📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 প্রকৃতি ও চরিত্র

📄 প্রকৃতি ও চরিত্র


সৃষ্টিগতভাবে মানুষের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। শৈশব থেকেই তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে মানুষের আচার-আচরণে ও চাল-চলনে। ধীরে ধীরে তা মানুষের মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত হয়। চরিত্র হয়ে যায় তার সকল কর্মকাণ্ড। তার মধ্যে কিছু হয় প্রকৃতিগতভাবেই স্বভাবজাত। আর কিছু হয় প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে। এই জন্য মানুষের চরিত্রকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
প্রকৃতিগত চরিত্র এবং পরিশীলিত চরিত্র।
১। প্রকৃতিগত চরিত্র
সৃষ্টিগতভাবে যেমন মানুষের বুদ্ধিমত্তার তারতম্য আছে, দৈহিক অঙ্গ গঠনে পার্থক্য আছে, তেমনি প্রকৃতিগত স্বভাবও। বহু গুণাগুণ আছে, যা মানুষের প্রকৃতিতে প্রক্ষিপ্ত আছে। যা অর্জন করার জন্য কোন অনুশীলন করতে হয় না। যেমন ঠাণ্ডা মেজাজ, মিনমিনে স্বভাব অথবা তার বিপরীত। এই শ্রেণীর গুণাবলী মানুষকে তৈরি করতে হয় না। মহান স্রষ্টার সৃষ্টিগত প্রকৃতিতেই তা নিহিত আছে। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ خَلَقَ آدَمَ مِنْ قَبْضَةٍ قَبَضَهَا مِنْ جَمِيعِ الْأَرْضِ فَجَاءَ بَنُو آدَمَ عَلَى قَدْرِ الْأَرْضِ جَاءَ مِنْهُمُ الْأَبْيَضُ وَالْأَحْمَرُ وَالْأَسْوَدُ وَبَيْنَ ذَلِكَ وَالْخَبِيتُ وَالطَّيِّبُ وَالسَّهْلُ وَالْحَزْنُ وَبَيْنَ ذَلِكَ
"নিশ্চয় আল্লাহ আয্যা অজাল্ল আদমকে সৃষ্টি করেছেন এক মুষ্টি মাটি থেকে, যা তিনি সারা পৃথিবী থেকে গ্রহণ করেছেন। তাই আদম সন্তান মাটি অনুসারে বিকাশ লাভ করেছে। তাদের কেউ রক্তিমবর্ণ, কেউ গৌরবর্ণ, কেউ কৃষ্ণবর্ণ, আবার কেউ এ সবের মাঝামাঝি। কেউ সহজ-সরল, কেউ দুর্দম-কঠিন, কেউ নোংরা চরিত্রের, কেউ সুন্দর চরিত্রের এবং কেউ এ সবের মাঝামাঝি।"৩৪
আবু হুরাইরাহ বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ কে প্রশ্ন করা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি কে?' তিনি বললেন, "তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে আল্লাহ-ভীরু।” অতঃপর তাঁরা (সাহাবীরা) বললেন, 'এ ব্যাপারে আমরা আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি না।' তিনি বললেন, "তাহলে ইউসুফ (সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি), যিনি স্বয়ং আল্লাহর নবী, তাঁর পিতা নবী, পিতামহও নবী এবং প্রপিতামহও নবী ও আল্লাহর বন্ধু।” তাঁরা বললেন, 'এটাও আমাদের প্রশ্ন নয়।' তিনি বললেন,
فَعَنْ مَّعَادِنِ العَرَبِ تَسْأَلُونِي؟ خِيَارُهُمْ فِي الجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِي الإِسْلامِ إِذَا فَقُهُوا
"তাহলে তোমরা কি আমাকে আরবের বংশাবলী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছ? (তবে শোনো!) তাদের মধ্যে যারা জাহেলী যুগে ভাল, তারা ইসলামেও ভাল; যদি দ্বীনী জ্ঞান রাখে।"৩৫
তিনি আরো বলেছেন,
النَّاسُ مَعَادِنٌ كَمَعَادِنِ الذَّهَبِ وَالفِضَّةِ ، خِيَارُهُمْ فِي الجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِي الإسْلامِ إِذَا فَقُهُوا ، وَالأَرْوَاحُ جُنُودٌ مُجَنَّدَةٌ ، فَمَا تَعَارَفَ مِنْهَا ائْتَلَفَ ، وَمَا تَنَاكَرَ مِنْهَا اخْتَلَفَ
"সোনা-রূপার খনিরাজির মত মানব জাতিও নানা গোত্রের খনিরাজি। যারা জাহেলী যুগে উত্তম ছিল, তারা ইসলামী যুগেও উত্তম; যখন তারা দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে। আর আত্মাসমূহ সমবেত সৈন্যদলের মত। সুতরাং আপোসে যে আত্মাদল পরিচিত ও অভিন্ন প্রকৃতির হয়, সে আত্মাদলের মাঝে মিলন ও বন্ধুত্ব স্থাপিত হয়ে থাকে এবং যে আত্মাদল আপোসে অপরিচিত ও ভিন্ন প্রকৃতির হয়, সে আত্মাদলের মাঝে বিচ্ছিন্নতা ও অনৈক্য প্রকট হয়ে ওঠে।”৩৬
লক্ষণীয় যে, মানুষ এক প্রকৃতির নয়। যত মানুষ, তত রকমের মন আছে। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে মনে-মনে মিল থাকে। আর যার প্রকৃতি ভালো, সে সকল পরিবেশে ভালো। যে ইসলামের পূর্বে জাহেলী যুগে ভালো ছিল, সে ইসলামের পরেও ভালো। প্রকৃতিগত সদাচরণ ও কদাচরণ মুসলিম-অমুসলিম সকলের মাঝে বিদ্যমান থাকে।
প্রকৃতিগত আচরণ প্রদর্শন করার প্রয়োজন হয় না। তা প্রদর্শন করতে কোন প্রকার চেষ্টা বা কষ্টের দরকার হয় না। মানুষ না চাইলেও সময়ে স্বাভাবিকভাবে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। রাসূলুল্লাহ আশাজ্ আব্দুল কায়েসকে বলেছিলেন,
إِنَّ فِيكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ : الْحِلْمُ وَالأَنَاةُ
"নিশ্চয় তোমার মধ্যে এমন দু'টি স্বভাব রয়েছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন; সহনশীলতা ও চিন্তা-ভাবনা ক'রে কাজ করা। "৩৭
নিম্নের একটি হাদীস থেকেও প্রকৃতিগত চরিত্রের কথা স্পষ্ট হয়। আমানতদারী মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রক্ষিপ্ত করা হয়। আর মানুষের মৌলিক চরিত্র এটাই যে, সে আমানতদার হবে।
হুযাইফাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ আমাদের নিকট দু'টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। একটি তো আমি প্রত্যক্ষ করেছি এবং দ্বিতীয়টির জন্য অপেক্ষায় রয়েছি। তিনি আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, আমানত মানুষের অন্তরের অন্তস্তলে অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর তারা কুরআন থেকে জ্ঞানার্জন করেছে। তারপর তারা নবীর হাদীস থেকেও জ্ঞানার্জন করেছে। এরপর আমাদেরকে আমানত তুলে নেওয়া সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, “মানুষ এক ঘুম ঘুমানোর পর তার অন্তর থেকে আমানত তুলে নেওয়া হবে। তখন একটি বিন্দুর মত তার চিহ্ন অবশিষ্ট থাকবে। পুনরায় মানুষ এক ঘুম ঘুমাবে। আবারো তার অন্তর থেকে আমানত উঠিয়ে নেওয়া হবে। তখন জ্বলন্ত আগুন গড়িয়ে তোমার পায়ে পড়লে যেমন একটা ফোস্কা পড়ে কালো দাগ দেখতে পাওয়া যায় তার মত চিহ্ন থাকবে। তুমি তাকে ফোলা দেখবে; কিন্তু বাস্তবে তাতে কিছুই থাকবে না।” অতঃপর (উদাহরণ স্বরূপ) তিনি একটি কাঁকর নিয়ে নিজ পায়ে গড়িয়ে দিলেন। (তারপর বলতে লাগলেন,) “সে সময় লোকেরা বেচা-কেনা করবে কিন্তু প্রায় কেউই আমানত আদায় করবে না। এমনকি লোকে বলাবলি করবে যে, অমুক বংশে একজন আমানতদার লোক আছে। এমনকি (দুনিয়াদার) ব্যক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করা হবে, সে কতই না অদম্য! সে কতই না বিচক্ষণ! সে কতই না বুদ্ধিমান! অথচ তার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমানও থাকবে না।” (হুযাইফা বলেন,) ইতিপূর্বে আমার উপর এমন যুগ অতিবাহিত হয়ে গেছে, যখন কারো সাথে বেচাকেনা করতে কোন পরোয়া করতাম না। কারণ সে মুসলিম হলে তার দ্বীন তাকে আমার (খিয়ানত থেকে) বিরত রাখবে। আর খ্রিষ্টান অথবা ইয়াহুদী হলে তার শাসকই আমার হক ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু বর্তমানের অবস্থা হচ্ছে এই যে, আমি অমুক অমুক ছাড়া বেচা-কেনা করতে প্রস্তুত নই।৩৮
নবুয়ত প্রাপ্তির প্রাক্কালে মহানবী এর বহু গুণ ছিল প্রকৃতিগত সুচরিত্র। সে কথার সাক্ষ্য দিয়েছেন মা খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)। জিবরীলকে দেখে হিরা গুহা থেকে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে যখন মহানবী তাঁর কাছে ফিরে এসে বৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন, তখন তিনি তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন,
كَلَّا أَبْشِرُ فَوَاللَّهِ لاَ يُخْزِيكَ اللهُ أَبَدًا، وَاللهِ إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ وَتَصْدُقُ الْحَدِيثَ وَتَحْمِلُ الْكَلَّ وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ وَتَقْرِى الضَّيْفَ وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ
অর্থাৎ, কক্ষনো না। আপনি সুসংবাদ নিন। আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে কখনই লাঞ্ছিত করবেন না। আল্লাহর কসম! আপনি তো আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখেন, সত্য কথা বলেন, (অপরের) বোঝা বইয়ে দেন, নিঃস্বকে দান করেন, মেহমানের খাতির করেন এবং বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করেন।৩৯
আবূ বাক্ সিদ্দীক ইসলামের পূর্বে জাহেলী যুগে মদ পান করেননি, এটা ছিল তাঁর প্রকৃতিগত চরিত্র। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَى أَن لَّا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانٍ يَفْتَرِينَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفٍ فَبَايِعُهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"হে নবী! বিশ্বাসী নারীরা যখন তোমার নিকট এসে বায়আত করে এই মর্মে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোন শরীক স্থির করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তান-সন্ততিদের হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোন অপবাদ রচনা ক'রে রটাবে না এবং সৎকার্যে তোমাকে অমান্য করবে না, তখন তাদের বায়আত গ্রহণ কর এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"৪০
উক্ত নির্দেশের প্রেক্ষিতে একদল নারীর বায়আত গ্রহণ কালে মহানবী বলেছিলেন, "তোমরা আমার কাছে এ মর্মে বায়আত করো যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শির্ক করবে না----ব্যভিচার করবে না।" তখন হিন্দ বিন্তে উতবাহ বলেছিলেন, 'স্বাধীন মেয়েও কি ব্যভিচার করে?'
অবাক হয়ে এ প্রশ্নের মানে হল, তাঁর প্রকৃতিগত সুচরিত্রে ছিল যে, একজন স্বাধীনা মহিলা ব্যভিচার করতে পারে না। সেই নোংরা জাহেলী যুগেও না। ব্যভিচার করতে পারে দাসীরা।
>২। পরিশীলিত চরিত্র
বহু শিষ্টাচার ও আচরণ এমন আছে, যা পরিশীলন ও অনুশীলনের মাধ্যমে রপ্ত করা যায়। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষের আচরণকে পরিবর্তিত ও বিশুদ্ধ করা যায়। আর সেই মর্মেই শরীয়তের প্রায় সকল নির্দেশ এসেছে মানুষকে 'মানুষ' রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে। মহানবী বলেছেন,
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ (مكارم) الْأَخْلَاقِ
"আমি মানুষের শ্রেষ্ঠ ও সুন্দর চরিত্রের পরিপূর্ণতা দানের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।"৪১

টিকাঃ
৩৪. আহমাদ ১৯৫৮২, আবু দাউদ ৪৬৯৫, তিরমিযী ২৯৫৫
৩৫. বুখারী ৩৩৫৩, মুসলিম ৬৩১১
৩৬. মুসলিম ৬৮৭৭
৩৭. মুসলিম ১২৬
৩৮. বুখারী ৬৪৯৭, ৭০৮৬, মুসলিম ৩৮৪
৩৯. বুখারী ৩, মুসলিম ৪২২
৪০. সূরা মুমতাহিনাহঃ ১২
৪১. আহমাদ ৮৯৫২, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ ২৭৩, হাকেম ৪২২১, বাইহাক্বী ২১৩০১

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 মানুষের চরিত্রের কি পরিবর্তন হতে পারে?

📄 মানুষের চরিত্রের কি পরিবর্তন হতে পারে?


তার মানে তার অভ্যাস কি বদলাতে পারে? কৃপণ কি দানশীল হতে পারে? নির্লজ্জ কি লজ্জাশীল হতে পারে?
অনেকে ধারণা করেন, চরিত্র বদলানো যায় না। অভ্যাস পরিবর্তন করা অসম্ভব। এমন একটা হাদীসও আছে, "যদি শোন যে, কোন পাহাড় নিজ জায়গা হতে সরে গেছে, তাহলে বিশ্বাস করো। কিন্তু যদি শোন যে, কারো প্রকৃতি পাল্টে গেছে, তাহলে বিশ্বাস করো না।"৪২
প্রথমতঃ উক্ত হাদীস সহীহ নয়।
দ্বিতীয়তঃ হাদীসে প্রকৃতি বলতে যার পরিবর্তন সাধনে মানুষের কোন এখতিয়ার নেই। যেমন মহিলার প্রকৃতি, শিশুর প্রকৃতি অথবা কোন পুরুষের মাঝে সৃষ্টিগত নারী-সুলভ বা শিশুসুলভ প্রকৃতি ইত্যাদি।
পক্ষান্তরে চরিত্র পরিবর্তনে মানুষের হাত আছে। মানুষের এখতিয়ারাধীন অভ্যাস পরিবর্তন করার ক্ষমতা আছে। কোন মানুষকে তার কর্মে বাধ্য করা হয় না। পরিবেশের চাপে অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটে। অনুশীলনের কারণে চরিত্র ভালো থেকে মন্দে বা মন্দ থেকে ভালোতে বদলে যেতে পারে।
দৃঢ় সংকল্প নিয়ে চেষ্টা ও চর্চা করলে অনেক সুচরিত্রকে মানুষ নিজ জীবনে চিত্রিত করতে পারে। চরিত্র পরিবর্তন করা সম্ভব বলেই মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا - فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا - قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَاهَا - وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا
"শপথ আত্মার এবং তার সুঠাম গঠনের। অতঃপর তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। সে সফলকাম হবে, যে তাকে পরিশুদ্ধ করবে এবং সে ব্যর্থ হবে, যে তাকে কলুষিত করবে।৪৩
তিনি আরো বলেছেন,
وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى
"আর এই যে, মানুষ তাই পায়, যা সে চেষ্টা করে।" ৪৪
চরিত্র বদলানো সম্ভব বলেই, আমাদের শরীয়ত চরিত্রকে সুন্দর করতে উদ্বুদ্ধ করে। যেমন মহানবী বলেছেন,
أَنَا زَعِيمٌ بِبَيْتٍ فِي أَعْلَى الْجَنَّةِ لِمَنْ حَسَّنَ خُلُقَهُ
"আমি জান্নাতের সবার উপরে এক গৃহের জামিন তার জন্য, যে তার চরিত্রকে সুন্দর করে।৪৫
রাগী চরিত্র থেকে রাগ দূর করা সম্ভব বলেই মহানবী রাগ করতে নিষেধ করেছেন। এক ব্যক্তি নবী কে বলল, 'আপনি আমাকে কিছু অসিয়ত করুন!' তিনি বললেন, "তুমি রাগান্বিত হয়ো না।" সে ব্যক্তি এ কথাটি কয়েকবার বলল। তিনি (প্রত্যেক বারেই একই কথা) বললেন, "তুমি রাগান্বিত হয়ো না।"৪৬
অভ্যাস বদলানো অবাস্তব নয় বলেই মহানবী বলেছেন,
إِنَّمَا الْعِلْمُ بِالتَّعَلُّمِ، وَإِنَّمَا الْحِلْمُ بِالتَّحَلُّمِ، مَنْ يَتَحَرَّى الْخَيْرَ يُعْطَهُ، وَمَنْ يَتَّقِ الشَّرَّ يُوقَهُ
"শিক্ষা লাভের ফলে শিক্ষা পাওয়া যায়। সহিষ্ণুতার অভ্যাস গড়লে সহিষ্ণু হওয়া যায়। যে কল্যাণ অনুসন্ধান করবে, তাকে তা দেওয়া হবে এবং যে মন্দ থেকে বাঁচার চেষ্টা করবে, তাকে বাঁচানো হবে।"৪৭
আবু সাঈদ খুদরী) হতে বর্ণিত, কিছু আনসারী আল্লাহর রসূল এর কাছে কিছু চাইলেন। তিনি তাদেরকে দিলেন। পুনরায় তারা দাবী করল। ফলে তিনি (আবার) তাদেরকে দিলেন। এমনকি যা কিছু তাঁর কাছে ছিল তা সব নিঃশেষ হয়ে গেল। অতঃপর যখন তিনি সমস্ত জিনিস নিজ হাতে দান ক'রে দিলেন, তখন তিনি বললেন,
مَا يَكُنْ عِنْدِي مِنْ خَيْرٍ فَلَنْ ادَّخِرَهُ عَنْكُمْ ، وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَهُ اللهُ ، وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللهُ ، وَمَنْ يَتَصَبَّرُ يُصَبِّرُهُ اللهُ وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءٌ خَيْراً وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ
"আমার কাছে যা কিছু (মাল) আসে তা আমি তোমাদেরকে না দিয়ে কখনই জমা ক'রে রাখব না। (কিন্তু তোমরা একটি কথা মনে রাখবে,) যে ব্যক্তি চাওয়া থেকে পবিত্র থাকার চেষ্টা করবে, আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখবেন। আর যে ব্যক্তি (চাওয়া থেকে) অমুখাপেক্ষিতা অবলম্বন করবে, আল্লাহ তাকে অমুখাপেক্ষী করবেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করার চেষ্টা করবে আল্লাহ, তাকে ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা প্রদান করবেন। আর কোন ব্যক্তিকে এমন কোন দান দেওয়া হয়নি, যা ধৈর্য অপেক্ষা উত্তম ও বিস্তর হতে পারে।"৪৮
মহান আল্লাহ বলেছেন,
فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَةَ اللهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
"তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত রাখ। আল্লাহর সেই প্রকৃতির অনুসরণ কর; যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটিই সরল ধর্ম; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” ৪৯
এখানে আল্লাহর সৃষ্টি বা প্রকৃতি বলে ইসলাম ও তওহীদকে বুঝানো হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, আল্লাহ তাআলা মু'মিন-কাফের প্রত্যেক মানুষকে ইসলাম ও তওহীদের প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এই জন্য তওহীদ মানুষের প্রকৃতি অর্থাৎ সহজাত ও স্বভাব-ধর্ম। যেমন যে সময় আল্লাহ তাআলা মানুষের আত্মা সৃষ্টি করেন তখন বলেন, 'আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?' তার উত্তরে মানুষ বলেছিল, অবশ্যই। এ থেকেও পরিষ্কার বুঝা যায় যে, মানুষের আসল ধর্ম হল একত্ববাদ।
কিন্তু পরিবেশের চাপেও প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটতে পারে। বিভিন্ন খারাপ পরিবেশ অথবা অন্য কোন প্রতিবন্ধক অনেককে সেই প্রকৃতি (ইসলামে) প্রতিষ্ঠিত থাকতে বাধা দান করে; ফলে তারা কাফের হয়েই থাকে। যেমন নবী হাদীসে বলেছেন,
كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَحِّسَانِهِ
"প্রত্যেক শিশু (ইসলামের) প্রকৃতির উপর জন্ম নেয়। কিন্তু তার পিতা- মাতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে দেয়।"৫০
"আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই।" এর মানে এই নয় যে, প্রকৃতির পরিবর্তন হতে পারে না। বরং এর অর্থ হল, আল্লাহর সেই সৃষ্টি বা প্রকৃতিকে পরিবর্তন করো না; সঠিক তরবিয়ত দিয়ে তার লালন-পালন কর ও তাকে বড় করে তোলো। যাতে ঈমান ও তওহীদ কচি-কাঁচা শিশুদের মনে-প্রাণে বদ্ধমূল হয়ে যায়। এখানে বাক্যটি খবর স্বরূপ প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু ব্যবহার হয়েছে আজ্ঞার অর্থে। অর্থাৎ, নেতিবাচক বাক্য নিষেধাজ্ঞার অর্থে ব্যবহার হয়েছে। ('আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই' অর্থাৎ, 'আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন করো না।')৫১
চরিত্রের পরিবর্তন হয় বলেই তো আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ক'রে চাওয়া হয়,
وَاهْدِنِي لَأَحْسَنِ الْأَخْلَاقِ لَا يَهْدِي لَأَحْسَنِهَا إِلَّا أَنْتَ ، وَاصْرِفْ عَنِّي سَيِّئَهَا لَا يَصْرِفُ عَنِّي سَيِّئَهَا إِلَّا أَنْتَ
"সুন্দরতম চরিত্রের প্রতি আমাকে পথ দেখাও, যেহেতু তুমি ছাড়া অন্য কেউ সুন্দরতম চরিত্রের প্রতি পথ দেখাতে পারে না। মন্দ চরিত্রকে আমার নিকট হতে দূরে রাখ, যেহেতু তুমি ছাড়া অন্য কেউ মন্দ চরিত্রকে আমার নিকট থেকে দূর করতে পারে না।"৫২

টিকাঃ
৪২. আহমাদ
৪৩. সূরা শামস: ৭-১০
৪৪. সূরা নাজম: ৩৯
৪৫. আবু দাউদ ৪৮০২, ত্বাবারানী ৭৩৬১
৪৬. বুখারী ৬১১৬
৪৭. ত্বাবারানীর কাবীর ১৭৬৩, আওসাত্ব ২৬৬৩, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১০৭৩৯, সিঃ সহীহাহ ৩৪২
৪৮. বুখারী ১৪৬৯, ৬৪৭০, মুসলিম ২৪৭১
৪৯. সূরা রূম: ৩০
৫০. বুখারী ১৩৫৯, ৪৭৭৫, মুসলিম ৬৯২৬
৫১. আহসানুল বায়ান
৫২. মুসলিম ১৮৪৮

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 সচ্চরিত্র হল দ্বীনের আত্মা

📄 সচ্চরিত্র হল দ্বীনের আত্মা


মুসলিমের সচ্চরিত্রতা যেন গোটা দ্বীনটাই। পুরো দ্বীনদারী, আনুগত্য ও পুণ্যবত্তাই যেন সচ্চরিত্রতা। মহানবী বলেছেন,
البر : حُسْنُ الخُلُقِ، وَالإِثْمُ : مَا حَاكَ فِي نَفْسِكَ ، وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ
"পুণ্যবত্তা হল সচ্চরিত্রতার নাম এবং পাপ হল তাই, যা তোমার অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করে এবং তা লোকে জেনে ফেলুক--এ কথা তুমি অপছন্দ কর।”৫৩
আর সেই সচ্চরিত্রতার পরিপূর্ণতা সাধনের লক্ষ্যেই প্রেরিত হয়েছিলেন মহান চরিত্রের অধিকারী মহানবী। তিনি বলেছেন,
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ (مكارم) الْأَخْلَاقِ
"আমি মানুষের শ্রেষ্ঠ ও সুন্দর চরিত্রের পরিপূর্ণতা দানের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।"৫৪
সুতরাং ইসলামী সচ্চরিত্রতায় আমরা যে সকল বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল কয়েকটি বিষয়:
১। ইসলামী সচ্চরিত্রতার উৎস হল অহী, কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ। যার জন্য তা সর্ব যুগের সর্ব স্থানের সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য উপযোগী। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمْ أَحْسَنَكُمْ أَخْلاقاً
"তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তোমাদের মধ্যে সুন্দরতম চরিত্রের অধিকারী। ৫৫
২। ইসলামী সচ্চরিত্রতা হল ব্যবহারিক ও বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য। শুধু তত্ত্বই নয়, বরং বাস্তবে আমলযোগ্য। আব্দুল্লাহ বিন আম্র কে রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন,
أَرْبَعُ إِذَا كُنَّ فِيكَ فَلَا عَلَيْكَ مَا فَاتَكَ مِنَ الدُّنْيَا حِفْظُ أَمَانَةٍ وَصِدْقُ حَدِيثٍ وَحُسْنُ خَلِيقَةٍ وَعِفَّةٌ فِي طُهْرٍ
"তোমার মধ্যে চারটি জিনিস হলে দুনিয়ার আর কিছু না পেলেও তোমার বয়ে যাবে না; ১। আমানত রক্ষা করা, ২। সত্য কথা বলা, ৩। চরিত্র সুন্দর করা এবং ৪। হালাল খাদ্য খাওয়া।"৫৬
৩। ইসলামী চরিত্রের উপর উদ্বুদ্ধকারী মূল জিনিস হল, মুসলিমের মনে মহান আল্লাহর ভয়, তাঁর স্মরণ এবং তাঁর সন্তুষ্টির অনুসন্ধান।
আবূ হুরাইরা বলেন, রাসূলুল্লাহ কে জিজ্ঞাসা করা হল যে, 'কোন্ আমল মানুষকে বেশি জান্নাতে নিয়ে যাবে?' তিনি বললেন,
تَقْوَى اللَّهِ وَحُسَنُ الْخُلُقِ
"আল্লাহ-ভীতি ও সচ্চরিত্র।"৫৭
তিনি আরো বলেছেন,
إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ، وَيُحِبُّ مَعَالِيَ الْأُمُورِ، وَيَكْرَهُ سَفْسَافَهَا»
"নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। তিনি সুউচ্চ চরিত্রকে ভালোবাসেন এবং ঘৃণা করেন নোংরা চরিত্রকে।"৫৮
৪। ইসলামী চরিত্রে কেবল প্রদর্শনই যথেষ্ট নয়, বরং তাতে আন্তরকিতা ও আল্লাহর জন্য বিশুদ্ধতা আবশ্যক। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّةِ
"যাবতীয় কার্য নিয়ত বা সংকল্পের উপর নির্ভরশীল।"৫৯
৫। ইসলামী চরিত্রের বিষয়াবলী খুব যুক্তিযুক্ত ও বিবেকগ্রাহ্য। শরীয়তের প্রত্যেক আদেশ-নিষেধের পশ্চাতে একটা না একটা হিকমত আছে, যৌক্তিকতা আছে। যেমন,
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً
"তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।"৬০
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلٍ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ - إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ
"হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও স্বলাতে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না?৬১
অনুরূপ প্রত্যেক সচ্চরিত্রতার পিছনেও অবশ্যই কোন না কোন মঙ্গল আছে, হিকমত আছে। যা কারো সুস্থ বিবেক অগ্রাহ্য করে না। ৬২

টিকাঃ
৫৩. মুসলিম ৬৬৮০-৬৬৮১
৫৪. আহমাদ ৮৯৫২, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ ২৭৩, হাকেম ৪২২১, বাইহাক্বী ২১৩০১
৫৫. বুখারী ৩৫৫৯, ৩৭৫৯, মুসলিম ৬১৭৭
৫৬. আহমাদ ৬৬৫২, ত্বাবারানী, বাইহাক্বী, সিঃ সহীহাহ ৭৩৩
৫৭. তিরমিযী ২০০৪নং, ইবনে হিব্বান ৪৭৬, বুখারীর আদব ২৮৯ ও ২৯৪, ইবনে মাজাহ ৪২৪৬, আহমাদ ২/৩৯২, হাকেম ৪/২৩৪
৫৮. ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৬৯০৬, সহীহুল জামে ১৭৪৩
৫৯. বুখারী ১, মুসলিম ১৯০৭
৬০. সূরা বানী ইস্রাঈল: ৩২
৬১. সূরা মায়িদাহ: ৯০-৯১
৬২. মাকারিমুল আখলাক্ব ১২-১৩পৃ,

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 সচ্চরিত্র ও ঈমান

📄 সচ্চরিত্র ও ঈমান


মুসলিমের সচ্চরিত্রতা কোন মযহাবী মতবাদ নয়, কোন বৈয়াক্তিক সুবিধাবাদ নয় এবং তা কোন পরিবেশগত আচার-আচরণ নয়, যা তার পরিবর্তনের ফলে চরিত্রেরও পরিবর্তন ঘটতে থাকবে। আসলে সচ্চরিত্রতা হল সঠিক ঈমান থেকে বিকীর্ণ আলো, যা মু'মিনের দেহ ও মনকে আলোকিত করে। সুচরিত্র কোন বিচ্ছিন্ন মাহাত্ম্য ও মহত্ত্ব নয়, বরং তা একটি শিকলেরই কয়েকটি কড়া, আকীদা, ইবাদত ও ব্যবহার। সুতরাং মুসলিমের আকীদা সচ্চরিত্রতার সাথে সম্পৃক্ত, তার ইবাদত সচ্চরিত্রতার সাথে জড়িত এবং তার আচার-আচরণও সুন্দর চরিত্রের সাথে মিলিত ও যুক্ত। এগুলির মধ্যে কোনও একটাতে ত্রুটি ঘটলে মু'মিনের ঈমানে ত্রুটি ঘটে থাকে। মহানবী বলেছেন,
لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَسْرِقُ السَّارِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ
"কোন ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে ব্যভিচার করতে পারে না। কোন চোর যখন চুরি করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে চুরি করতে পারে না এবং কোন মদ্যপায়ী যখন মদ্যপান করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে মদ্যপান করতে পারে না। "৬৩
পরিপূর্ণ মু'মিন মিথ্যা বলতে পারে না। মিথ্যা বলার অভ্যাস হল কাফের ও মুনাফিকের। মহান আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّمَا يَفْتَرِي الْكَذِبَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْكَاذِبُونَ
"যারা আল্লাহর আয়াতে বিশ্বাস করে না, তারাই শুধু মিথ্যা উদ্ভাবন করে এবং তারাই মিথ্যাবাদী।"৬৪
পূর্ণাঙ্গ মু'মিন সর্বদা অভিশাপকারী হতে পারে না। কথায়-কথায় বদ্দুআ দিতে পারে না। এমন করলে জানতে হবে, তার ঈমান পূর্ণাঙ্গ নয়।৬৫
যে ব্যক্তি নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তা যদি অপরের জন্য পছন্দ না করে, তাহলে সেও পরিপূর্ণ ঈমানের মু'মিন হতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يُؤْمِنُ عَبْدٌ حَتَّى يُحِبَّ لِجَارِهِ - أَوْ قَالَ لِأَخِيهِ - مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
"সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! কোন বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত (পূর্ণ) মুমিন হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার প্রতিবেশী অথবা (কোন) ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করেছে, যা সে নিজের জন্য করে।”৬৬
অনুরূপ সেই ব্যক্তির ঈমানও অসম্পূর্ণ, যে পেটপূর্ণ খায় অথচ পাশে তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ الَّذِي يَشْبَعُ وَجَارُهُ جَائِعٌ إِلَى جَنْبِهِ
"সে মুমিন নয়, যে ভরপেট খায় অথচ তার পাশে তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে। ৬৭
যে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়, সে চরিত্রবান হতে পারে না, তার ঈমানও পরিপূর্ণ নয়। একদা আল্লাহর নবী কসম ক'রে বললেন,
وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ ، وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ
"আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়।"
الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ
জিজ্ঞেস করা হল, 'কোন্ ব্যক্তি? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকে না। ৬৮
বলা বাহুল্য, সুচরিত্র মানুষের ঈমানের দলীল। চরিত্রবান মুসলিম পূর্ণ ঈমানের মু'মিন। যে যত বেশি চরিত্রবান, সে তত বড় মু'মিন এবং যে যত বেশি পরিপূর্ণ মু'মিন, সে তত বড় সুচরিত্রের অধিকারী।
ঈমানের সাথে সুচরিত্রের নিগূঢ় সম্পর্ক আছে বলেই মহান আল্লাহ ঈমানের কথা উল্লেখ ক'রে মু'মিনকে সম্বোধন করেছেন এবং চরিত্রবান হতে বলেছেন। যেমন তিনি বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।”৬৯
সুতরাং শক্তিশালী ঈমান শক্তিশালী সচ্চরিত্রতা সৃষ্টি করে। আর চারিত্রিক অবক্ষয় ঈমানে ক্ষয় ও ধস আনয়ন করে। উদাহরণ স্বরূপ লজ্জাশীলতা। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ الحَيَاء والإيمانَ قُرِنا جميعاً فإذا رُفِعَ أَحدُهُمَا رُفِعَ الْآخَرُ
"অবশ্যই লজ্জাশীলতা ও ঈমান একই সূত্রে গাঁথা। একটি চলে গেলে অপরটিও চলে যায়। "৭০
যদি কারো ঈমান থাকে, তাহলে সে এ কাজ করবে না। আর যে এ কাজ করে তার ঈমান পরিপূর্ণ হতে পারে না। যেমন মহানবী বলেছেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَقْعُدَنَّ عَلَى مَائِدَةٍ يُدَارُ عَلَيْهَا بِالْخَمْرِ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَدْخُلُ الْحَمَّامَ إِلَّا بِإِزَارٍ وَمَنْ كَانَتْ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا تَدْخُلُ الْحَمَّامَ
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন অবশ্যই এমন (ভোজনের) দস্তরখানে না বসে, যাতে মদ্য পরিবেশিত হয়। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন সাধারণ গোসলখানায় বিবস্ত্র হয়ে প্রবেশ না করে। আর যে মহিলা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন সাধারণ গোসলখানায় প্রবেশ না করে।" ৭১
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَاليَومِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ، وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَومِ الآخِرِ فَلْيَصِلُ رَحِمَهُ ، وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَاليَومِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْراً أَوْ لِيَصْمُتُ
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানের খাতির করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ণ রাখে। এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে, নচেৎ চুপ থাকে।"৭২
لا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ تُسَافِرُ مَسِيرَةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ عَلَيْهَا متفقٌ عَلَيْهِ
"আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি যে নারী ঈমান রাখে, তার মাহরামের সঙ্গ ছাড়া একাকিনী এক দিন এক রাতের দূরত্ব সফর করা বৈধ নয়।”৭৩
لا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ ، إِلَّا عَلَى زَوْجٍ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْراً
"যে স্ত্রীলোক আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, তার পক্ষে স্বামী ছাড়া অন্য কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক পালন করা জায়েয নয়। অবশ্যই তার স্বামীর জন্য সে চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে। "৭৪
এইভাবে প্রত্যেক সুচরিত্রের সম্পর্ক কায়েম করা হয়েছে ঈমানের সাথে। আর কুচরিত্রের সম্পর্ক জোড়া হয়েছে মুনাফিকীর সাথে। মহানবী বলেছেন,
أَرْبَعُ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقاً خَالِصاً ، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النَّفَاقِ حَتَّى يَدَعَها : إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ
"চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকবে সে খাঁটি মুনাফিকু গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তির মাঝে তার মধ্য হতে একটি স্বভাব থাকবে, তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকদের একটি স্বভাব থেকে যাবে। (সে স্বভাবগুলি হল,) ১। তার কাছে আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে। ২। কথা বললে মিথ্যা বলে। ৩। ওয়াদাহ করলে তা ভঙ্গ করে এবং ৪। ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল ভাষা বলে।"৭৫

টিকাঃ
৬৩. বুখারী ২৪৭৫, মুসলিম ২১১, আসহাবে সুনান
৬৪. সূরা নাহল: ১০৫
৬৫. তিরমিযী ২০১৯
৬৬. মুসলিম ১৮০
৬৭. বুখারীর আদাব ১১২, তাবারানী ১২৫৭৩, হাকেম, বাইহাকী ২০১৬০, সহীহুল জামে ৫৩৮২
৬৮. বুখারী ৬০১৬, মুসলিম ১৮১
৬৯. সূরা তাওবাহ: ১১৯
৭০. হাকেম ৫৮, মিশকাত ৫০৯৪, সহীহুল জামে ১৬০৩
৭১. আহমাদ ১২৫. সহীহ তারগীব ১৬৭
৭২. বুখারী ৬১৩৮
৭৩. বুখারী ১০৮৮, মুসলিম ৩৩৩১-৩৩৩২
৭৪. বুখারী ১২৮২, ৫৩৩৪, মুসলিম ৩৭৯৮-৩৭৯৯
৭৫. বুখারী ৩৪, ২৪৫۹, মুসলিম ২১৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00