পৌঁছনোর আগে আগে সন্ধিস্থাপনের মাধ্যমে মিলন সংসাধন করা কর্তব্য মুসলিমদের। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَالصُّلْحُ خَيْرٌ
অর্থাৎ, বস্তুতঃ আপোস করা অতি উত্তম।৩৭৮
তিনি অন্যত্র বলেছেন,
فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ
অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন কর। ৩৭৯
তিনি আরো বলেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ
অর্থাৎ, সকল মু'মিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই, সুতরাং তোমরা তোমাদের দুই ভাই-এর মধ্যে সন্ধি স্থাপন কর। ৩৮০
সন্ধিস্থাপনে কিছু লোকের অগ্রণী ভূমিকার প্রয়োজন থাকে। যারা সালিসী ও মধ্যস্থতা ক'রে দুই বিবদমান গোষ্ঠীর মাঝে মিলন সংসাধন করে। আর তাদের কাজ বিশাল মহৎ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
لا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِنْ نَجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ
অর্থাৎ, তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোন কল্যাণ নেই, তবে যে (তার পরামর্শে) দান খয়রাত, সৎকাজ ও মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের নির্দেশ দেয় (তাতে) কল্যাণ আছে। ৩৮১
মানুষের মাঝে মনোমালিন্য দূরীভূত হোক, তারা আপোসে মিলেমিশে বসবাস করুক, পরস্পরের হৃদয়-মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষ বিলীন হয়ে যাক, গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে বিবাদ-বিসংবাদ মুছে যাক, এমন সৎ প্রচেষ্টা যাদের, তারা কি সওয়াবপ্রাপ্ত না হয়?
মহানবী বলেছেন,
كُلُّ سُلامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ ، كُلَّ يَومٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ : تَعْدِلُ بَينَ الاثنينِ صَدَقَةٌ ، وتُعِينُ الرَّجُلَ فِي دَابَّتِهِ ، فَتَحْمِلُهُ عَلَيْهَا أَوْ تَرفَعُ لَهُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ ، وَالكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ ، وبكلِّ خَطْوَةٍ تَمشِيهَا إِلَى الصَّلاةِ صَدَقَةٌ ، وتميط الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
"প্রতিদিন যাতে সূর্য উদয় হয় (অর্থাৎ প্রত্যেক দিন) মানুষের প্রত্যেক গ্রন্থির পক্ষ থেকে প্রদেয় একটি করে সাদকাহ রয়েছে। (আর সাদকাহ শুধু মাল খরচ করাকেই বলে না; বরং) দু'জন মানুষের মধ্যে তোমার মীমাংসা ক'রে দেওয়াটাও সাদকাহ, কোন মানুষকে নিজ সওয়ারীর উপর বসানো অথবা তার উপর তার সামান উঠিয়ে নিয়ে সাহায্য করাও সাদকাহ, ভাল কথা বলা সাদকাহ, স্বলাতের জন্য কৃত প্রত্যেক পদক্ষেপ সাদকাহ এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস দূরীভূত করাও সাদকাহ।"৩৮২
সন্ধিস্থাপন ও বিবদমান দুই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাঝে মিলন সৃষ্টি করা এমন একটি মহান চরিত্রের কাজ, যার জন্য মিথ্যা বলাকেও বৈধ করা হয়েছে। বৃহত্তর কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে শরীয়ত মিথ্যা বা অবাস্তব কথা বলার অনুমতি দিয়েছে, যাতে দুই পক্ষের মাঝে প্রীতি সৃষ্টি হয়, উভয়ের হৃদয় থেকে বিভেদ দূর হয়ে যায়, দূর হতে থাকা বিপরীতগামী দুই মন যেন একে অন্যের নিকট হতে থাকে। সেটা আসলে মিথ্যা নয়, যে বলে, সে মিথ্যাবাদী নয়। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ وَيَقُولُ خَيْرًا وَيَنْمِي خَيْرًا
"লোকের মধ্যে সন্ধি স্থাপনকারী মিথ্যাবাদী নয়। সে হয় ভাল কথা পৌঁছায়, না হয় ভাল কথা বলে।"৩৮৩
ঠিক এরই বিপরীত কিছু অসৎ প্রকৃতির লোক আছে, যারা সম্প্রীতিশীল মানুষের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতে চায় এবং দুই গোষ্ঠীর মাঝে ঝগড়া বাধাতে চায়। তাদের ব্যাপারে মহানবী বলেছেন,
إِنَّ خِيَارَ أُمَّتِي الَّذِينَ إِذَا رُءُوا ذُكِرَ اللهُ ، وَإِنَّ شِرَارَ أُمَّتِي الْمَشَّاءُونَ بِالنَّمِيمَةِ الْمُفَرِّقُونَ بَيْنَ الأَحِبَّةِ الْبَاغُونَ الْبُرَاءَ الْعَنَتَ
"আমার উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি তারা, যাদেরকে দেখলে আল্লাহ স্মরণ হয়। আর আমার উম্মতের সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তি হল তারা, যারা চুগলখোরি ক'রে বেড়ায়, বন্ধুদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা ঘটায় এবং নির্দোষ লোকেদের মাঝে দোষ (বা কষ্ট) খুঁজে বেড়ায়।"৩৮৪
টিকাঃ
৩৭৮. ঐ ১২৮
৩৭৯. সূরা আনফাল ১
৩৮০. সূরা হুজুরাত ১০
৩৮১. সুরা নিসা ১১৪
৩৮২. বুখারী ২৯৮৯, মুসলিম ২৩৮২
৩৮৩. বুখারী ২৬৯২, মুসলিম ৬৭৯৯
৩৮৪. আহমাদ, বাইহাক্বী, সিঃ সহীহাহ ২৮৪৯
📄 ন্যায়পরায়ণতা
মহান আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ বাদশা, তিনি ন্যায়পরায়ণকে ভালোবাসেন। সুতরাং ন্যায়পরায়ণ হল একজন সুচরিত্রবান মানুষ। এমনই সচ্চরিত্রতার আদেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
"নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালংঘন করা হতে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন; যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।"৩৮৫
রাগ ও শান্তির সময় উচিত ও ন্যায্য কথা বলা আবশ্যক। বিরোধী হলেও তার সাথে সচ্চরিত্রতা তথা ইনসাফ বজায় রাখা কর্তব্য। আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও তার সাথে ইনসাফ বজায় রাখা সচ্চরিত্রতার লক্ষণ।
আপনার ভাষাভাষী নয় বলে, আপনি তার সাথে ন্যায় ব্যবহার করেন না, তাহলে আপনি সুচরিত্রবান হতে পারেন না।
আপনার স্বদেশী নয় বলে আপনি তার সাথে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখবেন না, তাকে স্বদেশী সমান মর্যাদা দেবেন না, ভালো কাজে তার সহযোগিতা করবেন না, তার বিপদে সাহায্য করবেন না, তাহলে আপনি সচ্চরিত্রের অধিকারী হতে পারবেন না।
আপনার স্বজাতি নয় বলে আপনি তার ন্যায্য অধিকার দেবেন না, তাহলে আপনি সুন্দর চরিত্রের মালিক হতে পারবেন না।
আপনার গায়ের রঙের সাথে মিলে না, তার সাথে আপনি ইনসাফপূর্ণ আচরণ করবেন না, তাহলে আপনি বর্ণ-বৈষম্যের শিকার, আপনি চরিত্রবান নন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاء بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে (হকের উপর) দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত (এবং) ন্যায়পরায়ণতার সাথে সাক্ষ্যদাতা হও। কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনও সুবিচার না করাতে প্ররোচিত না করে। সুবিচার কর, এটা আত্মসংযমের নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন। ৩৮৬
গঠনমূলক সমালোচনার ক্ষেত্রেও চরিত্রবান সচ্চরিত্রতা বজায় রাখে। সেখানেও সে ন্যায়পরায়ণতার ভারসাম্য রক্ষা ক'রে কথা বলে। কোন ব্যক্তি, জামাআত, মযহাব, দল, বই ইত্যাদির সমালোচনা করার ক্ষেত্রে অন্যায়ভাবে মুখ খোলা চরিত্রবানের উচিত নয়।
নিজের স্বার্থে ঘা লাগলে অসৎ লোকেরা ইনসাফের নিক্তি ঠিক রাখতে পারে না। আপনজনের পাতে ঝোল টানার ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতার নীতি ধ্বংস ক'রে বসে।
দেওয়া-নেওয়ার সময়, কথা বলার সময় বা মন্তব্য করার সময় আপন খেয়াল-খুশীর অনুবর্তী না হয়ে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখে প্রত্যেক মুসলিম। যেহেতু তা মহান আল্লাহর নির্দেশ,
وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى وَبِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا ذَلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
"যখন তোমরা কথা বলবে, তখন স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায় কথা বল এবং আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ কর। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।"৩৮৭
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاء لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالأَقْرَبِينَ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَفَقِيرًا فَالله أَوْلَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَن تَعْدِلُوا وَإِن تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ন্যায় বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাক, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দাও; যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। সে বিত্তবান হোক অথবা বিত্তহীনই হোক, আল্লাহ উভয়েরই যোগ্যতর অভিভাবক। সুতরাং তোমরা ন্যায়-বিচার করতে খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয়ো না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল অথবা পাশ কেটে চল, তাহলে (জেনে রাখ) যে, তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন। "৩৮৮
অতএব কেউ আপনার কোন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে বলে আপনি তার প্রতি সদ্ব্যবহার বা ন্যায়াচরণ করবেন না, তা উচিত নয়।
আপনার পণ্য নেয় না বলে, আপনার গাড়ি ভাড়া নেয় না বলে আপনি কারো প্রতি ইনসাফ করবেন না, তা সচ্চরিত্রতা নয়।
আপনার প্রশংসা করেনি বলে, যদিও আপনার নিন্দা করেনি, তবুও আপনি তাকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন, তা বৈধ নয়।
আপনাকে দাওয়াত দেয়নি বলে আপনি তাকে তার ন্যায়াধিকার প্রদান করবেন না, তা হয় না।
আপনার বা আপনার কোন আত্মীয়র বিরুদ্ধে বিচার করেছে বলে, যদিও সেটা ন্যায় বিচার ছিল, তবুও তার প্রতি অন্যায়াচরণ করবেন, তাহলে সচ্চরিত্রের মালিক হতে পারবেন না।
আপনার সুবিধা করেনি বলে, আপনার ভুল ধরেছে বলে, আপনাকে কোন মন্দ কাজে বাধা দিয়েছে বলে, আপনার কাছে ন্যায্য অধিকার দাবি করেছে বলে, আপনার কাছে শরীক হিসাবে সঠিক ভাগ চেয়েছে বলে, আপনার কাছে ঋণ পরিশোধ চেয়েছে বলে, সে খারাপ হয়ে গেল। এতদিন যে ‘ভালো’ ছিল, নিজের অধিকার চাওয়ার ফলে সে ‘কালো’ হয়ে গেল। এমন আচরণ চরিত্রবানের হতে পারে না।
কথা বললে, সঠিক কথা বলতে হবে, স্পষ্ট কথায় কষ্ট যেন না হয়, হক কথা বলতে যেন স্বার্থপরতার শিকার না হন। তবেই আপনি সৎ লোক, চরিত্রবান লোক। নচেৎ আপনার শ্লোগান যদি, ‘সুবিধাবাদ, জিন্দাবাদ’ হয় তাহলে- 'স্বার্থের বালাই তরে কহিতে উচিত কথা কুণ্ঠিত যারা তারা সৎলোক নহে, যেদিকে পেটের সেবা সেই দিকে বলে কথা যেমতো সুবিধা দেখে সেই মতো কহে।'
অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا
"হে বিশ্বাসিগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল।"৩৮৯
আর মহানবী বলেছেন,
صِلْ مَنْ qَطَعَكَ وَأَحْسِنُ إِلَى مَنْ أَسَاءَ إِلَيْكَ وَقُلِ الْحَقَّ وَلَوْ عَلَى نَفْسِكَ
"তুমি তার সাথে সুসম্পর্ক জুড়ে চল যে তোমার সাথে তা নষ্ট করতে চায়, তার প্রতি সদ্ব্যবহার কর যে তোমার সাথে দুর্ব্যবহার করে এবং হক কথা বল; যদিও তা নিজের বিরুদ্ধে হয়।"৩৯০
টিকাঃ
৩৮৫. সূরা নাহল: ৯০
৩৮৬. সূরা মায়িদাহ: ৮
৩৮৭. সূরা আনআম: ১৫২
৩৮৮. সূরা নিসা: ১৩৫
৩৮৯. সূরা আহযাব: ৭০
৩৯০. ইবনে নাজ্জার, সহীহুল জামে ৩৭৬৯