📄 সৎ সঙ্গী ভালো কাজে প্রেরণা জোগাবে
এতে দিনদিন ইবাদত-বন্দেগি ও আল্লাহ তাআলার স্মরণ এবং নেক আমল বৃদ্ধি পাবে। যেমন: রাতে তুমি যদি দুই রাকাত নফল নামাজ পড়তে। এরপর যখন তোমার বন্ধুকে প্রতিদিন চার রাকাত পড়তে দেখবে, তখন তুমিও দুই রাকাতের পরিবর্তে চার রাকাত নফল নামাজ পড়তে আগ্রহী হয়ে উঠবে। এমনইভাবে যদি তুমি দুই-চার টাকা দান করতে। অতঃপর তুমি যখন তোমার মতোই অবস্থার এক বন্ধুকে পাঁচ-দশ টাকা দান করতে দেখবে, তখন নিঃসন্দেহে তুমিও আরও বেশি দান করার প্রতি উদ্বুদ্ধ হবে ইনশাআল্লাহ।
যেমনটা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.-এর ক্ষেত্রে ঘটেছে। একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দানের জন্য সাহাবাদের উদ্বুদ্ধ করেন, তখন তিনি তার অর্ধেক সম্পদ এনে উপস্থিত করেন। কিন্তু আবু বকর সিদ্দিক রাযি.-কে তখন সম্পূর্ণ সম্পদ নিয়ে উপস্থিত হতে দেখলেন। এ সম্পর্কে হযরত যায়েদ ইবনু আসলাম রহ. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, আমি হযরত উমর রাযি.-কে বলতে শুনেছি, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে দান করার নির্দেশ দেন। ঘটনাক্রমে সেদিন আমার কাছে সম্পদ ছিল। আমি মনে মনে বললাম, আজ আমি আবু বকর রাযি.-এর চাইতে অগ্রগামী হব, যদিও কোনোদিন দানের ক্ষেত্রে আমি তার অগ্রগামী হতে পারিনি। তাই আমি আমার অর্ধেক সম্পদ নিয়ে আসি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করেন, তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের জন্য কী রেখে এসেছ? আমি বললাম, এর সমপরিমাণ সম্পদ রেখে এসেছি। উমর রাযি. বলেন, আর আবু বকর রাযি. আনলেন তার সমস্ত সম্পদ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের জন্য কী রেখে এসেছ? তিনি বলেন, আমি তাদের জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলকে রেখে এসেছি। উমর রাযি. বলেন, তখন আমি মনে মনে নিজেকে নিজে বললাম, ভবিষ্যতে কোনোদিন কোনো ব্যাপারে অধিক ফজিলতের অধিকারী হওয়ার জন্য আপনার সাথে প্রতিযোগিতা করব না。
টিকাঃ
১৯৩. আবু দাউদ শরিফ: ১৬৭৮।
📄 সৎ বন্ধু সালেহিনদের সাথে পরিচয় করাবে
একজন সৎ বন্ধু তোমাকে ভালো মানুষদের মজলিসে নিয়ে যাবে। তাদের পথে পরিচালিত করবে। হযরত আনাস রাযি. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আবু বকর রাযি. উমর রাযি.-কে বললেন, চলো উম্মু আইমানের নিকট যাই, তার সাথে সাক্ষাৎ করব। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে দেখা করতেন। যখন আমরা তার নিকট গেলাম, তখন তিনি কাঁদতে লাগলেন। তারা উভয়ে বললেন, তুমি কাঁদছ কেন? আল্লাহ তাআলার নিকট যা কিছু আছে তা তার রাসুলের জন্য সর্বাধিক উত্তম। উম্মু আইমান রাযি. বললেন, এ জন্য আমি কাঁদছি না, বরং আমি এ জন্য কাঁদছি যে, আকাশ হতে ওহি আসা বন্ধ হয়ে গেল। উম্মু আইমানের এ কথা তাদেরকে কান্নাপ্লুত করে তুলল। অতএব তারাও তার সঙ্গে কাঁদতে শুরু করলেন。
টিকাঃ
১৯৪. মুসলিম শরিফ: ২৪৫৪।
📄 সৎ সঙ্গী আল্লাহর পুরস্কারপ্রাপ্তির পথ দেখাবে
হযরত ইবনু আবি মুলাইকা রাযি. থেকে বুখারি শরিফে বর্ণিত হয়েছে, ইবনু আব্বাস রাযি. আয়েশা রাযি.-এর ওফাতের পূর্বে তার কাছে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলেন। এ সময় আয়েশা রাযি. মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিলেন। তিনি বললেন, আমি ভয় করছি, তিনি আমার কাছে এসে আমার প্রশংসা করবেন। তখন আয়েশা রাযি.-এর কাছে বলা হলো, তিনি হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাতো ভাই এবং সম্মানিত মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি বললেন, তাহলে তাকে অনুমতি দাও। তিনি এসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কাছে আপনার অবস্থা কেমন লাগছে? তিনি বললেন, আমি যদি নেককার হই, তাহলে ভালোই আছি। ইবনু আব্বাস রাযি. বললেন, আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি নেককারই আছেন। আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহধর্মিণী এবং তিনি আপনাকে ব্যতীত আর কোনো কুমারীকে বিবাহ করেননি এবং আপনার নির্দোষিতা আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর তার পেছনে ইবনু যুবায়ের রাযি. প্রবেশ করলেন। তখন আয়েশা রাযি. বললেন, ইবনু আব্বাস রাযি. আমার কাছে এসেছিলেন এবং আমার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু আমি এটাই পছন্দ করি যে, আমি যেন মানুষের স্মৃতি থেকে পুরোপুরি মুছে যাই。
টিকাঃ
১৯৫. বুখারি শরিফ: ৪৭৫৩।
📄 সৎ লোকের সাহচর্য সৎকাজে উৎসাহিত করে
এ ব্যাপারে ইতিপূর্বে দান-সদকার ক্ষেত্রে আবু বকর ও উমর রাযি.-এর প্রতিযোগিতার ঘটনা অতিবাহিত হয়েছে। সৎকাজে প্রতিযোগিতার এমনই এক ঘটনা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে, হযরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর ও উমর রাযি.-কে সাথে নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করে দেখতে পেলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযি. নামাজে সুরা নিসা তেলাওয়াত করছেন। সুরা নিসা শেষ করে তিনি সুরা মায়েদার শুরু পর্যন্ত তেলাওয়াত করলেন। এরপর নামাজে দণ্ডায়মান অবস্থায় আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করতে শুরু করলেন। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি আল্লাহর কাছে চাও, তোমাকে তা দেওয়া হবে। তুমি যা চাও তোমাকে তাই দেওয়া হবে। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের উদ্দেশ্যে বললেন, আল্লাহ তাআলা যেভাবে কুরআন নাজিল করেছেন, সেভাবে কুরআন তেলাওয়াত করে যদি আনন্দিত হতে চায়, তাহলে সে যেন ইবনু উম্মে আবদের ন্যায় কুরআন তেলাওয়াত করে। পরদিন সকালে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাযি. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযি.-কে এই সুসংবাদ দিতে গেলেন এবং বললেন, তুমি রাতে নামাজে আল্লাহর কাছে কী দুআ করেছিলে? উত্তরে তিনি বললেন, আমি দুআ করেছি হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে পরিপূর্ণ ঈমান কামনা করছি, যা থেকে আমি পিছপা হব না এবং এমন নেয়ামত কামনা করছি, যা কখনো শেষ হবে না আর আমি কামনা করছি চিরস্থায়ী জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য ও সান্নিধ্য। এরপর হযরত উমর রাযি.-এলেন। তখন কেউ তাকে বলল, নিঃসন্দেহে আবু বকর সিদ্দিক রাযি. আপনার থেকে আগে বেড়ে গেছেন। জবাবে হযরত উমর রাযি. বললেন, আল্লাহ তাআলা হযরত আবু বকর-এর ওপর রহম করুন কখনই আমি তাকে পেছনে ফেলতে পারব না। তার আগে যেতে পারব না。
অনুরূপভাবে ভালো সঙ্গী তার সাথির প্রতি সহমর্মিতা ও সর্বক্ষেত্রে তাদের অনুসরণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে। এমনকি তার চলন-বলন, উঠা-বসা ও হাঁটার ক্ষেত্রেও। যেমন: হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযি. সর্বক্ষণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্যে থাকার কারণে চলন-বলন, হাঁটা- চলা ও স্বভাবে তাঁর অনুকরণ করেন।
ইমাম বুখারি রহ. হযরত আবদুর রহমান ইবনু ইয়াজিদ রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, আমরা হুযায়ফা রাযি.-কে এমন এক ব্যক্তির সন্ধান দিতে অনুরোধ করলাম, যার আকার-আকৃতি, চাল-চলন, আচার-ব্যবহার এবং স্বভাব- চরিত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সবচেয়ে মিল আছে, আমরা তাঁর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করব। হুযায়ফা রাযি. বললেন, আকার- আকৃতি, চাল-চালন, আচার-ব্যবহার এবং স্বভাব-চরিত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সবচেয়ে মিল আছে এমন লোক আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযি. ছাড়া অন্য কাউকেও আমি জানি না。
এমনইভাবে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা রাযি. মুতার যুদ্ধে তার দুই সাথি হযরত যায়েদ ইবনু হারেসা ও হযরত জাফর ইবনু আবি তালেব রাযি.-এর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের জন্য সামনে এগিয়ে যান। ফলে তাদের মতো তিনিও শাহাদতবরণ করেন। তিনি তার দুই সঙ্গী হযরত যায়েদ ও জাফর রাযি.-এর সহযোগিতার উদ্দেশ্যে রণাঙ্গনে অবতরণ করেন। তখন তার চাচাতো ভাইও সেখানে আসেন। তার নিকট গোশতের টুকরো ছিল। সে বলল, তুমি এটি খেয়ে তোমার পিঠ সোজা করে নাও। কেননা আজ তুমি অনেক কষ্ট করেছ। সুতরাং গোশতের টুকরোটি খাওয়ার উদ্দেশ্যে সে তার হাত থেকে নিয়ে দাঁত দ্বারা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরল। এরই মধ্যে রণাঙ্গনের এক প্রান্ত হতে মানুষের শোরগোলের আওয়াজ ভেসে এল। তখন সে নিজেকে সম্বোধন করে বলল, তুমি এখনো দুনিয়াতে বেঁচে আছ! অতঃপর গোশতের টুকরোটি ফেলে দিয়ে তরবারি হাতে নিলো এবং মৃত্যু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেল。
টিকাঃ
১৯৬. মুসনাদু আহমাদ: ১/৪৫৪।
১৯৭. বুখারি শরিফ: ৩৭৬২।