📄 যে যাকে ভালোবাসে সে তার সঙ্গী হবে
সৎকর্মশীল ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে যে ভালোবাসে তার হাশর তার সাথে হবে। সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর নবী! সেই ব্যক্তি সম্পর্কে আপনার অভিমত কী, যে ব্যক্তি কোনো এক সম্প্রদায়কে ভালোবাসে অথচ সে তাদের কাজে অংশগ্রহণ করতে পারেনি? উত্তরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে যাকে ভালোবাসে সে তার সঙ্গী হবে। অর্থাৎ, জান্নাতে সে তার সঙ্গী হবে。
এ ছাড়া হযরত আনাস ইবনু মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয়ে মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলাম। এমন সময় একজন লোক মসজিদের আঙিনায় আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কেয়ামত কখন হবে? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তার জন্য কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ? এতে লোকটি কিছুটা লজ্জিত হলো। তারপর বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! নামাজ, রোজা, দান-সদকা খুব একটা করতে পারিনি, তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসি। তিনি বললেন, তুমি যাকে ভালোবাসো পরকালে তার সাথেই থাকবে。
টিকাঃ
১৭৭. বুখারি শরিফ: ৬১৬৯; মুসলিম শরিফ: ২৬৪০।
১৭৮. বুখারি শরিফ: ৬১৭১; মুসলিম শরিফ: ২০৩৩।
📄 আলেম ও আবেদ বন্ধুর সাহচর্যের উপকারিতা
নেককার ও আলেম বন্ধুর সাহচর্য দ্বারা জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সততা লাভ হয়। আর আবেদ এবং জিকিরকারী বন্ধুর সাহচর্য দ্বারা ইবাদত ও জিকিরের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
বুখারি শরিফে হযরত আবু জুহায়ফা রাযি. হতে বর্ণিত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান রাযি. ও আবুদ দারদা রাযি.-এর মাঝে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন করে দেন। একদা সালমান রাযি. আবুদ দারদা রাযি.-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসে উম্মুদ দারদা রাযি.-কে মলিন কাপড় পরিহিত দেখতে পান। তিনি এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে উম্মুদ দারদা রাযি. বললেন, আপনার ভাই আবুদ দারদার পার্থিব কোনো কিছুর প্রতিই মোহ নেই। কিছুক্ষণ পর আবুদ দারদা রাযি. এলেন। অতঃপর তিনি সালমান রাযি.-এর জন্য খাদ্য প্রস্তুত করান এবং বলেন, আপনি খেয়ে নিন, আমি রোজা রেখেছি। সালমান রাযি. বললেন, আপনি না খেলে আমি খাব না। এরপর আবুদ দারদা রাযি. সালমান রাযি.-এর সঙ্গে খেলেন। রাত হলে আবুদ দারদা রাযি. নামাজের উদ্দেশ্যে দাঁড়াতে গেলে সালমান রাযি. বললেন, এখন ঘুমিয়ে পড়েন। আবুদ দারদা রাযি. ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে আবুদ দারদা রাযি. আবার নামাজে দাঁড়াতে উদ্যত হলেন। সালমান রাযি. বললেন, ঘুমিয়ে পড়েন। যখন রাতের শেষভাগ হলো, সালমান রাযি. আবুদ দারদা রাযি.-কে বললেন, এখন উঠুন। এরপর তারা দুজনে নামাজ আদায় করলেন। পরে সালমান রাযি. তাকে বললেন, আপনার প্রতিপালকের হক আপনার দায়িত্বে আছে। আপনার নিজের হকও আপনার দায়িত্বে রয়েছে। আবার আপনার পরিবারের হকও রয়েছে। প্রত্যেক হকদারকে তার হক প্রদান করুন। এরপর আবুদ দারদা রাযি. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হাজির হয়ে এ ঘটনা বর্ণনা করেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সালমান ঠিকই বলেছে।
মধ্যপন্থার প্রকৃত মূলনীতি এটাই। যার শিক্ষা হযরত আবু দারদা রাযি. হযরত সালমান রাযি. থেকে পেয়েছেন। আমাদেরও শিক্ষা নিতে হবে। এ জন্যই আল্লাহর নবী মুসা আলাইহিস সালাম হযরত খিজির আলাইহিস সালাম থেকে শিক্ষা লাভ করার উদ্দেশ্যে তার সাক্ষাতে উদগ্রীব হয়েছিলেন।
বুখারি ও মুসলিম শরিফে হযরত উবাই ইবনু কাব রাযি. হতে বর্ণিত হয়েছে, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, একদা মুসা আলাইহিস সালাম বনি ইসরাইলের কোনো এক মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। তখন তার নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, আপনি কাউকে আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞানী বলে মনে করেন কি? মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, না। তখন আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহিস সালামের নিকট ওহি প্রেরণ করলেন, হ্যাঁ, আমার বান্দা খিজির। অতঃপর মুসা আলাইহিস সালাম তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য পথের সন্ধান চাইলেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা মাছকে তাঁর জন্য নিদর্শন বানিয়ে দিলেন এবং তাঁকে বলা হলো, যখন তুমি মাছটি হারিয়ে ফেলবে তখন ফিরে যাবে। কারণ, কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমি তাঁর সাথে মিলিত হবে। তখন তিনি সমুদ্রে সে মাছের নিদর্শন অনুসরণ করতে লাগলেন। মুসা আলাইহিস সালামকে তাঁর সঙ্গী যুবক ইউশা ইবনু নুন বললেন, আপনি কি লক্ষ করেছেন আমরা যখন পাথরের নিকট বিশ্রাম নিচ্ছিলাম তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম? শয়তানই তার কথা আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। মুসা বললেন, আমরা তো সেটিরই সন্ধান করছিলাম। অতঃপর তারা নিজেদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে ফিরে চলল এবং খিজিরকে পেয়ে গেল। তাদের ঘটনা সেটাই, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে বর্ণনা করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَلَوْلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةً لِّيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ.
অর্থ: অতঃপর তাদের প্রতিটি দল থেকে কিছু লোক কেন বের হয় না, যাতে তারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান আহরণ করতে পারে এবং আপন সম্প্রদায় যখন তাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে, তখন তাদেরকে সতর্ক করতে পারে, যাতে তারা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে。
অর্থাৎ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যুদ্ধে মুসলমানদের একটি দল জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে কেন বের হয় না! যেন এ থেকে তারা তার সফরকালীন জীবনাচার সম্পর্কে জানতে পারে এবং ফিরে আসার পর নিজ সম্প্রদায়কে সে বিষয়ে সতর্ক করতে পারে। কিংবা এই আয়াতের ব্যাখ্যা হলো, কেন মুসলমানদের একটি দল তাদের দেশ ছেড়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবাসস্থল মদিনায় শিক্ষালাভের জন্য আসে না এবং সেই জ্ঞান নিজ সম্প্রদায়ের নিকট নিয়ে তাদের সতর্ক করে না। তাদের উপদেশ দেয় না।
টিকাঃ
১৭৯. বুখারি শরিফ: ১৯৬৮。
১৮০. সুরা কাহাফ: ৬৩-৬৪।
১৮১. বুখারি শরিফ: ৭৮; মুসলিম শরিফ: ১৮৫৩।
১৮২. সুরা তাওবা: ১২২।
📄 নেককার বন্ধু তোমার জন্য দুআ করবে
তোমার নেককার বন্ধু তোমার জন্য দুআ করবে এবং তোমার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। বুখারি شরিফে হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লোককে মসজিদে কুরআন পড়তে শুনলেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তাকে রহম করুন। সে আমাকে অমুক সুরার অমুক অমুক আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যা আমি অমুক অমুক সুরা হতে ভুলে গিয়েছিলাম। আব্বাদ ইবনু আবদুল্লাহ রহ. আয়েশা রাযি. থেকে এতটুকু অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করলেন। সে সময় তিনি মসজিদে নামাজরত আব্বাদের আওয়াজ শুনতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আয়েশা! এটা কি আব্বাদের কণ্ঠস্বর? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ আব্বাদের প্রতি রহম করুন。
টিকাঃ
১৮৩. বুখারি শরিফ: ২৬৫৫।
📄 নেককার বন্ধু ইবাদতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়
স্মরণ করুন! পর্বতের গুহায় যখন হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাযি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলেন। আর তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এভাবে আল্লাহ তাআলার কথা স্মরণ করিয়ে দেন,
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا.
অর্থ: বিষণ্ণ হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।
বুখারি ও মুসলিম শরিফে হাদিসটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে, আবু বকর রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন সাওর গুহায় আত্মগোপন করেছিলাম। তখন আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, যদি কাফেররা তাদের পায়ের নিচের দিকে দৃষ্টিপাত করে, তবে আমাদের দেখে ফেলবে। তিনি বললেন, হে আবু বকর, ওই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কী ধারণা স্বয়ং আল্লাহ যাদের তৃতীয়জন。
ফেরাউনের দলবল কাছাকাছি চলে এসেছে দেখে হযরত মুসা আলাইহিস সালামের সাথীরা তাকে বলল, আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম। তখন তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন,
إِنَّا لَمُدْرَكُونَ. قَالَ كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ.
অর্থ: আমরা ধরা পড়ে গেলাম! মুসা বলল, কক্ষনো নয়; আমার সাথে আমার রব রয়েছেন। নিশ্চয়ই অচিরেই তিনি আমাকে পথনির্দেশ দেবেন。
টিকাঃ
১৮৪. বুখারি শরিফ: ৩৬৫৩, মুসলিম শরিফ: ২৩৮১।
১৮৫. সুরা শুআরা: ৬১-৬২।