📄 তাকওয়া
তাক্বওয়া বা পরহেযগারি সচ্চরিত্রতার মূল বলা যেতে পারে। দ্বীনদারি ও পরহেযগারি যার মধ্যে আছে, সে কোনদিন দুশ্চরিত্র হতে পারে না। আল্লাহ- ভীতি যার মধ্যে আছে সে অবশ্যই চরিত্রবান।
মহান প্রতিপালক নিজ পবিত্র গ্রন্থে বহুবারই মুসলিমকে তাক্বওয়া অবলম্বন করতে বলেছেন। তাক্বওয়ার পরিচ্ছদ দিয়ে সৌন্দর্য অবলম্বন করতে বলেছেন।
তাক্বওয়া অবলম্বন করলে মানুষ সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি পায় ও হক-বাতিলের পার্থক্য নির্বাচন করতে পারে।
তাক্বওয়ার সাথে জীবনযাপন করলে মানুষ শ্লীলতা-অশ্লীলতার মাঝে তফাৎ করার প্রয়াস লাভ করে।
তাক্বওয়ার পথে চললে মানুষ দুশ্চরিত্রতার ভ্রষ্টতা থেকে রেহাই পেতে পারে।
তাক্বওয়ার পথ মানেই সচ্চরিত্রতার পথ, সুখের পথ ও জান্নাতের পথ। আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করা হল যে, 'কোন্ আমল মানুষকে বেশি জান্নাতে নিয়ে যাবে?' তিনি বললেন, "আল্লাহভীতি ও সচ্চরিত্র।” আর তাঁকে (এটাও) জিজ্ঞাসা করা হল যে, 'কোন্ আমল মানুষকে বেশি জাহান্নামে নিয়ে যাবে?' তিনি বললেন, "মুখ ও যৌনাঙ্গ (অর্থাৎ, উভয় দ্বারা সংঘটিত পাপ)। "১২২
তাক্বওয়া না থাকলে মানুষ দুশ্চরিত্র হয়, নির্লজ্জ ও ধৃষ্ট হয়। পাপাচারী ও দুষ্কৃতী হয়। এক জ্ঞানী ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'আপনি কাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহকে।' বলা হল, 'মানুষের মধ্যে কাকে?' বললেন, 'যে আল্লাহকে ভয় করে না, তাকে।' বলা হল, 'তা কেন? বললেন, 'যেহেতু যে আল্লাহকে ভয় করে না, সে সব কিছু করতে পারে।'
তাক্বওয়া হল সংযমের বাঁধন। আর তা ছিন্ন হলে উদ্দাম, উচ্ছৃঙ্খলতা বন্যার মত প্রবাহিত হয়। সেই বন্যাতে মানুষের সংস্কার, শিক্ষা, চরিত্র সবই অনায়াসে ভেসে যায়; এমনকি শেষে লজ্জাও আর অবশিষ্ট থাকে না। তখন সে কোন পাপেই ভয় করে না, লজ্জা করে না। 'লজ্জা নাই যার, রাজাও মানে হার।'
টিকাঃ
১২২. তিরমিযী ২০০৪, ইবনে হিব্বান ৪৭৬, বুখারীর আদব ২৮৯ ও ২৯৪, ইবনে মাজাহ ৪২৪৬, আহমাদ ২/৩৯২, হাকেম ৪/২৩৪
📄 বিনয়
চরিত্রবানের একটি চরিত্র হল বিনয়। অমুসলিম হলেও অনেকের মাঝে এ চরিত্র প্রকৃতিগতভাবে থাকে। অনেকে শিক্ষিত হলে বিনয়ী হয়। শিক্ষা যত বাড়ে, বিনয় তত বৃদ্ধি লাভ করে। বিশেষ ক'রে ইসলামী শিক্ষা মানুষকে অত্যন্ত ভদ্র ও বিনয়ী ক'রে তোলে। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لاَ يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ ، وَلَا يَبْغِي أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ
"আল্লাহ তাআলা আমার নিকট অহী পাঠালেন যে, তোমরা পরস্পরে নম্র ব্যবহার অবলম্বন কর। যাতে কেউ যেন কারো প্রতি গর্ব না করে এবং কেউ যেন কারো প্রতি যুলুম না করে।"১২৩
বিনয়ী হওয়া মানে নিচে নামা নয়, ছোট হওয়া নয়। বরং বিনয়ে মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধিশীল হয়। বিনয়ী মানুষের সম্মান ঋদ্ধিলাভ করে। মহানবী বলেছেন,
مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ، وَمَا زَادَ اللهُ عَبْداً بِعَفْمٍ إِلَّا عِزّاً ، وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ اللَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللهُ
"দান-খয়রাত ধন-সম্পদ কমিয়ে দেয় না। বান্দা (অপরকে) ক্ষমা প্রদর্শন করলে আল্লাহ তার সম্মান বর্ধন করেন। আর আল্লাহর ওয়াস্তে যে ব্যক্তি বিনয়াবনত হয়, আল্লাহ তাকে সুউন্নত করেন।"১২৪
মাটির মানুষ কিছুদিন পর মাটিতেই মিশে যাবে। নিকৃষ্ট শুক্রবিন্দু থেকে সৃষ্ট প্রাণীর অহংকার শোভা পায় না। পানি থেকে জন্ম জিনিসের আগুনের মতো গরম হওয়া সমীচীন নয়। কেউ হলে তার জন্য পরকালে আগুনই হবে প্রকৃষ্ট ঠিকানা। মহানবী বলেছেন,
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ ؟ كُلُّ عُتُلٌ جَوَاطٍ مُسْتَكْبِرٍ
"আমি তোমাদেরকে জাহান্নামীদের সম্পর্কে অবহিত করব না কি? (তারা হল) প্রত্যেক রূঢ় স্বভাব, কঠিন হৃদয় দাম্ভিক ব্যক্তি।"১২৫
যে বিনয়ী না হয়ে অহংকারী হয়, তার ঠিকানা বেহেস্ত হতে পারে না। মানুষকে ছোট করা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করা এবং হক জানা সত্ত্বেও তা গ্রহণ না করা, অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখ্যান করা, তা অমান্য ও বর্জন করা মানুষের অহংকার ছাড়া আর কী হতে পারে?
এ ছাড়া ভালো পরিধান করা ও সাজ-সজ্জা করাতে অহংকার নেই। অহংকারের মূল 'অহম' চিন্তাধারাই হল কুচরিত্রের লক্ষণ। একদা মহানবী বললেন,
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ
"যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহঙ্কার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।"
একটি লোক বলল, 'মানুষ তো ভালবাসে যে, তার পোশাক সুন্দর হোক ও তার জুতো সুন্দর হোক, (তাহলে)?' তিনি বললেন,
إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الجَمَالَ ، الكِبْرُ : بَطَرُ الحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ
"আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালবাসেন। (সুন্দর পোশাক ও সুন্দর জুতো ব্যবহার অহংকার নয়, বরং) অহংকার হল, সত্য প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।”১২৬
হ্যাঁ, সত্য প্রত্যাখ্যান করা চরিত্রবান বিনয়ী মানুষের কাজ নয়। অহংকারপ্রসূত এমন চরিত্রের কথা কুরআন কারীমে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন,
وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِ آيَاتُنَا وَلَّى مُسْتَكْبِرًا كَأَن لَّمْ يَسْمَعْهَا كَأَنَّ فِي أُذُنَيْهِ وَقُرًا فَبَشِّرُهُ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ
"যখন ওদের নিকট আমার বাক্য আবৃত্তি করা হয়, তখন ওরা দম্ভভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়; যেন ওরা তা শুনতে পায়নি; যেন ওদের কান দু'টি বধির। অতএব ওদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সুসংবাদ দাও।”১২৭
وَيْلٌ لِّكُلِّ أَفَاكٍ أَثِيمٍ (۷) يَسْمَعُ آيَاتِ اللهِ تُتْلَى عَلَيْهِ ثُمَّ يُصِرُّ مُسْتَكْبِرًا كَأَن لَّمْ يَسْمَعْهَا فَبَشِّرْهُ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ
"দুর্ভোগ প্রত্যেক ঘোর মিথ্যাবাদী পাপীর, যে আল্লাহর আয়াতের আবৃত্তি শোনে অথচ ঔদ্ধত্যের সাথে (নিজ মতবাদে) অটল থাকে; যেন সে তা শোনেইনি। সুতরাং ওকে মর্মন্তুদ শাস্তির সুসংবাদ দাও।”১২৮
আর এক শ্রেণীর উদ্ধত মানুষের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَإِذَا قِيلَ لَهُ اتَّقِ اللهَ أَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالإِثْمِ فَحَسْبُهُ جَهَنَّمُ وَلَبِئْسَ الْمِهَادُ
"যখন তাকে বলা হয়, তুমি আল্লাহকে ভয় কর, তখন তার আত্মাভিমান তাকে অধিকতর পাপাচারে লিপ্ত করে। সুতরাং তার জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট এবং নিশ্চয়ই তা অতি মন্দ শয়নাগার।”১২৯
এই শ্রেণীর লোকেদেরকে যখন বলা হয়, 'পাপ করছ কেন?' তখন তারা লজ্জিত না হয়ে জবাবে নাক সিঁটকে বলে, 'তুমি খুব ভালো। তুমি নিজের ঘর সামলাও। তোমার অমুক কী করছে? নিজের চরকায় তেল দাও। আমাকে শিখাতে হবে না।' ইত্যাদি
চরিত্রবান বিনয়ী নারী-পুরুষ কোন অন্যায় বা ভুল ক'রে ফেললে তা স্বীকার করতে দ্বিধাবোধ করে না। যেহেতু ভুল ক'রে ধরিয়ে দেওয়ার পরেও জেনেশুনে তা স্বীকার না করা এক মহাভুল। পরন্তু ভুল স্বীকারে মানুষের মর্যাদা কমে যায় না, বরং তাতে মহতের মহত্ত্ব আরো বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে ভুল স্বীকার না করা অহংকারীর লক্ষণ।
সুন্দর পোশাক পরিধান করলে এবং মনের ভিতরে অহংকার না থাকলে সমস্যা নেই। তবে পোশাক-পরিচ্ছদের ভিতরেও আছে অহংকার। মহানবী বলেন,
لا يَنْظُرُ اللَّهُ يَوْمَ القِيَامَةِ إِلَى مَنْ جَرَّ إِزَارَهُ بَطَراً
"আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তির দিকে (রহমতের দৃষ্টিতে) তাকিয়ে দেখবেন না, যে অহংকারের সাথে তার লুঙ্গি (প্যান্ট, পায়জামা মাটিতে) ছেঁচড়াবে।”১৩০
ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ القِيَامَةِ ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ ، وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ : المُسْبِلُ ، وَالمَنَّانُ ، وَالمُنْفِقُ سِلْعَتَهُ بِالْحَلِفِ الكَاذِبِ
"কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির সঙ্গে আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না। আর তাদের জন্য হবে মর্মন্তুদ শাস্তি। যে (পায়ের) গাঁটের নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরে, দান করে যে প্রচার করে বেড়ায় এবং মিথ্যা কসম খেয়ে নিজের পণ্যদ্রব্য বিক্রি করে।”১৩১
একই কারণে পুরুষকে স্বর্ণ ও রেশম ব্যবহারে অনুমতি দেওয়া হয়নি। যেহেতু তাতে বিনয়ীর বিনয় লয় হতে পারে। বলা বাহুল্য, সুচরিত্রবান এমন কোন মুসলিম পুরুষকেই আপনি দেখতে পাবেন না, যে স্বর্ণের কোন জিনিস ব্যবহার করে অথবা রেশমবস্ত্র পরিধান করে অথবা পায়ের গাঁটের নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরে।
পানাহারের উপবেশনেও বিনয়ীর বিনয় পরিলক্ষিত হতে পারে। আমাদের বিনয়ী নবী বলেছেন,
لَا أَكُلُ مُتَّكِناً
“আমি হেলান দিয়ে বসে আহার করি না।”১৩২
তিনি হেলান দিয়ে খেতে নিষেধও করেছেন। ১৩৩
যেহেতু অনুরূপ বসা বিনয়ীদের লক্ষণ নয় এবং হেলান দিয়ে খেলে বেশী খাওয়া হয়। আর বেশী খাওয়া তাঁর বাঞ্ছনীয় ছিল না। আব্দুল্লাহ ইবনে বুস্র বলেন, নবী এর একটি পাত্র ছিল যাকে 'গারা' বলা হত, সেটাকে চারজন মানুষ ধরে তুলতো। একদা চান্তের সময়ে যখন চান্তের স্বলাত পড়ার পর ঐ (বিশাল) পাত্রটি আনা হল---অর্থাৎ, তাতে 'সারীদ' (মাংস ও খণ্ড খণ্ড রুটি সংমিশ্রণে প্রস্তুত সুস্বাদু খাদ্য) রাখার পর, তখন লোকেরা তাতে জমায়েত হল। লোকের পরিমাণ যখন বেশি হল, তখন রাসূলুল্লাহ হাঁটুর ভরে বসে পড়লেন। (এরূপ দেখে) জনৈক বেদুঈন বলল, 'এ কেমন বসা?' আল্লাহর রসূল বললেন,
إِنَّ اللَّهَ جَعَلَنِي عَبْداً كَرِيماً ، وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّاراً عَنِيداً
"নিশ্চয় আল্লাহ আমাকে ভদ্র (বিনয়ী) বান্দা করেছেন এবং উদ্ধত ও হঠকারী করেননি। "১৩৪
তিনি বলতেন, "দাস যেভাবে খায়, আমি সেইভাবে খাই। দাস যেভাবে বসে, আমিও সেইভাবে বসি। "১৩৫
তিনি মাটিতে বসতেন, মাটিতে বসে খেতেন, ছাগল বাঁধতেন এবং ক্রীতদাস যবের রুটি খেতে দাওয়াত দিলেও তা গ্রহণ করতেন। ১৩৬
তিনি ক্রীতদাসের সাথে খেতেন। নিম্নমানের খাবার খেতে দাওয়াত দিলেও তা গ্রহণ করতেন। পুরনো তেল দিয়ে যবের রুটি খাওয়ার দাওয়াত দিলেও তা খেয়ে আসতেন। ১৩৭
তিনি বলতেন,
مَا اسْتَكْبَرَ مَنْ أَكَلَ مَعَهُ خَادِمُهُ ، وَرَكِبَ الْحِمَارُ بِالْأَسْوَاقِ ، وَاعْتَقَلَ الشَّاةَ فَحَلَبَهَا
"সে ব্যক্তি অহংকারী নয়, যার সাথে তার খাদেম আহার করে, বাজারে গাধায় চড়ে এবং ছাগী বেঁধে দোহন করে।"১৩৮
তিনি আরো বলতেন,
لَوْ دُعِيتُ إِلَى ذِرَاعٍ أَوْ كُرَاعٍ لَأَجَبْتُ وَلَوْ أُهْدِيَ إِلَيَّ ذِرَاعٌ أَوْ كُرَاعٌ لَقَبِلْتُ
অর্থাৎ, যদি আমাকে ছাগলাদির পা অথবা বাহু খাওয়ানোর জন্য দাওয়াত দেওয়া হয়, তাহলে আমি নিশ্চয় তা কবুল করব। আর যদি আমাকে পা অথবা বাহু উপঢৌকন দেওয়া হয়, তাহলে আমি নিশ্চয় তা সাদরে গ্রহণ করব। ১৩৯
তিনি পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন। তিনি নিজের জুতা পরিষ্কার ও সিলাই করতেন, কাপড় সিলাই করতেন, তাঁর কাপড়ে তালি লাগাতেন, স্বহস্তে নিজ কাপড় পরিষ্কার করতেন, ছাগলের দুধ দোহাতেন এবং নিজের খেদমত নিজেই করতেন। অন্যান্য পুরুষরা যেমন নিজেদের বাড়িতে সংসারের কাজ করে, অনুরূপ তিনিও কাজ করতেন। ১৪০
তিনি মহান নেতা ও ইমামে আ'যম হয়েও নিজের খিদমত নিজেই করতেন। যদিও তাঁর দাস-দাসীও ছিল। কিন্তু বিনয়াপ্লুত প্রকৃতি তাঁকে এমন সকল কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করত এবং সে সবকে নিজের মান-সম্মানের পরিপন্থী বলে মনে করতেন না।
তিনি গাধার পিঠে সওয়ার হতেন এবং পিছনে অন্যকে সওয়ার-সঙ্গীও করে নিতেন। ১৪১
আর এ কাজকে সম্মানহানিকর ভাবতেন না। বরং তা ছিল তাঁর বিনয়ের প্রকৃষ্ট নিদর্শন।
আনসারদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যেতেন, তাঁদের শিশুদেরকে সালাম দিতেন এবং তাদের মাথায় হাত বুলাতেন। ১৪২
মদীনার ক্রীতদাসীদের মধ্যে কোন কোন ক্রীতদাসী নবী এর হাত ধরে নিত, তারপর সে (নিজের প্রয়োজনে) তার ইচ্ছামত তাঁকে নিয়ে যেত। ১৪৩
বলা বাহুল্য, মহিলা বা শিশু বলে তিনি তাদেরকে তুচ্ছ করতেন না। শিশুকে তিনি সালাম দিতেন। ১৪৪ তাতে তাঁর বিনয় প্রকাশ পেত এবং শিশুদের মনে আনন্দ।
তিনি শিশুদেরকে নিয়ে খেলাতেন। আদর করে উম্মে সালামার শিশুকন্যা যয়নাবকে ‘যুয়াইনাব’ বলতেন। ১৪৫
মাহমূদ বিন রাবী এর বয়স তখন পাঁচ বছর। মহানবী খেলাচ্ছলে বালতি থেকে মুখে পানি নিয়ে তাঁর মুখে কুল্লি করে দিয়েছিলেন। ১৪৬
কোথায় সে চরিত্র? কোথায় সে আদর্শ? মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও সে চরিত্রের অনুসরণ নেই। আলেম হওয়া সত্ত্বেও সে চরিত্রের আমল নেই। কেউ তো শিক্ষা উচ্চ বলে তিনি এত উচ্চে পৌঁছে গেছেন যে, তাঁর সাথে কথা বলা যায় না, তাঁর সাথে দেখা করা যায় না। এক দস্তরখান বা এক মজলিসে বসলেও কথা বলেন না। এক জালসার বক্তা হয়েও পরিচয় জানতে চান না। কারণ তিনি কোন প্রদেশের নেতা বা আমীরে জামাআত!
অনেকের মাল বৃদ্ধি পেলে অহংকার বৃদ্ধি পায়। বেতন বেশি হলে আর কারো সাথে মেশেন না। কারো সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান বেশি হলে অন্য কাউকে আর পাত্তা দেন না। অনেকে ইল্মী গোমড়ে গোমড়ামুখ থাকেন। কারো সাথে কুশল-বিনিময় করতে চান না, ফোনেও জবাব দেন না। এতে নাকি তাঁর অমূল্য সময় নষ্ট হয়!
পক্ষান্তরে প্রকৃতত্ব এই যে, অনেক বড় মানুষ আছেন, যাঁর সামনে গেলে নিজেকে ছোট মনে হয়। কিন্তু প্রকৃত বড় মানুষ হলেন তিনিই, যাঁর সামনে গেলে কেউ নিজেকে ছোট ভাবে না। আর সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা হলেন তিনি, যাঁর মেজাজ বড় ঠাণ্ডা। যাঁর স্বভাব হল মিশুক। বিনয়ের সাথে যিনি সকলকে সাদর সম্ভাষণ জানান।
দুনিয়া পেয়ে খোশ হওয়া ভালো নয়। বড় চাকরি পেয়ে অথবা ব্যবসায় প্রচুর লাভ পেয়ে মনে মনে গর্বিত হওয়া উচিত নয়। কেউ ধন নিয়ে দম্ভ করলে কারূনের ইতিহাস স্মরণ করা উচিত। মহান আল্লাহ বলেছেন, “কারূন ছিল মূসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি যুলুম করেছিল। আমি তাকে ধনভাণ্ডার দান করেছিলাম, যার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। স্মরণ কর, তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, 'দম্ভ করো না, আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার মাধ্যমে পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান কর। আর তুমি তোমার ইহলোকের অংশ ভুলে যেয়ো না। তুমি (পরের প্রতি) অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না।' সে বলল, 'এ সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি।' সে কি জানত না যে, আল্লাহ তার পূর্বে বহু মানবগোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছেন, যারা তার থেকেও শক্তিতে ছিল প্রবল, সম্পদে ছিল প্রাচুর্যশালী? আর অপরাধীদেরকে তাদের অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাও করা হবে না। কারূন তার সম্প্রদায়ের সম্মুখে জাঁকজমক সহকারে বের হল। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত তারা বলল, 'আহা! কারূনকে যা দেওয়া হয়েছে, সেরূপ যদি আমাদেরও থাকত; প্রকৃতই সে মহা ভাগ্যবান।' আর যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তারা বলল, 'ধিক্ তোমাদের! যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ। আর ধৈর্যশীল ব্যতীত তা অন্য কেউ পায় না।' অতঃপর আমি কারূনকে ও তার প্রাসাদকে মাটিতে ধসিয়ে দিলাম। তার স্বপক্ষে এমন কোন দল ছিল না, যে আল্লাহর শাস্তির বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করতে পারত এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিল না। পূর্বদিন যারা তার (মত) মর্যাদা কামনা করেছিল তারা বলতে লাগল, 'দেখ, আল্লাহ তাঁর দাসদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার রুযী বর্ধিত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা হাস করেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করতেন, তবে আমাদেরকেও তিনি মাটিতে ধসিয়ে দিতেন। দেখ, অকৃতজ্ঞরা সফলকাম হয় না।' এ পরলোকের আবাস; যা আমি নির্ধারিত করি তাদেরই জন্য যারা এ পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। সাবধানীদের জন্য শুভ পরিণাম। ১৪৭
সুতরাং এমন কথা বলা উচিত নয়, যাতে গর্ব হয়, দম্ভ প্রকাশ পায়, অহংকার ফুটে ওঠে।
নিজের যা আছে, তার থেকে কম বলা ভালো। মিথ্যা বলে নয়, প্রকাশ না ক'রে।
সামনে কেউ দম্ভ করলে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা উচিত নয়। তার সামনে ছোট হতে হয়, তাহলে সে লজ্জিত হয়।
বিনয়ী চরিত্রবানের উচিত নয়, গর্বভরে চলাফেরা করা বা চলনে অহংকার প্রকাশ করা। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَن تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَن تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولاً
"ভূ-পৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না, তুমি তো কখনোই পদভারে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বত-প্রমাণ হতে পারবে না।"১৪৮
সেই উপদেশ দিয়েই লোকমান হাকীম তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন,
وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
"মানুষের জন্য নিজের গাল ফুলায়ো না (অহংকারে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না) এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না; কারণ আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে ভালোবাসেন না।”১৪৯
মহান স্রষ্টা এমন উদ্ধতকে ভালোবাসেন না বলেই দুনিয়াতেই এক ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়েছেন, যাতে অহংকারীরা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। মহানবী বলেছেন,
بَيْنَمَا رَجُلٌ يَمْشِي فِي حُلَّةٍ تُعْجِبُهُ نَفْسُهُ ، مُرَجِّلٌ رَأْسَهُ ، يَخْتَالُ فِي مَشْيَتِهِ ، إِذْ خَسَفَ اللهُ بِهِ ، فَهُوَ يَتَجَلْجَلُ فِي الْأَرْضِ إِلَى يَوْمِ القِيَامَةِ
"একদা (পূর্ববর্তী উম্মতের) এক ব্যক্তি একজোড়া পোশাক পরে, গর্বভরে, মাথা আঁচড়ে অহংকারের সাথে চলা-ফেরা করছিল। ইত্যবসরে আল্লাহ তার (পায়ের নীচের মাটিকে) ধসিয়ে দিলেন। সুতরাং সে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত মাটির গভীরে নেমে যেতেই থাকবে।"১৫০
আর কিয়ামতেও এমন উদ্ধত মানুষ মহান আল্লাহর ক্রোধভাজন থাকবে। মহানবী বলেছেন,
مَنْ تَعَظَمَ فِي نَفْسِهِ أَوْ اخْتَالَ فِي مِشْيَتِهِ لَقِيَ اللَّهَ وَهُوَ عَلَيْهِ غَضْبَانُ
"যে ব্যক্তি মনে মনে গর্বিত হবে অথবা চলনে অহমিকা প্রকাশ করবে, সে ব্যক্তি যখন আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন তিনি তার উপর ক্রোধান্বিত থাকবেন।"১৫১
এমন অহংকারীকে কি কোন মানুষও পছন্দ করে? কক্ষনো না। অহংকারী নিজেকে অনেক উপরে ভাবে। যেন সে হিমালয়ের উচ্চ শিখরে পৌঁছে গেছে। তাই সে সকল মানুষকে ছোট দেখে। আর অবশ্যই মানুষেও তাকে ছোটই দেখবে, বড় নয়।
অহংকারীরা মানুষকে নেহাতই ক্ষুদ্র ভাবে বলে কিয়ামতে তাদেরকে ক্ষুদ্র প্রাণী পিঁপড়ার মতো জমায়েত করা হবে। ১৫২
বলা বাহুল্য, চরিত্রবানের চলন হবে রহমানের বান্দার মতো। যার গুণ বর্ণনা ক'রে রহমান বলেছেন,
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا
"তারাই রহমানের বান্দা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। ১৫৩
চরিত্রবান বিনয়ী চায় না যে, তার জন্য কোন মানুষ উঠে দণ্ডায়মান হোক। অথবা লোকে তার সামনে তার সম্মানে দাঁড়িয়ে থাক। মনে মনে এমন অভ্যর্থনা ও আপ্যায়ন কামনা করলে সে অহংকারীতে পরিণত হবে। আর তার পরিণাম অবশ্যই ভালো নয়। মহানবী বলেছেন,
مَنْ أَحَبَّ أَنْ يَمْثُلَ لَهُ الرِّجَالُ قِيَامًا فَلْيَتَبَوَّأُ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
"যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে লোক তার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে থাকুক সে যেন নিজের বাসস্থান দোযখে বানিয়ে নেয়। "১৫৪
বিনয়ী অপরের চোখে বড় হলেও নিজের চোখে বড় হয় না। আর নিজে বড় না হলে বাপ-দাদাকে নিয়ে বড় সাজতে চায় না। বাপদাদা বা বংশ নিয়ে গর্ব করা বিনয়ী মানুষের পরিচয় নয়। মহানবী বলেছেন,
لَيَنْتَهِيَنَ أَقْوَامٌ يَفْتَخِرُونَ بِآبَائِهِمُ الَّذِينَ مَاتُوا إِنَّمَا هُمْ فَحْمُ جَهَنَّمَ، أَوْ لَيَكُونُنَّ أَهْوَنَ عَلَى اللَّهِ مِنَ الجُعَلِ الَّذِي يُدَهْدِهُ الخِرَاءَ بِأَنْفِهِ، إِنَّ اللَّهَ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِّيَّةَ الجَاهِلِيَّةِ وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ، إِنَّمَا هُوَ مُؤْمِنٌ تَقِيٌّ وَفَاجِرٌ شَقِيٌّ النَّاسُ كُلُّهُمْ بَنُو آدَمَ وَآدَمُ خُلِقَ مِنْ تُرَابٍ
"লোকেরা যেন মৃত বাপ-দাদাদের নিয়ে ফখর করা অবশ্যই ত্যাগ করে। তারা তো জাহান্নামের কয়লা মাত্র। তা ত্যাগ না করলে তারা সেই গোবরে পোকার চেয়েও নিকৃষ্ট হবে যে নিজ নাক দ্বারা মল ঠেলে নিয়ে যায়।
অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের নিকট থেকে জাহেলিয়াতের গর্ব ও ফখর দূর করে দিয়েছেন। (মুসলিম) তো মুত্তাকী (সংযমশীল) মুমিন অথবা পাপাচারী বদমায়েশ। মানুষ সকলেই আদমের সন্তান এবং আদম মাটি হতে সৃষ্ট।”১৫৫
বংশ নিয়ে গর্ব করা জাহেল মানুষের কাজ, জাহেলী যুগের জাহেল লোকেদের প্রথা। মহানবী বলেছেন,
أَرْبَعٌ فِي أُمَّتِي مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ لَا يَتْرُكُونَهُنَّ الْفَخْرُ فِي الْأَحْسَابِ وَالطَّعْنُ فِي الأَنْسَابِ وَالاسْتِسْقَاءُ بِالنُّجُومِ وَالنِّيَاحَةُ
"আমার উম্মতের মাঝে চারটি কাজ হল জাহেলিয়াতের প্রথা, যা তারা ত্যাগ করবে না; বংশ নিয়ে গর্ব করা, (কারো) বংশ-সূত্রে খোঁটা দেওয়া, তারা (ও নক্ষত্রের) মাধ্যমে বৃষ্টির আশা করা এবং (মুর্দার জন্য) মাতম করা। ১৫৬
পক্ষান্তরে ইসলামী পরিবেশের আচরণ হল, মু'মিন বিনয়ী হবে, সহজ ও সরল হবে। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
الْمُؤْمِنُونَ هَيِّنُونَ لَيْنُونَ كالجَمَلِ الأَنفِ إِنْ قَيدَ انْقَادَ ، وَإِذَا أُنِيخَ عَلَى صَخْرَةٍ اسْتَنَاخَ
"মুমিনগণ সরল-বিনম্র হয়। ঠিক লাগাম দেওয়া উটের মত; তাকে টানা হলে চলতে লাগে এবং পাথরের উপরে বসতে ইঙ্গিত করলে বসে যায়। "১৫৭
আর তাদের জন্যই রয়েছে উপযুক্ত পুরস্কার, জান্নাতের মহল। সরল মনের বিনয়ী লোকেরা জাহান্নামে যাবে না। মহানবী বলেছেন,
مَنْ كَانَ لَيْنًا هَيِّنًا سَهْلاً حَرَّمَهُ اللَّهُ عَلَى النَّارِ
"যে ব্যক্তি বিনম্র ও সরল-সিধা হবে, আল্লাহ তাকে দোযখের জন্য হারাম করে দেবেন। "১৫৮
একদা রাত্রে উমার বিন আব্দুল আযীযের নিকট এক মেহমান ছিল। তিনি কিছু লিখছিলেন। এমন সময় তেলের বাতি নিভুনিভু হল। মেহমানটি বলল, 'বাতিটা ঠিক করে দিই।' তিনি বললেন, 'মেহমানকে কাজে লাগানো বা মেহমানের নিকট থেকে খিদমত নেওয়া আতিথেয়তা বিরোধী।' বলল, 'তাহলে চাকরকে জাগিয়ে দিই।' বললেন, 'ও এই মাত্র প্রথম ঘুমিয়েছে, ওকে জাগাও না।' অতঃপর তিনি নিজে উঠে গিয়ে বাতিতে তেল ভরে ঠিক করলেন।
মেহমানটি বলল, 'আপনি নিজে কষ্ট করলেন, হে আমীরুল মু'মেনীন!' তিনি উত্তরে বললেন, '(তেল ভরতে) গেলাম তখন আমি উমার বিন আব্দুল আযীয ছিলাম, আর এলাম তখনও আমি উমার বিন আব্দুল আযীয। আমার মধ্যে কিছুই কমে যায়নি। পরন্তু শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সেই, যে আল্লাহর কাছে বিনয়ী। ১৬৯
টিকাঃ
১২৩. মুসলিম ৭৩৮-৯
১২৪. মুসলিম ৬৭৫৭, প্রমুখ
১২৫. বুখারী ৪৯১৮, মুসলিম ৭৩৬৬
১২৬. মুসলিম ২৭৫, তিরমিযী, হাকেম ১/২৬
১২৭. সূরা লুকুমান: ৭
১২৮. সূরা জাষিয়াহ: ৭-৮
১২৯. সূরা বাক্বারাহ-২: ২০৬
১৩০. বুখারী ৫৭৮৮, মুসলিম ৫৫৮৪
১৩১. মুসলিম ৩০৬
১৩২. বুখারী ৫৩৯৮
১৩৩. সিলসিলাহ সহীহাহ ৩১২২
১৩৪. আবু দাউদ ৩৭৭৫, ইবনে মাজাহ ৩২৬৩
১৩৫. সঃ জামে' ৭
১৩৬. সঃ জামে' ৪৯১৫
১৩৭. সঃ জামে' ৪৯৩৯
১৩৮. আল-আদাবুল মুফরাদ ৫৫০, বাইহাকীর শুআবুল ঈমান ৮১৮৮, সহীহুল জামে ৫৫২৭
১৩৯. বুখারী ২৫৬৮
১৪০. সহীহ আদাবুল মুফরাদ ১/২১৫, সহীহুল জামে' ৪৯৩৭, ৪৯৪৬, ৪৯৯৬
১৪১. সঃ জামে' ৪৯৪৫
১৪২. সঃ জামে' ৪৯৪৭
১৪৩. বুখারী ৬০৭২
১৪৪. ঐ ৫০১৪
১৪৫. ঐ ৫০২৫
১৪৬. বুখারী ৭৭, মুসলিম ১৫৩০
১৪৭. সূরা ক্বাস্বাস্ব: ৭৬-৮৩
১৪৮. সূরা বানী ইস্রাঈল: ৩৭
১৪৯. সূরা লুকুমান: ১৮
১৫০. বুখারী ৫৭৮৯, মুসলিম ৫৫৮৬
১৫১. আহমাদ ৫৯৯৫, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ, হাকেম ১/১৬০, সহীহুল জামে' ৬১৫৭
১৫২. আহমাদ ৬৬৭৭, তিরমিযী ২৪৯২
১৫৩. সূরা ফুরক্বান: ৬৩
১৫৪. আবু দাউদ ৫২৩১, তিরমিযী ২৭৫৫, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৫৭
১৫৫. তিরমিযী ৩৯৫৫, আহমাদ, আবু দাউদ, বাইহাক্বী, সহীহুল জামে' ৫৪৮২
১৫৬. মুসলিম ২২০৩, ইবনে মাজাহ ১৫৮১
১৫৭. বাইহাকীর শুআবুল ঈমান ৮১২৯, সহীহুল জামে ৬৬৬৯
১৫৮. হাকেম ৪৩৫, বাইহাকী ২১৩২৭, সহীহুল জামে ৬৪৮৪
১৫৯. আল-বিদায়াহ অনিহায়াহ ৯/২০৩
📄 উদারতা
উদারতা এক সচ্চরিত্রতার নাম। অতিরঞ্জন, গোঁড়ামি ও বাড়াবাড়ির চরিত্র পছন্দনীয় নয় ইসলামে। উদারতা ও সরলতা ইসলামে বরণীয়। ধার্মিকতার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'কোন্ দ্বীন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয়?' তিনি বললেন,
الْحَنِيفِيَّةُ السَّمْحَةُ
“একনিষ্ঠ সরল।”১৬০
এ ধর্মে সংকীর্ণতা নেই। এ ধর্মের মানুষদের মাঝে অস্পৃশ্যতা নেই। বলপূর্বক কারো ঘাড়ে ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার রীতি নেই ইসলামে। আর যে চাপে পড়ে ইসলাম গ্রহণ করে, তার ইসলাম গ্রহণযোগ্যও নয় আল্লাহর কাছে।
চরিত্রবান মুসলিম অমুসলিমকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে না। সে তার কথাবার্তা ও আচরণে অমুসলিমদের মনে ইসলামের প্রতি বিকর্ষণ ও বিতৃষ্ণা সৃষ্টি করে না।
চরিত্রবান মুসলিম অমুসলিমের পাশাপাশি শান্তির সাথে বসবাস করে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখে, পার্থিব লেনদেনে শরীক হয় এবং তাদের হিদায়াত কামনা করে। যেহেতু মহান প্রতিপালক বলেছেন,
لَا يَنْهَاكُمُ اللهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
"দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে স্বদেশ হতে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায় বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়-পরায়ণদেরকে ভালবাসেন।"১৬১
কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সব ধর্ম সমান মানতে হবে। যেহেতু ইসলামই মহান আল্লাহর প্রেরিত একমাত্র ধর্ম।
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الإِسْلَامُ
“নিশ্চয় ইসলাম আল্লাহর নিকট (একমাত্র মনোনীত) ধর্ম।”১৬২
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْلامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
“যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম অন্বেষণ করবে, তার পক্ষ হতে তা কখনও গ্রহণ করা হবে না। আর সে হবে পরলোকে ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত।”১৬৩
উদারতা বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার মানে এই নয় যে, মুসলিম- অমুসলিম বৈবাহিক সম্পর্ক কায়েম করতে হবে। পরস্পরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগদান করতে হবে। যদি কেউ অন্যায় ও অসত্যের সাথে আপোস করতে বলে, তাহলে তাকে বলুন,
قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ - لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ - وَلا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ - وَلَا أَنَا عَابِدٌ مَا عَبَدتُّمْ - وَلا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ - لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ
"বল, হে অস্বীকারকারীর দল! আমি তার ইবাদত করি না, যার ইবাদত তোমরা কর এবং তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও, যাঁর ইবাদত আমি করি। এবং আমি ইবাদতকারী নই তার, যার ইবাদত তোমরা ক'রে থাক। এবং তোমরা তাঁর ইবাদতকারী নও, যাঁর ইবাদত আমি করি। তোমাদের দ্বীন (শির্ক) তোমাদের জন্য এবং আমার দ্বীন (ইসলাম) আমার জন্য।”১৬৪
ব্যবসা-বাণিজ্যে ও আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে উদার ও সরল হয় চরিত্রবান মুসলিম। যেহেতু এমন মানুষ মহানবী এর দুআতে শামিল হয়। তিনি বলেছেন,
رَحِمَ اللَّهُ رَجُلًا سَمْحًا إِذَا بَاعَ وَإِذَا اشْتَرَى وَإِذَا اقْتَضَى
“আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি রহম করুন, যে বিক্রয়কালে উদার, ক্রয়কালে উদার, ঋণ পরিশোধ কালে উদার এবং ঋণ আদায়কালেও উদার।”১৬৫
নিজ স্বামী-সংসারে সরলা হয় চরিত্রবতী মুসলিম নারী। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির ব্যাপারে কোন সংকীর্ণতার শিকার হয় না সে। যা জোটে তাই খায়, তাই পরে। অতিরিক্ত কিছুর জন্য চাপ সৃষ্টি বা অভিমান করে না। স্বামীর অকৃতজ্ঞতা করে না।
সরল মনে স্বামীর ভালোবাসার অধিকারিণী হয়। তার সাথে কোন ছলাকলা বা চাতুর্য ব্যবহার ক'রে তাকে ধোঁকা দেয় না। সংসারের কারো প্রতি হিংসা করে না। তার মনে কারো প্রতি কোন কূটিলতা থাকে না, প্যাঁচ থাকে না। কথায় হয় অকপট ও সরল। প্রত্যেক স্বামী চায় এমনই সহধর্মিণী।
'আমি চাই শিশু হেন উলঙ্গ পরাণ, মুখে মাখা সরলতা, কয় না সাজানো কথা, জানে না যোগাতে মন করি নানা ভান। প্রাণ খোলা, মন খোলা, আপনি আপনা ভোলা, তার স্নেহ-প্রীতি সবি হৃদয়ের টান। আমি চাই স্বরগের উলঙ্গ পরাণ।।'
স্ত্রীর জন্যও চরিত্রবান স্বামী হয় উদার-চিত্ত। ভালোবাসায় উজাড় করা বুক, সরল বাক্যে প্রেম ও হাসি-ভরা মুখ এবং ক্ষমাশীলতা প্রয়োগ ক'রে স্ত্রীর ভুলকে ফুল দ্বারা পরিণত করে। চলার পথে একটা দোষ দেখে তার অন্য গুণাবলীকে দৃষ্টিচ্যুত করে না। মহানবী এর নির্দেশ,
لا يَفْرَكُ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقاً رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
"কোন ঈমানদার পুরুষ যেন কোন ঈমানদার নারী (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। যদি সে তার একটি আচরণে অসন্তুষ্ট হয়, তবে অন্য আচরণে সন্তুষ্ট হবে। "১৬৬
তবে সরল হওয়া মানে আঁচল-ধরা 'দাইয়ুস' হওয়া নয়। কারণ তা হলে তো বেহেশতই নিষিদ্ধ হয়ে যাবে তার জন্য।
উদার হওয়ার মানে এই নয় যে, স্ত্রীকে বেপর্দা করতে হবে, বেগানার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতে দিতে হবে, মিশ্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে পাঠাতে হবে, বয়ফ্রেণ্ড গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে, একাকিনী বাজার যাওয়ার বা সফর করার অনুমতি দিতে হবে, পুরুষদের সাথে চাকরি করতে দিতে হবে, ইচ্ছামতো থাকার ও বাইরে যাওয়া-আসার স্বাধীনতা দিতে হবে ইত্যাদি। যেহেতু স্বাধীনতা পুণ্যময়ী স্ত্রীকেও নষ্ট ক'রে ফেলে।
এ বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ অনুদার। অধিকাংশ মানুষ হক জানে না, হক মানে না। হক গ্রহণে উদারতা প্রদর্শন করে না, বরং ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে। হক মানতে তর্ক-বিতর্ক করে। এই শ্রেণীর বিতর্কপ্রিয় মানুষদের কথা মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবের একাধিক জায়গায় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন,
وَمَا نُرْسِلُ الْمُرْسَلِينَ إِلَّا مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَيُجَادِلُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِالْبَاطِلِ لِيُدْحِضُوا بِهِ الْحَقَّ وَاتَّخَذُوا آيَاتِي وَمَا أُنذِرُوا هُزُوًا
"আমি শুধু সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপেই রসূলদেরকে পাঠিয়ে থাকি, কিন্তু সত্য প্রত্যাখ্যানকারীরা মিথ্যা অবলম্বনে বিতণ্ডা করে; যাতে তার দ্বারা সত্যকে ব্যর্থ ক'রে দেয়। আর তারা আমার নিদর্শনাবলী ও যার দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে, সে সবকে বিদ্রূপের বিষয়রূপে গ্রহণ ক'রে থাকে।"১৬৭
مَا يُجَادِلُ فِي آيَاتِ اللهِ إِلَّا الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَا يَغْرُرُكَ تَقَلُّبُهُمْ فِي الْبِلَادِ
"কেবল অবিশ্বাসীরাই আল্লাহর নিদর্শনসমূহ সম্বন্ধে বিতর্ক করে, সুতরাং দেশে-দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন তোমাকে বিভ্রান্ত না করে।"১৬৮
كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمُ نُوحٍ وَالْأَحْزَابُ مِن بَعْدِهِمْ وَهَمَّتْ كُلُّ أُمَّةٍ بِرَسُولِهِمْ لِيَأْخُذُوهُ وَجَادَلُوا بِالْبَاطِلِ لِيُدْخِضُوا بِهِ الْحَقَّ فَأَخَذْتُهُمْ فَكَيْفَ كَانَ عِقَابِ
"কেবল অবিশ্বাসীরাই আল্লাহর নিদর্শনসমূহ সম্বন্ধে বিতর্ক করে, সুতরাং দেশে-দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন তোমাকে বিভ্রান্ত না করে। এদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়ও নবীগণকে মিথ্যাবাদী বলেছিল এবং তাদের পরে অন্যান্য দলও। প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ রসূলকে নিরস্ত করার অভিসন্ধি করেছিল এবং ওরা সত্যকে ব্যর্থ ক'রে দেওয়ার জন্য অসার যুক্তি-তর্কে লিপ্ত হয়েছিল, ফলে আমি ওদেরকে পাকড়াও করলাম। সুতরাং কত কঠোর ছিল আমার শাস্তি!”১৬৯
وَمِنَ النَّاسِ مَن يُجَادِلُ فِي اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّبِعُ كُلَّ شَيْطَانٍ مَّرِيدٍ
"মানুষের মধ্যে কতক আছে যারা অজ্ঞানতাবশতঃ আল্লাহ সম্বন্ধে বিতণ্ডা করে এবং অনুসরণ করে প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তানের।"১৭০
وَمِنَ النَّاسِ مَن يُجَادِلُ فِي اللهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَلَا هُدًى وَلَا كِتَابٍ مُّنِيرٍ - ثَانِيَ عِطْفِهِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللهِ لَهُ فِي الدُّنْيَا خِزْيٌ وَنُذِيقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَذَابَ الْحَرِيقِ - ذَلِكَ بِمَا قَدَّمَتْ يَدَاكَ وَأَنَّ اللَّهَ لَيْسَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ
“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ জ্ঞান, পথনির্দেশ ও দীপ্তিমান কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্বন্ধে বিতণ্ডা করে। (সে বিতণ্ডা করে) ঘাড় বাঁকিয়ে, লোকদেরকে আল্লাহর পথ হতে ভ্রষ্ট করবার জন্য; তার জন্য ইহলোকে রয়েছে লাঞ্ছনা। আর কিয়ামতের দিন আমি তাকে আস্বাদ করাব জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি। (সেদিন তাকে বলা হবে,) এটা তোমার কৃতকর্মেরই ফল। নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দাদের প্রতি অত্যাচার করেন না।” (হাজ্জ: ৪-১০)
الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي آيَاتِ اللهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ أَتَاهُمْ كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ وَعِندَ الَّذِينَ آمَنُوا كَذَلِكَ يَطْبَعُ اللَّهُ عَلَى كُلِّ قَلْبِ مُتَكَبِّرٍ جَبَّارٍ
“যারা নিজেদের নিকট আগত কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়---তাদের এ কাজ আল্লাহ এবং বিশ্বাসীদের নিকট অতিশয় অসন্তোষের বিষয়। এইভাবে আল্লাহ প্রত্যেক উদ্ধত ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়কে মোহর ক'রে দেন।" (মু'মিনঃ ৩৫)
إِنَّ الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي آيَاتِ اللهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ أَتَاهُمْ إِن فِي صُدُورِهِمْ إِلَّا كِبْرٌ مَّا هُم بِبَالِغِيهِ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
“যারা নিজেদের নিকট আগত কোন দলীল ছাড়াই আল্লাহর নিদর্শনাবলী সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়, ওদের অন্তরে আছে কেবল অহংকার, যা সফল হওয়ার নয়। অতএব তুমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর; নিশ্চয় তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”১৭১
পক্ষান্তরে তিনি এই উম্মতকে আমভাবে তর্ক করতে অনুমতি দেননি। বিধর্মীদের সাথে তর্ক করতে হলে সৌজন্যের সাথে করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِلَّا الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْهُمْ وَقُولُوا آمَنَّا بِالَّذِي أُنزِلَ إِلَيْنَا وَأُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَإِلَهُنَا وَإِلَهُكُمْ وَاحِدٌ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ
"সৌজন্যের সাথে ছাড়া তোমরা গ্রন্থধারী (ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান)দের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করো না; তবে ওদের মধ্যে যারা সীমালংঘনকারী, তাদের সাথে (তর্ক) নয়। আর বল, 'আমাদের প্রতি এবং তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাতে আমরা বিশ্বাস করি এবং আমাদের উপাস্য ও তোমাদের উপাস্য তো একই এবং আমরা তাঁরই প্রতি আত্মসমর্পণকারী। "১৭২
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
"তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা কর সভাবে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক, তাঁর পথ ছেড়ে কে বিপথগামী হয়, সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত এবং কে সৎপথে আছে তাও সবিশেষ অবহিত। "১৭৩
আর স্বধর্মাবলম্বীদের সাথে তর্ক করতে আমভাবে নিষেধ করা হয়েছে। বিশেষ ক'রে আল্লাহর কিতাব ও তার অর্থ বা ব্যাখ্যা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করা মোটেই বৈধ নয়। একদা কুরআনী কোন বিষয় নিয়ে কিছু সাহাবাকে তর্ক করতে দেখে নবী বললেন,
مَهْلًا يَا قَوْمِ بِهَذَا أُهْلِكَتْ الْأُمَمُ مِنْ قَبْلِكُمْ بِاخْتِلَافِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ وَضَرْبِهِمُ الْكُتُبَ بَعْضَهَا بِبَعْضٍ إِنَّ الْقُرْآنَ لَمْ يَنْزِلُ يُكَذِّبُ بَعْضُهُ بَعْضًا بَلْ يُصَدِّقُ بَعْضُهُ بَعْضًا فَمَا عَرَفْتُمْ مِنْهُ فَاعْمَلُوا بِهِ وَمَا جَهِلْتُمْ مِنْهُ فَرُدُّوهُ إِلَى عَالِمِهِ
"থামো হে লোক সকল! নবীদের ব্যাপারে মতভেদ এবং কিতাবের একাংশকে অন্য অংশের সাথে সংঘর্ষ সৃষ্টি ক'রে তোমাদের পূর্বের বহু জাতি ধ্বংস হয়েছে। কুরআন এভাবে অবতীর্ণ হয়নি যে, তার একাংশ অন্য অংশকে মিথ্যায়ন করবে। বরং তার একাংশ অন্য অংশকে সত্যায়ন করে। সুতরাং যা তোমরা বুঝতে পার, তার উপর আমল কর এবং যা বুঝতে পার না, তা তার জ্ঞানীর দিকে ফিরিয়ে দাও। "১৭৪
তিনি আরো বলেছেন,
الْمِرَاءُ فِي الْقُرْآنِ كُفْرُ
"কুরআন বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ করা কুফরী।”১৭৫
আসলে চরিত্রবান উদার হয়, মু'মিনের ঈমান হয় অকপট প্রত্যয় ও সরল বিশ্বাস, মুসলিমের ইসলাম হয় দ্বিধাহীন আত্মসমর্পণ ও নিষ্ঠার সাথে আনুগত্য। তার তর্কের প্রয়োজন হয় না, তর্কে জড়ায়ও না। যেহেতু সে বিতর্ক করতে আদিষ্ট নয়, সে আদিষ্ট প্রচার করতে ও পৌঁছে দিতে। আসলে তর্ক করে মুসলিম সমাজে বসবাসকারী মুসলিম নামধারী কিছু মুনাফিক অথবা কাফেরদের ছত্রছায়ায় বসবাসকারী কিছু ক্রীতমস্তিষ্কের মুর্তাদ। তারাই কুরআন নিয়ে নানা সন্দিহান ও বিতর্ক সৃষ্টি ক'রে ভিতর থেকে ইসলামকে দুর্বল করার অপচেষ্টা করে। আর সত্য কথা এই যে, তারা তর্কে সফলতা লাভ করে। মহানবী বলেছেন,
لَا تُجَادِلُوا بِالْقُرْآنِ وَلَا تُكَذِّبُوا كِتَابَ اللهِ بَعْضَهُ بِبَعْضٍ فَوَاللَّهِ إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَيُجَادِلُ بِالْقُرْآنِ فَيُغْلَبُ وَإِنَّ الْمُنَافِقَ لَيُجَادِلُ بِالْقُرْآنِ فَيَغْلِبُ»
"তোমরা কুরআন নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করো না এবং আল্লাহর কিতাবের কিছু অংশ দ্বারা কিছু অংশকে মিথ্যাজ্ঞান করো না। আল্লাহর কসম! মু'মিন কুরআন নিয়ে বিতর্ক করলে পরাজিত হবে এবং মুনাফিক কুরআন নিয়ে বিতর্ক করলে বিজয়ী হবে।"১৭৬
যিয়াদ বিন হুদাইর বলেন, একদা আমাকে উমার বললেন, 'তুমি জান কি, ইসলামকে কিসে ধ্বংস করবে?' আমি বললাম, 'জী না।' তিনি বললেন,
يَهْدِمُهُ زَلَّةُ الْعَالِمِ، وَجِدَالُ الْمُنَافِقِ بِالْكِتَابِ وَحُكْمُ الْأَئِمَّةِ الْمُضِلَّينَ
'ইসলামকে ধ্বংস করবে আলেমের পদস্খলন, কুরআন নিয়ে মুনাফিকের বিতর্ক এবং ভ্রষ্টকারী শাসকদের রাষ্ট্রশাসন।'১৭৭
উদার হওয়া ভালো, তর্ক করা ভালো নয়। প্রকৃত আলেম তর্কে জড়ান না। তর্ক করার জন্য ইলম শিক্ষা করাও বৈধ নয়। মহানবী বলেছেন,
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِيُجَارِيَ بِهِ الْعُلَمَاءَ ، أَوْ لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ ، أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْهِ ، أَدْخَلَهُ اللَّهُ النَّارَ
"যে ব্যক্তি উলামাদের সাথে তর্ক করার জন্য, অথবা মূর্খ লোকেদের সাথে বচসা করার জন্য এবং জন সাধারণের সমর্থন (বা অর্থ) কুড়াবার জন্য ইলম অন্বেষণ করে, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ জাহান্নাম প্রবেশ করাবেন।"১৭৮
لَا تَعَلَّمُوا الْعِلْمَ لِتُبَاهُوا بِهِ الْعُلَمَاءَ ، وَلَا لِتُمَارُوا بِهِ السُّفَهَاءَ ، وَلَا تَخَيَّرُوا بِهِ الْمَجَالِسَ، فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ ، فَالنَّارُ النَّارُ
"তোমরা উলামাগণের সাথে তর্ক-বাহাস করার উদ্দেশ্যে ইলম শিক্ষা করো না, ইলম দ্বারা মূর্খ লোকেদের সাথে বাগ্বিতণ্ডা করো না এবং তদ্দ্বারা আসন, পদ বা নেতৃত্ব) লাভের আশা করো না। কারণ, যে ব্যক্তি তা করে তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম, তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম।"১৭৯
তর্কে অনেক সময় হককে বাতিল প্রতিপন্ন করা হয়। আর সে ক্ষেত্রে ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কী লাভ হয়? আর এই জন্যই মহানবী বলেছেন,
مَا ضَلَّ قَوْمٌ بَعْدَ هُدًى كَانُوا عَلَيْهِ إِلَّا أُوتُوا الْجَدَلَ ثُمَّ قَرَأَ مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ
"হিদায়াতপ্রাপ্তির পর যে জাতিই পথভ্রষ্ট হয়েছে সেই জাতির মধ্যেই কলহ-প্রিয়তা প্রক্ষিপ্ত হয়েছে।" অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন।
مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا، بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ
অর্থাৎ, তারা তোমার সামনে যে উদাহরণ পেশ করে, তা কেবল বিতর্কের জন্যই করে। বস্তুতঃ তারা হল এক বিতর্ককারী সম্প্রদায়। ১৮০
তর্কপ্রিয় মানুষ মহান প্রতিপালকের নিকট পছন্দনীয় নয়। বরং সে তাঁর নিকট সবচেয়ে ঘৃণ্য। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ أَبْغَضَ الرِّجَالِ إِلَى اللَّهِ الأَلَدُّ الْخَصِمُ
"আল্লাহর নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট শ্রেণীর মানুষ হল কঠিন ঝগড়াটে ও হুজ্জতকারী ব্যক্তি।"১৮১
হকপন্থী ও সত্যাশ্রয়ী নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও তর্ক করা উচিত নয়। যে তর্ক করে না, সে চরিত্রবান। তার জন্য রয়েছে বেহেস্তী মহল। মহানবী বলেছেন,
أَنَا زَعِيمٌ بِبَيْتٍ فِي رَبَضِ الْجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ الْمِرَاءَ وَإِنْ كَانَ مُحِقًّا وَبِبَيْتٍ فِي وَسَطِ الْجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ الْكَذِبَ وَإِنْ كَانَ مَازِحًا وَبِبَيْتٍ فِي أَعْلَى الْجَنَّةِ لِمَنْ حَسَّنَ خُلُقَهُ
"আমি জান্নাতের পার্শ্বে এক গৃহের জামিন সেই ব্যক্তির জন্য যে সত্যাশ্রয়ী হওয়া সত্ত্বেও তর্ক বর্জন করে, জান্নাতের মাঝে এক গৃহের জামিন তার জন্য যে উপহাস ছলেও মিথ্যা ত্যাগ করে এবং জান্নাতের সবার উপরে এক গৃহের জামিন তার জন্য যার চরিত্র সুন্দর হয়।"১৮২
আর বাতিলপন্থী হয়ে জেনেশুনে তর্ক করা অবশ্যই চরিত্রবান মানুষের কর্ম নয়। এমন লোক মহান প্রতিপালকের ক্রোধভাজন। মহানবী বলেছেন,
وَمَنْ خَاصَمَ فِي بَاطِلٍ وَهُوَ يَعْلَمُهُ لَمْ يَزَلْ فِي سَخَطِ اللَّهِ حَتَّى يَنْزِعَ عَنْهُ
"--যে ব্যক্তি জেনেশুনে কোন বাতিল (অন্যায়) বিষয়ে তর্ক করে, সে ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর রোষে থাকে; যতক্ষণ পর্যন্ত সে তা বর্জন না করে।"১৮৩
তর্ক না করার ব্যাপারে জ্ঞানীদের উপদেশ হল :
১। তর্ক করো না, কারণ তর্কে জেতা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তর্কে না জড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ।
২। কোন ধৈর্যশীল বা আহমকের সাথে তর্ক করো না। কারণ, ধৈর্যশীল তোমাকে পরাজিত করবে এবং আহমক তোমাকে ক্লিষ্ট করবে।
৩। আহমকের সঙ্গে তর্ক করো না, কারণ লোকে তোমাদের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে ভুল করতে পারে।
৪। আরবী কবি বলেছেন,
إذا نطق السفيه فلا تجبه " فخير من إجابته السكوت
অর্থাৎ, আহমক যখন কথা বলে, তখন তুমি তার কথার জবাব দিয়ো না। যেহেতু তার কথার জবাব দেওয়া অপেক্ষা চুপ থাকা উত্তম।
আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
"তারাই পরম দয়াময়ের দাস, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, ‘সালাম’।"১৮৪
وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ وَقَالُوا لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِي الْجَاهِلِينَ
"ওরা যখন অসার বাক্য শ্রবণ করে, তখন ওরা তা পরিহার ক'রে চলে এবং বলে, 'আমাদের কাজের জন্য আমরা দায়ী এবং তোমাদের কাজের জন্য তোমরা দায়ী; তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা অজ্ঞদের সঙ্গ চাই না। "১৮৫
৫। মূর্খের সাথে তর্কযুদ্ধ বা বাক্যুদ্ধ করার মানেই হল পাথরের উপর হাত দিয়ে আঘাত করা। হাতই ক্ষত-বিক্ষত হবে, পাথরের কী হবে? কারণ, তা তো নির্জীব।
৬। বচনবাগিশ আর মূর্খের সাথে খবরদার তর্ক করো না। কারণ, প্রথমোক্তের কাছে তুমি পরাজিত হবে এবং দ্বিতীয়োক্তের কাছে হবে অপমানিত।
৭। জ্ঞানী যদি মূর্খের মোকাবিলায় পড়ে তবে তার নিকট থেকে সম্মানের আশা করা ঠিক নয়। আর কোন মূর্খ যদি জ্ঞানী লোকের মোকাবিলায় জিতে যায়, তবে আশ্চর্যের কিছু নয়। কারণ, পাথরের আঘাতে মুক্তার বিনাশ সহজেই হয়ে থাকে। ১৮৬
৮। একটি মূল্যহীন পাথর যদি সোনার পাত্র ভেঙ্গে ফেলে, তাহলে তাতে পাথরের কোন প্রকার মূল্য বৃদ্ধি হয় না এবং সোনারও কোন প্রকার মূল্য হ্রাস হয় না। ১৮৭
৯। মূর্খদের মজলিসে কোন জ্ঞানী ব্যক্তির কথা না চললে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নয়। কারণ, ঢাকের শব্দের কাছে তবলার শব্দ বিলীন হওয়া এবং রসুনের দুর্গন্ধের কাছে ধূপের সুগন্ধ বিলুপ্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। ১৮৮
১০। একজন মূর্খ কোন জ্ঞানী ব্যক্তিকে তর্কে হারিয়ে দিলে সে আস্ফালন করতে থাকে। কিন্তু তার এ কথা জানা নেই যে, ঢাকের ঢপঢপে শব্দের মাঝে মোহন বাঁশীর সুর বিলীন হয়ে যায়। ১৮৯
১১। মুহাম্মাদ বিন হুসাইন বলেন, কারো সাথে হুজ্জত করো না। কারণ, হুজ্জত দ্বীন নষ্ট করে দেয় এবং হৃদয়ে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে।
পরিশেষে বলি, তর্কে কোন লাভ নেই। তর্কে হককে বাতিল প্রতিপন্ন করা হতে পারে। তর্কে দলীল হারিয়ে প্রতিপক্ষ গালাগালি ও অসভ্য ভাষা প্রয়োগ করে। পরে বাড়াবাড়ি হয়ে তা মারামারিতে পৌঁছে যেতে পারে। যেহেতু তর্কে নিজের ঘোলকে কেউ টক বলে না।
'সকল পীড়ার ঔষধের সার সুরা, সুরাপায়ী কয় রে, যে যাহার বশ গায় তার যশ শুনে মূঢ় বশ হয় রে।'
তাই কেউ হক না মানলে আপনি তার সাথে তর্ক করবেন না। আপনার কাজ হক পৌঁছে দেওয়া। হিদায়াতের মালিক আল্লাহ।
সংসার-ধর্মেও আপনি তর্ক বর্জন করুন। কথায়-কথায় তর্ক করলে লোক আপনার নিকট থেকে সরে যাবে, আপনার সাথে কেউ দেখা করতেও চাইবে না। তর্কাতর্কিতে ভালোবাসা মলিন হতে থাকে। বিশেষ ক'রে আপনি ছোট হলে বড়দের সাথে তর্ক করবেন না, করলে আপনি তার কাছে অপ্রিয় ও অবাঞ্ছিত হয়ে যাবেন। কারো কথা পছন্দ না হলে অথবা অযৌক্তিক লাগলে এবং মেনে নিতে না পারলেও তর্ক বর্জন করুন। তাতে শান্তি পাবেন, স্বস্তি পাবেন। নচেৎ এমনও হতে পারে, তর্ক এক সময় নিয়ে যাবে গালাগালিতে। অতঃপর শেষ হবে মারামারিতে।
টিকাঃ
১৬০. আহমাদ ২১০৭, আল-আদাবুল মুফরাদ বুখারী ২৮৩, সিঃ সহীহাহ ৮৮১
১৬১. সূরা মুমতাহিনাহ: ৮
১৬২. সূরা আলে ইমরান-৩: ১৯
১৬৩. সূরা আলে ইমরান-৩: ৮৫
১৬৪. সূরা কাফিরুন
১৬৫. বুখারী ২০৭৬, ইবনে মাজাহ ২২০৩, সহীহুল জামে' ৩৪৯৫
১৬৬. মুসলিম ১৪৬৯
১৬৭. সূরা কাহফ: ৫৬
১৬৮. সূরা মু'মিন: 4
১৬৯. সূরা মু'মিন: ৪-৫
১৭০. সূরা হাজ্জ:৩
১৭১. সূরা মু'মিন: ৫৬
১৭২. সূরা আনকাবূত: ৪৬
১৭৩. সূরা নাহল: ১২৫
১৭৪. আহমাদ ৬৭০২, শারহুল আক্বীদাতিত ত্বাহাবিয়্যাহ ১/২১৮
১৭৫. আবু দাউদ ৪৬০৫, ইবনে হিব্বান ১৪৬৪, সহীহ তারগীব ১৩৮
১৭৬. তাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৪৪৭
১৭৭. দারেমী ২১৪
১৭৮. তিরমিযী ২৬৫৪, ইবনে আবিদ্দুনয়্যা, হাকেম ২৯৩, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭৭২, সহীহ তারগীব ১০০
১৭৯. ইবনে মাজাহ ২৫৪, ইবনে হিব্বান ৭৭, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭৭১, সহীহ তারগীব ১০১
১৮০. সূরা যুখরুফ ৫৮ আয়াত, আহমাদ ২২১৬৪, ২২২০৪, তিরমিযী ৩২৫৩, ইবনে মাজাহ ৪৮, ইবনে আবিদ্দুনয়্যা, সহীহ তারগীব ১৩৬
১৮১. বুখারী ২৪৫৭, মুসলিম ৬৯৫১নং প্রমুখ
১৮২. আবু দাউদ ৪৮০২, তাবারানী ৭৩৬১
১৮৩. আবু দাউদ ৩৫৯৭, হাকেম ২/২৭, ত্বাবারানী, বাইহাকী, সহীহুল জামে' ৬১৯৬
১৮৪. সূরা ফুরক্বান: ৬৩
১৮৫. সূরা ক্বাস্বাস: ৫৫
১৮৬. শেখ সা'দী
১৮৭. শেখ সা'দী
১৮৮. শেখ সা'দী
১৮৯. শেখ সা'দী
📄 সহিষ্ণুতা
চরিত্রবান নারী-পুরুষের একটি মহৎ গুণ হল সহিষ্ণুতা ও সহনশীলতা। দেখবেন তাদের প্রতি দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে, দুর্ব্যবহারের প্রতিশোধে অনুরূপ দুর্ব্যবহার করার ক্ষমতা অথবা তার শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা সে ক্ষমতা প্রয়োগ করছে না। নিজের প্রতি কৃত অন্যায়কে সহ্য করে যাচ্ছে। তারা দ্বীনের ব্যাপারে কোন অন্যায়াচরণকে বরদাস্ত করে না, কিন্তু নিজের ব্যাপারে অপরের অন্যায়াচরণকে বরদাস্ত ও হজম ক'রে নিচ্ছে।
শত্রুর শত্রুতার বিরুদ্ধে সংযম ও সহিষ্ণুতার নীতি অবলম্বন করছে। বিরোধীর বিরোধিতার নীতির ব্যাপারে সহনশীলতা অবলম্বন করছে। হিংসুকের হিংসার ছোবলে পড়েও সহিষ্ণু হয়ে জীবন-যাপন করছে। অবাধ্য স্ত্রী-সন্তানের ব্যাপারেও সহিষ্ণুতা অবলম্বন ক'রে চলেছে। অত্যাচারী স্বামী-শ্বাশুড়ীর অত্যাচারের মুখে সহনশীলতার আদর্শ প্রদর্শন ক'রে চলেছে।
বারবার ভুলকারী দাস-দাসী ও ভৃত্য-চাকরের ভুলে সহনশীলতার সদাচার প্রয়োগ ক'রে চলেছে।
যালেম প্রশাসনের স্টিম রুলারের নিচে পিষ্ট হয়েও সহ্যশীলতার নীতি আঁকড়ে ধারণ ক'রে আছে।
প্রতিদ্বন্দ্বীদের কটাক্ষ ও গালাগালির বিরুদ্ধেও সহিষ্ণু হওয়া ও ক্ষয়িষ্ণু না হওয়ার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
যার প্রতি উপকার করা হয়েছে, কিন্তু সে অকৃতজ্ঞ, এমন নেমকহারামের বিরুদ্ধে সহিষ্ণুতার নীতি অবলম্বন ক'রে সংসার করছে।
তারা তা পারবে না কেন? তাদের আদর্শ যে সহিষ্ণু নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,
مَا خُيْرَ رَسُولُ اللهِ ﷺ بَيْنَ أَمْرَيْنِ قَطُّ إِلَّا أَخَذَ أَيْسَرَهُمَا ، مَا لَمْ يَكُنْ إِثماً ، فَإِنْ كَانَ إِثماً ، كَانَ أَبْعَدَ النَّاسِ مِنْهُ وَمَا انْتَقَمَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِنَفْسِهِ فِي شَيْءٍ قَطُّ، إِلَّا أَن تُنْتَهَكَ حُرْمَةُ اللَّهِ ، فَيَنْتَقِمَ اللَّهِ تَعَالَى
'রাসূলুল্লাহ কে যখনই দু'টি কাজের মধ্যে স্বাধীনতা দেওয়া হত, তখনই তিনি সে দু'টির মধ্যে সহজ কাজটি গ্রহণ করতেন; যদি সে কাজটি গর্হিত না হত। কিন্তু তা গর্হিত কাজ হলে তিনি তা থেকে সকলের চেয়ে বেশি দূরে থাকতেন। আর রাসূলুল্লাহ নিজের জন্য কখনই কোন বিষয়ে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। কিন্তু (কেউ) আল্লাহর হারামকৃত কাজ ক'রে ফেললে তিনি কেবলমাত্র মহান আল্লাহর জন্য প্রতিশোধ নিতেন। ১১৯০
তিনি আরো বলেছেন, 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ব্যতীত রাসূলুল্লাহ কখনো কাউকে স্বহস্তে মারেননি, না কোন স্ত্রীকে না কোন দাস-দাসীকে। কারো দিক থেকে তিনি কোন কষ্ট পেলে কষ্টদাতার নিকট থেকে প্রতিশোধ নেননি। হ্যাঁ, যদি আল্লাহর হারামকৃত কোন জিনিস লংঘন করা হত (অর্থাৎ কেউ চুরি, ব্যভিচার ইত্যাদি কাজ ক'রে ফেলত), তাহলে মহান আল্লাহর জন্যই তিনি প্রতিশোধ নিতেন (শাস্তি দিতেন)। '১৯১
মহান আল্লাহও বড় সহিষ্ণু। বান্দাকে খেতে-পরতে দেন, আর তারা তাঁর অবাধ্যাচরণ করে। তাঁর সামনে অন্যায়াচরণ করে, নোংরামি করে। আর তিনি সব দেখেও সহ্য ক'রে যান; তড়িৎ শাস্তি দেন না। তিনি সহিষ্ণুতাকে পছন্দ করেন। যেমন তাঁর নবী ও পছন্দ করেন সহনশীলতাকে।
একদা তিনি আশাজ্ আব্দুল কায়েসকে বলেছেন,
إِنَّ فِيكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ : الْحِلْمُ وَالأَنَاةُ
"নিশ্চয় তোমার মধ্যে এমন দু'টি স্বভাব রয়েছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন; সহনশীলতা ও চিন্তা-ভাবনা ক'রে কাজ করা। "১৯২
সহিষ্ণুতার নীতির উপকারিতা কী? 'যে সয়, সে রয়। অসহিষ্ণুতা প্রদর্শনে হয়ে যায় লয়।' একটা নমুনা দেখুন বর্ণিত হাদীসে।
আবু হুরাইরা বলেন, এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার কিছু আত্মীয় আছে, আমি তাদের সাথে আত্মীয়তা বজায় রাখি, আর তারা ছিন্ন করে। আমি তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করি, আর তারা আমার সাথে দুর্ব্যবহার করে। তারা কষ্ট দিলে আমি সহ্য করি, আর তারা আমার সাথে মূর্খের আচরণ করে।' তিনি বললেন,
لَئِنْ كُنْتَ كَمَا قُلْتَ ، فَكَأَنَّمَا تُسِفُهُمُ الْمَلَّ ، وَلاَ يَزَالُ مَعَكَ مِنَ اللَّهِ ظَهِيرٌ عَلَيْهِمْ مَا دُمْتَ عَلَى ذَلِكَ
"যদি তা-ই হয়, তাহলে তুমি যেন তাদের মুখে গরম ছাই নিক্ষেপ করছ (অর্থাৎ, এ কাজে তারা গোনাহগার হয়।) এবং তোমার সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্যকারী থাকবে; যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি এর উপর অবিচল থাকবে।"১৯৩
এই সহিষ্ণু চরিত্রের মানবের মনেই সৃষ্টি হয় ক্ষমাশীলতা। এই মানব-মানবীরাই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
টিকাঃ
১৯০. বুখারী ৩৫৬০, মুসলিম ৬১৯০
১৯১. মুসলিম ৬১৯৫
১৯২. মুসলিম ১২৬
১৯৩. মুসলিম ৬৬৮৯