📄 মহানবী ﷺ এর চরিত্র
মহানবী এর চরিত্র ছিল মহান চরিত্র। তিনি নবী হওয়ার পূর্বেও ছিলেন সুচরিত্রবান। আর নবী হওয়ার পরে তো অবশ্যই। যেহেতু তাঁর চরিত্র ছিল কুরআনের বাস্তব রূপ। মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'তাঁর চরিত্র কেমন ছিল?' উত্তরে তিনি বললেন, 'তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন।'৯২
অর্থাৎ, কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর চরিত্র গঠিত ছিল। তিনি কুরআনের আদেশ পালন করতেন, নিষেধ বর্জন করতেন এবং তার অঙ্গীকার ও ধমক অনুসারে নিজের জীবন পরিচালনা করতেন। কুরআন কারীমের যে চরিত্রের নিন্দা করা হয়েছে, তিনি সেই চরিত্র থেকে দূরে থেকেছেন। আর যে চরিত্রের প্রশংসা করা হয়েছে, সেই চরিত্রে চরিত্রবান ছিলেন। আল-কুরআনই ছিল তাঁর সচ্চরিত্রতার উৎস। তার বাণীই ছিল তাঁর সুন্দর চরিত্রের অলঙ্কার।
মহান চরিত্রের অধিকারী নবী প্রেরিত হয়েছিলেন সারা বিশ্বজাহানের জন্য রহমত ও করুণা স্বরূপ। আল-কুরআনও হল সারা বিশ্বজাহানের জন্য রহমত ও করুণা স্বরূপ। পরম করুণাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে করুণাময় নবীর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল করুণারূপ মহাগ্রন্থ আল-কুরআন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءتْكُم مَّوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَشِفَاء لِّمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ
"হে মানব জাতি! তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের তরফ হতে উপদেশ ও অন্তরের রোগের নিরাময় এবং বিশ্বাসীদের জন্য পথপ্রদর্শক ও রহমত (করুণা) সমাগত হয়েছে।"৯৩
وَمَا أَنزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ إِلَّا لِتُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِي اخْتَلَفُوا فِيهِ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
"আমি তো তোমার প্রতি গ্রন্থ এ জন্যই অবতীর্ণ করেছি; যাতে তারা যে বিষয়ে মতভেদ করে, তাদেরকে তুমি তা সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে পার এবং বিশ্বাসীদের জন্য পথ নির্দেশ ও রহমত স্বরূপ। "৯৪
هَذَا بَصَائِرُ لِلنَّاسِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ
"এ (কুরআন) মানবজাতির জন্য সুস্পষ্ট দলীল এবং নিশ্চিত বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য হিদায়াত ও রহমত। "৯৫
তিনিও প্রেরিত হয়েছিলেন সারা বিশ্বের জন্য রহমত ও করুণা স্বরূপ। রহমতের কিতাবেই রহমান ঘোষণা করেছেন,
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ
"আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি শুধু করুণা রূপেই প্রেরণ করেছি। ৯৬
সেই রহমতের কিতাবই রহমতের নবী কে রহমতপূর্ণ চরিত্রে অলংকৃত করেছিল। তাই "তিনি ছিলেন সকল মানুষের চাইতে বেশি চরিত্রবান।"৯৭
যেহেতু তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ মানব। মানবতার সকল সদ্গুণ তাঁর মাঝে একত্রিত ছিল। সকল প্রশংসনীয় গুণের আধার ছিলেন তিনি। তাইতো মহান আল্লাহর সাক্ষ্য ছিল,
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
অর্থাৎ, তুমি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।৯৮
মুজাহিদ উক্ত মহান চরিত্রের ব্যাখ্যায় বলেছেন, 'দ্বীন।' অর্থাৎ, পুরো দ্বীনই তাঁর চরিত্র।
মহান চরিত্রের মাঝেই রয়েছে পরিপূর্ণ দ্বীনের বিধান। তিনিই ছিলেন দ্বীনের ধারক ও বাহক। আর সচ্চরিত্রতা সেই দ্বীনেরই বিধান।
সেই দ্বীনদারি ও ধার্মিকতা, যার বয়ান কুরআনে আছে, তাই হল তাঁর মহান চরিত্র।
আরো গভীরভাবে প্রণিধান করলে দেখা যাবে, উক্ত মহানতার কারণ হল তিনটি:
এক: তাঁর মধ্যে ছিল কুরআনের আদব।
দুই: তাঁর মধ্যে ছিল পরিপূর্ণ দ্বীন-এ-ইসলাম।
তিন: তিনি ছিলেন সুশীল প্রকৃতির অধিকারী।
ইবনুল কাইয়েম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'নবী এর মধ্যে আল্লাহর তাক্বওয়া ও সচ্চরিত্রতা একত্রিত ছিল। তাক্বওয়া বান্দা ও তার প্রতিপালকের মাঝে সম্পর্ক সুন্দর করে। আর সচ্চরিত্রতা বান্দা ও সৃষ্টির মাঝে সম্পর্ক সুন্দর করে। তাক্বওয়া আল্লাহর ভালোবাসা অবধারিত করে। আর সচ্চরিত্রতা মানুষকে তার ভালোবাসার প্রতি আহবান করে।
সচ্চরিত্রতা চারটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। সেই স্তম্ভ ছাড়া সুচরিত্রের ইমারত খাড়া থাকতে পারে না। আর তা হল, ধৈর্যশীলতা, নৈতিক পবিত্রতা, সাহসিকতা ও ন্যায়পরায়ণতা। সুচরিত্রের যাবতীয় আচরণের উৎসই হল এই চারটি গুণ।
উক্ত চারটি গুণেরই গুণাধার ছিলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।
তাঁর এমন বিশাল চরিত্র, যার বিশালতায় অতীতে কোন সৃষ্টি পৌঁছতে পারেনি, আর ভবিষ্যতেও পারবে না।
তিনি (প্রকৃতিগতভাবে কথা ও কাজে) অশ্লীল ছিলেন না এবং (ইচ্ছাকৃতভাবেও) অশ্লীল ছিলেন না। তিনি ছিলেন কোমল-হৃদয়; রূঢ় ও কঠোর-চিত্ত ছিলেন না। বাজারে হৈ-হুল্লোড়কারী ছিলেন না।৯৯
তিনি ছিলেন দয়াল নবী। আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখতেন, সত্য কথা বলতেন, (অপরের) বোঝা বইয়ে দিতেন, মেহমানের খাতির করতেন এবং বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করতেন। ১০১
তিনি ছিলেন (রূপে-গুণে) সবচেয়ে সুন্দর মানুষ, সবচেয়ে বড় দাতা এবং সবচেয়ে বড় সাহসী। ১০২
তিনি ছিলেন বাআদব মানুষ। হাঁচির সময় নিজ মুখে হাত বা কাপড় রেখে নিতেন এবং শব্দ হাল্কা করতেন। ১০০ হাই তুললে মুখে হাত রাখতে বলতেন। ১০৪
তিনি প্রয়োজনে রাগতেন। আর যখন রাগতেন তখন তাঁর গণ্ডদেশ রাঙা হয়ে উঠত। ১০৫
তিনি ছিলেন ন্যায়ের কাছে বিনম্র, কিন্তু অন্যায়ের কাছে কঠোর।
সচ্চরিত্রতা একটি ব্যাপক বিষয়। যাতে থাকে সকল সুন্দর আচরণ। ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা, ধৈর্যশীলতা, গম্ভীরতা, নম্রতা, ভদ্রতা, ন্যায়পরায়ণতা, পরার্থপরতা, পরোপকারিতা, সত্যবাদিতা, সুদৃঢ়তা, সৎশীলতা ইত্যাদি ইত্যাদি সব কিছু সদ্গুণ তাঁর মাঝে ছিল।
তিনি অঙ্গীকার ও চুক্তি ভঙ্গ করতেন না। তিনি সমাজের মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও সহানুভূতি রাখতেন। যথা প্রয়োজনে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন।
তাঁর মাঝে বিষয়াসক্তি ছিল না। ষড়রিপু (কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-মদ-মাৎসর্য) তাঁর চরিত্রে স্থান পায়নি।
তাঁর মধ্যে যশ ছিল, প্রখর বুদ্ধিমত্তা ছিল, স্ফূর্তি ছিল, উদারতা ছিল, সভ্যতা ছিল, পরহিতৈষণা ছিল, বিশ্বস্ততা ছিল এবং আন্তরিকতা ছিল।
তাঁর এই সচ্চরিত্রতা ও অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েই বহু লোক ইসলামে দীক্ষিত হয়েছে। দ্বীনের দাঈরা যদি অনুরূপ চরিত্রের অধিকারী হতে পারে, তাহলে দ্বীনের প্রতি মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হবে।
টিকাঃ
৯২. মুসলিম ১৭৭৩, আহমাদ, আবু দাউদ
৯৩. সূরা ইউনুস: ৫৭
৯৪. সূরা নাহল: ৬৪
৯৫. সূরা জাষিয়াহ: ২০
৯৬. সূরা আম্বিয়া: ১০৭
৯৭. বুখারী ৬২০৩, মুসলিম ৫৭৪৭
৯৮. ক্বালাম: ৪
৯৯. তিরমিযী ৩৬২১, মিশকাত ৫৮১৯
১০০. তিরমিযী ২৭৪৫
১০১. বুখারী ৩, মুসলিম ৪২২
১০২. সঃ জামে' ৪৬৩৪
১০৩. সঃ জামে' ৪৭৫৫
১০৪. সঃ জামে' ৪২৬
১০৫. সঃ জামে' ৪৭৫৮
📄 সলফদের সচ্চরিত্রের কতিপয় নমুনা
সাহাবাগণ মানুষ ছিলেন, কিন্তু সাধারণ মানুষ না। তাঁরা ছিলেন আকাশের তারকা, হিদায়াতের প্রদীপ, যার দ্বারা সাধারণ মানুষ চলার পথে আলো পেয়ে থাকে। তাঁরা ছিলেন নবীর সহযোগীরূপে সৃষ্ট একটি সম্প্রদায়।
তাঁরা ছিলেন জ্বলন্ত প্রদীপ নবী মুহাম্মাদ এর প্রতিবেশী, তাঁর শিষ্য ও সহচর, ভক্ত ও ছাত্র। তাঁরা তাঁর সাথে সত্যের পতাকা উড্ডীন করেছেন।
তাঁরা রেখে গেছেন সকল সচ্চরিত্রতার ব্যাপারে সুন্দর সুন্দর নমুনা। আন্তরিকতায়, কর্মে, সাহসিকতায়, সদিচ্ছায়, বদান্যতায়, আচরণে, ব্যবহারে, সর্বক্ষেত্রে তাঁদের সচ্চরিত্রতা অসাধারণ। তাঁরা মহান প্রতিপালকের নিকট নিজেদের জান-মাল বিক্রয় ক'রে ব্যবসায় প্রচুর লাভবান ছিলেন। তাই তো তাঁদের পথ অবলম্বন করার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
“যে ব্যক্তি তার নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং মু'মিন (সাহাবা) দের পথ ভিন্ন অন্য পথ অনুসরণ করবে, তাকে আমি সেদিকেই ফিরিয়ে দেব, যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব। আর তা কত মন্দ আবাস!”১০৬
তাঁদের জীবন আমাদের আদর্শ, তাঁদের চরিত্র আমাদের অনুসরণীয়, তাঁদের কর্ম আমাদের অনুকরণীয়। তাঁরা যে খোদ সুমহান চরিত্রের অধিকারী মহানবী এর কাছে কুরআনী তরবিয়তপ্রাপ্ত। তাই তাঁরা ছিলেন, "নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি দয়ার্দ্র ও সহানুভূতিশীল।"১০৭
“যাঁদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন ও যাঁরা তাঁকে ভালবাসে, তারা মু'মিনদের প্রতি কোমল। "১০৮
"তাঁরা সব এমন পুরুষ যাঁদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে এবং স্বলাত কায়েম ও যাকাত প্রদান করা হতে বিরত রাখে না।”১০৯
আবু যার কে এক ব্যক্তি গালি দিল। কিন্তু তিনি বললেন, 'আমার ও জান্নাতের মাঝে বহু বাধা আছে। তা যদি আমি অতিক্রম করতে পারি, তাহলে তুমি যা বলছ, তা অপেক্ষা আমি বেশি উত্তম। আর যদি আমাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে তুমি যা বলছ, তা অপেক্ষা আমি বেশি নিকৃষ্ট। '১১০
এক ব্যক্তি উম্মতের পণ্ডিত ইবনে আব্বাসকে গালি দিল। তিনি শিষ্য ইকরামাকে বললেন, 'হে ইকরামা! দেখ, লোকটার কোন প্রয়োজন আছে কি না, পূরণ ক'রে দাও!' এ কথা শুনে লোকটি মাথা নিচু ক'রে নিল এবং লজ্জিত হল। ১১১
উমার বিন যারকে একজন গালি দিলে তিনি তাকে বললেন, 'ওহে অমুক! আমাদেরকে গালি দেওয়ার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। সন্ধি করার জায়গা রাখো। যেহেতু যে আমাদের ব্যাপারে আল্লাহর অবাধ্যতা করে, আমরা তার ব্যাপারে তাঁর আনুগত্য করার মতো কোন বদলা পাই না!'১১২
আহনাফ বিন কাইসের সাথে এক ব্যক্তির রাগারাগি হল। সে বলল, 'তুমি একটা বললে দশটা শুনবে।' তার জবাবে তিনি বললেন, 'আর তুমি দশটা বললে একটাও শুনবে না!'১১৩
রবী' বিন খুষাইমের বিশ হাজার দামের একটি ঘোড়া চুরি হয়ে গেল। তাঁকে বলা হল, 'আপনি চোরের উপর বদ্দুআ করুন। তিনি বললেন, 'হে আল্লাহ! সে যদি ধনী হয়, তাহলে তাকে ক্ষমা ক'রে দাও। আর অভাবী হলে তাকে অভাবমুক্ত ক'রে দাও!'১১৪
একদা খালেদ বিন অলীদ, আব্দুর রহমান বিন আওফ, আবু যার ও বিলাল কোন এক মজলিসে একত্রিত ছিলেন। অতঃপর কোন এক বিষয় নিয়ে তাঁদের কথা কাটাকাটি হয়। বিলাল কোন এক বিষয়ে কথা বললে আবু যার তাঁকে 'কালুনীর বেটা' বলে উত্তর দেন।
যদিও বিলাল ছিলেন হাবশী ও কৃষ্ণাঙ্গ, তবুও তা বলে তাকে তুচ্ছ করা ইসলামের নীতি নয়। সুতরাং বিলাল রাসূলুল্লাহ এর কাছে অভিযোগ জানালেন।
রাসূলুল্লাহ অভিযোগ শুনে রাগান্বিত হলেন এবং আবূ যারকে ডেকে বললেন, 'আবূ যার তুমি বিলালকে তার মা তুলে খোঁটা দিয়েছ? তুমি এমন একটা লোক, যার মধ্যে জাহেলী যুগের ছিট আছে!'
আবূ যার লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে কেঁদে ফেললেন এবং নবী কে নিজের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে অনুরোধ করলেন। অতঃপর তিনি তাঁর গাল মাটিতে রেখে বিলালের উদ্দেশ্যে বললেন, 'হে বিলাল! তুমি যতক্ষণ না আমার গালে পা রেখে পার হয়েছ, আমি ততক্ষণ তা মাটি থেকে উঠাব না। তুমি সম্মানী, আমিই অসম্মানী।'
এ কথা শুনে বিলালও কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, 'আবু যার! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। আল্লাহর কসম! আমি সেই মাথায় নিজ পা রাখতে পারি না, যে মাথা আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য সিজদাবনত হয়।'
অতঃপর মুআনাকার মাধ্যমে পরস্পরকে ক্ষমা ক'রে দিলে সকলের হৃদয় পরিষ্কার হল। ১১৫
বাকী আরো উদাহরণ অত্র পুস্তকের বিভিন্ন স্থলে পরিবেশিত হয়েছে।
টিকাঃ
১০৬. সূরা নিসা: ১১৫
১০৭. সূরা সূরা ফাতহ: ২৯
১০৮. সূরা মায়িদাহ: ৫৪
১০৯. সূরা নূর: ৩
১১০. কাশকূল ১৮৫৭,
১১১. ইহয়াউ উলুমিদ্দীন ৩/১৭৮
১১২. বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৮৪৬৪
১১৩. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা' ৪/৯৩
১১৪. ইবনে হিব্বানের সিক্বাত ২৬২৪ন, সংক্ষিপ্ত সিফাতুস স্বাফওয়াহ ১/১৯৭
১১৫. শাখসিয়্যাতুর রাসূল ১৬পৃঃ, কাফেলাতুদ দাঈয়াত ১৫/১৬০
📄 সচ্চরিত্রতা প্রার্থনার দুআ
মানুষ কিছু হওয়ার ইচ্ছা করলেই হতে পারে না, যদি না আল্লাহর ইচ্ছা থাকে। এই জন্য আমরা বলে থাকি, 'লা হাউলা অলা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।' অর্থাৎ, আল্লাহর তওফীক ছাড়া পাপ থেকে ফিরার এবং সৎকাজ করার (নড়া-সরার) শক্তি কারো নেই।
এই জন্যই চরিত্রবান হওয়ার প্রচেষ্টা করার সাথে সাথে মহান প্রতিপালকের কাছে তার তওফীক প্রার্থনা করতে হবে। সুমহান চরিত্রের অধিকারী মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত নবী মুহাম্মাদ সুচরিত্র কামনা ক'রে মহান প্রভুর কাছে দুআ করতেন এবং মন্দ চরিত্র হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। এখানে সে সব দুআ উল্লেখ করা হল, যাতে পাঠকও সেই প্রয়াসে দুআ করতে পারেন।
(১) স্বলাতে দাঁড়িয়ে তকবীর-এ-তাহরীমার পর পড়তে হয়।
وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ حَنِيفاً وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ، إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ اللَّهُمَّ أَنْتَ الْمَلِكُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ أَنْتَ رَبِّي وَأَنَا عَبْدُكَ ، ظَلَمْتُ نَفْسِي وَاعْتَرَفْتُ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي ذَنْبِي جَمِيعاً إِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ وَاهْدِنِي لَأَحْسَنِ الْأَخْلَاقِ لَا يَهْدِي لِأَحْسَنِهَا إِلَّا أَنْتَ ، وَاصْرِفْ عَنِّي سَيِّئَهَا لَا يَصْرِفُ عَنِّي سَيِّئَهَا إِلَّا أَنْتَ، لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ وَالْخَيْرُ كُلُّهُ فِي يَدَيْكَ وَالشَّرُّ لَيْسَ إِلَيْكَ وَالْمَهْدِي مَنْ هَدَيْتَ ، أَنَا بِكَ وَإِلَيْكَ، لاَ مَنْجَا وَلَا مَلْجَأَ مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ، تَبَارَكْتَ وَتَعَالَيْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
অর্থ- আমি একনিষ্ঠ হয়ে তাঁর প্রতি মুখ ফিরিয়েছি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, আর আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয় আমার স্বলাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই। তাঁর কোন অংশী নেই। আমি এ সম্বন্ধেই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের প্রথম। হে আল্লাহ! তুমিই বাদশাহ তুমি ছাড়া কেউ সত্য উপাস্য নেই। আমি তোমার সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করি। তুমি আমার প্রভু ও আমি তোমার দাস। আমি নিজের উপর অত্যাচার করেছি এবং আমি আমার অপরাধ স্বীকার করেছি। সুতরাং তুমি আমার সমস্ত অপরাধ মার্জনা করে দাও, যেহেতু তুমি ছাড়া অন্য কেউ অপরাধ ক্ষমা করতে পারে না। সুন্দরতম চরিত্রের প্রতি আমাকে পথ দেখাও, যেহেতু তুমি ছাড়া অন্য কেউ সুন্দরতম চরিত্রের প্রতি পথ দেখাতে পারে না। মন্দ চরিত্রকে আমার নিকট হতে দূরে রাখ, যেহেতু তুমি ছাড়া অন্য কেউ মন্দ চরিত্রকে আমার নিকট থেকে দূর করতে পারে না। আমি তোমার আনুগত্যে হাজির এবং তোমার আজ্ঞা মানতে প্রস্তুত। যাবতীয় কল্যাণ তোমার হাতে এবং মন্দের সম্পর্ক তোমার প্রতি নয়। হিদায়াতপ্রাপ্ত সেই, যাকে তুমি হিদায়াত করেছ। আমি তোমার অনুগ্রহে আছি এবং তোমারই প্রতি আমার প্রত্যাবর্তন। তুমি বরকতময় ও মহিমময়, তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তোমার দিকেই প্রত্যাবর্তন করি। ১১৬
(২) যে কোন স্বলাতের সালাম ফেরার পর (হাত না তুলে) পঠনীয়।
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي وَخَطَايَايَ كُلَّهَا ، اللهُمَّ أَنْعِشْنِي وَاجْبُرْنِي، واهْدِنِي لصالح الأعمال والأَخْلاقِ، فَإِنَّهُ لا يَهْدِي لصالحها ولا يَصْرِفُ سَيِّئَهَا إِلَّا أَنْتَ
আল্লাহুম্মাগফিরলী যুনূবী অখাত্বায়ায়া কুল্লাহা। আল্লাহুম্মা আন্শনী অঙ্কুরনী, অহদিনী লিস্নালিহিল আ'মালি অল-আখলাকু। ফাইন্নাহু লা য়্যাহদী লিসালিহিহা অলা য়্যাসুরিফু সাইয়িআহা ইল্লা আন্ত্।
অর্থাৎ, হে আল্লাহ! তুমি আমার সকল পাপ ও ত্রুটিসমূহকে ক্ষমা ক'রে দাও। তুমি আমাকে প্রাণবন্ত কর, সংশোধন কর। আর উৎকৃষ্ট কর্ম ও চরিত্রের প্রতি আমাকে পথ-প্রদর্শন কর। যেহেতু তার উৎকৃষ্টতার প্রতি তুমি ছাড়া অন্য কেউ পথ-প্রদর্শন করতে পারে না এবং তুমি ছাড়া অন্য কেউ তার নিকৃষ্টতা দূর করতে পারে না। ১১৭
(৩) যে কোন মুনাজাতের সময় পড়া যায়।
اللَّهُمَّ كَمَا حَسَّنْتَ خَلْقِي فَحَسْنُ خُلُقِي
আল্লা-হুম্মা কামা হাসান্তা খাল্কী ফাহাসিন খুলুক্বী।
অর্থঃ- হে আল্লাহ! তুমি আমার সৃষ্টিকে যেমন সুন্দর করেছ, তেমনি আমার চরিত্রকেও সুন্দর কর। ১১৮
(৪) মন্দ চরিত্রাদি থেকে আশ্রয় চাইতে যে কোন মুনাজাতের সময় পড়া যায়।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الأَخْلاقِ وَالْأَعْمَالِ وَالْأَهْوَاءِ وَالْأَدْوَاءِ
আল্লা-হুম্মা ইন্নী আউযু বিকা মিন মুনকারা-তিল আখলা-ক্বি অলআ'মা-লি অলআহওয়া-ই অলআদওয়া-'।
অর্থঃ- হে আল্লাহ! অবশ্যই আমি তোমার নিকট দুশ্চরিত্র, অসৎ কর্ম, কুপ্রবৃত্তি এবং কঠিন রোগসমূহ থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। ১১৯
টিকাঃ
১১৬. মুসলিম ১৮-৪৮
১১৭. হাকেম ৫৯৪২, ত্বাবারানীর কাবীর ৭৯০৯, স্বাগীর ৬১০, সঃ জামে' ১২৬৬
১১৮. আহমাদ ৩৮২৩, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৮৫৪৩, ইবনে হিব্বান ৯৫৯, সঃ জামে' ১৩০৭
১১৯. সঃ তিরমিযী ৩/১৮৪, সঃ জামে' ১২৯৮
📄 সচ্চরিত্রতার মূলসূত্র
সচ্চরিত্রতার মূলসূত্র চারটি সদ্গুণ ৪
> এক : হিকমত
হিকমত বলতে বুঝানো হয়, এমন সুকৌশল ও বিচক্ষণতা প্রয়োগ করার ক্ষমতা, যার দ্বারা সকল স্বেচ্ছাধীন কর্মে ভুল থেকে সঠিককে চিহ্নিত করা যায়। অর্থাৎ হিকমত-ওয়ালা মানুষ ভুলে পতিত হয় না, তার পদস্খলন ঘটে না, ভুল সিদ্ধান্ত নেয় না, ফিতনায় পড়ে না, ফিতনা সৃষ্টি করে না। যেহেতু সে লাঠির মাঝখানে ধরে সমতা বজায় রাখে, প্রত্যেক জিনিসকে তার স্বস্থানে রাখে।
> দুই : ন্যায়পরায়ণতা
ন্যায়পরায়ণতা এমন একটি সদ্গুণ, যার অধিকারী কাম-ক্রোধ-লোভ-মদ-মোহ-মাৎসর্য ষডুবর্গের আক্রমণের সময় নিজেকে বিজয়ী রাখতে পারে। উক্ত রিপুসমূহকে পরাজিত ও দমন ক'রে প্রয়োজনানুযায়ী প্রয়োগ করতে পারে।
> তিন : বীরত্ব ও সাহসিকতা
এ গুণটিও রাগ ও ক্রোধ দমনে সহায়ক হয়। যেহেতু আসল বীর হল সেই, যে নিজ ক্রোধ দমনে বীরত্ব প্রদর্শন করে। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ
"শক্তিশালী (বা বীর) সে নয় যে কুন্তীতে জয়লাভ করে। বরং প্রকৃত শক্তিশালী (বা বীর) হল সেই ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় নিজেকে সামলে নিতে পারে।"১২০
যেমন উক্ত গুণটি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ও বাতিলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সহযোগিতা করে।
> চার : চারিত্রিক পবিত্রতা
উল্লিখিত সদ্গুণটি যৌন-সংক্রান্ত পদস্খলন থেকে রক্ষা করে। নিজ সুস্থ বিবেক ও দ্বীনদারী দ্বারা নিজেকে সকল প্রকার যৌন-নোংরামি থেকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখতে সহযোগিতা করে।
উল্লেখ্য যে, উক্ত চারটি মৌলিক সদ্গুণ প্রয়োগে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা আবশ্যক। নচেৎ কম-বেশি হলে অভীষ্ট লাভে সফল হওয়া সম্ভব হবে না।
বলা বাহুল্য, মধ্যমভাবে হিকমত ও বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করতে পারলে মানুষ বিচক্ষণ হবে, সুবুদ্ধির অধিকারী হবে, ধারণার সঠিকতায় পৌঁছতে সক্ষম হবে, সজাগ ও সতর্ক হবে ইত্যাদি। পক্ষান্তরে উক্ত ব্যাপারে বাড়াবাড়ি হলে মন্দ গুণ সৃষ্টি হতে পারে। যেমন কূট ষড়যন্ত্র, কুচক্রান্ত, ধোঁকাবাজি, ফন্দিবাজি, চালাকি, চাতুর্য, প্রতারণা ইত্যাদি। আর উক্ত ব্যাপারে শৈথিল্য হলে অন্য কিছু বদগুণ সৃষ্টি হতে পারে। যেমন বোকামি, মেড়ামি, আহাম্মকি, অসতর্কতা ইত্যাদি।
সাহসিকতাকে মধ্যমভাবে ব্যবহার করতে পারলে মানুষ দানশীল হবে, মহানুভব হবে, অপরের প্রাণ রক্ষা করতে আগ্রহী ও সাহসী হবে, স্বার্থপরতাকে কুরবানী দিয়ে পরার্থপর হবে, ত্যাগ স্বীকার করতে অনুপ্রাণিত হবে, ধৈর্যশীল ও সহ্যশীল হবে, রাগদমনকারী ও গম্ভীর হবে, ধীর-স্থির হবে ইত্যাদি।
পক্ষান্তরে তাতে অতিরঞ্জন করলে দুঃসাহসিক হবে, বেপরোয়া ও উন্নাসিক হবে, দাম্ভিক ও অহংকারী হবে ইত্যাদি। আর তাতে শৈথিল্য করলে লাঞ্ছনা ও অপমান হজমে অভ্যস্ত হবে, অল্প শোকে কাতর হয়ে পড়বে, নীচতা, হীনতা ও পরাধীনতা বরণ করতে আগ্রহী হবে, কর্তব্যপালনে পিছপা থাকবে ইত্যাদি।
চারিত্রিক পবিত্রতাকে পরিমিতভাবে ব্যয় করলে মানুষের মাঝে দানশীলতা, লজ্জাশীলতা, ধৈর্যশীলতা, উদারতা, ক্ষমাশীলতা ইত্যাদি সৃষ্টি হবে। নিজের যা আছে তাই নিয়ে তুষ্ট থাকতে উদ্বুদ্ধ হবে, অর্থাৎ লোভী হবে না। হারামের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে ইত্যাদি। আর তাতে বাড়াবাড়ি করলে লোভী হবে, তার মাঝে অশ্লীলতা ও নোংরামি দেখা যাবে, ভেড়ামি ও ঈর্ষাহীনতার শিকার হবে, স্ত্রীর প্রতি কর্তব্যে অসচেতন হবে, হিংসাপরায়ণ হবে, ধনীর পাচাঁটা গোলামে পরিণত হবে, দরিদ্রকে ঘৃণা করবে ইত্যাদি।
মোটকথা উক্ত মৌলিক চারটি সদ্গুণের অধিকারী হলে অবশিষ্ট শাখায়িত গুণাবলীতে মানুষ গুণান্বিত হবে। তবে সাধারণ মানুষ পরিপূর্ণরূপে উক্ত চারটি সদ্গুণের অধিকারী হতে সক্ষম হবে না। একমাত্র তার অধিকারী ছিলেন একজনই। আর তিনি হলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। মহান আল্লাহ যাঁকে বলেছেন,
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
"তুমি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী। "১২১
টিকাঃ
১২০. আহমাদ, বুখারী ৬১১৪, মুসলিম ৬৮০৯, মিশকাত ৫১০৫
১২১. সূরা ক্বালামঃ৪, দ্রঃ মাকারিমুল আখলাক্ব ২৮পৃ