📄 সৎ বন্ধুর সাহচর্য গুনাহ থেকে বিরত রাখে
নেককার লোকদের সাথে উঠাবসার অন্যতম একটি ফায়দা হলো, তুমি তার লজ্জায় এবং তার সাথে সম্পর্কের খাতিরে অন্যায়-অপরাধ এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবে। তাই দ্বীনদার সৎ বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক করবে এবং চলাফেরা করবে। এতে বহু পাপ ও অন্যায় থেকে বেঁচে যাবে।
মুসলিম শরিফে হযরত আবু মাসউদ বদরি রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি আমার এক ক্রীতদাসকে চাবুক দিয়ে প্রহার করছিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে থেকে একটি শব্দ শোনলাম, হে আবু মাসউদ। জেনে রেখো! রাগের কারণে আমি শব্দটি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম না। বর্ণনাকারী বলেন, যখন তিনি আমার কাছাকাছি এলেন তখন দেখতে পেলাম, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তিনি বলছেন, হে আবু মাসউদ! তুমি জেনে রেখো, হে আবু মাসউদ! তুমি জেনে রেখো! বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আমি চাবুকটি আমার হাত থেকে ফেলে দিলাম। এরপর তিনি বললেন, হে আবু মাসউদ! তুমি জেনে রেখো যে, এ গোলামের ওপর তোমার ক্ষমতার চেয়ে তোমার ওপর আল্লাহ তাআলা অধিক ক্ষমতাবান। বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, এরপর কখনো কোনো কৃতদাসকে আমি প্রহার করব না。
মুসলিম শরিফের অন্যত্র হযরত আবু মাসউদ বদরি রাযি. থেকে এই হাদিস এভাবে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি আমার এক দাসকে প্রহার করছিলাম। হঠাৎ আমার পেছন দিক থেকে একটি আওয়াজ শোনলাম। হে আবু মাসউদ! জেনে রেখো, তুমি তার ওপর যেরূপ শক্তিমান, আল্লাহ তাআলা তোমার ওপর এর চেয়ে অধিক শক্তিমান। হঠাৎ পেছন দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! সে আল্লাহর ওয়াস্তে মুক্ত। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সাবধান! যদি তুমি তা না করতে, তাহলে অবশ্যই জাহান্নام তোমাকে গ্রাস করত। কিংবা জাহান্নাম তোমাকে অবশ্যই স্পর্শ করত。
টিকাঃ
২২২. মুসলিম শরিফ: ১৬৫৯。
২২৩. মুসলিম শরিফ: ১৬৫৯।
📄 শয়তান সালেহিনদের মজলিসকে ভয় পায়
ইমাম আহমদ রহ. প্রমুখ বিশুদ্ধ সনদে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.-এর হাদিস বর্ণনা করেন। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন উপস্থিত মানুষদের লক্ষ্য করে ঘোষণা করলেন, আমার সাহাবাদের সম্মান করো... অতঃপর একাংশে বলেন, সাবধান! যে ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যস্থলের আকাঙ্ক্ষী, সে যেন সাহাবা, তাবেয়ি, তাবে তাবেয়িন ও সালাফে সালেহিনের অনুসরণ করে চলে। কেননা শয়তান বিচ্ছিন্ন লোকের সাথে থাকে। আর দুইজনের জামাত হতে অধিক দূরে থাকে...।
হযরত মুআয রাযি.-এর সূত্রে বর্ণিত হাদিসেও এই হাদিসের সমর্থন পাওয়া যায়। যেমন,
إن الشيطان ذئب ابن آدم كذئب الغنم، وإن ذئب الغنم يأخذ من الغنم الشاة المهزولة والقاصية، ولا يدخل في الجماعة، فالزموا العامة والجماعة والمساجد.
অর্থ: নিঃন্দেহে শয়তান আদমসন্তানের জন্য বকরির পালের জন্য অপেক্ষারত বাঘের ন্যায়। আর বকরির পালের জন্য অপেক্ষারত বাঘ সেই বকরিকে আক্রমণ করে, যে দল থেকে বিচ্ছিন্ন এবং শীর্ণকায় দুর্বল থাকে। দলবদ্ধ বকরির পালে সে আক্রমণ করতে সাহস করে না। তাই তোমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সাথে থেকো এবং দলবদ্ধ হয়ে থেকো। আর মসজিদে জামাতে নামাজের পাবন্দি করো。
টিকাঃ
۲۲۴. মুসনাদে আহমদ: ১/২৬।
২২৫. মুনতাখাবে আবদ ইবনে হুমায়িদ: ১১৪।
📄 সালেহিনের মজলিসে রয়েছে সম্মান ও মর্যাদা
আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বোত্তম নবী। তাই তার যুগটা যেমন সর্বোত্তম যুগ, তেমনই তার উম্মতও সর্বোত্তম উম্মত। আর এই উম্মতের মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ, সর্বোত্তম নবীর সাহচর্য এবং তাঁর পবিত্র মজলিসগুলো। এমনইভাবে সকল নবী, নেককার, আলেম, শহিদ এবং ইমামের সাথিরাও একই কারণে মর্যাদাবান হয়।
হযরত আবু দারদা রাযি.-এর নিকট কুফাবাসীকে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ, আম্মার ও হযরত হুযায়ফা রাযি.-এর বরকতময় উপস্থিতিকে তাদের ওপর আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ হিসেবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
বুখারি শরিফে হযরত আলকামা রাযি.-এর হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, একবার আমি সিরিয়ায় গেলাম এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করে দুআ করলাম, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে একজন নেককার সাথি মিলিয়ে দিন। অতঃপর আমি এক কওমের নিকট এসে বসলাম। তখন একজন বৃদ্ধ লোক এসে আমার পাশেই বসলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তারা উত্তরে বললেন, ইনি আবু দারদা রাযি.। আমি তখন তাকে বললাম, একজন সৎ সঙ্গীর জন্য আমি আল্লাহর নিকট দুআ করছিলাম। আল্লাহ আপনাকে মিলিয়ে দিয়েছেন। তিনি বললেন, তুমি কোথাকার অধিবাসী? আমি বললাম, আমি কুফার অধিবাসী। তিনি বললেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জুতা, বালিশ এবং ওজুর পাত্র বহনকারী সার্বক্ষণিক সাহচর্যপ্রাপ্ত ইবনু উম্মে আবদ রাযি. কি তোমাদের ওখানে নেই? তোমাদের মাঝে কি ওই ব্যক্তি নেই, যাকে আল্লাহ শয়তান হতে নিরাপত্তা দান করেছেন? (অর্থাৎ আম্মার ইবনু ইয়াসির রাযি.) তোমাদের মধ্যে কি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপন তথ্যবিদ লোকটি নেই? যিনি ছাড়া অন্য কেউ এসব রহস্য জানেন না। [অর্থাৎ হুযায়ফা রাযি.]
টিকাঃ
২২৬. বুখারি শরিফ: ৩৭৪২।
📄 কল্যাণের মজলিস উপেক্ষা করাকে আল্লাহ তাআলা উপেক্ষা করেন
বুখারি ও মুসলিম শরিফে হযরত আবু ওয়াকিদ লাইসি রাযি. হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা মসজিদে বসে ছিলেন। তাঁর সাথে আরও লোকজন ছিলেন। এমতাবস্থায় তিনজন লোক এল। তন্মধ্যে দুজন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে এগিয়ে এলেন এবং একজন চলে গেলেন। আবু ওয়াকিদ রাযি. বলেন, তারা দুজন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। অতঃপর তাদের একজন মজলিসের মধ্যে কিছুটা খালি জায়গা দেখে সেখানে বসে পড়লেন এবং অপরজন তাদের পেছনে বসলেন। আর তৃতীয় ব্যক্তি ফিরে গেল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবসর হয়ে সাহাবিদের লক্ষ্য করে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে এই তিন ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু বলব না? তাদের একজন আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করল, আল্লাহ তাকে আশ্রয় দিলেন। অন্যজন লজ্জাবোধ করল, তাই আল্লাহও তার ব্যাপারে লজ্জাবোধ করলেন। আর অপরজন মুখ ফিরিয়ে নিলেন, তাই আল্লাহ তাআলাও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন。
হযরত সাহাবায়ে কেরাম রাযি. থেকে অনেক অকল্পনীয় বিস্ময়কর ঘটনাবলি প্রকাশ পেয়েছে। এসব অর্জন প্রিয় নবীজির অনুসরণ, অনুকরণ, তাঁর সান্নিধ্য গ্রহণ এবং তাঁর সাহচর্য অবলম্বনের বরকতেই হয়েছে। যেমন: হযরত খালেদ রাযি. কর্তৃক বিষ পান করা এবং কোনো ক্ষতি না হওয়ার ঘটনা। 'ফাজায়েলে সাহাবা' গ্রন্থে বিশুদ্ধ সনদে ইমাম আহমদ রহ. হযরত কায়েস রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, মহাবীর হযরত খালেদ ইবনু ওয়ালিদ রাযি.-এর সামনে বিষ আনা হলো। তিনি তখন জানতে চাইলেন, এটা কী? উত্তর এল, বিষ। তিনি অমনই তা পান করে নিলেন। কিন্তু আল্লাহর রহমতে কোনো প্রতিক্রিয়াই হলো না。
আরেক সাহাবি হযরত ইমরান ইবনু হুসাইন রাযি.। তিনি যখন বাহিরে বের হতেন ফেরেশতারা তাকে সালাম করত। হযরত মুতাররিফ রহ.-এর সূত্রে মুসলিম শরিফে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইমরান ইবনু হুসাইন রাযি. মৃত্যুকালীন রোগে আমাকে ডেকে পাঠান। তিনি বললেন, আমি তোমাকে কয়েকটি হাদিস বলব, আশা করি আল্লাহ তাআলা আমার পরে তোমাকে এর দ্বারা উপকৃত করবেন। আমি বেঁচে থাকলে তুমি আমার সূত্রে বর্ণনা করা গোপন রাখবে। আর আমি মারা গেলে তুমি চাইলে তা বর্ণনা করতে পারো। আমাকে সালাম করা হতো。
হযরত উসাইদ ইবনু হুযাইর এবং আববাদ ইবনু বিশর রাযি. যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অন্ধকার রাত্রে ফিরছিলেন তখন তাদের দুজনের হাতের লাঠি আলোকোজ্জ্বল হয়ে আলো ছড়াতে লাগল।
মুসনাদু আহমাদে বিশুদ্ধ সনদে হযরত আনাস রাযি.-এর সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, উসাইদ ইবনু হুযাইর এবং আববাদ ইবনু বিশর নামক দুই ব্যক্তি এক অন্ধকার রজনিতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দেখা করতে এসেছিল। কথা শেষে তারা যখন ফিরে যাচ্ছিল তখন তাদের একজনের হাতের লাঠি আলো ছড়াচ্ছিল এবং সেই আলোতে তারা পথ চলছিল। এক পর্যায়ে তাদের দুজনের পথ যখন আলাদা হয়ে গেল, তখন দুজনের হাতের লাঠিই আলোকোজ্জ্বল হয়ে গেল।
তবে বুখারিতে সাহাবাদ্বয়ের নাম উল্লেখ ব্যতীত হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে। হযরত আনাস রাযি. বলেন,
أَنَّ رَجُلَيْنِ خَرَجًا مِنْ عِنْدِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فِي لَيْلَةٍ مُظْلِمَةٍ وَإِذَا نُوْرُ بَيْنَ أَيْدِيهِمَا حَتَّى تَفَرَّقَا فَتَفَرَّقَ النُّوْرُ مَعَهُمَا.
অর্থ: দুই ব্যক্তি অন্ধকার রাতে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হতে বের হলেন। হঠাৎ তারা তাদের সম্মুখে একটি উজ্জ্বল আলো দেখতে পেলেন। রাস্তায় তারা যখন আলাদা হলেন তখন আলোটিও তাদের উভয়ের সাথে আলাদা আলাদা হয়ে গেল。
টিকাঃ
২২৭. বুখারি শরিফ: ৬৬; মুসলিম শরিফ: ২১৭৬。
২২৮. ইমাম আহমদের ফাজায়েলে সাহাবা: ১৪৮২।
২২৯. মুসলিম শরিফ: ১২২৬। মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থে ইমাম নববি রহ. লেখেন, হযরত ইমরান ইবনু হুসাইন রাযি. অর্শ্বরোগী ছিলেন। আর তা মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। তখন ফেরেশতারা তাকে সালাম করত। রোগের কারণে তপ্ত লোহার দাগ গ্রহণ করলে সালাম দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আবার যখন দাগ দেওয়া বন্ধ করেন, পুনরায় সালাম দেওয়া শুরু হয়।
২৩০. অর্থাৎ আমার জীবদ্দশায় তুমি কাউকে এ কথা বলো না যে, আমাকে ফেরেশতারা সালাম করে। কেননা এ কথা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পরলে ফেতনা সৃষ্টি হতে পারে। এই ভয়ে তিনি তাকে এ কথা বলেছেন যে, আমি বেঁচে থাকলে তুমি আমার সূত্রে বর্ণনা করা গোপন রাখবে। আর আমি মারা গেলে তুমি চাইলে তা বর্ণনা করতে পার। এ ছাড়াও মুসলিম শরিফের অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রোগের কারণে তপ্ত লোহার দাগ গ্রহণ, করার পূর্ব পর্যন্ত আমাকে ফেরেশতাগণ কর্তৃক সালাম দেওয়া অব্যাহত ছিল। আমি দাগ গ্রহণ করলে সালাম দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আবার যখন দাগ দেওয়া বন্ধ করলাম, পুনরায় সালাম দেওয়া শুরু হয়।
২৩۱. মুসনাদু আহমদ: ৩/১৯০।
২৩২. বুখারি শরিফ: ৩৮০৫।