📘 সৎ সঙ্গে সর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ > 📄 বইপত্রও সঙ্গী

📄 বইপত্রও সঙ্গী


অতএব উত্তম বিষয়বস্তু নিয়ে লিখিত বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হও। যাতে আল্লাহ তাআলার কিতাবের আলোচনা রয়েছে। অথবা নবীজির সুন্নাহ কিংবা কোনো নেককার ব্যক্তির জীবনী আলোচিত হয়েছে। কিংবা এমন গ্রন্থকে সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করো, যা থেকে তুমি এমন কোনো মাসআলা শিক্ষা লাভ করবে, যা তোমার দ্বীন ও দুনিয়ার উপকার সাধিত হবে।

অসংখ্য ভালো বই রয়েছে, যেগুলো তোমার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করবে। নেক আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে এবং তোমার সামনে অনুগ্রহ ও অনুগ্রহকারীদের শুভ পরিণام তুলে ধরবে। তোমাকে রাগ দমন, ক্ষমা, উত্তম আখলাক ও ভালো গুণাবলি অর্জনে উৎসাহিত করবে। সুতরাং এ ধরনের ভালো গ্রন্থাবলিকে সঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করতে হবে এবং যাদু, ভাগ্য গণনা ও ভৌতিক গ্রন্থাবলি বর্জন করতে হবে। এমনইভাবে যেসব বই অনৈতিক প্রেম-ভালোবাসা, অশ্লীলতা এবং ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে, সেগুলো থেকেও দূরে থাকতে হবে। এমনইভাবে কল্পকাহিনির বই-পুস্তক থেকেও বেঁচে থাকতে হবে, যেগুলোতে সময় অপচয় ও দ্বীনের ক্ষতি ছাড়া কোনো ফায়দা নেই। যেমনইভাবে বেঁচে থাকতে হবে সেসব দর্শনশাস্ত্রের বই-পুস্তক থেকে, যেগুলো অযথা বিতর্ক, নাস্তিকতা ও কুফরি কথাবার্তায় পরিপূর্ণ।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযি. পূর্ববর্তী সেসব গ্রন্থ পাঠ করতে নিষেধ করতেন, ইসলাম যেগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছিল। বুখারি শরিফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযি. হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, হে মুসলিম সমাজ! কী করে তোমরা আহলে কিতাবদের নিকট জিজ্ঞেস করো? অথচ আল্লাহ তাঁর নবীর ওপর যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, তা আল্লাহর সম্পর্কিত নবতর তথ্য-সংবলিত, যা তোমরা তেলাওয়াত করছ এবং যার মধ্যে মিথ্যার কোনো সংমিশ্রণ নেই। তদুপরি আল্লাহ তোমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, আহলে কিতাবরা আল্লাহ তাআলা যা লিখে দিয়েছিলেন, তা পরিবর্তন করে ফেলেছে এবং নিজ হাতে সেই কিতাবের বিকৃতি সাধন করে তা দিয়ে তুচ্ছ মূল্যের উদ্দেশ্যে প্রচার করেছে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকেই অবতীর্ণ। তোমাদেরকে প্রদত্ত মহাজ্ঞান কি তাদের নিকট জিজ্ঞেস করা থেকে তোমাদের বাধা দিয়ে রাখতে পারে না? আল্লাহর কসম! তাদের একজনকেও আমি কখনো তোমাদের ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে সে বিষয়ে তোমাদের জিজ্ঞেস করতে দেখিনি।

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
لَا يُحِبُّ اللَّهُ الْجَهْرَ بِالسُّوءِ مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا مَنْ ظُلِمَ.
অর্থ: মন্দ কথার প্রচার আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না, তবে কারও ওপর জুলুম করা হলে ভিন্ন কথা।

এই আয়াতের তাফসিরে শায়খ মুহাম্মদ রশিদ রেজা তার রচিত 'তাফসিরুল মানার' গ্রন্থে বলেন, অনুচিত কথা বলতে এমন কথা বোঝানো উদ্দেশ্য, যা শ্রোতাকে কষ্ট দেয়। আঘাত করে। সেটা যেমন তার দোষ-ত্রুটি বর্ণনা দ্বারা হতে পারে, তেমনই কারও গিবত-শেকায়েত দ্বারাও হতে পারে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এসব করতে নিষেধ করেছেন। কারণ, এতে নিহিত রয়েছে সর্বনাশা ক্ষতি। সেগুলোর মধ্য হতে সবচেয়ে বড় দুটি ক্ষতি হলো:
প্রথমত: কেননা এটি দোষচর্চাকারী এবং যার দোষ বলা হচ্ছে তার মধ্যে শত্রুতা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করে। যে শত্রুতা ক্ষোভ অন্যের হক নষ্ট এবং রক্তপাতের দিকে নিয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত: অনৈতিক এবং অশ্লীল কর্মকাণ্ডের প্রচারণা শ্রোতাদের অন্তরে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। কেননা স্বভাবতই মানুষ একে অপরের অনুসরণপ্রিয় হয়ে থাকে। তাই কেউ যখন মন্দ কাজের প্রচার করতে শুনে, প্রথমবার সে এই প্রচারণাকে দোষণীয় মনে করে। কিন্তু পরবর্তীতে যখন এমনটা হয়, তখন এর প্রচারণাকে সে দোষণীয় মনে করে না। কিংবা সেও এই খারাপ কাজের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। বিশেষত যদি শ্রোতা যদি অন্যকে অনুসরণপ্রবণ কেউ হয়। অথবা প্রচারকারী যদি সমাজের বিশিষ্ট কোনো ব্যক্তি হয়। আর সাধারণ মানুষ বিশিষ্ট ব্যক্তিকে অনুসরণ করে- এটাই স্বাভাবিক। অতঃপর যখন এই অনৈতিক বিষয়টি বিশিষ্ট লোকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাধারণদের মধ্যে ছড়াতে বেশি সময় প্রয়োজন হয় না।

এভাবে যখন মানুষের অন্তর ও আত্মা অশ্লীলতা এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি ধাবিত হয়ে যায়, তখন তারা বাস্তবে গুনাহে লিপ্ত হতে উদ্বুদ্ধ হয়। বিশেষত যখন জানতে পারে কাজটি তাদের অনুসরণীয় কেউ করেছে। অথচ যদি অনুসরণীয় কেউ না করত, তাহলে হয়তো সে গুনাহের কাজটি করতে সাহস পেত না। প্রথমত মন্দ কথাবার্তা শ্রবণের প্রভাব যুবক উঠতি বয়সি মানুষের মাঝে বেশি পড়ে। এরপর এই প্রভাব শুধুমাত্র সাধারণ মানুষ আর উঠতি বয়সিদের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ে। তাই বলা যায়, মন্দ কোনো বিষয় শ্রবণ করা মন্দ কাজে লিপ্ত হওয়ার নামান্তর। মন্দ বিষয়গুলো শোনার কারণে যেমন মন্দ প্রভাব পড়ে, তেমনইভাবে মন্দ কিছু দেখার কারণেও মন্দ প্রভাব পড়ে। আর এর সর্বনিম্ন প্রতিক্রিয়া হচ্ছে মানুষের অন্তরে কাজগুলো মন্দ হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বহীন হয়ে যায়। বিশেষ করে যখন এ ধরনের কাজ ও কর্মকাণ্ডের বিবরণ বারবার শোনা হয় কিংবা দেখা হয়।

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রহ. 'ইকতিজাউস সিরাতিল মুস্তাকিম' কিতাবে লেখেন, দেহের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যখন সে ক্ষুধার্ত থাকে, তখন কোনো একটা খাবার তার চাহিদামতো গ্রহণ করে নেয়। তখন অন্য খাবারের চাহিদা তার থাকে না। এই খাবারেই সে পরিতৃপ্ত হয়ে যায়। এরপরও যদি অন্য খাবার দেওয়া হয়, তাহলে খুব কষ্টে কিংবা জোরজবরদস্তি করে খেতে বাধ্য হয়। কখনো এই খাবার তার জন্য ক্ষতিকর হয় এবং এটি তার শরীরের জন্য উপকারী হয় না। ঠিক তেমনইভাবে বান্দা যখন অবৈধ কর্মকাণ্ড এবং গুনাহে সময় ব্যয় করে, তখন সে অনুপাতে বৈধ এবং তার জন্য উপকারী কর্মকাণ্ড ও ভালো কাজের আগ্রহ কমে যায়। পক্ষান্তরে বৈধ এবং ভালো কাজে যে বান্দা শক্তি-সামর্থ্য ব্যয় করে, গুনাহ এবং অবৈধ কাজের প্রতি তাদের আগ্রহ কম থাকে। বৈধ কাজগুলোর প্রতি তার ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। তার দ্বীন পূর্ণতা পায়।

এ জন্যই দেখা যায় নিজ আত্মা ও অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে অধিক পরিমাণে কবিতা শ্রবণকারী ব্যক্তির আগ্রহ কুরআন শ্রবণের প্রতি কমে যায়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সে এতে বিরক্ত হয়। এমনইভাবে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে অধিক সফরকারী ব্যক্তিকে দেখা যায় তার অন্তরে বায়তুল্লাহ শরিফে হজের ইচ্ছা ও ভালোবাসা থাকে না। যেই আগ্রহ ও ভালোবাসার কথা কুরআন এবং সুন্নাহে বলা হয়েছে। এমনইভাবে যে ব্যক্তি পশ্চিমা ও বিজাতীয় দর্শন ও শিষ্টাচারের বই-পুস্তক থেকে দর্শন এবং শিষ্টাচার শেখে, তার অন্তরে ইসলামি শিষ্টাচারের জন্য কোনো জায়গা থাকে না। তেমনই যে ব্যক্তি তাদের রাজা-বাদশাদের জীবনাচারকে নিজের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে, তার অন্তরে নবী-রাসুলদের জীবনাদর্শ অনুসরণের কোনো গুরুত্ব অবশিষ্ট থাকে না। আমাদের আশেপাশে এমন দৃষ্টান্ত ও উপমা প্রচুর রয়েছে।

তাই মুসলমানদের একান্ত কর্তব্য হলো নিজ সময় ও সাথিসঙ্গীর ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করা। আল্লাহ তাআলার দেওয়া কুরআন এবং সুন্নাহর নির্দেশ অনুযায়ী নিজেকে পরিচালিত করা। আল্লাহর কিতাবের প্রতিটি হরফ পাঠে সওয়াব লেখা হয়। বরং কুরআনকেন্দ্রিক গবেষণা ও চিন্তা-ভাবনার কারণেও মানুষ সওয়াবের অধিকারী হন। এ বিষয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ قَرَأَ حَرْفاً مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ حَسَنَةٌ وَالحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لَا أَقُولُ : الم حَرفٌ وَلَكِنْ : أَلِፍٌ حَرْفٌ وَلَامٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ.
অর্থ: যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি বর্ণ পাঠ করবে, তার একটি নেকি হবে। আর একটি নেকি, দশটি নেকির সমান হয়। আমি বলছি না যে, 'আলিফ-লাম-মিম' একটি বর্ণ; বরং আলিফ একটি বর্ণ, লাম একটি বর্ণ এবং মিম একটি বর্ণ。

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا فَإِنَّ مَنْزِلَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَؤُهَا.
অর্থ: কেয়ামতের দিন কুরআন অধ্যয়নকারীকে বলা হবে, কুরআন পাঠ করতে করতে ওপরে উঠতে থাকো। তুমি দুনিয়াতে যেভাবে ধীরেসুস্থে পাঠ করতে সেভাবে পাঠ করো। কেননা তোমার তেলাওয়াতের শেষ আয়াতেই জান্নাতে তোমার বাসস্থান হবে。

কুরআন তেলাওয়াতকারীর মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَتْلُونَ كِتَابَ اللهِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةٌ يَرْجُونَ تِجَارَةً لَّن تَبُورَ .
অর্থ: নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর কিতাব অধ্যয়ন করে, নামাজ কায়েম করে এবং আল্লাহ তাআলা যে রিজিক দিয়েছেন তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসার আশা করতে পারে, যা কখনো ধ্বংস হবে না。

কুরআন তেলাওয়াতকারীর ফজিলত সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
نَضَّرَ اللهُ امْرَأَ سَمِعَ مَقَالَتِي فَوَعَاهَا وَحَفِظَهَا وَبَلَّغَهَا.
অর্থ: আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তিকে আলোকোজ্জ্বল করুন, যে আমার কথা শুনেছে, তা কণ্ঠস্থ করেছে, সংরক্ষণ করেছে এবং অন্যের নিকট পৌঁছে দিয়েছে。

আল্লাহু আকবার! কোথায় আল্লাহ তাআলার কিতাব! আর কোথায় তোমাদের পঠিত মানবরচিত বই-পুস্তক!

টিকাঃ
২৫৬. বুখারি শরিফ: ২৬৮৫।
২৫৭. সুরা নিসা: ১৪৮।
২৫৮. তিরমিজি শরিফ: ২৯১০।
২৫৯. তিরমিজি শরিফ: ২৯১৪, ইমাম তিরমিজি বলেন, এ হাদিসটি হাসান সহিহ।-মুসনাদু আহমাদ: ৬৭৯৯।
২৬০. সুরা ফাতির: ২৯।
২৬১. তিরমিজি শরিফ: ২৬৫৮।

📘 সৎ সঙ্গে সর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ > 📄 অশ্লীল পত্র-পত্রিকা পরিত্যাগ করতে হবে

📄 অশ্লীল পত্র-পত্রিকা পরিত্যাগ করতে হবে


যেসব পত্র-পত্রিকা অশ্লীলতা ও উলঙ্গ ছবি প্রকাশ করে, সেসব পত্র-পত্রিকা বর্জন করতে হবে। কেননা, সেসবের আড়ালে শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট করে। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে, কান, চোখ এবং অন্তর কেয়ামতের দিন জিজ্ঞাসিত হবে।

আমরা তো বলি, শয়তান মানুষের পূর্ব সংঘটিত গুনাহের কারণেও পদস্খলিত করে। যেমনটা পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ تَوَلَّوْا مِنكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ إِنَّمَا اسْتَزَلَّهُمُ الشَّيْطَانُ بِبَعْضِ مَا كَسَبُوا وَلَقَدْ عَفَا اللَّهُ عَنْهُمْ.
অর্থ: নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য থেকে যারা পিছু হটে গিয়েছিল সেদিন, যেদিন দুদল মুখোমুখি হয়েছিল, শয়তানই তাদের কিছু কৃতকর্মের ফলে তাদেরকে পদস্খলিত করেছিল। আর অবশ্যই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ক্ষমা করেছেন。

আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। ওহুদ যুদ্ধে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিরন্দাজ বাহিনীকে পাহাড়ের প্রবেশদ্বারে নিযুক্ত করেছিলেন, আদেশ দিয়েছিলেন পরিস্থিতি যা-ই হোক, কোনো অবস্থাতেই স্থান ত্যাগ করবে না। যুদ্ধের পরিবেশ যখন مسلمانوں অনুকূলে এল, অন্যান্যদের মতো তিরন্দাজ বাহিনীর কিছু সদস্যও গনিমত কুড়ানোর জন্য স্থান ছেড়ে চলে আসে। ঠিক তখনই শত্রুদল প্রবেশমুখ ফাঁকা দেখে একযোগে হামলা করে। ফলে যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যায়। তাদের কিছু সদস্য যখন পাল্টা আক্রমণ করতে পরিকল্পনা করে, সে সময় স্থান ত্যাগ করা তিরন্দাজ বাহিনীর কিছু সৈনিকের মাঝে শয়তান কুমন্ত্রণা ঢেলে দেয় যে, তোমরা কীভাবে শত্রুর মোকাবিলার সাহস করো, অথচ তোমরা তোমাদের নবীর আদেশ অমান্য করে চরম অপরাধ করেছ। এখন যুদ্ধ করবে কোন শক্তিতে? সুতরাং যাও! আগে কৃত অপরাধ হতে তাওবা করো, ক্ষমা চাও! এই অপরাধ তাদের যুদ্ধের ময়দান হতে পৃষ্ঠপ্রদর্শনে উদ্বুদ্ধ করে। তখন তারা মনে মনে বলতে লাগল, এত বড় অন্যায় করে কীভাবে আমরা যুদ্ধ করব?

এই আয়াতের দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হলো, ওহুদ যুদ্ধের দিন শয়তান মুমিনদের কোনো এক দলের লোকদেরকে তাদের পূর্ব-সংঘটিত গুনাহের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তখন যুদ্ধের মাঝে তাদের ভেতরে এই কুমন্ত্রণা কাজ করে যে, কীভাবে আমরা যুদ্ধ করব, অথচ আমরা তো অপরাধী। ফলে তারা যুদ্ধ থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শনের প্রতি প্ররোচিত এবং উদ্বুদ্ধ হয়।

শয়তান এভাবেই মানুষকে ধোঁকা দেয়, পথভ্রষ্ট করে। কেউ যখন অশ্লীল ও নগ্ন ছবি দেখে শয়তান তার মনের মাঝে সেসব অশ্লীল গল্পকথা, নগ্ন ছবির চিত্র কল্পনা ও ভাবনায় স্থির করে দেয়। ফলে সে যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন সেসব চিত্র তার চোখে ভাসতে থাকে। শয়তান সেসব দৃশ্যকে তার কল্পনায় আকর্ষণীয় করে তুলে ধরে। ফলে নামাজের খুশু চলে যায় এবং নামাজের কথা ভুলে যায়। নামাজের দুআ-কালামের প্রতি আগ্রহ ও মনোযোগ চলে যায়।

আমাদের নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বোত্তম শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক। একবার তিনি একটি কাপড় পরিধান করে নামাজ পড়ছিলেন। যাতে কিছু নকশা করা ছিল। যা নামাজের প্রতি তাঁর মনোযোগ ছিন্ন করে দেয়। বুখারি শরিফে হযরত আয়েশা রাযি. হতে বর্ণিত হয়েছে; তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা একটি কারুকার্যখচিত চাদর গায়ে দিয়ে নামাজ আদায় করলেন। আর নামাজে সে চাদরের কারুকার্যের প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়ল। নামাজ শেষে তিনি বললেন, এ চাদরখানা আবু জাহমের নিকট নিয়ে যাও এবং তার থেকে আমবিজানিয়্যাহ অর্থাৎ, কারুকার্য ছাড়া মোটা চাদর নিয়ে আসো। এটা তো আমাকে নামাজ হতে অমনোযোগী করে দিচ্ছিল। হিশাম ইবনু উরওয়াহ রহ. তার পিতা হতে এবং তিনি আয়েশা রাযি. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি নামাজ আদায়ের সময় এর কারুকার্যের প্রতি আমার দৃষ্টি পড়ে। তখন আমি আশঙ্কা করছিলাম যে, এটা আমাকে ফেতনায় ফেলে দিতে পারে।

বুখারি শরিফে হযরত আনাস রাযি. থেকেও এ ব্যাপারে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

তিনি বলেন, হযরত আয়েশা রাযি.-এর নিকট একটি বিচিত্র রঙের পাতলা পর্দার কাপড় ছিল। তিনি তা ঘরের একদিকে পর্দা হিসেবে ব্যবহার করছিলেন। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার সামনে থেকে তোমার এই পর্দা সরিয়ে নাও। কারণ, নামাজ আদায়ের সময় এর ছবিগুলো আমার সামনে ভেসে ওঠে。

এমনইভাবে অশ্লীল পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে শয়তান মানুষকে তার একাকিত্বে আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতায় প্ররোচিত করে। ফলে উঠতি যুবক-যুবতির তরুণ-তরুণীরা হস্তমৈথুনের মতো জঘন্য পাপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। এসবের মাধ্যমে তাদেরকে নারীদের নিয়ে কল্পনা এবং এক পর্যায়ে ব্যভিচার ও অশ্লীল কর্মকাণ্ডের জন্য প্ররোচিত করা হয়। একইভাবে টেলিভিশন ও মোবাইলের স্ক্রিনে ভাসমান অশ্লীল ও নগ্ন ছবির প্রতি দৃষ্টিপাতের কারণে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের অন্তর কলুষিত হয় এবং তার চিন্তাভাবনার বিকৃতি ঘটে। মানুষ ফেতনা-ফ্যাসাদ ও অনৈতিক কাজে উদ্বুদ্ধ হয়। সমাজে অন্যায়-অপরাধের বিস্তার ঘটে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا.
অর্থ: নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তকরণ—এগুলোর প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে。

এ ছাড়াও অসংখ্য হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার হারাম ও নিষিদ্ধকৃত বিষয়ে দৃষ্টিপাত করতে নিষেধ করেছেন। এগুলো হলো মানুষের চারিত্রিক পবিত্রতা ও ঈমান বিনষ্টে অশ্লীল পত্র-পত্রিকা ও বিকৃত ম্যাগাজিনের ধ্বংসাত্মক দিক। এ ছাড়াও তার নেতিবাচক আরেকটি দিক হলো, এগুলোতে আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শিক্ষা দেওয়া হয়। এগুলোতে প্রচারিত সিনেমা, ধারাবাহিক নাটক ও টেলিফিল্ম এবং উপন্যাসে শেখানো হয়, কীভাবে চুরি করবে। কীভাবে মানুষ হত্যা করবে। কীভাবে মানুষ অপরকে ধোঁকা দিয়ে তার সম্পদ আত্মসাৎ করবে। কীভাবে মেয়েরা পরপুরুষকে ফাঁদে ফেলবে। এ সবকিছুই এগুলোতে শিক্ষা দেওয়া হয় এবং এসবের প্রতিই উৎসাহিত করা হয়; যা পৃথিবীতে ফেতনা-ফ্যাসাদ বিস্তার করছে।

এসবের আরও মারাত্মক নেতিবাচক দিক হলো, এগুলো মুসলমানদের ধর্মীয় নির্দেশনার অনুসরণ ও তাদের শিক্ষার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়। ফলে রাস্তাঘাটে প্রকাশ্যে নারীর সৌন্দর্যের প্রদর্শন, নাচ-গান ও অশ্লীল কর্মকাণ্ড তখন মানুষের কাছে ঘৃণিত হিসেবে বাকি থাকে না। বরং প্রতি মুহূর্তে ঘটমান এসব অপরাধের প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া জানানোর মতো ব্যক্তিও দুষ্প্রাপ্য হয়ে যায়। হায় আফসোস! কোথায় সেই মুসলমান, যাদের সম্বোধন করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন,
وَاِذَا سَاَلْتُمُوْهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوْهُنَّ مِنْ وَّرَاءِ حِجَابٍ ذٰلِكُمْ اَطْهَرُ لِقُلُوْبِكُمْ وَقُلُوْبِهِنَّ.
অর্থ: আর যখন নবীপত্নীদের কাছে তোমরা কোনো সামগ্রী চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে; এটি তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্র。

কোথায় সেসব মুসলমান! যাদেরকে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলের মাধ্যমে নির্দেশ দিয়েছেন,
قُلْ لِّلْمُؤْمِنِيْنَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُمْ ذٰلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللهَ خَبِيْرٌ بِمَا يَصْنَعُوْنَ. وَقُلْ لِّلْمُؤْمِنٰتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوْجَهُنَّ.
অর্থ: মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে。

কোথায় সেসব মুসলমান! যাদের উদ্দেশ্যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, চোখও ব্যভিচার করে, আর চোখের ব্যভিচার হলো কুদৃষ্টি।

এসবের আরেকটি ক্ষতিকর দিক হলো, এসবের কারণে দাম্পত্যজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। স্বামী যখন এসবের মাধ্যমে সুন্দরী নারীকে দর্শক এবং পরপুরুষের সামনে কৃত্রিম সাজগোজ ও সৌন্দর্যের প্রদর্শন করতে দেখে, তখন সে পৃথিবীর সব নারীকে এমনটাই কল্পনা করতে শুরু করে। নিজের স্ত্রীর সৌন্দর্য তার ভালো লাগে না এবং তার স্ত্রীকে সে এ জন্য তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। ফলে তাদের মাঝে পারস্পরিক কলহ-বিবাদ সৃষ্টি হয়। এভাবে ধীরে ধীরে স্বামী তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

অন্যদিকে, এসবের মাধ্যমে পুরুষদের কৃত্রিমভাবে ভালো মানুষ সাজিয়ে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। এই ভালো মানুষির ছদ্মবেশ দেখে অনেক নারী তাদের প্রতি প্রলুব্ধ হয় এবং প্রতারিত হয়। এ জন্যই অনেক ক্ষেত্রে একজন সতী-সাধ্বী ও চরিত্রবান নারীকে তার সতীত্ব এবং পবিত্রতা বিসর্জন দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্যতম পাপাচারী এই সমস্ত পুরুষদের প্রেমে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।

আরেকটি খারাপ দিক হলো, এসবে দীর্ঘ রাত পর্যন্ত বিভিন্ন প্রোগ্রাম ও অনুষ্ঠান প্রচারিত হওয়ায় ফজরের নামাজ ছুটে যায়। শেষরাতের কুরআন তেলাওয়াত, জিকির-আজকার, দুআ-দুরুদের আমল ছুটে যায়। এ ছাড়াও এসবের কারণে বাদ্যযন্ত্র শ্রবণ, মনকে বিক্ষিপ্ত করা, দৃষ্টিশক্তি ও স্নায়ুতন্ত্র দুর্বল করা-সহ মানুষকে এমন পরিণতির দিকে নিয়ে যায়, যা তার দ্বীন ও দুনিয়ার ক্ষতি ছাড়া কিছুই বয়ে আনে না।

কোথায় সে মুসলমান! যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ.
অর্থ: আর যারা অযথা কথা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়。

এসবের আরও একটি নেতিবাচক দিক হচ্ছে; এতে ইসলামের শিক্ষা, মূল্যবোধ ও নীতির সাথে সাংঘর্ষিক ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-ভাবনার প্রচার করা হয়। ফলে সমাজে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, নারী-পুরুষের সমান উত্তরাধিকার আইন এবং যুবক-যুবতিদের বিয়ের বয়স বৃদ্ধির আওয়াজ তোলা হয়। ওহে মুসলমান ভাই-বোনেরা! তোমরা আল্লাহ তাআলাকে নিজ জীবন, পরিবার-পরিজন এবং সাধারণ মানুষদের সঙ্গে আচার-আচরণের ক্ষেত্রে ভয় করো।

তদুপরি এসবের মাধ্যমে অনর্থক ও অসার কথাবার্তা শোনা হয় এবং সেগুলোর মাধ্যমে মিথ্যা, গোমরাহি, ধোঁকা, অপপ্রচার, প্রতারণার বিস্তার লাভ করে। এমনইভাবে কুৎসিত ও নোংরা বিষয়ের শিক্ষা দেওয়া হয়।

তাই আত্মমর্যাদাশীল মুসলমানের উচিত তার সাথি-সঙ্গী এবং বন্ধু-বান্ধব নির্বাচনের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার নির্দেশনা অনুসরণ করে চলা।

আফসোস!! এইসব কুৎসিত দৃশ্য দেখার কারণে মানুষ কত ধরনের গুনাহ এবং অপরাধে যে জড়িয়ে পড়ছে! কত ইজ্জত-সম্মান নষ্ট করা হয়েছে!! এমনকি কত মানুষ তার বোন, তার প্রতিবেশী এবং তার সহকর্মীকে লাঞ্ছিত করেছে!!! তাদের সাথে ব্যভিচারের মতো ধ্বংসাত্মক মহা অপরাধে লিপ্ত হয়েছে সেই সমস্ত অশ্লীল ভিডিও এবং দৃশ্য দেখার কারণে।

তদুপরি এসবের মাধ্যমে জ্ঞানী-গুণীজন, আলেম-ওলামা ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিদের সম্পর্কে মিথ্যা অপপ্রচার ও বিকৃত তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে সবচেয়ে ভালো মানুষদের সমাজের চোখে অপরাধী বানানোর চেষ্টা করা হয়।

চরিত্রবান ও সৎ ব্যক্তিদেরকে মূর্খ এবং পশ্চাদ্গামী বলে প্রচার করা হয়। এ সমস্ত মিডিয়ার কারণে মানুষ মন্দকে ভালো আর ভালোকে খারাপ মনে করতে শুরু করে দেয়。

টিকাঃ
২৬২. সুরা আলে ইমরান: ১৫৫।
২৬৩. বুখারি শরিফ: ৩৭৩।
২৬৪. বুখারি শরিফ: ৩৭৪।
২৬৫. সুরা ইসরাইল: ৩৬।
২৬৬. সুরা আহযাব-৫৩।
২৬৭. সুরা নূর: ৩০, ৩১।
২৬৮. সুরা মুমিনুন: ৩。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00