📄 আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসা ও ঘৃণা করা
সুচরিত্রবান মানুষের একটি মহৎ গুণ হল, সে কাউকে বা কোন কিছুকে ভালোবাসে, তখন কেবল মহান আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসে, তাঁর সন্তুষ্টি লাভের আশায় ভালোবাসে, আর যখন কাউকে বা কোন কিছুকে ঘৃণা করে, তখন কেবল মহান আল্লাহকেই রাজি-খুশী করার জন্যই ঘৃণা করে।
যখন কাউকে ভালোবাসে, তখন এই জন্য ভালোবাসে যে, তাকে মহান আল্লাহ ভালোবাসেন অথবা সে মহান আল্লাহকে ভালোবাসে। আর যখন কাউকে ঘৃণা করে, তখন এই জন্য ঘৃণা করে যে, মহান আল্লাহ তাকে ঘৃণা করেন অথবা সে মহান আল্লাহকে ঘৃণা করে।
যখন কোন জিনিস বা কাজকে ভালোবাসে, তখন এই জন্য ভালোবাসে যে, তা মহান আল্লাহ ভালোবাসেন। আর যখন কোন জিনিস বা কাজকে ঘৃণা করে, তখন এই জন্য ঘৃণা করে যে, মহান আল্লাহ তা ঘৃণা করেন।
কারণ এ হল ঈমান পরিপূর্ণতার লক্ষণ, পূর্ণ ঈমানদার মানুষের কর্ম। মহানবী বলেছেন,
مَنْ أَعْطَى اللَّهِ وَمَنَعَ اللَّهِ وَأَحَبَّ اللَّهِ وَأَبْغَضَ اللَّهِ وَأَنْكَحَ لِلَّهِ فَقَدْ اسْتَكْمَلَ إِيمَانَهُ
"যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে কিছু দান করে, কিছু দেওয়া হতে বিরত থাকে, কাউকে ভালোবাসে অথবা ঘৃণাবাসে এবং তাঁরই সন্তুষ্টিলাভের কথা খেয়াল করে বিবাহ দেয়, তার ঈমান পূর্ণাঙ্গ ঈমান।"৩৩২
ঈমানের বন্ধন আত্মীয়তার বন্ধনের অনেক ঊর্ধ্বে। আত্মীয়তাকেও বিচার করতে হবে ঈমানের কষ্টিপাথরে। যে আত্মীয় আল্লাহকে চায় না, সে আত্মীয়কে মু'মিন চাইতে পারে না। তাই এমন সম্প্রীতি ও বিদ্বেষ কায়েম করার কাজ হল ঈমানের মজবুত হাতল। মহানবী বলেছেন,
أوثَقُ عُرَى الإِيمَانِ الْمُوَالاةُ فِي اللهِ، وَالْمُعَادَاةُ فِي اللهِ، وَالْحُبُّ فِي اللهِ، وَالْبُغْضُ فِي اللهِ
ঈমানের সবচাইতে মজবুত হাতল হল, আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্ব স্থাপন করা, আল্লাহর ওয়াস্তে শত্রুতা স্থাপন করা, আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসা রাখা এবং আল্লাহরই ওয়াস্তে ঘৃণা পোষণ করা।"৩৩৩
দুর্বলতম ঈমানের দাবী হল মন্দকে মন্দ জানা, মন্দকে ঘৃণা করা, মন্দের প্রতিবাদ করা। মন্দ দূর করার এটাও এক পদ্ধতি। তা না ক'রে যদি 'এক হাতে মোর কোরান শরীফ মদের গ্লাস অন্য হাতে, পুণ্য-পাপের সৎ-অসতের দোস্তি সমান আমার সাথে।' এই রীতি হয়, তাহলে তার ঈমান যে বর্তমান আছে, তার নিশ্চয়তা কোথায়? মহানবী বলেছেন,
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرُهُ بِيَدِهِ ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দেয়। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ জিভ দ্বারা (উপদেশ দিয়ে পরিবর্তন করে)। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তর দ্বারা (ঘৃণা করে)। আর এ হল সবচেয়ে দুর্বল ঈমান।"৩৩৪
তিনি আরো বলেছেন,
مَا مِنْ نَبِي بَعَثَهُ اللهُ فِي أُمَّةٍ قَبْلِي إِلَّا كَانَ لَهُ مِنْ أُمَّتِهِ حَوَارِيُّونَ وَأَصْحَابٌ يَأْخُذُونَ بِسُنَّتِهِ وَيَقْتَدُونَ بِأَمْرِهِ ثُمَّ إِنَّهَا تَخْلُفُ مِنْ بَعْدِهِمْ خُلُوفٌ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ وَيَفْعَلُونَ مَا لَا يُؤْمَرُونَ فَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِيَدِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِلِسَانِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِقَلْبِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَيْسَ وَرَاءَ ذَلِكَ مِنَ الْإِيمَانِ حَبَّةُ خَرْدَلٍ
"আমার পূর্বে আল্লাহ যে কোন নবীকে যে কোন উম্মতের মাঝে পাঠিয়েছেন তাদের মধ্যে তাঁর (কিছু) সহযোগী ও সহচর হতো। তারা তাঁর সুন্নতের উপর আমল করত এবং তাঁর আদেশের অনুসরণ করত। অতঃপর তাদের পরে এমন অপদার্থ লোক সৃষ্টি হয় যে, তারা যা বলে, তা করে না এবং তারা তা করে, যার আদেশ তাদেরকে দেওয়া হয় না। সুতরাং যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে নিজ হাত দ্বারা সংগ্রাম করবে সে মু'মিন, যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে নিজ জিভ দ্বারা সংগ্রাম করবে সে মু'মিন এবং যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে নিজ অন্তর দ্বারা জিহাদ করবে সে মু'মিন। আর এর পর সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান নেই।"৩৩৫
বলা বাহুল্য, বন্ধুত্ব করা ও বজায় রাখার ক্ষেত্রে, জীবন-সাথী এখতিয়ার ও দাম্পত্য বন্ধন অটুট রাখার ক্ষেত্রে এবং আত্মীয়তার বন্ধন মজবুত করার ক্ষেত্রে চরিত্রবান যদি এই নীতি অবলম্বন করে, তাহলে সে সুখী হয়, দুনিয়াতে ও আখেরাতে।
সতর্কতার বিষয় যে, যদি কোন নারী-পুরুষের ভালোবাসা আল্লাহর ওয়াস্তে হয়, কিন্তু তা প্রকাশ করা অবৈধ হয়, তাহলে তা গোপন রাখাই ওয়াজেব। যাতে অন্তর ছাপিয়ে বের হয়ে এসে অপবিত্রতার নর্দমায় পড়ে তিনিই অসন্তুষ্ট হয়ে না যান, যাঁর ওয়াস্তে সেই ভালোবাসার সৃষ্টি।
টিকাঃ
৩৩৩. ত্বাবারানী ১১৩৭২, সিলসিলাহ সহীহাহ ৯৯৮, ১৭২৮
৩৩৪. আহমাদ ১১০৭৪, মুসলিম ১৮-৬, আসহাবে সুনান
৩৩৫. মুসলিম ১৮৮
📄 সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে বাধাদান
সুচরিত্রবান যে হবে, প্রকৃতিগতভাবে অথবা নৈতিকভাবে সে কুচরিত্রতাকে ঘৃণা করবে। নোংরা কাজ হতে দেখলে সে বাধা দেবে, তা দূর করার চেষ্টা করবে। হ্যাঁ, সে প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর অভিভাবক। স্বঘোষিত নয়, মহান স্রষ্টার ঘোষণা অনুযায়ী সে সকলের অভিভাবক। তিনি বলেছেন,
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاء بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُوْلَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
"বিশ্বাসী পুরুষরা ও বিশ্বাসী নারীরা হচ্ছে পরস্পর একে অন্যের অভিভাবক, তারা সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজে নিষেধ করে। আর যথাযথভাবে স্বলাত আদায় করে ও যাকাত প্রদান করে, আর আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে। এসব লোকের প্রতিই আল্লাহ অতি সত্বর করুণা বর্ষণ করবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতিশয় ক্ষমতাবান, হিকমতওয়ালা।"৩৩৬
আর মহানবী বলেছেন,
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَراً فَلْيُغَيِّرُهُ بِيَدِهِ ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দেয়। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ জিভ দ্বারা (উপদেশ দিয়ে পরিবর্তন করে)। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তর দ্বারা (ঘৃণা করে)। আর এ হল সবচেয়ে দুর্বল ঈমান।"৩৩৭
অবশ্য হিকমতের সাথে ও কৌশলে সে কাজ করতে হবে। নচেৎ তা করতে গিয়ে অপেক্ষাকৃত বড় ফিতনা সৃষ্টি করা চরিত্রবানের লক্ষণ নয়।
টিকাঃ
৩৩৬. সূরা তাওবাহ: ৭১
৩৩৭. আহমাদ ১১০৭৪, মুসলিম ১৮-৬, আসহাবে সুনান
📄 আল্লাহর দিকে দাওয়াত
আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়া সচ্চরিত্রতার একটি লক্ষণ। কারণ সে সৃষ্টির মঙ্গল চায়। সে জানে এক আল্লাহর প্রতি সঠিক বিশ্বাস ও সঠিক ইসলাম অবলম্বন ছাড়া মুক্তির কোন পথ নেই। আর সেই আশংকায় অমুসলিম ও নামসর্বস্ব মুসলিমদেরকে সঠিক ইসলামের দিকে আহবান করে। তাদের প্রতি দয়াপূর্বকই সত্যের দিকে আহবান করে। তাতে তার কোন পার্থিব স্বার্থ থাকে না। আর সে জন্যই তার কথা ও কর্ম হয় সর্বশ্রেষ্ঠ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
"যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকাজ করে এবং বলে, 'আমি তো আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)' তার অপেক্ষা কথায় উত্তম আর কোন্ ব্যক্তি?”৩৩৮
মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন সচ্চরিত্রতার একটি মহৎ গুণ, মানুষের হিতাকাঙ্ক্ষী হওয়া চরিত্রবান মানুষের অন্যতম লক্ষণ। এমন মানুষ চায়, সকল মানুষ আল্লাহর কিতাব কুরআন পড়ুক, কুরআন শিখুক। আর তাই সে তা শিক্ষা দেয়, শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করে। সে জন্যও সে হয় সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। মহানবী বলেছেন,
خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ
"তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সেই, যে নিজে কুরআন শিখে অপরকে শিক্ষা দেয়। "৩৩৯
চরিত্রবান কেবল নিজেকেই বাঁচায় না, সে অপরকেও বাঁচাতে চেষ্টাবান হয়। সে স্বার্থপর নয়, সে পরের পরিত্রাণের জন্য নিজের শ্রম, বুদ্ধি ও কথাকে কাজে লাগায়। বিশ্বমানবতার শান্তি ও সাফল্যের জন্য নিরলস প্রচেষ্টায় মহান স্রষ্টা ও তাঁর বিধানের প্রতি মানুষকে সনির্বন্ধ আহবান জানায়।
চরিত্রবান মানুষ জানে, 'আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।'
আমরা যেমন বিশ্বশান্তির জন্য পরস্পরকে সহযোগিতা করব, তেমনি চিরশান্তির জন্যও একে অন্যকে পথপ্রদর্শন করব সজ্ঞানে ও সুকৌশলে। আর আল্লাহই তওফীকদাতা ও হিদায়াতকর্তা।
টিকাঃ
৩৩৮. সূরা হা-মীম সাজদাহ: ৩৩
৩৩৯. বুখারী ৫০২৭-৫০২৮
📄 হিকমত অবলম্বন
'হিকমত' শব্দের অর্থ কৌশল বা প্রজ্ঞা।
হিকমত হল ইলমের মাখন।
হিকমত অবলম্বন করা মানে: প্রত্যেক জিনিসকে তার যথোপযুক্ত স্থাপন করা।
হিকমত অবলম্বন করার অর্থ হল: প্রত্যেক কাজের সঠিকতার নাগাল পাওয়া।
হিকমত অবলম্বন করার মানে হল: কথা ও কাজে সঠিকতা ও আদব বজায় রাখা।
কেউ যদি নিজের সাত বছরের ছেলেকে স্বলাতের জন্য মারে, তাহলে সে 'হাকীম' (প্রজ্ঞাবান) নয়। কারণ স্বলাত না পড়লে তাকে দশ বছর বয়সে মারার হুকুম আছে। নিশ্চয় সে চাষী 'হাকীম' নয়, যে ফসল পাকার আগেই কেটে ফেলে। সে ডাক্তার 'হাকীম' নয়, যে রোগ নির্ণয় না করেই চিকিৎসা করে।
হিকমত মানে সুন্নাহ। হিকমত অবলম্বন করার মানে হল কথা ও কাজে সুন্নাহ অবলম্বন করা।
হিকমত অবলম্বন করার মানে হল: প্রত্যেক হকদারকে তার হক প্রদান করা। কোন বিষয়ে সীমা লংঘন না করা। প্রত্যেক মানুষকে তার যথা মর্যাদা প্রদান করা। সময় হওয়ার পূর্বে কোন জিনিস পেতে তাড়াহুড়া না করা। কোন কাজের ফললাভে শীঘ্রতা না করা। কোন কাজকে যথাসময় হতে পিছিয়ে না দেওয়া।
সত্যপক্ষে, যার হিকমত আছে, সে অনেক কল্যাণের অধিকারী। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَن يَشَاء وَمَن يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا
অর্থাৎ, তিনি যাকে ইচ্ছা প্রজ্ঞা দান করেন, আর যাকে প্রজ্ঞা প্রদান করা হয়, তাকে নিশ্চয় প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়। ৩৪০
চরিত্রবান নারী-পুরুষ চলার পথে হিকমত অবলম্বন করে। মহান আল্লাহ দাওয়াতের পথে হিকমত অবলম্বন করতে বলেছেন,
ادْعُ إِلى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلُهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
অর্থাৎ, তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা কর উত্তম পদ্ধতিতে। ৩৪১
তবে শির্ক দেখে চুপ থাকা হিকমত নয়। অন্যায় দেখে মুখে কুলুপ দেওয়া অথবা অন্যায়ের সাথে আপোস করা হিকমত নয়। হিকমতের সাথে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, তাতে সক্ষম না হলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করা আবশ্যক।
শিশু ওষুধ আদরের সাথে না খেলে মেরেও খাওয়াতে হবে। কিন্তু মেরে ফেললে তো হবে না। তবে হিংস্র প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে সাবধানে।
'ধর্ম কথা প্রেমের বাণী জানি মহান উচ্চ খুব, কিন্তু সাপের দাঁত না ভেঙ্গে মন্ত্র ঝাড়ে যে বেকুব। ব্যাঘ্র সাহেব হিংসা ছাড়, পড়বে এসে বেদান্ত, কয় যদি ছাগ লাফ দিয়ে বাঘ অমনি হবে কৃতান্ত। থাকতে বাঘের দন্ত নখ বিফল ভাই ঐ প্রেম-সবক।'
ময়লা যদি ধুলে না যায়, মেজে-ঘসে পরিষ্কার করতে হবে। তাতেও না হলে আঘাত দিয়ে তা তুলতে হবে। ময়লা লোহার জং হলে না হয় হাতুড়ির আঘাত মারবেন, কিন্তু কাঁচের উপর হলে তা করতে পারেন না।
নীতিবান ও চরিত্রবান অন্ধকারকে গালি দেয় না। যেহেতু হিকমত হল, বাতি জ্বালিয়ে দেওয়া। গালি ও লাঠি কোনদিন দলীল-প্রমাণের কাজ করতে পারে না।
দুশমন যদি দুশমনি দিয়ে আপনার সম্মুখীন হয়, তাহলে আপনি হিকমত দিয়ে তার মোকাবিলা করুন। জেনে রাখুন, আবেগ ও জোশ দিয়ে নয়, বরং বিচক্ষণতা ও হুঁশ দিয়ে পরিস্থিতির সামাল দিতে হবে।
গরম গরম খেতে গেলে মুখ পুড়ে যায়, একটু ঠাণ্ডা হলে খেতে হয়। আগুন দিয়ে আগুন নিভানো যায় না। তার জন্য প্রয়োজন পানির।
জ্ঞানী হল সেই ব্যক্তি, যে তার দুটো রোগের মধ্যে যেটা বেশী মারাত্মক সেটার চিকিৎসা আগে করায়। একটি লোকের সর্দি, পায়খানা হওয়ার পর যদি তাকে সাপে কাটে, তাহলে ডাক্তার সাপে কাটার চিকিৎসাই আগে করবেন। একটি লোক পানিতে ডোবা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য যদি আপনার দিকে হাত বাড়ায় এবং তার হাতে সোনার আংটি থাকে, তাহলে সোনার আংটি ব্যবহার হারাম ফতোয়া দিয়ে সময় নষ্ট না ক'রে তাকে আগে হাত ধরে টেনে তুলে উদ্ধার করুন।
জানালা দিয়ে হাওয়া ঢুকে উড়ে যাওয়া কাগজগুলি তোলার আগে জানালাটা বন্ধ করুন।
যে ব্যক্তি দুটি পাখিকে এক সঙ্গে শিকার করতে চায়, সে দুটিকেই হারিয়ে বসে।
সাবধানী লোক কখনো তার সমস্ত ডিমগুলিকে একটি ধামাতে রাখে না।
মাথা ধরলে মাথার ব্যথা কীভাবে সারবে, সে ব্যবস্থা করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। মাথাটাকে কেটে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
অগ্নিশিখা গগন-চুম্বি হলে অগ্নিদমনকর্মীরা শিখার উপরে পানি ছড়ায় না। বরং অগ্নির উৎসস্থলে পানি ছড়ায়।
সুচরিত্রবানেরা নীতিবান হয়। তারাই পারে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে। মানুষকে চরিত্রবান বানাতে সুমহান চরিত্রের অধিকারীর একটি হিকমত লক্ষ্য করুন।
আবু উমামা বলেন, একদা এক যুবক আল্লাহর রসূল এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমাকে ব্যভিচার করার অনুমতি দিন!'
এ কথা শুনে লোকেরা তাকে ধমক দিয়ে বলল, 'থামো, থামো! (এ কী বলছ তুমি?)'
কিন্তু মহানবী তাকে বললেন, "আমার কাছে এসো।" সে তাঁর কাছে এসে বসলে তিনি তাঁকে বললেন, "তুমি কি নিজ মায়ের জন্য তা পছন্দ কর?"
সে বলল, 'না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করুন।'
তিনি বললেন, "তাহলে লোকেরাও তো তাদের মায়েদের জন্য তা পছন্দ করে না।"
অতঃপর তিনি বললেন, "তাহলে তুমি কি তোমার মেয়ের জন্য তা পছন্দ কর?"
সে বলল, 'না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করুন।'
তিনি বললেন, "তাহলে লোকেরাও তো তাদের মেয়েদের জন্য তা পছন্দ করে না।"
অতঃপর তিনি বললেন, "তাহলে তুমি কি তোমার বোনের জন্য তা পছন্দ কর?"
সে বলল, 'না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করুন।'
তিনি বললেন, "তাহলে লোকেরাও তো তাদের বোনেদের জন্য তা পছন্দ করে না।"
অতঃপর তিনি বললেন, "তাহলে তুমি কি তোমার ফুফুর জন্য তা পছন্দ কর?"
সে বলল, 'না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করুন।'
তিনি বললেন, "তাহলে লোকেরাও তো তাদের ফুফুদের জন্য তা পছন্দ করে না।"
অতঃপর তিনি বললেন, "তাহলে তুমি কি তোমার খালার জন্য তা পছন্দ কর?"
সে বলল, 'না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করুন।'
তিনি বললেন, "তাহলে লোকেরাও তো তাদের খালাদের জন্য তা পছন্দ করে না।"
অতঃপর তিনি তার বুকে হাত রাখলেন এবং তার জন্য দুআ ক'রে বললেন, হে আল্লাহ! তুমি ওর গোনাহ মাফ করে দাও, ওর হৃদয়কে পবিত্র করে দাও এবং ওকে ব্যভিচার থেকে রক্ষা কর।
বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর সেই যুবক আর ব্যভিচারের দিকে ভ্রূক্ষেপও করেনি। ৩৪২
টিকাঃ
৩৪০. সূরা বাক্বারাহ-২: ২৬৯
৩৪১. সূরা নাহল: ১২৫
৩৪২. আহমাদ ২২২১১, তাবারানীর কাবীর ৭৬৭৯, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৫৪১৫, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৭০