📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 ক্ষমাশীলতা

📄 ক্ষমাশীলতা


কেউ অন্যায় করলে অথবা কোন দুর্ব্যবহার করলে তাকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও শাস্তি না দিয়ে বা কোন প্রকার প্রতিশোধ গ্রহণ না ক'রে অপরাধীকে ক্ষমা ক'রে দেওয়া সুচরিত্রবানের একটি মহা সদ্‌গুণ। এ গুণ জান্নাতী মানুষদের গুণ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ - الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاء وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهِ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
"তোমরা প্রতিযোগিতা (ত্বরা) কর, তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে ক্ষমা এবং জান্নাতের জন্য, যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান, যা ধর্মভীরুদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় দান করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা ক'রে থাকে। আর আল্লাহ (বিশুদ্ধচিত্ত) সৎকর্মশীলদেরকে ভালবাসেন।”২১৮
তিনি অন্যত্র বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَواْ إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
"নিশ্চয়ই যারা সাবধান হয়, যখন শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দেয়, তখন তারা আত্মসচেতন হয় এবং তৎক্ষণাৎ তাদের চক্ষু খুলে যায়।”২১৯
উক্ত আয়াতের এক অর্থে বলা হয়েছে, "নিশ্চয়ই যারা সাবধান হয়, যখন শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দেয়” অর্থাৎ, সে তাদের মনে ক্রোধ সৃষ্টি করে, "তখন তারা আত্মসচেতন হয় এবং তৎক্ষণাৎ তাদের চক্ষু খুলে যায়।" সুতরাং তারা অপরাধীকে মার্জনা করে। মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন,
وَالَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ وَإِذَا مَا غَضِبُوا هُمْ يَغْفِرُونَ
"যারা মহাপাপ ও অশ্লীল কাজ হতে দূরে থাকে এবং ক্রোধান্বিত হলে ক্ষমা ক'রে দেয়।”২২০
অপরাধীকে ক্ষমা করা মহামানবদের মহৎ গুণ। আর তার সুফলও বড় সুন্দর। মহানবী তায়েফবাসীকে ক্ষমা করেছিলেন। নচেৎ তারা চিরতরে ধ্বংস হয়ে যেত।
তিনি সুমামা বিন উসালকে ক্ষমা করেছিলেন, ফলে সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। একদা এক মরুভূমিতে মরু-বাবলা গাছের উপর নিজের তরবারি লটকে রেখে তার ছায়ার নিচে বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন আমাদের মহানবী । ইতিমধ্যে এক বেদুঈন দুশমন এসে তাঁর ঐ তরবারিটি হাতে নিয়ে তাঁর উপর তুলে ধরে বলল, 'ওহে মুহাম্মাদ! তুমি কি আমাকে ভয় পাও না?' মহানবী নির্ভয়ে বললেন, 'না।'
বেদুঈন বলল, 'তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ।' বেদুঈন আবার বলল, 'তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?' তিনি পূর্বেকার মতই বললেন, 'আল্লাহ।' বেদুঈন পুনরায় বলল, 'তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?' তিনি পুনরায় বললেন, 'আল্লাহ।'
এরপর বেদুঈনের দেহ-মন কেঁপে উঠল। সহসা তার হাত থেকে তলোয়ারটি পড়ে গেল। মহানবী তা তুলে নিয়ে তার প্রতি তুলে ধরে বললেন, 'এবার তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?' বেদুঈন বলল, 'কেউ নয়।' অথবা 'তুমি।'
দয়ার নবী তাকে মাফ ক'রে দিলেন, ফলে সে মুসলমান হয়ে গেল। অন্য বর্ণনা মতে সে মুসলমান হয়নি; কিন্তু অঙ্গীকারাবদ্ধ হল যে, সে তাঁর বিরুদ্ধে কোনক্রমেই আর যুদ্ধ করবে না। ২২১
মক্কা-বিজয়ের যুদ্ধে বিজয় লাভের পর তিনি ইচ্ছা করলে বহু পুরাতন ক্ষোভ মিটাতে পারতেন এবং কাফের মক্কাবাসীকে এক ইশারায় ধ্বংস ক'রে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। কারণ তাঁর তো ব্যক্তিগত কোন ক্রোধ ছিল না এবং তিনি তো ধ্বংসের জন্য প্রেরিত হননি। তাই তিনি ক্ষমা ঘোষণা ক'রে বলেছিলেন,
مَنْ دَخَلَ دَارَ أَبِي سُفْيَانَ فَهُوَ آمِنْ وَمَنْ أَغْلَقَ عَلَيْهِ دَارَهُ فَهُوَ آمِنْ وَمَنْ دَخَلَ الْمَسْجِدَ فَهُوَ آمِنٌ ومن ألقى السلاح فهو آمن
অর্থাৎ, যে আবু সুফিয়ানের ঘরে ঢুকবে, সে নিরাপদ। যে নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে নেবে, সে নিরাপদ। যে মসজিদে ঢুকবে, সে নিরাপদ। যে অস্ত্র বর্জন করবে, সে নিরাপদ। ২২২
মক্কা বিজয়ের দিন আলী আবু সুফিয়ানকে বললেন, 'আল্লাহর রসূল এর সম্মুখে গিয়ে সেই কথা বল, যে কথা ইউসুফের ভাইগণ ইউসুফকে বলেছিলেন,
تَاللهِ لَقَدْ آثَرَكَ اللَّهُ عَلَيْنَا وَإِن كُنَّا لَخَاطِئِينَ
'আল্লাহর শপথ! আল্লাহ নিশ্চয় তোমাকে আমাদের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন এবং নিঃসন্দেহে আমরাই ছিলাম অপরাধী।'২২৩
নিশ্চয় তিনি চাইবেন না যে, অন্য কেউ উত্তরে তাঁর চাইতে বেশি সুন্দর হোক। সুতরাং আবু সুফিয়ান সেই মতো করলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন,
لَا تَثْرَيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
'আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।'২২৪
মহানবী বহু মূর্খ ও অজ্ঞদের দুর্ব্যবহারে ক্ষমাশীলতা প্রদর্শন করেছিলেন। যেহেতু তাঁর প্রতিপালকের নির্দেশ ছিল,
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ
"তুমি ক্ষমাশীলতার নীতি অবলম্বন কর, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খদেরকে এড়িয়ে চল।”২২৫
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন, হুনাইন যুদ্ধের গনিমতের মাল বন্টনে রাসূলুল্লাহ ﷺ কিছু লোককে (তাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য) প্রাধান্য দিলেন (অর্থাৎ, অন্য লোকের তুলনায় তাদেরকে বেশী মাল দিলেন)। সুতরাং তিনি আকুরা' বিন হাবেসকে একশত উট দিলেন এবং উয়াইনা বিন হিস্নকেও তারই মতো দিলেন। অনুরূপ আরবের আরো কিছু সম্ভ্রান্ত মানুষকেও সেদিন (মাল) বন্টনে প্রাধান্য দিলেন। (এ দেখে) একটি লোক বলল, 'আল্লাহর কসম! এই বন্টনে ইনসাফ করা হয়নি এবং এতে আল্লাহর সন্তোষ লাভের ইচ্ছা রাখা হয়নি!' আমি (ইবনে মাসউদ) বললাম, 'আল্লাহর কসম! নিশ্চয় আমি এই সংবাদ আল্লাহর রসূল ﷺ কে পৌঁছে দেব।' অতএব আমি তাঁর কাছে এসে সেই সংবাদ দিলাম, যা সে বলল। ফলে তাঁর চেহারা পরিবর্তিত হয়ে এমনকি লালবর্ণ হয়ে গেল। অতঃপর তিনি বললেন,
فَمَنْ يَعْدِلُ إِذَا لَمْ يَعْدِلُ اللهُ وَرَسُولُهُ؟ رَحِمَ اللهُ مُوسَى قَدْ أُوذِيَ بِأَكْثَرَ مِنْ هَذَا فَصَبَرَ
"যদি আল্লাহ ও তাঁর রসূল ইনসাফ না করেন, তাহলে আর কে ইনসাফ করবে? আল্লাহ মূসাকে রহম করুন, তাঁকে এর চেয়ে বেশী কষ্ট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করেছিলেন।"২২৬
আনাস(রাঃ) বলেন, (একদা) আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে পথ চলছিলাম। সে সময় তাঁর উপর মোটা পেড়ে একখানি নাজরানী চাদর ছিল। অতঃপর পথে এক বেদুঈনের সঙ্গে দেখা হল। সে তাঁর চাদর ধরে খুব জোরে টান দিল। আমি নবী ﷺ এর কাঁধের এক পাশে দেখলাম যে, খুব জোরে টানার কারণে চাদরের পাড়ের দাগ পড়ে গেছে। পুনরায় সে বলল, 'ওহে মুহাম্মাদ! তোমার নিকট আল্লাহর যে মাল আছে, তা থেকে আমাকে দেওয়ার আদেশ কর।' তিনি তার দিকে মুখ ফিরিয়ে হাসলেন। অতঃপর তাকে (কিছু মাল) দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। ২২৭
এক বেদুঈন মসজিদের ভিতরে প্রস্রাব ক'রে দিল। সুতরাং লোকেরা তাকে ধমক দিয়ে বলল, 'এ কী? এ কী!' নবী ﷺ বললেন, "ওর পেসাব আটকে দিয়ো না, ওকে ছেড়ে দাও।"
সুতরাং তাকে ছেড়ে দেওয়া হল। সে প্রস্রাব করে শেষ করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে ডেকে বললেন,
إِنَّ هَذِهِ الْمَسَاجِدَ لَا تَصْلُحُ لِشَيْءٍ مِنْ هَذَا الْبَوْلِ وَلَا الْقَذَرِ إِنَّمَا هِيَ لِذِكْرِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ وَالصَّلَاةِ وَقِرَاءَةِ الْقُرْآنِ
অর্থাৎ, এই মসজিদগুলো কোন প্রকার পেসাব বা নোংরা জিনিসের জন্য নয়। এ হল কেবল আল্লাহ আয্যা অজাল্লার যিক্র, স্বলাত ও কুরআন পড়ার জন্য। ২২৮
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
دَعُوهُ وَأَهْرِيقُوا عَلَى بَوْلِهِ ذَنُوبًا مِنْ مَاءٍ أَوْ سَجْلًا مِنْ مَاءٍ فَإِنَّمَا بُعِثْتُمْ مُيَسِّرِينَ وَلَمْ تُبْعَثُوا مُعَسِّرِينَ
অর্থাৎ, ওকে ছেড়ে দাও এবং ওর প্রস্রাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। কেননা তোমাদেরকে সহজ নীতি অবলম্বন করার জন্য পাঠানো হয়েছে, কঠোর নীতি অবলম্বন করার জন্য পাঠানো হয়নি। "২২৯
এইভাবে তিনি মুনাফিকদের আচরণে ক্ষমাশীলতা ও সহিষ্ণুতার বিশাল নমুনা রেখে গেছেন। চরিত্রবান হতে হলে, বিশেষ ক'রে একজন 'দ্বীনের দাঈ' হতে হলে ক্ষমাশীলতা প্রয়োগ করা অত্যাবশ্যক। বিরোধীদের দেওয়া কষ্টে ধৈর্যশীলতা ও ক্ষমাশীলতাই হল সাফল্যের সরল পথ। মহান আল্লাহর নির্দেশ হল,
وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَالْمُنَافِقِينَ وَدَعْ أَذَاهُمْ وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلًا
"তুমি অবিশ্বাসী ও কপটাচারীদের কথা মান্য করো না; ওদের নির্যাতন উপেক্ষা কর এবং আল্লাহর ওপর নির্ভর কর। কর্মবিধায়করূপে আল্লাহই যথেষ্ট। "২৩০
ইচ্ছা করলে তিনি প্রতিশোধ নিতে পারতেন, কিন্তু নিলেন না, মাফ ক'রে দিলেন। এটাই তো মহৎ লোকের কর্ম।
সুতরাং মহৎ ও চরিত্রবান হতে কেউ আপনাকে গালি দিলে, তা গালিদাতাকে ফিরিয়ে দিন।
কেউ আপনার চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে কষ্ট দিতে থাকলে তার অসুখে তাকে সাক্ষাৎ ক'রে সান্ত্বনা দিতে যান।
কেউ আপনার পরিচয় না জেনে আপনাকে গালাগালি করলে আপনি তার বোঝা বয়ে দিন।
কেউ আপনার হিংসা বা শত্রুতা করলে তার একটা চাকরি ক'রে দিন, একটি ভিসা পাঠিয়ে দিন, একটা বড় উপহার পাঠিয়ে দিন।
কেউ আপনার বদনাম ক'রে বেড়ালে, সমালোচনা করলে, কুৎসা গেয়ে বেড়ালে আপনি তার বিপদে হাত বাড়িয়ে দিন।
ক্ষমাশীলতা প্রয়োগ ক'রে প্রতিক্রিয়া দেখুন। আপনি হতবাক হবেন, লোকেরাও অবাক হবে!
সত্বর সুফল পাবেন দুনিয়াতে। আর আখেরাতের পুরস্কার তো আছেই। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَجَزَاء سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِّثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ
"মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। আর যে ক্ষমা ক'রে দেয় ও আপোস- নিষ্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট আছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।”২৩১
কোন দুর্বল মিসকীনের প্রতি অনুগ্রহশীল থাকার পর যদি বুঝতে পারেন, সে আপনার প্রতি অশ্রদ্ধাশীল। সে আপনার পরোয়াও করে না, বরং উল্টে সে আপনার বা আপনার কোন আপনজনের অপবাদ রচনা ও রটনা ক'রে বেড়ায়। তাহলে পারবেন তাকে ক্ষমা করতে? না দেওয়ার কসম খাওয়ার পর কসম ভেঙ্গে পারবেন তাকে তার দান অবিরাম দিয়ে যেতে? প্রতিপালকের ক্ষমা লাভের জন্য পারবেন তাকে ক্ষমা করতে? মহান প্রতিপালকের নির্দেশ শুনুন,
وَلَا يَأْتَلِ أُولُوا الْفَضْلِ مِنكُمْ وَالسَّعَةِ أَن يُؤْتُوا أُولِي الْقُرْبَى وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللهِ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তারা আত্মীয়-স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহর রাস্তায় যারা গৃহত্যাগ করেছে তাদের কিছুই দেবে না; তারা যেন ওদেরকে ক্ষমা করে এবং ওদের দোষ-ত্রুটি মার্জনা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা ক'রে দিন? আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়। "২৩২
হ্যাঁ, মহান প্রভুর ক্ষমা লাভের জন্য ক্ষমা করতে হবে। মাছের কাঁটার মতো আপনার গলায় লেগে থাকা আপনার বউ, যা আপনি গিলতেও পারেন না, ফেলতেও পারেন না। পরন্তু কাঁটার যাতনায় আপনি সর্বদা যন্ত্রণাকাতর থাকেন, তাঁকেও ক্ষমা করতে হবে। যে বউ আপনার মনের মতো নয়, যে বউ আপনার নেশা ও পেশার সহায়িকা নয়, যে বউ নূহ ও লূত (আলাইহিমাস সালাম) এর বউদের মতো, যে বউ আপনার শত্রু, যে আপনার শত্রুদের সাথে হাত মেলায়, আপনি যাকে ভালোবাসেন না, সে তাকে ভালোবাসে, আপনার শত্রুদের কাছে সে আপনার গোপন রহস্য প্রকাশ ক'রে দেয়, হয়তো মনে মনে, গোপনে গোপনে সে আপনার প্রাণহানি কামনা করে, পারবেন তাকে ক্ষমা করতে? অনুরূপ সন্তান, যে আপনার মনের বিরুদ্ধে চলতে চায়, আপনার খেয়ে আপনার মান-মর্যাদার খেয়াল রাখে না, পারবেন তাকে ক্ষমা করতে? মহান আল্লাহর নির্দেশ শুনুন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ وَإِن تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক থেকো। আর তোমরা যদি তাদেরকে মার্জনা কর, তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা কর এবং তাদেরকে ক্ষমা কর, তাহলে (জেনে রেখো যে,) নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”২৩৩
জানি, ক্ষমা করা বড় কঠিন। কিন্তু ক্ষমা করলে, মহাক্ষমাশীলের ক্ষমা পাবেন। তিনি অন্যত্র বলেছেন,
إِن تُبْدُوا خَيْرًا أَوْ تُخْفُوهُ أَوْ تَعْفُوا عَن سُوَءٍ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوًا قَدِيرًا
"যদি তোমরা সৎকাজ প্রকাশ্যে কর অথবা গোপনে কর অথবা অপরাধ ক্ষমা কর, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহও পরম ক্ষমাশীল, মহা শক্তিমান।”২৩৪
অপরাধের কারণে আপনার শাস্তি দেওয়ার সামর্থ্য ও বৈধতা থাকলে, আপনি তা প্রয়োগ করতে পারেন। কিন্তু ধৈর্যের সাথে ক্ষমাশীলতাই শ্রেষ্ঠ এবং সুচরিত্রবান মানুষের আচরণ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ وَلَئِن صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِّلصَّابِرِينَ - وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلا بِالله وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ مِّمَّا يَمْكُرُونَ
"যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তাহলে ঠিক ততখানি করবে যতখানি অন্যায় তোমাদের প্রতি করা হয়েছে। আর যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর, তাহলে অবশ্যই ধৈর্যশীলদের জন্য সেটাই উত্তম। তুমি ধৈর্যধারণ কর; আর তোমার ধৈর্য তো হবে আল্লাহরই সাহায্যে। তাদের (অবিশ্বাসের) জন্য তুমি দুঃখ করো না এবং তাদের ষড়যন্ত্রে তুমি মনঃক্ষুণ্ণ হয়ো না।”২৩৫
আপনি পরীক্ষা ক'রে দেখতে পারেন, প্রতিশোধ নিতে পারলে মনে বড় তৃপ্তি আছে ঠিকই, কিন্তু তার চাইতে অধিক তৃপ্তি আছে ক্ষমা করাতে। তাছাড়া যে মানুষকে ক্ষমা করতে পারে না, সে একদিন একা হয়ে যায়। কারণ মানুষ মাত্রই ভুল করে। যাকে ক্ষমা করবেন না, তার প্রতি আপনি অথবা আপনার প্রতি সে বিরূপ হয়ে যাবে। আর তার ফলে আপনার শান্তিনিকেতন অশান্তির আলয়ে পরিণত হবে। তাহলে লাভ কী? মহানবী এর সচ্চরিত্রতা ও বিশেষ ক'রে ক্ষমাশীলতার একটি মূল্যবান উপদেশ শুনুন, তিনি বলেছেন,
لا تَسُبَّنَّ أَحَدًا، وَلاَ تَحْقِرَنَّ شَيْئًا مِنَ الْمَعْرُوفِ وَأَنْ تُكَلِّمَ أَخَاكَ وَأَنْتَ مُنْبَسِطٌ إِلَيْهِ وَجْهُكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنَ الْمَعْرُوفِ وَارْفَعْ إِزَارَكَ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ فَإِنْ أَبَيْتَ فَإِلَى الْكَعْبَيْنِ وَإِيَّاكَ وَإِسْبَالَ الإِزَارِ فَإِنَّهَا مِنَ الْمَخِيلَةِ وَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمَخِيلَةَ وَإِنِ امْرُؤٌ شَتَمَكَ وَعَيَّرَكَ بِمَا يَعْلَمُ فِيكَ فَلَا تُعَيِّرُهُ بِمَا تَعْلَمُ فِيهِ فَإِنَّمَا وَبَالُ ذَلِكَ عَلَيْهِ
"তুমি খবরদার কাউকে গালি দিয়ো না। যে কোনও ভালো কাজকে তুচ্ছজ্ঞান করো না। তোমার ভাইয়ের সাথে খুশীভরা চেহারা নিয়ে কথা বল, এটিও একটি ভালো কাজ। তোমার লুঙ্গি পায়ের রলার অর্ধাংশে উঠিয়ে পর। তা যদি অস্বীকার কর, তাহলে গাঁট পর্যন্ত নামিয়ে পর। আর সাবধান! লুঙ্গি গাঁটের নিচে ঝুলিয়ে পরো না। কারণ তা অহংকারের আলামত। পরন্তু আল্লাহ অবশ্যই অহংকার পছন্দ করেন না। যদি কোন লোক তোমাকে গালি দেয় এবং এমন দোষ ধরে তোমাকে লজ্জা দেয়, যা তোমার মধ্যে আছে বলে সে জানে, তাহলে তুমি তাকে এমন দোষ ধরে লজ্জা দিয়ো না, যা তার মধ্যে আছে বলে তুমি জান। তার বোঝা সেই বহন করুক।”২৩৬
পরিশেষে বলি, ক্ষমাশীলতা যেখানে ক্ষীণ দুর্বলতা বলে পরিগণিত হয়, সেখানে নিষ্ঠুর হওয়া বাঞ্ছনীয়।
শায়খ সা'দী বলেছেন, 'ক্ষমা করা মহৎ গুণ। কিন্তু ক্ষমাশীলতাকে কোন হিংস্র পশু বা মানুষের জন্য প্রয়োগ করলে জানতে হবে বিপদ অনিবার্য।'

টিকাঃ
২১৮. সূরা আলে ইমরান-৩: ১৩৩-১৩৪
২১৯. সূরা আ'রাফ: ২০১
২২০. সূরা শূরা: ৩৭
২২১. আহমাদ, বুখারী, মুসলিম, নাসাঈ, বাইহাক্বী, মিশকাত ৫৩০৫
২২২. মুসলিম ৪৭২৪, আবু দাউদ ৩০২৩
২২৩. সূরা ইউসুফ: ৯১
২২৪. সূরা ইউসুফ: ৯২, ফিকুহুস সীরাহ ৩৭৬পৃ, আর-রাহীকুল মাখতুম ৩৭৬পৃঃ
২২৫. সূরা আ'রাফ: ১৯৯
২২৬. বুখারী ৩১৫০, মুসলিম ২৪৯৪
২২৭. বুখারী ৩১৪৯, মুসলিম ২৪৭৬
২২৮. মুসলিম ৬৮৭
২২৯. বুখারী ২২০, ৬১২৮
২৩০. সূরা আহযাব: ৪৮
২৩১. সূরা শূরা: 80
২৩২. সূরা নূর: ২২
২৩৩. সূরা তাগাবুন: ১৪
২৩৪. সূরা নিসা: ১৪৯
২৩৫. সূরা নাহল: ১২৬-১২৭
২৩৬. আবু দাউদ ৪০৮৬, সহীহুল জামে' ৭৩০৯

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 লজ্জাशीलता

📄 লজ্জাशीलता


লজ্জাশীলতার প্রকৃতত্ব হল এমন সচ্চরিত্রতা, যা নোংরা বর্জন করতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে এবং অধিকারীর অধিকার আদায়ে ত্রুটি প্রদর্শন করতে বিরত রাখে। কেউ লজ্জাশীল চরিত্রবান হলে তার দ্বারা কোন পাপ, অপরাধ, ধৃষ্টতা অথবা নোংরামি ঘটতে পারে না। যেহেতু লজ্জাশীলতার উৎস হল ঈমান। মহানবী বলেছেন,
الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ أَوْ بِضْعٌ وَسِتُونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ
"ঈমান সত্তর বা ষাটের অধিক শাখাবিশিষ্ট; যার উত্তম (ও প্রধান) শাখা 'লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই) বলা এবং সবচেয়ে ক্ষুদ্র শাখা পথ হতে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের অন্যতম শাখা।”২৩৭
ইবনে উমার বলেন, রাসূলুল্লাহ এক আনসার ব্যক্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, যিনি তার ভাইকে লজ্জার ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে বললেন,
دَعْهُ ، فَإِنَّ الْحَيَاءَ مِنَ الإِيمَانِ
"ওকে ছেড়ে দাও। কেননা, লজ্জা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।”২৩৮
লজ্জাশীলতা ও ঈমান এক সূত্রে গাঁথা। একটি চলে গেলে অন্যটিও চলে যায়। নির্লজ্জের ঈমান পরিপূর্ণ নয়। বেহায়া নারী-পুরুষ পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী নয়। মহানবী বলেছেন,
إنَّ الحَيَاءَ والإيمانَ قُرِنا جميعاً فإِذا رُفِعَ أَحدُهُمَا رُفِعَ الْآخَرُ
"অবশ্যই লজ্জাশীলতা ও ঈমান একই সূত্রে গাঁথা। উভয়ের একটি চলে গেলে অপরটিও চলে যায়।”২৩৯
সভ্যতা, শ্লীলতা ও ভদ্রতা ঈমানের অঙ্গ বিশেষ। ভদ্র মানুষ জান্নাতে প্রবেশাধিকার পাবে। পক্ষান্তরে অসভ্য ও অভদ্র মানুষের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। মহানবী বলেছেন,
الْحَيَاءُ مِنْ الْإِيمَانِ وَالْإِيمَانُ فِي الْجَنَّةِ وَالْبَذَاءُ مِنْ الْجَفَاءِ وَالْجَفَاءُ فِي النَّارِ
"লজ্জাশীলতা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত এবং ঈমান হবে জান্নাতে। আর অশ্লীলতা রূঢ়তার অন্তর্ভুক্ত এবং রূঢ়তা হবে জাহান্নামে।"২৪০
এমন অনেক কথা আছে, যা আকারে-ইঙ্গিতে বলতে হয়, স্পষ্ট বলতে লজ্জাবোধ হয়। অনেক সময় নিজের অধিকার চাইতেও লজ্জা লাগে। এমন লজ্জাশীলতাও ঈমানের শাখা। মহানবী বলেছেন,
الْحَيَاءُ وَالْعِيُّ شُعْبَتَانِ مِنْ الْإِيمَانِ وَالْبَذَاءُ وَالْبَيَانُ شُعْبَتَانِ مِنْ النَّفَاقِ
“লজ্জাশীলতা ও মুখচোরামি ঈমানের দু'টি শাখা। আর মুখ খিস্তি করা ও বাক্সটু হওয়া মুনাফিকীর দু'টি শাখা।"২৪১
إِنَّ الْحَيَاءَ، وَالْعَفَافَ، وَالْعِيَّ، عِيُّ اللِّسَانِ لا عِيَّ الْقَلْبِ، وَالْعَمَلَ، مِنَ الإِيمَانِ، وَإِنَّهُنَّ يَزِدْنَ فِي الآخِرَةِ، وَيُنْقِصْنَ مِنَ الدُّنْيَا، وَلَمَا يَزِدْنَ فِي الْآخِرَةِ، أَكْثَرُ مِمَّا يُنْقِصْنَ فِي الدُّنْيَا، فَإِنَّ الشُّحَّ، وَالْبَذَاءَ مِنَ النَّفَاقِ، وَإِنَّهُنَّ يَزِدْنَ فِي الدُّنْيَا، وَيُنْقِصْنَ مِنَ الآخِرَةِ، وَلَمَا يُنْقِصْنَ فِي الآخِرَةِ أَكْثَرُ مِمَّا يَزِدْنَ فِي الدُّنْيَا
"নিশ্চয় লজ্জাশীলতা, যৌন-পবিত্রতা, মুখচোরামি (হৃদয়ের অক্ষমতা নয়) ও আমল বা দ্বীনী জ্ঞান ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। এগুলি পরকালের সম্বল বৃদ্ধি করবে এবং ইহকালের সম্বল হ্রাস করবে। আর পরকালের যা বৃদ্ধি পায়, তা ইহকালের যা হাস করে তা অপেক্ষা অধিক। পক্ষান্তরে কার্পণ্য, অশ্লীলতা ও নোংরা ভাষা মুনাফিকীর অন্তর্ভুক্ত। এগুলি পরকালের সম্বল হাস করে এবং ইহকালের সম্বল বৃদ্ধি করে। আর পরকালের যা হ্রাস পায়, তা ইহকালের যা বৃদ্ধি করে তা অপেক্ষা অধিক।”২৪২
মু'মিন নির্লজ্জ, বেহায়া ও অশ্লীল প্রকৃতির হতে পারে না। যেহেতু যে গুণ মুনাফিকের, তা কোন মু'মিনের হতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ الْمُؤمن بالطعان وَلَا اللعان وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَدِيء
"মুমিন খোঁটাদানকারী, অভিশাপকারী, অশ্লীল এবং অসভ্য হয় না।”২৪৩
অবশ্যই মহান প্রতিপালক মুনাফিককে ভালোবাসেন না। এমন কাউকে ভালোবাসেন না, যে তার চরিত্র ও চলনে নির্লজ্জ ও ধৃষ্ট, যে তার বলনে অশ্লীলভাষী। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَبْغَضُ الْفَاحِشَ الْبَذِيءَ
"নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা অমার্জিত অশ্লীলভাষীকে ঘৃণা করেন।"২৪৪
মানুষও কি অসভ্য দুশ্চরিত্রকে ভালোবাসে? কক্ষনো না। সভ্য মানুষেরা অসভ্যকে পছন্দ করতেই পারে না। যে পুরুষ মেয়ে দেখে হ্যাংলা কুকুরের মতো ভ্যালভ্যাল ক'রে তার দিকে তাকিয়ে থাকে, চরিত্রবতী মেয়েরা সেই সকল পুরুষকেই বেশী ঘৃণা করে। অভব্য কোন মানুষকে তার মজলিসে বসাতে চায় না, তার মেহমান বানাতে চায় না, তাকে বন্ধু বানাতে চায় না, তাকে জামাই বা বউ করতে চায় না, আপন স্বামী বা স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতে চায় না। সুস্থ প্রকৃতির ভব্য নারী-পুরুষ মাত্রই অভব্য নারী-পুরুষকে এড়িয়ে চলতে চায়, বর্জন করতে চায়। এমন দুশ্চরিত্র নারী-পুরুষ মানুষের কাছে ঘৃণ্য, মহান প্রতিপালকের কাছেও ঘৃণ্য। বরং কিয়ামতে তাঁর নিকট তারাই সবচেয়ে বেশি নিকৃষ্ট। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ شَرَّ النَّاسِ مَنْزِلَةً عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ وَدَعَهُ أَوْ تَرَكَهُ النَّاسُ اتَّقَاءَ فُحْشِهِ
"কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্টমানের ব্যক্তি সেই হবে, যাকে মানুষ তার অশ্লীলতা থেকে বাঁচার জন্য বর্জন ক'রে থাকে।”২৪৫
দেহ প্রদর্শন না করা এক প্রকার লজ্জাশীলতা। বিশেষ ক'রে যে দেহাংশ গোপন রাখা ওয়াজেব, তা প্রকাশ করা নির্লজ্জতা ও বেহায়ামি। তাই মহানবী বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حَى سِتِّيرٌ يُحِبُّ الْحَيَاءَ وَالسَّتْرَ فَإِذَا اغْتَسَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْتَتِرُ
"নিশ্চয় আল্লাহ আয্যা অজাল্লু লজ্জাশীল, গোপনকারী। তিনি লজ্জাশীলতা ও গোপনীয়তাকে পছন্দ করেন। সুতরাং যখন তোমাদের কেউ গোসল করবে, তখন সে যেন গোপনীয়তা অবলম্বন করে (পর্দার সাথে করে)।"২৪৬
এ তো গোসল করা অথবা প্রাকৃতিক কর্ম সারার সময়কার কথা। তাহলে কথান্তরে দেহ অন্য সময় প্রকাশ করা, দেহকে সুসজ্জিত ক'রে জনসমক্ষে পেশ করা, জনসভায় প্রদর্শন করা, রূপালী পর্দায় পেশ করা, নানা অঙ্গভঙ্গির সাথে পেশ করা, রূপব্যবসা করা ইত্যাদি কোন শ্রেণীর নির্লজ্জতা, তা অনুমেয়।
লজ্জাশীলতা নারীর ভূষণ। অলঙ্কার যেমন নারীকে আরো সুন্দরী ক'রে তোলে, তেমনি লজ্জাশীলতাও সুন্দরীকে আরো বেশি সুন্দরী ক'রে তোলে। পুরুষের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তোলে লজ্জাশীলতার সচ্চরিত্রতা। পক্ষান্তরে নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতা সুন্দর-সুন্দরীর সৌন্দর্যকে ম্লান ক'রে দেয় এবং অসুন্দরের কদর্যতা আরো বৃদ্ধি করে। মহানবী বলেছেন,
مَا كَانَ الْفُحْشُ فِي شَيْءٍ قَطُّ إِلَّا شَانَهُ وَلَا كَانَ الْحَيَاءُ فِي شَيْءٍ قَطُّ إِلَّا زَانَهُ
"অশ্লীলতা বা নির্লজ্জতা যে বিষয়ে থাকে, সে বিষয়কে তা সৌন্দর্যহীন করে ফেলে; পক্ষান্তরে লজ্জাশীলতা যে বিষয়ে থাকে, সে বিষয়কে তা সৌন্দর্যময় ও মনোহর করে তোলে।”২৪৭
হক কথা বলতে লজ্জা করা উচিত নয়, দ্বীনের মসলা জানতে কারো লজ্জা থাকা উচিত নয়। নচেৎ লজ্জাশীলতা মঙ্গলই-মঙ্গল। মহানবী বলেছেন,
الْحَيَاءُ لَا يَأْتِي إِلَّا بِخَيْرٍ الحَيَاءُ خَيْرٌ كُلُّهُ الْحَيَاءُ كُلُّهُ خَيْرٌ
"লজ্জা মঙ্গলই বয়ে আনে।" বা "লজ্জার সবটাই মঙ্গল। "২৪৮
ইসলামের বিধান হল সুচরিত্রতা। মুসলিম মানেই হল চরিত্রবান-চরিত্রবতী। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ لِكُلِّ دِينِ خُلُقًا ، وَخُلُقُ الإِسْلَامِ الْحَيَاءُ
"প্রত্যেক ধর্মে সচ্চরিত্রতা আছে, ইসলামের সচ্চরিত্রতা হল লজ্জাশীলতা।”২৪৯
মোটকথা, লজ্জাশীল মানুষ অপরকে শ্রদ্ধা করে। যে লজ্জাশীল হয়, সে দানশীল হয়। লজ্জাশীল মানুষ ঢিটে হয় না, প্রগল্ভ ও চপল হয় না। অশ্লীল বা লজ্জাকর কথাকে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করে না।
লজ্জাশীল মানুষ বিনয়ী হয়, অহংকারী হয় না। ভেড়া বা মেড়া হয় না, ঈর্ষাবান ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন হয়।
লজ্জাহীন মানুষ রূঢ় ও কর্কশভাষী হয়।
লজ্জাহীন মানুষ নিজ কর্তব্য পালনে শৈথিল্য করে। নিজ দায়িত্বের কাজ সঠিকভাবে পালন করে না। নিজ কর্মে ও আচরণে বেপরোয়া হয়।
প্রকাশ্যে পাপাচরণ করা; মানুষের সামনে ধুমপান করা, জোর শব্দে রেডিও বা টিভির প্রোগাম শোনা ও দেখা, নোংরা ফিল্ম দেখা, কথায় কথায় তর্ক করা, অশ্লীল কথা বলা, মা-বাপের অবাধ্য হওয়া, মা-বাপ, গুরুজন বা স্বামীর মুখের উপর মুখ দেওয়া, অত্যন্ত মুখর হওয়া, পাড়া-প্রতিবেশীর সাথে অশালীন আচরণ করা, অশ্লীল বাক্যে উপহাস করা বা লোককে হাসানো, উচ্চহাসি হাসা, সর্বদা হিহি করা, বেগানা নারী-পুরুষের আপোসে রসিকতা ও হাসাহাসি করা। সাধারণ্যে মল-মূত্র ত্যাগ করা, আত্মপ্রশংসা ও গর্ব করা, লোক সমাজে হৈ-হুল্লোড় করা, দেওয়ালে অশ্লীল কথা লেখা, অশ্লীল ছবি আঁকা। সাধারণতঃ যে অঙ্গ ঢেকে রাখা জরুরী তা খুলে রাখা, মহিলাদের বেপর্দা হওয়া, পাতলা বা টাইট-ফিট্ অথবা খোলামেলা পোশাক পরা, জোর গলায় কথা বলা, নারী-পুরুষের একে অন্যের পরিচ্ছদ বা বেশ ধারণ করা, পুরুষের গাঁটের নিচে ঝুলিয়ে এবং মহিলার গাঁটের উপর (বরং হাঁটুর উপর) তুলে কাপড় পরা, যুবক-যুবতীর একে অন্যের প্রতি ভ্যালভ্যাল করে তাকিয়ে দেখা। ইভটিজিং করা, ধর্ষণ করা। সমকামিতা করা, বেশ্যাগমন করা। অবৈধ প্রেম করা এবং তা প্রকাশ ক'রে বিয়ের আগে প্রেমিক-প্রেমিকার অবাধ মেলামিশা করা বা এক সাথে বসবাস করা, ব্যভিচার করা, প্রেম ক'রে ঘর ছেড়ে বের হয়ে যাওয়া। যখন এমন নির্লজ্জ প্রেম-পাগল-পাগলিনীকে তাদের আত্মীয়রা বলে, 'মান-লজ্জা-ভয়, তিন থাকতে নয়।' তখন তারা বলে, 'পিয়ার কিয়া তো ডরনা কিয়া?' যখন তাদেরকে 'কুলের কুলাঙ্গার' বলা হয়, তখন তারা বলে, 'কুল ভাঙ্গে তো ভেঙ্গে যাক, হোক কলঙ্ক যদি হয়, কুল ভাঙ্গে না যে নদীর, সে নদী তো নদী নয়।'
মানুষের যখন লজ্জা থাকে না, তখন তার সংযমের বাঁধন শিথিল হয়ে যায়। তখন সে দুশ্চরিত্র হয়। তখন সে যাচ্ছে তাই করতে পারে। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ مِنْ كَلَامِ النُّبُوَّةِ إِذَا لَمْ تَسْتَحْيِ فَاصْنَعْ مَا شِئْتَ
"প্রথম নবুঅতের বাণীসমূহের যা লোকেরা পেয়েছে তার মধ্যে একটি বাণী এই যে, তোমার লজ্জা না থাকলে যা মন তাই কর।”২৫০

টিকাঃ
২৩৭. মুসলিম ১৬২
২৩৮. বুখারী ২৪, ৬১১৮, মুসলিম ১৬৩
২৩৯. হাকেম ৫৮, মিশকাত ৫০৯৪, সহীহুল জামে ১৬০৩
২৪০. আহমাদ ১০৫১২, তিরমিযী ২০০৯, ইবনে হিব্বান, হাকেম ১/৫২, সহীহুল জামে' ৩১৯৯
২৪১. আহমাদ ২২৩১২, তিরমিযী ২০২৭
২৪২. তাবারানী ১৫৪০৭. সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৩৮১
২৪৩. আহমাদ ৩৮-৩৯, হাকেম ২৯, তাবারানী ১০৩৩২, ইবনে হিব্বান ১৯২, সহীহুল জামে ৫২৫৭
২৪৪. বাইহাকী ২১৩১৯, সঃ জামে' ১৮৭৩
২৪৫. বুখারী ৬০৫৪, মুসলিম ৬৭৬১
২৪৬. আবু দাউদ, নাসাঈ ৪০৬, মিশকাত ৪৪৭
২৪৭. তিরমিযী ১৯৭৪, ইবনে মাজাহ ৪১৮৫
২৪৮. বুখারী ৬১১৭, মুসলিম ১৬৫
২৪৯. ইবনে মাজাহ ৪১৮১-৪১৮২, সহীহুল জামে ২১৪৯
২৫০. আহমাদ ১৭০৯০, বুখারী ৩৪৮৪, আবু দাউদ ৪৭৯৯, ইবনে মাজাহ ৪১৮৩, সহীহুল জামে ২২৩০

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 দয়ার্দ্রতা

📄 দয়ার্দ্রতা


চরিত্রবান মানুষ দয়াবান হয়। দয়াবان হয় সৃষ্টির প্রতি। অভাব-অনটনে, বিপদে-কষ্টে সে দয়া প্রদর্শন করে। কারণ সেও তার মহান প্রতিপালকের দয়ার মুখাপেক্ষী। আর সৃষ্টির প্রতি দয়া করলে, তবেই স্রষ্টার দয়া লাভ হয়। মহানবী বলেছেন,
مَنْ لا يَرْحَمِ النَّاسَ لَا يَرْحَمُهُ الله
"যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করবে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করবেন না।”২৫১
الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ ارْحَمُوا أَهْلَ الْأَرْضِ يَرْحَمُكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ
"দয়ার্দ্র মানুষদেরকে পরম দয়াময় (আল্লাহ) দয়া করেন। তোমরা জগদ্বাসীর প্রতি দয়া প্রদর্শন কর, তাহলে তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন, যিনি আকাশে আছেন। ”২৫২
مَنْ لَا يَرْحَمْ لَا يُرْحَمُ
"যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।”২৫৩
وَإِنَّمَا يَرْحَمُ اللَّهُ مِنْ عِبَادِهِ الرُّحَمَاءَ
"আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে দয়ালুদের প্রতিই দয়া করেন। "২৫৪
বিশেষ ক'রে মুসলিম সমাজ, এ সমাজের মানুষ একটি দেহের মতো। মহানবী বলেছেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ في تَوَادِّهِمْ وَتَرَاحُمِهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ، مَثَلُ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضُوْ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ والحُمَّى
"মু'মিনদের আপোসের মধ্যে একে অপরের প্রতি সম্প্রীতি, দয়া ও মায়া- মমতার উদাহরণ (একটি) দেহের মতো। যখন দেহের কোন অঙ্গ পীড়িত হয়, তখন তার জন্য সারা দেহ অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়। "২৫৫
বলা বাহুল্য, চরিত্রবান নারী-পুরুষ সমাজের মানুষের প্রতি অতি সহজে দয়া প্রদর্শন ক'রে থাকে। তাদের চরিত্র সৃষ্টির প্রতি করুণাসিক্ত থাকে। যেহেতু দয়া প্রদর্শন ক'রে আনন্দ ও তৃপ্তি পাওয়া যায়। দয়া বিতরণ ক'রে দয়া লাভ করা যায়। দয়াবানেরা সত্যই সৌভাগ্যবান।
পক্ষান্তরে যারা নির্দয় ও নিষ্ঠুর, যাদের মনে অপরের কষ্ট দেখে দয়া-মায়া হয় না, যাদের হৃদয়ে করুণার সঞ্চার হয় না, তারা নিঃসন্দেহে হতভাগ্য। মহানবী বলেছেন,
لَا تُنْزَعُ الرَّحْمَةُ إِلَّا مِنْ شَقِيَّ
"দুর্ভাগা ছাড়া অন্য কারো (হৃদয়) থেকে দয়া, ছিনিয়ে নেওয়া হয় না।”২৫৬
পরম করুণাময় মহান আল্লাহ নিজ দয়ালু নবী কে বলেছেন,
وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِينَ
অর্থাৎ, মু'মিনদের জন্য তুমি তোমার বাহুকে অবনমিত রাখ। ২৫৭
তিনি ছিলেন দয়াল নবী, রহমতের নবী। সৃষ্টির প্রতি তাঁর হৃদয় ছিল দয়ার্দ্র। দুর্বলদের প্রতি তাঁর অন্তর ছিল দয়াময়। তিনি ছিলেন হৃদয়বান মহান ব্যক্তি। আর দুর্বলদের সাথে ব্যবহারেই মহৎ ব্যক্তির মহত্ত্ব প্রকাশ পেতে থাকে। চরিত্রবানেরাও সেই ব্যক্তিত্বের অনুসরণ করার আপ্রাণ চেষ্টা ক'রে থাকে।
চরিত্রবানেরা এ খেয়ালও রাখে যে, দয়া কেবল দয়ার পাত্রকেই করা যাবে। নচেৎ অপাত্রে দয়াদান বিপত্তির কারণ হতে পারে।
'দুর্বৃত্তদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করলে ভালো লোকেদের প্রতি অত্যাচার করা হয় এবং অত্যাচারীদেরকে ক্ষমা করার মানেই হল, সাধু লোকদের প্রতি অত্যাচার করা।' 'বাঘের প্রতি দয়া-প্রদর্শনের মানেই হল, ছাগের প্রতি অত্যাচার করা। ১২৫৮

টিকাঃ
২৫১. বুখারী ৬০১৩, ৭৩৭৬, মুসলিম ৬১৭০-৬১৭২
২৫২. আবু দাউদ ৪৯৪৩, তিরমিযী ১৯২৪
২৫৩. বুখারী ৫৯৯৭, মুসলিম ৬১৭০
২৫৪. বুখারী ১২৮৪, মুসলিম ২১৭৪
২৫৫. বুখারী ৬০১১, মুসলিম ৬৭৫১
২৫৬. আহমাদ, ২/৩০১, আবু দাউদ ৪৯৪২, তিরমিযী ১৯২৩, ইবনে হিব্বান, সহীহুল জামে' ৭৪৬৭
২৫৭. হিজর ৮৮
২৫৮. শেখ সা'দী

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 নম্রতা

📄 নম্রতা


ভদ্র ও চরিত্রবান মানুষ বিনম্র হয়। তার কথায় ও কাজে নম্রতা থাকে। যেহেতু নম্রতা মানুষকে আকর্ষণ করে এবং কঠোরতা সৃষ্টি করে বিকর্ষণ। মহান আল্লাহ তাঁর প্রেরিত নবী কে বিনম্র বানানোর কারণ উল্লেখ ক'রে বলেছেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهُ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
"আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি হয়েছিলে কোমল-হৃদয়; যদি তুমি রূঢ় ও কঠোর-চিত্ত হতে, তাহলে তারা তোমার আশপাশ হতে সরে পড়ত। সুতরাং তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। অতঃপর তুমি কোন সংকল্প গ্রহণ করলে আল্লাহর প্রতি নির্ভর কর। নিশ্চয় আল্লাহ (তাঁর উপর) নির্ভরশীলদের ভালবাসেন।"২৫৯
খোদ মহান আল্লাহ নম্রতাকে পছন্দ করেন। প্রত্যেক বিষয়ে নম্রতা প্রয়োগ করাকে ভালোবাসেন। আর নম্রতার মাঝেই মানুষ দান করেন সফলতা। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ رَفِيقٌ يُحِبُّ الرِّفْقَ فِي الْأَمْرِ كُلِّهِ إِنَّ اللَّهَ رَفِيقٌ يُحِبُّ الرَّفْقَ ، وَيُعْطِي عَلَى الرِّفقِ ، مَا لاَ يُعْطِي عَلَى العُنْفِ ، وَمَا لَا يُعْطِي عَلَى مَا سِوَاهُ
"নিশ্চয় আল্লাহ কৃপাময়। তিনি সকল বিষয়ে নম্রতা ও কৃপা পছন্দ করেন।”২৬০ "নিশ্চয় আল্লাহ কৃপাময়। তিনি নম্রতা পছন্দ করেন। আর নম্রতার উপর যা প্রদান করেন তা কঠোরতার উপর বরং এ ব্যতীত অন্য কিছুর উপর প্রদান করেন না। "২৬১
নিশ্চয়ই নম্রতা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য এক প্রকার অলংকার। বরং যে জিনিসে নম্রতা প্রয়োগ করা হয়, সেই জিনিসের আভরণ। তাই যে উদ্ধত, তার চেহারা সুন্দর হলেও সে কুৎসিৎ ও হতশ্রী। আর যে বিনম্র, সে সুন্দর। যাতে নম্রতা প্রয়োগ করা হয়েছে, তা অতি মনোহর। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلا زَانَهُ وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ
"নম্রতা যে বিষয়ে থাকে সে বিষয়কে তা সৌন্দর্যমণ্ডিত (মনোহর) করে তোলে। আর যে বিষয় থেকে তা তুলে নেওয়া হয়, সে বিষয়কে সৌন্দর্যহীন (ম্লান) করে ফেলে।”২৬২
যে মানুষ নম্রতা থেকে বঞ্চিত, সে চরিত্রবান হতে পারে না। কারণ নম্রতায় রয়েছে সমূহ মঙ্গল। আর মহানবী বলেছেন,
مَنْ حُرِمَ الرِّفْقَ حُرِمَ الْخَيْرَ أَوْ مَنْ يُحْرَمِ الرِّفْقَ يُحْرَمِ الْخَيْرَ
"যে নম্রতা থেকে বঞ্চিত, সে সকল মঙ্গল থেকে বঞ্চিত। "২৬৩
বিনম্র চরিত্রবান ও চরিত্রবতীকে মহান আল্লাহ ভালোবাসেন। তাই দুনিয়াতে তাদেরকে সাফল্য ও মঙ্গল দান করেন। আর আখেরাতে দান করেন মহা সাফল্য, জাহান্নাম থেকে মুক্তি। মহানবী বলেছেন,
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِمَنْ يَحْرُمُ عَلَى النَّارِ ، أَوْ بِمَنْ تَحْرُمُ عَلَيْهِ النَّارُ ؟ عَلَى كُلِّ قَرِيبٍ ، هَيْنِ سَهْلٍ
"আমি কি তোমাদেরকে এমন লোকের কথা বলে দেব না, যে জাহান্নামের জন্য অথবা জাহান্নাম যার জন্য হারাম হবে? প্রত্যেক জনপ্রিয়, সরল, বিনম্র ও অকুটিল লোকের জন্য জাহান্নাম হারাম। "২৬৪
কোন পদ বা নেতৃত্বে থাকলে চরিত্রবান মানুষ নম্রতা ব্যবহার করে। এতে তার সম্মান বাড়ে, জনপ্রিয়তা বাড়ে এবং নেতৃত্বাধীন ব্যক্তিবর্গের নিকট তার চাহিদা বাড়ে। আর তার ব্যাপারে মহানবী এর দুআ লাগে, ফলে মহান আল্লাহ তার প্রতি সদয় হন। মহানবী দুআ ক'রে বলেছেন,
اللَّهُمَّ مَنْ وَلِيَ مِنْ أَمْرِ أُمَّتِي شَيْئاً فَشَقَّ عَلَيْهِمْ ، فَاشْقُقْ عَلَيْهِ ، وَمَنْ وَلِيَ مِنْ أَمْرِ أُمَّتِي شَيْئاً فَرَفَقَ بِهِمْ ، فَارِفُقْ بِهِ
“হে আল্লাহ! যে কেউ আমার উম্মতের কোন কাজের কিছু দায়িত্ব নিয়ে তাদেরকে কষ্টে ফেলবে, তুমি তাকে কষ্টে ফেলো। আর যে কেউ আমার উম্মতের কোন কাজের কিছু দায়িত্ব নিয়ে তাদের সাথে নম্রতা করবে, তুমি তার সাথে নম্রতা করো। "২৬৫
পক্ষান্তরে যার মাঝে নম্রতা নেই, সে নেতৃত্বের যোগ্য নয়। কঠোর ব্যক্তি নেতা হতে পারে না। হলেও তার নেতৃত্ব টিঁকতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ شَرَّ الرَّعَاءِ الْحُطَمَةُ
"নিকৃষ্ট রাখাল হল সেই, যে রাখালিতে বড় কঠোর।”২৬৬
দাওয়াতের কাজেও নম্রতা দরকার। গরম হয়ে দাওয়াত দিলে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। নরম কথার মাধ্যমে দাওয়াত দিলে গ্রহণযোগ্যতার আশা থাকে। মহান আল্লাহ মূসা ও হারুন (আলাইহিমাস সালাম) কে বলেছিলেন,
اذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى - فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيْنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى
"তোমরা দু'জন ফিরাউনের নিকট যাও, সে তো সীমালংঘন করেছে। তোমরা তার সাথে নম্র কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে, অথবা ভয় করবে।”২৬৭
আপনি একজন গণ্যমান্য আলেম বলেই আপনি উপদেশে যার-তার জন্য কঠোর ভাষা প্রয়োগ করতে পারেন না। আপনার প্রভাব থাকলেও নরম ভাষা ও আচরণ প্রদর্শন করা উত্তম। বাদশা মামুনের নিকট এক ওয়াযকারী কঠোর ভাষায় তাঁকে ওয়ায-নসীহত করতে শুরু করলে তিনি তার উদ্দেশ্যে বললেন, 'হে অমুক! নম্রভাবে কথা বলুন। আল্লাহ তাআলা আপনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি (মূসা ও হারুন)কে আমার চেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ (ফিরআউন) এর নিকট পাঠিয়ে তাঁদেরকে নম্রভাবে কথা বলতে আদেশ দিয়েছিলেন।'
জাহেল ও মূর্খ মানুষের সাথেও নম্র আচরণ চরিত্রবান দাঈর কর্তব্য। এর নমুনা রয়েছে নববী দাওয়াতে। আবূ হুরাইরা বলেন, এক বেদুঈন মসজিদের ভিতরে প্রস্রাব ক'রে দিল। সুতরাং লোকেরা তাকে ধমক দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল। নবী বললেন,
دَعُوهُ وَأَرِيقُوا عَلَى بَوْلِهِ سَجُلاً مِنْ مَاءٍ ، أَوْ ذَنُوباً مِنْ مَاءٍ ، فَإِنَّمَا بُعِثْتُمْ مُيَسِّرِينَ وَلَمْ تُبْعَثُوا مُعَسِّرِينَ
“ওকে ছেড়ে দাও এবং প্রস্রাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। কেননা তোমাদেরকে সহজ নীতি অবলম্বন করার জন্য পাঠানো হয়েছে, কঠোর নীতি অবলম্বন করার জন্য পাঠানো হয়নি।”২৬৮
দাওয়াতের ক্ষেত্রে বিশেষ নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেছেন,
يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا ، وَبَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا
"তোমরা সহজ কর, কঠিন করো না এবং (লোকেদেরকে) সুসংবাদ দাও। তাদের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি করো না।”২৬৯
সংসারেও নরম হতে হয়। সেখানে এমন কিছু ঘটে, যা দেখেও না দেখার ভান করতে হয়, শুনেও না শোনার অভিনয় করতে হয়। নচেৎ সংসার চলতে পারে না। টানে ও ঠেলায় চলা সংসার-পথ ভুল হয়ে যায়। কঠোর হতে গিয়ে হাতুড়ির আঘাত পড়ে কাঁচের উপর। পরিণামে দাম্পত্যের ঠুনকো শিশমহল ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
তবে সংসারে বিনম হওয়ার মানে 'দাইয়ুস' হওয়া নয়। 'মাটির মানুষ' হওয়া ভালো, কিন্তু প্রয়োজনে কঠোর হওয়াও সচ্চরিত্রবান স্বামীর আচরণ। নরম মানুষ হয়ে যদি পরিবারের নোংরামিতে বাধা না দেয়, তাহলে তার জন্য জান্নাতে ঠাঁই নেই। মহানবী বলেছেন,
ثَلَاثَةٌ قَدْ حَرَّمَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى عَلَيْهِمُ الْجَنَّةَ مُدْمِنُ الْخَمْرِ وَالْعَاقُ وَالدَّيُّوتُ الَّذِي يُقِرُّ فِي أَهْلِهِ الْخُبْتَ
"তিন শ্রেণীর লোকের জন্য আল্লাহ তাবারাকা অতাআলা জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। অব্যাহতভাবে মদ পানকারী, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান এবং এমন বেহায়া, যে তার পরিবারের অশ্লীলতাকে মেনে নেয়।"২৭০
তদনুরূপ নম্র হওয়া মানে দুর্বল হওয়া নয়, নয় লাঞ্ছনাকে বরণ করা। বিনয়ী হওয়া মানে তোষামদ করাও নয়। আর আল্লাহই সঠিক পথের দিশারী।
আপনার পার্শ্বকে নরম করুন আপনার পাশে দণ্ডায়মান ব্যক্তির জন্য, আপনার পাশে উপবিষ্ট ব্যক্তির জন্য। তবে বেগানা মহিলা হলে পার্শ্বকে দূরে রাখুন। তবেই আপনি সুন্দর চরিত্রবান মুসলিম।

টিকাঃ
২৫৯. সূরা আলে ইমরান-৩: ১৫৯
২৬০. বুখারী ৬৯২৭
২৬১. মুসলিম ৬৭৬৬
২৬২. মুসলিম ৬৭৬৭, আবু দাউদ ৪৮০৮
২৬৩. মুসলিম ৬৭৬৫, আবু দাউদ ৪৮০৯
২৬৪. তিরমিযী ২৪৮৮, সহীহুল জামে' ২৬০৯
২৬৫. মুসলিম ৪৮২৬
২৬৬. মুসলিম ৪৮৩৬
২৬৭. সূরা ত্বা-হা: ৪৩-৪৪
২৬৮. বুখারী ২২০, ৬১২৮
২৬৯. বুখারী ৬৯, মুসলিম ৪৬২৬
২৭০. আহমাদ ৫৩৭২, ৬১১৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00