📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 চরিত্র নিয়ে আলোচনা কেন?

📄 চরিত্র নিয়ে আলোচনা কেন?


আমরা জানি চরিত্রের ব্যাপারটা দ্বীনের মধ্যেই শামিল, তবুও পৃথকভাবে চরিত্র নিয়ে লেখা বা পড়ার কী প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব আছে?
আসলে সচ্চরিত্রতার শেখা ও জানার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনেক বেশি। যেহেতু আমরা দেখি, কোন কোন মানুষ দ্বীনদার, অথচ চরিত্রবান নয়। কোন কোন মানুষ চরিত্রবান, কিন্তু দ্বীনদার নয়। সুতরাং চরিত্র নিয়ে পড়াশোনার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব আমরা চারভাবে অনুভব করতে পারি:
০৫ এক: সচ্চরিত্রতাকে পরিপূর্ণতা দান করার জন্যই মহানবী কে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল। তিনি এই মহান উদ্দেশ্যকেই সফল করার জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। তিনি বলেছেন,
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ (مکارم) الْأَخْلَاقِ
"আমি মানুষের শ্রেষ্ঠ ও সুন্দর চরিত্রের পরিপূর্ণতা দানের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।"১ যদি বলেন, মহান আল্লাহ তো বলেছেন,
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ)
"আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি শুধু করুণা রূপেই প্রেরণ করেছি।”২ আপনি কি মনে করেন, উভয় বক্তব্যের মাঝে পরস্পর বিরোধিতা আছে? না কখনই না। যেহেতু রহমত ও করুণা প্রতিষ্ঠার জন্য সচ্চরিত্রতা চাই।
যে সমাজের মানুষেরা পরস্পর ধোঁকাবাজি করে, আমানতে খিয়ানত করে, অশ্লীলতা প্রদর্শন করে, সে সমাজে কি রহমত থাকতে পারে?
যে পরিবারের সদস্যদের মাঝে পরস্পরের প্রতি ঘৃণা থাকে, হিংসা থাকে, অশ্রদ্ধা থাকে, সে পরিবারে কি রহমত, করুণা, সুখ বা শান্তি বিরাজ করে? কোনদিনও না।
বলা বাহুল্য কুরআন ও হাদীসের বক্তব্যের মাঝে নিগুঢ় সম্পর্ক রয়েছে। যেহেতু 'সুন্দর চরিত্র' ছাড়া 'করুণা' প্রতিষ্ঠালাভ করতে পারে না। যদি বলেন, মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبúdُونِ)
"আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবল এ জন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমারই ইবাদত করবে।"৩
আর রসূল কে পাঠানো হয়েছে সেই ইবাদতের পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়ার জন্য। সুতরাং চরিত্রের চাইতে ইবাদত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চরিত্রের তুলনায় স্বলাত, যাকাত, সিয়াম, হজ্জ ইত্যাদির গুরুত্ব বেশি।
আমরা বলি, সচ্চরিত্রতার গুরুত্ব বেশি। যেমন এ কথা অন্যত্র উল্লিখিত হবে। যেহেতু প্রত্যেক ইবাদতের পশ্চাতে মহান উদ্দেশ্য রয়েছে মানুষের সুচরিত্র গঠন করা। যে স্বলাতে চরিত্র গঠন হয় না, সে স্বলাত কেবল এক প্রকার ব্যায়াম হয়। যে যাকাতে পবিত্রতা আসে না, সে যাকাত কেবল ব্যয় করা হয়। যে সিয়ামে চরিত্র সংশোধন হয় না, তাতে কেবল উপবাস হয় এবং যে হজ্জে হাজীর চরিত্র সুন্দর হয় না, সে হাজীর কেবল দেশভ্রমণ হয়।
৫ দুই: চরিত্র ও ইবাদতকে পৃথকভাবে দেখার যে মানসিকতা রয়েছে তা দূর করা। অন্য কথায় দ্বীন ও দুনিয়াকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার যে প্রবণতা রয়েছে তা অপসারণ করা।
আপনি দেখবেন, মুসলিম যখন মসজিদে আসে, তখন কী সুন্দর মানুষ সে! কিন্তু পরক্ষণে মসজিদের বাইরে তাকে অন্য মানুষ লক্ষ্য করবেন। মসজিদে ইবাদতে সে যেন দ্বীনদার মুসলিম। আর তার বাইরে যেন দ্বীনের সাথে তার কোন যোগসূত্রই নেই। তার অবস্থা যেন বলে, 'ইবাদত ঠিক থাকলেই হল। দ্বীনদারি হল মসজিদের ভিতরে। বাকি দুনিয়াদারি তে যা ইচ্ছে তাই করা যায়।' আর এমন ধারণা নিশ্চয় মহাভুল।
ইসলাম হল দ্বীন ও দুনিয়া। ইসলামে আছে আকীদা, ইবাদত ও ব্যবহার। সব মিলেই পরিপূর্ণ ইসলাম। ইসলাম হল পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা। জীবনের কোন বিষয়কে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। সুতরাং এমন মুসলিম হওয়া উচিত নয়, যে বড় আবেদ হবে, অথচ তার চরিত্র সুন্দর হবে না। অথবা যার চরিত্র বড় সুন্দর হবে, কিন্তু ইবাদতে হবে ফাঁকিবাজ।
সুতরাং আপনি দেখবেন, অনেক মুসলিম আছে, যারা আমানতদার, সত্যবাদী, ভদ্র ও পরোপকারী, কিন্তু তারা স্বলাত পড়ে না। এরই বিপরীত অনেক মুস্বাল্লী দেখবেন, তারা চরিত্রগতভাবে অনেক নিচে। অনেকে আকীদায় সহীহ, কিন্তু আখলাকে গোল্লায়। অথচ আবূ হুরাইরাহ বলেন, নবী বলেছেন, "আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়।" জিজ্ঞেস করা হল, 'কোন্ ব্যক্তি? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকে না।"৪
সেই মহিলাদের ভেবে দেখা উচিত, যারা কাপড় শুকানো নিয়ে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। পাশাপাশি অথবা উপর তলা-নিচু তলার বাসা হওয়ায় পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি নিয়ে কলহ বাধায়।
ভেবে দেখতে পারেন সেই মুস্বাল্লীর কথা, যে নিজের গাড়ি এমন জায়গায় পার্কিং ক'রে মসজিদে গেছে, যেখানে অন্য গাড়ি-ওয়ালা বা বাড়ি-ওয়ালার সমস্যা হচ্ছে। সে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে গেছে, কিন্তু তাঁর বান্দাকে রাগান্বিত ক'রে। ইবাদতে গেছে, কিন্তু চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে।
কে বেশি উত্তম? যার নফল স্বালাত-সিয়াম বেশি, কিন্তু চরিত্রে কম সে? নাকি যার নফল স্বালাত-সিয়াম কম, কিন্তু চরিত্রে উত্তম
এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! অমুক মহিলা বেশী বেশী (নফল) স্বলাত পড়ে, সিয়াম রাখে ও দান-খয়রাত করে বলে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু সে নিজ জিভ দ্বারা (অসভ্য কথা বলে বা গালি দিয়ে) প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। (তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?)' তিনি বললেন, "সে দোযখে যাবে।"
লোকটি আবার বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! অমুক মহিলা অল্প (নফল) স্বলাত পড়ে, সিয়াম রাখে ও দান-খয়রাত করে বলে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু সে নিজ জিভ দ্বারা (অসভ্য কথা বলে বা গালি দিয়ে) প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। (তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?)' তিনি বললেন, "সে জান্নাতে যাবে।"৫
অনুরূপভাবে আপনি দেখতে পাবেন, মহিলা বোরকা পরে, পর্দা করে, স্বলাতও পড়ে, কিন্তু চরিত্রহীনা, অসতী, কুলটা ও ভ্রষ্টা। অনেক মহিলার থাকে 'ঘোমটার ভিতরে খেমটার নাচ!' পতির সংসারে উপপতির প্রেম। অনুরূপ পুরুষও হয়ে থাকে, দিনের বেলায় মোল্লাগিরি, রাতের বেলায় কলাই চুরি!
এখানে উদ্দেশ্য ইবাদতের গুরুত্ব কম করা নয়। উদ্দেশ্য হল, চরিত্রকে ঈমান ও ইবাদত থেকে পৃথক করা যাবে না। অথবা চরিত্রের গুরুত্বকে ছোট ক'রে দেখা যাবে না। লজ্জাশীলতা একটি সদাচরণের গুণ। সেটা ঈমানের একটি অংশ। মহানবী বলেছেন,
الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ أَوْ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الْإِيمَانِ
"ঈমান সত্তর বা ষাটের অধিক শাখাবিশিষ্ট; যার উত্তম (ও প্রধান) শাখা 'লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই) বলা এবং সবচেয়ে ক্ষুদ্র শাখা পথ হতে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের অন্যতম শাখা।"৬
কুরআন পাঠের সময় আপনি বুঝতে পারবেন, ইবাদত ও আখলাককে বহু স্থলে একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ - الَّذِينَ هُمْ فِي صَلاتِهِمْ خَاشِعُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ عَنْ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ - إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ - فَمَنْ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ لأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ - أُوْلَئِكَ هُمُ الْوَارِثُونَ - الَّذِينَ يَرِثُونَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
"অবশ্যই মু'মিনগণ সফলকাম হয়েছে। যারা নিজেদের স্বলাতে বিনয়-নম্র। যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। যারা যাকাত দানে সক্রিয়। যারা নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখে। নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত; এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। সুতরাং কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে, তারা হবে সীমালংঘনকারী। এবং যারা তাদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। আর যারা নিজেদের স্বলাতে যত্নবান থাকে। তারাই হবে উত্তরাধিকারী। উত্তরাধিকারী হবে ফিরদাউসের; যাতে তারা চিরস্থায়ী হবে।"৭
আশা করি বুঝতে পেরেছেন, সফলকাম মু'মিন কারা? ফিরদাউস জান্নাতের অধিকারী কারা? যারা মহান আল্লাহর ইবাদত করে এবং সেই সাথে নিজেদের চরিত্রকে সুন্দর করে।
মহান আল্লাহ তাঁর দাস 'ইবাদুর রহমান'-এর গুণ বর্ণনা ক'রে বলেছেন,
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلاماً - وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّداً وَقِيَاماً - وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَاماً - إِنَّهَا سَاءَتْ مُسْتَقَرّاً وَمُقَاماً - وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَاماً - وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَاماً
"তারাই পরম দয়াময়ের দাস, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, 'সালাম'। এবং যারা তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে ও দণ্ডায়মান থেকে রাত্রি অতিবাহিত করে। এবং যারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তি নিবৃত্ত কর; জাহান্নামের শাস্তি তো নিশ্চিতভাবে ধ্বংসাত্মক; নিশ্চয় তা আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসাবে অতীব নিকৃষ্ট!' এবং যারা ব্যয় করলে অপচয় করে না, কার্পণ্যও করে না; বরং তারা এ দুয়ের মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করে। এবং যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন উপাস্যকে আহবান করে না, আল্লাহ যাকে যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে হত্যা নিষেধ করেছেন, তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। আর যারা এগুলি করে, তারা শাস্তি ভোগ করবে।"৮
উক্ত সূরার বাকী অংশটুকু পড়েও আপনি দেখতে পারেন, মহান আল্লাহর বান্দাগণের গুণাবলী কী? গুণাবলীতে রয়েছে আকীদা, ইবাদত ও সচ্চরিত্রতা। মহান আল্লাহ বলেছেন,
فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ - الَّذِينَ هُمْ عَنْ صَلاتِهِمْ سَاهُونَ - الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُونَ - وَيَمْنَعُونَ الْمَاعُونَ
"সুতরাং পরিতাপ সেই স্বলাত আদায়কারীদের জন্য; যারা তাদের স্বলাতে অমনোযোগী। যারা লোক প্রদর্শন (ক'রে তা) করে এবং যারা গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোটখাট সাহায্য দানে বিরত থাকে।"৯
আপনি কি লক্ষ্য করেছেন? 'যারা তাদের স্বলাতে অমনোযোগী' এ কথার সাথে 'যারা গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোটখাট সাহায্য দানে বিরত থাকে'---এ কথার কী সম্পর্ক আছে?
সম্পর্ক হল, ইবাদত ও চরিত্র পরস্পর একে অন্যের সম্পূরক। একটা ছাড়া অন্যটা পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না অথবা উপকারে আসে না।
তিন: আমাদের অনেকে আছে, যারা মুখে নৈতিকতার কথা বলে, কিন্তু কাজে করে না। অপরকে উপদেশ দেয়, নিজে মানে না।
অনেকে আছে, যারা অনেক নীতি কথা শোনে। প্রায় সকল শায়খদের দর্সে উপস্থিত হয়, তাঁদের অডিও-সিডি বিতরণ করে, ইসলামী বই সংগ্রহ করে, পড়ে ও বিতরণ করে, তাকে দাওয়াতের ময়দানে দক্ষ অশ্বারোহী রূপে দেখা যায়, কিন্তু আমলের ময়দানে তাদের টিকি দেখা যায় না।
অনেকে পেশা বা চাকরি নিয়ে দাওয়াতের ময়দানে কাজ করে, দাওয়াতী ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে বড় দক্ষতার সাথে দুনিয়া শিকার করে, কিন্তু আমল ও চরিত্র গঠনের ময়দানে তাদের পা চলে না। অযোগ্য হয়েও ঘুস অথবা সুপারিশের বলে যোগ্য জায়গা পেয়ে দ্বীনের দাঈ হয়ে বসে আছে, কিন্তু তার দায়িত্ব পালনে কোন আগ্রহ নেই। দাওয়াতের অন্যতম শর্ত হল, 'আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শেখাও।' কিন্তু তারা পরকে শেখায়, নিজেরা শিক্ষা নেয় না, পরকে তরবিয়ত দেয়, নিজের পরিবারকে দেয় না বা দিতে চায় না।
বহু শিক্ষক আদর্শবান নন, তাঁরা চাকরি করেন, কিন্তু শিক্ষাদান করেন না। বরং অনেক সময় শিক্ষার বিপরীত চরিত্রহীনতার কাজে জড়িয়ে পড়েন।
'রক্ষক যদি ভক্ষক হয় কে করিবে রক্ষা, ধার্মিক যদি চুরি করে, কে দেবে তারে শিক্ষা?'
এই জন্য পৃথক ক'রে সচ্চরিত্রতার আলোচনা। যাতে আমরা পৃথকভাবে গুরুত্ব দিয়ে ও নিয়ে চরিত্রবান হতে পারি, আদর্শ ও নীতিবান হতে পেরে নিজেদেরকে আগে সুশিক্ষিত ও 'মানুষ' রূপে গড়ে তুলতে পারি।
আমরা কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নই। আসুন! আমরা সকলেই একে অপরের জন্য অসিয়ত করি, একে অপরের জন্য দুআ করি। চরিত্র গঠনে নিজের ব্যাপারে এখতিয়ার থাকলেও অনেক সময় পরিবারের অনেকের ব্যাপারে এখতিয়ার থাকে না। সে ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি,
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদেরকে আমাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর কর এবং আমাদেরকে সাবধানীদের জন্য আদর্শস্বরূপ কর।'
চার: উপরোক্ত কারণেরই সারনির্যাস, আমরা যারা মুসলিম, মুস্বাল্লী, পরহেযগার, আলেম, দাঈ, ইমাম সাহেব, মুদারিস, শিক্ষক, তারা যেন সাধারণ মানুষের ফিতনার কারণ না হয়ে থাকি। অর্থাৎ, আমরা সমাজের এমন বিকৃত নমুনা না হই, যা লক্ষ্য ক'রে মানুষ হিদায়াতের জায়গায় গোমরাহ হয়ে যায়।
অনেক সময় কোন ভালো মানুষের প্রশংসা করলে অথবা তার মতো হতে উদ্বুদ্ধ করলে শুনতে পাওয়া যায়,
'অমুকের কথা বলছেন পরহেযগার? তাতেই ডিউটিতে এসে ঘুমায়।'
'অমুকের মতো হতে বলছেন? ওর কপালে দাগ আছে, কিন্তু সূদ খায়।'
'অমুক মেয়ের কথা বলছেন? ও বোরকা পরে আসা-যাওয়া করে, কিন্তু পর-পুরুষের সাথে ওপেন ভিডিও-চ্যাট করে।'
'অমুক মেয়ের কথা বলছেন? ও দাওয়াতের কাজ করে, কিন্তু স্বামী মানে না।'
'অমুক সাহেবের কথা বলছেন? উনি বড় বড় বুলি আওড়ান, কিন্তু ওনার বউ-বেটি বেপর্দা।'
এইভাবে আরো কত কি? অবশ্য তার মধ্যে অনেক কথা অপবাদও হতে পারে। তবুও যেটা বাস্তব উদাহরণ, আমরা সেটার কথা উল্লেখ ক'রে বলতে চাই, আমরা যেন সমাজের জন্য আদর্শ হতে পারি। আমরা যেন আমাদের চরিত্রের মাধ্যমে ইসলামের সঠিক চিত্র মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারি।
আসুন! আমরা সচ্চরিত্রতা নিয়ে পড়ার আগে সেই সংকল্প করি যে, আমরা যা পড়ব তা মানব। আমরা চরিত্র গঠন করব। অপরকে তা শিক্ষা দেব এবং প্রয়োজনে ধৈর্যশীলতা অবলম্বন করব। আল্লাহ আমাদেরকে তওফীক দিন। আমীন।১০

টিকাঃ
১. আহমাদ ৮৯৫২, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ ২৭৩, হাকেম ৪২২১, বাইহাক্বী ২১৩০১
২. সূরা আম্বিয়া-২১:১০৭
৩. সূরা যারিয়াত-৫১:৫৬
৪. বুখারী ৬০১৬, মুসলিম ১৮১
৫. আহমাদ ৯৬৭৫, ইবনে হিব্বান ৫৭৬৪, হাকেম ৭৩০৫, সহীহ তারগীব ২৫৬০
৬. মুসলিম ১৬২
৭. সূরা মু'মিনূন: ১-১১
৮. সূরা ফুরক্বান: ৬৩-৬৮
৯. সূরা মাউন: ৪-৭
১০. আখলাকুল মু'মিন পুস্তিকা থেকে সংগৃহীত

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 সচ্চরিত্রতার অর্থ

📄 সচ্চরিত্রতার অর্থ


সচ্চরিত্রতা তাই, যা প্রয়োগ করলে আপোসের মাঝে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য কায়েম হয় এবং অসচ্চরিত্রতা তাই, যা প্রয়োগ করলে আপোসের মাঝে বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি হয়।
ইমাম তিরমিযী আব্দুল্লাহ বিন মুবারক (রাহিমাহুল্লাহ) হতে সচ্চরিত্রতার ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন,
وَصَفَ حُسْنَ الْخُلُقِ فَقَالَ هُوَ بَسْطُ الْوَجْهِ وَبَذْلُ الْمَعْرُوفِ وَكَفَّ الْأَذَى
'তা হল, সর্বদা হাসিমুখ থাকা, মানুষের উপকার করা এবং কাউকে কষ্ট না দেওয়া।'১১
একদা তাঁকে বলা হল, 'সচ্চরিত্রতার সারকথা বলুন।' তিনি বললেন, 'রাগ বর্জন কর।'
ইবনে মানসূর উল্লেখ করেছেন, সচ্চরিত্রতা হল এই যে, তুমি রাগান্বিত হবে না এবং গরম হবে না। লোকেদের দুর্ব্যবহারে সহনশীলতা অবলম্বন করবে। হাফেয ইবনে হাজার উল্লেখ করেছেন, সচ্চরিত্রতা হল সমূহ সৎকর্ম সম্পাদন করা এবং সমূহ অপকর্ম থেকে বিরত থাকা।
হাসান বাসরী বলেছেন, 'সচ্চরিত্রতার প্রকৃতত্ব হল মানুষের উপকার করা, কষ্টদানে বিরত থাকা এবং চেহারাকে হাস্যময় রাখা।'
অসচ্চরিত্রতার ব্যাপারে আহনাফ বিন কায়স বলেছেন, 'সবচেয়ে বড় রোগ হল নিকৃষ্ট চরিত্র এবং অশ্লীল ভাষা।'
কিছু বিদ্বান বলেছেন, 'চরিত্রবান হল সে, যে সব দিক দিয়ে আরামে আছে এবং লোকেরাও তার ব্যাপারে নিরাপদ আছে।'
শা'বী বলেছেন, 'সচ্চরিত্রতা হল পরোপকার, দানশীলতা ও হাস্যমুখ থাকার নাম।'
মুক্বাতিল বলেছেন, 'সচ্চরিত্রতা হল উদারতা ও ক্ষমাশীলতার নামান্তর।'
সাফারীনী বলেছেন, 'সচ্চরিত্রতা হল মুসলিমদের অধিকার আদায় করার নাম।'
সর্বোচ্চ পর্যায়ের সচ্চরিত্রতার ব্যাপারে হাসান বাসরী বলেছেন, তা হল 'শক্তিশালিতার সাথে নম্রতা, দ্বীনের ব্যাপারে কর্তব্যনিষ্ঠা, ঈমানের ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয়, ইলমের ব্যাপারে অনুরাগ, খরচের ব্যাপারে মধ্যমপন্থা, অভাবমুক্ত থাকার সময় খরচ করা, অভাবের সময় অল্পে তুষ্ট থাকা, বিপদগ্রস্তের প্রতি দয়ার্দ্র হওয়া, দানশীল হয়ে দান করা এবং অবিরত পুণ্যবান থাকা।'১২

টিকাঃ
১১. তিরমিযী হা/২০০৫, সুনানে দারেমী হা/৩৩৭৮
১২. গিয়াউল আলবাব ২৮৩৭,

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 সচ্চরিত্রতার মাহাত্ম্য

📄 সচ্চরিত্রতার মাহাত্ম্য


মানব জীবনে সুন্দর চরিত্রের অতি গুরুত্ব রয়েছে। শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে সচ্চরিত্রতার গুরুত্ব অনেক। তাই শরীয়ত আমাদেরকে সুন্দর চরিত্র গঠন করতে আদেশ ও উদ্বুদ্ধ করে। মহানবী বলেছেন,
اِتَّقِ اللهَ حَيْثُمَا كُنْتَ وَاَتْبِعُ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا وَخَالِقَ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ
"তুমি যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় কর, পাপ করলে সাথে সাথে পুণ্যও কর; যাতে পাপ মোচন হয়ে যায় এবং মানুষের সাথে সুন্দর ব্যবহার কর।”১৩
সুন্দর চরিত্র পুরুষের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সাজসজ্জা, মহিলার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ অলংকার ও প্রসাধন। সচ্চরিত্রতা সুদর্শন পুরুষকে আরো বেশি সুদর্শন ক'রে তোলে এবং সুন্দরী-রূপসীর সৌন্দর্য ও রূপ আরো বৃদ্ধি করে। সচ্চরিত্রতার মতো সুন্দর অলংকার ও প্রসাধন আর কিছু নেই এ দুনিয়াতে। মহানবী বলেছেন,
عَلَيْكَ بِحُسْنِ الْخُلُقِ وَطُولِ الصَّمْتِ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا تَجْمُلُ الْخَلَائِقُ بِمِثْلِهِمَا
"তুমি সুন্দর চরিত্র ও দীর্ঘ নীরবতা অবলম্বন কর। সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে, সারা সৃষ্টি উক্ত দুই (অলংকারের) মত অন্য কিছু দিয়ে সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে পারে না।"১৪
সুন্দর চরিত্র মহান স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ দান, সবচেয়ে মূল্যবান উপহার। মানুষ হিসাবে মানুষ এর চাইতে বড় কিছু উপহার পায়নি। উসামাহ বিন শারীক বলেন, লোকেরা রাসূলুল্লাহ কে জিজ্ঞাসা করল, 'হে আল্লাহর রসূল! মানুষকে দেওয়া দানসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দান কী দেওয়া হয়েছে?' উত্তরে তিনি বললেন, "সুন্দর চরিত্র।"১৫
সুন্দর চরিত্রের নারী-পুরুষের বংশ হল সবার চাইতে উচ্চ। সচ্চরিত্রতা হল শ্রেষ্ঠ কৌলীন্য। এর চাইতে বড় কুলমর্যাদা কোন বংশে হতে পারে না। উচ্চ বংশের মানুষের যদি চরিত্রই না থাকে, তাহলে তার বংশ কোন কাজে লাগবে? এই জন্য মহানবী বলেছেন,
أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ، وأفضلكم حَسَباً أحسنكم خُلُقا
"আল্লাহর নিকট সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি সে, যে সবচেয়ে বেশী পরহেযগার। আর সবচেয়ে উচ্চ বংশীয় লোক সে, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।"১৬
আলী হাসান কে লক্ষ্য ক'রে বলেছেন, 'সবচেয়ে বড় ধনবত্তা হল জ্ঞান, সবচেয়ে নিম্ন মানের দীনতা হল মূর্খতা, সবচেয়ে বড় বাতুলতা হল গর্ব এবং সবচেয়ে বড় বংশ হল সুন্দর চরিত্র।'
সচ্চরিত্রতা ও সুন্দর চরিত্রের নারী-পুরুষ মহান প্রতিপালকের নিকট বেশি পছন্দনীয়। মহান আল্লাহ সৌন্দর্য ভালোবাসেন, বান্দার দেহে সুন্দর পোশাক ভালোবাসেন, ভালোবাসেন তার চারিত্রিক সৌন্দর্য। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ، وَيُحِبُّ مَعَالِيَ الْأُمُورِ، وَيَكْرَهُ سَفْسَافَهَا»
"নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। তিনি সুউচ্চ চরিত্রকে ভালোবাসেন এবং ঘৃণা করেন নোংরা চরিত্রকে।”১৭
যার চরিত্র সুন্দর, তাকে মহান আল্লাহ সবার চাইতে বেশি ভালোবাসেন। এ কথার সাক্ষ্য দিয়ে রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
أَحَبُّ عِبَادِ اللَّهِ إِلَى اللَّهِ أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا
"আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম বান্দা হল সেই, যার চরিত্র সুন্দর।"১৮
সুন্দর চরিত্রের অধিকারী নারী-পুরুষ সকল মানুষের কাছেই বরণীয় আদরণীয়। কে না ভালোবাসে তাদেরকে? চরিত্রবানরা সেরা মানব মহানবী এর নিকটও বেশি পছন্দনীয়। তিনি বলেছেন,
إِنَّ أَحَبَّكُمْ إِلَيَّ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلاقًا، الْمُوَطَّئُونَ أَكْنَافًا، الَّذِينَ يَأْلَفُونَ وَيُؤْلَفُونَ ، وَإِنَّ أَبْغَضَكُمْ إِلَيَّ الْمَشَّاءُونَ بِالنَّمِيمَةِ ، الْمُفَرِّقُونَ بَيْنَ الأَحِبَّةِ ، الْمُلْتَمِسُونَ لِلْبُرَاءِ الْعَنَتَ الْعَيْبَ
"আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি তারা, তোমাদের মধ্যে যাদের চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর। যারা অমায়িক (সহজ-সরল), যারা সম্প্রীতির বন্ধনে সহজে আবদ্ধ হয়। আর তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে অপ্রিয় ব্যক্তি তারা, যারা চুগলখোরি করে, বন্ধুদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা ঘটায় এবং নির্দোষ লোকেদের মাঝে দোষ খুঁজে বেড়ায়।"১৯
চরিত্রবানেরা দুনিয়াতে তাদের প্রিয় নবী এর বেশি ভালোবাসার পাত্র, কিয়ামতেও তারাই তাঁর বেশি নিকটবর্তী জায়গায় স্থানলাভ করবে। তিনি বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَحَبِّكُمْ إِليَّ ، وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِساً يَوْمَ القِيَامَةِ ، أَحَاسِنَكُم أَخْلَاقاً ، وَإِنَّ أَبْغَضَكُمْ إِلَيَّ وَأَبْعَدَكُمْ مِنِّي يَوْمَ القِيَامَةِ الثَّرْثَارُونَ وَالمُتَشَدِّقُونَ وَالمُتَفَيْهِقُونَ
"তোমাদের মধ্যে আমার প্রিয়তম এবং কিয়ামতের দিন অবস্থানে আমার নিকটতম ব্যক্তিদের কিছু সেই লোক হবে যারা তোমাদের মধ্যে চরিত্রে শ্রেষ্ঠতম। আর তোমাদের মধ্যে আমার নিকট ঘৃণ্যতম এবং কিয়ামতের দিন অবস্থানে আমার নিকট থেকে দূরতম হবে তারা; যারা অনর্থক অত্যাধিক আবোল-তাবোল বলে ও বাজে বকে এমন বাচাল ও বখাটে লোক; যারা আলস্যভরে বা কায়দা করে টেনে-টেনে কথা বলে। আর অনুরূপ অহংকারীরাও।”২০
তিনি আরো বলেছেন,
إِنَّ أَحَبَّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبَكُمْ مِنِّي فِي الْآخِرَةِ مَحَاسِنُكُمْ أَخْلَاقًا وَإِنَّ أَبْغَضَكُمْ إِلَيَّ وَأَبْعَدَكُمْ مِنِّي فِي الْآخِرَةِ مَسَاوِيكُمْ أَخْلَاقًا الثَّرْثَارُونَ الْمُتَفَيْهِقُونَ الْمُتَشَدِّقُونَ
"কিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে আমার প্রিয়তম এবং অবস্থানে আমার নিকটতম ব্যক্তি সেই সব লোক হবে, যারা তোমাদের মধ্যে চরিত্রে শ্রেষ্ঠতম। আর তোমাদের মধ্যে আমার নিকট ঘৃণ্যতম এবং অবস্থানে আমার থেকে দূরতম হবে তারা; যারা অনর্থক অত্যধিক আবোল-তাবোল বলে ও বাজে বকে এমন বখাটে লোক; যারা গর্বভরে এবং আলস্যভরে বা কায়দা করে টেনে-টেনে কথা বলে।”২১
সাধারণ লোকেদের ভিতরে যারা চরিত্রে সুন্দর, তারাই সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। আব্দুল্লাহ বিন আম্র (রাঃ) বলেন, একদা মহানবী (স.) কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ লোক কে?' উত্তরে তিনি বললেন,
كُلُّ مَحْمُومِ الْقَلْبِ صَدُوقِ اللَّسَانِ
"সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ লোক হল সেই, যার হৃদয় হল পরিষ্কার এবং জিভ হল সত্যবাদী।"
জিজ্ঞাসা করা হল, 'পরিষ্কার হৃদয়ের অর্থ কী?' বললেন,
هُوَ التَّقِيُّ النَّقِيُّ لَا إِثْمَ فِيهِ وَلَا بَغْيَ وَلَا غِلَّ وَلَا حَسَدَ
"যে হৃদয় সংযমশীল, নির্মল, যাতে কোন পাপ নেই, অন্যায় নেই, ঈর্ষা ও হিংসা নেই।"
জিজ্ঞাসা করা হল, 'তারপর কে?' বললেন,
الَّذِي يشنأ الدُّنْيَا وَيُحِبُّ الْآخِرَةَ»
"যে দুনিয়াকে ঘৃণা করে এবং আখেরাতকে ভালোবাসে।"
জিজ্ঞাসা করা হল, 'তারপর কে?' বললেন,
مُؤْمِنٌ فِي خُلُقٍ حَسَنٍ»
"সুন্দর চরিত্রের মুমিন।”২২
লক্ষণীয় যে, "যার হৃদয় হল পরিষ্কার এবং জিভ হল সত্যবাদী" সে একজন মহান চরিত্রের অধিকারী। অতএব শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা তার অবশ্যই প্রাপ্য।
আব্দুল্লাহ ইবনে আম্র ইবনে আ'স বলেন, আল্লাহর রসূল (প্রকৃতিগতভাবে কথা ও কাজে) অশ্লীল ছিলেন না এবং (ইচ্ছাকৃতভাবেও) অশ্লীল ছিলেন না। আর তিনি বলতেন,
إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمْ أَحْسَنَكُمْ أَخْلَاقاً
"তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তোমাদের মধ্যে সুন্দরতম চরিত্রের অধিকারী। "২৩
সর্বশ্রেষ্ঠ মানব ছিলেন সর্বোচ্চ মানের চরিত্রের অধিকারী। যেহেতু তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন। আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
"তুমি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।"২৪
তাঁর খাদেম আনাস বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সব মানুষের চাইতে বেশি সুন্দর চরিত্রের ছিলেন। '২৫
সচ্চরিত্রতা মানেই পুণ্য, আর পুণ্যই হল সচ্চরিত্রতা। নাওয়াস ইবনে সামআন বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে পুণ্য ও পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, উত্তরে তিনি বললেন,
البر : حسن الخلق ، والإثمُ : مَا حَاكَ فِي صَدْرِكَ ، وَكَرِهْتَ أَن يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ
"পুণ্য হল সচ্চরিত্রতার নাম। আর পাপ হল তাই, যা তোমার অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করে এবং তা লোকে জেনে ফেলুক, এ কথা তুমি অপছন্দ কর।”২৬
অনেকে ঈমানদার বা মু'মিন হয়, কিন্তু পরিপূর্ণ ঈমানদার বা মু'মিন সবাই হতে পারে না। চরিত্রবান মানুষই সবার চাইতে বেশি পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী। মহানবী বলেছেন,
أَكْمَلُ المُؤمِنِينَ إِيمَاناً أَحْسَنُهُمْ خُلُقاً، وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ
"মু'মিনদের মধ্যে সে ব্যক্তি পূর্ণ মু'মিন, যে তাদের মধ্যে চরিত্রের দিক দিয়ে সুন্দরতম। আর তোমাদের উত্তম ব্যক্তি তারা, যারা তাদের স্ত্রীদের নিকট উত্তম। "২৭
তিনি আরো বলেছেন,
أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيْمَانًا أَحَاسِنُهُمْ أَخْلاقًا ، الْمُوَطَّئُونَ أَكْنَافًا ، الَّذِينَ يَأْلَفُوْنَ وَيُؤْلَفُوْنَ ، وَلَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يَأْلَفُ وَلَا يُؤْلَفُ
“সবার চেয়ে পূর্ণ ঈমানদার ব্যক্তি সে, যার চরিত্র সবার চেয়ে সুন্দর, সহজ- সরল। যারা অপরকে প্রীতির বাঁধনে জড়াতে পারে এবং নিজেরাও অপরের প্রীতির বাঁধনে জড়িত হয়। আর সেই ব্যক্তির মাঝে কোন মঙ্গল নেই, যে প্রীতির বাঁধনে কাউকে বাঁধতে পারে না এবং নিজেকেও অপরের প্রীতির বাঁধনে আনে না।”২৮
সুন্দর চরিত্র কেবল মু’মিনেরই বৈশিষ্ট্য। অন্যের মাঝে কোন সচ্চরিত্রতা থাকলে আংশিকভাবে থাকতে পারে। মুনাফিকের মাঝে সচ্চরিত্রতা এবং দ্বীনের জ্ঞান বিদ্যমান থাকে না। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
خَصْلَتَانِ لَا تَجْتَمِعَانِ فِي مُنَافِقٍ : حُسْنُ سَمْتٍ ، وَلَا فِقْهُ فِي الدِّينِ
“দু’টি স্বভাব কোন মুনাফিকের ভিতরে জমা হতে পারে না; না সুন্দর চরিত্র, আর না দ্বীনী জ্ঞান।”২৯
চরিত্রবান মুসলিম নর-নারী সচ্চরিত্রতার মাধ্যমে নফল স্বালাত-সিয়ামের সওয়াব লাভ করতে পারে। নবী বলেছেন,
إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَيُدْرِكُ بِحُسْنِ خُلُقِهِ دَرَجَةَ الصَّائِمِ القَائِمِ
“অবশ্যই মু’মিন তার সদাচারিতার কারণে দিনে (নফল) সিয়াম পালনকারী এবং রাতে (নফল) ইবাদতকারীর মর্যাদা পেয়ে থাকে।”৩০
কিয়ামতের মীযানে বান্দার পাপ-পুণ্য ওজন হবে। দাঁড়িপাল্লায় সবচেয়ে বেশি ভারি হবে সচ্চরিত্রতা। মহানবী বলেছেন,
مَا مِنْ شَيْءٍ أَثْقَلُ فِي مِيْزَانِ العَبْدِ المُؤْمِنِ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ حُسْنِ الْخُلُقِ، وَإِنَّ الله يُبْغِضُ الفَاحِشَ البَنِيَّ
“কিয়ামতের দিন (নেকী) ওজন করার দাঁড়ি-পাল্লায় সচ্চরিত্রতার চেয়ে কোন বস্তুই অধিক ভারী হবে না। আর আল্লাহ তাআলা অশ্লীল ও চোয়াড়কে অপছন্দ করেন।”৩১
সচ্চরিত্রতা হল বেহেস্ত যাওয়ার অসীলা। সুন্দর আচার-ব্যবহার এমন আমল, যা জান্নাতে যেতে অন্যান্য আমলের তুলনায় বেশি কাজে দেবে। আবু হুরাইরা বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞাসা করা হল যে, 'কোন্ আমল মানুষকে বেশি জান্নাতে নিয়ে যাবে?' তিনি বললেন,
تَقْوَى اللَّهِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ
"আল্লাহভীতি ও সচ্চরিত্র।"
আর তাঁকে (এটাও) জিজ্ঞাসা করা হল যে, 'কোন্ আমল মানুষকে বেশি জাহান্নামে নিয়ে যাবে?' তিনি বললেন,
الفَمُ وَالْفَرْجُ
"মুখ ও যৌনাঙ্গ (অর্থাৎ, উভয় দ্বারা সংঘটিত পাপ)।"৩২
চরিত্রবান নরনারীর জন্য সুউচ্চ বেহেস্তের নিশ্চয়তা দিয়েছেন বেহেস্তের সর্দার রাসূলুল্লাহ ﷺ। তিনি বলেছেন,
أَنَا زَعِيمٌ بِبَيْتٍ فِي رَبَضِ الجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ المِرَاءَ وَإِنْ كَانَ مُحِقَّاً ، وَبِبَيْتٍ فِي وَسَطِ الجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ الكَذِبَ وَإِنْ كَانَ مَازِحاً ، وَبِبَيْتٍ في أَعلَى الْجَنَّةِ لِمَنْ حَسُنَ خُلُقُهُ
"আমি সেই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের শেষ সীমায় একটি ঘর দেওয়ার জন্য জামিন হচ্ছি, যে সত্যাশ্রয়ী হওয়া সত্ত্বেও কলহ-বিবাদ বর্জন করে। সেই ব্যক্তির জন্য আমি জান্নাতের মধ্যস্থলে একটি ঘরের জামিন হচ্ছি, যে উপহাসছলেও মিথ্যা বলা বর্জন করে। আর সেই ব্যক্তির জন্য আমি জান্নাতের সবচেয়ে উঁচু জায়গায় একটি ঘরের জামিন হচ্ছি, যার চরিত্র সুন্দর।"৩৩
ধন-মাল দিয়ে সকল মানুষের মন সন্তুষ্ট করতে পারা সম্ভব নয়, কুলাতেও পারবে না কেউ। কিন্তু সুন্দর চরিত্র দ্বারা তা পারা যায়।
মানুষের তিরোধানের পরে তার চর্চা অবশিষ্ট থেকে যায়, মানুষের উচিত, তার চর্চাকে ভালো করে গড়ে তোলা।
মৃত্যুর পরে যার জন্য মানুষ মানুষের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকে, তা হচ্ছে তার অমায়িক ব্যবহার।
পরিচিত অনেকে হতে পারে, কিন্তু সুপরিচিত হতে অতিরিক্ত গুণের দরকার, সুন্দর চরিত্রের দরকার।
মানুষের ভদ্রতাই তার ব্যবহারকে সুন্দর করে। আর তার সুন্দর ব্যবহারই তাকে প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে তোলে। অতএব সুন্দর চরিত্র মানব-জীবনের দামী অলঙ্কার ও অমূল্য সম্পত্তি।
যদি কেউ প্রশ্ন করে, 'ইসলামের সবচেয়ে সুন্দর দর্শন কী?' তাহলে তার উত্তরে বলা যায় যে, 'সচ্চরিত্রতা।'
যদি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দার্শনিককে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, 'এক কথায় বিশ্বমানবতার চিকিৎসা কী?' তাহলে তার উত্তরে তিনি অবশ্যই বলবেন যে, 'সচ্চরিত্রতা।'
যদি ইউরোপের সমস্ত বিদ্বানগণ সমবেত হয়ে ইউরোপীয় সভ্যতার ব্যাপারে অধ্যয়ন করেন, অতঃপর তার ফলস্বরূপ যেটা তাঁরা পেতে চান, সেটা হল 'সচ্চরিত্রতা।'
ইসলামে সচ্চরিত্রতার বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব পৃথক ও অধিক বেশি। অন্য ধর্ম ও জাতির মানুষের মাঝেও সচ্চরিত্রতার গুরুত্ব আছে। ইংরেজিতে বলা হয়, 'মনি লস ইজ নাথিং লস, হেল্থ লস ইজ সামথিং লস, বাট কারেকটর লস ইজ এভরিথিং লস।'
বাংলাতে বলা হয়, 'যদি ধন নাশ হয়, তায় কিবা আসে যায়, যদি স্বাস্থ্য নাশ হয়, তবে কিছু হয় ক্ষয়, হইলে চরিত্র নাশ সর্বনাশ হয়।'
খাওয়ারিযমী বলেছেন, 'মানুষের মাঝে চরিত্র থাকলে সে ১ নম্বর থাকে। অতঃপর তার মধ্যে রূপ থাকলে তার পাশে একটি শূন্য যোগ হয়ে ১০ হয়। অতঃপর তার ধনবত্তা থাকলে আরো একটি শূন্য যোগ হয়ে ১০০ হয়। অতঃপর তার কৌলীন্য থাকলে আরো একটি শূন্য যোগ হয়ে ১০০০ হয়। কিন্তু ১ সংখ্যাটি অর্থাৎ চরিত্র বাদ পড়লে মানুষের মূল্য চলে যায় এবং পাশের শূন্যগুলি অকেজো হয়ে অবশিষ্ট থাকে।'
কবি বলেছেন, 'গুণহীন চিরদিন পরাধীন রয়, নাহি সুখ ম্লানমুখ চিরদুখ সয়। গুণবান্ মতিমান্ ধনবান্ হয়, নাহি দুখ হাস্যমুখ সদা সুখময়।'
আরবী কবি বলেছেন,
وإنما الأمم الأخلاق ما بقيت فإن هم ذهبت أخلاقهم ذهبوا
অর্থাৎ, জাতি ততক্ষণ পর্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে, যতক্ষণ তার চরিত্র থাকে। জাতির চরিত্র গেলে সবাই ধ্বংস হয়ে যায়।

টিকাঃ
১৩. আহমাদ ২১১৫৪, তিরমিযী ১৯৮৭, হাকেম ১৭৮, সহীহুল জামে ৯৭
১৪. আবু য়‍্যা'লা ৩২৯৮, সহীহুল জামে ৪০৪৮
১৫. আহমাদ ১৮৪৫৪, ইবনে হিব্বান ৬০৬১, হাকেম ৪১৬, বাইহাক্বী ২০০৪৩, সঃ তারগীব ২৬৫২
১৬. আল-আদাবুল মুফরাদ ৮৯৯
১৭. ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৬৯০৬, সহীহুল জামে ১৭৪৩
১৮. ত্বাবারানী ৪৭৩, সহীহুল জামে ১৭৯
১৯. তাবারানী ৪৩৫
২০. তিরমিযী ২০১৮
২১. আহমাদ ১৭৭৩২, ইবনে হিব্বান, তাবারানীর কাবীর, বাইহাকীর শুআবুল ঈমান, সিলসিলাহ সহীহাহ ৭৯১
২২. ইবনে মাজাহ ৪২১৬, সহীহুল জামে ৩২৯১
২৩. বুখারী ৩৫৫৯, ৩৭৫৯, মুসলিম ৬১৭৭
২৪. ক্বালাম:৪
২৫. বুখারী ৬২০৩, মুসলিম ৫৭৪৭
২৬. মুসলিম ৬৬৮০
২৭. তিরমিযী ১১৬২
২৮. ত্বাবারানী ৬০৫, সিঃ সহীহাহ ৭৫১
২৯. তিরমিযী ২৬৮৪, সহীহুল জামে’ ৩২২৯
৩০. আবু দাউদ ৪৮০০
৩১. তিরমিযী ২০০৩, ইবনে হিব্বান ৫৬৬৪, আবু দাউদ ৪৭৯৯, সিলসিলাহ সহীহাহ ৮৭৬
৩২. তিরমিযী ২০০৪, ইবনে হিব্বান ৪৭৬, বুখারীর আদব ২৮৯ ও ২৯৪, ইবনে মাজাহ ৪২৪৬, আহমাদ ২/৩৯২, হাকেম ৪/২৩৪
৩৩. আবু দাউদ ৪৮০২, তিরমিযী ১৯৯৩, ইবনে মাজাহ ৫১, বাইহাকী, সহীহ তারগীব ১৩৩

📘 সচ্চরিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলী > 📄 প্রকৃতি ও চরিত্র

📄 প্রকৃতি ও চরিত্র


সৃষ্টিগতভাবে মানুষের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। শৈশব থেকেই তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে মানুষের আচার-আচরণে ও চাল-চলনে। ধীরে ধীরে তা মানুষের মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত হয়। চরিত্র হয়ে যায় তার সকল কর্মকাণ্ড। তার মধ্যে কিছু হয় প্রকৃতিগতভাবেই স্বভাবজাত। আর কিছু হয় প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে। এই জন্য মানুষের চরিত্রকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
প্রকৃতিগত চরিত্র এবং পরিশীলিত চরিত্র।
১। প্রকৃতিগত চরিত্র
সৃষ্টিগতভাবে যেমন মানুষের বুদ্ধিমত্তার তারতম্য আছে, দৈহিক অঙ্গ গঠনে পার্থক্য আছে, তেমনি প্রকৃতিগত স্বভাবও। বহু গুণাগুণ আছে, যা মানুষের প্রকৃতিতে প্রক্ষিপ্ত আছে। যা অর্জন করার জন্য কোন অনুশীলন করতে হয় না। যেমন ঠাণ্ডা মেজাজ, মিনমিনে স্বভাব অথবা তার বিপরীত। এই শ্রেণীর গুণাবলী মানুষকে তৈরি করতে হয় না। মহান স্রষ্টার সৃষ্টিগত প্রকৃতিতেই তা নিহিত আছে। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ خَلَقَ آدَمَ مِنْ قَبْضَةٍ قَبَضَهَا مِنْ جَمِيعِ الْأَرْضِ فَجَاءَ بَنُو آدَمَ عَلَى قَدْرِ الْأَرْضِ جَاءَ مِنْهُمُ الْأَبْيَضُ وَالْأَحْمَرُ وَالْأَسْوَدُ وَبَيْنَ ذَلِكَ وَالْخَبِيتُ وَالطَّيِّبُ وَالسَّهْلُ وَالْحَزْنُ وَبَيْنَ ذَلِكَ
"নিশ্চয় আল্লাহ আয্যা অজাল্ল আদমকে সৃষ্টি করেছেন এক মুষ্টি মাটি থেকে, যা তিনি সারা পৃথিবী থেকে গ্রহণ করেছেন। তাই আদম সন্তান মাটি অনুসারে বিকাশ লাভ করেছে। তাদের কেউ রক্তিমবর্ণ, কেউ গৌরবর্ণ, কেউ কৃষ্ণবর্ণ, আবার কেউ এ সবের মাঝামাঝি। কেউ সহজ-সরল, কেউ দুর্দম-কঠিন, কেউ নোংরা চরিত্রের, কেউ সুন্দর চরিত্রের এবং কেউ এ সবের মাঝামাঝি।"৩৪
আবু হুরাইরাহ বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ কে প্রশ্ন করা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি কে?' তিনি বললেন, "তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে আল্লাহ-ভীরু।” অতঃপর তাঁরা (সাহাবীরা) বললেন, 'এ ব্যাপারে আমরা আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি না।' তিনি বললেন, "তাহলে ইউসুফ (সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি), যিনি স্বয়ং আল্লাহর নবী, তাঁর পিতা নবী, পিতামহও নবী এবং প্রপিতামহও নবী ও আল্লাহর বন্ধু।” তাঁরা বললেন, 'এটাও আমাদের প্রশ্ন নয়।' তিনি বললেন,
فَعَنْ مَّعَادِنِ العَرَبِ تَسْأَلُونِي؟ خِيَارُهُمْ فِي الجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِي الإِسْلامِ إِذَا فَقُهُوا
"তাহলে তোমরা কি আমাকে আরবের বংশাবলী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছ? (তবে শোনো!) তাদের মধ্যে যারা জাহেলী যুগে ভাল, তারা ইসলামেও ভাল; যদি দ্বীনী জ্ঞান রাখে।"৩৫
তিনি আরো বলেছেন,
النَّاسُ مَعَادِنٌ كَمَعَادِنِ الذَّهَبِ وَالفِضَّةِ ، خِيَارُهُمْ فِي الجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِي الإسْلامِ إِذَا فَقُهُوا ، وَالأَرْوَاحُ جُنُودٌ مُجَنَّدَةٌ ، فَمَا تَعَارَفَ مِنْهَا ائْتَلَفَ ، وَمَا تَنَاكَرَ مِنْهَا اخْتَلَفَ
"সোনা-রূপার খনিরাজির মত মানব জাতিও নানা গোত্রের খনিরাজি। যারা জাহেলী যুগে উত্তম ছিল, তারা ইসলামী যুগেও উত্তম; যখন তারা দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে। আর আত্মাসমূহ সমবেত সৈন্যদলের মত। সুতরাং আপোসে যে আত্মাদল পরিচিত ও অভিন্ন প্রকৃতির হয়, সে আত্মাদলের মাঝে মিলন ও বন্ধুত্ব স্থাপিত হয়ে থাকে এবং যে আত্মাদল আপোসে অপরিচিত ও ভিন্ন প্রকৃতির হয়, সে আত্মাদলের মাঝে বিচ্ছিন্নতা ও অনৈক্য প্রকট হয়ে ওঠে।”৩৬
লক্ষণীয় যে, মানুষ এক প্রকৃতির নয়। যত মানুষ, তত রকমের মন আছে। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে মনে-মনে মিল থাকে। আর যার প্রকৃতি ভালো, সে সকল পরিবেশে ভালো। যে ইসলামের পূর্বে জাহেলী যুগে ভালো ছিল, সে ইসলামের পরেও ভালো। প্রকৃতিগত সদাচরণ ও কদাচরণ মুসলিম-অমুসলিম সকলের মাঝে বিদ্যমান থাকে।
প্রকৃতিগত আচরণ প্রদর্শন করার প্রয়োজন হয় না। তা প্রদর্শন করতে কোন প্রকার চেষ্টা বা কষ্টের দরকার হয় না। মানুষ না চাইলেও সময়ে স্বাভাবিকভাবে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। রাসূলুল্লাহ আশাজ্ আব্দুল কায়েসকে বলেছিলেন,
إِنَّ فِيكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ : الْحِلْمُ وَالأَنَاةُ
"নিশ্চয় তোমার মধ্যে এমন দু'টি স্বভাব রয়েছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন; সহনশীলতা ও চিন্তা-ভাবনা ক'রে কাজ করা। "৩৭
নিম্নের একটি হাদীস থেকেও প্রকৃতিগত চরিত্রের কথা স্পষ্ট হয়। আমানতদারী মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রক্ষিপ্ত করা হয়। আর মানুষের মৌলিক চরিত্র এটাই যে, সে আমানতদার হবে।
হুযাইফাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ আমাদের নিকট দু'টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। একটি তো আমি প্রত্যক্ষ করেছি এবং দ্বিতীয়টির জন্য অপেক্ষায় রয়েছি। তিনি আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, আমানত মানুষের অন্তরের অন্তস্তলে অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর তারা কুরআন থেকে জ্ঞানার্জন করেছে। তারপর তারা নবীর হাদীস থেকেও জ্ঞানার্জন করেছে। এরপর আমাদেরকে আমানত তুলে নেওয়া সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, “মানুষ এক ঘুম ঘুমানোর পর তার অন্তর থেকে আমানত তুলে নেওয়া হবে। তখন একটি বিন্দুর মত তার চিহ্ন অবশিষ্ট থাকবে। পুনরায় মানুষ এক ঘুম ঘুমাবে। আবারো তার অন্তর থেকে আমানত উঠিয়ে নেওয়া হবে। তখন জ্বলন্ত আগুন গড়িয়ে তোমার পায়ে পড়লে যেমন একটা ফোস্কা পড়ে কালো দাগ দেখতে পাওয়া যায় তার মত চিহ্ন থাকবে। তুমি তাকে ফোলা দেখবে; কিন্তু বাস্তবে তাতে কিছুই থাকবে না।” অতঃপর (উদাহরণ স্বরূপ) তিনি একটি কাঁকর নিয়ে নিজ পায়ে গড়িয়ে দিলেন। (তারপর বলতে লাগলেন,) “সে সময় লোকেরা বেচা-কেনা করবে কিন্তু প্রায় কেউই আমানত আদায় করবে না। এমনকি লোকে বলাবলি করবে যে, অমুক বংশে একজন আমানতদার লোক আছে। এমনকি (দুনিয়াদার) ব্যক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করা হবে, সে কতই না অদম্য! সে কতই না বিচক্ষণ! সে কতই না বুদ্ধিমান! অথচ তার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমানও থাকবে না।” (হুযাইফা বলেন,) ইতিপূর্বে আমার উপর এমন যুগ অতিবাহিত হয়ে গেছে, যখন কারো সাথে বেচাকেনা করতে কোন পরোয়া করতাম না। কারণ সে মুসলিম হলে তার দ্বীন তাকে আমার (খিয়ানত থেকে) বিরত রাখবে। আর খ্রিষ্টান অথবা ইয়াহুদী হলে তার শাসকই আমার হক ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু বর্তমানের অবস্থা হচ্ছে এই যে, আমি অমুক অমুক ছাড়া বেচা-কেনা করতে প্রস্তুত নই।৩৮
নবুয়ত প্রাপ্তির প্রাক্কালে মহানবী এর বহু গুণ ছিল প্রকৃতিগত সুচরিত্র। সে কথার সাক্ষ্য দিয়েছেন মা খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)। জিবরীলকে দেখে হিরা গুহা থেকে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে যখন মহানবী তাঁর কাছে ফিরে এসে বৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন, তখন তিনি তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন,
كَلَّا أَبْشِرُ فَوَاللَّهِ لاَ يُخْزِيكَ اللهُ أَبَدًا، وَاللهِ إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ وَتَصْدُقُ الْحَدِيثَ وَتَحْمِلُ الْكَلَّ وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ وَتَقْرِى الضَّيْفَ وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ
অর্থাৎ, কক্ষনো না। আপনি সুসংবাদ নিন। আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে কখনই লাঞ্ছিত করবেন না। আল্লাহর কসম! আপনি তো আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখেন, সত্য কথা বলেন, (অপরের) বোঝা বইয়ে দেন, নিঃস্বকে দান করেন, মেহমানের খাতির করেন এবং বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করেন।৩৯
আবূ বাক্ সিদ্দীক ইসলামের পূর্বে জাহেলী যুগে মদ পান করেননি, এটা ছিল তাঁর প্রকৃতিগত চরিত্র। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَى أَن لَّا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانٍ يَفْتَرِينَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفٍ فَبَايِعُهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"হে নবী! বিশ্বাসী নারীরা যখন তোমার নিকট এসে বায়আত করে এই মর্মে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোন শরীক স্থির করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তান-সন্ততিদের হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোন অপবাদ রচনা ক'রে রটাবে না এবং সৎকার্যে তোমাকে অমান্য করবে না, তখন তাদের বায়আত গ্রহণ কর এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"৪০
উক্ত নির্দেশের প্রেক্ষিতে একদল নারীর বায়আত গ্রহণ কালে মহানবী বলেছিলেন, "তোমরা আমার কাছে এ মর্মে বায়আত করো যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শির্ক করবে না----ব্যভিচার করবে না।" তখন হিন্দ বিন্তে উতবাহ বলেছিলেন, 'স্বাধীন মেয়েও কি ব্যভিচার করে?'
অবাক হয়ে এ প্রশ্নের মানে হল, তাঁর প্রকৃতিগত সুচরিত্রে ছিল যে, একজন স্বাধীনা মহিলা ব্যভিচার করতে পারে না। সেই নোংরা জাহেলী যুগেও না। ব্যভিচার করতে পারে দাসীরা।
>২। পরিশীলিত চরিত্র
বহু শিষ্টাচার ও আচরণ এমন আছে, যা পরিশীলন ও অনুশীলনের মাধ্যমে রপ্ত করা যায়। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষের আচরণকে পরিবর্তিত ও বিশুদ্ধ করা যায়। আর সেই মর্মেই শরীয়তের প্রায় সকল নির্দেশ এসেছে মানুষকে 'মানুষ' রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে। মহানবী বলেছেন,
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ (مكارم) الْأَخْلَاقِ
"আমি মানুষের শ্রেষ্ঠ ও সুন্দর চরিত্রের পরিপূর্ণতা দানের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।"৪১

টিকাঃ
৩৪. আহমাদ ১৯৫৮২, আবু দাউদ ৪৬৯৫, তিরমিযী ২৯৫৫
৩৫. বুখারী ৩৩৫৩, মুসলিম ৬৩১১
৩৬. মুসলিম ৬৮৭৭
৩৭. মুসলিম ১২৬
৩৮. বুখারী ৬৪৯৭, ৭০৮৬, মুসলিম ৩৮৪
৩৯. বুখারী ৩, মুসলিম ৪২২
৪০. সূরা মুমতাহিনাহঃ ১২
৪১. আহমাদ ৮৯৫২, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ ২৭৩, হাকেম ৪২২১, বাইহাক্বী ২১৩০১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00