📄 উদারতা
উদারতা এক সচ্চরিত্রতার নাম। অতিরঞ্জন, গোঁড়ামি ও বাড়াবাড়ির চরিত্র পছন্দনীয় নয় ইসলামে। উদারতা ও সরলতা ইসলামে বরণীয়। ধার্মিকতার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'কোন্ দ্বীন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয়?' তিনি বললেন,
الْحَنِيفِيَّةُ السَّمْحَةُ
“একনিষ্ঠ সরল।”১৬০
এ ধর্মে সংকীর্ণতা নেই। এ ধর্মের মানুষদের মাঝে অস্পৃশ্যতা নেই। বলপূর্বক কারো ঘাড়ে ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার রীতি নেই ইসলামে। আর যে চাপে পড়ে ইসলাম গ্রহণ করে, তার ইসলাম গ্রহণযোগ্যও নয় আল্লাহর কাছে।
চরিত্রবান মুসলিম অমুসলিমকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে না। সে তার কথাবার্তা ও আচরণে অমুসলিমদের মনে ইসলামের প্রতি বিকর্ষণ ও বিতৃষ্ণা সৃষ্টি করে না।
চরিত্রবান মুসলিম অমুসলিমের পাশাপাশি শান্তির সাথে বসবাস করে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখে, পার্থিব লেনদেনে শরীক হয় এবং তাদের হিদায়াত কামনা করে। যেহেতু মহান প্রতিপালক বলেছেন,
لَا يَنْهَاكُمُ اللهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
"দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে স্বদেশ হতে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায় বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়-পরায়ণদেরকে ভালবাসেন।"১৬১
কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সব ধর্ম সমান মানতে হবে। যেহেতু ইসলামই মহান আল্লাহর প্রেরিত একমাত্র ধর্ম।
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الإِسْلَامُ
“নিশ্চয় ইসলাম আল্লাহর নিকট (একমাত্র মনোনীত) ধর্ম।”১৬২
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْلامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
“যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম অন্বেষণ করবে, তার পক্ষ হতে তা কখনও গ্রহণ করা হবে না। আর সে হবে পরলোকে ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত।”১৬৩
উদারতা বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার মানে এই নয় যে, মুসলিম- অমুসলিম বৈবাহিক সম্পর্ক কায়েম করতে হবে। পরস্পরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগদান করতে হবে। যদি কেউ অন্যায় ও অসত্যের সাথে আপোস করতে বলে, তাহলে তাকে বলুন,
قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ - لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ - وَلا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ - وَلَا أَنَا عَابِدٌ مَا عَبَدتُّمْ - وَلا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ - لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ
"বল, হে অস্বীকারকারীর দল! আমি তার ইবাদত করি না, যার ইবাদত তোমরা কর এবং তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও, যাঁর ইবাদত আমি করি। এবং আমি ইবাদতকারী নই তার, যার ইবাদত তোমরা ক'রে থাক। এবং তোমরা তাঁর ইবাদতকারী নও, যাঁর ইবাদত আমি করি। তোমাদের দ্বীন (শির্ক) তোমাদের জন্য এবং আমার দ্বীন (ইসলাম) আমার জন্য।”১৬৪
ব্যবসা-বাণিজ্যে ও আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে উদার ও সরল হয় চরিত্রবান মুসলিম। যেহেতু এমন মানুষ মহানবী এর দুআতে শামিল হয়। তিনি বলেছেন,
رَحِمَ اللَّهُ رَجُلًا سَمْحًا إِذَا بَاعَ وَإِذَا اشْتَرَى وَإِذَا اقْتَضَى
“আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি রহম করুন, যে বিক্রয়কালে উদার, ক্রয়কালে উদার, ঋণ পরিশোধ কালে উদার এবং ঋণ আদায়কালেও উদার।”১৬৫
নিজ স্বামী-সংসারে সরলা হয় চরিত্রবতী মুসলিম নারী। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির ব্যাপারে কোন সংকীর্ণতার শিকার হয় না সে। যা জোটে তাই খায়, তাই পরে। অতিরিক্ত কিছুর জন্য চাপ সৃষ্টি বা অভিমান করে না। স্বামীর অকৃতজ্ঞতা করে না।
সরল মনে স্বামীর ভালোবাসার অধিকারিণী হয়। তার সাথে কোন ছলাকলা বা চাতুর্য ব্যবহার ক'রে তাকে ধোঁকা দেয় না। সংসারের কারো প্রতি হিংসা করে না। তার মনে কারো প্রতি কোন কূটিলতা থাকে না, প্যাঁচ থাকে না। কথায় হয় অকপট ও সরল। প্রত্যেক স্বামী চায় এমনই সহধর্মিণী।
'আমি চাই শিশু হেন উলঙ্গ পরাণ, মুখে মাখা সরলতা, কয় না সাজানো কথা, জানে না যোগাতে মন করি নানা ভান। প্রাণ খোলা, মন খোলা, আপনি আপনা ভোলা, তার স্নেহ-প্রীতি সবি হৃদয়ের টান। আমি চাই স্বরগের উলঙ্গ পরাণ।।'
স্ত্রীর জন্যও চরিত্রবান স্বামী হয় উদার-চিত্ত। ভালোবাসায় উজাড় করা বুক, সরল বাক্যে প্রেম ও হাসি-ভরা মুখ এবং ক্ষমাশীলতা প্রয়োগ ক'রে স্ত্রীর ভুলকে ফুল দ্বারা পরিণত করে। চলার পথে একটা দোষ দেখে তার অন্য গুণাবলীকে দৃষ্টিচ্যুত করে না। মহানবী এর নির্দেশ,
لا يَفْرَكُ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقاً رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
"কোন ঈমানদার পুরুষ যেন কোন ঈমানদার নারী (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। যদি সে তার একটি আচরণে অসন্তুষ্ট হয়, তবে অন্য আচরণে সন্তুষ্ট হবে। "১৬৬
তবে সরল হওয়া মানে আঁচল-ধরা 'দাইয়ুস' হওয়া নয়। কারণ তা হলে তো বেহেশতই নিষিদ্ধ হয়ে যাবে তার জন্য।
উদার হওয়ার মানে এই নয় যে, স্ত্রীকে বেপর্দা করতে হবে, বেগানার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতে দিতে হবে, মিশ্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে পাঠাতে হবে, বয়ফ্রেণ্ড গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে, একাকিনী বাজার যাওয়ার বা সফর করার অনুমতি দিতে হবে, পুরুষদের সাথে চাকরি করতে দিতে হবে, ইচ্ছামতো থাকার ও বাইরে যাওয়া-আসার স্বাধীনতা দিতে হবে ইত্যাদি। যেহেতু স্বাধীনতা পুণ্যময়ী স্ত্রীকেও নষ্ট ক'রে ফেলে।
এ বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ অনুদার। অধিকাংশ মানুষ হক জানে না, হক মানে না। হক গ্রহণে উদারতা প্রদর্শন করে না, বরং ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে। হক মানতে তর্ক-বিতর্ক করে। এই শ্রেণীর বিতর্কপ্রিয় মানুষদের কথা মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবের একাধিক জায়গায় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন,
وَمَا نُرْسِلُ الْمُرْسَلِينَ إِلَّا مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَيُجَادِلُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِالْبَاطِلِ لِيُدْحِضُوا بِهِ الْحَقَّ وَاتَّخَذُوا آيَاتِي وَمَا أُنذِرُوا هُزُوًا
"আমি শুধু সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপেই রসূলদেরকে পাঠিয়ে থাকি, কিন্তু সত্য প্রত্যাখ্যানকারীরা মিথ্যা অবলম্বনে বিতণ্ডা করে; যাতে তার দ্বারা সত্যকে ব্যর্থ ক'রে দেয়। আর তারা আমার নিদর্শনাবলী ও যার দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে, সে সবকে বিদ্রূপের বিষয়রূপে গ্রহণ ক'রে থাকে।"১৬৭
مَا يُجَادِلُ فِي آيَاتِ اللهِ إِلَّا الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَا يَغْرُرُكَ تَقَلُّبُهُمْ فِي الْبِلَادِ
"কেবল অবিশ্বাসীরাই আল্লাহর নিদর্শনসমূহ সম্বন্ধে বিতর্ক করে, সুতরাং দেশে-দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন তোমাকে বিভ্রান্ত না করে।"১৬৮
كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمُ نُوحٍ وَالْأَحْزَابُ مِن بَعْدِهِمْ وَهَمَّتْ كُلُّ أُمَّةٍ بِرَسُولِهِمْ لِيَأْخُذُوهُ وَجَادَلُوا بِالْبَاطِلِ لِيُدْخِضُوا بِهِ الْحَقَّ فَأَخَذْتُهُمْ فَكَيْفَ كَانَ عِقَابِ
"কেবল অবিশ্বাসীরাই আল্লাহর নিদর্শনসমূহ সম্বন্ধে বিতর্ক করে, সুতরাং দেশে-দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন তোমাকে বিভ্রান্ত না করে। এদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়ও নবীগণকে মিথ্যাবাদী বলেছিল এবং তাদের পরে অন্যান্য দলও। প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ রসূলকে নিরস্ত করার অভিসন্ধি করেছিল এবং ওরা সত্যকে ব্যর্থ ক'রে দেওয়ার জন্য অসার যুক্তি-তর্কে লিপ্ত হয়েছিল, ফলে আমি ওদেরকে পাকড়াও করলাম। সুতরাং কত কঠোর ছিল আমার শাস্তি!”১৬৯
وَمِنَ النَّاسِ مَن يُجَادِلُ فِي اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّبِعُ كُلَّ شَيْطَانٍ مَّرِيدٍ
"মানুষের মধ্যে কতক আছে যারা অজ্ঞানতাবশতঃ আল্লাহ সম্বন্ধে বিতণ্ডা করে এবং অনুসরণ করে প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তানের।"১৭০
وَمِنَ النَّاسِ مَن يُجَادِلُ فِي اللهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَلَا هُدًى وَلَا كِتَابٍ مُّنِيرٍ - ثَانِيَ عِطْفِهِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللهِ لَهُ فِي الدُّنْيَا خِزْيٌ وَنُذِيقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَذَابَ الْحَرِيقِ - ذَلِكَ بِمَا قَدَّمَتْ يَدَاكَ وَأَنَّ اللَّهَ لَيْسَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ
“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ জ্ঞান, পথনির্দেশ ও দীপ্তিমান কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্বন্ধে বিতণ্ডা করে। (সে বিতণ্ডা করে) ঘাড় বাঁকিয়ে, লোকদেরকে আল্লাহর পথ হতে ভ্রষ্ট করবার জন্য; তার জন্য ইহলোকে রয়েছে লাঞ্ছনা। আর কিয়ামতের দিন আমি তাকে আস্বাদ করাব জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি। (সেদিন তাকে বলা হবে,) এটা তোমার কৃতকর্মেরই ফল। নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দাদের প্রতি অত্যাচার করেন না।” (হাজ্জ: ৪-১০)
الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي آيَاتِ اللهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ أَتَاهُمْ كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ وَعِندَ الَّذِينَ آمَنُوا كَذَلِكَ يَطْبَعُ اللَّهُ عَلَى كُلِّ قَلْبِ مُتَكَبِّرٍ جَبَّارٍ
“যারা নিজেদের নিকট আগত কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়---তাদের এ কাজ আল্লাহ এবং বিশ্বাসীদের নিকট অতিশয় অসন্তোষের বিষয়। এইভাবে আল্লাহ প্রত্যেক উদ্ধত ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়কে মোহর ক'রে দেন।" (মু'মিনঃ ৩৫)
إِنَّ الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي آيَاتِ اللهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ أَتَاهُمْ إِن فِي صُدُورِهِمْ إِلَّا كِبْرٌ مَّا هُم بِبَالِغِيهِ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
“যারা নিজেদের নিকট আগত কোন দলীল ছাড়াই আল্লাহর নিদর্শনাবলী সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়, ওদের অন্তরে আছে কেবল অহংকার, যা সফল হওয়ার নয়। অতএব তুমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর; নিশ্চয় তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”১৭১
পক্ষান্তরে তিনি এই উম্মতকে আমভাবে তর্ক করতে অনুমতি দেননি। বিধর্মীদের সাথে তর্ক করতে হলে সৌজন্যের সাথে করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِلَّا الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْهُمْ وَقُولُوا آمَنَّا بِالَّذِي أُنزِلَ إِلَيْنَا وَأُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَإِلَهُنَا وَإِلَهُكُمْ وَاحِدٌ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ
"সৌজন্যের সাথে ছাড়া তোমরা গ্রন্থধারী (ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান)দের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করো না; তবে ওদের মধ্যে যারা সীমালংঘনকারী, তাদের সাথে (তর্ক) নয়। আর বল, 'আমাদের প্রতি এবং তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাতে আমরা বিশ্বাস করি এবং আমাদের উপাস্য ও তোমাদের উপাস্য তো একই এবং আমরা তাঁরই প্রতি আত্মসমর্পণকারী। "১৭২
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
"তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা কর সভাবে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক, তাঁর পথ ছেড়ে কে বিপথগামী হয়, সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত এবং কে সৎপথে আছে তাও সবিশেষ অবহিত। "১৭৩
আর স্বধর্মাবলম্বীদের সাথে তর্ক করতে আমভাবে নিষেধ করা হয়েছে। বিশেষ ক'রে আল্লাহর কিতাব ও তার অর্থ বা ব্যাখ্যা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করা মোটেই বৈধ নয়। একদা কুরআনী কোন বিষয় নিয়ে কিছু সাহাবাকে তর্ক করতে দেখে নবী বললেন,
مَهْلًا يَا قَوْمِ بِهَذَا أُهْلِكَتْ الْأُمَمُ مِنْ قَبْلِكُمْ بِاخْتِلَافِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ وَضَرْبِهِمُ الْكُتُبَ بَعْضَهَا بِبَعْضٍ إِنَّ الْقُرْآنَ لَمْ يَنْزِلُ يُكَذِّبُ بَعْضُهُ بَعْضًا بَلْ يُصَدِّقُ بَعْضُهُ بَعْضًا فَمَا عَرَفْتُمْ مِنْهُ فَاعْمَلُوا بِهِ وَمَا جَهِلْتُمْ مِنْهُ فَرُدُّوهُ إِلَى عَالِمِهِ
"থামো হে লোক সকল! নবীদের ব্যাপারে মতভেদ এবং কিতাবের একাংশকে অন্য অংশের সাথে সংঘর্ষ সৃষ্টি ক'রে তোমাদের পূর্বের বহু জাতি ধ্বংস হয়েছে। কুরআন এভাবে অবতীর্ণ হয়নি যে, তার একাংশ অন্য অংশকে মিথ্যায়ন করবে। বরং তার একাংশ অন্য অংশকে সত্যায়ন করে। সুতরাং যা তোমরা বুঝতে পার, তার উপর আমল কর এবং যা বুঝতে পার না, তা তার জ্ঞানীর দিকে ফিরিয়ে দাও। "১৭৪
তিনি আরো বলেছেন,
الْمِرَاءُ فِي الْقُرْآنِ كُفْرُ
"কুরআন বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ করা কুফরী।”১৭৫
আসলে চরিত্রবান উদার হয়, মু'মিনের ঈমান হয় অকপট প্রত্যয় ও সরল বিশ্বাস, মুসলিমের ইসলাম হয় দ্বিধাহীন আত্মসমর্পণ ও নিষ্ঠার সাথে আনুগত্য। তার তর্কের প্রয়োজন হয় না, তর্কে জড়ায়ও না। যেহেতু সে বিতর্ক করতে আদিষ্ট নয়, সে আদিষ্ট প্রচার করতে ও পৌঁছে দিতে। আসলে তর্ক করে মুসলিম সমাজে বসবাসকারী মুসলিম নামধারী কিছু মুনাফিক অথবা কাফেরদের ছত্রছায়ায় বসবাসকারী কিছু ক্রীতমস্তিষ্কের মুর্তাদ। তারাই কুরআন নিয়ে নানা সন্দিহান ও বিতর্ক সৃষ্টি ক'রে ভিতর থেকে ইসলামকে দুর্বল করার অপচেষ্টা করে। আর সত্য কথা এই যে, তারা তর্কে সফলতা লাভ করে। মহানবী বলেছেন,
لَا تُجَادِلُوا بِالْقُرْآنِ وَلَا تُكَذِّبُوا كِتَابَ اللهِ بَعْضَهُ بِبَعْضٍ فَوَاللَّهِ إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَيُجَادِلُ بِالْقُرْآنِ فَيُغْلَبُ وَإِنَّ الْمُنَافِقَ لَيُجَادِلُ بِالْقُرْآنِ فَيَغْلِبُ»
"তোমরা কুরআন নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করো না এবং আল্লাহর কিতাবের কিছু অংশ দ্বারা কিছু অংশকে মিথ্যাজ্ঞান করো না। আল্লাহর কসম! মু'মিন কুরআন নিয়ে বিতর্ক করলে পরাজিত হবে এবং মুনাফিক কুরআন নিয়ে বিতর্ক করলে বিজয়ী হবে।"১৭৬
যিয়াদ বিন হুদাইর বলেন, একদা আমাকে উমার বললেন, 'তুমি জান কি, ইসলামকে কিসে ধ্বংস করবে?' আমি বললাম, 'জী না।' তিনি বললেন,
يَهْدِمُهُ زَلَّةُ الْعَالِمِ، وَجِدَالُ الْمُنَافِقِ بِالْكِتَابِ وَحُكْمُ الْأَئِمَّةِ الْمُضِلَّينَ
'ইসলামকে ধ্বংস করবে আলেমের পদস্খলন, কুরআন নিয়ে মুনাফিকের বিতর্ক এবং ভ্রষ্টকারী শাসকদের রাষ্ট্রশাসন।'১৭৭
উদার হওয়া ভালো, তর্ক করা ভালো নয়। প্রকৃত আলেম তর্কে জড়ান না। তর্ক করার জন্য ইলম শিক্ষা করাও বৈধ নয়। মহানবী বলেছেন,
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِيُجَارِيَ بِهِ الْعُلَمَاءَ ، أَوْ لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ ، أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْهِ ، أَدْخَلَهُ اللَّهُ النَّارَ
"যে ব্যক্তি উলামাদের সাথে তর্ক করার জন্য, অথবা মূর্খ লোকেদের সাথে বচসা করার জন্য এবং জন সাধারণের সমর্থন (বা অর্থ) কুড়াবার জন্য ইলম অন্বেষণ করে, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ জাহান্নাম প্রবেশ করাবেন।"১৭৮
لَا تَعَلَّمُوا الْعِلْمَ لِتُبَاهُوا بِهِ الْعُلَمَاءَ ، وَلَا لِتُمَارُوا بِهِ السُّفَهَاءَ ، وَلَا تَخَيَّرُوا بِهِ الْمَجَالِسَ، فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ ، فَالنَّارُ النَّارُ
"তোমরা উলামাগণের সাথে তর্ক-বাহাস করার উদ্দেশ্যে ইলম শিক্ষা করো না, ইলম দ্বারা মূর্খ লোকেদের সাথে বাগ্বিতণ্ডা করো না এবং তদ্দ্বারা আসন, পদ বা নেতৃত্ব) লাভের আশা করো না। কারণ, যে ব্যক্তি তা করে তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম, তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম।"১৭৯
তর্কে অনেক সময় হককে বাতিল প্রতিপন্ন করা হয়। আর সে ক্ষেত্রে ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কী লাভ হয়? আর এই জন্যই মহানবী বলেছেন,
مَا ضَلَّ قَوْمٌ بَعْدَ هُدًى كَانُوا عَلَيْهِ إِلَّا أُوتُوا الْجَدَلَ ثُمَّ قَرَأَ مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ
"হিদায়াতপ্রাপ্তির পর যে জাতিই পথভ্রষ্ট হয়েছে সেই জাতির মধ্যেই কলহ-প্রিয়তা প্রক্ষিপ্ত হয়েছে।" অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন।
مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا، بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ
অর্থাৎ, তারা তোমার সামনে যে উদাহরণ পেশ করে, তা কেবল বিতর্কের জন্যই করে। বস্তুতঃ তারা হল এক বিতর্ককারী সম্প্রদায়। ১৮০
তর্কপ্রিয় মানুষ মহান প্রতিপালকের নিকট পছন্দনীয় নয়। বরং সে তাঁর নিকট সবচেয়ে ঘৃণ্য। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ أَبْغَضَ الرِّجَالِ إِلَى اللَّهِ الأَلَدُّ الْخَصِمُ
"আল্লাহর নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট শ্রেণীর মানুষ হল কঠিন ঝগড়াটে ও হুজ্জতকারী ব্যক্তি।"১৮১
হকপন্থী ও সত্যাশ্রয়ী নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও তর্ক করা উচিত নয়। যে তর্ক করে না, সে চরিত্রবান। তার জন্য রয়েছে বেহেস্তী মহল। মহানবী বলেছেন,
أَنَا زَعِيمٌ بِبَيْتٍ فِي رَبَضِ الْجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ الْمِرَاءَ وَإِنْ كَانَ مُحِقًّا وَبِبَيْتٍ فِي وَسَطِ الْجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ الْكَذِبَ وَإِنْ كَانَ مَازِحًا وَبِبَيْتٍ فِي أَعْلَى الْجَنَّةِ لِمَنْ حَسَّنَ خُلُقَهُ
"আমি জান্নাতের পার্শ্বে এক গৃহের জামিন সেই ব্যক্তির জন্য যে সত্যাশ্রয়ী হওয়া সত্ত্বেও তর্ক বর্জন করে, জান্নাতের মাঝে এক গৃহের জামিন তার জন্য যে উপহাস ছলেও মিথ্যা ত্যাগ করে এবং জান্নাতের সবার উপরে এক গৃহের জামিন তার জন্য যার চরিত্র সুন্দর হয়।"১৮২
আর বাতিলপন্থী হয়ে জেনেশুনে তর্ক করা অবশ্যই চরিত্রবান মানুষের কর্ম নয়। এমন লোক মহান প্রতিপালকের ক্রোধভাজন। মহানবী বলেছেন,
وَمَنْ خَاصَمَ فِي بَاطِلٍ وَهُوَ يَعْلَمُهُ لَمْ يَزَلْ فِي سَخَطِ اللَّهِ حَتَّى يَنْزِعَ عَنْهُ
"--যে ব্যক্তি জেনেশুনে কোন বাতিল (অন্যায়) বিষয়ে তর্ক করে, সে ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর রোষে থাকে; যতক্ষণ পর্যন্ত সে তা বর্জন না করে।"১৮৩
তর্ক না করার ব্যাপারে জ্ঞানীদের উপদেশ হল :
১। তর্ক করো না, কারণ তর্কে জেতা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তর্কে না জড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ।
২। কোন ধৈর্যশীল বা আহমকের সাথে তর্ক করো না। কারণ, ধৈর্যশীল তোমাকে পরাজিত করবে এবং আহমক তোমাকে ক্লিষ্ট করবে।
৩। আহমকের সঙ্গে তর্ক করো না, কারণ লোকে তোমাদের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে ভুল করতে পারে।
৪। আরবী কবি বলেছেন,
إذا نطق السفيه فلا تجبه " فخير من إجابته السكوت
অর্থাৎ, আহমক যখন কথা বলে, তখন তুমি তার কথার জবাব দিয়ো না। যেহেতু তার কথার জবাব দেওয়া অপেক্ষা চুপ থাকা উত্তম।
আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
"তারাই পরম দয়াময়ের দাস, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, ‘সালাম’।"১৮৪
وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ وَقَالُوا لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِي الْجَاهِلِينَ
"ওরা যখন অসার বাক্য শ্রবণ করে, তখন ওরা তা পরিহার ক'রে চলে এবং বলে, 'আমাদের কাজের জন্য আমরা দায়ী এবং তোমাদের কাজের জন্য তোমরা দায়ী; তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা অজ্ঞদের সঙ্গ চাই না। "১৮৫
৫। মূর্খের সাথে তর্কযুদ্ধ বা বাক্যুদ্ধ করার মানেই হল পাথরের উপর হাত দিয়ে আঘাত করা। হাতই ক্ষত-বিক্ষত হবে, পাথরের কী হবে? কারণ, তা তো নির্জীব।
৬। বচনবাগিশ আর মূর্খের সাথে খবরদার তর্ক করো না। কারণ, প্রথমোক্তের কাছে তুমি পরাজিত হবে এবং দ্বিতীয়োক্তের কাছে হবে অপমানিত।
৭। জ্ঞানী যদি মূর্খের মোকাবিলায় পড়ে তবে তার নিকট থেকে সম্মানের আশা করা ঠিক নয়। আর কোন মূর্খ যদি জ্ঞানী লোকের মোকাবিলায় জিতে যায়, তবে আশ্চর্যের কিছু নয়। কারণ, পাথরের আঘাতে মুক্তার বিনাশ সহজেই হয়ে থাকে। ১৮৬
৮। একটি মূল্যহীন পাথর যদি সোনার পাত্র ভেঙ্গে ফেলে, তাহলে তাতে পাথরের কোন প্রকার মূল্য বৃদ্ধি হয় না এবং সোনারও কোন প্রকার মূল্য হ্রাস হয় না। ১৮৭
৯। মূর্খদের মজলিসে কোন জ্ঞানী ব্যক্তির কথা না চললে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নয়। কারণ, ঢাকের শব্দের কাছে তবলার শব্দ বিলীন হওয়া এবং রসুনের দুর্গন্ধের কাছে ধূপের সুগন্ধ বিলুপ্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। ১৮৮
১০। একজন মূর্খ কোন জ্ঞানী ব্যক্তিকে তর্কে হারিয়ে দিলে সে আস্ফালন করতে থাকে। কিন্তু তার এ কথা জানা নেই যে, ঢাকের ঢপঢপে শব্দের মাঝে মোহন বাঁশীর সুর বিলীন হয়ে যায়। ১৮৯
১১। মুহাম্মাদ বিন হুসাইন বলেন, কারো সাথে হুজ্জত করো না। কারণ, হুজ্জত দ্বীন নষ্ট করে দেয় এবং হৃদয়ে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে।
পরিশেষে বলি, তর্কে কোন লাভ নেই। তর্কে হককে বাতিল প্রতিপন্ন করা হতে পারে। তর্কে দলীল হারিয়ে প্রতিপক্ষ গালাগালি ও অসভ্য ভাষা প্রয়োগ করে। পরে বাড়াবাড়ি হয়ে তা মারামারিতে পৌঁছে যেতে পারে। যেহেতু তর্কে নিজের ঘোলকে কেউ টক বলে না।
'সকল পীড়ার ঔষধের সার সুরা, সুরাপায়ী কয় রে, যে যাহার বশ গায় তার যশ শুনে মূঢ় বশ হয় রে।'
তাই কেউ হক না মানলে আপনি তার সাথে তর্ক করবেন না। আপনার কাজ হক পৌঁছে দেওয়া। হিদায়াতের মালিক আল্লাহ।
সংসার-ধর্মেও আপনি তর্ক বর্জন করুন। কথায়-কথায় তর্ক করলে লোক আপনার নিকট থেকে সরে যাবে, আপনার সাথে কেউ দেখা করতেও চাইবে না। তর্কাতর্কিতে ভালোবাসা মলিন হতে থাকে। বিশেষ ক'রে আপনি ছোট হলে বড়দের সাথে তর্ক করবেন না, করলে আপনি তার কাছে অপ্রিয় ও অবাঞ্ছিত হয়ে যাবেন। কারো কথা পছন্দ না হলে অথবা অযৌক্তিক লাগলে এবং মেনে নিতে না পারলেও তর্ক বর্জন করুন। তাতে শান্তি পাবেন, স্বস্তি পাবেন। নচেৎ এমনও হতে পারে, তর্ক এক সময় নিয়ে যাবে গালাগালিতে। অতঃপর শেষ হবে মারামারিতে।
টিকাঃ
১৬০. আহমাদ ২১০৭, আল-আদাবুল মুফরাদ বুখারী ২৮৩, সিঃ সহীহাহ ৮৮১
১৬১. সূরা মুমতাহিনাহ: ৮
১৬২. সূরা আলে ইমরান-৩: ১৯
১৬৩. সূরা আলে ইমরান-৩: ৮৫
১৬৪. সূরা কাফিরুন
১৬৫. বুখারী ২০৭৬, ইবনে মাজাহ ২২০৩, সহীহুল জামে' ৩৪৯৫
১৬৬. মুসলিম ১৪৬৯
১৬৭. সূরা কাহফ: ৫৬
১৬৮. সূরা মু'মিন: 4
১৬৯. সূরা মু'মিন: ৪-৫
১৭০. সূরা হাজ্জ:৩
১৭১. সূরা মু'মিন: ৫৬
১৭২. সূরা আনকাবূত: ৪৬
১৭৩. সূরা নাহল: ১২৫
১৭৪. আহমাদ ৬৭০২, শারহুল আক্বীদাতিত ত্বাহাবিয়্যাহ ১/২১৮
১৭৫. আবু দাউদ ৪৬০৫, ইবনে হিব্বান ১৪৬৪, সহীহ তারগীব ১৩৮
১৭৬. তাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৪৪৭
১৭৭. দারেমী ২১৪
১৭৮. তিরমিযী ২৬৫৪, ইবনে আবিদ্দুনয়্যা, হাকেম ২৯৩, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭৭২, সহীহ তারগীব ১০০
১৭৯. ইবনে মাজাহ ২৫৪, ইবনে হিব্বান ৭৭, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭৭১, সহীহ তারগীব ১০১
১৮০. সূরা যুখরুফ ৫৮ আয়াত, আহমাদ ২২১৬৪, ২২২০৪, তিরমিযী ৩২৫৩, ইবনে মাজাহ ৪৮, ইবনে আবিদ্দুনয়্যা, সহীহ তারগীব ১৩৬
১৮১. বুখারী ২৪৫৭, মুসলিম ৬৯৫১নং প্রমুখ
১৮২. আবু দাউদ ৪৮০২, তাবারানী ৭৩৬১
১৮৩. আবু দাউদ ৩৫৯৭, হাকেম ২/২৭, ত্বাবারানী, বাইহাকী, সহীহুল জামে' ৬১৯৬
১৮৪. সূরা ফুরক্বান: ৬৩
১৮৫. সূরা ক্বাস্বাস: ৫৫
১৮৬. শেখ সা'দী
১৮৭. শেখ সা'দী
১৮৮. শেখ সা'দী
১৮৯. শেখ সা'দী
📄 সহিষ্ণুতা
চরিত্রবান নারী-পুরুষের একটি মহৎ গুণ হল সহিষ্ণুতা ও সহনশীলতা। দেখবেন তাদের প্রতি দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে, দুর্ব্যবহারের প্রতিশোধে অনুরূপ দুর্ব্যবহার করার ক্ষমতা অথবা তার শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা সে ক্ষমতা প্রয়োগ করছে না। নিজের প্রতি কৃত অন্যায়কে সহ্য করে যাচ্ছে। তারা দ্বীনের ব্যাপারে কোন অন্যায়াচরণকে বরদাস্ত করে না, কিন্তু নিজের ব্যাপারে অপরের অন্যায়াচরণকে বরদাস্ত ও হজম ক'রে নিচ্ছে।
শত্রুর শত্রুতার বিরুদ্ধে সংযম ও সহিষ্ণুতার নীতি অবলম্বন করছে। বিরোধীর বিরোধিতার নীতির ব্যাপারে সহনশীলতা অবলম্বন করছে। হিংসুকের হিংসার ছোবলে পড়েও সহিষ্ণু হয়ে জীবন-যাপন করছে। অবাধ্য স্ত্রী-সন্তানের ব্যাপারেও সহিষ্ণুতা অবলম্বন ক'রে চলেছে। অত্যাচারী স্বামী-শ্বাশুড়ীর অত্যাচারের মুখে সহনশীলতার আদর্শ প্রদর্শন ক'রে চলেছে।
বারবার ভুলকারী দাস-দাসী ও ভৃত্য-চাকরের ভুলে সহনশীলতার সদাচার প্রয়োগ ক'রে চলেছে।
যালেম প্রশাসনের স্টিম রুলারের নিচে পিষ্ট হয়েও সহ্যশীলতার নীতি আঁকড়ে ধারণ ক'রে আছে।
প্রতিদ্বন্দ্বীদের কটাক্ষ ও গালাগালির বিরুদ্ধেও সহিষ্ণু হওয়া ও ক্ষয়িষ্ণু না হওয়ার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
যার প্রতি উপকার করা হয়েছে, কিন্তু সে অকৃতজ্ঞ, এমন নেমকহারামের বিরুদ্ধে সহিষ্ণুতার নীতি অবলম্বন ক'রে সংসার করছে।
তারা তা পারবে না কেন? তাদের আদর্শ যে সহিষ্ণু নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,
مَا خُيْرَ رَسُولُ اللهِ ﷺ بَيْنَ أَمْرَيْنِ قَطُّ إِلَّا أَخَذَ أَيْسَرَهُمَا ، مَا لَمْ يَكُنْ إِثماً ، فَإِنْ كَانَ إِثماً ، كَانَ أَبْعَدَ النَّاسِ مِنْهُ وَمَا انْتَقَمَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِنَفْسِهِ فِي شَيْءٍ قَطُّ، إِلَّا أَن تُنْتَهَكَ حُرْمَةُ اللَّهِ ، فَيَنْتَقِمَ اللَّهِ تَعَالَى
'রাসূলুল্লাহ কে যখনই দু'টি কাজের মধ্যে স্বাধীনতা দেওয়া হত, তখনই তিনি সে দু'টির মধ্যে সহজ কাজটি গ্রহণ করতেন; যদি সে কাজটি গর্হিত না হত। কিন্তু তা গর্হিত কাজ হলে তিনি তা থেকে সকলের চেয়ে বেশি দূরে থাকতেন। আর রাসূলুল্লাহ নিজের জন্য কখনই কোন বিষয়ে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। কিন্তু (কেউ) আল্লাহর হারামকৃত কাজ ক'রে ফেললে তিনি কেবলমাত্র মহান আল্লাহর জন্য প্রতিশোধ নিতেন। ১১৯০
তিনি আরো বলেছেন, 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ব্যতীত রাসূলুল্লাহ কখনো কাউকে স্বহস্তে মারেননি, না কোন স্ত্রীকে না কোন দাস-দাসীকে। কারো দিক থেকে তিনি কোন কষ্ট পেলে কষ্টদাতার নিকট থেকে প্রতিশোধ নেননি। হ্যাঁ, যদি আল্লাহর হারামকৃত কোন জিনিস লংঘন করা হত (অর্থাৎ কেউ চুরি, ব্যভিচার ইত্যাদি কাজ ক'রে ফেলত), তাহলে মহান আল্লাহর জন্যই তিনি প্রতিশোধ নিতেন (শাস্তি দিতেন)। '১৯১
মহান আল্লাহও বড় সহিষ্ণু। বান্দাকে খেতে-পরতে দেন, আর তারা তাঁর অবাধ্যাচরণ করে। তাঁর সামনে অন্যায়াচরণ করে, নোংরামি করে। আর তিনি সব দেখেও সহ্য ক'রে যান; তড়িৎ শাস্তি দেন না। তিনি সহিষ্ণুতাকে পছন্দ করেন। যেমন তাঁর নবী ও পছন্দ করেন সহনশীলতাকে।
একদা তিনি আশাজ্ আব্দুল কায়েসকে বলেছেন,
إِنَّ فِيكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ : الْحِلْمُ وَالأَنَاةُ
"নিশ্চয় তোমার মধ্যে এমন দু'টি স্বভাব রয়েছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন; সহনশীলতা ও চিন্তা-ভাবনা ক'রে কাজ করা। "১৯২
সহিষ্ণুতার নীতির উপকারিতা কী? 'যে সয়, সে রয়। অসহিষ্ণুতা প্রদর্শনে হয়ে যায় লয়।' একটা নমুনা দেখুন বর্ণিত হাদীসে।
আবু হুরাইরা বলেন, এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার কিছু আত্মীয় আছে, আমি তাদের সাথে আত্মীয়তা বজায় রাখি, আর তারা ছিন্ন করে। আমি তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করি, আর তারা আমার সাথে দুর্ব্যবহার করে। তারা কষ্ট দিলে আমি সহ্য করি, আর তারা আমার সাথে মূর্খের আচরণ করে।' তিনি বললেন,
لَئِنْ كُنْتَ كَمَا قُلْتَ ، فَكَأَنَّمَا تُسِفُهُمُ الْمَلَّ ، وَلاَ يَزَالُ مَعَكَ مِنَ اللَّهِ ظَهِيرٌ عَلَيْهِمْ مَا دُمْتَ عَلَى ذَلِكَ
"যদি তা-ই হয়, তাহলে তুমি যেন তাদের মুখে গরম ছাই নিক্ষেপ করছ (অর্থাৎ, এ কাজে তারা গোনাহগার হয়।) এবং তোমার সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্যকারী থাকবে; যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি এর উপর অবিচল থাকবে।"১৯৩
এই সহিষ্ণু চরিত্রের মানবের মনেই সৃষ্টি হয় ক্ষমাশীলতা। এই মানব-মানবীরাই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
টিকাঃ
১৯০. বুখারী ৩৫৬০, মুসলিম ৬১৯০
১৯১. মুসলিম ৬১৯৫
১৯২. মুসলিম ১২৬
১৯৩. মুসলিম ৬৬৮৯
📄 ধৈর্যশীলতা
ধৈর্যশীলতা মানুষের একটি মহৎ গুণ। বিশেষ ক'রে দ্বীনের দাঈর মহান চরিত্রগুণ ধৈর্যধারণ করা। যেহেতু সাবালক-সাবালিকা হওয়ার পর মানুষের উপর সর্বপ্রথম ফরয হয় দ্বীনী ইল্ম শিক্ষা করা, তারপর সেই ইল্য অনুযায়ী আমল করা, তারপর তা তাবলীগ ও প্রচার করা এবং উক্ত তিন বিষয়ে ধৈর্যধারণ করা। এই বিশাল বিষয়টি সংক্ষেপে উল্লিখিত হয়েছে সূরা আল-আস্রে।
ধৈর্য ধরার মানে হল প্রিয় জিনিসের বিয়োগে অথবা অপ্রিয় জিনিসের আগমনে হা-হুতাশ, অভিযোগ, আফসোস বা আর্তনাদ না করা।
সাধারণতঃ ধৈর্যধারণ করা হয় তিন বিষয়ে: মহান আল্লাহর ফরয ও আদেশ পালনে ধৈর্য, মহান আল্লাহর নিষেধ পালন ও হারাম বর্জনে ধৈর্য এবং মহান আল্লাহর বিধির বিধানে ধৈর্য।
এটি একটি সুদীর্ঘ আলোচনা-সাপেক্ষ বিষয়। সুন্দর চরিত্র গঠনে ধৈর্যশীলতার গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য সম্পর্কে জানতে আমরা এ অবসরে কেবল কুরআন কারীম হতে কয়েকটি আয়াত নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করব। আশা করি তাই আমাদের সুন্দর চরিত্র গঠনে যথেষ্ট সহায়ক হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
فَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ وَلَا تُطِعْ مِنْهُمْ آئِمًا أَوْ كَفُورًا
“সুতরাং ধৈর্যের সাথে তোমার প্রতিপালকের ফায়সালার প্রতীক্ষা কর এবং তাদের মধ্যে যে পাপিষ্ঠ অথবা অবিশ্বাসী তার আনুগত্য করো না।” ১৯৪
وَاصْبِرْ عَلَى مَا يَقُولُونَ وَاهْجُرُهُمْ هَجْرًا جَمِيلًا
“লোকে যা বলে, তাতে তুমি ধৈর্যধারণ কর এবং সৌজন্য সহকারে তাদেরকে পরিহার ক'রে চল। ”১৯৫
فَاصْبِرْ عَلَى مَا يَقُولُونَ وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ الْغُرُوبِ
“অতএব তারা যা বলে, তাতে তুমি ধৈর্যধারণ কর এবং তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে। "১৯৬
إِن تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِن تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُوا بِهَا وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ
“যদি তোমাদের কোন মঙ্গল হয়, তাহলে তারা নাখোশ হয়, আর তোমাদের অমঙ্গল হলে তারা খোশ হয়। যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং সাবধান হয়ে চল, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না। তারা যা করে, নিশ্চয় তা আল্লাহর জ্ঞানায়ত্তে।”১৯৭
لَتَبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
“(হে বিশ্বাসিগণ!) নিশ্চয় তোমাদের ধনৈশ্বর্য ও জীবন সম্বন্ধে পরীক্ষা করা হবে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল তাদের এবং অংশীবাদী (মুশরিক) দের কাছ থেকে অবশ্যই তোমরা অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনতে পাবে। সুতরাং যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং সংযমী হও, তাহলে তা হবে দৃঢ়সংকল্পের কাজ।”১৯৮
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ وَلَئِن صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِّلصَّابِرِينَ - وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِالله وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ مِّمَّا يَمْكُرُونَ
"যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তাহলে ঠিক ততখানি করবে যতখানি অন্যায় তোমাদের প্রতি করা হয়েছে। আর যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর, তাহলে অবশ্যই ধৈর্যশীলদের জন্য সেটাই উত্তম। তুমি ধৈর্যধারণ কর; আর তোমার ধৈর্য তো হবে আল্লাহরই সাহায্যে। তাদের (অবিশ্বাসের) জন্য তুমি দুঃখ করো না এবং তাদের ষড়যন্ত্রে তুমি মনঃক্ষুণ্ণ হয়ো না।”১৯৯
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
"আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর ও নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ করো না, করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি ও প্রতিপত্তি বিলুপ্ত হবে। আর তোমরা ধৈর্য ধারণ কর; নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকেন। "২০০
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর। ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা কর এবং (শত্রুর বিপক্ষে) সদা প্রস্তুত থাক; আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।”২০১
فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُوا الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ وَلَا تَسْتَعْجِل لَّهُمْ
"অতএব তুমি ধৈর্যধারণ কর, যেমন ধৈর্যধারণ করেছিল দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ রসূলগণ এবং তাদের জন্য (শাস্তি প্রার্থনায়) তাড়াতাড়ি করো না।”২০২
মহান আল্লাহর বিধির বিধানে ধৈর্যধারণ করা অবধার্য কর্তব্য। তাঁর বিতরিত ভাগ্য ও ভাগে তুষ্ট থাকা মহৎ লোকের চরিত্র।
মানুষ বিপদগ্রস্ত হয়। কোন কোন বিপদে তার কোন এখতিয়ার থাকে না। আবার কোন বিপদ তার নিজস্ব ভুলের কারণে এসে উপস্থিত হয়। সকল বিপদেই মানুষকে ধৈর্যধারণ করতে হয়। অতএব অভাবগ্রস্ত হলে, রোগাক্রান্ত হলে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত হলে, আত্মীয়-বিয়োগ ঘটলে, অসহায় হলে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফল-ফসলের ক্ষতি হলে, ঘর-বাড়ি ধ্বংস-কবলিত হলে, ব্যবসায় বিশাল ক্ষতি হলে, চাকরি চলে গেলে, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত হলে, যালেম সরকার অথবা কোন শত্রুর অত্যাচারের শিকার হলে, শ্বশুরবাড়ি অথবা স্বামী বা স্ত্রীর নির্যাতনের শিকার হলে অথবা কোন মানুষের পক্ষ থেকে দুর্ব্যবহার বা অভব্যতার শিকার হলে ধৈর্যধারণ ছাড়া উপায় কী আছে? মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَلَئِنْ أَذَقْنَا الإِنسَانَ مِنَّا رَحْمَةً ثُمَّ نَزَعْنَاهَا مِنْهُ إِنَّهُ لَيَئُوسٌ كَفُورٌ - وَلَئِنْ أَذَقْنَاهُ نَعْمَاءَ بَعْدَ ضَرَّاءَ مَسَّتْهُ لَيَقُولَنَّ ذَهَبَ السَّيِّئَاتُ عَنِّي إِنَّهُ لَفَرِحٌ فَخُورٌ - إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُوْلَئِكَ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ
"যদি আমি মানুষকে স্বীয় অনুগ্রহ আস্বাদন করিয়ে তার নিকট হতে তা ছিনিয়ে নিই, তাহলে সে নিরাশ ও অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে। আর যদি তার উপর আপতিত কোন কষ্টের পর তাকে কোন নিয়ামত আস্বাদন করাই, তাহলে সে বলতে শুরু করে, আমার সব দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে গেল; (আর তখন) সে উৎফুল্ল অহংকারী হয়ে যায়। কিন্তু যারা ধৈর্য ধরে ও ভাল কাজ করে (তারা এরূপ হয় না); এমন লোকদের জন্য রয়েছে ক্ষমা এবং মহা প্রতিদান।”২০০
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ধৈর্য ও স্বলাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকেন।”২০৪
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوفُ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الأَمَوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
"নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা দ্বারা এবং কিছু ধনপ্রাণ এবং ফলের (ফসলের) নোকসান দ্বারা পরীক্ষা করব; আর তুমি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দাও।"২০৫
قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ اسْتَعِينُوا بِالله وَاصْبِرُوا إِنَّ الأَرْضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَن يَشَاء مِنْ عِبَادِهِ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ
"মূসা তাঁর সম্প্রদায়কে বলল, 'আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর এবং ধৈর্য ধারণ কর, রাজ্য তো আল্লাহরই! তিনি তাঁর দাসদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তার উত্তরাধিকারী করেন এবং সাবধানীদের জন্যই তো শুভ পরিণাম!”২০৬
সবরের ফল মিঠা হয়। ধৈর্যের পরিণাম শুভ হয়। মহান প্রতিপালক পার্থিব জীবনে ধৈর্যশীলদের সাথের সাথী, তাদের সাহায্যকারী। আর পরকালের জীবনে তাদেরকে দেবেন মহাপুরস্কার। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ
"ওরা যেহেতু ধৈর্যশীল ছিল তার জন্য আমি ওদের মধ্য হতে নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথপ্রদর্শন করত। ওরা ছিল আমার নিদর্শনাবলীতে দৃঢ় বিশ্বাসী।”২০৭
وَالَّذِينَ هَاجَرُوا فِي الله مِن بَعْدِ مَا ظُلِمُوا لَنُبَوِّثَنَّهُمْ فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَلَأَجْرُ الآخِرَةِ أَكْبَرُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ - الَّذِينَ صَبَرُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
"যারা অত্যাচারিত হবার পর আল্লাহর পথে হিজরত (স্বদেশ ত্যাগ) করেছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়ায় উত্তম আবাস প্রদান করব। আর পরকালের পুরস্কারই অধিক বড়; যদি তারা জানত! যারা ধৈর্য ধারণ করেছে এবং নিজেদের প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে।”২০৮
مَا عِندَكُمْ يَنفَدُ وَمَا عِندَ الله بَاقٍ وَلَنَجْزِيَنَّ الَّذِينَ صَبَرُوا أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
"তোমাদের কাছে যা আছে তা নিঃশেষ হবে এবং আল্লাহর কাছে যা আছে তা চিরস্থায়ী থাকবে। যারা ধৈর্য ধারণ করে, আমি নিশ্চয়ই তাদেরকে তাদের কর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।”২০৯
أُوْلَئِكَ يُؤْتَوْنَ أَجْرَهُم مَّرَّتَيْنِ بِمَا صَبَرُوا وَيَدْرَؤُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
"ওদেরকে দু'বার পুরস্কৃত করা হবে, কারণ ওরা ধৈর্যশীল এবং ভালোর দ্বারা মন্দকে দূর করে ও আমি ওদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি তা হতে ব্যয় করে।”২১০
وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ - الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَالصَّابِرِينَ عَلَى مَا أَصَابَهُمْ وَالْمُقِيمِي الصَّلَاةِ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
"সুসংবাদ দাও বিনীতগণকে; যাদের হৃদয় ভয়ে কম্পিত হয় আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে, যারা তাদের বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করে, স্বলাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রুযী দিয়েছি তা হতে ব্যয় করে।"২11
قُلْ يَا عِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
"ঘোষণা ক'রে দাও (আমার এ কথা), হে আমার বিশ্বাসী দাসগণ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর। যারা এ পৃথিবীতে কল্যাণকর কাজ করে, তাদের জন্য আছে কল্যাণ। আর আল্লাহর পৃথিবী প্রশস্ত। ধৈর্যশীলদেরকে তো অপরিমিত পুরস্কার দেওয়া হবে।”২১২
قَالَ اخْسَئُوا فِيهَا وَلا تُكَلِّمُونِ - إِنَّهُ كَانَ فَرِيقٌ مِنْ عِبَادِي يَقُولُونَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ - فَاتَّخَذْتُمُوهُمْ سِخْرِيَّاً حَتَّى أَنسَوْكُمْ ذِكْرِي وَكُنتُمْ مِنْهُمْ تَضْحَكُونَ - إِنِّي جَزَيْتُهُمُ الْيَوْمَ بِمَا صَبَرُوا أَنَّهُمْ هُمُ الْفَائِزُونَ
"(আল্লাহ জাহান্নামীদেরকে) বলবেন, 'তোমরা হীন অবস্থায় এখানেই থাক এবং আমার সাথে কোন কথা বলো না। আমার বান্দাদের মধ্যে একদল ছিল যারা বলত, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা বিশ্বাস করেছি; সুতরাং তুমি আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও ও আমাদের উপর দয়া কর, তুমি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু। কিন্তু তাদেরকে নিয়ে তোমরা এতো ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে যে, তা তোমাদেরকে আমার কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল; তোমরা তো তাদেরকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টাই করতে। আমি আজ তাদেরকে তাদের ধৈর্যের কারণে এমনভাবে পুরস্কৃত করলাম যে, তারাই হল সফলকাম।”২১৩
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَنُبَوِّئَنَّهُم مِّنَ الْجَنَّةِ غُرَفًا تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا نِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ - الَّذِينَ صَبَرُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
"যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে জান্নাতের সুউচ্চ প্রাসাদসমূহে স্থান দান করব; যার নিচে নদীমালা প্রবাহিত থাকবে, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কার কত উত্তম! যারা ধৈর্য অবলম্বন করে ও তাদের প্রতিপালকের ওপরেই নির্ভর করে।”২১৪
وَجَزَاهُم بِمَا صَبَرُوا جَنَّةً وَحَرِيرًا
"তাদের ধৈর্যশীলতার পুরস্কার স্বরূপ তাদেরকে দেবেন জান্নাত ও রেশমী বস্ত্র।”২১৫
أُوْلَئِكَ يُجْزَوْنَ الْغُرْفَةَ بِمَا صَبَرُوا وَيُلَقَّوْنَ فِيهَا تَحِيَّةً وَسَلَامًا
"তাদেরকে ধৈর্যাবলম্বনের প্রতিদান স্বরূপ (জান্নাতের) কক্ষ দেওয়া হবে এবং তাদেরকে সেখানে অভিবাদন ও সালাম সহকারে অভ্যর্থনা জানানো হবে।”২১৬
وَالَّذِينَ صَبَرُوا ابْتِغَاء وَجْهِ رَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً وَيَدْرَؤُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ أُولَئِكَ لَهُمْ عُقْبَى الدَّارِ - جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ وَالْمَلَائِكَةُ يَدْخُلُونَ عَلَيْهِمْ مِنْ كُلِّ بَابٍ - سَلامٌ عَلَيْكُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ
আর যারা তাদের প্রতিপালকের মুখমণ্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ করে, স্বলাত সুপ্রতিষ্ঠিত করে, আমি তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি, তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং যারা ভাল দ্বারা মন্দকে প্রতিহত করে, তাদের জন্য শুভ পরিণাম (পরকালের গৃহ); স্থায়ী জান্নাত, তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের পিতা-মাতা, পতিপত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তারাও। আর ফিরিস্তাগণ তাদের কাছে প্রবেশ করবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে। (তারা বলবে,) 'তোমরা ধৈর্যধারণ করেছ বলে তোমাদের প্রতি শান্তি! কতই না ভাল এই পরিণাম। ' ২১৭
টিকাঃ
১৯৪. সূরা দাহর: ২৪
১৯৫. সূরা মুয্যাম্মিল: ১০
১৯৬. সূরা ক্বাফ: ৩৯
১৯৭. সূরা আলে ইমরান-৩: ১২০
১৯৮. সূরা আলে ইমরান-৩: ১৮৬
১৯৯. সূরা নাহল: ১২৬-১২৭
২০০. সূরা আনফাল: ৪৬
২০১. সূরা আলে ইমরান-৩: ২০০
২০২. সূরা আহক্বাফ: ৩৫
২০৩. সূরা হুদ: ৯-১১
২০৪. সূরা বাক্বারাহ-২: ১৫৩
২০৫. সূরা বাক্বারাহ-২: ১৫৫
২০৬. সূরা আ'রাফ: ১২৮
২০৭. সূরা সাজদাহ: ২৪
২০৮. সূরা নাহল: ৪১-৪২
২০৯. সূরা নাহল: ৯৬
২১০. সূরা ক্বাস্বাস্ব: ৫৪
২১১. সূরা হাজ্জ: ৩৪-৩৫
২১২. সূরা যুমার: ১০
২১৩. সূরা মু'মিনূন: ১০৮-১১১
২১৪. সূরা আনকাবৃত: ৫৮-৫৯
২১৫. সূরা দাহর: ১২
২১৬. সূরা ফুরক্বান: ৭৫
২১৭. সূরা রা'দ: ২২-২৪
📄 ক্ষমাশীলতা
কেউ অন্যায় করলে অথবা কোন দুর্ব্যবহার করলে তাকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও শাস্তি না দিয়ে বা কোন প্রকার প্রতিশোধ গ্রহণ না ক'রে অপরাধীকে ক্ষমা ক'রে দেওয়া সুচরিত্রবানের একটি মহা সদ্গুণ। এ গুণ জান্নাতী মানুষদের গুণ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ - الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاء وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهِ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
"তোমরা প্রতিযোগিতা (ত্বরা) কর, তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে ক্ষমা এবং জান্নাতের জন্য, যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান, যা ধর্মভীরুদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় দান করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা ক'রে থাকে। আর আল্লাহ (বিশুদ্ধচিত্ত) সৎকর্মশীলদেরকে ভালবাসেন।”২১৮
তিনি অন্যত্র বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَواْ إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
"নিশ্চয়ই যারা সাবধান হয়, যখন শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দেয়, তখন তারা আত্মসচেতন হয় এবং তৎক্ষণাৎ তাদের চক্ষু খুলে যায়।”২১৯
উক্ত আয়াতের এক অর্থে বলা হয়েছে, "নিশ্চয়ই যারা সাবধান হয়, যখন শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দেয়” অর্থাৎ, সে তাদের মনে ক্রোধ সৃষ্টি করে, "তখন তারা আত্মসচেতন হয় এবং তৎক্ষণাৎ তাদের চক্ষু খুলে যায়।" সুতরাং তারা অপরাধীকে মার্জনা করে। মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন,
وَالَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ وَإِذَا مَا غَضِبُوا هُمْ يَغْفِرُونَ
"যারা মহাপাপ ও অশ্লীল কাজ হতে দূরে থাকে এবং ক্রোধান্বিত হলে ক্ষমা ক'রে দেয়।”২২০
অপরাধীকে ক্ষমা করা মহামানবদের মহৎ গুণ। আর তার সুফলও বড় সুন্দর। মহানবী তায়েফবাসীকে ক্ষমা করেছিলেন। নচেৎ তারা চিরতরে ধ্বংস হয়ে যেত।
তিনি সুমামা বিন উসালকে ক্ষমা করেছিলেন, ফলে সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। একদা এক মরুভূমিতে মরু-বাবলা গাছের উপর নিজের তরবারি লটকে রেখে তার ছায়ার নিচে বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন আমাদের মহানবী । ইতিমধ্যে এক বেদুঈন দুশমন এসে তাঁর ঐ তরবারিটি হাতে নিয়ে তাঁর উপর তুলে ধরে বলল, 'ওহে মুহাম্মাদ! তুমি কি আমাকে ভয় পাও না?' মহানবী নির্ভয়ে বললেন, 'না।'
বেদুঈন বলল, 'তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ।' বেদুঈন আবার বলল, 'তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?' তিনি পূর্বেকার মতই বললেন, 'আল্লাহ।' বেদুঈন পুনরায় বলল, 'তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?' তিনি পুনরায় বললেন, 'আল্লাহ।'
এরপর বেদুঈনের দেহ-মন কেঁপে উঠল। সহসা তার হাত থেকে তলোয়ারটি পড়ে গেল। মহানবী তা তুলে নিয়ে তার প্রতি তুলে ধরে বললেন, 'এবার তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?' বেদুঈন বলল, 'কেউ নয়।' অথবা 'তুমি।'
দয়ার নবী তাকে মাফ ক'রে দিলেন, ফলে সে মুসলমান হয়ে গেল। অন্য বর্ণনা মতে সে মুসলমান হয়নি; কিন্তু অঙ্গীকারাবদ্ধ হল যে, সে তাঁর বিরুদ্ধে কোনক্রমেই আর যুদ্ধ করবে না। ২২১
মক্কা-বিজয়ের যুদ্ধে বিজয় লাভের পর তিনি ইচ্ছা করলে বহু পুরাতন ক্ষোভ মিটাতে পারতেন এবং কাফের মক্কাবাসীকে এক ইশারায় ধ্বংস ক'রে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। কারণ তাঁর তো ব্যক্তিগত কোন ক্রোধ ছিল না এবং তিনি তো ধ্বংসের জন্য প্রেরিত হননি। তাই তিনি ক্ষমা ঘোষণা ক'রে বলেছিলেন,
مَنْ دَخَلَ دَارَ أَبِي سُفْيَانَ فَهُوَ آمِنْ وَمَنْ أَغْلَقَ عَلَيْهِ دَارَهُ فَهُوَ آمِنْ وَمَنْ دَخَلَ الْمَسْجِدَ فَهُوَ آمِنٌ ومن ألقى السلاح فهو آمن
অর্থাৎ, যে আবু সুফিয়ানের ঘরে ঢুকবে, সে নিরাপদ। যে নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে নেবে, সে নিরাপদ। যে মসজিদে ঢুকবে, সে নিরাপদ। যে অস্ত্র বর্জন করবে, সে নিরাপদ। ২২২
মক্কা বিজয়ের দিন আলী আবু সুফিয়ানকে বললেন, 'আল্লাহর রসূল এর সম্মুখে গিয়ে সেই কথা বল, যে কথা ইউসুফের ভাইগণ ইউসুফকে বলেছিলেন,
تَاللهِ لَقَدْ آثَرَكَ اللَّهُ عَلَيْنَا وَإِن كُنَّا لَخَاطِئِينَ
'আল্লাহর শপথ! আল্লাহ নিশ্চয় তোমাকে আমাদের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন এবং নিঃসন্দেহে আমরাই ছিলাম অপরাধী।'২২৩
নিশ্চয় তিনি চাইবেন না যে, অন্য কেউ উত্তরে তাঁর চাইতে বেশি সুন্দর হোক। সুতরাং আবু সুফিয়ান সেই মতো করলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন,
لَا تَثْرَيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
'আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।'২২৪
মহানবী বহু মূর্খ ও অজ্ঞদের দুর্ব্যবহারে ক্ষমাশীলতা প্রদর্শন করেছিলেন। যেহেতু তাঁর প্রতিপালকের নির্দেশ ছিল,
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ
"তুমি ক্ষমাশীলতার নীতি অবলম্বন কর, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খদেরকে এড়িয়ে চল।”২২৫
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন, হুনাইন যুদ্ধের গনিমতের মাল বন্টনে রাসূলুল্লাহ ﷺ কিছু লোককে (তাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য) প্রাধান্য দিলেন (অর্থাৎ, অন্য লোকের তুলনায় তাদেরকে বেশী মাল দিলেন)। সুতরাং তিনি আকুরা' বিন হাবেসকে একশত উট দিলেন এবং উয়াইনা বিন হিস্নকেও তারই মতো দিলেন। অনুরূপ আরবের আরো কিছু সম্ভ্রান্ত মানুষকেও সেদিন (মাল) বন্টনে প্রাধান্য দিলেন। (এ দেখে) একটি লোক বলল, 'আল্লাহর কসম! এই বন্টনে ইনসাফ করা হয়নি এবং এতে আল্লাহর সন্তোষ লাভের ইচ্ছা রাখা হয়নি!' আমি (ইবনে মাসউদ) বললাম, 'আল্লাহর কসম! নিশ্চয় আমি এই সংবাদ আল্লাহর রসূল ﷺ কে পৌঁছে দেব।' অতএব আমি তাঁর কাছে এসে সেই সংবাদ দিলাম, যা সে বলল। ফলে তাঁর চেহারা পরিবর্তিত হয়ে এমনকি লালবর্ণ হয়ে গেল। অতঃপর তিনি বললেন,
فَمَنْ يَعْدِلُ إِذَا لَمْ يَعْدِلُ اللهُ وَرَسُولُهُ؟ رَحِمَ اللهُ مُوسَى قَدْ أُوذِيَ بِأَكْثَرَ مِنْ هَذَا فَصَبَرَ
"যদি আল্লাহ ও তাঁর রসূল ইনসাফ না করেন, তাহলে আর কে ইনসাফ করবে? আল্লাহ মূসাকে রহম করুন, তাঁকে এর চেয়ে বেশী কষ্ট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করেছিলেন।"২২৬
আনাস(রাঃ) বলেন, (একদা) আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে পথ চলছিলাম। সে সময় তাঁর উপর মোটা পেড়ে একখানি নাজরানী চাদর ছিল। অতঃপর পথে এক বেদুঈনের সঙ্গে দেখা হল। সে তাঁর চাদর ধরে খুব জোরে টান দিল। আমি নবী ﷺ এর কাঁধের এক পাশে দেখলাম যে, খুব জোরে টানার কারণে চাদরের পাড়ের দাগ পড়ে গেছে। পুনরায় সে বলল, 'ওহে মুহাম্মাদ! তোমার নিকট আল্লাহর যে মাল আছে, তা থেকে আমাকে দেওয়ার আদেশ কর।' তিনি তার দিকে মুখ ফিরিয়ে হাসলেন। অতঃপর তাকে (কিছু মাল) দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। ২২৭
এক বেদুঈন মসজিদের ভিতরে প্রস্রাব ক'রে দিল। সুতরাং লোকেরা তাকে ধমক দিয়ে বলল, 'এ কী? এ কী!' নবী ﷺ বললেন, "ওর পেসাব আটকে দিয়ো না, ওকে ছেড়ে দাও।"
সুতরাং তাকে ছেড়ে দেওয়া হল। সে প্রস্রাব করে শেষ করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে ডেকে বললেন,
إِنَّ هَذِهِ الْمَسَاجِدَ لَا تَصْلُحُ لِشَيْءٍ مِنْ هَذَا الْبَوْلِ وَلَا الْقَذَرِ إِنَّمَا هِيَ لِذِكْرِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ وَالصَّلَاةِ وَقِرَاءَةِ الْقُرْآنِ
অর্থাৎ, এই মসজিদগুলো কোন প্রকার পেসাব বা নোংরা জিনিসের জন্য নয়। এ হল কেবল আল্লাহ আয্যা অজাল্লার যিক্র, স্বলাত ও কুরআন পড়ার জন্য। ২২৮
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
دَعُوهُ وَأَهْرِيقُوا عَلَى بَوْلِهِ ذَنُوبًا مِنْ مَاءٍ أَوْ سَجْلًا مِنْ مَاءٍ فَإِنَّمَا بُعِثْتُمْ مُيَسِّرِينَ وَلَمْ تُبْعَثُوا مُعَسِّرِينَ
অর্থাৎ, ওকে ছেড়ে দাও এবং ওর প্রস্রাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। কেননা তোমাদেরকে সহজ নীতি অবলম্বন করার জন্য পাঠানো হয়েছে, কঠোর নীতি অবলম্বন করার জন্য পাঠানো হয়নি। "২২৯
এইভাবে তিনি মুনাফিকদের আচরণে ক্ষমাশীলতা ও সহিষ্ণুতার বিশাল নমুনা রেখে গেছেন। চরিত্রবান হতে হলে, বিশেষ ক'রে একজন 'দ্বীনের দাঈ' হতে হলে ক্ষমাশীলতা প্রয়োগ করা অত্যাবশ্যক। বিরোধীদের দেওয়া কষ্টে ধৈর্যশীলতা ও ক্ষমাশীলতাই হল সাফল্যের সরল পথ। মহান আল্লাহর নির্দেশ হল,
وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَالْمُنَافِقِينَ وَدَعْ أَذَاهُمْ وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلًا
"তুমি অবিশ্বাসী ও কপটাচারীদের কথা মান্য করো না; ওদের নির্যাতন উপেক্ষা কর এবং আল্লাহর ওপর নির্ভর কর। কর্মবিধায়করূপে আল্লাহই যথেষ্ট। "২৩০
ইচ্ছা করলে তিনি প্রতিশোধ নিতে পারতেন, কিন্তু নিলেন না, মাফ ক'রে দিলেন। এটাই তো মহৎ লোকের কর্ম।
সুতরাং মহৎ ও চরিত্রবান হতে কেউ আপনাকে গালি দিলে, তা গালিদাতাকে ফিরিয়ে দিন।
কেউ আপনার চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে কষ্ট দিতে থাকলে তার অসুখে তাকে সাক্ষাৎ ক'রে সান্ত্বনা দিতে যান।
কেউ আপনার পরিচয় না জেনে আপনাকে গালাগালি করলে আপনি তার বোঝা বয়ে দিন।
কেউ আপনার হিংসা বা শত্রুতা করলে তার একটা চাকরি ক'রে দিন, একটি ভিসা পাঠিয়ে দিন, একটা বড় উপহার পাঠিয়ে দিন।
কেউ আপনার বদনাম ক'রে বেড়ালে, সমালোচনা করলে, কুৎসা গেয়ে বেড়ালে আপনি তার বিপদে হাত বাড়িয়ে দিন।
ক্ষমাশীলতা প্রয়োগ ক'রে প্রতিক্রিয়া দেখুন। আপনি হতবাক হবেন, লোকেরাও অবাক হবে!
সত্বর সুফল পাবেন দুনিয়াতে। আর আখেরাতের পুরস্কার তো আছেই। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَجَزَاء سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِّثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ
"মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। আর যে ক্ষমা ক'রে দেয় ও আপোস- নিষ্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট আছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।”২৩১
কোন দুর্বল মিসকীনের প্রতি অনুগ্রহশীল থাকার পর যদি বুঝতে পারেন, সে আপনার প্রতি অশ্রদ্ধাশীল। সে আপনার পরোয়াও করে না, বরং উল্টে সে আপনার বা আপনার কোন আপনজনের অপবাদ রচনা ও রটনা ক'রে বেড়ায়। তাহলে পারবেন তাকে ক্ষমা করতে? না দেওয়ার কসম খাওয়ার পর কসম ভেঙ্গে পারবেন তাকে তার দান অবিরাম দিয়ে যেতে? প্রতিপালকের ক্ষমা লাভের জন্য পারবেন তাকে ক্ষমা করতে? মহান প্রতিপালকের নির্দেশ শুনুন,
وَلَا يَأْتَلِ أُولُوا الْفَضْلِ مِنكُمْ وَالسَّعَةِ أَن يُؤْتُوا أُولِي الْقُرْبَى وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللهِ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তারা আত্মীয়-স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহর রাস্তায় যারা গৃহত্যাগ করেছে তাদের কিছুই দেবে না; তারা যেন ওদেরকে ক্ষমা করে এবং ওদের দোষ-ত্রুটি মার্জনা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা ক'রে দিন? আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়। "২৩২
হ্যাঁ, মহান প্রভুর ক্ষমা লাভের জন্য ক্ষমা করতে হবে। মাছের কাঁটার মতো আপনার গলায় লেগে থাকা আপনার বউ, যা আপনি গিলতেও পারেন না, ফেলতেও পারেন না। পরন্তু কাঁটার যাতনায় আপনি সর্বদা যন্ত্রণাকাতর থাকেন, তাঁকেও ক্ষমা করতে হবে। যে বউ আপনার মনের মতো নয়, যে বউ আপনার নেশা ও পেশার সহায়িকা নয়, যে বউ নূহ ও লূত (আলাইহিমাস সালাম) এর বউদের মতো, যে বউ আপনার শত্রু, যে আপনার শত্রুদের সাথে হাত মেলায়, আপনি যাকে ভালোবাসেন না, সে তাকে ভালোবাসে, আপনার শত্রুদের কাছে সে আপনার গোপন রহস্য প্রকাশ ক'রে দেয়, হয়তো মনে মনে, গোপনে গোপনে সে আপনার প্রাণহানি কামনা করে, পারবেন তাকে ক্ষমা করতে? অনুরূপ সন্তান, যে আপনার মনের বিরুদ্ধে চলতে চায়, আপনার খেয়ে আপনার মান-মর্যাদার খেয়াল রাখে না, পারবেন তাকে ক্ষমা করতে? মহান আল্লাহর নির্দেশ শুনুন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ وَإِن تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক থেকো। আর তোমরা যদি তাদেরকে মার্জনা কর, তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা কর এবং তাদেরকে ক্ষমা কর, তাহলে (জেনে রেখো যে,) নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”২৩৩
জানি, ক্ষমা করা বড় কঠিন। কিন্তু ক্ষমা করলে, মহাক্ষমাশীলের ক্ষমা পাবেন। তিনি অন্যত্র বলেছেন,
إِن تُبْدُوا خَيْرًا أَوْ تُخْفُوهُ أَوْ تَعْفُوا عَن سُوَءٍ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوًا قَدِيرًا
"যদি তোমরা সৎকাজ প্রকাশ্যে কর অথবা গোপনে কর অথবা অপরাধ ক্ষমা কর, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহও পরম ক্ষমাশীল, মহা শক্তিমান।”২৩৪
অপরাধের কারণে আপনার শাস্তি দেওয়ার সামর্থ্য ও বৈধতা থাকলে, আপনি তা প্রয়োগ করতে পারেন। কিন্তু ধৈর্যের সাথে ক্ষমাশীলতাই শ্রেষ্ঠ এবং সুচরিত্রবান মানুষের আচরণ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ وَلَئِن صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِّلصَّابِرِينَ - وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلا بِالله وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ مِّمَّا يَمْكُرُونَ
"যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তাহলে ঠিক ততখানি করবে যতখানি অন্যায় তোমাদের প্রতি করা হয়েছে। আর যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর, তাহলে অবশ্যই ধৈর্যশীলদের জন্য সেটাই উত্তম। তুমি ধৈর্যধারণ কর; আর তোমার ধৈর্য তো হবে আল্লাহরই সাহায্যে। তাদের (অবিশ্বাসের) জন্য তুমি দুঃখ করো না এবং তাদের ষড়যন্ত্রে তুমি মনঃক্ষুণ্ণ হয়ো না।”২৩৫
আপনি পরীক্ষা ক'রে দেখতে পারেন, প্রতিশোধ নিতে পারলে মনে বড় তৃপ্তি আছে ঠিকই, কিন্তু তার চাইতে অধিক তৃপ্তি আছে ক্ষমা করাতে। তাছাড়া যে মানুষকে ক্ষমা করতে পারে না, সে একদিন একা হয়ে যায়। কারণ মানুষ মাত্রই ভুল করে। যাকে ক্ষমা করবেন না, তার প্রতি আপনি অথবা আপনার প্রতি সে বিরূপ হয়ে যাবে। আর তার ফলে আপনার শান্তিনিকেতন অশান্তির আলয়ে পরিণত হবে। তাহলে লাভ কী? মহানবী এর সচ্চরিত্রতা ও বিশেষ ক'রে ক্ষমাশীলতার একটি মূল্যবান উপদেশ শুনুন, তিনি বলেছেন,
لا تَسُبَّنَّ أَحَدًا، وَلاَ تَحْقِرَنَّ شَيْئًا مِنَ الْمَعْرُوفِ وَأَنْ تُكَلِّمَ أَخَاكَ وَأَنْتَ مُنْبَسِطٌ إِلَيْهِ وَجْهُكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنَ الْمَعْرُوفِ وَارْفَعْ إِزَارَكَ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ فَإِنْ أَبَيْتَ فَإِلَى الْكَعْبَيْنِ وَإِيَّاكَ وَإِسْبَالَ الإِزَارِ فَإِنَّهَا مِنَ الْمَخِيلَةِ وَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمَخِيلَةَ وَإِنِ امْرُؤٌ شَتَمَكَ وَعَيَّرَكَ بِمَا يَعْلَمُ فِيكَ فَلَا تُعَيِّرُهُ بِمَا تَعْلَمُ فِيهِ فَإِنَّمَا وَبَالُ ذَلِكَ عَلَيْهِ
"তুমি খবরদার কাউকে গালি দিয়ো না। যে কোনও ভালো কাজকে তুচ্ছজ্ঞান করো না। তোমার ভাইয়ের সাথে খুশীভরা চেহারা নিয়ে কথা বল, এটিও একটি ভালো কাজ। তোমার লুঙ্গি পায়ের রলার অর্ধাংশে উঠিয়ে পর। তা যদি অস্বীকার কর, তাহলে গাঁট পর্যন্ত নামিয়ে পর। আর সাবধান! লুঙ্গি গাঁটের নিচে ঝুলিয়ে পরো না। কারণ তা অহংকারের আলামত। পরন্তু আল্লাহ অবশ্যই অহংকার পছন্দ করেন না। যদি কোন লোক তোমাকে গালি দেয় এবং এমন দোষ ধরে তোমাকে লজ্জা দেয়, যা তোমার মধ্যে আছে বলে সে জানে, তাহলে তুমি তাকে এমন দোষ ধরে লজ্জা দিয়ো না, যা তার মধ্যে আছে বলে তুমি জান। তার বোঝা সেই বহন করুক।”২৩৬
পরিশেষে বলি, ক্ষমাশীলতা যেখানে ক্ষীণ দুর্বলতা বলে পরিগণিত হয়, সেখানে নিষ্ঠুর হওয়া বাঞ্ছনীয়।
শায়খ সা'দী বলেছেন, 'ক্ষমা করা মহৎ গুণ। কিন্তু ক্ষমাশীলতাকে কোন হিংস্র পশু বা মানুষের জন্য প্রয়োগ করলে জানতে হবে বিপদ অনিবার্য।'
টিকাঃ
২১৮. সূরা আলে ইমরান-৩: ১৩৩-১৩৪
২১৯. সূরা আ'রাফ: ২০১
২২০. সূরা শূরা: ৩৭
২২১. আহমাদ, বুখারী, মুসলিম, নাসাঈ, বাইহাক্বী, মিশকাত ৫৩০৫
২২২. মুসলিম ৪৭২৪, আবু দাউদ ৩০২৩
২২৩. সূরা ইউসুফ: ৯১
২২৪. সূরা ইউসুফ: ৯২, ফিকুহুস সীরাহ ৩৭৬পৃ, আর-রাহীকুল মাখতুম ৩৭৬পৃঃ
২২৫. সূরা আ'রাফ: ১৯৯
২২৬. বুখারী ৩১৫০, মুসলিম ২৪৯৪
২২৭. বুখারী ৩১৪৯, মুসলিম ২৪৭৬
২২৮. মুসলিম ৬৮৭
২২৯. বুখারী ২২০, ৬১২৮
২৩০. সূরা আহযাব: ৪৮
২৩১. সূরা শূরা: 80
২৩২. সূরা নূর: ২২
২৩৩. সূরা তাগাবুন: ১৪
২৩৪. সূরা নিসা: ১৪৯
২৩৫. সূরা নাহল: ১২৬-১২৭
২৩৬. আবু দাউদ ৪০৮৬, সহীহুল জামে' ৭৩০৯