📘 সৎ সঙ্গে সর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ > 📄 আলেম ও আবেদ বন্ধুর সাহচর্যের উপকারিতা

📄 আলেম ও আবেদ বন্ধুর সাহচর্যের উপকারিতা


নেককার ও আলেম বন্ধুর সাহচর্য দ্বারা জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সততা লাভ হয়। আর আবেদ এবং জিকিরকারী বন্ধুর সাহচর্য দ্বারা ইবাদত ও জিকিরের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়।

বুখারি শরিফে হযরত আবু জুহায়ফা রাযি. হতে বর্ণিত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান রাযি. ও আবুদ দারদা রাযি.-এর মাঝে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন করে দেন। একদা সালমান রাযি. আবুদ দারদা রাযি.-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসে উম্মুদ দারদা রাযি.-কে মলিন কাপড় পরিহিত দেখতে পান। তিনি এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে উম্মুদ দারদা রাযি. বললেন, আপনার ভাই আবুদ দারদার পার্থিব কোনো কিছুর প্রতিই মোহ নেই। কিছুক্ষণ পর আবুদ দারদা রাযি. এলেন। অতঃপর তিনি সালমান রাযি.-এর জন্য খাদ্য প্রস্তুত করান এবং বলেন, আপনি খেয়ে নিন, আমি রোজা রেখেছি। সালমান রাযি. বললেন, আপনি না খেলে আমি খাব না। এরপর আবুদ দারদা রাযি. সালমান রাযি.-এর সঙ্গে খেলেন। রাত হলে আবুদ দারদা রাযি. নামাজের উদ্দেশ্যে দাঁড়াতে গেলে সালমান রাযি. বললেন, এখন ঘুমিয়ে পড়েন। আবুদ দারদা রাযি. ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে আবুদ দারদা রাযি. আবার নামাজে দাঁড়াতে উদ্যত হলেন। সালমান রাযি. বললেন, ঘুমিয়ে পড়েন। যখন রাতের শেষভাগ হলো, সালমান রাযি. আবুদ দারদা রাযি.-কে বললেন, এখন উঠুন। এরপর তারা দুজনে নামাজ আদায় করলেন। পরে সালমান রাযি. তাকে বললেন, আপনার প্রতিপালকের হক আপনার দায়িত্বে আছে। আপনার নিজের হকও আপনার দায়িত্বে রয়েছে। আবার আপনার পরিবারের হকও রয়েছে। প্রত্যেক হকদারকে তার হক প্রদান করুন। এরপর আবুদ দারদা রাযি. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হাজির হয়ে এ ঘটনা বর্ণনা করেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সালমান ঠিকই বলেছে।

মধ্যপন্থার প্রকৃত মূলনীতি এটাই। যার শিক্ষা হযরত আবু দারদা রাযি. হযরত সালমান রাযি. থেকে পেয়েছেন। আমাদেরও শিক্ষা নিতে হবে। এ জন্যই আল্লাহর নবী মুসা আলাইহিস সালাম হযরত খিজির আলাইহিস সালাম থেকে শিক্ষা লাভ করার উদ্দেশ্যে তার সাক্ষাতে উদগ্রীব হয়েছিলেন।

বুখারি ও মুসলিম শরিফে হযরত উবাই ইবনু কাব রাযি. হতে বর্ণিত হয়েছে, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, একদা মুসা আলাইহিস সালাম বনি ইসরাইলের কোনো এক মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। তখন তার নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, আপনি কাউকে আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞানী বলে মনে করেন কি? মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, না। তখন আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহিস সালামের নিকট ওহি প্রেরণ করলেন, হ্যাঁ, আমার বান্দা খিজির। অতঃপর মুসা আলাইহিস সালাম তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য পথের সন্ধান চাইলেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা মাছকে তাঁর জন্য নিদর্শন বানিয়ে দিলেন এবং তাঁকে বলা হলো, যখন তুমি মাছটি হারিয়ে ফেলবে তখন ফিরে যাবে। কারণ, কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমি তাঁর সাথে মিলিত হবে। তখন তিনি সমুদ্রে সে মাছের নিদর্শন অনুসরণ করতে লাগলেন। মুসা আলাইহিস সালামকে তাঁর সঙ্গী যুবক ইউশা ইবনু নুন বললেন, আপনি কি লক্ষ করেছেন আমরা যখন পাথরের নিকট বিশ্রাম নিচ্ছিলাম তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম? শয়তানই তার কথা আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। মুসা বললেন, আমরা তো সেটিরই সন্ধান করছিলাম। অতঃপর তারা নিজেদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে ফিরে চলল এবং খিজিরকে পেয়ে গেল। তাদের ঘটনা সেটাই, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَلَوْلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةً لِّيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ.
অর্থ: অতঃপর তাদের প্রতিটি দল থেকে কিছু লোক কেন বের হয় না, যাতে তারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান আহরণ করতে পারে এবং আপন সম্প্রদায় যখন তাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে, তখন তাদেরকে সতর্ক করতে পারে, যাতে তারা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে。

অর্থাৎ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যুদ্ধে মুসলমানদের একটি দল জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে কেন বের হয় না! যেন এ থেকে তারা তার সফরকালীন জীবনাচার সম্পর্কে জানতে পারে এবং ফিরে আসার পর নিজ সম্প্রদায়কে সে বিষয়ে সতর্ক করতে পারে। কিংবা এই আয়াতের ব্যাখ্যা হলো, কেন মুসলমানদের একটি দল তাদের দেশ ছেড়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবাসস্থল মদিনায় শিক্ষালাভের জন্য আসে না এবং সেই জ্ঞান নিজ সম্প্রদায়ের নিকট নিয়ে তাদের সতর্ক করে না। তাদের উপদেশ দেয় না।

টিকাঃ
১৭৯. বুখারি শরিফ: ১৯৬৮。
১৮০. সুরা কাহাফ: ৬৩-৬৪।
১৮১. বুখারি শরিফ: ৭৮; মুসলিম শরিফ: ১৮৫৩।
১৮২. সুরা তাওবা: ১২২।

📘 সৎ সঙ্গে সর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ > 📄 নেককার বন্ধু তোমার জন্য দুআ করবে

📄 নেককার বন্ধু তোমার জন্য দুআ করবে


তোমার নেককার বন্ধু তোমার জন্য দুআ করবে এবং তোমার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। বুখারি شরিফে হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লোককে মসজিদে কুরআন পড়তে শুনলেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তাকে রহম করুন। সে আমাকে অমুক সুরার অমুক অমুক আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যা আমি অমুক অমুক সুরা হতে ভুলে গিয়েছিলাম। আব্বাদ ইবনু আবদুল্লাহ রহ. আয়েশা রাযি. থেকে এতটুকু অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করলেন। সে সময় তিনি মসজিদে নামাজরত আব্বাদের আওয়াজ শুনতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আয়েশা! এটা কি আব্বাদের কণ্ঠস্বর? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ আব্বাদের প্রতি রহম করুন。

টিকাঃ
১৮৩. বুখারি শরিফ: ২৬৫৫।

📘 সৎ সঙ্গে সর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ > 📄 নেককার বন্ধু ইবাদতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়

📄 নেককার বন্ধু ইবাদতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়


স্মরণ করুন! পর্বতের গুহায় যখন হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাযি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলেন। আর তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এভাবে আল্লাহ তাআলার কথা স্মরণ করিয়ে দেন,
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا.
অর্থ: বিষণ্ণ হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।

বুখারি ও মুসলিম শরিফে হাদিসটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে, আবু বকর রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন সাওর গুহায় আত্মগোপন করেছিলাম। তখন আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, যদি কাফেররা তাদের পায়ের নিচের দিকে দৃষ্টিপাত করে, তবে আমাদের দেখে ফেলবে। তিনি বললেন, হে আবু বকর, ওই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কী ধারণা স্বয়ং আল্লাহ যাদের তৃতীয়জন。

ফেরাউনের দলবল কাছাকাছি চলে এসেছে দেখে হযরত মুসা আলাইহিস সালামের সাথীরা তাকে বলল, আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম। তখন তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন,
إِنَّا لَمُدْرَكُونَ. قَالَ كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ.
অর্থ: আমরা ধরা পড়ে গেলাম! মুসা বলল, কক্ষনো নয়; আমার সাথে আমার রব রয়েছেন। নিশ্চয়ই অচিরেই তিনি আমাকে পথনির্দেশ দেবেন。

টিকাঃ
১৮৪. বুখারি শরিফ: ৩৬৫৩, মুসলিম শরিফ: ২৩৮১।
১৮৫. সুরা শুআরা: ৬১-৬২।

📘 সৎ সঙ্গে সর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ > 📄 নেককার বন্ধু কুরআনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়

📄 নেককার বন্ধু কুরআনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়


এমনইভাবে নেককার ব্যক্তি তার বন্ধুকে আল্লাহ তাআলার কিতাবের আয়াতসমূহের বিভিন্ন বিষয়ে স্মরণ করিয়ে দেয়। এ জন্যই আমিরুল মুমিনিন হযরত উমর রাযি. তার পরামর্শসভায় হাফেজে কুরআনদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তারা সর্বদা তাকে কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও তার ব্যাখ্যা বর্ণনা করে শোনাতেন।

বুখারি শরিফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উয়াইনাহ ইবনু হিসন ইবনু হুযায়ফা এসে তাঁর ভাতিজা হুর ইবনু কায়েসের কাছে অবস্থান করেন। উমর রাযি. যাদেরকে পার্শ্বে রাখতেন হুর ইবনু কায়েস ছিলেন তাদের একজন। কারিগণ, যুবক-বৃদ্ধ সকলেই উমর ফারুক রাযি.-এর মজলিসের সদস্য এবং উপদেষ্টা ছিলেন। এরপর উয়াইনাহ তার ভাতিজাকে ডেকে বললেন, এই আমিরের কাছে তো তোমার একটা মর্যাদা আছে, সুতরাং তুমি আমার জন্য তার কাছে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে দাও। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি তার কাছে আপনার প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করব।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযি. বলেন, এরপর হুর ইবনু কায়েস অনুমতি প্রার্থনা করলেন উয়াইনার জন্য এবং উমর রাযি. অনুমতি দিলেন। উয়াইনাহ উমরের কাছে গিয়ে বললেন, হ্যাঁ, আপনি তো আমাদেরকে অধিক দানও করেন না এবং আমাদের মাঝে সুবিচারও করেন না। উমর রাযি. রাগান্বিত হলেন এবং তাকে কিছু একটা করতে উদ্যত হলেন। তখন হুর ইবনু কায়েস বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন! আল্লাহ তাআলা তো তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছেন, 'ক্ষমা অবলম্বন করো, সৎকাজের আদেশ দাও এবং মূর্খদের উপেক্ষা করো। আর এই ব্যক্তি তো নিশ্চয়ই মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর কসম! উমর রাযি. আয়াতের নির্দেশ অমান্য করেননি। উমর আল্লাহর কিতাবের বিধানের সামনে চুপ হয়ে যেতেন。

বুখারি শরিফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমর রাযি. বদর যুদ্ধে যোগদানকারী প্রবীণ সাহাবিদের সঙ্গে আমাকেও উল্লেখ করতেন। এ কারণে কারও কারও মনে প্রশ্ন দেখা দিলো। একজন বললেন, আপনি তাকে আমাদের সঙ্গে কেন শামিল করছেন। আমাদের তো তার মতো সন্তানই রয়েছে। উমর রাযি. বললেন, এর কারণ তো আপনারাও অবগত আছেন। সুতরাং একদিন তিনি তাকে ডাকলেন এবং তাদের সঙ্গে বসালেন। ইবনু আব্বাস রাযি. বলেন, আমি বুঝতে পারলাম, আজকে তিনি আমাকে ডেকেছেন এ জন্য যে, তিনি আমার প্রজ্ঞা তাদের দেখাবেন। তিনি তাদেরকে বললেন, আপনারা আল্লাহ তাআলার বাণী إِذَ جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ -এর কী ব্যাখ্যা করেন? তখন তাদের কেউ বললেন, আমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হলে এবং বিজয় লাভ করলে এ আয়াতে আমাদেরকে আল্লাহর প্রশংসা এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য আদেশ করা হয়েছে। কেউ কেউ কিছু না বলে চুপ করে থাকলেন। এরপর তিনি আমাকে বললেন, হে ইবনু আব্বাস! তুমিও কি তাই বলো? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তাহলে তুমি কী বলতে চাও? উত্তরে আমি বললাম, এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর ইন্তেকালের সংবাদ জানিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এলে এটিই হবে তোমার মৃত্যুর নিদর্শন।
فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا.
অর্থ: তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবুলকারী।

এ কথা শুনে হযরত উমর রাযি. বললেন, তুমি যা বলছ, এ আয়াতের ব্যাখ্যা আমিও তা-ই জানি。

হযরত উমর রাযি. হুদায়বিয়ার দিন যখন ক্রোধে ফেটে পড়েন তখন হযরত আবু বকর রাযি. তাকে চমৎকার হৃদয়গ্রাহী উপদেশ প্রদান করেন। যাতে তার অন্তর প্রশান্ত হয় এবং তার রাগ ও ক্রোধ ঠান্ডা হয়ে যায়।

বুখারি শরিফে হযরত মিসওয়ার ইবনু মাখরামা ও মারওয়ান থেকে বর্ণিত হাদিস। তাদের উভয়ের বর্ণনা অপরজনের বর্ণনাকে সমর্থন করে। তারা বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়ার সময় বের হলেন। যুহরি রহ. তার বর্ণিত হাদিসে বলেন, সুহাইল ইবনু আমর এসে বলল, আসুন আমাদের এবং আপনাদের মধ্যে একটি চুক্তিপত্র লিখি। তারপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন লেখককে ডেকে বললেন, লিখুন بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ । এতে সুহাইল বলল, আল্লাহর কসম! রহমান কে? আমরা তা জানি না, বরং পূর্বে আপনি যেমন লিখতেন লিখুন, بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ। মুসলমানরা বললেন, আল্লাহর কসম! আমরা بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ছাড়া আর কিছু লিখব না। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, লিখো, بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ তারপর বললেন, এর ওপর চুক্তিবদ্ধ হয়েছে আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন সুহাইল বলল, আল্লাহর কসম! আমরা যদি আপনাকে আল্লাহর রাসুল বলেই বিশ্বাস করতাম, তাহলে আপনাকে কাবা জিয়ারত থেকে বাধা দিতাম না এবং আপনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতেও উদ্যত হতাম না। বরং আপনি লিখুন, আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর রাসুল; কিন্তু তোমরা যদি আমাকে অস্বীকার করো তবে লিখো, আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ।

যুহরি রহ. বলেন, এটি এ জন্য যে, তিনি বলেছিলেন, তারা যদি আল্লাহর পবিত্র বস্তুগুলোর সম্মান করার কোনো কথা দাবি করে, তাহলে আমি তাদের সে দাবি মেনে নেব। তারপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ চুক্তি করো যে, তারা আমাদের ও কাবা শরিফের মধ্যে কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে না, যাতে আমরা (নির্বিঘ্নে) তাওয়াফ করতে পারি। সুহাইল বলল, আল্লাহর কসম! আরববাসীরা যেন এ কথা বলার সুযোগ না পায় যে, এ প্রস্তাব গ্রহণে আমাদের বাধ্য করা হয়েছে; বরং আগামী বছর তা হতে পারে। তারপর লেখা হলো। সুহাইল বলল, এটাও লেখা হোক যে, আমাদের কোনো লোক যদি আপনার কাছে চলে আসে এবং সে যদিও আপনার দ্বীন গ্রহণ করে থাকে, তবুও তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেবেন। মুসলমানরা বললেন, সুবাহানাল্লাহ! যে ইসলাম গ্রহণ করে আমাদের কাছে এসেছে, তাকে কেমন করে মুশরিকদের কাছে ফেরত দেওয়া যেতে পারে?

এমন সময় আবু জানদাল ইবনু সুহাইল ইবনু আমর সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি বেড়ি পরিহিত অবস্থায় ধীরে ধীরে চলছিলেন। তিনি মক্কার নিম্নাঞ্চল থেকে বের হয়ে এসে মুসলিমদের সামনে নিজেকে পেশ করলেন। সুহাইল বলল, হে মুহাম্মদ! আপনার সাথে আমার চুক্তি হয়েছে, সে অনুযায়ী প্রথম কাজ হলো তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেবেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এখনো তো চুক্তি সম্পাদিত হয়নি। সুহাইল বলল, আল্লাহর কসম! তাহলে আমি আপনাদের সঙ্গে আর কখনো সন্ধি করব না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেবল এ লোকটিকে আমার কাছে থাকার অনুমতি দাও। সে বলল, না। এ অনুমতি আমি দেব না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তুমি এটা করো। সে বলল, আমি তা করব না।

মিকরাজ বলল, আমরা তাকে আপনার কাছে থাকার অনুমতি দিলাম। আবু জানদাল বলেন, হে মুসলিম সমাজ! আমাকে মুশরিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, অথচ আমি মুসলিম হয়ে এসেছি। আপনার কি দেখছেন না, আমি কত কষ্ট পাচ্ছি। আল্লাহর রাস্তায় তাকে অনেক নির্যাতিত করা হয়েছে।

উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলাম এবং বললাম, আপনি কি আল্লাহর সত্য নবী নন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, আমরা কি হকের ওপর নই, আর আমাদের দুশমনরা কি বাতিলের ওপর নয়? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, তাহলে দ্বীনের ব্যাপারে কেন আমরা হেয় হব?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি অবশ্যই আল্লাহর রাসুল। সুতরাং আমি আল্লাহর অবাধ্য হতে পারি না। আর তিনিই আমার সাহায্যকারী।

আমি বললাম, আপনি কি আমাদের বলেননি যে, আমরা শীঘ্রই বায়তুল্লাহ যাব এবং তাওয়াফ করব। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি কি এ বছরই আসার কথা বলেছি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তুমি অবশ্যই কাবা গৃহে যাবে এবং তাওয়াফ করবে।

উমর রাযি. বলেন, তারপর আমি আবু বকর রাযি.-এর কাছে গিয়ে বললাম, হে আবু বকর! তিনি কি আল্লাহর সত্য নবী নন? আবু বকর রাযি. বললেন, অবশ্যই। আমি বললাম, আমরা কি সত্যের ওপর নই এবং আমাদের দুশমনরা কি বাতিলের ওপর নয়? আবু বকর রাযি. বললেন, নিশ্চয়ই। আমি বললাম, তাহলে কেন আমরা এখন আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এত হীনতা স্বীকার করব?

আবু বকর রাযি. বললেন, নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহর রাসুল এবং তিনি তাঁর রবের নাফরমানি করতে পারেন না। তিনিই তাঁর সাহায্যকারী। তুমি তাঁর আনুগত্যকে আঁকড়ে ধরো। আল্লাহর কসম! তিনি সত্যের ওপর আছেন।

আমি বললাম, তিনি কি বলেননি যে, আমরা অচিরেই বায়তুল্লাহ যাব এবং তার তাওয়াফ করব। আবু বকর রাযি. বললেন, অবশ্যই। কিন্তু তুমি এবারই যে যাবে তিনি এ কথা কি বলেছিলেন? আমি বললাম, না। আবু বকর রাযি. বললেন, তাহলে নিশ্চয়ই তুমি সেখানে যাবে এবং তার তাওয়াফ করবে।

যুহরি রহ. বলেন, উমর রাযি. বলেছিলেন, আমি এই ধৈর্যহীনতার কাফফারা হিসেবে অনেক নেক আমল করেছি। বর্ণনাকারী বলেন, সন্ধিপত্র লেখা শেষ হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগণকে বললেন, তোমরা উঠো এবং কুরবানি করো ও মাথা মুণ্ডন করে ফেলো। বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা তিনবার বলার পরও কেউ উঠলেন না। তাদের কাউকে উঠতে না দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সালামা রাযি.-এর কাছে এসে লোকদের এ আচরণের কথা বলেন। উম্মে সালামা রাযি. বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি যদি তাই চান, তাহলে আপনি বাইরে যান ও তাদের সাথে কোনো কথা না বলে আপনার উট আপনি কুরবানি করুন এবং নাপিত ডেকে মাথা মুণ্ডিয়ে নিন।

পরামর্শ অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে গেলেন এবং কারও সাথে কোনো কথা না বলে নিজের পশু কুরবানি করলেন এবং নাপিত ডেকে মাথা মুণ্ডিয়ে নিলেন। তা দেখে সাহাবাগণ উঠে দাঁড়ালেন। অতঃপর নিজ নিজ পশু কুরবানি করে একে অপরের মাথা মুণ্ডিয়ে দিলেন। অবস্থা এমন হলো যে, ভিড়ের কারণে একে অপরের ওপর পড়তে লাগলেন。

টিকাঃ
১৮৬. সুরা আরাফ: ১৯৯।
১৮৭. বুখারি শরিফ: ৪৬৪২।
১৮৮. বুখারি শরিফ: ৪৯৭০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00