📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 হিকমত অবলম্বন

📄 হিকমত অবলম্বন


'হিকমত' শব্দের অর্থ কৌশল বা প্রজ্ঞা।
হিকমত হল ইলমের মাখন।
হিকমত অবলম্বন করা মানে: প্রত্যেক জিনিসকে তার যথোপযুক্ত স্থাপন করা।
হিকমত অবলম্বন করার অর্থ হল: প্রত্যেক কাজের সঠিকতার নাগাল পাওয়া।
হিকমত অবলম্বন করার মানে হল: কথা ও কাজে সঠিকতা ও আদব বজায় রাখা।
কেউ যদি নিজের সাত বছরের ছেলেকে স্বলাতের জন্য মারে, তাহলে সে 'হাকীম' (প্রজ্ঞাবান) নয়। কারণ স্বলাত না পড়লে তাকে দশ বছর বয়সে মারার হুকুম আছে। নিশ্চয় সে চাষী 'হাকীম' নয়, যে ফসল পাকার আগেই কেটে ফেলে। সে ডাক্তার 'হাকীম' নয়, যে রোগ নির্ণয় না করেই চিকিৎসা করে।
হিকমত মানে সুন্নাহ। হিকমত অবলম্বন করার মানে হল কথা ও কাজে সুন্নাহ অবলম্বন করা।
হিকমত অবলম্বন করার মানে হল: প্রত্যেক হকদারকে তার হক প্রদান করা। কোন বিষয়ে সীমা লংঘন না করা। প্রত্যেক মানুষকে তার যথা মর্যাদা প্রদান করা। সময় হওয়ার পূর্বে কোন জিনিস পেতে তাড়াহুড়া না করা। কোন কাজের ফললাভে শীঘ্রতা না করা। কোন কাজকে যথাসময় হতে পিছিয়ে না দেওয়া।
সত্যপক্ষে, যার হিকমত আছে, সে অনেক কল্যাণের অধিকারী। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَن يَشَاء وَمَن يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا
অর্থাৎ, তিনি যাকে ইচ্ছা প্রজ্ঞা দান করেন, আর যাকে প্রজ্ঞা প্রদান করা হয়, তাকে নিশ্চয় প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়। ৩৪০
চরিত্রবান নারী-পুরুষ চলার পথে হিকমত অবলম্বন করে। মহান আল্লাহ দাওয়াতের পথে হিকমত অবলম্বন করতে বলেছেন,
ادْعُ إِلى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلُهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
অর্থাৎ, তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা কর উত্তম পদ্ধতিতে। ৩৪১
তবে শির্ক দেখে চুপ থাকা হিকমত নয়। অন্যায় দেখে মুখে কুলুপ দেওয়া অথবা অন্যায়ের সাথে আপোস করা হিকমত নয়। হিকমতের সাথে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, তাতে সক্ষম না হলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করা আবশ্যক।
শিশু ওষুধ আদরের সাথে না খেলে মেরেও খাওয়াতে হবে। কিন্তু মেরে ফেললে তো হবে না। তবে হিংস্র প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে সাবধানে।
'ধর্ম কথা প্রেমের বাণী জানি মহান উচ্চ খুব, কিন্তু সাপের দাঁত না ভেঙ্গে মন্ত্র ঝাড়ে যে বেকুব। ব্যাঘ্র সাহেব হিংসা ছাড়, পড়বে এসে বেদান্ত, কয় যদি ছাগ লাফ দিয়ে বাঘ অমনি হবে কৃতান্ত। থাকতে বাঘের দন্ত নখ বিফল ভাই ঐ প্রেম-সবক।'
ময়লা যদি ধুলে না যায়, মেজে-ঘসে পরিষ্কার করতে হবে। তাতেও না হলে আঘাত দিয়ে তা তুলতে হবে। ময়লা লোহার জং হলে না হয় হাতুড়ির আঘাত মারবেন, কিন্তু কাঁচের উপর হলে তা করতে পারেন না।
নীতিবান ও চরিত্রবান অন্ধকারকে গালি দেয় না। যেহেতু হিকমত হল, বাতি জ্বালিয়ে দেওয়া। গালি ও লাঠি কোনদিন দলীল-প্রমাণের কাজ করতে পারে না।
দুশমন যদি দুশমনি দিয়ে আপনার সম্মুখীন হয়, তাহলে আপনি হিকমত দিয়ে তার মোকাবিলা করুন। জেনে রাখুন, আবেগ ও জোশ দিয়ে নয়, বরং বিচক্ষণতা ও হুঁশ দিয়ে পরিস্থিতির সামাল দিতে হবে।
গরম গরম খেতে গেলে মুখ পুড়ে যায়, একটু ঠাণ্ডা হলে খেতে হয়। আগুন দিয়ে আগুন নিভানো যায় না। তার জন্য প্রয়োজন পানির।
জ্ঞানী হল সেই ব্যক্তি, যে তার দুটো রোগের মধ্যে যেটা বেশী মারাত্মক সেটার চিকিৎসা আগে করায়। একটি লোকের সর্দি, পায়খানা হওয়ার পর যদি তাকে সাপে কাটে, তাহলে ডাক্তার সাপে কাটার চিকিৎসাই আগে করবেন। একটি লোক পানিতে ডোবা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য যদি আপনার দিকে হাত বাড়ায় এবং তার হাতে সোনার আংটি থাকে, তাহলে সোনার আংটি ব্যবহার হারাম ফতোয়া দিয়ে সময় নষ্ট না ক'রে তাকে আগে হাত ধরে টেনে তুলে উদ্ধার করুন।
জানালা দিয়ে হাওয়া ঢুকে উড়ে যাওয়া কাগজগুলি তোলার আগে জানালাটা বন্ধ করুন।
যে ব্যক্তি দুটি পাখিকে এক সঙ্গে শিকার করতে চায়, সে দুটিকেই হারিয়ে বসে।
সাবধানী লোক কখনো তার সমস্ত ডিমগুলিকে একটি ধামাতে রাখে না।
মাথা ধরলে মাথার ব্যথা কীভাবে সারবে, সে ব্যবস্থা করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। মাথাটাকে কেটে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
অগ্নিশিখা গগন-চুম্বি হলে অগ্নিদমনকর্মীরা শিখার উপরে পানি ছড়ায় না। বরং অগ্নির উৎসস্থলে পানি ছড়ায়।
সুচরিত্রবানেরা নীতিবান হয়। তারাই পারে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে। মানুষকে চরিত্রবান বানাতে সুমহান চরিত্রের অধিকারীর একটি হিকমত লক্ষ্য করুন।
আবু উমামা বলেন, একদা এক যুবক আল্লাহর রসূল এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমাকে ব্যভিচার করার অনুমতি দিন!'
এ কথা শুনে লোকেরা তাকে ধমক দিয়ে বলল, 'থামো, থামো! (এ কী বলছ তুমি?)'
কিন্তু মহানবী তাকে বললেন, "আমার কাছে এসো।" সে তাঁর কাছে এসে বসলে তিনি তাঁকে বললেন, "তুমি কি নিজ মায়ের জন্য তা পছন্দ কর?"
সে বলল, 'না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করুন।'
তিনি বললেন, "তাহলে লোকেরাও তো তাদের মায়েদের জন্য তা পছন্দ করে না।"
অতঃপর তিনি বললেন, "তাহলে তুমি কি তোমার মেয়ের জন্য তা পছন্দ কর?"
সে বলল, 'না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করুন।'
তিনি বললেন, "তাহলে লোকেরাও তো তাদের মেয়েদের জন্য তা পছন্দ করে না।"
অতঃপর তিনি বললেন, "তাহলে তুমি কি তোমার বোনের জন্য তা পছন্দ কর?"
সে বলল, 'না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করুন।'
তিনি বললেন, "তাহলে লোকেরাও তো তাদের বোনেদের জন্য তা পছন্দ করে না।"
অতঃপর তিনি বললেন, "তাহলে তুমি কি তোমার ফুফুর জন্য তা পছন্দ কর?"
সে বলল, 'না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করুন।'
তিনি বললেন, "তাহলে লোকেরাও তো তাদের ফুফুদের জন্য তা পছন্দ করে না।"
অতঃপর তিনি বললেন, "তাহলে তুমি কি তোমার খালার জন্য তা পছন্দ কর?"
সে বলল, 'না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করুন।'
তিনি বললেন, "তাহলে লোকেরাও তো তাদের খালাদের জন্য তা পছন্দ করে না।"
অতঃপর তিনি তার বুকে হাত রাখলেন এবং তার জন্য দুআ ক'রে বললেন, হে আল্লাহ! তুমি ওর গোনাহ মাফ করে দাও, ওর হৃদয়কে পবিত্র করে দাও এবং ওকে ব্যভিচার থেকে রক্ষা কর।
বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর সেই যুবক আর ব্যভিচারের দিকে ভ্রূক্ষেপও করেনি। ৩৪২

টিকাঃ
৩৪০. সূরা বাক্বারাহ-২: ২৬৯
৩৪১. সূরা নাহল: ১২৫
৩৪২. আহমাদ ২২২১১, তাবারানীর কাবীর ৭৬৭৯, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৫৪১৫, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৭০

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 উৎকৃষ্ট দ্বারা মন্দ প্রতিহত করা

📄 উৎকৃষ্ট দ্বারা মন্দ প্রতিহত করা


কেউ অত্যাচারিত হলে অত্যাচারের বদলা নেওয়া তার জন্য বৈধ। তবে সচ্চরিত্রতার দাবী হল ভিন্ন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَجَزَاء سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِّثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ
"মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। আর যে ক্ষমা ক'রে দেয় ও আপোস-নিষ্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট আছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।" ৩৪৩
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ وَلَئِن صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِّلصَّابِرِينَ
"যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তাহলে ঠিক ততখানি করবে যতখানি অন্যায় তোমাদের প্রতি করা হয়েছে। আর যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর, তাহলে অবশ্যই ধৈর্যশীলদের জন্য সেটাই উত্তম।" ৩৪৪
'শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ'---এ নীতি ইসলামের নয়। কোন চরিত্রবান নারী-পুরুষের এমন নীতি অবলম্বন করা উচিত নয়।
এক ব্যক্তি দূর সফরে গেলে তার বণিক বন্ধুর কাছে এক বাক্স স্বর্ণমোহর আমানত রেখে যায়। বণিক তার অনুপস্থিতিতে তা দেখে লোভ সংবরণ না করতে পেরে সেগুলি বের ক'রে নেয় এবং তার জায়গায় পিতলের মোহর রেখে দেয়।
বন্ধু এসে বাক্স ফেরৎ নিয়ে দেখল, তার আসল মোহর নেই। বণিককে বললেও সে অস্বীকার করল এবং বলল, 'তুমি যেভাবে যা রেখে গেছ, তাই আমি তোমাকে ফেরৎ দিয়েছি।'
বন্ধু দেখল, লাভ নেই। সুতরাং প্রতিশোধের উপায় খুঁজতে বন্ধুত্ব নষ্ট না ক'রে আরো বাড়িয়ে দিল।
এক সময় বণিক তার এক কিশোরী মেয়ে-সহ তার বাড়ি বেড়াতে এসে রেখে কোথাও গেল। কৌশলে সে মেয়েটির পোশাক ও অলংকার খুলে নিয়ে অন্য পোশাক পরিয়ে দিল। অতঃপর এক বানরীকে কিশোরীর পোশাক পরিয়ে রাখল।
বণিক মেয়েকে নিতে এলে সে বানরীর দড়ি হাতে ধরিয়ে দিল। অবাক হয়ে সে বলল, 'এ কী? আমার মেয়ে কই?' বন্ধু বলল, 'তুমি যেভাবে যা রেখে গেছ, তাই আমি তোমাকে ফেরৎ দিয়েছি।'
বণিক রাগান্বিত হয়ে মামলা করল। আদালতে বিচারকের সামনে বন্ধু বলল, 'যেভাবে আমার সোনার মোহর পিতলের মোহরে পরিণত হয়েছে, সেভাবেই বণিকের কিশোরী মেয়ে বানরীতে পরিণত হয়ে গেছে।'
অতঃপর ব্যাপার খুলে বললে সকলেই আসল জিনিস ফিরে পেল।
বক ও শিয়ালে বন্ধুত্ব হল। কিন্তু সে বন্ধুত্বে আন্তরিকতা ছিল না। একদা চালাক শিয়াল বককে দাওয়াত দিয়ে থালায় ঝোল পরিবেশন করল। তারপর বন্ধুকে খেতে বলে নিজে খেতে শুরু করল। কিন্তু বক তার লম্বা ঠোঁট নিয়ে সে ঝোল খেতে সক্ষম হল না। অপমান বোধ ক'রে বাসায় ফিরে এল।
অতঃপর সে একদিন শিয়াল বন্ধুকে দাওয়াত দিল। সেও ঝোল পরিবেশন করল। কিন্তু মাটির কুঁজে। ফলে সে তার লম্বা ঠোঁট প্রবেশ করিয়ে খেতে লাগল এবং বন্ধুকে খেতে বলল। কিন্তু বন্ধুর মুখ তাতে প্রবেশ করাতে পারল না এবং সে তার অপমানের প্রতিশোধ পেল।
এই শ্রেণীর আচরণ ক'রে হয়তো বিপক্ষকে শিক্ষা দেওয়া যায়। কিন্তু তবুও তাতে রয়েছে শঠতার সমাচরণ। যা একজন চরিত্রবানের জন্য শোভনীয় নয়।
পক্ষান্তরে আচরণ যদি নেহাতই নোংরা হয়, তাহলে নিশ্চয়ই নোংরামির মোকাবেলায় নোংরামি করা যায় না। প্রতিপক্ষ অশ্লীল আচরণ করলে তার বিনিময়ে অশ্লীল আচরণ করা যায় না।
সুতরাং চরিত্রবান গালির বদলে গালি দেয় না, প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজের চরিত্র খারাপ করে না।
দুশ্চরিত্রবান স্বামী মেয়ে দেখে বেড়ায় বলে সুচরিত্রবতী স্ত্রী তার প্রতিশোধে ছেলে দেখে বেড়ায় না।
দুশ্চরিত্রবতী স্ত্রীর বয়ফ্রেণ্ড আছে বলে সুচরিত্রবান স্বামী তার প্রতিশোধে গার্লফ্রেণ্ড গ্রহণ করে না।
একজনের চরিত্র নোংরা বলে অপরজন প্রতিশোধ নিজে নিজের চরিত্রকে নোংরা করে না।
শরীকি ব্যবসায় শরীক চুরি বা খিয়ানত করে বলে প্রতিশোধে অপর শরীকও নিজের সুচরিত্রকে নষ্ট করে না।
বরং উক্ত সকল ক্ষেত্রে এবং তদনুরূপ অন্য ক্ষেত্রেও চরিত্রবান বলে, 'তুমি অধম, তা বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?' মহানবী এর নির্দেশ হল,
أَدَّ الأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ وَلَا تَخْنُ مَنْ خَانَكَ
“যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে, তার আমানত তাকে ফেরৎ দাও এবং যে তোমার খিয়ানত করেছে, তুমি তার খিয়ানত করো না।”৩৪৫
দুশ্চরিত্রবানের প্রতিশোধে তার অনুরূপ কোন আচরণই চরিত্রবান করে না। যেহেতু সে জানে যে,
'কুকুরের কাজ কুকুরে করেছে কামড় দিয়াছে পায়, তা বলে কুকুরে কামড়ানো কিরে মানুষের শোভা পায়?'
না, মোটেই না। অবশ্য প্রতিশোধে কুকুরকে প্রহার করা যায় বা অন্য শাস্তি দেওয়া যায়।
কিন্তু যে ক্ষেত্রে শাস্তি দিতে গিয়ে মনের আগুন প্রশমিত হওয়ার স্থলে দ্বিগুণ হয়ে জ্বলে ওঠে, সে ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শনই উত্তম কাজ। যেহেতু আগুন দিয়ে আগুন নিভানো যায় না। ফায়ার-ব্রিগেডের কর্মীরা আগুন দিয়ে আগুন নিভায় না। সে ক্ষেত্রে পানি ব্যবহার করলে আগুন নির্বাপিত হয়। উৎকৃষ্ট দিয়ে মন্দ প্রতিহত করলে সমূহ কল্যাণ লাভ হয়। মহান আল্লাহ তার আদেশ দিয়ে বলেছেন,
ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ السَّيِّئَةَ نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَصِفُونَ
"তুমি ভালো দ্বারা মন্দের মুকাবিলা কর। তারা যা বলে, আমি সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।”৩৪৬
ক্ষমাশীলতা প্রদর্শনপূর্বক ভালো দিয়ে মন্দ প্রতিহত করার নীতি অবলম্বন করলে শত্রু বন্ধুতে পরিণত হয়। এ কথা খোদ সৃষ্টিকর্তার। তিনি বলেছেন,
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ - وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ
"ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না। উৎকৃষ্ট দ্বারা মন্দ প্রতিহত কর; তাহলে যাদের সাথে তোমার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত। এ চরিত্রের অধিকারী কেবল তারাই হয় যারা ধৈর্যশীল, এ চরিত্রের অধিকারী তারাই হয় যারা মহাভাগ্যবান।"৩৪৭
এমন চরিত্রবান মহাভাগ্যবান ধৈর্যশীলদের জন্য রয়েছে শুভ পরিণাম এবং তাদের দ্বিগুণ পুরস্কৃত করা হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَالَّذِينَ صَبَرُوا ابْتِغَاء وَجْهِ رَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلاةَ وَأَنفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً وَيَدْرَؤُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ أُوْلَئِكَ لَهُمْ عُقْبَى الدَّارِ
"যারা তাদের প্রতিপালকের মুখমণ্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ করে, স্বলাত সুপ্রতিষ্ঠিত করে, আমি তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি, তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং যারা ভাল দ্বারা মন্দকে প্রতিহত করে, তাদের জন্য শুভ পরিণাম (পরকালের গৃহ)।"৩৪৮
أُوْلَئِكَ يُؤْتَوْنَ أَجْرَهُم مَّرَّتَيْنِ بِمَا صَبَرُوا وَيَدْرَؤُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
"ওদেরকে দু'বার পুরস্কৃত করা হবে, কারণ ওরা ধৈর্যশীল এবং ভালোর দ্বারা মন্দকে দূর করে ও আমি ওদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি তা হতে ব্যয় করে।"৩৪৯
এটি একটি বড় কঠিন কাজ, কেউ আপনার সাথে দুর্ব্যবহার করবে, আর আপনি তার সাথে সদ্ব্যবহার করবেন! সে আপনার ঘর ভাঙবে, আর আপনি তার ঘর বানিয়ে দেবেন! সে আপনার বদনাম গেয়ে বেড়াবে, আর আপনি তার সুনাম গাইবেন! সে আপনার ব্যথার সময় হাসবে, আর আপনি তার ব্যথায় সমব্যথী হয়ে কেঁদে বেড়াবেন! সে আপনাকে ছোবল মারবে, আর আপনি তাকে দুধ-কলা খাওয়াবেন!
কোন এক সময় কবির মতো গেয়ে বেড়াবেন, "আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা, আমি বাঁধি তার ঘর, আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর। যে মোরে করিল পথের বিবাগী; পথে পথে আমি ফিরি তার লাগি; দীঘল রজনী তার তরে জাগি ঘুম যে হরেছে মোর; আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা, আমি বাঁধি তার ঘর। আমার এ কূল ভাঙিয়াছে যেবা আমি তার কূল বাঁধি, যে গেছে বুকেতে আঘাত হানিয়া তার লাগি আমি কাঁদি; যে মোরে দিয়েছে বিষ-ভরা বাণ, আমি দেই তারে বুকভরা গান; কাঁটা পেয়ে তারে ফুল করি দান সারাটি জনম ভর, আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর। মোর বুকে যেবা বিঁধেছে আমি তার বুক ভরি, রঙিন ফুলের সোহাগ-জড়ানো ফুল-মালঞ্চ ধরি। যে মুখে সে নিঠুরিয়া বাণী, আমি লয়ে সখী তারি মুখখানি, কত ঠাঁই হতে কত কি যে আনি, সাজাই নিরন্তর, আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।"
হ্যাঁ, আপনি পারবেন। কারণ আপনি যে চরিত্রবান, আপনি যে হৃদয়বান। আর আপনার আদর্শ মহানবী বলেছেন,
صِلْ مَنْ قَطَعَكَ وَأَعْطِ مَنْ حَرَمَكَ وَاعْفُ عَمَّنْ ظَلَمَكَ
"তোমার সঙ্গে যে আত্মীয়তা ছিন্ন করেছে, তুমি তার সাথে তা বজায় কর, তোমাকে যে বঞ্চিত করেছে, তুমি তাকে প্রদান কর এবং যে তোমার প্রতি অন্যায়াচরণ করেছে, তুমি তাকে ক্ষমা ক'রে দাও।"৩৫০
صِلْ مَنْ قَطَعَكَ وَأَحْسِنُ إِلَى مَنْ أَسَاءَ إِلَيْكَ وَقُلِ الْحَقَّ وَلَوْ عَلَى نَفْسِكَ
"তুমি তার সাথে সুসম্পর্ক জুড়ে চল যে তোমার সাথে তা নষ্ট করতে চায়, তার প্রতি সদ্ব্যবহার কর যে তোমার সাথে দুর্ব্যবহার করে এবং হক কথা বল; যদিও তা নিজের বিরুদ্ধে হয়।"৩৫১
আসলে সে মানুষ চরিত্রবান নয়, যার সাথে সদাচরণ করা হলে বিনিময়ে সে সদাচরণ করে। তার সাথে ভালো ব্যবহার করা হলে তবেই সে ভালো ব্যবহার করে। তাকে দিতে পারলে তবেই সে সুন্দর ব্যবহার প্রদর্শন করে। কেবল দানের বিনিময়েই প্রতিদান দেয়।
বরং আসল চরিত্রবান সে, যে এর বিপরীত করতে পারে। যার সাথে অসদাচরণ করা হলেও সে তার সাথে সদাচরণ করে। তার সাথে দুর্ব্যবহার করা হলেও সে ভালো ব্যবহার করে। তাকে দিতে না পারলেও সে সুন্দর ব্যবহার প্রদর্শন করে। কেবল দানের বিনিময়েই প্রতিদান দেয় না, বরং দান না পেলেও দান দিয়ে থাকে। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ الوَاصِلُ بِالمُكَافِئ ، وَلكِنَّ الوَاصِلَ الَّذِي إِذَا قَطَعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا
"সেই ব্যক্তি সম্পর্ক বজায়কারী নয়, যে সম্পর্ক বজায় করার বিনিময়ে বজায় করে। বরং প্রকৃত সম্পর্ক বজায়কারী হল সেই ব্যক্তি, যে কেউ তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সে তা কায়েম করে।"৩৫২
দিলে পাওয়া যাবে---এ নীতি বড় প্রাচীন। কিছু না পেলেও দিয়ে যাব, কিছু দিলে কিছু পাওয়ার আশা করব না---এ নীতি বড় চিরন্তন। আর কেউ আমাকে বঞ্চিত করলেও আমি তাকে দিয়ে যাব, কেউ আমার সাথে দুর্ব্যবহার করলেও আমি তার সাথে সদ্ব্যবহার করব---এ নীতি অতি মহৎ। এমন নীতির অনুসারীর জন্য রয়েছে মহা প্রতিদান।
আবূ হুরাইরা বলেন, এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার কিছু আত্মীয় আছে, আমি তাদের সাথে আত্মীয়তা বজায় রাখি, আর তারা ছিন্ন করে। আমি তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করি, আর তারা আমার সাথে দুর্ব্যবহার করে। তারা কষ্ট দিলে আমি সহ্য করি, আর তারা আমার সাথে মূর্খের আচরণ করে।' তিনি বললেন,
لَئِنْ كُنْتَ كَمَا قُلْتَ ، فَكَأَنَّمَا تُسِفُهُمُ الْمَلَّ ، وَلَا يَزَالُ مَعَكَ مِنَ اللَّهِ ظَهِيرٌ عَلَيْهِمْ مَا دُمْتَ عَلَى ذَلِكَ
"যদি তা-ই হয়, তাহলে তুমি যেন তাদের মুখে গরম ছাই নিক্ষেপ করছ (অর্থাৎ, এ কাজে তারা গোনাহগার হয়।) এবং তোমার সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্যকারী থাকবে; যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি এর উপর অনড় থাকবে।"৩৫৩
অতএব কঠিন হলেও চরিত্রবানের এ আদর্শকে আপনার জীবনের আচরণ বানিয়ে নিন,
'যে তোমাকে ডাকে না হে তারে তুমি ডাকো ডাকো, তোমা হতে দূরে যে যায় তারে তুমি রাখো রাখো।'
আপনি সেই ফলদার গাছের মতো হন, যাকে ঢিল মারলে তার বিনিময়ে আপনাকে ফল দান করে। সেই মোমবাতির মতো হন, যাকে আগুন দিয়ে প্রজ্বলিত করলে পরিণামে আলো দান করে। সেই ধূপকাঠির মতো হন, যাতে অগ্নিসংযোগ করলে বিনিময়ে সুগন্ধ বিতরণ করে।
কেউ গায়ে থুথু দিলে প্রাপ্য ভেবে গায়ে মেখে নিন। কেউ অত্যাচার করলে তার অসুখে দেখা করতে যান। কেউ হিংসা করলে তাকে উপহার দিন।
মন্দকে ভালো দ্বারা প্রতিহত করুন। তারপর দেখুন তার আজব প্রতিক্রিয়া।

টিকাঃ
৩৪৩. সূরা শূরা: ৪০
৩৪৪. সূরা নাহল: ১২৬
৩৪৫. আবু দাউদ ৩৫৩৭, তিরমিযী ১২৬৪, দারেমী, মিশকাত ২৯৩৪
৩৪৬. সূরা মু'মিনূন: ৯৬
৩৪৭. সূরা হা-মীম সাজদাহ: ৩৪-৩৫
৩৪৮. সূরা রা'দ: ২২
৩৪৯. সূরা ক্বাস্বাস্ব: ৫৪
৩৫০. আহমাদ ১৭৪৫২, হাকেম ৭২৮৫, ত্বাবারানী ১৪২৫৮, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৮০৭৯, সিঃ সহীহাহ ৮৯১
৩৫১. ইবনে নাজ্জার, সহীহুল জামে ৩৭৬৯
৩৫২. বুখারী ৫৯৯১
৩৫৩. মুসলিম ৬৬৮৯

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 দোষ ঢাকা

📄 দোষ ঢাকা


দোষ-ত্রুটি দিয়ে ভরা মানুষের জীবন। দোষ করে না এমন কে আছে? সুতরাং সে দোষ গোপন করা এবং লোক মাঝে প্রচার না করা মানুষের কর্তব্য, যেহেতু তার নিজেরও দোষ আছে। বিশেষ ক'রে চরিত্রবান নারী-পুরুষ মানুষের দোষ প্রচার ক'রে গীবত করে না। 'সুজনে সুযশ গায় কুযশ ঢাকিয়া, কুজনে কুরব করে সুরব নাশিয়া।'
অনেকে ভুল ক'রে তওবা করেছে এবং ভালো মানুষ হয়েছে অথবা বড় কোন মর্যাদা লাভে ধন্য হয়েছে, কিন্তু পরশ্রীকাতর মানুষ তাদের সেই পুরনো ভুল উল্লেখ ক'রে তাদেরকে লোক চোখে ছোট করতে চায়। যে ত্রুটি মহান আল্লাহ ক্ষমা করেছেন, সে ত্রুটিকে এক শ্রেণীর মানুষ ক্ষমা করতে চায় না। এমন মানুষ কিন্তু চরিত্রবান হতে পারে না।
কেউ দোষ গোপন করলে মহান আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন করেন। দুনিয়াতে তাকে লোক মাঝে লাঞ্চিত করেন না এবং কিয়ামতে তিনি তার দোষ-ত্রুটির হিসাব করেন না। মহানবী বলেছেন,
وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
"যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোন মুসলিমের দোষত্রুটি গোপন করে নেবে, আল্লাহ তার দোষত্রুটিকে দুনিয়া ও আখেরাতে গোপন করে নেবেন।"৩৫৪
وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِماً سَتَرَهُ اللهُ يَومَ القِيامَةِ
"যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি গোপন করবে, আল্লাহ কিয়ামতে তার দোষ-ত্রুটি গোপন করবেন।"৩৫৫
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
لَا يَسْتُرُ عَبْدٌ عَبْداً في الدُّنْيَا إِلَّا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ القِيَامَةِ
"যে বান্দা দুনিয়াতে কোন বান্দার দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।"৩৫৬
ছিদ্রান্বেষণ করা সাধারণতঃ চরিত্রবান মুসলিমের কাজ নয়, এ কাজ চরিত্রহীন মুনাফিকের। আর এ কাজের রয়েছে অনুরূপ প্রতিফল দুনিয়াতেই। মহানবী বলেছেন,
يَا مَعْشَرَ مَنْ قَدْ أَسْلَمَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يُفْضِ الإِيمَانُ إِلَى قَلْبِهِ لَا تُؤْذُوا الْمُسْلِمِينَ وَلَا تُعَيِّرُوهُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنْ تَتَبَّعَ عَوْرَةَ أَخِيهِ الْمُسْلِمِ تَتَبَّعَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ تَتَبَّعَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ وَلَوْ فِي جَوْفِ رَحْلِهِ
"হে (মুনাফিকের দল!) যারা মুখে মুসলমান হয়েছ এবং যাদের অন্তরে এখনও ঈমান প্রবেশ করেনি (তারা শোন), তোমরা মুসলিমদেরকে কষ্ট দিয়ো না, তাদেরকে লাঞ্ছিত করো না ও তাদের ছিদ্রান্বেষণ করো না। যেহেতু যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ অনুসন্ধান করে আল্লাহ তার দোষ অনুসন্ধান করেন। আর আল্লাহ যার দোষ অনুসন্ধান করেন (অর্থাৎ গোপন না করেন) তিনি তাকে অপদস্থ করেন; যদিও সে নিজ গৃহাভ্যন্তরে থাকে।"৩৫৭
চরিত্রবান মুসলিম রহস্য গোপন রাখতে যত্নবান হয়। নিজের তথা দাম্পত্য-সুখের নানা রস ও সুখের কথাও গোপন রাখে। যারা বন্ধু মহলে তা প্রকাশ করে, তারা কিন্তু চরিত্রবান নয়। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا
"কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট মানের দিক থেকে সবচেয়ে জঘন্য মানের ব্যক্তি হল সে, যে স্বামী স্ত্রী-মিলন করে এবং যে স্ত্রী স্বামী-মিলন করে, অতঃপর একে অন্যের মিলন-রহস্য (অপরের নিকট) প্রচার করে।"৩৫৮
"এমন লোক তো সেই শয়তানের মত, যে কোন নারী-শয়তানকে রাস্তায় পেয়ে সঙ্গম করতে লাগে, আর লোকেরা তার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখে।"৩৫৯
মানুষের দ্বারা পাপ ঘটতেই পারে। সচ্চরিত্রবান মানুষ হলেও ঘটতে পারে। কিন্তু দুশ্চরিত্রবানের অভ্যাস হল তা লোক মাঝে প্রচার করা। পাপ ক'রে তা নিয়ে গর্ব করা। এমন দুশ্চরিত্রবান নর-নারী ক্ষমার্হ নয়। মহানবী বলেছেন,
كُلُّ أُمَّتِي مُعَافَى إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ وَإِنَّ مِنَ الْمُجَاهَرَةِ أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا ثُمَّ يُصْبِحَ وَقَدْ سَتَرَهُ اللهُ عَلَيْهِ فَيَقُولَ يَا فُلَانُ عَمِلْتُ الْبَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ وَيُصْبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللَّهِ عَنْهُ
"আমার প্রত্যেক উম্মতের পাপ মাফ করে দেওয়া হবে, তবে যে প্রকাশ্যে পাপ করে (অথবা পাপ করে বলে বেড়ায়) তার পাপ মাফ করা হবে না। আর পাপ প্রকাশ করার এক ধরন এও যে, একজন লোক রাত্রে কোন পাপ করে ফেলে, অতঃপর আল্লাহ তা গোপন করে নেন। (অর্থাৎ, কেউ তা জানতে পারে না।) কিন্তু সকাল বেলায় উঠে সে লোকের কাছে বলে বেড়ায়, 'হে অমুক! গত রাতে আমি এই এই কাজ করেছি।'
রাতের বেলায় আল্লাহ তার পাপকে গোপন ক'রে নেন; কিন্তু সে সকাল বেলায় আল্লাহর সে গোপনীয়তাকে নিজে নিজেই ফাঁস ক'রে ফেলে।"৩৬০
বেহায়া সে মানুষ, ধৃষ্ট সে মানুষ। সে কি আবার চরিত্রবান থাকে?

টিকাঃ
৩৫৪. আহমাদ ৭৪২৭, মুসলিম ৭০২৮, আবু দাউদ ৪৯৪৮, তিরমিযী ১৪২৫, ইবনে মাজাহ ২২৫, সহীহুল জামে' ৬৫৭৭
৩৫৫. বুখারী ২৪৪২, মুসলিম ৬৭৪৩
৩৫৬. মুসলিম ৬৭৫৯
৩৫৭. তিরমিযী ২০৩২
৩৫৮. মুসলিম ৩৬১৫, আবু দাউদ ৪৮৭০
৩৫৯. আহমাদ ২৭৫৮৩, ইবনে আবী শাইবাহ, আবু দাউদ ২১৭৬, বাইহাকী প্রভৃতি, আদাবুয যিফাফ ১৪৩পৃঃ
৩৬০. বুখারী ৬০৬৯, মুসলিম ৭৬৭৬

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 সাহসিকতা ও বীরত্ব

📄 সাহসিকতা ও বীরত্ব


যুদ্ধের ময়দানে ধৈর্যের সাথে অবস্থান করে নির্ভয়ে শত্রুর মোকাবেলা করা হল বীরত্ব। ভীতি ও ত্রাস থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা হল সাহসিকতা।
বীর পুরুষ হল সেই মানুষ, যে যুদ্ধে ভয় পায় না। যে আত্মরক্ষা করতে শত্রুপক্ষের সকল প্রয়াসকে ব্যর্থ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। যে বাঁচার জন্য মৃত্যুকে ভয় পায় না।
'মৃত্যুকে যে এড়িয়ে চলে, মৃত্যু তারেই টানে। যারা মৃত্যুকে বুক পেতে লয়, বাঁচতে তারাই জানে।'
প্রয়োজনে যে মরতে প্রস্তুত হয়, জীবনে বেঁচে থাকার অধিকার তারই আছে। আবু বাক্ সিদ্দীক (রাঃ) খালেদ বিন অলীদ (রাঃ) কে জিহাদে প্রেরণ করার সময় অসিয়ত ক'রে বলেছিলেন, 'মরার চেষ্টা করো, তোমাকে জীবন দান করা হবে।'
সংগ্রাম করে বাঁচাই সত্যিকারের বাঁচা।
মানুষ তখনই বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যখন সে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে, অধিকার অর্জন করে নিতে হয়। আর তখনই প্রয়োজন পড়ে সাহসিকতা ও বীরত্বের।
'যারা শুধু মরে কিন্তু নাহি দেয় প্রাণ, কেহ কভু তাহাদের করেনি সম্মান।'
ভয়ের অনুভূতি না থাকার নাম বীরত্ব নয়। বরং বীরত্ব হল ভয় অনুভূত হওয়ার পরও নির্ভয় থাকার নাম। যাঁরা এ জগতে বীর বলে প্রসিদ্ধ হয়েছেন, তাঁরাও এ কথার দাবী করতে পারেন না যে, তাঁদেরকে মোটেই ভয় লাগে না। সুতরাং বীর পুরুষ ভয়কে ভয় করে, কিন্তু সে ভয়কে জয় করে। তাই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা মহা অপরাধ।
'পলায়ন, সে যে ঘৃণ্য ভীরুতা অগ্রসরেই মান, পালাবে কোথায় তকদীর হতে নাহিক পরিত্রাণ।'
সাহস ও বীরত্ব থাকলে দ্বীন বাঁচানো যায়, জান বাঁচানো যায়, মর্যাদা বাঁচানো যায়, মাল বাঁচানো যায়, পরিবার বাঁচানো যায়, দেশ বাঁচানো যায়। আর তার ফলে প্রাণ গেলে 'শহীদ'-এর মর্যাদা লাভ হয়। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَنْ قُتِلَ دُونَ مَالِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ وَمَنْ قُتِلَ دُونَ أَهْلِهِ أَوْ دُونَ دَمِهِ أَوْ دُونَ دِينِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ
"যে ব্যক্তি নিজের মাল রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ, যে নিজের পরিবার রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ, যে তার নিজের প্রাণ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সেও শহীদ এবং যে নিজের দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ।"৩৬১
স্ত্রীর ব্যাপারে যে পুরুষ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে পারে না, মেয়েরা তেমন পুরুষকে পছন্দ করে না। নিস্তেজ ভীরু কাপুরুষকে কোন জ্ঞানী নারী নিজ স্বামী রূপে পেতে চায় না।
একজন মু'মিন সৎ-সাহসী হয়। মহান প্রতিপালক ছাড়া সে কারো সামনে মাথা নত করে না। মহান আল্লাহ ছাড়া সে আর কোন কিছুকে ভয় করে না। মহান আল্লাহ সাহসী মু'মিনদের ব্যাপারে বলেছেন,
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللهِ مَنْ آمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُوْلَئِكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
"তারাই তো আল্লাহর মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণ করবে, যারা আল্লাহতে ও পরকালে বিশ্বাস করে এবং যথাযথভাবে স্বলাত পড়ে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকেও ভয় করে না, ওদেরই সম্বন্ধে আশা যে, ওরা সৎপথ প্রাপ্ত হবে। ৩৬২
الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللَّهَ وَكَفَى بِاللهِ حَسِيبًا
"ওরা আল্লাহর বাণী প্রচার করত; ওরা তাঁকে ভয় করত এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাকেও ভয় করত না। আর হিসাব গ্রহণে আল্লাহই যথেষ্ট।"৩৬৩
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ ذَلِكَ فَضْلُ الله يُؤْتِيهِ مَن يَشَاء وَاللَّهِ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ ধর্ম হতে ফিরে গেলে আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনয়ন করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন ও যারা তাঁকে ভালবাসবে, তারা হবে বিশ্বাসীদের প্রতি কোমল ও অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দায় ভয় করবে না, এ আল্লাহর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা তিনি দান করেন। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়। ৩৬৪
বহু ভীরু মানুষ আছে, যারা মুসলিমদেরকে কাফেরদের ভয় দেখায়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءهُ فَلا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
"ঐ (এক শ্রেণীর বক্তা) তো শয়তান; যে (তোমাদেরকে) তার (কাফের) বন্ধুদের ভয় দেখায়; সুতরাং যদি তোমরা বিশ্বাসী হও, তাহলে তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকেই ভয় কর।"৩৬৫
হক বলার সৎ সাহস থাকা চাই সচ্চরিত্রবান মানুষের মাঝে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার হিম্মত থাকা চাই একজন আদর্শ মানুষের মাঝে। মহানবী বলেছেন,
أَفْضَلُ الْجِهَادِ كَلِمَةُ عَدْلٍ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ
"অত্যাচারী বাদশাহর নিকট হক কথা বলা সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ।"৩৬৬
লক্ষণীয় যে, 'বাদশাহর নিকট হক কথা বলা সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ'। অর্থাৎ বাদশাহ বা শাসকের পশ্চাতে হক কথা বলা বীরত্ব নয়। ঘরে বসে রাজার মাকে গালি দেওয়া সাহসিকতা নয়, ভীরুতা। ক্ষমতাসীন শাসকের সামনে না বলে তার ক্ষমতাধীন জনগণের সামনে হক কথা বলে উত্তেজনা ও বিদ্রোহ সৃষ্টি করা 'সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ' নয়। 'শোষণ-শ্রেণীর মুখের উপর সত্য ও ন্যায়ের কথা বলাটাই প্রকৃত বিপ্লব।'
নিরাপত্তার সময় হক কথা বলতে পারাই বীরত্ব নয়, বীরত্ব হল অনিরাপত্তার সময় হক কথা বলা।
ইমাম শাফেয়ী বলেন, 'সবচেয়ে কঠিন কাজ হল ৩টি; অভাবের সময় দান করা, নির্জনে পরহেযগার হওয়া এবং যার নিকট কোন ভয় বা আশা থাকে, তার নিকট হক কথা বলা।'
গীবত করা সাহসিকতা নয়, বরং কাপুরুষতার পরিচয়। ভক্তদের মাঝে প্রতিপক্ষকে গালাগালি করা, অনুগামীদের মাঝে নিরাপদে বসবাস ক'রে অথবা জলসা ক'রে তাদেরকে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া, ফেসবুক বা অন্য কোন নেট-মাধ্যমে ঘরে বসে বিরোধীকে হুমকি দেওয়া, নিজের দেশে বসে অপর দেশ বা তার কোন ব্যক্তিকে কটাক্ষ করা কাপুরুষদের কাজ।
পরিশেষে জেনে রাখা ভালো যে, হক হলেই যে তা সব জায়গায় বলা যাবে বা বলতে হবে, তা নয়। হক কথা বলার স্থান ও কৌশল জেনে বলতে হবে। নচেৎ হিতে বিপরীত হলে লাভের জায়গায় ক্ষতি হতে পারে।
কেবল শত্রু দমনে নয়, বীরত্বের এ গুণটি রাগ ও ক্রোধ দমনেও বড় সহায়ক। যেহেতু আসল বীর হল সেই, যে নিজ ক্রোধ দমনে বীরত্ব প্রদর্শন করে। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ
"শক্তিশালী (বা বীর) সে নয় যে কুন্তীতে জয়লাভ করে। বরং প্রকৃত শক্তিশালী (বা বীর) হল সেই ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় নিজেকে সামলে নিতে পারে।"৩৬৭

টিকাঃ
৩৬১. আবু দাউদ ৪৭৭৪, তিরমিযী ১৪২১, নাসাঈ ৪০৯৫
৩৬২. সূরা তাওবাহ: ১৮
৩৬৩. সূরা আহযাব: ৩৯
৩৬৪. সূরা মায়িদাহ: ৫৪
৩৬৫. সূরা আলে ইমরান-৩: ১৭৫
৩৬৬. আবু দাউদ ৪৩৪৬, তিরমিযী ২১৭৪, ইবনে মাজাহ ৪০১১
৩৬৭. আহমাদ, বুখারী ৬১১৪, মুসলিম ৬৮০৯, মিশকাত ৫১০৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00