📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 সচ্চরিত্রতার মাহাত্ম্য

📄 সচ্চরিত্রতার মাহাত্ম্য


মানব জীবনে সুন্দর চরিত্রের অতি গুরুত্ব রয়েছে। শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে সচ্চরিত্রতার গুরুত্ব অনেক। তাই শরীয়ত আমাদেরকে সুন্দর চরিত্র গঠন করতে আদেশ ও উদ্বুদ্ধ করে। মহানবী বলেছেন,
اِتَّقِ اللهَ حَيْثُمَا كُنْتَ وَاَتْبِعُ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا وَخَالِقَ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ
"তুমি যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় কর, পাপ করলে সাথে সাথে পুণ্যও কর; যাতে পাপ মোচন হয়ে যায় এবং মানুষের সাথে সুন্দর ব্যবহার কর।”১৩
সুন্দর চরিত্র পুরুষের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সাজসজ্জা, মহিলার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ অলংকার ও প্রসাধন। সচ্চরিত্রতা সুদর্শন পুরুষকে আরো বেশি সুদর্শন ক'রে তোলে এবং সুন্দরী-রূপসীর সৌন্দর্য ও রূপ আরো বৃদ্ধি করে। সচ্চরিত্রতার মতো সুন্দর অলংকার ও প্রসাধন আর কিছু নেই এ দুনিয়াতে। মহানবী বলেছেন,
عَلَيْكَ بِحُسْنِ الْخُلُقِ وَطُولِ الصَّمْتِ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا تَجْمُلُ الْخَلَائِقُ بِمِثْلِهِمَا
"তুমি সুন্দর চরিত্র ও দীর্ঘ নীরবতা অবলম্বন কর। সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে, সারা সৃষ্টি উক্ত দুই (অলংকারের) মত অন্য কিছু দিয়ে সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে পারে না।"১৪
সুন্দর চরিত্র মহান স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ দান, সবচেয়ে মূল্যবান উপহার। মানুষ হিসাবে মানুষ এর চাইতে বড় কিছু উপহার পায়নি। উসামাহ বিন শারীক বলেন, লোকেরা রাসূলুল্লাহ কে জিজ্ঞাসা করল, 'হে আল্লাহর রসূল! মানুষকে দেওয়া দানসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দান কী দেওয়া হয়েছে?' উত্তরে তিনি বললেন, "সুন্দর চরিত্র।"১৫
সুন্দর চরিত্রের নারী-পুরুষের বংশ হল সবার চাইতে উচ্চ। সচ্চরিত্রতা হল শ্রেষ্ঠ কৌলীন্য। এর চাইতে বড় কুলমর্যাদা কোন বংশে হতে পারে না। উচ্চ বংশের মানুষের যদি চরিত্রই না থাকে, তাহলে তার বংশ কোন কাজে লাগবে? এই জন্য মহানবী বলেছেন,
أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ، وأفضلكم حَسَباً أحسنكم خُلُقا
"আল্লাহর নিকট সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি সে, যে সবচেয়ে বেশী পরহেযগার। আর সবচেয়ে উচ্চ বংশীয় লোক সে, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।"১৬
আলী হাসান কে লক্ষ্য ক'রে বলেছেন, 'সবচেয়ে বড় ধনবত্তা হল জ্ঞান, সবচেয়ে নিম্ন মানের দীনতা হল মূর্খতা, সবচেয়ে বড় বাতুলতা হল গর্ব এবং সবচেয়ে বড় বংশ হল সুন্দর চরিত্র।'
সচ্চরিত্রতা ও সুন্দর চরিত্রের নারী-পুরুষ মহান প্রতিপালকের নিকট বেশি পছন্দনীয়। মহান আল্লাহ সৌন্দর্য ভালোবাসেন, বান্দার দেহে সুন্দর পোশাক ভালোবাসেন, ভালোবাসেন তার চারিত্রিক সৌন্দর্য। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ، وَيُحِبُّ مَعَالِيَ الْأُمُورِ، وَيَكْرَهُ سَفْسَافَهَا»
"নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। তিনি সুউচ্চ চরিত্রকে ভালোবাসেন এবং ঘৃণা করেন নোংরা চরিত্রকে।”১৭
যার চরিত্র সুন্দর, তাকে মহান আল্লাহ সবার চাইতে বেশি ভালোবাসেন। এ কথার সাক্ষ্য দিয়ে রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
أَحَبُّ عِبَادِ اللَّهِ إِلَى اللَّهِ أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا
"আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম বান্দা হল সেই, যার চরিত্র সুন্দর।"১৮
সুন্দর চরিত্রের অধিকারী নারী-পুরুষ সকল মানুষের কাছেই বরণীয় আদরণীয়। কে না ভালোবাসে তাদেরকে? চরিত্রবানরা সেরা মানব মহানবী এর নিকটও বেশি পছন্দনীয়। তিনি বলেছেন,
إِنَّ أَحَبَّكُمْ إِلَيَّ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلاقًا، الْمُوَطَّئُونَ أَكْنَافًا، الَّذِينَ يَأْلَفُونَ وَيُؤْلَفُونَ ، وَإِنَّ أَبْغَضَكُمْ إِلَيَّ الْمَشَّاءُونَ بِالنَّمِيمَةِ ، الْمُفَرِّقُونَ بَيْنَ الأَحِبَّةِ ، الْمُلْتَمِسُونَ لِلْبُرَاءِ الْعَنَتَ الْعَيْبَ
"আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি তারা, তোমাদের মধ্যে যাদের চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর। যারা অমায়িক (সহজ-সরল), যারা সম্প্রীতির বন্ধনে সহজে আবদ্ধ হয়। আর তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে অপ্রিয় ব্যক্তি তারা, যারা চুগলখোরি করে, বন্ধুদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা ঘটায় এবং নির্দোষ লোকেদের মাঝে দোষ খুঁজে বেড়ায়।"১৯
চরিত্রবানেরা দুনিয়াতে তাদের প্রিয় নবী এর বেশি ভালোবাসার পাত্র, কিয়ামতেও তারাই তাঁর বেশি নিকটবর্তী জায়গায় স্থানলাভ করবে। তিনি বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَحَبِّكُمْ إِليَّ ، وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِساً يَوْمَ القِيَامَةِ ، أَحَاسِنَكُم أَخْلَاقاً ، وَإِنَّ أَبْغَضَكُمْ إِلَيَّ وَأَبْعَدَكُمْ مِنِّي يَوْمَ القِيَامَةِ الثَّرْثَارُونَ وَالمُتَشَدِّقُونَ وَالمُتَفَيْهِقُونَ
"তোমাদের মধ্যে আমার প্রিয়তম এবং কিয়ামতের দিন অবস্থানে আমার নিকটতম ব্যক্তিদের কিছু সেই লোক হবে যারা তোমাদের মধ্যে চরিত্রে শ্রেষ্ঠতম। আর তোমাদের মধ্যে আমার নিকট ঘৃণ্যতম এবং কিয়ামতের দিন অবস্থানে আমার নিকট থেকে দূরতম হবে তারা; যারা অনর্থক অত্যাধিক আবোল-তাবোল বলে ও বাজে বকে এমন বাচাল ও বখাটে লোক; যারা আলস্যভরে বা কায়দা করে টেনে-টেনে কথা বলে। আর অনুরূপ অহংকারীরাও।”২০
তিনি আরো বলেছেন,
إِنَّ أَحَبَّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبَكُمْ مِنِّي فِي الْآخِرَةِ مَحَاسِنُكُمْ أَخْلَاقًا وَإِنَّ أَبْغَضَكُمْ إِلَيَّ وَأَبْعَدَكُمْ مِنِّي فِي الْآخِرَةِ مَسَاوِيكُمْ أَخْلَاقًا الثَّرْثَارُونَ الْمُتَفَيْهِقُونَ الْمُتَشَدِّقُونَ
"কিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে আমার প্রিয়তম এবং অবস্থানে আমার নিকটতম ব্যক্তি সেই সব লোক হবে, যারা তোমাদের মধ্যে চরিত্রে শ্রেষ্ঠতম। আর তোমাদের মধ্যে আমার নিকট ঘৃণ্যতম এবং অবস্থানে আমার থেকে দূরতম হবে তারা; যারা অনর্থক অত্যধিক আবোল-তাবোল বলে ও বাজে বকে এমন বখাটে লোক; যারা গর্বভরে এবং আলস্যভরে বা কায়দা করে টেনে-টেনে কথা বলে।”২১
সাধারণ লোকেদের ভিতরে যারা চরিত্রে সুন্দর, তারাই সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। আব্দুল্লাহ বিন আম্র (রাঃ) বলেন, একদা মহানবী (স.) কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ লোক কে?' উত্তরে তিনি বললেন,
كُلُّ مَحْمُومِ الْقَلْبِ صَدُوقِ اللَّسَانِ
"সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ লোক হল সেই, যার হৃদয় হল পরিষ্কার এবং জিভ হল সত্যবাদী।"
জিজ্ঞাসা করা হল, 'পরিষ্কার হৃদয়ের অর্থ কী?' বললেন,
هُوَ التَّقِيُّ النَّقِيُّ لَا إِثْمَ فِيهِ وَلَا بَغْيَ وَلَا غِلَّ وَلَا حَسَدَ
"যে হৃদয় সংযমশীল, নির্মল, যাতে কোন পাপ নেই, অন্যায় নেই, ঈর্ষা ও হিংসা নেই।"
জিজ্ঞাসা করা হল, 'তারপর কে?' বললেন,
الَّذِي يشنأ الدُّنْيَا وَيُحِبُّ الْآخِرَةَ»
"যে দুনিয়াকে ঘৃণা করে এবং আখেরাতকে ভালোবাসে।"
জিজ্ঞাসা করা হল, 'তারপর কে?' বললেন,
مُؤْمِنٌ فِي خُلُقٍ حَسَنٍ»
"সুন্দর চরিত্রের মুমিন।”২২
লক্ষণীয় যে, "যার হৃদয় হল পরিষ্কার এবং জিভ হল সত্যবাদী" সে একজন মহান চরিত্রের অধিকারী। অতএব শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা তার অবশ্যই প্রাপ্য।
আব্দুল্লাহ ইবনে আম্র ইবনে আ'স বলেন, আল্লাহর রসূল (প্রকৃতিগতভাবে কথা ও কাজে) অশ্লীল ছিলেন না এবং (ইচ্ছাকৃতভাবেও) অশ্লীল ছিলেন না। আর তিনি বলতেন,
إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمْ أَحْسَنَكُمْ أَخْلَاقاً
"তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তোমাদের মধ্যে সুন্দরতম চরিত্রের অধিকারী। "২৩
সর্বশ্রেষ্ঠ মানব ছিলেন সর্বোচ্চ মানের চরিত্রের অধিকারী। যেহেতু তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন। আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
"তুমি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।"২৪
তাঁর খাদেম আনাস বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সব মানুষের চাইতে বেশি সুন্দর চরিত্রের ছিলেন। '২৫
সচ্চরিত্রতা মানেই পুণ্য, আর পুণ্যই হল সচ্চরিত্রতা। নাওয়াস ইবনে সামআন বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে পুণ্য ও পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, উত্তরে তিনি বললেন,
البر : حسن الخلق ، والإثمُ : مَا حَاكَ فِي صَدْرِكَ ، وَكَرِهْتَ أَن يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ
"পুণ্য হল সচ্চরিত্রতার নাম। আর পাপ হল তাই, যা তোমার অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করে এবং তা লোকে জেনে ফেলুক, এ কথা তুমি অপছন্দ কর।”২৬
অনেকে ঈমানদার বা মু'মিন হয়, কিন্তু পরিপূর্ণ ঈমানদার বা মু'মিন সবাই হতে পারে না। চরিত্রবান মানুষই সবার চাইতে বেশি পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী। মহানবী বলেছেন,
أَكْمَلُ المُؤمِنِينَ إِيمَاناً أَحْسَنُهُمْ خُلُقاً، وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ
"মু'মিনদের মধ্যে সে ব্যক্তি পূর্ণ মু'মিন, যে তাদের মধ্যে চরিত্রের দিক দিয়ে সুন্দরতম। আর তোমাদের উত্তম ব্যক্তি তারা, যারা তাদের স্ত্রীদের নিকট উত্তম। "২৭
তিনি আরো বলেছেন,
أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيْمَانًا أَحَاسِنُهُمْ أَخْلاقًا ، الْمُوَطَّئُونَ أَكْنَافًا ، الَّذِينَ يَأْلَفُوْنَ وَيُؤْلَفُوْنَ ، وَلَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يَأْلَفُ وَلَا يُؤْلَفُ
“সবার চেয়ে পূর্ণ ঈমানদার ব্যক্তি সে, যার চরিত্র সবার চেয়ে সুন্দর, সহজ- সরল। যারা অপরকে প্রীতির বাঁধনে জড়াতে পারে এবং নিজেরাও অপরের প্রীতির বাঁধনে জড়িত হয়। আর সেই ব্যক্তির মাঝে কোন মঙ্গল নেই, যে প্রীতির বাঁধনে কাউকে বাঁধতে পারে না এবং নিজেকেও অপরের প্রীতির বাঁধনে আনে না।”২৮
সুন্দর চরিত্র কেবল মু’মিনেরই বৈশিষ্ট্য। অন্যের মাঝে কোন সচ্চরিত্রতা থাকলে আংশিকভাবে থাকতে পারে। মুনাফিকের মাঝে সচ্চরিত্রতা এবং দ্বীনের জ্ঞান বিদ্যমান থাকে না। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
خَصْلَتَانِ لَا تَجْتَمِعَانِ فِي مُنَافِقٍ : حُسْنُ سَمْتٍ ، وَلَا فِقْهُ فِي الدِّينِ
“দু’টি স্বভাব কোন মুনাফিকের ভিতরে জমা হতে পারে না; না সুন্দর চরিত্র, আর না দ্বীনী জ্ঞান।”২৯
চরিত্রবান মুসলিম নর-নারী সচ্চরিত্রতার মাধ্যমে নফল স্বালাত-সিয়ামের সওয়াব লাভ করতে পারে। নবী বলেছেন,
إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَيُدْرِكُ بِحُسْنِ خُلُقِهِ دَرَجَةَ الصَّائِمِ القَائِمِ
“অবশ্যই মু’মিন তার সদাচারিতার কারণে দিনে (নফল) সিয়াম পালনকারী এবং রাতে (নফল) ইবাদতকারীর মর্যাদা পেয়ে থাকে।”৩০
কিয়ামতের মীযানে বান্দার পাপ-পুণ্য ওজন হবে। দাঁড়িপাল্লায় সবচেয়ে বেশি ভারি হবে সচ্চরিত্রতা। মহানবী বলেছেন,
مَا مِنْ شَيْءٍ أَثْقَلُ فِي مِيْزَانِ العَبْدِ المُؤْمِنِ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ حُسْنِ الْخُلُقِ، وَإِنَّ الله يُبْغِضُ الفَاحِشَ البَنِيَّ
“কিয়ামতের দিন (নেকী) ওজন করার দাঁড়ি-পাল্লায় সচ্চরিত্রতার চেয়ে কোন বস্তুই অধিক ভারী হবে না। আর আল্লাহ তাআলা অশ্লীল ও চোয়াড়কে অপছন্দ করেন।”৩১
সচ্চরিত্রতা হল বেহেস্ত যাওয়ার অসীলা। সুন্দর আচার-ব্যবহার এমন আমল, যা জান্নাতে যেতে অন্যান্য আমলের তুলনায় বেশি কাজে দেবে। আবু হুরাইরা বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞাসা করা হল যে, 'কোন্ আমল মানুষকে বেশি জান্নাতে নিয়ে যাবে?' তিনি বললেন,
تَقْوَى اللَّهِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ
"আল্লাহভীতি ও সচ্চরিত্র।"
আর তাঁকে (এটাও) জিজ্ঞাসা করা হল যে, 'কোন্ আমল মানুষকে বেশি জাহান্নামে নিয়ে যাবে?' তিনি বললেন,
الفَمُ وَالْفَرْجُ
"মুখ ও যৌনাঙ্গ (অর্থাৎ, উভয় দ্বারা সংঘটিত পাপ)।"৩২
চরিত্রবান নরনারীর জন্য সুউচ্চ বেহেস্তের নিশ্চয়তা দিয়েছেন বেহেস্তের সর্দার রাসূলুল্লাহ ﷺ। তিনি বলেছেন,
أَنَا زَعِيمٌ بِبَيْتٍ فِي رَبَضِ الجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ المِرَاءَ وَإِنْ كَانَ مُحِقَّاً ، وَبِبَيْتٍ فِي وَسَطِ الجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ الكَذِبَ وَإِنْ كَانَ مَازِحاً ، وَبِبَيْتٍ في أَعلَى الْجَنَّةِ لِمَنْ حَسُنَ خُلُقُهُ
"আমি সেই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের শেষ সীমায় একটি ঘর দেওয়ার জন্য জামিন হচ্ছি, যে সত্যাশ্রয়ী হওয়া সত্ত্বেও কলহ-বিবাদ বর্জন করে। সেই ব্যক্তির জন্য আমি জান্নাতের মধ্যস্থলে একটি ঘরের জামিন হচ্ছি, যে উপহাসছলেও মিথ্যা বলা বর্জন করে। আর সেই ব্যক্তির জন্য আমি জান্নাতের সবচেয়ে উঁচু জায়গায় একটি ঘরের জামিন হচ্ছি, যার চরিত্র সুন্দর।"৩৩
ধন-মাল দিয়ে সকল মানুষের মন সন্তুষ্ট করতে পারা সম্ভব নয়, কুলাতেও পারবে না কেউ। কিন্তু সুন্দর চরিত্র দ্বারা তা পারা যায়।
মানুষের তিরোধানের পরে তার চর্চা অবশিষ্ট থেকে যায়, মানুষের উচিত, তার চর্চাকে ভালো করে গড়ে তোলা।
মৃত্যুর পরে যার জন্য মানুষ মানুষের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকে, তা হচ্ছে তার অমায়িক ব্যবহার।
পরিচিত অনেকে হতে পারে, কিন্তু সুপরিচিত হতে অতিরিক্ত গুণের দরকার, সুন্দর চরিত্রের দরকার।
মানুষের ভদ্রতাই তার ব্যবহারকে সুন্দর করে। আর তার সুন্দর ব্যবহারই তাকে প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে তোলে। অতএব সুন্দর চরিত্র মানব-জীবনের দামী অলঙ্কার ও অমূল্য সম্পত্তি।
যদি কেউ প্রশ্ন করে, 'ইসলামের সবচেয়ে সুন্দর দর্শন কী?' তাহলে তার উত্তরে বলা যায় যে, 'সচ্চরিত্রতা।'
যদি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দার্শনিককে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, 'এক কথায় বিশ্বমানবতার চিকিৎসা কী?' তাহলে তার উত্তরে তিনি অবশ্যই বলবেন যে, 'সচ্চরিত্রতা।'
যদি ইউরোপের সমস্ত বিদ্বানগণ সমবেত হয়ে ইউরোপীয় সভ্যতার ব্যাপারে অধ্যয়ন করেন, অতঃপর তার ফলস্বরূপ যেটা তাঁরা পেতে চান, সেটা হল 'সচ্চরিত্রতা।'
ইসলামে সচ্চরিত্রতার বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব পৃথক ও অধিক বেশি। অন্য ধর্ম ও জাতির মানুষের মাঝেও সচ্চরিত্রতার গুরুত্ব আছে। ইংরেজিতে বলা হয়, 'মনি লস ইজ নাথিং লস, হেল্থ লস ইজ সামথিং লস, বাট কারেকটর লস ইজ এভরিথিং লস।'
বাংলাতে বলা হয়, 'যদি ধন নাশ হয়, তায় কিবা আসে যায়, যদি স্বাস্থ্য নাশ হয়, তবে কিছু হয় ক্ষয়, হইলে চরিত্র নাশ সর্বনাশ হয়।'
খাওয়ারিযমী বলেছেন, 'মানুষের মাঝে চরিত্র থাকলে সে ১ নম্বর থাকে। অতঃপর তার মধ্যে রূপ থাকলে তার পাশে একটি শূন্য যোগ হয়ে ১০ হয়। অতঃপর তার ধনবত্তা থাকলে আরো একটি শূন্য যোগ হয়ে ১০০ হয়। অতঃপর তার কৌলীন্য থাকলে আরো একটি শূন্য যোগ হয়ে ১০০০ হয়। কিন্তু ১ সংখ্যাটি অর্থাৎ চরিত্র বাদ পড়লে মানুষের মূল্য চলে যায় এবং পাশের শূন্যগুলি অকেজো হয়ে অবশিষ্ট থাকে।'
কবি বলেছেন, 'গুণহীন চিরদিন পরাধীন রয়, নাহি সুখ ম্লানমুখ চিরদুখ সয়। গুণবান্ মতিমান্ ধনবান্ হয়, নাহি দুখ হাস্যমুখ সদা সুখময়।'
আরবী কবি বলেছেন,
وإنما الأمم الأخلاق ما بقيت فإن هم ذهبت أخلاقهم ذهبوا
অর্থাৎ, জাতি ততক্ষণ পর্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে, যতক্ষণ তার চরিত্র থাকে। জাতির চরিত্র গেলে সবাই ধ্বংস হয়ে যায়।

টিকাঃ
১৩. আহমাদ ২১১৫৪, তিরমিযী ১৯৮৭, হাকেম ১৭৮, সহীহুল জামে ৯৭
১৪. আবু য়‍্যা'লা ৩২৯৮, সহীহুল জামে ৪০৪৮
১৫. আহমাদ ১৮৪৫৪, ইবনে হিব্বান ৬০৬১, হাকেম ৪১৬, বাইহাক্বী ২০০৪৩, সঃ তারগীব ২৬৫২
১৬. আল-আদাবুল মুফরাদ ৮৯৯
১৭. ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৬৯০৬, সহীহুল জামে ১৭৪৩
১৮. ত্বাবারানী ৪৭৩, সহীহুল জামে ১৭৯
১৯. তাবারানী ৪৩৫
২০. তিরমিযী ২০১৮
২১. আহমাদ ১৭৭৩২, ইবনে হিব্বান, তাবারানীর কাবীর, বাইহাকীর শুআবুল ঈমান, সিলসিলাহ সহীহাহ ৭৯১
২২. ইবনে মাজাহ ৪২১৬, সহীহুল জামে ৩২৯১
২৩. বুখারী ৩৫৫৯, ৩৭৫৯, মুসলিম ৬১৭৭
২৪. ক্বালাম:৪
২৫. বুখারী ৬২০৩, মুসলিম ৫৭৪৭
২৬. মুসলিম ৬৬৮০
২৭. তিরমিযী ১১৬২
২৮. ত্বাবারানী ৬০৫, সিঃ সহীহাহ ৭৫১
২৯. তিরমিযী ২৬৮৪, সহীহুল জামে’ ৩২২৯
৩০. আবু দাউদ ৪৮০০
৩১. তিরমিযী ২০০৩, ইবনে হিব্বান ৫৬৬৪, আবু দাউদ ৪৭৯৯, সিলসিলাহ সহীহাহ ৮৭৬
৩২. তিরমিযী ২০০৪, ইবনে হিব্বান ৪৭৬, বুখারীর আদব ২৮৯ ও ২৯৪, ইবনে মাজাহ ৪২৪৬, আহমাদ ২/৩৯২, হাকেম ৪/২৩৪
৩৩. আবু দাউদ ৪৮০২, তিরমিযী ১৯৯৩, ইবনে মাজাহ ৫১, বাইহাকী, সহীহ তারগীব ১৩৩

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 প্রকৃতি ও চরিত্র

📄 প্রকৃতি ও চরিত্র


সৃষ্টিগতভাবে মানুষের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। শৈশব থেকেই তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে মানুষের আচার-আচরণে ও চাল-চলনে। ধীরে ধীরে তা মানুষের মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত হয়। চরিত্র হয়ে যায় তার সকল কর্মকাণ্ড। তার মধ্যে কিছু হয় প্রকৃতিগতভাবেই স্বভাবজাত। আর কিছু হয় প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে। এই জন্য মানুষের চরিত্রকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
প্রকৃতিগত চরিত্র এবং পরিশীলিত চরিত্র।
১। প্রকৃতিগত চরিত্র
সৃষ্টিগতভাবে যেমন মানুষের বুদ্ধিমত্তার তারতম্য আছে, দৈহিক অঙ্গ গঠনে পার্থক্য আছে, তেমনি প্রকৃতিগত স্বভাবও। বহু গুণাগুণ আছে, যা মানুষের প্রকৃতিতে প্রক্ষিপ্ত আছে। যা অর্জন করার জন্য কোন অনুশীলন করতে হয় না। যেমন ঠাণ্ডা মেজাজ, মিনমিনে স্বভাব অথবা তার বিপরীত। এই শ্রেণীর গুণাবলী মানুষকে তৈরি করতে হয় না। মহান স্রষ্টার সৃষ্টিগত প্রকৃতিতেই তা নিহিত আছে। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ خَلَقَ آدَمَ مِنْ قَبْضَةٍ قَبَضَهَا مِنْ جَمِيعِ الْأَرْضِ فَجَاءَ بَنُو آدَمَ عَلَى قَدْرِ الْأَرْضِ جَاءَ مِنْهُمُ الْأَبْيَضُ وَالْأَحْمَرُ وَالْأَسْوَدُ وَبَيْنَ ذَلِكَ وَالْخَبِيتُ وَالطَّيِّبُ وَالسَّهْلُ وَالْحَزْنُ وَبَيْنَ ذَلِكَ
"নিশ্চয় আল্লাহ আয্যা অজাল্ল আদমকে সৃষ্টি করেছেন এক মুষ্টি মাটি থেকে, যা তিনি সারা পৃথিবী থেকে গ্রহণ করেছেন। তাই আদম সন্তান মাটি অনুসারে বিকাশ লাভ করেছে। তাদের কেউ রক্তিমবর্ণ, কেউ গৌরবর্ণ, কেউ কৃষ্ণবর্ণ, আবার কেউ এ সবের মাঝামাঝি। কেউ সহজ-সরল, কেউ দুর্দম-কঠিন, কেউ নোংরা চরিত্রের, কেউ সুন্দর চরিত্রের এবং কেউ এ সবের মাঝামাঝি।"৩৪
আবু হুরাইরাহ বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ কে প্রশ্ন করা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি কে?' তিনি বললেন, "তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে আল্লাহ-ভীরু।” অতঃপর তাঁরা (সাহাবীরা) বললেন, 'এ ব্যাপারে আমরা আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি না।' তিনি বললেন, "তাহলে ইউসুফ (সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি), যিনি স্বয়ং আল্লাহর নবী, তাঁর পিতা নবী, পিতামহও নবী এবং প্রপিতামহও নবী ও আল্লাহর বন্ধু।” তাঁরা বললেন, 'এটাও আমাদের প্রশ্ন নয়।' তিনি বললেন,
فَعَنْ مَّعَادِنِ العَرَبِ تَسْأَلُونِي؟ خِيَارُهُمْ فِي الجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِي الإِسْلامِ إِذَا فَقُهُوا
"তাহলে তোমরা কি আমাকে আরবের বংশাবলী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছ? (তবে শোনো!) তাদের মধ্যে যারা জাহেলী যুগে ভাল, তারা ইসলামেও ভাল; যদি দ্বীনী জ্ঞান রাখে।"৩৫
তিনি আরো বলেছেন,
النَّاسُ مَعَادِنٌ كَمَعَادِنِ الذَّهَبِ وَالفِضَّةِ ، خِيَارُهُمْ فِي الجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِي الإسْلامِ إِذَا فَقُهُوا ، وَالأَرْوَاحُ جُنُودٌ مُجَنَّدَةٌ ، فَمَا تَعَارَفَ مِنْهَا ائْتَلَفَ ، وَمَا تَنَاكَرَ مِنْهَا اخْتَلَفَ
"সোনা-রূপার খনিরাজির মত মানব জাতিও নানা গোত্রের খনিরাজি। যারা জাহেলী যুগে উত্তম ছিল, তারা ইসলামী যুগেও উত্তম; যখন তারা দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে। আর আত্মাসমূহ সমবেত সৈন্যদলের মত। সুতরাং আপোসে যে আত্মাদল পরিচিত ও অভিন্ন প্রকৃতির হয়, সে আত্মাদলের মাঝে মিলন ও বন্ধুত্ব স্থাপিত হয়ে থাকে এবং যে আত্মাদল আপোসে অপরিচিত ও ভিন্ন প্রকৃতির হয়, সে আত্মাদলের মাঝে বিচ্ছিন্নতা ও অনৈক্য প্রকট হয়ে ওঠে।”৩৬
লক্ষণীয় যে, মানুষ এক প্রকৃতির নয়। যত মানুষ, তত রকমের মন আছে। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে মনে-মনে মিল থাকে। আর যার প্রকৃতি ভালো, সে সকল পরিবেশে ভালো। যে ইসলামের পূর্বে জাহেলী যুগে ভালো ছিল, সে ইসলামের পরেও ভালো। প্রকৃতিগত সদাচরণ ও কদাচরণ মুসলিম-অমুসলিম সকলের মাঝে বিদ্যমান থাকে।
প্রকৃতিগত আচরণ প্রদর্শন করার প্রয়োজন হয় না। তা প্রদর্শন করতে কোন প্রকার চেষ্টা বা কষ্টের দরকার হয় না। মানুষ না চাইলেও সময়ে স্বাভাবিকভাবে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। রাসূলুল্লাহ আশাজ্ আব্দুল কায়েসকে বলেছিলেন,
إِنَّ فِيكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ : الْحِلْمُ وَالأَنَاةُ
"নিশ্চয় তোমার মধ্যে এমন দু'টি স্বভাব রয়েছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন; সহনশীলতা ও চিন্তা-ভাবনা ক'রে কাজ করা। "৩৭
নিম্নের একটি হাদীস থেকেও প্রকৃতিগত চরিত্রের কথা স্পষ্ট হয়। আমানতদারী মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রক্ষিপ্ত করা হয়। আর মানুষের মৌলিক চরিত্র এটাই যে, সে আমানতদার হবে।
হুযাইফাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ আমাদের নিকট দু'টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। একটি তো আমি প্রত্যক্ষ করেছি এবং দ্বিতীয়টির জন্য অপেক্ষায় রয়েছি। তিনি আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, আমানত মানুষের অন্তরের অন্তস্তলে অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর তারা কুরআন থেকে জ্ঞানার্জন করেছে। তারপর তারা নবীর হাদীস থেকেও জ্ঞানার্জন করেছে। এরপর আমাদেরকে আমানত তুলে নেওয়া সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, “মানুষ এক ঘুম ঘুমানোর পর তার অন্তর থেকে আমানত তুলে নেওয়া হবে। তখন একটি বিন্দুর মত তার চিহ্ন অবশিষ্ট থাকবে। পুনরায় মানুষ এক ঘুম ঘুমাবে। আবারো তার অন্তর থেকে আমানত উঠিয়ে নেওয়া হবে। তখন জ্বলন্ত আগুন গড়িয়ে তোমার পায়ে পড়লে যেমন একটা ফোস্কা পড়ে কালো দাগ দেখতে পাওয়া যায় তার মত চিহ্ন থাকবে। তুমি তাকে ফোলা দেখবে; কিন্তু বাস্তবে তাতে কিছুই থাকবে না।” অতঃপর (উদাহরণ স্বরূপ) তিনি একটি কাঁকর নিয়ে নিজ পায়ে গড়িয়ে দিলেন। (তারপর বলতে লাগলেন,) “সে সময় লোকেরা বেচা-কেনা করবে কিন্তু প্রায় কেউই আমানত আদায় করবে না। এমনকি লোকে বলাবলি করবে যে, অমুক বংশে একজন আমানতদার লোক আছে। এমনকি (দুনিয়াদার) ব্যক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করা হবে, সে কতই না অদম্য! সে কতই না বিচক্ষণ! সে কতই না বুদ্ধিমান! অথচ তার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমানও থাকবে না।” (হুযাইফা বলেন,) ইতিপূর্বে আমার উপর এমন যুগ অতিবাহিত হয়ে গেছে, যখন কারো সাথে বেচাকেনা করতে কোন পরোয়া করতাম না। কারণ সে মুসলিম হলে তার দ্বীন তাকে আমার (খিয়ানত থেকে) বিরত রাখবে। আর খ্রিষ্টান অথবা ইয়াহুদী হলে তার শাসকই আমার হক ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু বর্তমানের অবস্থা হচ্ছে এই যে, আমি অমুক অমুক ছাড়া বেচা-কেনা করতে প্রস্তুত নই।৩৮
নবুয়ত প্রাপ্তির প্রাক্কালে মহানবী এর বহু গুণ ছিল প্রকৃতিগত সুচরিত্র। সে কথার সাক্ষ্য দিয়েছেন মা খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)। জিবরীলকে দেখে হিরা গুহা থেকে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে যখন মহানবী তাঁর কাছে ফিরে এসে বৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন, তখন তিনি তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন,
كَلَّا أَبْشِرُ فَوَاللَّهِ لاَ يُخْزِيكَ اللهُ أَبَدًا، وَاللهِ إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ وَتَصْدُقُ الْحَدِيثَ وَتَحْمِلُ الْكَلَّ وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ وَتَقْرِى الضَّيْفَ وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ
অর্থাৎ, কক্ষনো না। আপনি সুসংবাদ নিন। আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে কখনই লাঞ্ছিত করবেন না। আল্লাহর কসম! আপনি তো আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখেন, সত্য কথা বলেন, (অপরের) বোঝা বইয়ে দেন, নিঃস্বকে দান করেন, মেহমানের খাতির করেন এবং বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করেন।৩৯
আবূ বাক্ সিদ্দীক ইসলামের পূর্বে জাহেলী যুগে মদ পান করেননি, এটা ছিল তাঁর প্রকৃতিগত চরিত্র। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَى أَن لَّا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانٍ يَفْتَرِينَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفٍ فَبَايِعُهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"হে নবী! বিশ্বাসী নারীরা যখন তোমার নিকট এসে বায়আত করে এই মর্মে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোন শরীক স্থির করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তান-সন্ততিদের হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোন অপবাদ রচনা ক'রে রটাবে না এবং সৎকার্যে তোমাকে অমান্য করবে না, তখন তাদের বায়আত গ্রহণ কর এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"৪০
উক্ত নির্দেশের প্রেক্ষিতে একদল নারীর বায়আত গ্রহণ কালে মহানবী বলেছিলেন, "তোমরা আমার কাছে এ মর্মে বায়আত করো যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শির্ক করবে না----ব্যভিচার করবে না।" তখন হিন্দ বিন্তে উতবাহ বলেছিলেন, 'স্বাধীন মেয়েও কি ব্যভিচার করে?'
অবাক হয়ে এ প্রশ্নের মানে হল, তাঁর প্রকৃতিগত সুচরিত্রে ছিল যে, একজন স্বাধীনা মহিলা ব্যভিচার করতে পারে না। সেই নোংরা জাহেলী যুগেও না। ব্যভিচার করতে পারে দাসীরা।
>২। পরিশীলিত চরিত্র
বহু শিষ্টাচার ও আচরণ এমন আছে, যা পরিশীলন ও অনুশীলনের মাধ্যমে রপ্ত করা যায়। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষের আচরণকে পরিবর্তিত ও বিশুদ্ধ করা যায়। আর সেই মর্মেই শরীয়তের প্রায় সকল নির্দেশ এসেছে মানুষকে 'মানুষ' রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে। মহানবী বলেছেন,
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ (مكارم) الْأَخْلَاقِ
"আমি মানুষের শ্রেষ্ঠ ও সুন্দর চরিত্রের পরিপূর্ণতা দানের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।"৪১

টিকাঃ
৩৪. আহমাদ ১৯৫৮২, আবু দাউদ ৪৬৯৫, তিরমিযী ২৯৫৫
৩৫. বুখারী ৩৩৫৩, মুসলিম ৬৩১১
৩৬. মুসলিম ৬৮৭৭
৩৭. মুসলিম ১২৬
৩৮. বুখারী ৬৪৯৭, ৭০৮৬, মুসলিম ৩৮৪
৩৯. বুখারী ৩, মুসলিম ৪২২
৪০. সূরা মুমতাহিনাহঃ ১২
৪১. আহমাদ ৮৯৫২, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ ২৭৩, হাকেম ৪২২১, বাইহাক্বী ২১৩০১

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 মানুষের চরিত্রের কি পরিবর্তন হতে পারে?

📄 মানুষের চরিত্রের কি পরিবর্তন হতে পারে?


তার মানে তার অভ্যাস কি বদলাতে পারে? কৃপণ কি দানশীল হতে পারে? নির্লজ্জ কি লজ্জাশীল হতে পারে?
অনেকে ধারণা করেন, চরিত্র বদলানো যায় না। অভ্যাস পরিবর্তন করা অসম্ভব। এমন একটা হাদীসও আছে, "যদি শোন যে, কোন পাহাড় নিজ জায়গা হতে সরে গেছে, তাহলে বিশ্বাস করো। কিন্তু যদি শোন যে, কারো প্রকৃতি পাল্টে গেছে, তাহলে বিশ্বাস করো না।"৪২
প্রথমতঃ উক্ত হাদীস সহীহ নয়।
দ্বিতীয়তঃ হাদীসে প্রকৃতি বলতে যার পরিবর্তন সাধনে মানুষের কোন এখতিয়ার নেই। যেমন মহিলার প্রকৃতি, শিশুর প্রকৃতি অথবা কোন পুরুষের মাঝে সৃষ্টিগত নারী-সুলভ বা শিশুসুলভ প্রকৃতি ইত্যাদি।
পক্ষান্তরে চরিত্র পরিবর্তনে মানুষের হাত আছে। মানুষের এখতিয়ারাধীন অভ্যাস পরিবর্তন করার ক্ষমতা আছে। কোন মানুষকে তার কর্মে বাধ্য করা হয় না। পরিবেশের চাপে অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটে। অনুশীলনের কারণে চরিত্র ভালো থেকে মন্দে বা মন্দ থেকে ভালোতে বদলে যেতে পারে।
দৃঢ় সংকল্প নিয়ে চেষ্টা ও চর্চা করলে অনেক সুচরিত্রকে মানুষ নিজ জীবনে চিত্রিত করতে পারে। চরিত্র পরিবর্তন করা সম্ভব বলেই মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا - فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا - قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَاهَا - وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا
"শপথ আত্মার এবং তার সুঠাম গঠনের। অতঃপর তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। সে সফলকাম হবে, যে তাকে পরিশুদ্ধ করবে এবং সে ব্যর্থ হবে, যে তাকে কলুষিত করবে।৪৩
তিনি আরো বলেছেন,
وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى
"আর এই যে, মানুষ তাই পায়, যা সে চেষ্টা করে।" ৪৪
চরিত্র বদলানো সম্ভব বলেই, আমাদের শরীয়ত চরিত্রকে সুন্দর করতে উদ্বুদ্ধ করে। যেমন মহানবী বলেছেন,
أَنَا زَعِيمٌ بِبَيْتٍ فِي أَعْلَى الْجَنَّةِ لِمَنْ حَسَّنَ خُلُقَهُ
"আমি জান্নাতের সবার উপরে এক গৃহের জামিন তার জন্য, যে তার চরিত্রকে সুন্দর করে।৪৫
রাগী চরিত্র থেকে রাগ দূর করা সম্ভব বলেই মহানবী রাগ করতে নিষেধ করেছেন। এক ব্যক্তি নবী কে বলল, 'আপনি আমাকে কিছু অসিয়ত করুন!' তিনি বললেন, "তুমি রাগান্বিত হয়ো না।" সে ব্যক্তি এ কথাটি কয়েকবার বলল। তিনি (প্রত্যেক বারেই একই কথা) বললেন, "তুমি রাগান্বিত হয়ো না।"৪৬
অভ্যাস বদলানো অবাস্তব নয় বলেই মহানবী বলেছেন,
إِنَّمَا الْعِلْمُ بِالتَّعَلُّمِ، وَإِنَّمَا الْحِلْمُ بِالتَّحَلُّمِ، مَنْ يَتَحَرَّى الْخَيْرَ يُعْطَهُ، وَمَنْ يَتَّقِ الشَّرَّ يُوقَهُ
"শিক্ষা লাভের ফলে শিক্ষা পাওয়া যায়। সহিষ্ণুতার অভ্যাস গড়লে সহিষ্ণু হওয়া যায়। যে কল্যাণ অনুসন্ধান করবে, তাকে তা দেওয়া হবে এবং যে মন্দ থেকে বাঁচার চেষ্টা করবে, তাকে বাঁচানো হবে।"৪৭
আবু সাঈদ খুদরী) হতে বর্ণিত, কিছু আনসারী আল্লাহর রসূল এর কাছে কিছু চাইলেন। তিনি তাদেরকে দিলেন। পুনরায় তারা দাবী করল। ফলে তিনি (আবার) তাদেরকে দিলেন। এমনকি যা কিছু তাঁর কাছে ছিল তা সব নিঃশেষ হয়ে গেল। অতঃপর যখন তিনি সমস্ত জিনিস নিজ হাতে দান ক'রে দিলেন, তখন তিনি বললেন,
مَا يَكُنْ عِنْدِي مِنْ خَيْرٍ فَلَنْ ادَّخِرَهُ عَنْكُمْ ، وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَهُ اللهُ ، وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللهُ ، وَمَنْ يَتَصَبَّرُ يُصَبِّرُهُ اللهُ وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءٌ خَيْراً وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ
"আমার কাছে যা কিছু (মাল) আসে তা আমি তোমাদেরকে না দিয়ে কখনই জমা ক'রে রাখব না। (কিন্তু তোমরা একটি কথা মনে রাখবে,) যে ব্যক্তি চাওয়া থেকে পবিত্র থাকার চেষ্টা করবে, আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখবেন। আর যে ব্যক্তি (চাওয়া থেকে) অমুখাপেক্ষিতা অবলম্বন করবে, আল্লাহ তাকে অমুখাপেক্ষী করবেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করার চেষ্টা করবে আল্লাহ, তাকে ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা প্রদান করবেন। আর কোন ব্যক্তিকে এমন কোন দান দেওয়া হয়নি, যা ধৈর্য অপেক্ষা উত্তম ও বিস্তর হতে পারে।"৪৮
মহান আল্লাহ বলেছেন,
فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَةَ اللهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
"তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত রাখ। আল্লাহর সেই প্রকৃতির অনুসরণ কর; যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটিই সরল ধর্ম; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” ৪৯
এখানে আল্লাহর সৃষ্টি বা প্রকৃতি বলে ইসলাম ও তওহীদকে বুঝানো হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, আল্লাহ তাআলা মু'মিন-কাফের প্রত্যেক মানুষকে ইসলাম ও তওহীদের প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এই জন্য তওহীদ মানুষের প্রকৃতি অর্থাৎ সহজাত ও স্বভাব-ধর্ম। যেমন যে সময় আল্লাহ তাআলা মানুষের আত্মা সৃষ্টি করেন তখন বলেন, 'আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?' তার উত্তরে মানুষ বলেছিল, অবশ্যই। এ থেকেও পরিষ্কার বুঝা যায় যে, মানুষের আসল ধর্ম হল একত্ববাদ।
কিন্তু পরিবেশের চাপেও প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটতে পারে। বিভিন্ন খারাপ পরিবেশ অথবা অন্য কোন প্রতিবন্ধক অনেককে সেই প্রকৃতি (ইসলামে) প্রতিষ্ঠিত থাকতে বাধা দান করে; ফলে তারা কাফের হয়েই থাকে। যেমন নবী হাদীসে বলেছেন,
كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَحِّسَانِهِ
"প্রত্যেক শিশু (ইসলামের) প্রকৃতির উপর জন্ম নেয়। কিন্তু তার পিতা- মাতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে দেয়।"৫০
"আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই।" এর মানে এই নয় যে, প্রকৃতির পরিবর্তন হতে পারে না। বরং এর অর্থ হল, আল্লাহর সেই সৃষ্টি বা প্রকৃতিকে পরিবর্তন করো না; সঠিক তরবিয়ত দিয়ে তার লালন-পালন কর ও তাকে বড় করে তোলো। যাতে ঈমান ও তওহীদ কচি-কাঁচা শিশুদের মনে-প্রাণে বদ্ধমূল হয়ে যায়। এখানে বাক্যটি খবর স্বরূপ প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু ব্যবহার হয়েছে আজ্ঞার অর্থে। অর্থাৎ, নেতিবাচক বাক্য নিষেধাজ্ঞার অর্থে ব্যবহার হয়েছে। ('আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই' অর্থাৎ, 'আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন করো না।')৫১
চরিত্রের পরিবর্তন হয় বলেই তো আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ক'রে চাওয়া হয়,
وَاهْدِنِي لَأَحْسَنِ الْأَخْلَاقِ لَا يَهْدِي لَأَحْسَنِهَا إِلَّا أَنْتَ ، وَاصْرِفْ عَنِّي سَيِّئَهَا لَا يَصْرِفُ عَنِّي سَيِّئَهَا إِلَّا أَنْتَ
"সুন্দরতম চরিত্রের প্রতি আমাকে পথ দেখাও, যেহেতু তুমি ছাড়া অন্য কেউ সুন্দরতম চরিত্রের প্রতি পথ দেখাতে পারে না। মন্দ চরিত্রকে আমার নিকট হতে দূরে রাখ, যেহেতু তুমি ছাড়া অন্য কেউ মন্দ চরিত্রকে আমার নিকট থেকে দূর করতে পারে না।"৫২

টিকাঃ
৪২. আহমাদ
৪৩. সূরা শামস: ৭-১০
৪৪. সূরা নাজম: ৩৯
৪৫. আবু দাউদ ৪৮০২, ত্বাবারানী ৭৩৬১
৪৬. বুখারী ৬১১৬
৪৭. ত্বাবারানীর কাবীর ১৭৬৩, আওসাত্ব ২৬৬৩, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১০৭৩৯, সিঃ সহীহাহ ৩৪২
৪৮. বুখারী ১৪৬৯, ৬৪৭০, মুসলিম ২৪৭১
৪৯. সূরা রূম: ৩০
৫০. বুখারী ১৩৫৯, ৪৭৭৫, মুসলিম ৬৯২৬
৫১. আহসানুল বায়ান
৫২. মুসলিম ১৮৪৮

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 সচ্চরিত্র হল দ্বীনের আত্মা

📄 সচ্চরিত্র হল দ্বীনের আত্মা


মুসলিমের সচ্চরিত্রতা যেন গোটা দ্বীনটাই। পুরো দ্বীনদারী, আনুগত্য ও পুণ্যবত্তাই যেন সচ্চরিত্রতা। মহানবী বলেছেন,
البر : حُسْنُ الخُلُقِ، وَالإِثْمُ : مَا حَاكَ فِي نَفْسِكَ ، وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ
"পুণ্যবত্তা হল সচ্চরিত্রতার নাম এবং পাপ হল তাই, যা তোমার অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করে এবং তা লোকে জেনে ফেলুক--এ কথা তুমি অপছন্দ কর।”৫৩
আর সেই সচ্চরিত্রতার পরিপূর্ণতা সাধনের লক্ষ্যেই প্রেরিত হয়েছিলেন মহান চরিত্রের অধিকারী মহানবী। তিনি বলেছেন,
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ (مكارم) الْأَخْلَاقِ
"আমি মানুষের শ্রেষ্ঠ ও সুন্দর চরিত্রের পরিপূর্ণতা দানের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।"৫৪
সুতরাং ইসলামী সচ্চরিত্রতায় আমরা যে সকল বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল কয়েকটি বিষয়:
১। ইসলামী সচ্চরিত্রতার উৎস হল অহী, কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ। যার জন্য তা সর্ব যুগের সর্ব স্থানের সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য উপযোগী। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمْ أَحْسَنَكُمْ أَخْلاقاً
"তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তোমাদের মধ্যে সুন্দরতম চরিত্রের অধিকারী। ৫৫
২। ইসলামী সচ্চরিত্রতা হল ব্যবহারিক ও বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য। শুধু তত্ত্বই নয়, বরং বাস্তবে আমলযোগ্য। আব্দুল্লাহ বিন আম্র কে রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন,
أَرْبَعُ إِذَا كُنَّ فِيكَ فَلَا عَلَيْكَ مَا فَاتَكَ مِنَ الدُّنْيَا حِفْظُ أَمَانَةٍ وَصِدْقُ حَدِيثٍ وَحُسْنُ خَلِيقَةٍ وَعِفَّةٌ فِي طُهْرٍ
"তোমার মধ্যে চারটি জিনিস হলে দুনিয়ার আর কিছু না পেলেও তোমার বয়ে যাবে না; ১। আমানত রক্ষা করা, ২। সত্য কথা বলা, ৩। চরিত্র সুন্দর করা এবং ৪। হালাল খাদ্য খাওয়া।"৫৬
৩। ইসলামী চরিত্রের উপর উদ্বুদ্ধকারী মূল জিনিস হল, মুসলিমের মনে মহান আল্লাহর ভয়, তাঁর স্মরণ এবং তাঁর সন্তুষ্টির অনুসন্ধান।
আবূ হুরাইরা বলেন, রাসূলুল্লাহ কে জিজ্ঞাসা করা হল যে, 'কোন্ আমল মানুষকে বেশি জান্নাতে নিয়ে যাবে?' তিনি বললেন,
تَقْوَى اللَّهِ وَحُسَنُ الْخُلُقِ
"আল্লাহ-ভীতি ও সচ্চরিত্র।"৫৭
তিনি আরো বলেছেন,
إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ، وَيُحِبُّ مَعَالِيَ الْأُمُورِ، وَيَكْرَهُ سَفْسَافَهَا»
"নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। তিনি সুউচ্চ চরিত্রকে ভালোবাসেন এবং ঘৃণা করেন নোংরা চরিত্রকে।"৫৮
৪। ইসলামী চরিত্রে কেবল প্রদর্শনই যথেষ্ট নয়, বরং তাতে আন্তরকিতা ও আল্লাহর জন্য বিশুদ্ধতা আবশ্যক। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّةِ
"যাবতীয় কার্য নিয়ত বা সংকল্পের উপর নির্ভরশীল।"৫৯
৫। ইসলামী চরিত্রের বিষয়াবলী খুব যুক্তিযুক্ত ও বিবেকগ্রাহ্য। শরীয়তের প্রত্যেক আদেশ-নিষেধের পশ্চাতে একটা না একটা হিকমত আছে, যৌক্তিকতা আছে। যেমন,
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً
"তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।"৬০
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلٍ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ - إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ
"হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও স্বলাতে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না?৬১
অনুরূপ প্রত্যেক সচ্চরিত্রতার পিছনেও অবশ্যই কোন না কোন মঙ্গল আছে, হিকমত আছে। যা কারো সুস্থ বিবেক অগ্রাহ্য করে না। ৬২

টিকাঃ
৫৩. মুসলিম ৬৬৮০-৬৬৮১
৫৪. আহমাদ ৮৯৫২, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ ২৭৩, হাকেম ৪২২১, বাইহাক্বী ২১৩০১
৫৫. বুখারী ৩৫৫৯, ৩৭৫৯, মুসলিম ৬১৭৭
৫৬. আহমাদ ৬৬৫২, ত্বাবারানী, বাইহাক্বী, সিঃ সহীহাহ ৭৩৩
৫৭. তিরমিযী ২০০৪নং, ইবনে হিব্বান ৪৭৬, বুখারীর আদব ২৮৯ ও ২৯৪, ইবনে মাজাহ ৪২৪৬, আহমাদ ২/৩৯২, হাকেম ৪/২৩৪
৫৮. ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৬৯০৬, সহীহুল জামে ১৭৪৩
৫৯. বুখারী ১, মুসলিম ১৯০৭
৬০. সূরা বানী ইস্রাঈল: ৩২
৬১. সূরা মায়িদাহ: ৯০-৯১
৬২. মাকারিমুল আখলাক্ব ১২-১৩পৃ,

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00