📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 সহমর্মিতা

📄 সহমর্মিতা


মহান চরিত্রের অধিকারী নর-নারী পরের কষ্টে কষ্ট পায়, পরের আনন্দে আনন্দিত হয়। আসলে মুসলিমরা তো একটি অট্টালিকার ইটসমূহের মতো। ঈমানী সিমেন্টের জোড়ায় একে অপরকে মজবুত ক'রে রাখে। মু'মিনরা একটি দেহের সকল অঙ্গের মতো। একটি বিকল হলে অন্যটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি ব্যথা পেলে সকল অঙ্গ সেই ব্যথাতে শরীক হয়। মহানবী বলেছেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ في تَوَادِّهِمْ وَتَرَاحُمِهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ ، مَثَلُ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ والحُمَّى
"মু'মিনদের আপোসের মধ্যে একে অপরের প্রতি সম্প্রীতি, দয়া ও মায়া-মমতার উদাহরণ (একটি) দেহের মতো। যখন দেহের কোন অঙ্গ পীড়িত হয়, তখন তার জন্য সারা দেহ অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।"৩২৫
যখনই শোনে, অমুক সফল হয়েছে অথবা অমুক চাকরি পেয়েছে অথবা অমুক প্রথম স্থান অধিকার করেছে, তখনই সে তার খুশীতে খুশী হয়।
আর যখনই সে শোনে, অমুক অসফল হয়েছে অথবা অমুকের চাকরি চলে গেছে অথবা অমুক ফেল করেছে, তখনই সে তার দুঃখে দুঃখিত হয়।
কেউ সফল হলে তাকে সাক্ষাৎ করে মোবারকবাদ ও বর্কতের দুআ দেয়। কেউ অসুস্থ হলে তাকে সাক্ষাৎ ক'রে সান্ত্বনা ও আরোগ্যের দুআ দেয়। সাধ্যে কুলালে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে।
কেউ বিপদগ্রস্ত হলে তাকে দেখা ক'রে সমবেদনা জানায়। কেউ মারা গেলে তার জানাযায় অংশগ্রহণ করে।
পক্ষান্তরে আত্মকেন্দ্রিক, হিংসুক ও পরশ্রীকাতর লোকের চরিত্র ঠিক এর বিপরীত। সে কারো সুখে খুশী হয় হয় না, পরন্তু দুঃখে সমব্যথী হয় না, খুশী হয়।
লোকে বলে, 'দয়া-মায়া এবং করুণা সহজেই লোহার ফটক দিয়ে প্রবেশ করে না।' এ কথা কোন সুচরিত্রবান মুসলিমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
সুতরাং মু'মিনের সমব্যথী হন, আপনার অর্থ দ্বারা, পদ ও মর্যাদা দ্বারা, দৈহিক খিদমত দ্বারা, সদুপদেশ ও সৎপরামর্শ দ্বারা, সান্ত্বনা ও দুআ দ্বারা। আর ঘায়ের উপর মলম লাগাতে না পারলে তাতে নুনের ছিটা দিয়ে কারো যন্ত্রণা বৃদ্ধি করবেন না।

টিকাঃ
৩২৫. বুখারী ৬০১১, মুসলিম ৬৭৫১

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 হিতাকাঙ্ক্ষিতা

📄 হিতাকাঙ্ক্ষিতা


মু'মিনরা ভাই-ভাই। একে অপরের কল্যাণকামী হয় সকলেই। একে অন্যের শুভানুধ্যায়ী হয় মুসলিম উম্মাহ। পরস্পর হিতাকাঙ্ক্ষী হয় চরিত্রবান সকল মানুষ। 'সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে'--- এই কথার প্রতি খেয়াল রেখে প্রত্যেক দ্বীনদারই প্রত্যেকের মঙ্গল আশা করে।
একদা নবী বললেন, "দ্বীন হল কল্যাণ কামনা করার নাম।" সাহাবাগণ বললেন, 'কার জন্য?' তিনি বললেন,
لِلهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ
"আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রসূলের জন্য, মুসলিমদের শাসকদের জন্য এবং মুসলিম জনসাধারণের জন্য। ৩২৬
জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ -এর নিকট স্বলাত কায়েম করা, যাকাত দেওয়া ও সকল মুসলমানের জন্য হিতাকাঙ্ক্ষী হওয়ার উপর বায়আত করেছি।' ৩২৭
চরিত্রবান সর্বদা পরের জন্য তাই পছন্দ করে, যা নিজের জন্য করে এবং নিজের জন্য যা পছন্দ করে না, তা পরের জন্যও করে না। যেহেতু এমন পছন্দ-অপছন্দ করাটা ঈমান পরিপূরক কর্ম। মহানবী বলেছেন,
لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
"ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেউ প্রকৃত ঈমানদার হবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।"৩২৮
'আপন ছাগল বেঁধে রাখি, পরের ছাগল হাততালি দি।'
'আপন বেলায় চাপন-চোপন, পরের বেলায় ঝুরঝুরে মাপন।'
'আপনার ছেলেটি খায় এতটি, বেড়ায় যেন ঠাকুরটি। পরের ছেলেটা খায় এতটা, বেড়ায় যেন বাঁদরটা।'
'আপনারটা ঢাকা থাক, পরেরটা বিকিয়ে যাক।'
'আপনার বেলায় আঁটিসাঁটি, পরের বেলায় দাঁত কপাটি।'
'আপনার বেলায় পাঁচ কড়ায় গণ্ডা, পরের বেলায় তিন কড়ায় গণ্ডা।'
'পরের ঘি পেলে, প্রদীপে দেয় ঢেলে।'
'পরের ছেলে পরমানন্দ, যত উচ্ছন্নে যায় তত আনন্দ।'
'পরের লেজে পা পড়লে তুলো পানা ঠেকে, নিজের লেজে পা পড়লে ক্যাঁক ক'রে ডাকে।'
কিন্তু না। প্রকৃত মুসলিম হতে হলে সুন্দর ও সৌজন্যমূলক ব্যবহার প্রদর্শন করতে হবে মানুষের সাথে। যা নিজের কাছে প্রিয়, জানতে হবে, তা অপরের কাছেও প্রিয় এবং যা নিজের কাছে অপ্রিয়, তা অপরের কাছেও অপ্রিয়। পরের ব্যাপারে ভাবতে হবে, সে যদি আমার জায়গায় হত, তাহলে আমি নিজের জন্য কী চাইতাম। একটি সুন্দর উপদেশে রাসূলুল্লাহ আবূ হুরাইরা কে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন,
اتَّقِ الْمَحَارِمَ تَكُنْ أَعْبَدَ النَّاسِ وَارْضَ بِمَا قَسَمَ اللَّهُ لَكَ تَكُنْ أَغْنَى النَّاسِ وَأَحْسِنُ إِلَى جَارِكَ تَكُنْ مُؤْمِنًا وَأَحِبَّ لِلنَّاسِ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ تَكُنْ مُسْلِمًا وَلَا تُكْثِرُ الضَّحِكَ فَإِنَّ كَثْرَةَ الضَّحِكِ تُمِيتُ الْقَلْبَ
"নিষিদ্ধ ও হারাম জিনিস থেকে বেঁচে থাক, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সব চেয়ে বড় আ'বেদ (ইবাদতকারী) গণ্য হবে। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন, তাতেই পরিতুষ্ট থাক, তবে তুমিই মানুষের মধ্যে সব চেয়ে বড় ধনী হবে। প্রতিবেশীর প্রতি অনুগ্রহ কর, তাহলে তুমি একজন (খাঁটি) মু'মিন বিবেচিত হবে। মানুষের জন্যও তা-ই পছন্দ কর, যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ কর, তাহলে তুমি একজন (খাঁটি) মুসলিম গণ্য হবে। আর খুব বেশী হাসবে না, কারণ, অধিক হাসি অন্তরকে মেরে ফেলে।"৩২৯
আমি চাই, লোকে আমাকে শ্রদ্ধা করুক, তাহলে আমার উচিত, লোককে শ্রদ্ধা করা।
আমি চাই, লোকে আমাকে অসম্মান না করুক, তাহলে আমার উচিত, লোককে অসম্মান না করা।
আমি চাই, লোকে আমাকে ভালোবাসুক, তাহলে আমার উচিত, লোককে ভালোবাসা।
আমি চাই, লোকে আমাকে ঘৃণা না করুক, তাহলে আমার উচিত, লোককে ঘৃণা না করা।
আমি চাই, আমার মেয়ের বিয়ে বিনা পণে হোক, তাহলে আমার উচিত, পণ না নিয়ে আমার ছেলের বিয়ে দেওয়া।
আমি চাই, আমার মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে সুখে থাক, তাহলে আমার উচিত, আমার বউমাকে সুখে রাখা।
এইভাবে প্রত্যেক কাজে পরের অসুবিধা বুঝে, তাকে নিজের জায়গায় রেখে বিচার ও ব্যবহার প্রদর্শন করতে হয় চরিত্রবানকে। মহানবী বলেছেন,
مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُزَحْزَحَ عَنِ النَّارِ وَيَدْخُلَ الْجَنَّةَ فَلْتَأْتِهِ مَنِيَّتُهُ وَهُوَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَأْتِ إِلَى النَّاسِ الَّذِي يُحِبُّ أَنْ يُؤْتَى إِلَيْهِ
"যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, সে দোযখ থেকে নিস্তার লাভ করে জান্নাতে প্রবেশ করবে সে ব্যক্তির জন্য উচিত, যেন তার মৃত্যু তার কাছে সেই সময় আসে, যে সময় সে আল্লাহতে ও পরকালে ঈমান রাখে। আর লোকেদের সাথে সেইরূপ ব্যবহার করে যেরূপ ব্যবহার সে নিজের জন্য পছন্দ করে।"৩৩০
'নিজ প্রতি ব্যবহার আশা কর যে প্রকার, করহ পরের প্রতি সেই ব্যবহার।'

টিকাঃ
৩২৬. মুসলিম ২০৫
৩২৭. বুখারী ৫৭, মুসলিম ২০৮
৩২৮. বুখারী ১৩, মুসলিম ৪৫, ইবনে হিব্বান ২৩৫
৩২৯. আহমাদ ৮০৯৫, তিরমিযী ২৩০৫, সহীহুল জামে ৪৫৮০, ৭৮৩৩
৩৩০. মুসলিম ৪৮৮২

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 পরস্পর উপদেশ বিনিময়

📄 পরস্পর উপদেশ বিনিময়


মু'মিন মু'মিনের ভাই। মু'মিনা মু'মিনার বোন। তারা একে অন্যের জন্য আয়না স্বরূপ। একে অন্যের ত্রুটি সংশোধনে প্রয়াসী হয়। একে অপরের সুখে সুখানুভব করে। একে অন্যের কষ্টে কষ্টানুভব করে। বিপদে সান্ত্বনা দেয় ও ধৈর্যের তাকীদ দান করে এবং একে অন্যকে সত্যের পরামর্শ দেয়, হকের অসিয়ত করে, উপকারী উপদেশ দান করে।
সারা বিশ্বের সকল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও উক্ত শ্রেণীর চরিত্রবান নারী-পুরুষ বড় লাভবান থাকে।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَالْعَصْرِ، إِنَّ الإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ ، إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ
অর্থাৎ, মহাকালের শপথ। মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয়। আর উপদেশ দেয় ধৈর্য ধারণের। ৩৩১
ঈমানচোর পকেটমারের অভাব নেই দুনিয়াতে। যাদেরকে নিয়ে শয়তানের বাজার বড় সরগরম। ভ্রষ্টকারী ফিতনা যেন পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের ন্যায় সারা পৃথিবীকে গ্রাস ক'রে রেখেছে। হক-বাতিলের বিভ্রাটে পড়ে মুসলিম সরল পথচ্যুত হচ্ছে। সুশোভনকারী বাতিলের চমকে পথিকের পথ ভুল হয়ে যাচ্ছে। এই সময় সুচরিত্রবান বন্ধু হকপথ প্রদর্শন ক'রে বন্ধুকে ফিতনা থেকে রক্ষা করে। বিশেষ উপদেশ দিয়ে তাকে ভ্রষ্টতার পথে যেতে বাধা দেয়।
বিপদ যখন ঘনিয়ে আসে। মহান প্রতিপালকের পরীক্ষা যখন মু'মিনকে পরীক্ষা করতে চায়।
আপন যখন পর হয়ে যায়।
শয্যাসঙ্গিনী স্ত্রী যখন শত্রুতে পরিণত হয়।
জীবন-যৌবনের অধিকারী স্বামী যখন ভালোবাসার বাঁধনহারা হয়।
সন্তান ও আপনজন যখন স্বার্থের তরে দূরে সরে যায়।
অত্যাচারীর অত্যাচারের চাবুক যখন উন্মুক্ত পিঠে বারবার আঘাত হানে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দিয়ে যখন ধনজন সহায়-সম্বল সব কিছু কেড়ে নেয়।
ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যখন মানুষ দেউলিয়া হয়ে যায়।
ঋণে জর্জরিত হয়ে যখন খালি থলের মতো উঠে দাঁড়াতে পারে না।
শারীরিক অসুস্থতা ও রোগ-যন্ত্রণায় যখন জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
মানসিক পীড়া ও প্রতিকূল পরিবেশের পীড়ন যখন পিষ্ট করে।
রাজনৈতিক কোন ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত হয়ে যখন অন্যায়ভাবে শাস্তিভোগ করতে হয়।
হিংসুকের হিংসা-বিষ যখন জীবন-যন্ত্রণা বৃদ্ধি করে।
জীবন-তরীর বিপরীত মুখে যখন সমুদ্রবায়ু প্রবাহিত হয়।
তখন মহান প্রভুর আশ্রয় ছাড়া আর কী থাকতে পারে? অতঃপর একজন চরিত্রবান নিঃস্বার্থ বন্ধু ছাড়া এহেন দুঃখে-শোকে আর কে সান্ত্বনা দিতে পারে? যে বন্ধু পাশে বসে সাহস দেয়, দূরে থেকে প্রবোধ দান করে, এস-এম-এস ক'রে শান্তির বাণী প্রেরণ করে।
যে বন্ধুর উৎসাহদানে মৃত্যুশয্যায় শায়িত থেকেও নতুন ক'রে বাঁচার ইচ্ছা জেগে ওঠে।
লতার মতো ছুঁয়ে গড়াগড়ি খেয়ে যে বন্ধুর অবলম্বন পেয়ে পুনরায় উঠে দাঁড়াতে সাহস হয়।
এমন বন্ধু কোন আর্থিক সাহায্য না করতে পারলেও, মানসিক সহযোগিতা কম কিছু নয়।
হকের অসিয়ত, ধৈর্যের অসিয়ত। সৎভাবে বাঁচার প্রেরণা।

টিকাঃ
৩৩১. সূরা আস্র

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসা ও ঘৃণা করা

📄 আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসা ও ঘৃণা করা


সুচরিত্রবান মানুষের একটি মহৎ গুণ হল, সে কাউকে বা কোন কিছুকে ভালোবাসে, তখন কেবল মহান আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসে, তাঁর সন্তুষ্টি লাভের আশায় ভালোবাসে, আর যখন কাউকে বা কোন কিছুকে ঘৃণা করে, তখন কেবল মহান আল্লাহকেই রাজি-খুশী করার জন্যই ঘৃণা করে।
যখন কাউকে ভালোবাসে, তখন এই জন্য ভালোবাসে যে, তাকে মহান আল্লাহ ভালোবাসেন অথবা সে মহান আল্লাহকে ভালোবাসে। আর যখন কাউকে ঘৃণা করে, তখন এই জন্য ঘৃণা করে যে, মহান আল্লাহ তাকে ঘৃণা করেন অথবা সে মহান আল্লাহকে ঘৃণা করে।
যখন কোন জিনিস বা কাজকে ভালোবাসে, তখন এই জন্য ভালোবাসে যে, তা মহান আল্লাহ ভালোবাসেন। আর যখন কোন জিনিস বা কাজকে ঘৃণা করে, তখন এই জন্য ঘৃণা করে যে, মহান আল্লাহ তা ঘৃণা করেন।
কারণ এ হল ঈমান পরিপূর্ণতার লক্ষণ, পূর্ণ ঈমানদার মানুষের কর্ম। মহানবী বলেছেন,
مَنْ أَعْطَى اللَّهِ وَمَنَعَ اللَّهِ وَأَحَبَّ اللَّهِ وَأَبْغَضَ اللَّهِ وَأَنْكَحَ لِلَّهِ فَقَدْ اسْتَكْمَلَ إِيمَانَهُ
"যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে কিছু দান করে, কিছু দেওয়া হতে বিরত থাকে, কাউকে ভালোবাসে অথবা ঘৃণাবাসে এবং তাঁরই সন্তুষ্টিলাভের কথা খেয়াল করে বিবাহ দেয়, তার ঈমান পূর্ণাঙ্গ ঈমান।"৩৩২
ঈমানের বন্ধন আত্মীয়তার বন্ধনের অনেক ঊর্ধ্বে। আত্মীয়তাকেও বিচার করতে হবে ঈমানের কষ্টিপাথরে। যে আত্মীয় আল্লাহকে চায় না, সে আত্মীয়কে মু'মিন চাইতে পারে না। তাই এমন সম্প্রীতি ও বিদ্বেষ কায়েম করার কাজ হল ঈমানের মজবুত হাতল। মহানবী বলেছেন,
أوثَقُ عُرَى الإِيمَانِ الْمُوَالاةُ فِي اللهِ، وَالْمُعَادَاةُ فِي اللهِ، وَالْحُبُّ فِي اللهِ، وَالْبُغْضُ فِي اللهِ
ঈমানের সবচাইতে মজবুত হাতল হল, আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্ব স্থাপন করা, আল্লাহর ওয়াস্তে শত্রুতা স্থাপন করা, আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসা রাখা এবং আল্লাহরই ওয়াস্তে ঘৃণা পোষণ করা।"৩৩৩
দুর্বলতম ঈমানের দাবী হল মন্দকে মন্দ জানা, মন্দকে ঘৃণা করা, মন্দের প্রতিবাদ করা। মন্দ দূর করার এটাও এক পদ্ধতি। তা না ক'রে যদি 'এক হাতে মোর কোরান শরীফ মদের গ্লাস অন্য হাতে, পুণ্য-পাপের সৎ-অসতের দোস্তি সমান আমার সাথে।' এই রীতি হয়, তাহলে তার ঈমান যে বর্তমান আছে, তার নিশ্চয়তা কোথায়? মহানবী বলেছেন,
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرُهُ بِيَدِهِ ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দেয়। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ জিভ দ্বারা (উপদেশ দিয়ে পরিবর্তন করে)। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তর দ্বারা (ঘৃণা করে)। আর এ হল সবচেয়ে দুর্বল ঈমান।"৩৩৪
তিনি আরো বলেছেন,
مَا مِنْ نَبِي بَعَثَهُ اللهُ فِي أُمَّةٍ قَبْلِي إِلَّا كَانَ لَهُ مِنْ أُمَّتِهِ حَوَارِيُّونَ وَأَصْحَابٌ يَأْخُذُونَ بِسُنَّتِهِ وَيَقْتَدُونَ بِأَمْرِهِ ثُمَّ إِنَّهَا تَخْلُفُ مِنْ بَعْدِهِمْ خُلُوفٌ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ وَيَفْعَلُونَ مَا لَا يُؤْمَرُونَ فَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِيَدِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِلِسَانِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِقَلْبِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَيْسَ وَرَاءَ ذَلِكَ مِنَ الْإِيمَانِ حَبَّةُ خَرْدَلٍ
"আমার পূর্বে আল্লাহ যে কোন নবীকে যে কোন উম্মতের মাঝে পাঠিয়েছেন তাদের মধ্যে তাঁর (কিছু) সহযোগী ও সহচর হতো। তারা তাঁর সুন্নতের উপর আমল করত এবং তাঁর আদেশের অনুসরণ করত। অতঃপর তাদের পরে এমন অপদার্থ লোক সৃষ্টি হয় যে, তারা যা বলে, তা করে না এবং তারা তা করে, যার আদেশ তাদেরকে দেওয়া হয় না। সুতরাং যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে নিজ হাত দ্বারা সংগ্রাম করবে সে মু'মিন, যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে নিজ জিভ দ্বারা সংগ্রাম করবে সে মু'মিন এবং যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে নিজ অন্তর দ্বারা জিহাদ করবে সে মু'মিন। আর এর পর সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান নেই।"৩৩৫
বলা বাহুল্য, বন্ধুত্ব করা ও বজায় রাখার ক্ষেত্রে, জীবন-সাথী এখতিয়ার ও দাম্পত্য বন্ধন অটুট রাখার ক্ষেত্রে এবং আত্মীয়তার বন্ধন মজবুত করার ক্ষেত্রে চরিত্রবান যদি এই নীতি অবলম্বন করে, তাহলে সে সুখী হয়, দুনিয়াতে ও আখেরাতে।
সতর্কতার বিষয় যে, যদি কোন নারী-পুরুষের ভালোবাসা আল্লাহর ওয়াস্তে হয়, কিন্তু তা প্রকাশ করা অবৈধ হয়, তাহলে তা গোপন রাখাই ওয়াজেব। যাতে অন্তর ছাপিয়ে বের হয়ে এসে অপবিত্রতার নর্দমায় পড়ে তিনিই অসন্তুষ্ট হয়ে না যান, যাঁর ওয়াস্তে সেই ভালোবাসার সৃষ্টি।

টিকাঃ
৩৩৩. ত্বাবারানী ১১৩৭২, সিলসিলাহ সহীহাহ ৯৯৮, ১৭২৮
৩৩৪. আহমাদ ১১০৭৪, মুসলিম ১৮-৬, আসহাবে সুনান
৩৩৫. মুসলিম ১৮৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00