📄 মানুষের চরিত্রের কি পরিবর্তন হতে পারে?
তার মানে তার অভ্যাস কি বদলাতে পারে? কৃপণ কি দানশীল হতে পারে? নির্লজ্জ কি লজ্জাশীল হতে পারে?
অনেকে ধারণা করেন, চরিত্র বদলানো যায় না। অভ্যাস পরিবর্তন করা অসম্ভব। এমন একটা হাদীসও আছে, "যদি শোন যে, কোন পাহাড় নিজ জায়গা হতে সরে গেছে, তাহলে বিশ্বাস করো। কিন্তু যদি শোন যে, কারো প্রকৃতি পাল্টে গেছে, তাহলে বিশ্বাস করো না।"৪২
প্রথমতঃ উক্ত হাদীস সহীহ নয়।
দ্বিতীয়তঃ হাদীসে প্রকৃতি বলতে যার পরিবর্তন সাধনে মানুষের কোন এখতিয়ার নেই। যেমন মহিলার প্রকৃতি, শিশুর প্রকৃতি অথবা কোন পুরুষের মাঝে সৃষ্টিগত নারী-সুলভ বা শিশুসুলভ প্রকৃতি ইত্যাদি।
পক্ষান্তরে চরিত্র পরিবর্তনে মানুষের হাত আছে। মানুষের এখতিয়ারাধীন অভ্যাস পরিবর্তন করার ক্ষমতা আছে। কোন মানুষকে তার কর্মে বাধ্য করা হয় না। পরিবেশের চাপে অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটে। অনুশীলনের কারণে চরিত্র ভালো থেকে মন্দে বা মন্দ থেকে ভালোতে বদলে যেতে পারে।
দৃঢ় সংকল্প নিয়ে চেষ্টা ও চর্চা করলে অনেক সুচরিত্রকে মানুষ নিজ জীবনে চিত্রিত করতে পারে। চরিত্র পরিবর্তন করা সম্ভব বলেই মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا - فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا - قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَاهَا - وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا
"শপথ আত্মার এবং তার সুঠাম গঠনের। অতঃপর তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। সে সফলকাম হবে, যে তাকে পরিশুদ্ধ করবে এবং সে ব্যর্থ হবে, যে তাকে কলুষিত করবে।৪৩
তিনি আরো বলেছেন,
وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى
"আর এই যে, মানুষ তাই পায়, যা সে চেষ্টা করে।" ৪৪
চরিত্র বদলানো সম্ভব বলেই, আমাদের শরীয়ত চরিত্রকে সুন্দর করতে উদ্বুদ্ধ করে। যেমন মহানবী বলেছেন,
أَنَا زَعِيمٌ بِبَيْتٍ فِي أَعْلَى الْجَنَّةِ لِمَنْ حَسَّنَ خُلُقَهُ
"আমি জান্নাতের সবার উপরে এক গৃহের জামিন তার জন্য, যে তার চরিত্রকে সুন্দর করে।৪৫
রাগী চরিত্র থেকে রাগ দূর করা সম্ভব বলেই মহানবী রাগ করতে নিষেধ করেছেন। এক ব্যক্তি নবী কে বলল, 'আপনি আমাকে কিছু অসিয়ত করুন!' তিনি বললেন, "তুমি রাগান্বিত হয়ো না।" সে ব্যক্তি এ কথাটি কয়েকবার বলল। তিনি (প্রত্যেক বারেই একই কথা) বললেন, "তুমি রাগান্বিত হয়ো না।"৪৬
অভ্যাস বদলানো অবাস্তব নয় বলেই মহানবী বলেছেন,
إِنَّمَا الْعِلْمُ بِالتَّعَلُّمِ، وَإِنَّمَا الْحِلْمُ بِالتَّحَلُّمِ، مَنْ يَتَحَرَّى الْخَيْرَ يُعْطَهُ، وَمَنْ يَتَّقِ الشَّرَّ يُوقَهُ
"শিক্ষা লাভের ফলে শিক্ষা পাওয়া যায়। সহিষ্ণুতার অভ্যাস গড়লে সহিষ্ণু হওয়া যায়। যে কল্যাণ অনুসন্ধান করবে, তাকে তা দেওয়া হবে এবং যে মন্দ থেকে বাঁচার চেষ্টা করবে, তাকে বাঁচানো হবে।"৪৭
আবু সাঈদ খুদরী) হতে বর্ণিত, কিছু আনসারী আল্লাহর রসূল এর কাছে কিছু চাইলেন। তিনি তাদেরকে দিলেন। পুনরায় তারা দাবী করল। ফলে তিনি (আবার) তাদেরকে দিলেন। এমনকি যা কিছু তাঁর কাছে ছিল তা সব নিঃশেষ হয়ে গেল। অতঃপর যখন তিনি সমস্ত জিনিস নিজ হাতে দান ক'রে দিলেন, তখন তিনি বললেন,
مَا يَكُنْ عِنْدِي مِنْ خَيْرٍ فَلَنْ ادَّخِرَهُ عَنْكُمْ ، وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَهُ اللهُ ، وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللهُ ، وَمَنْ يَتَصَبَّرُ يُصَبِّرُهُ اللهُ وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءٌ خَيْراً وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ
"আমার কাছে যা কিছু (মাল) আসে তা আমি তোমাদেরকে না দিয়ে কখনই জমা ক'রে রাখব না। (কিন্তু তোমরা একটি কথা মনে রাখবে,) যে ব্যক্তি চাওয়া থেকে পবিত্র থাকার চেষ্টা করবে, আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখবেন। আর যে ব্যক্তি (চাওয়া থেকে) অমুখাপেক্ষিতা অবলম্বন করবে, আল্লাহ তাকে অমুখাপেক্ষী করবেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করার চেষ্টা করবে আল্লাহ, তাকে ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা প্রদান করবেন। আর কোন ব্যক্তিকে এমন কোন দান দেওয়া হয়নি, যা ধৈর্য অপেক্ষা উত্তম ও বিস্তর হতে পারে।"৪৮
মহান আল্লাহ বলেছেন,
فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَةَ اللهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
"তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত রাখ। আল্লাহর সেই প্রকৃতির অনুসরণ কর; যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটিই সরল ধর্ম; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” ৪৯
এখানে আল্লাহর সৃষ্টি বা প্রকৃতি বলে ইসলাম ও তওহীদকে বুঝানো হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, আল্লাহ তাআলা মু'মিন-কাফের প্রত্যেক মানুষকে ইসলাম ও তওহীদের প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এই জন্য তওহীদ মানুষের প্রকৃতি অর্থাৎ সহজাত ও স্বভাব-ধর্ম। যেমন যে সময় আল্লাহ তাআলা মানুষের আত্মা সৃষ্টি করেন তখন বলেন, 'আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?' তার উত্তরে মানুষ বলেছিল, অবশ্যই। এ থেকেও পরিষ্কার বুঝা যায় যে, মানুষের আসল ধর্ম হল একত্ববাদ।
কিন্তু পরিবেশের চাপেও প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটতে পারে। বিভিন্ন খারাপ পরিবেশ অথবা অন্য কোন প্রতিবন্ধক অনেককে সেই প্রকৃতি (ইসলামে) প্রতিষ্ঠিত থাকতে বাধা দান করে; ফলে তারা কাফের হয়েই থাকে। যেমন নবী হাদীসে বলেছেন,
كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَحِّسَانِهِ
"প্রত্যেক শিশু (ইসলামের) প্রকৃতির উপর জন্ম নেয়। কিন্তু তার পিতা- মাতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে দেয়।"৫০
"আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই।" এর মানে এই নয় যে, প্রকৃতির পরিবর্তন হতে পারে না। বরং এর অর্থ হল, আল্লাহর সেই সৃষ্টি বা প্রকৃতিকে পরিবর্তন করো না; সঠিক তরবিয়ত দিয়ে তার লালন-পালন কর ও তাকে বড় করে তোলো। যাতে ঈমান ও তওহীদ কচি-কাঁচা শিশুদের মনে-প্রাণে বদ্ধমূল হয়ে যায়। এখানে বাক্যটি খবর স্বরূপ প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু ব্যবহার হয়েছে আজ্ঞার অর্থে। অর্থাৎ, নেতিবাচক বাক্য নিষেধাজ্ঞার অর্থে ব্যবহার হয়েছে। ('আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই' অর্থাৎ, 'আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন করো না।')৫১
চরিত্রের পরিবর্তন হয় বলেই তো আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ক'রে চাওয়া হয়,
وَاهْدِنِي لَأَحْسَنِ الْأَخْلَاقِ لَا يَهْدِي لَأَحْسَنِهَا إِلَّا أَنْتَ ، وَاصْرِفْ عَنِّي سَيِّئَهَا لَا يَصْرِفُ عَنِّي سَيِّئَهَا إِلَّا أَنْتَ
"সুন্দরতম চরিত্রের প্রতি আমাকে পথ দেখাও, যেহেতু তুমি ছাড়া অন্য কেউ সুন্দরতম চরিত্রের প্রতি পথ দেখাতে পারে না। মন্দ চরিত্রকে আমার নিকট হতে দূরে রাখ, যেহেতু তুমি ছাড়া অন্য কেউ মন্দ চরিত্রকে আমার নিকট থেকে দূর করতে পারে না।"৫২
টিকাঃ
৪২. আহমাদ
৪৩. সূরা শামস: ৭-১০
৪৪. সূরা নাজম: ৩৯
৪৫. আবু দাউদ ৪৮০২, ত্বাবারানী ৭৩৬১
৪৬. বুখারী ৬১১৬
৪৭. ত্বাবারানীর কাবীর ১৭৬৩, আওসাত্ব ২৬৬৩, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১০৭৩৯, সিঃ সহীহাহ ৩৪২
৪৮. বুখারী ১৪৬৯, ৬৪৭০, মুসলিম ২৪৭১
৪৯. সূরা রূম: ৩০
৫০. বুখারী ১৩৫৯, ৪৭৭৫, মুসলিম ৬৯২৬
৫১. আহসানুল বায়ান
৫২. মুসলিম ১৮৪৮
📄 সচ্চরিত্র হল দ্বীনের আত্মা
মুসলিমের সচ্চরিত্রতা যেন গোটা দ্বীনটাই। পুরো দ্বীনদারী, আনুগত্য ও পুণ্যবত্তাই যেন সচ্চরিত্রতা। মহানবী বলেছেন,
البر : حُسْنُ الخُلُقِ، وَالإِثْمُ : مَا حَاكَ فِي نَفْسِكَ ، وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ
"পুণ্যবত্তা হল সচ্চরিত্রতার নাম এবং পাপ হল তাই, যা তোমার অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করে এবং তা লোকে জেনে ফেলুক--এ কথা তুমি অপছন্দ কর।”৫৩
আর সেই সচ্চরিত্রতার পরিপূর্ণতা সাধনের লক্ষ্যেই প্রেরিত হয়েছিলেন মহান চরিত্রের অধিকারী মহানবী। তিনি বলেছেন,
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ (مكارم) الْأَخْلَاقِ
"আমি মানুষের শ্রেষ্ঠ ও সুন্দর চরিত্রের পরিপূর্ণতা দানের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।"৫৪
সুতরাং ইসলামী সচ্চরিত্রতায় আমরা যে সকল বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল কয়েকটি বিষয়:
১। ইসলামী সচ্চরিত্রতার উৎস হল অহী, কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ। যার জন্য তা সর্ব যুগের সর্ব স্থানের সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য উপযোগী। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمْ أَحْسَنَكُمْ أَخْلاقاً
"তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তোমাদের মধ্যে সুন্দরতম চরিত্রের অধিকারী। ৫৫
২। ইসলামী সচ্চরিত্রতা হল ব্যবহারিক ও বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য। শুধু তত্ত্বই নয়, বরং বাস্তবে আমলযোগ্য। আব্দুল্লাহ বিন আম্র কে রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন,
أَرْبَعُ إِذَا كُنَّ فِيكَ فَلَا عَلَيْكَ مَا فَاتَكَ مِنَ الدُّنْيَا حِفْظُ أَمَانَةٍ وَصِدْقُ حَدِيثٍ وَحُسْنُ خَلِيقَةٍ وَعِفَّةٌ فِي طُهْرٍ
"তোমার মধ্যে চারটি জিনিস হলে দুনিয়ার আর কিছু না পেলেও তোমার বয়ে যাবে না; ১। আমানত রক্ষা করা, ২। সত্য কথা বলা, ৩। চরিত্র সুন্দর করা এবং ৪। হালাল খাদ্য খাওয়া।"৫৬
৩। ইসলামী চরিত্রের উপর উদ্বুদ্ধকারী মূল জিনিস হল, মুসলিমের মনে মহান আল্লাহর ভয়, তাঁর স্মরণ এবং তাঁর সন্তুষ্টির অনুসন্ধান।
আবূ হুরাইরা বলেন, রাসূলুল্লাহ কে জিজ্ঞাসা করা হল যে, 'কোন্ আমল মানুষকে বেশি জান্নাতে নিয়ে যাবে?' তিনি বললেন,
تَقْوَى اللَّهِ وَحُسَنُ الْخُلُقِ
"আল্লাহ-ভীতি ও সচ্চরিত্র।"৫৭
তিনি আরো বলেছেন,
إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ، وَيُحِبُّ مَعَالِيَ الْأُمُورِ، وَيَكْرَهُ سَفْسَافَهَا»
"নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। তিনি সুউচ্চ চরিত্রকে ভালোবাসেন এবং ঘৃণা করেন নোংরা চরিত্রকে।"৫৮
৪। ইসলামী চরিত্রে কেবল প্রদর্শনই যথেষ্ট নয়, বরং তাতে আন্তরকিতা ও আল্লাহর জন্য বিশুদ্ধতা আবশ্যক। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّةِ
"যাবতীয় কার্য নিয়ত বা সংকল্পের উপর নির্ভরশীল।"৫৯
৫। ইসলামী চরিত্রের বিষয়াবলী খুব যুক্তিযুক্ত ও বিবেকগ্রাহ্য। শরীয়তের প্রত্যেক আদেশ-নিষেধের পশ্চাতে একটা না একটা হিকমত আছে, যৌক্তিকতা আছে। যেমন,
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً
"তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।"৬০
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلٍ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ - إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ
"হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও স্বলাতে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না?৬১
অনুরূপ প্রত্যেক সচ্চরিত্রতার পিছনেও অবশ্যই কোন না কোন মঙ্গল আছে, হিকমত আছে। যা কারো সুস্থ বিবেক অগ্রাহ্য করে না। ৬২
টিকাঃ
৫৩. মুসলিম ৬৬৮০-৬৬৮১
৫৪. আহমাদ ৮৯৫২, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ ২৭৩, হাকেম ৪২২১, বাইহাক্বী ২১৩০১
৫৫. বুখারী ৩৫৫৯, ৩৭৫৯, মুসলিম ৬১৭৭
৫৬. আহমাদ ৬৬৫২, ত্বাবারানী, বাইহাক্বী, সিঃ সহীহাহ ৭৩৩
৫৭. তিরমিযী ২০০৪নং, ইবনে হিব্বান ৪৭৬, বুখারীর আদব ২৮৯ ও ২৯৪, ইবনে মাজাহ ৪২৪৬, আহমাদ ২/৩৯২, হাকেম ৪/২৩৪
৫৮. ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৬৯০৬, সহীহুল জামে ১৭৪৩
৫৯. বুখারী ১, মুসলিম ১৯০৭
৬০. সূরা বানী ইস্রাঈল: ৩২
৬১. সূরা মায়িদাহ: ৯০-৯১
৬২. মাকারিমুল আখলাক্ব ১২-১৩পৃ,
📄 সচ্চরিত্র ও ঈমান
মুসলিমের সচ্চরিত্রতা কোন মযহাবী মতবাদ নয়, কোন বৈয়াক্তিক সুবিধাবাদ নয় এবং তা কোন পরিবেশগত আচার-আচরণ নয়, যা তার পরিবর্তনের ফলে চরিত্রেরও পরিবর্তন ঘটতে থাকবে। আসলে সচ্চরিত্রতা হল সঠিক ঈমান থেকে বিকীর্ণ আলো, যা মু'মিনের দেহ ও মনকে আলোকিত করে। সুচরিত্র কোন বিচ্ছিন্ন মাহাত্ম্য ও মহত্ত্ব নয়, বরং তা একটি শিকলেরই কয়েকটি কড়া, আকীদা, ইবাদত ও ব্যবহার। সুতরাং মুসলিমের আকীদা সচ্চরিত্রতার সাথে সম্পৃক্ত, তার ইবাদত সচ্চরিত্রতার সাথে জড়িত এবং তার আচার-আচরণও সুন্দর চরিত্রের সাথে মিলিত ও যুক্ত। এগুলির মধ্যে কোনও একটাতে ত্রুটি ঘটলে মু'মিনের ঈমানে ত্রুটি ঘটে থাকে। মহানবী বলেছেন,
لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَسْرِقُ السَّارِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ
"কোন ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে ব্যভিচার করতে পারে না। কোন চোর যখন চুরি করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে চুরি করতে পারে না এবং কোন মদ্যপায়ী যখন মদ্যপান করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে মদ্যপান করতে পারে না। "৬৩
পরিপূর্ণ মু'মিন মিথ্যা বলতে পারে না। মিথ্যা বলার অভ্যাস হল কাফের ও মুনাফিকের। মহান আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّمَا يَفْتَرِي الْكَذِبَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْكَاذِبُونَ
"যারা আল্লাহর আয়াতে বিশ্বাস করে না, তারাই শুধু মিথ্যা উদ্ভাবন করে এবং তারাই মিথ্যাবাদী।"৬৪
পূর্ণাঙ্গ মু'মিন সর্বদা অভিশাপকারী হতে পারে না। কথায়-কথায় বদ্দুআ দিতে পারে না। এমন করলে জানতে হবে, তার ঈমান পূর্ণাঙ্গ নয়।৬৫
যে ব্যক্তি নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তা যদি অপরের জন্য পছন্দ না করে, তাহলে সেও পরিপূর্ণ ঈমানের মু'মিন হতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يُؤْمِنُ عَبْدٌ حَتَّى يُحِبَّ لِجَارِهِ - أَوْ قَالَ لِأَخِيهِ - مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
"সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! কোন বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত (পূর্ণ) মুমিন হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার প্রতিবেশী অথবা (কোন) ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করেছে, যা সে নিজের জন্য করে।”৬৬
অনুরূপ সেই ব্যক্তির ঈমানও অসম্পূর্ণ, যে পেটপূর্ণ খায় অথচ পাশে তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ الَّذِي يَشْبَعُ وَجَارُهُ جَائِعٌ إِلَى جَنْبِهِ
"সে মুমিন নয়, যে ভরপেট খায় অথচ তার পাশে তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে। ৬৭
যে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়, সে চরিত্রবান হতে পারে না, তার ঈমানও পরিপূর্ণ নয়। একদা আল্লাহর নবী কসম ক'রে বললেন,
وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ ، وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ
"আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়।"
الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ
জিজ্ঞেস করা হল, 'কোন্ ব্যক্তি? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকে না। ৬৮
বলা বাহুল্য, সুচরিত্র মানুষের ঈমানের দলীল। চরিত্রবান মুসলিম পূর্ণ ঈমানের মু'মিন। যে যত বেশি চরিত্রবান, সে তত বড় মু'মিন এবং যে যত বেশি পরিপূর্ণ মু'মিন, সে তত বড় সুচরিত্রের অধিকারী।
ঈমানের সাথে সুচরিত্রের নিগূঢ় সম্পর্ক আছে বলেই মহান আল্লাহ ঈমানের কথা উল্লেখ ক'রে মু'মিনকে সম্বোধন করেছেন এবং চরিত্রবান হতে বলেছেন। যেমন তিনি বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।”৬৯
সুতরাং শক্তিশালী ঈমান শক্তিশালী সচ্চরিত্রতা সৃষ্টি করে। আর চারিত্রিক অবক্ষয় ঈমানে ক্ষয় ও ধস আনয়ন করে। উদাহরণ স্বরূপ লজ্জাশীলতা। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ الحَيَاء والإيمانَ قُرِنا جميعاً فإذا رُفِعَ أَحدُهُمَا رُفِعَ الْآخَرُ
"অবশ্যই লজ্জাশীলতা ও ঈমান একই সূত্রে গাঁথা। একটি চলে গেলে অপরটিও চলে যায়। "৭০
যদি কারো ঈমান থাকে, তাহলে সে এ কাজ করবে না। আর যে এ কাজ করে তার ঈমান পরিপূর্ণ হতে পারে না। যেমন মহানবী বলেছেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَقْعُدَنَّ عَلَى مَائِدَةٍ يُدَارُ عَلَيْهَا بِالْخَمْرِ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَدْخُلُ الْحَمَّامَ إِلَّا بِإِزَارٍ وَمَنْ كَانَتْ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا تَدْخُلُ الْحَمَّامَ
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন অবশ্যই এমন (ভোজনের) দস্তরখানে না বসে, যাতে মদ্য পরিবেশিত হয়। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন সাধারণ গোসলখানায় বিবস্ত্র হয়ে প্রবেশ না করে। আর যে মহিলা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন সাধারণ গোসলখানায় প্রবেশ না করে।" ৭১
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَاليَومِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ، وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَومِ الآخِرِ فَلْيَصِلُ رَحِمَهُ ، وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَاليَومِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْراً أَوْ لِيَصْمُتُ
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানের খাতির করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ণ রাখে। এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে, নচেৎ চুপ থাকে।"৭২
لا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ تُسَافِرُ مَسِيرَةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ عَلَيْهَا متفقٌ عَلَيْهِ
"আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি যে নারী ঈমান রাখে, তার মাহরামের সঙ্গ ছাড়া একাকিনী এক দিন এক রাতের দূরত্ব সফর করা বৈধ নয়।”৭৩
لا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ ، إِلَّا عَلَى زَوْجٍ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْراً
"যে স্ত্রীলোক আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, তার পক্ষে স্বামী ছাড়া অন্য কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক পালন করা জায়েয নয়। অবশ্যই তার স্বামীর জন্য সে চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে। "৭৪
এইভাবে প্রত্যেক সুচরিত্রের সম্পর্ক কায়েম করা হয়েছে ঈমানের সাথে। আর কুচরিত্রের সম্পর্ক জোড়া হয়েছে মুনাফিকীর সাথে। মহানবী বলেছেন,
أَرْبَعُ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقاً خَالِصاً ، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النَّفَاقِ حَتَّى يَدَعَها : إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ
"চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকবে সে খাঁটি মুনাফিকু গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তির মাঝে তার মধ্য হতে একটি স্বভাব থাকবে, তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকদের একটি স্বভাব থেকে যাবে। (সে স্বভাবগুলি হল,) ১। তার কাছে আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে। ২। কথা বললে মিথ্যা বলে। ৩। ওয়াদাহ করলে তা ভঙ্গ করে এবং ৪। ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল ভাষা বলে।"৭৫
টিকাঃ
৬৩. বুখারী ২৪৭৫, মুসলিম ২১১, আসহাবে সুনান
৬৪. সূরা নাহল: ১০৫
৬৫. তিরমিযী ২০১৯
৬৬. মুসলিম ১৮০
৬৭. বুখারীর আদাব ১১২, তাবারানী ১২৫৭৩, হাকেম, বাইহাকী ২০১৬০, সহীহুল জামে ৫৩৮২
৬৮. বুখারী ৬০১৬, মুসলিম ১৮১
৬৯. সূরা তাওবাহ: ১১৯
৭০. হাকেম ৫৮, মিশকাত ৫০৯৪, সহীহুল জামে ১৬০৩
৭১. আহমাদ ১২৫. সহীহ তারগীব ১৬৭
৭২. বুখারী ৬১৩৮
৭৩. বুখারী ১০৮৮, মুসলিম ৩৩৩১-৩৩৩২
৭৪. বুখারী ১২৮২, ৫৩৩৪, মুসলিম ৩৭৯৮-৩৭৯৯
৭৫. বুখারী ৩৪, ২৪৫۹, মুসলিম ২১৯
📄 চরিত্র গঠনে ইবাদতের ভূমিকা
মহান আল্লাহ মানুষকে তাঁর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তাতে কেবলই ইবাদতই আছে, মহান আল্লাহর হুকুমের তামীল আছে, তাঁর স্মরণ আছে, তা নয়। বরং তাতেও আছে মানব-চরিত্রের সুন্দর প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন।
উদাহরণ স্বরূপ, স্বলাত মানুষকে সময়ানুবর্তিতা শিক্ষা দেয়। নেতার নেতৃত্ব মেনে চলার প্রশিক্ষণ দেয়।
স্বলাত মানুষকে নোংরা কাজ ও অশ্লীলতা থেকে দূরে রেখে চরিত্রবান বানায়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاء وَالْمُنكَرِ وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ
"তোমার প্রতি যে গ্রন্থ অহী করা হয়েছে তা পাঠ কর এবং যথাযথভাবে স্বলাত পড়। নিশ্চয় স্বলাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। আর অবশ্যই আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা জানেন।"৭৬
স্বলাত মহান প্রতিপালকের সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করে।
স্বলাত সমাজের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে অভ্যাসী বানায়। জামাআতবদ্ধ জীবনের গুরুত্ব আরোপ করে। যাকাতও মানুষের চরিত্র সুন্দর করে, সংশোধন ও পবিত্র করে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا
"তুমি তাদের ধন-সম্পদ হতে সাদকাহ গ্রহণ কর, যার দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র ও পরিশোধিত ক'রে দেবে।"৭৭
বলা বাহুল্য, যাকাত মানুষের মাঝে বদান্যতা সৃষ্টি করে, আত্মকেন্দ্রিকতা হতে দূরে রাখে, কৃপণতা ও ব্যয়কুণ্ঠতার চরিত্র থেকে পবিত্র করে।
রোযার ইবাদত তো মানুষকে মুত্তাক্বী-পরহেযগার বানানোর জন্যই ফরয করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের (রোযার) বিধান দেওয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা সংযমশীল হতে পার।"৭৮
বলা বাহুল্য, সিয়াম রোযাদারের চরিত্র সংশোধন করে, ধৈর্যশীলতা শেখায়, যৌন-ভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করে। মহানবী বলেছেন,
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجُ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ
"হে যুবকদল! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি (বিবাহের অর্থাৎ স্ত্রীর ভরণপোষণ ও রতিক্রিয়ার) সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কারণ, বিবাহ চক্ষুকে দস্তুরমত সংযত করে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে। আর যে ব্যক্তি ঐ সামর্থ্য রাখে না সে যেন সিয়াম রাখে। কারণ, তা যৌনেন্দ্রিয় দমনকারী।"৭৯
সিয়ামপালনকারীর কর্তব্য সম্বন্ধে মহানবী বলেছেন,
إِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ ، فَلا يَرْفُتْ وَلا يَصْخَبُ ، فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ ، فَلْيَقُلْ : إِنِّي صَائِمٌ
"যখন তোমাদের কেউ সিয়ামপালন করবে, সে যেন অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ না করে ও হৈ-হট্টগোল না করে। আর যদি কেউ গালাগালি করে অথবা তার সাথে লড়াই ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে যে, 'আমি সিয়াম পালনকারী।"৮০
لَيْسَ الصِّيَامُ مِنَ الأَكْلِ وَالشَّرْبِ فَقَدْ إِنَّمَا الصِّيَامُ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ فَإِنْ سَابَكَ أَحَدٌ أَوْ جَهِلَ عَلَيْكَ فَقَلْ : إِنِّي صَائِمٌ ، إِنِّي صَائِمٌ
"কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নামই সিয়াম নয়। সিয়াম তো অসার, বাজে ও অশ্লীল কথা থেকে বিরত থাকার নাম। যদি তোমাকে কেউ গালি দেয় অথবা তোমার সাথে কেউ মূর্খামি করে তবে তাকে বল, 'আমি সিয়াম রেখেছি। আমি সিয়াম রেখেছি।"৮১
রোযার আসল উদ্দেশ্য সাধিত না হলে সিয়াম যে সম্পূর্ণ হয় না, সে ব্যাপারে মহানবী বলেছেন,
مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ اللهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ
"যখন কোন ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা ও তার উপর আমল পরিহার না করল, তখন আল্লাহর কোন দরকার নেই যে, সে তার পানাহার ত্যাগ করুক।"৮২
স্বলাত-সিয়াম মানুষের চরিত্র গঠন করে। আবার সুচরিত্রের মাধ্যমে মানুষ স্বলাত-সিয়ামের সওয়াব লাভ করতে পারে। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَيُدْرِكُ بِحُسْنِ خُلُقِهِ دَرَجَةَ الصَّائِمِ القَائِمِ
"অবশ্যই মু'মিন তার সদাচারিতার কারণে দিনে (নফল) সিয়াম পালনকারী এবং রাতে (নফল) ইবাদতকারীর মর্যাদা পেয়ে থাকে।"৮৩
অনুরূপ হজ্জও মানুষের চরিত্র সংশোধন করে এবং হাজীকে পাপ থেকে সদ্যপ্রসূত শিশুর মতো পবিত্র ক'রে সুন্দর মানুষরূপে ঘরে ফিরিয়ে আনে। হজ্জেও আছে বদান্যতা, সহনশীলতা ও ধৈর্যশীলতা, ক্ষমাশীলতা ও উদারতা, সংযমশীলতা ও পরহেযগারি, মহান আল্লাহর প্রতীকসমূহের তা'যীমের মাধ্যমে তাঁর তাক্বওয়া। তিনি বলেছেন,
الْحَجَّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ يَعْلَمُهُ الله وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى وَاتَّقُونِ يَا أُولِي الأَلْبَابِ
"সুবিদিত মাসে (যথা: শওয়াল, যিলকুদ ও যিলহজ্জে) হজ্জ্ব হয়। সুতরাং যে কেউ এই মাসগুলিতে হজ্জ করার সংকল্প করে, সে যেন হজ্জের সময় স্ত্রী-সহবাস (কোন প্রকার যৌনাচার), পাপ কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। তোমরা যে সৎকাজ কর, আল্লাহ তা জানেন। আর তোমরা (পরকালের) পাথেয় সংগ্রহ কর এবং আত্মসংযমই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। হে জ্ঞানিগণ! তোমরা আমাকেই ভয় কর।"৮৪
তিনি আরো বলেছেন,
ذَلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ
“এটাই (আল্লাহর) বিধান। আর কেউ আল্লাহর (দ্বীনের) প্রতীকসমূহের সম্মান করলে এটা তো তার হৃদয়ের সংযমশীলতারই বহিঃপ্রকাশ।"৮৫
হজ্জকর্মের পুরোটাই সচ্চরিত্রতা। সেখানে হাজী সচ্চরিত্রতা প্রদর্শনে যত্নবান থাকে। কেউ কারো প্রতি রাগ দেখায় না, কেউ কাউকে গালি দেয় না, কেউ কারো প্রতি অন্যায়াচরণ করে না। মক্কায় গিয়ে প্রায় ২০ দিন মতো থাকতে হয় এবং সকল প্রকার নিয়মানুবর্তিতার নির্দেশ পালন ক'রে চলতে হয়। ত্রিশ লক্ষাধিক হাজী প্রত্যেক বছর সেখানে জমায়েত হয়। সেই প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝে নিজের সুচরিত্র, আত্মসংযম ও আত্মসংবরণ প্রয়োগ করতে হয়। সেই নারী-পুরুষের কঠিন ভিড়ে পুরুষকে পুরুষের মতো এবং নারীকে নারীর মতো সদাচরণ প্রদর্শন করতে হয়। একই সাথে মিনা যাত্রা, সেখান হতে আরাফাত, আরাফাত হতে মুযদালিফা এবং মুযদালিফা হতে পুনরায় মিনায় ফেরা। এই যাতায়াত ও অবস্থানের মাঝে কতটা সংযম ও নিয়মানুবর্তিতা দরকার? কতটা সদাচরণ প্রয়োজন?
সুতরাং যে হাজী ৩০ লক্ষাধিক নারী-পুরুষের মাঝে প্রায় ২০ দিন সচ্চরিত্রতার অনুশীলন পায়, সে ফিরে এসে নিজ পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-প্রতিবেশী ও সমাজের সাথে সেই সদাচরণ প্রদর্শন করবে না?
বলা বাহুল্য, এইভাবে সকল ইবাদতের পশ্চাতে আছে চরিত্র গঠনের উপকারিতা, সুন্দর মানুষ হওয়ার তাকীদ এবং সচ্চরিত্রতার নির্দেশ। ৮৬
শুধু তাই নয়, ইবাদত অপেক্ষা সুচরিত্রের গুরুত্ব বেশি। অনেকেই ইবাদত করে, কিন্তু চরিত্রে সজ্জন হতে পারে না। হয়তো-বা তাদের ইবাদত ঠিকমতো কাজে লাগে না। নচেৎ কীভাবে মুস্বাল্লী হয়ে অবৈধ নারী-প্রেমে জড়িত হতে পারে? কীভাবে একজন তাহাজ্জুদ পড়ে আবার নোংরা ফ্লিম্ষ্ণ দেখে? কীভাবে মুস্বাল্লী মহিলা স্বামীর সাথে ভালো ব্যবহার প্রদর্শন করে না? শ্বশুর-শাশুড়ীর সাথে সদ্ভাব নেই? মুস্বাল্লী অথচ মানুষের সাথে ব্যবহার ভালো নয়?
সে যাই হোক, ইসলামে নফল স্বালাত-সিয়ামের চাইতে সচ্চরিত্রতার বেশি মাহাত্ম্য আছে। এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে নিম্নের হাদীসটি পড়ুন।
আবূ হুরাইরা বলেন, এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! অমুক মহিলা বেশী বেশী (নফল) স্বলাত পড়ে, সিয়াম রাখে ও দান-খয়রাত করে বলে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু সে নিজ জিভ দ্বারা (অসভ্য কথা বলে বা গালি দিয়ে) প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। (তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?)'
তিনি বললেন,
هِيَ فِي النَّارِ
"সে দোযখে যাবে।"
লোকটি আবার বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! অমুক মহিলা অল্প (নফল) স্বলাত পড়ে, সিয়াম রাখে ও দান-খয়রাত করে বলে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু সে নিজ জিভ দ্বারা (অসভ্য কথা বলে বা গালি দিয়ে) প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। (তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?)'
তিনি বললেন,
هِيَ فِي الْجَنَّةِ
"সে জান্নাতে যাবে।"৮৭
আরো একটি হাদীস প্রণিধান করুন, এটাও আবূ হুরাইরাহ কর্তৃক বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ বললেন, "তোমরা কি জান, নিঃস্ব কে?” তাঁরা বললেন, 'আমাদের মধ্যে নিঃস্ব ঐ ব্যক্তি, যার কাছে কোন দিরহাম এবং কোন আসবাব-পত্র নেই।' তিনি বললেন,
إِنَّ المُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ يأتي يَومَ القِيامَةِ بِصَلَاةٍ وَصِيام وزكاة، ويأتي وقد شَتَمَ هَذَا ، وقَذَفَ هَذَا ، وَأَكَلَ مالَ هَذَا ، وسَفَكَ دَمَ هَذَا ، وَضَرَبَ هَذَا ، فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ ، وَهَذَا مِنْ حَسنَاتِهِ ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَناتُه قَبْلَ أَنْ يُقضى مَا عَلَيْهِ ، أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُم فَطَرِحَتْ عَلَيْهِ ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ
"আমার উম্মতের মধ্যে (আসল) নিঃস্ব তো সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন স্বলাত, সিয়াম ও যাকাতের (নেকী) নিয়ে হাযির হবে। (কিন্তু এর সাথে সাথে সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে। কারো প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করেছে, কারো (অবৈধরূপে) মাল ভক্ষণ করেছে। কারো রক্তপাত করেছে এবং কাউকে মেরেছে। অতঃপর এ (অত্যাচারিত) কে তার নেকী দেওয়া হবে, এ (অত্যাচারিত) কে তার নেকী দেওয়া হবে। পরিশেষে যদি তার নেকীরাশি অন্যান্যদের দাবী পূরণ করার পূর্বেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাদের পাপরাশি নিয়ে তার উপর নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।"৮৮
প্রকৃতপক্ষেই সে নিঃস্ব, আসলেই সে একজন দেউলিয়া। এ হল সেই ব্যবসায়ীর মতো যার দোকানে হয়তো পাঁচ লক্ষ টাকার মাল আছে, কিন্তু তার দেনা আছে দশ লক্ষ টাকার। এমন ব্যবসায়ী কি আসলে লাখপতি, নাকি দেউলিয়া? আরো একটি হাদীস লক্ষ্য করুন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
آية المنافق ثلاث : إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا وَعدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ
وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ
"মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি; (১) কথা বললে মিথ্যা বলে। (২) ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং (৩) তার কাছে আমানত রাখা হলে তার খিয়ানত করে।"৮৯
মুসলিমের অন্য বর্ণনায় আছে, "যদিও সে সিয়াম রাখে এবং স্বলাত পড়ে ও ধারণা করে যে, সে মুসলিম (তবু সে মুনাফিক)।"৯০
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইসলামে ইবাদত অপেক্ষা সচ্চরিত্রতার গুরুত্ব রয়েছে অনেক বেশি। তাই একজন মুসলিমকে 'আবেদ' হওয়ার সাথে সাথে সুচরিত্রের অধিকারী হতে হয়। যেহেতু ইবাদত হল পুণ্যের কাজ, আর অসচ্চরিত্রতা হল পাপ। পুণ্য করার চাইতে পাপ না করাটাই বেশি উত্তম। ৯১
টিকাঃ
৭৬. সূরা আনকাবৃত: ৪৫
৭৭. সূরা তাওবাহ: ১০৩
৭৮. সূরা বাক্বারাহ-২: ১৮৩
৭৯. বুখারী ৫০৬৫-৫০৬৬, মুসলিম ৩৪৬৪-৩৪৬৬, মিশকাত ৩০৮০
৮০. বুখারী ১৯০৪, মুসলিম ২৭৬২
৮১. হাকেম ১৫৭০, বাইহাক্বী ৮০৯৬, ইবনে খুযাইমা ১৯৯৬, সহীহুল জামে' ৫৩৭৬
৮২. বুখারী ১৯০৩, ৬০৫৭
৮৩. আবু দাউদ ৪৮০০
৮৪. সূরা বাক্বারাহ-২: ১৯৭
৮৫. সূরা হাজ্জ: ৩২
৮৬. মাকারিমুল আখলাক্ব ৩৬পৃ
৮৭. আহমাদ ৯৬৭৫, ইবনে হিব্বান ৫৭৬৪, হাকেম ৭৩০৫, সহীহ তারগীব ২৫৬০
৮৮. মুসলিম ৬৭৪৪, তিরমিযী ২৮১৮
৮৯. বুখারী ৩৩, মুসলিম ২২০
৯০. মুসলিম ২২২
৯১. আখলাকু ফিল ইসলাম ৪পৃ.