📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 সাহসিকতা ও বীরত্ব

📄 সাহসিকতা ও বীরত্ব


যুদ্ধের ময়দানে ধৈর্যের সাথে অবস্থান করে নির্ভয়ে শত্রুর মোকাবেলা করা হল বীরত্ব। ভীতি ও ত্রাস থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা হল সাহসিকতা।
বীর পুরুষ হল সেই মানুষ, যে যুদ্ধে ভয় পায় না। যে আত্মরক্ষা করতে শত্রুপক্ষের সকল প্রয়াসকে ব্যর্থ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। যে বাঁচার জন্য মৃত্যুকে ভয় পায় না।
'মৃত্যুকে যে এড়িয়ে চলে, মৃত্যু তারেই টানে। যারা মৃত্যুকে বুক পেতে লয়, বাঁচতে তারাই জানে।'
প্রয়োজনে যে মরতে প্রস্তুত হয়, জীবনে বেঁচে থাকার অধিকার তারই আছে। আবু বাক্ সিদ্দীক (রাঃ) খালেদ বিন অলীদ (রাঃ) কে জিহাদে প্রেরণ করার সময় অসিয়ত ক'রে বলেছিলেন, 'মরার চেষ্টা করো, তোমাকে জীবন দান করা হবে।'
সংগ্রাম করে বাঁচাই সত্যিকারের বাঁচা।
মানুষ তখনই বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যখন সে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে, অধিকার অর্জন করে নিতে হয়। আর তখনই প্রয়োজন পড়ে সাহসিকতা ও বীরত্বের।
'যারা শুধু মরে কিন্তু নাহি দেয় প্রাণ, কেহ কভু তাহাদের করেনি সম্মান।'
ভয়ের অনুভূতি না থাকার নাম বীরত্ব নয়। বরং বীরত্ব হল ভয় অনুভূত হওয়ার পরও নির্ভয় থাকার নাম। যাঁরা এ জগতে বীর বলে প্রসিদ্ধ হয়েছেন, তাঁরাও এ কথার দাবী করতে পারেন না যে, তাঁদেরকে মোটেই ভয় লাগে না। সুতরাং বীর পুরুষ ভয়কে ভয় করে, কিন্তু সে ভয়কে জয় করে। তাই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা মহা অপরাধ।
'পলায়ন, সে যে ঘৃণ্য ভীরুতা অগ্রসরেই মান, পালাবে কোথায় তকদীর হতে নাহিক পরিত্রাণ।'
সাহস ও বীরত্ব থাকলে দ্বীন বাঁচানো যায়, জান বাঁচানো যায়, মর্যাদা বাঁচানো যায়, মাল বাঁচানো যায়, পরিবার বাঁচানো যায়, দেশ বাঁচানো যায়। আর তার ফলে প্রাণ গেলে 'শহীদ'-এর মর্যাদা লাভ হয়। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَنْ قُتِلَ دُونَ مَالِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ وَمَنْ قُتِلَ دُونَ أَهْلِهِ أَوْ دُونَ دَمِهِ أَوْ دُونَ دِينِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ
"যে ব্যক্তি নিজের মাল রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ, যে নিজের পরিবার রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ, যে তার নিজের প্রাণ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সেও শহীদ এবং যে নিজের দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ।"৩৬১
স্ত্রীর ব্যাপারে যে পুরুষ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে পারে না, মেয়েরা তেমন পুরুষকে পছন্দ করে না। নিস্তেজ ভীরু কাপুরুষকে কোন জ্ঞানী নারী নিজ স্বামী রূপে পেতে চায় না।
একজন মু'মিন সৎ-সাহসী হয়। মহান প্রতিপালক ছাড়া সে কারো সামনে মাথা নত করে না। মহান আল্লাহ ছাড়া সে আর কোন কিছুকে ভয় করে না। মহান আল্লাহ সাহসী মু'মিনদের ব্যাপারে বলেছেন,
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللهِ مَنْ آمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُوْلَئِكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
"তারাই তো আল্লাহর মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণ করবে, যারা আল্লাহতে ও পরকালে বিশ্বাস করে এবং যথাযথভাবে স্বলাত পড়ে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকেও ভয় করে না, ওদেরই সম্বন্ধে আশা যে, ওরা সৎপথ প্রাপ্ত হবে। ৩৬২
الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللَّهَ وَكَفَى بِاللهِ حَسِيبًا
"ওরা আল্লাহর বাণী প্রচার করত; ওরা তাঁকে ভয় করত এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাকেও ভয় করত না। আর হিসাব গ্রহণে আল্লাহই যথেষ্ট।"৩৬৩
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ ذَلِكَ فَضْلُ الله يُؤْتِيهِ مَن يَشَاء وَاللَّهِ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ ধর্ম হতে ফিরে গেলে আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনয়ন করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন ও যারা তাঁকে ভালবাসবে, তারা হবে বিশ্বাসীদের প্রতি কোমল ও অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দায় ভয় করবে না, এ আল্লাহর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা তিনি দান করেন। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়। ৩৬৪
বহু ভীরু মানুষ আছে, যারা মুসলিমদেরকে কাফেরদের ভয় দেখায়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءهُ فَلا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
"ঐ (এক শ্রেণীর বক্তা) তো শয়তান; যে (তোমাদেরকে) তার (কাফের) বন্ধুদের ভয় দেখায়; সুতরাং যদি তোমরা বিশ্বাসী হও, তাহলে তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকেই ভয় কর।"৩৬৫
হক বলার সৎ সাহস থাকা চাই সচ্চরিত্রবান মানুষের মাঝে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার হিম্মত থাকা চাই একজন আদর্শ মানুষের মাঝে। মহানবী বলেছেন,
أَفْضَلُ الْجِهَادِ كَلِمَةُ عَدْلٍ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ
"অত্যাচারী বাদশাহর নিকট হক কথা বলা সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ।"৩৬৬
লক্ষণীয় যে, 'বাদশাহর নিকট হক কথা বলা সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ'। অর্থাৎ বাদশাহ বা শাসকের পশ্চাতে হক কথা বলা বীরত্ব নয়। ঘরে বসে রাজার মাকে গালি দেওয়া সাহসিকতা নয়, ভীরুতা। ক্ষমতাসীন শাসকের সামনে না বলে তার ক্ষমতাধীন জনগণের সামনে হক কথা বলে উত্তেজনা ও বিদ্রোহ সৃষ্টি করা 'সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ' নয়। 'শোষণ-শ্রেণীর মুখের উপর সত্য ও ন্যায়ের কথা বলাটাই প্রকৃত বিপ্লব।'
নিরাপত্তার সময় হক কথা বলতে পারাই বীরত্ব নয়, বীরত্ব হল অনিরাপত্তার সময় হক কথা বলা।
ইমাম শাফেয়ী বলেন, 'সবচেয়ে কঠিন কাজ হল ৩টি; অভাবের সময় দান করা, নির্জনে পরহেযগার হওয়া এবং যার নিকট কোন ভয় বা আশা থাকে, তার নিকট হক কথা বলা।'
গীবত করা সাহসিকতা নয়, বরং কাপুরুষতার পরিচয়। ভক্তদের মাঝে প্রতিপক্ষকে গালাগালি করা, অনুগামীদের মাঝে নিরাপদে বসবাস ক'রে অথবা জলসা ক'রে তাদেরকে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া, ফেসবুক বা অন্য কোন নেট-মাধ্যমে ঘরে বসে বিরোধীকে হুমকি দেওয়া, নিজের দেশে বসে অপর দেশ বা তার কোন ব্যক্তিকে কটাক্ষ করা কাপুরুষদের কাজ।
পরিশেষে জেনে রাখা ভালো যে, হক হলেই যে তা সব জায়গায় বলা যাবে বা বলতে হবে, তা নয়। হক কথা বলার স্থান ও কৌশল জেনে বলতে হবে। নচেৎ হিতে বিপরীত হলে লাভের জায়গায় ক্ষতি হতে পারে।
কেবল শত্রু দমনে নয়, বীরত্বের এ গুণটি রাগ ও ক্রোধ দমনেও বড় সহায়ক। যেহেতু আসল বীর হল সেই, যে নিজ ক্রোধ দমনে বীরত্ব প্রদর্শন করে। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ
"শক্তিশালী (বা বীর) সে নয় যে কুন্তীতে জয়লাভ করে। বরং প্রকৃত শক্তিশালী (বা বীর) হল সেই ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় নিজেকে সামলে নিতে পারে।"৩৬৭

টিকাঃ
৩৬১. আবু দাউদ ৪৭৭৪, তিরমিযী ১৪২১, নাসাঈ ৪০৯৫
৩৬২. সূরা তাওবাহ: ১৮
৩৬৩. সূরা আহযাব: ৩৯
৩৬৪. সূরা মায়িদাহ: ৫৪
৩৬৫. সূরা আলে ইমরান-৩: ১৭৫
৩৬৬. আবু দাউদ ৪৩৪৬, তিরমিযী ২১৭৪, ইবনে মাজাহ ৪০১১
৩৬৭. আহমাদ, বুখারী ৬১১৪, মুসলিম ৬৮০৯, মিশকাত ৫১০৫

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 সত্যবাদিতা

📄 সত্যবাদিতা


সত্যবাদিতা সুচরিত্রবান মানুষের অন্যতম সদ্গুণ। অবশ্যই এ গুণ একজন মু'মিনের। মহান আল্লাহ সত্যবাদীদের সঙ্গী হতে আদেশ দিয়ে বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও। ৩৬৮
পক্ষান্তরে মিথ্যাবাদিতা চরিত্রহীনদের বদ গুণ। এ গুণ মুনাফিকের। মহানবী বলেছেন,
آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثُ إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ
"মুনাফিকের লক্ষণ হল তিনটি; কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা দিলে খেলাপ করে এবং চুক্তি করলে ভঙ্গ করে।"৩৬৯
মুসলিমের এক বর্ণনায় এ কথা বেশী আছে, "যদিও সে ব্যক্তি স্বলাত পড়ে সিয়াম রাখে এবং নিজেকে মুসলিম মনে করে।"৩৭০
সত্যবাদিতা ও মিথ্যাবাদিতা উভয়ের পরিণাম বর্ণনা ক'রে রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى البِرِّ ، وَإِنَّ البِرَّ يَهْدِي إِلَى الجَنَّةِ ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَصْدُقُ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ صِدِّيقاً وَإِنَّ الكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الفُجُورِ، وَإِنَّ الفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَكْذِبُ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّاباً
"নিশ্চয় সত্যবাদিতা পুণ্যের পথ দেখায়। আর পুণ্য জান্নাতের দিকে পথ নির্দেশনা করে। আর মানুষ সত্য কথা বলতে থাকে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নিকট তাকে 'মহাসত্যবাদী' রূপে লিপিবদ্ধ করা হয়। আর নিঃসন্দেহে মিথ্যাবাদিতা নির্লজ্জতা ও পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়। আর পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। আর মানুষ মিথ্যা বলতে থাকে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নিকট তাকে 'মহামিথ্যাবাদী' রূপে লিপিবদ্ধ করা হয়। ৩৭১
সত্যবাদী সর্বদা উদ্বেগশূন্য থাকে, তার মনের ভিতরে প্রশান্তি থাকে। পক্ষান্তরে মিথ্যাবাদী এর বিপরীত; তার হৃদয়ে সংশয়, দ্বিধা ও উদ্বেগ থাকে।
মহানবী বলেছেন,
دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ ؛ فَإِنَّ الصِّدقَ طُمَأْنِينَةٌ ، وَالكَذِبَ رِيبَةٌ
"তুমি ঐ জিনিস পরিত্যাগ কর, যে জিনিস তোমাকে সন্দেহে ফেলে এবং তা গ্রহণ কর যাতে তোমার সন্দেহ নেই। কেননা, সত্য প্রশান্তির কারণ এবং মিথ্যা সন্দেহের কারণ।"৩৭২
চরিত্রবান সৎলোক সদা সত্য কথা বলে। যেহেতু সত্য কথায় বরকত আছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে সত্য বলে, কারণ তার লাভে বরকত আছে। পক্ষান্তরে যে মিথ্যা বলে, তার বরকত বিনাশপ্রাপ্ত হয়। মহানবী বলেছেন,
البَيِّعَانِ بِالخِيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا ، فَإِنْ صَدَقا وَبَيَّنَا بُورِكَ لَهُمَا فِي بيعِهِمَا ، وإِنْ كَتَمَا وَكَذَبَا مُحِقَّتْ بَرَكَةُ بَيعِهِما
"ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত (চুক্তি পাকা বা বাতিল করার) স্বাধীনতা রয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা পৃথক (স্থানান্তরিত) না হবে। আর যদি তারা সত্য কথা বলে এবং (পণ্যদ্রব্যের প্রকৃতত্ব) খুলে বলে, (দোষ- ত্রুটি গোপন না রাখে,) তাহলে তাদের কেনা-বেচার মধ্যে বরকত দেওয়া হয়। আর তারা যদি (দোষ-ত্রুটি) গোপন রাখে এবং মিথ্যা বলে, তাহলে তাদের দু'জনের কেনা-বেচার বরকত রহিত করা হয়।"৩৭৩
বলা বাহুল্য, সত্যবাদিতায় মানসিক শান্তি, আত্মিক আরাম লাভ হয়, উপার্জনে বরকত হয়, মঙ্গলে আতিশয্য আসে, বিপদ থেকে মুক্তি লাভ হয়।
সুচরিত্রবান সত্যবাদীদের হৃদয় পরিষ্কার, যেহেতু তারা সত্য কথা বলে। শিশুদের মন সাদা, তাই তাদের মুখে সত্য ও বাস্তব প্রকাশ পেয়ে যায়।
সত্যবাদী চরিত্রবান অল্প কথা বলে। পক্ষান্তরে যে বেশী কথা বলে, সাধারণতঃ সে বেশী মিথ্যা বলে। যেমন যে নিজের গল্প ও বড়াই বেশী করে, সেও বেশী মিথ্যা বলে। আর এইভাবে মিথ্যা বলা মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত হয়ে যায়। তখন তার কথা লোকে বিশ্বাস করে না। 'সত্য কথা মিথ্যা কার? মিথ্যা বলা অভ্যাস যার।'
শুধু লোকেরাই তার কথায় বিশ্বাস করে না তাই নয়, বরং খোদ মিথ্যুকও কারো কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে না।

টিকাঃ
৩৬৮. সূরা তাওবাহ ১১৯
৩৬৯. বুখারী ৩৩, মুসলিম ২২০
৩৭০. ২২২
৩৭১. বুখারী ৬০৯৪, মুসলিম ২৬০৭, আবু দাউদ, তিরমিযী
৩৭২. তিরমিযী ২৫১৮
৩৭৩. বুখারী ২০৭৯, মুসলিম ৩৯৩৭

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 কথায় সচ্চরিত্রতা

📄 কথায় সচ্চরিত্রতা


সুচরিত্রবান নর-নারী নিজের কাজে যেমন সুন্দর আচরণ প্রদর্শন করে, তেমনি নিজ কথাতেও সভ্য আচরণ প্রকাশ ক'রে থাকে।
সুতরাং একজন চরিত্রবান কাউকে গালাগালি করে না। কারণ মুসলিমকে গালাগালি করা ফাসেকী। গালি দেয় না কোন মৃতকে, গালি দেয় না কোন কাফেরকে, গালি দেয় না পশুকে, গালি দেয় না ঝড়-বাতাস, মেঘ-বাদল বা প্রাকৃতিক কোন অবস্থাকে, গালি দেয় না যুগ-যামানাকে। কারণ এমন গালি দেওয়াতে মহান আল্লাহকে গালি দেওয়া হয়।
সে কোন রোগ-বালা বা জ্বরকে গালি দেয় না। কারণ তা তার জন্য উপকারী। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় বলে গালি দেয় না মোরগকে।
সে পরের পিতা-মাতাকে গালি দেয় না। কারণ তাতে পরোক্ষভাবে নিজের পিতামাতাকে গালি দেওয়া হয়।
তেমনি সে পরের বাপকে বাপ বলে দাবি করে না, কারণ তাতে নিজের মাকে ভ্রষ্টা বানানো হয়।
কোন আক্ষেপে নিজ পরিবার, সন্তান-সন্ততি বা কোন আত্মীয়কে কোন প্রকার অভিশাপ বা বদ্দুআ দেয় না, যেমন নিজ গৃহপালিত কোন পশুকেও অভিশাপ দেয় না। কারণ তাতে তার নিজেরই ক্ষতি হয়।
চরিত্রবান মুসলিম নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিকে অভিসম্পাত করে না, নির্দিষ্ট কোন জীবিত ব্যক্তিকে জাহান্নামী বলে না, যেমন সে কোন নির্দিষ্ট মুসলিমকে 'কাফের' বলে না।
সে কোন মানুষকে 'পশু' বলে গালি দেয় না, কারণ তা স্পষ্ট মিথ্যা কথা।
সে কোন সম্মানীর মানহানি করে না, কোন সম্ভ্রান্তের সম্ভ্রম লুটে না। কারণ তা সবচেয়ে বড় সূদের পাপ।
চরিত্রবান-চরিত্রবতী মিথ্যা কথা বলে না। মিথ্যা কসম খায় না। মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না। মিথ্যা অঙ্গীকার করে না। মিথ্যা স্বপ্ন গড়ে বলে না। কারো চরিত্রে মিথ্যা অপবাদ দেয় না। কারো প্রতি মিথ্যা দোষারোপ করে না। কারণ এগুলি এক-একটি মহাপাপ।
সে কারো রহস্য প্রকাশ করে না, কারো কাছে নিজ পাপ রহস্য প্রকাশ করে না, স্বামী-স্ত্রীর মিলন রহস্য প্রকাশ ক'রে তৃপ্তি নেয় না।
চরিত্রবতী মেয়ে পরস্ত্রীর সৌন্দর্য নিজ স্বামীর নিকট প্রকাশ করে না। পর-পুরুষের সাথে মোহনীয় কণ্ঠে কথোপকথন করে না এবং কথার আকর্ষণ-জালে পর-পুরুষকে আবদ্ধ করে না।
চরিত্রবান ও চরিত্রবতী কারো চুগলী করে না, কারো গীবত বা পরচর্চা করে না। দু' মুখে কথা বলে না। কারো কান ভাঙ্গায় না, কোন সন্তানকে তার পিতামাতার বিরুদ্ধে অথবা কোন পিতামাতাকে তার বউ-বেটার বিরুদ্ধে, কোন স্বামীকে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অথবা কোন স্ত্রীকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে, কোন দাসকে তার প্রভুর বিরুদ্ধে অথবা কোন মালিককে তার চাকরের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে না।
চরিত্রবান-চরিত্রবতী কোন মানুষকে নিয়ে, তার দ্বীনদারী নিয়ে, দৈহিক গঠন, আকৃতি-প্রকৃতি বা চারিত্রিক গুণ নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে না। অযথা কাউকে তার দোষ ধরে লজ্জা দেয় না। কথায় কথায় ভুল ধরে মানুষকে নাজেহাল করে না। সুচরিত্রের অধিকারী কাউকে মন্দ খেতাব দিয়ে ডাকে না অথবা তার নামের বিকৃতি ঘটায় না।
কেউ কথা বললে নিজে টপকে পড়ে তার কথা কাটে না। বড়দের মুখের উপর মুখ দেয় না।
চরিত্রবান-চরিত্রবতী প্রগল্ভ হয় না, ঢেটা বা ঢেটী হয় না। কথায় কথায় 'হোঃ-হোঃ, হাঃ-হাঃ, হিঃ-হিঃ' হাস্য-কৌতুক, মজাক-মস্করা ও ঠাট্টা-উপহাস করে না এবং সে সব করতে গিয়ে মিথ্যাও বলে না। সাধারণতঃ সচ্চরিত্র লোকেরা গম্ভীর হয়।
চরিত্রবান নর-নারীর মিথ্যা ঠাট-বাট থাকে না। যা আছে, তার থেকে বেশি কিছু প্রকাশ করে না, তা নিয়ে দম্ভ করে না। যেমন বড়লোকি প্রদর্শন করে না, তেমনি দারিদ্রেরও ভান করে না।
কোন বিষয়ে হকের সপক্ষে থেকেও বিতর্কে জড়ায় না। তর্ক করা সুচরিত্রবান লোকের নিদর্শন নয়। না চাইতেও কোন বিতর্কে জড়িয়ে গেলে সে সময় সে অশ্লীল বলে না। কারণ এটা মুনাফিকের লক্ষণ।
সুচরিত্রবান নেতৃত্ব প্রার্থনা করে না। কারণ তা এমন জিনিস, যাতে চরিত্রে দাগ লাগতে পারে এবং তা এক প্রকার আমানত। আর তাতে খিয়ানত হলে কিয়ামতের দিন তা অপমান ও অনুতাপের কারণ হবে।
কেউ পরামর্শ চাইলে চরিত্রবান নারী-পুরুষ পরামর্শদানে অহিতৈষা প্রদর্শন করে না। কারণ সেটাও এক প্রকার আমানত।
ইসলামই হল সবচেয়ে উচ্চ বংশের পরিচয়। সুতরাং চরিত্রবান নারী-পুরুষ উচ্চ বংশীয় হলে অপরের বংশে খোঁটা দেয় না এবং নিজেদের বংশ নিয়ে গর্ব করে না। কারণ এ হল অজ্ঞ যুগের অজ্ঞ মানুষদের আচরণ।
চরিত্রবান মুসলিম পুরুষ-মহিলা অশ্লীলতা থেকে যেমন শতক্রোশ দূরে থাকে, তেমনি মুখে নোংরা কথা বলা থেকেও সতত বিরত থাকে। অশ্লীলভাষী সুচরিত্রের অধিকারী হতে পারে না।
চরিত্রবান যুবক-যুবতী যেমন (ভালোবাসার নামে) ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয় না, তেমনি সর্বদা তারা জিহ্বার ব্যভিচার থেকেও সুদূরে থাকে। যেমন কান, চোখ, হাত ও পায়ের ব্যভিচার থেকেও অনেক তফাতে থাকে।
চরিত্রবান নারী-পুরুষ কর্কশভাষী হয় না, বরং মিষ্টভাষী হয়। তবে বেশি মিষ্টি দিয়ে নারী পুরুষকে আকর্ষণ করে না।
পরকীয় কথায় থাকা সচ্চরিত্র মানুষের কর্ম নয়। নিজের বিষয়ীভূত নয়, এমন কথা বলে নিজেকে বিতর্কে ফেলে না। অবশ্য মু'মিন নারী-পুরুষ একে অন্যের অভিভাবক। তারা পরস্পরকে সৎকর্মে আদেশ ও অসৎকর্মে বাধাদান ক'রে থাকে।
কোন গুজব রটানো চরিত্রবানের কাজ নয়। কোন রটিত গুজবে থাকাও তার জন্য শোভনীয় নয়।
সন্দিগ্ধ কথা বর্ণনা করা চরিত্রবানের উচিত নয়। কারণ তাতে সে মিথ্যুক প্রমাণিত হয়ে লাঞ্ছিত হতে পারে।
সুচরিত্রের অধিকারী কারো প্রতি কোন উপকার বা অনুগ্রহ ক'রে তা অন্যের কাছে প্রকাশ করে না। কারণ তাতে তার সওয়াব বাতিল হয়ে যায়। অবশ্য কোন অকৃতজ্ঞ নেমকহারামের কথা প্রয়োজনে উল্লেখ করার কথা আলাদা।
চরিত্রবান নারী-পুরুষ কথা বলে আদবের সাথে। তাদের কথায় গর্ব ও অহংকার প্রকাশ পায় না, কথায় কথায় তারা দম্ভ প্রকাশ করে না, আত্মপ্রশংসা করে না, ভঙ্গিপূর্ণ কথা বলে না। 'কাজে কুঁড়ে খেতে দেড়ে, বচনে মারে তেড়ে ফুঁড়ে।' অথবা 'বাক্যেতে পর্বত, কিন্তু কার্যে তুলাকার।' সুচরিত্রের মুকুটধারী এমন হতে পারে না।
চরিত্রবান নারী-পুরুষ রাগান্বিত হলে, তা সংবরণ করে। ক্রোধের সময় কথা বলা বন্ধ রেখে নিজেকে নিরাপদ করে। যেমন অন্যের ক্রোধের সময়েও কথা বলে তার ক্রোধবৃদ্ধি করে না।
সুন্দর চরিত্রের অধিকারী নারী-পুরুষ উপদেশ দেয় ও নেয়। অন্যের উপদেশ গ্রহণে কোন প্রকার ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে না।
সচ্চরিত্র মানুষ কারো জন্য অন্যায় সুপারিশ করে না, কাউকে অন্যায়ের পথ বলে না।
চরিত্রবান পুরুষ মসজিদে গিয়ে স্বলাত আদায় করে, সেখানে আল্লাহর যিক্র করে এবং সাংসারিক গল্প-গুজব করে না।
সুচরিত্রের অধিকারী নারী-পুরুষ কোন অবৈধ কাজে অনুমতিদান করে না।
কথায় কথায় কসম খায় না। কারণ তাতে সন্দেহ বাড়ে এবং আল্লাহর নামের তাযীম হাস পায়।
চরিত্রবান নারী-পুরুষ কম কথা বলে, প্রয়োজনে বলে এবং অসঙ্গত কথা আদৌ বলে না। আর কথা বললে অকপটে বলে, মনে কূট রাখে না।

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 সুন্দর কথা বলা

📄 সুন্দর কথা বলা


যার চরিত্র সুন্দর, তার কথা কেন সুন্দর হবে না? অবশ্যই। চরিত্রবানের কথায় খোঁটা থাকবে না, খোঁচা থাকবে না, অহংকার থাকবে না, উদ্ভট ভঙ্গি থাকবে না। তার ভাষা কর্কশ হবে না, অশ্লীল হবে না, অসভ্য হবে না।
আব্দুল্লাহ বিন আম্র হতে বর্ণিত, একদা নবী বললেন,
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ غُرْفَةً يُرَى ظَاهِرُهَا مِنْ بَاطِنِهَا وَبَاطِنُهَا مِنْ ظَاهِرِهَا
"জান্নাতের মধ্যে এমন একটি কক্ষ আছে, যার বাহিরের অংশ ভিতর থেকে এবং ভিতরের অংশ বাহির থেকে দেখা যাবে।"
তা শুনে আবু মালেক আশআরী বললেন, 'সে কক্ষ কার জন্য হবে, হে আল্লাহর রসূল?' তিনি বললেন,
لِمَنْ أَلَانَ الْكَلَامَ وَأَطْعَمَ الطَّعَامَ وَبَاتَ لِلَّهِ قَائِمًا وَالنَّاسُ نِيَامٌ
"যে ব্যক্তি নরম কথা বলে, অন্নদান করে ও লোকেরা যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন স্বলাতে রত হয়; তার জন্য। "৩৭৪
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
لِمَنْ أَطَابَ الْكَلَامَ وَأَطْعَمَ الطَّعَامَ وَأَدَامَ الصِّيَامَ وَصَلَّى لِلَّهِ بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ
"যে ব্যক্তি সুন্দর কথা বলে, অন্নদান করে, বরাবর সিয়াম রাখে ও লোকেরা যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন স্বলাতে রত হয়; তার জন্য। "৩৭৫
আবূ ত্বালহা যায়েদ ইবনে সাহল বলেন, একদা আমরা ঘরের বাইরে অবস্থিত প্রাঙ্গনে বসে কথাবার্তায় রত ছিলাম। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (সেখানে) এসে আমাদের নিকট দাঁড়িয়ে বললেন,
مَا لَكُمْ وَلِمَجَالِسِ الصُّعُدَاتِ ؟ اِجْتَنِبُوا مَجَالِسَ الصُّعُدَاتِ
"তোমরা রাস্তায় বৈঠক করছ? তোমরা রাস্তায় বসা থেকে বিরত থাক।"
আমরা নিবেদন করলাম, 'আমরা তো এখানে এমন উদ্দেশ্যে বসেছি, যাতে (শরীয়তের দৃষ্টিতে) কোন আপত্তি নেই। আমরা এখানে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করা ও কথাবার্তা বলার জন্য বসেছি।' তিনি বললেন,
إِمَّا لَا فَأَدُّوا حَقَّهَا : غَضُّ البَصَرِ ، وَرَدُّ السَّلَامِ، وَحُسْنُ الكَلامِ
"যদি রাস্তায় বসা ত্যাগ না কর, তাহলে তার হক আদায় কর। আর তা হল, দৃষ্টি সংযত রাখা, সালামের উত্তর দেওয়া এবং সুন্দরভাবে কথাবার্তা বলা।"৩৭৬
কথা সুন্দর বলতে পারলে সুন্দরীর সুন্দরতায় বৃদ্ধি লাভ হয়। তবে বেগানা পুরুষের সাথে কথা বলতে হলে সেই সৌন্দর্য চুরি যাওয়ার আশঙ্কায় তাকে মহান আল্লাহর নির্দেশ মনে রেখে বলতে হবে। তিনি মহিলাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,
إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا
"যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। (স্বাভাবিকভাবে কথা বল।)৩৭৭

টিকাঃ
৩৭৪. আহমাদ ৬৬১৫, ত্বাবারানী ৩৩৮৮, হাকেম ২৭০, ১২০০, শুআবুল ঈমান বাইহাক্বী ৩০৯০, সহীহ তারগীব ৬১৭
৩৭৫. তিরমিযী ১৯৮৪, ২৫২৭
৩৭৬. মুসলিম ৫৭৭৩
৩৭৭. সূরা আহযাব: ৩২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00