📄 সমালোচককে উপেক্ষা
চরিত্রবান নর-নারী নিন্দুকের নিন্দা ও সমালোচকের সমালোচনাকে উপেক্ষা করে। যখন সে জানে যে, সে হক পথে প্রতিষ্ঠিত, তখন কোন রটনায় সে কান দেয় না। অটল ও অবিচল থেকে নিজ হক পথে চলমান থাকে। যেহেতু এ হল মহান স্রষ্টার নির্দেশ।
তিনি নিজ প্রেরিত নবী ﷺ কে শিক্ষা দিয়েছেন, কীভাবে বিরোধীদেরকে উপেক্ষা করবেন। সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ বসবাস করে। সেখানে থাকে কাফের, মুনাফিক, মুশরিক ও অজ্ঞ-মূর্খ। এদের প্রত্যেকের সাথে একই আচরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; উপেক্ষা কর, তর্কে যেয়ো না, সংঘাতে যেয়ো না, মনমরা হয়ো না, কষ্ট নিয়ো না।
তিনি মুশরিকদের ব্যাপারে তাঁকে বলেছেন,
اتَّبِعْ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ
"তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ হয়, তুমি তারই অনুসরণ কর, তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। আর অংশীবাদীদের থেকে বিমুখ থাক।”২৯৬
فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ
"তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছ, তা প্রকাশ্যে প্রচার কর এবং অংশীবাদীদেরকে উপেক্ষা কর।”২৯৭
অর্থাৎ, তারা যদি তোমাকে মিথ্যায়ন করে, তোমার কথায় অবিশ্বাস করে, তাহলে তুমি কোন পরোয়া করো না, তোমার কোন ক্ষতি হবে না। তারা যদি তোমাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে, তাহলে তাদেরকে উপেক্ষা কর, মন খারাপ করো না, দুঃখ নিয়ো না। যেহেতু মহান প্রতিপালক তোমার সাথে আছেন।
কাফের, নাস্তিক ও কেবল পার্থিব জীবনে বিশ্বাসীদের ব্যাপারে তাঁকে সতর্ক ক'রে মহান আল্লাহ বলেছেন,
فَأَعْرِضْ عَن مَّن تَوَلَّى عَن ذِكْرِنَا وَلَمْ يُرِدْ إِلَّا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا - ذَلِكَ مَبْلَغُهُم مِّنَ الْعِلْمِ
"অতএব তাকে উপেক্ষা ক'রে চল, যে আমার স্মরণে বিমুখ এবং যে শুধু পার্থিব জীবনই কামনা করে। তাদের জ্ঞানের দৌড় এই পর্যন্ত।”২৯৮
তারা যত বড়ই শিক্ষিত হোক, যত বড়ই বিজ্ঞানী হোক, তাদের শিক্ষা ও জ্ঞান কেবল পার্থিব জীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ
"ওরা পার্থিব জীবনের বাহ্য দিক সম্বন্ধে অবগত, অথচ পারলৌকিক জীবন সম্বন্ধে ওরা উদাসীন।”২৯৯
সুতরাং তারা তাদের কৃতকর্মের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে পরকালে। আর তাদের অবিশ্বাস তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
মুনাফিকদের ব্যাপারেও সতর্ক ক'রে তিনি তাঁকে বলেছেন, "তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা ধারণা (ও দাবী) করে যে, তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাতে তারা বিশ্বাস করে? অথচ তারা তাগূতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়; যদিও তা প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়। তাদেরকে যখন বলা হয়, 'আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে এবং রসূলের দিকে এস।' তখন তুমি মুনাফিক (কপট) দেরকে তোমার নিকট থেকে মুখ একেবারে ফিরিয়ে নিতে দেখবে। সুতরাং তাদের কৃত অপরাধের পরিণামে যখন তাদের উপর কোন বিপদ এসে পড়বে, তখন তাদের কী অবস্থা হবে? অতঃপর তারা তোমার নিকট এসে আল্লাহর শপথ ক'রে বলবে, 'আমরা কল্যাণ এবং সম্প্রীতি ব্যতীত অন্য কিছুই চাইনি।" মহান আল্লাহ বলেন,
أُولَئِكَ الَّذِينَ يَعْلَمُ الله مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِي أَنفُسِهِمْ قَوْلاً بَلِيغًا
"এরাই তো তারা, যাদের অন্তরে কী আছে, আল্লাহ তা জানেন। সুতরাং তুমি তাদেরকে উপেক্ষা কর, তাদেরকে সদুপদেশ দাও এবং তাদেরকে তাদের সম্বন্ধে মর্মস্পর্শী কথা বল।"৩০০
কারণ তারা তো সমাজেরই লোক। তারা মুসলিম নাম নিয়ে মুসলিম সমাজে বসবাস করে। মুসলিমদের মসজিদ ও ঈদগাহে জুমআহ ও ঈদ পড়তে আসে। তাদের বিরুদ্ধে মুসলিম সরকারও কোন ব্যবস্থা নিতে পারে না। সুতরাং তাদের দুর্ব্যবহারে সহ্য ছাড়া আর কী করার থাকতে পারে? উপেক্ষা করা ছাড়া আর কীসের অপেক্ষা করা যেতে পারে?
وَيَقُولُونَ طَاعَةٌ فَإِذَا بَرَزُوا مِنْ عِندِكَ بَيَّتَ طَائِفَةٌ مِّنْهُمْ غَيْرَ الَّذِي تَقُولُ وَالله يَكْتُبُ مَا يُبَيِّتُونَ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهُ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلاً
"আর তারা বলে, (আমাদের কর্তব্য) আনুগত্য। অতঃপর যখন তারা তোমার নিকট থেকে চলে যায়, তখন রাত্রে তাদের একদল তারা যা বলে (বা তুমি যা বল) তার বিপরীত পরামর্শ করে। তারা রাত্রে যা পরামর্শ করে আল্লাহ তা লিপিবদ্ধ করে রাখেন। সুতরাং তুমি তাদের উপেক্ষা কর এবং আল্লাহর প্রতি ভরসা কর। আর কর্ম-বিধানে আল্লাহই যথেষ্ট।"৩০১
অজ্ঞ ও জাহেল লোকেরাও অনেক কিছু বলে থাকে। নবী ও তাঁর ওয়ারেসগণকে তাও উপেক্ষা ক'রে চলতে হয়। মহান আল্লাহর নির্দেশ হল,
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ
"তুমি ক্ষমাশীলতার নীতি অবলম্বন কর, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খদেরকে এড়িয়ে চল।”৩০২
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
"তারাই পরম দয়াময়ের দাস, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, 'সালাম'।"৩০৩
নীচ ও হীন মনের মানুষরা বড় মানুষদের ত্রুটি খুঁজে পেয়ে তার সমালোচনায় লিপ্ত হয়ে প্রচুর আনন্দ পায়। কিন্তু একজন মূর্খ একজন জ্ঞানীর সমালোচনা করলে উপেক্ষা ছাড়া পথ কী? তর্কে মূর্খের কাছে জেতা যাবে না, গালাগালিতে মূর্খই প্রথম স্থান অধিকার করবে, ব্যবহারে সে ছোটলোককেও হার মানাবে। অবশ্য অন্য জ্ঞানীরাও তা অনুভব করে এবং মূর্খের মূর্খামি দেখে হাস্য করে। এই জন্যই 'নীচ যদি উচ্চ ভাষে, সুবুদ্ধি উড়ায় হাসে।'
কিন্তু নীচ ও মূর্খ লোক জ্ঞানীর বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে নিজের মূর্খতা ও বোকামিকে আরো প্রসিদ্ধ করে।
'পেঁচা রাষ্ট্র করি দেয় পেলে কোন ছুতা, জান না আমার সাথে সূর্যের শত্রুতা?'
বোকার সাথে তর্কে জড়ালে নিজেকে বোকা সাজানো হয়। তাই আরবী কবি বলেছেন,
إذا نطق السفيه فلا تجبه * فخير من إجابته السكوت
অর্থাৎ, কোন নির্বোধ কথা বললে তার জবাব দেবে না। কারণ তাকে জবাব দেওয়ার চাইতে চুপ থাকা উত্তম।
তার মানে এই নয় যে, সমালোচনার ভয়ে আমি আমার কর্তব্যে পিছপা থাকব, নিন্দার ভয়ে আমি কাজ করাই ছেড়ে দেব। আর তাহলে তো ক্ষান্ত বুড়ির দিদি-শাশুড়ীর পাঁচ বোনের মতো অবস্থা হবে। 'পাছে কোন দোষ ধরে নিন্দুকে নিজে থাকে তারা লোহা-সিন্দুকে!' আর সেটা কি সম্ভব? সেটা কি গতিশীল জীবন?
চরিত্রবান নর-নারী জানে, সামাজিক কোন কাজ না করলে সমালোচনার পাত্র হতে হয় না। যত বেশি লক্ষ্য-সিদ্ধির পথে এগোবেন, ততই সমালোচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। মনে হয় সাফল্য ও সমালোচনার মাঝে একটি যোগসূত্র আছে। সাফল্য যত বেশি, সমালোচনাও তত বেশি।
উচিত বলার জন্য আমাদের সৎ সাহস থাকা দরকার। মানুষকে ভয় করা আমাদের উচিত নয়। অপরে আমাদের সম্পর্কে কী ভাবে, সে কথাও চিন্তা করা উচিত নয়। আমাদের উদ্দেশ্য সৎ হলে আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন।
আমাদের মনে রাখা উচিত, বিশাল সমুদ্রে রাখালে পাথর মারলে সমুদ্রের কী যায় আসে? উজ্জ্বল নক্ষত্রে ঢিল মারলে, সে ঢিল কি তার গায়ে লাগে? জ্ঞানীর মানহানির জন্য অজ্ঞানীর কুমন্তব্য নিতান্ত অসার। তাতে জ্ঞানীর কিছু আসে যায় না।
সুফিয়ান সওরী বলেন, 'যে নিজেকে চিনেছে, তার সম্বন্ধে লোকের সমালোচনা কোন ক্ষতি করতে পারে না।'
বড় সুখী তারা, যারা লোকেদের সমালোচনা উপেক্ষা ক'রে চলে। গুরুত্ব না দিয়ে ক্ষোভ না ক'রে নিন্দুকের নিন্দাকে তুচ্ছজ্ঞান করে।
কবি বলেছেন, 'যদি কোন ছোট লোক বড় কথা কয় হে, বড় কথা কয়, মহতের ক্রোধ করা কভু ভালো নয় হে, কভু ভালো নয়। মৃগেন্দ্র মেঘের নাদে প্রতিনাদ করে হে, প্রতিনাদ করে, লক্ষ্য নাহি করে যদি ফেরু ডেকে মরে হে, ফেরু ডেকে মরে।'
একটি গল্প প্রসিদ্ধ আছে, একদা লোকমান হাকীম তাঁর পুত্র সহ একটি গাধার পিঠে চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে কতক লোক বলতে লাগল, 'লোকটা কত নিষ্ঠুর! একটি গাধার পিঠে দু' দু'টো লোক।' এ কথা শুনে হাকীম নেমে হাঁটতে লাগলেন। কিছু দূর পরে আরো কিছু লোক তাঁদেরকে দেখে বলে উঠল, 'ছেলেটি কত বড় বেআদব! বুড়োটাকে হাঁটিয়ে নিজে সওয়ার হয়ে যাচ্ছে।' এ কথা শুনে ছেলেটি নেমে এল এবং হাকীম সওয়ার হলেন। আরো কিছু দূর পর কিছু লোক বলতে লাগল, 'বুড়োটির কী আক্কেল! নিজে গাধার পিঠে চড়ে ছেলেটিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।' এ কথা শুনে তিনিও গাধার পিঠ থেকে নেমে হাঁটতে লাগলেন। কিছু পরে আরো কিছু লোক সমালোচনার সুরে বলল, 'লোক দু'টো কী বোকা! সঙ্গে সওয়ার থাকতে পায়ে হেঁটে পথ চলছে!' এ বারে হাকীম তাঁর ছেলেকে বললেন, 'দেখলে বাবা! তুমি চাপলেও দোষ, আমি চাপলেও দোষ, দু'জনে চড়লেও দোষ, কেউ না চড়লেও দোষ। সুতরাং তুমি কারো কথায় কর্ণপাত করো না।' কারণ, লোকের খোঁটা থেকে বাঁচা কঠিন। নিজের বিবেকে সঠিক কাজ ক'রে যাওয়া উচিত। 'হাথী চলতা রহেগা, কুত্তা হুঁক্তা রহেগা।'
মহান ব্যক্তিত্বের মহানতার আন্দাজ তখনই হয়, যখন দেখা যায় যে, তিনি তাঁর সমালোচকদেরকে খুশী মনে ক্ষমা ক'রে দিচ্ছেন এবং সত্যই কোন ভুল থাকলে তা সংশোধন ক'রে নিচ্ছেন। মহান তিনিই, যিনি তাঁর সমালোচককে সাদর সম্ভাষণ জানান, যিনি তাঁর সমালোচককে উপকারী বিবেচনা করেন।
একজন মহান চিত্তের সমালোচিত কবি লিখেছেন, 'নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো, যুগ-জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরে আলো। সবাই মোরে ছাড়তে পারে, বন্ধু যারা আছে, নিন্দুক সে ছায়ার মতো থাকবে পাছে পাছে। বিশ্বজনে নিঃস্ব ক'রে পবিত্রতা আনে, সাধকজনে নিস্তারিতে তার মতো কে জানে? বিনামূল্যে ময়লা ধুয়ে করে পরিষ্কার, বিশ্ব মাঝে এমন দয়াল মিলবে কোথা আর? নিন্দুক সে বেঁচে থাকুক বিশ্ব হিতের তরে, আমার আশা পূর্ণ হবে তাহার কৃপা ভরে।'
টিকাঃ
২৯৬. সূরা আনআম: ১০৬
২৯৭. সূরা হিজর: ৯৪
২৯৮. সূরা নাজম: ২৯-৩০
২৯৯. সূরা রূম: ৭
৩০০. সূরা নিসা: ৬০-৬৩
৩০১. সূরা নিসা: ৮১
৩০২. সূরা আ'রাফ: ১৯৯
৩০৩. সূরা ফুরক্বান: ৬৩
📄 আত্মসমালোচনা
প্রত্যেক মানুষের ভিতরে আত্মসমালোচনা, আত্মবিচার ও আত্মশুদ্ধি থাকা উচিত সচ্চরিত্রতার অধিকারী হওয়ার জন্য। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক যে, আগামীকালের (কিয়ামতের) জন্য সে কি অগ্রিম পাঠিয়েছে। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।"৩০৪
তিনি আত্মশুদ্ধির প্রতি উদ্বুদ্ধ ক'রে বলেছেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَاهَا - وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا
"সে সফলকাম হবে, যে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করবে এবং সে ব্যর্থ হবে, যে তাকে কলুষিত করবে।"৩০৫
উমার বিন খাত্ত্বাব বলেছেন, "(মরণের পর) তোমাদের হিসাব নেওয়ার পূর্বে তোমরা নিজেদের হিসাব নাও। তোমাদের আমল ওজন করার পূর্বে তোমরা নিজেরা ওজন ক'রে দেখে নাও। কারণ যে ব্যক্তি দুনিয়ায় নিজের হিসাব নিজে নেবে, তার জন্য কিয়ামতের হিসাব হাল্কা হয়ে যাবে। যেদিন তোমাদেরকে পেশ করা হবে এবং তোমাদের কিছুই গোপন থাকবে না, সেদিনকার জন্য তোমরা সুসজ্জিত হও।"৩০৬
মাইমূন বিন মিহরান বলেছেন, 'বান্দা পরহেযগার হতে পারে না, যতক্ষণ না সে নিজের হিসাব গ্রহণ করেছে; যেমন সে তার শরীকের হিসাব গ্রহণ ক'রে থাকে, তার খাদ্য কোথা হতে আসছে, তার পোশাক কোথা হতে পাচ্ছে?৩০৭
মানুষ আত্মসমীক্ষা করলে পাপাচারিতা, অতি বিলাসিতা ও আত্মমুগ্ধতা থেকে বিরত থাকতে পারবে। আর তা হলেই সে সহজে চরিত্রবান ও ভদ্র মানুষ হয়ে প্রতিষ্ঠালাভ করবে সমাজে।
আত্মবিচার করলে মানুষ নিজ মনে মহান আল্লাহর তা'যীম অনুভব করবে এবং পরকাল সম্বন্ধে উদাসীনতা দূরীভূত হবে। আর তা হলেই সে অনায়াসে সদাচারী হয়ে বিকাশ লাভ করবে।
যে ব্যক্তি পরের ছিদ্র অন্বেষণ করা থেকে বিরত থাকবে, সে ব্যক্তি নিজের ছিদ্র সংশোধনে প্রয়াসী হবে। আর যে নিজের ছিদ্র অন্বেষণ করবে, সে পরের ছিদ্র অন্বেষণ করতে পারবে না। আর সেই হবে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী।
যে ব্যক্তি পরকে ছেড়ে নিজের দোষ গণনা করায় ব্যাপৃত হয়, সেই হয় মানুষের মতো মানুষ।
জ্ঞানী মানুষ নিজেকে চিনতে চেষ্টা করে। কিন্তু নিজেকে চেনা আসলেই কঠিন কাজ।
যে মানুষ চেনে, সে বড় বুদ্ধিমান। কিন্তু যে নিজেকে চেনে, সে সবথেকে বড় বুদ্ধিমান।
মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝগড়া করে নিজের সাথে। জ্ঞানী মানুষ নিজের মনকেই অধিক শাসিয়ে থাকে। আর যে মানুষ নিজ মনের বিরুদ্ধে লড়াই করে, সেই হল উল্লেখযোগ্য মানুষ। সেই হল সর্বশ্রেষ্ঠ মুজাহিদ। মহানবী বলেছেন,
أَفضَلُ الجِهَادِ أَن يُجَاهِدَ الرَّجُلُ نَفْسَهُ وَهَوَاهُ
“স্বীয় আত্মা ও কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ হল মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ।”৩০৮
সুতরাং যে ব্যক্তি নিজের সমালোচনা করতে পারে, সেই সর্বাপেক্ষা বেশী বুদ্ধিমান।
তাই চরিত্রবানের উচিত, লোকে যখন তার বাহ্যিক গুণগ্রাম দেখে প্রশংসা করবে, তখন নিজের আভ্যন্তরীণ ত্রুটি অন্বেষণ ও বিচার করা। যাতে সে তার নিজের গোপন ত্রুটি সংশোধন ক'রে নিজের আত্মার কাছে বিশ্বস্ত হতে পারে। আর তা লোকের ঐ প্রশংসা থেকে বহুগুণ উত্তম।
আমরা জেনেছি, যে স্ত্রীর কাছে ভালো, সে সবার চাইতে ভালো। কারণ সে তার গোপন অনেক তথ্য সম্বন্ধে অন্যান্যের তুলনায় বেশি অবহিতা। আর যে ভালো স্ত্রীর কাছে চরিত্রবান, তার চাইতেও বেশি বড় চরিত্রবান সেই ব্যক্তি, যে নিজের সুস্থ বিবেকের বিচারে চরিত্রবান। কারণ 'মনে জানে পাপ, আর মায়ে জানে বাপ।'
টিকাঃ
৩০৪. সূরা হাশর: ১৮
৩০৫. সূরা শামস: ৯-১০
৩০৬. তিরমিযী ২৪৫৯, ইবনে আবী শাইবা ৩৪৪৫৯
৩০৭. তিরমিযী ২৪৫৯
৩০৮. ইবনে নাজ্জার, সঃ জামে' ১০১৯
📄 আমানত আদায় করা
আমানত আদায় করা মু'মিনের দায়িত্ব এবং আমানতে খিয়ানত করা মুনাফিকের লক্ষণ। এই জন্য চরিত্রবান মু'মিন আমানত আদায় করে এবং সে সেই ব্যক্তিরও খিয়ানত করে না, যে তার খিয়ানত করেছে। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
أَدَّ الأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ وَلَا تَحْنُ مَنْ خَانَكَ
"যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে, তার আমানত তাকে ফেরৎ দাও এবং যে তোমার খিয়ানত করেছে, তুমি তার খিয়ানত করো না।"৩০৯
আর যেহেতু আমানত আদায় করা সচ্চরিত্রতার একটি মহৎ গুণ, যে গুণে গুণান্বিত হলে আল্লাহ ও তাঁর রসূল এর ভালোবাসা পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ أَنْ يَحِبَّكُمُ اللهُ وَرَسُولُهُ فَحَافِظُوا عَلَى ثَلاثَ خِصَالٍ : صِدْقُ الْحَدِيثِ ، وَأَدَاءُ الأَمَانَةِ ، وَحُسْنُ الجَوَارِ
"যদি তোমরা পছন্দ কর যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূল তোমাদেরকে ভালবাসুন, তাহলে তিনটি গুণের হিফাযত কর; ১। সত্য কথা বলা, ২। আমানত আদায় করা এবং ৩। প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করা। "৩১০
বলা বাহুল্য, চরিত্রবান মুসলিম সেই আমানতে খিয়ানত করে না, যা তার কাছে গচ্ছিত রাখা হয়।
সরকার, জনগণ বা কোন প্রতিষ্ঠানের অর্থে কোন প্রকার খিয়ানত করে না। চাকরি বা অর্পিত কোন দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে না।
রাজা হয়ে প্রজার প্রতি, স্বামী হয়ে স্ত্রীর প্রতি, স্ত্রী হয়ে স্বামীর প্রতি, পিতামাতা হয়ে সন্তানের প্রতি, সন্তান হয়ে পিতামাতার প্রতি, প্রভু হয়ে ভৃত্যের প্রতি, ভৃত্য হয়ে প্রভুর প্রতি কর্তব্য পালনে কোন প্রকার ত্রুটি করে না।
প্রত্যেকের প্রাপ্য আমানত প্রত্যর্পণ করে চরিত্রবান মুসলিম। যেহেতু তার প্রতিপালকের নির্দেশ,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤدُّوا الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا
"নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমানত তার মালিককে প্রত্যর্পণ করবে। আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার-কার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদেরকে যে উপদেশ দেন, তা কত উৎকৃষ্ট! নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।"৩১১
টিকাঃ
৩০৯. আবু দাউদ ৩৫৩৭, তিরমিযী ১২৬৪, দারেমী, মিশকাত ২৯৩৪
৩১০. সিলসিলাহ সহীহাহ ২৯৯৮
৩১১.সূরা নিসা: ৫৮
📄 উপহার বিনিময়
আপোসে উপহার-উপঢৌকন বিনিময় করা সুচরিত্রের একটি সুন্দর আচরণ। যেহেতু তার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্প্রীতি সৃষ্টি হয়।
'স্মৃতি দিয়ে বাঁধা থাকে প্রীতি, প্রীতি দিয়ে বাঁধা থাকে মন, উপহারে বাঁধা থাকে প্রীতি, তাই দেওয়া প্রয়োজন।'
মহানবী বলেছেন,
تَهَادُوا تَحَابُّوا
"তোমরা উপহার বিনিময় কর, পারস্পরিক সম্প্রীতি লাভ করবে।"৩১২
সা'ব ইবনে জাষ্যামাহ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে (শিকার করা) এক জংলী গাধা উপঢৌকন দিলাম। কিন্তু তিনি তা আমাকে ফিরিয়ে দিলেন। তারপর তিনি আমার চেহারায় (বিষণ্ণতার চিহ্ন) দেখে বললেন,
إِنَّا لَمْ نَرُدَّهُ عَلَيْكَ إِلَّا لِأَنَّا حُرُمٌ
"আমরা ইহরামের অবস্থায় আছি, তাই আমরা এটি তোমাকে ফিরিয়ে দিলাম।"৩১৩
যেহেতু ইহরাম অবস্থায় শিকার করা ও তার গোশ্ত খাওয়া নিষিদ্ধ, সেহেতু মহানবী সেই উপঢৌকন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। নচেৎ তিনি কারো উপঢৌকন প্রত্যাখ্যান করতেন না।
যে জিনিস উপহারে দেওয়া হয়, তার প্রয়োজন না থাকলেও তা ফিরিয়ে দেওয়া উচিত নয়। কারণ তাতে দাতার মন ভেঙ্গে যায়।
'তোমায় কিছু দেব বলে চায় যে আমার মন, নাই বা তোমার থাকল প্রয়োজন।'
বিভিন্ন উপলক্ষ্যে উপহার বিনিময় একটি সুন্দর লোকাচার। কিন্তু তা লোভে পরিণত হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। আপোসে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দান হওয়া গ্রহণীয় নয়। উপহারের বিনিময়ে কেউ উপহার দিতে না পারলে যেন চরিত্রবানের মনঃক্ষুণ্ণ না হয়। উপহারের লোভে বেছে বেছে কেবল বড়লোকদেরকেই দাওয়াত না দেওয়া হয়। সামর্থ্য অনুযায়ী যে যা উপহার দেবে, তা যেন সাদরে গ্রহণ করা হয়। নচেৎ উপহার বিনিময় সম্প্রীতির জায়গায় বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করবে। আর সে কাজ কোন চরিত্রবান-চরত্রিবতীর হতে পারে না।
টিকাঃ
৩১২. বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ ৫৯৪, আবু য়্যা'লা ৬১৪৮, সহীহুল জামে' ৩০০৪
৩১৩. বুখারী ১৮২৫, মুসলিম ২৯০২