📘 সৎ সঙ্গে সর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ > 📄 এরাও আপনার সঙ্গী

📄 এরাও আপনার সঙ্গী


সহধর্মিণী, প্রতিবেশী, সফরসঙ্গী, বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকা-এরাও আপনার সাথি-সঙ্গী। তাই সচেতনার সাথে তাদের নির্বাচন করুন এবং তাদের বিষয়ে সতর্ক হোন।

স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য সবচেয়ে কাছের সঙ্গী। তাই অন্তরঙ্গ সেই বন্ধুর যথার্থ নির্বাচন ও তার বিষয়ে সর্তকতা জরুরি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ.
অর্থ: হে মুমিনগণ, তোমাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের কেউ কেউ তোমাদের দুশমন। অতএব তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো。

স্বামীদের মাঝে অনেকেই আছেন, যে তার স্ত্রীকে আল্লাহ তাআলার বিধি-বিধানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহর দেওয়া বিধান পালনে স্ত্রীকে সহযোগিতা করে। ফজর নামাজের জন্য ঘুম থেকে ডেকে দেয়। ফরজ নামাজের পরে নফল আদায়ে উদ্বুদ্ধ করে। যেমনটা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করতেন। একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে বললেন,
سُبْحَانَ اللهِ مَاذَا أُنْزِلَ اللَّيْلَةَ مِنَ الْفِتَنِ وَمَاذَا فُتِحَ مِنَ الْخَزَائِنِ أَيْقِظُوا صَوَاحِبَاتِ الْحُجَرِ، فَرُبّ كَاسِيَةٍ فِي الدُّنْيَا عَارِيَةٍ فِي الْآخِرَةِ.
অর্থ: সুবহানাল্লাহ! এ রাতে কতই-না বিপদাপদ নেমে আসছে এবং কতই-না ভান্ডার উন্মুক্ত করা হচ্ছে! অন্য সব ঘরের নারীদেরও জানিয়ে দাও, বহু নারী যারা দুনিয়ায় পোশাক পরিহিতা, তারা আখেরাতে হবে বিবস্ত্র。

অপর এক হাদিসে এমন উত্তম গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী স্বামীর বিশেষত্ব উল্লেখ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি দয়া করুন, যে রাতে উঠে নামাজ পড়ে এবং নিজ স্ত্রীকেও জাগায়। অতঃপর যদি সে জাগ্রত হতে অস্বীকার করে, তাহলে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। অনুরূপ আল্লাহ সেই নারীর প্রতি দয়া করুন, যে রাতে উঠে নামাজ পড়ে এবং নিজ স্বামীকেও জাগায়। অতঃপর যদি সে জাগ্রত হতে অস্বীকার করে, তাহলে সে তার মুখে পানির ছিটা মারে。

এদের মাঝে নামাজের জন্য নির্দেশকারী যেমন আছে, তেমনই আল্লাহর কোনো বান্দাকে নামাজ পড়তে নিষেধকারীও আছে।

অনেক পুণ্যবান নারী এমন আছে, যে তার স্বামীকে দান-সদকা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সুসম্পর্ক ও মাতা-পিতার হক আদায়ের কথা তার স্বামীকে স্মরণ করিয়ে দেয়। পক্ষান্তরে অনেক স্ত্রী আছে, যারা স্বামীকে কৃপণতা করতে উৎসাহ দেয় এবং আত্মীয়তার সম্পর্কচ্ছেদ এবং পিতা-মাতার নাফরমানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কিছু নারী এমন রয়েছে, যারা রবের পরিচয় জানে, তাঁর নির্ধারিত তাকদিরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং আল্লাহর দেওয়া দুঃখ-কষ্টে ধৈর্যধারণ করে। পক্ষান্তরে এমন কিছু নারীও রয়েছে, যারা আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে বেখবর ও জ্ঞানহীন। আল্লাহর ফয়সালা ও সিদ্ধান্তের ওপর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে। সুখের সময়গুলো অস্বীকার করে এবং অনুগ্রহগুলোকে ভুলে যায়। এ কারণেই আল্লাহর নবী হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইলকে তার দরজার চৌকাট পরিবর্তন করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর এই নির্দেশ মূলত আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ ও অবাধ্য স্ত্রীকে তালাকের নির্দেশ ছিল। বুখারি শরিফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নারী জাতি সর্বপ্রথম কোমরবন্দ বানানো শিখেছে ইসমাইল আলাইহিস সালামের মায়ের নিকট থেকে। হাজেরা আলাইহিস সালাম কোমরবন্দ লাগাতেন সারাহ আলাইহিস সালাম থেকে নিজের মর্যাদা গোপন রাখার জন্য। অতঃপর ইবরাহিম আলাইহিস সালাম হাজেরা আলাইহাস সালাম এবং তাঁর শিশু ছেলে ইসমাইল আলাইহিস সালামকে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন এ অবস্থায় যে, হাজেরা আলাইহাস সালাম শিশুকে দুধ পান করাতেন। অবশেষে যেখানে কাবা ঘর অবস্থিত, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাঁদের উভয়কে সেখানে নিয়ে এসে মসজিদের উঁচু অংশে জমজম কূপের নিকটবর্তী উঁচু স্থানে অবস্থিত একটি বিরাট গাছের নিচে রাখলেন। তখন মক্কায় না ছিল কোনো মানুষ, না ছিল কোনো পানির ব্যবস্থা। তিনি তাদেরকে সেখানেই রেখে গেলেন। আর তিনি তাদের নিকট রেখে গেলেন একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর এবং একটি মশকে কিছু পরিমাণ পানি। অতঃপর ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ফিরে চললেন। তখন ইসমাইল আলাইহিস সালামের মা পিছু পিছু এসে বলতে লাগলেন, হে ইবরাহিম! আপনি কোথায় চলে যাচ্ছেন? আমাদেরকে এমন এক ময়দানে রেখে যাচ্ছেন, যেখানে না আছে কোনো সাহায্যকারী আর না আছে কোনো কিছু। তিনি এ কথা তাকে বারবার বললেন। কিন্তু ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাঁর দিকে তাকালেন না। তখন হাজেরা আলাইহাস সালাম তাঁকে বললেন, এর আদেশ কি আপনাকে আল্লাহ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। হাজেরা আলাইহাস সালাম বললেন, তাহলে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না। অতঃপর তিনি ফিরে এলেন।

এই হাদিসে আরও উল্লেখ করেন, ইসমাইলের বিবাহের পর ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাঁর পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা দেখার জন্য এখানে এলেন। কিন্তু তিনি ইসমাইলকে পেলেন না। তিনি তাঁর স্ত্রীকে তাঁর সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে স্ত্রী বলল, তিনি আমাদের জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। অতঃপর তিনি পুত্রবধূকে তাঁদের জীবনযাত্রা এবং অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, আমরা অতি দুরবস্থায়, টানাটানি ও খুব কষ্টে আছি। সে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের নিকট তাদের দুর্দশার অভিযোগ করল। তিনি বললেন, তোমার স্বামী বাড়ি এলে তাকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ পাল্টিয়ে নেয়। পরবর্তীতে যখন ইসমাইল বাড়ি এলেন, তখন তিনি যেন কারও আগমনের আভাস পেলেন। তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের নিকট কেউ কি এসেছিল? স্ত্রী বলল, হ্যাঁ। এমন এমন আকৃতির একজন বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং আমাকে আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ দিলাম। তিনি আমাকে আমাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আমি তাঁকে জানালাম, আমরা খুব কষ্ট ও অভাবে আছি। ইসমাইল আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি তোমাকে কোনো উপদেশ দিয়েছেন? স্ত্রী বলল, হ্যাঁ। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন আপনাকে তাঁর সালাম পৌঁছিয়ে বলি; আপনি যেন আপনার ঘরের দরজার চৌকাঠ পাল্টিয়ে নেন। ইসমাইল আলাইহিস সালাম বললেন, তিনি আমার পিতা। এ কথা দ্বারা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আমি যেন তোমাকে তালাক দিয়ে দিই। অতএব তুমি তোমার আপনজনের নিকট চলে যাও। অতঃপর তিনি তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন এবং অন্য নারীকে বিয়ে করে নেন। অতঃপর দীর্ঘদিন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাদের থেকে দূরে থাকেন। দীর্ঘ সময় পর ইবরাহিম আলাইহিস সালাম আবার এলেন। তখনও হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালামকে বাড়িতে পাননি। তিনি ইসমাইল আলাইহিস সালামের স্ত্রীর নিকট গিয়ে তাঁর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে স্ত্রী জবাবে বলল, তিনি আমাদের জীবিকার খুঁজে গিয়েছেন। অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের দিন-কাল কেমন কাটছে? স্ত্রী বলল, আলহামদুলিল্লাহ আমরা খুবই ভালো আছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের খাবার কী? স্ত্রী বলল, গোশত। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন তোমাদের পানীয় কী? স্ত্রী বলল, পানি। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের গোশত ও পানিতে বরকত দান করুন। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তাদের নিকট তখন কোনো শস্য ছিল না। যখন তাদের নিকট কোনো শস্য থাকত, তখন তারা লোকজনকে দাওয়াত করতেন। তবে তারা ঘটনাচক্রে দু-একজন ছাড়া মক্কার বাহিরের কাউকে পেতেন না।' অতঃপর ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বলেন, যখন তোমার স্বামী আসবে, তাকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে, সে যেন তার দরজার চৌকাঠ বহাল রাখে। সুতরাং যখন ইসমাইল আলাইহিস সালাম এলেন, তখন জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের এখানে কি কেউ এসেছিল? সে বলল, হ্যাঁ, একজন সুন্দর অবয়বের বৃদ্ধ এসেছিলেন। তিনি আপনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি আপনার কথা জানিয়েছি। তিনি আমাদের জীবন ধারণের ব্যাপারেও জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি বলেছি আমরা ভালো আছি। তখন ইসমাইল আলাইহিস সলাম বললেন, তিনি কি তোমাকে কোনো উপদেশ দিয়েছেন? সে বলল, হ্যাঁ, তিনি আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং আপনাকে বলেছেন, আপনি যেন আপনার দরজার চৌকাঠ বহাল রাখেন। তখন ইসমাইল আলাইহিস সালাম বললেন, তিনি আমার পিতা। আর দরজার চৌকাঠ মূলত তুমি। তিনি তোমাকে স্ত্রী হিসেবে বহাল রাখতে বলেছেন。

টিকাঃ
২৩৫. সুরা তাগাবুন: ১৪।
২৩৬. বুখারি শরিফ: ১১৫。
২৩৭. আবু দাউদ শরিফ: ১৩০৮; নাসায়ি শরিফ : ১৬১০; ইবনু মাজাহ : ১৩৩৬; মুসনাদু আহমাদ : ৭৩৬২。
২৩৮. বুখারি শরিফ: ৩৩৬৪।

📘 সৎ সঙ্গে সর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ > 📄 প্রতিবেশী

📄 প্রতিবেশী


সৎ ও ভালো মানুষকে প্রতিবেশী হিসেবে নির্বাচন করুন। সুখে-দুঃখে আপনার পাশে থাকবে। অভাবে সহযোগিতা করবে। আপনার ইবাদত-বন্দেগিতে সহযোগী হবে। নামাজের সময় ডেকে নিয়ে যাবে। মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। তাদের দ্বারা আপনার পরিবার-পরিজন নিরাপত্তা পাবে। আপনার অবর্তমানে তারাই দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে। তার থেকে ভালো কথা শুনতে পাবে। তার ঘর থেকে আলো বিচ্ছুরিত হবে। তার ঘরে আল্লাহর বাণী তেলাওয়াত হতে শুনবে। নামাজের জন্য তোমাকে জাগ্রত করবে। নফল ও ফরজ রোজা পালনের কথা, রোগীর সেবার কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। সৎকাজ ও অনুগ্রহে তোমার সহযোগী হবে।

পক্ষান্তরে অসৎ লোক প্রতিবেশী হলে সবকিছু তার বিপরীত হবে। তার থেকে মন্দ কথা শুনবে। সর্বদা তার খেয়ানতের আতঙ্কে থাকবে। তোমার অনুপস্থিতিতে পরিবারের ব্যাপারে তার থেকে অনিষ্ট ও অকল্যাণের শঙ্কায় থাকবে। তোমার গোপন বিষয় খুঁজে বেড়াবে এবং তা প্রচার করবে। তোমার প্রতি রবের অনুগ্রহ ও নেয়ামতের ব্যাপারে হিংসা করবে। তাই বসবাসের জন্য বাড়ি কেনার আগে প্রতিবেশীদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নাও। কেননা তাদের সন্তানদের দ্বারা তোমার সন্তানাদি প্রভাবান্বিত হবে। আল্লাহ তাআলার নিরাপত্তাই সর্বোত্তম নিরাপত্তা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00