📘 সৎ সঙ্গে সর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ > 📄 একাকিত্ব উত্তম, নাকি সামাজিক জীবন উত্তম

📄 একাকিত্ব উত্তম, নাকি সামাজিক জীবন উত্তম


একাকী জীবনযাপন উত্তম, নাকি মানুষের সাথে মিলেমিশে বসবাস করা উত্তম—এ প্রসঙ্গে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِنَّ الْمُسْلِمَ إِذَا كَانَ مُخَالِطًا النَّاسَ وَيَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ خَيْرٌ مِنَ الْمُسْلِمِ الَّذِي لَا يُخَالِطُ النَّاسَ وَلَا يَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ.
অর্থ: নিশ্চয়ই যখন একজন মুসলিম মানুষের সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের দেওয়া যন্ত্রণায় ধৈর্যধারণ করে, সে এমন মুসলিমের চেয়ে উত্তম যে মানুষদের সাথে মেলামেশাও করে না এবং তাদের দেওয়া যন্ত্রণায় ধৈর্যও ধরে না。

'একাকী জীবনাচরণ' অধ্যায়ে ইমাম বুখারি রহ. হযরত আবু সায়িদ খুদরি রাযি.-এর হাদিস উল্লেখ করেছেন,
يُوشِكُ أَنْ يَكُونَ خَيْرَ مَالِ الْمُسْلِمِ غَنَمُ يَتْبَعُ بِهَا شَعَفَ الْجِبَالِ وَمَوَاقِعَ الْقَطْرِ، يَفِرُّ بِدِينِهِ مِنَ الْفِتَنِ.
অর্থ: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন মুসলিমের উত্তম সম্পদ হবে কয়েকটি বকরি, যা নিয়ে সে পাহাড়ের চূড়ায় অথবা বৃষ্টিপাতের স্থানে চলে যাবে। ফেতনা থেকে বাঁচতে সে তার দ্বীন নিয়ে পালিয়ে যাবে。

এ ছাড়াও এই বিষয়ে আরও অনেক দলিল-প্রমাণ রয়েছে। তবে প্রতিউত্তরে মানুষের সাথে মেলামেশা উত্তম হওয়ার বিষয়ে কোনো হাদিস প্রমাণিত নেই। তবে এ ক্ষেত্রে কতক উলামায়ে কেরামের বক্তব্য পাওয়া যায়। ইমাম খাত্তাবির লিখিত 'কিতাবুল উজলাহ' থেকে হাফেজ ইবনু হাজার রহ. 'ফাতহুল বারি' গ্রন্থে লিখেছেন, একাকী থাকা এবং মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকার ক্ষেত্রে উত্তম এবং অনুত্তম হওয়ার বিষয়টি সাথি-সঙ্গীর ভিন্নতায় ভিন্নতর হয়ে থাকে। তাই সম্মিলিতভাবে থাকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে বর্ণিত দলিলাদি ও প্রমাণসমূহকে ইমামের আনুগত্য এবং ধর্মীয় নির্দেশনা পালনের সাথে সম্পৃক্ত ধরে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। এর বিপরীত ক্ষেত্রে দলিল-প্রমাণগুলোকেও বিপরীত ধরে নিতে হবে। আর সশরীরে একত্রিত হওয়া কিংবা পৃথক থাকার বিষয়টি হলো, যে ব্যক্তি জানে যে, সে তার জীবিকা ও দ্বীন রক্ষায় নিজের জন্য নিজেই যথেষ্ট, তার জন্য মানুষের সাথে মেলামেশা থেকে বিরত থাকাই উত্তম। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো তাকে মুসলমানদের বিভিন্ন হক, যেমন : নামাজের জামাত, সালাম প্রদান ও সালামের উত্তর প্রদান, রুগ্ন ব্যক্তির সেবা, জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ ইত্যাদি হক আদায়ে সোচ্চার থাকতে হবে। আর এতে উদ্দেশ্য থাকবে লোকজনের খারাপ সাহচর্যের প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছেড়ে সময় নষ্ট ও অনর্থক কাজে মন লাগানো থেকে বেঁচে থাকা। আর সবার সাথে একত্রিত হওয়া ও মেলামেশার বিষয়টিকে সকাল-সন্ধ্যায় খাবারের মতো প্রয়োজনীয় মনে করে যতটুকু প্রয়োজন তাতে ততটুকু সময় ব্যয় করবে। তাহলে এটা শরীর ও আত্মার জন্য খোরাক এবং আরামদায়ক হবে। আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞাত।

ইমাম কুশাইরি রহ. তার 'রিসালা' গ্রন্থে লিখেছেন, নির্জনতা ও একাকী জীবনকে প্রাধান্য দেওয়ার পন্থা ও পদ্ধতি হলো, অন্তরে সুদৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে, এতে মানুষ তার মন্দত্ব ও অনিষ্টতা থেকে নিরাপদ থাকবে। অন্যথায় এটি বৈধ নয়। কারণ, প্রথমটিতে নিজের মধ্যে নম্রতা সৃষ্টি হয়, যা বিনয়ীদের বৈশিষ্ট্য। আর দ্বিতীয়টিতে মানুষের মধ্যে নিজের উপস্থিতি বড় মনে হয়। যা অহংকারীদের বৈশিষ্ট্য।

এ সম্পর্কে হাফেজ ইবনু হাজার রহ. 'ফাতহুল বারি' গ্রন্থে লেখেন, পূর্ববর্তী ওলামায়ে কেরাম একাকী জীবনযাপনের বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। তবে অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের মতে মানুষদের সাথে মিলেমিশে জীবনযাপন করাই উত্তম। কেননা এতে ইসলামের বিভিন্ন নির্দেশনা পালন ও مسلمانوں দল বৃদ্ধি পায়, ভালো কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়, পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ ইত্যাদি ধর্মীয় ও দ্বীনি অনেক উপকারিতা ও ফায়দা অর্জিত হয়।

কেউ কেউ বলেন, একাকী জীবনযাপন করাই উত্তম। কেননা এতে মানুষদের অনিষ্টতা থেকে বেঁচে থাকা যায়। তবে এর জন্য শর্ত হলো, ফরজ বিষয়গুলোর পূর্ণ জ্ঞান থাকা আবশ্যক। এ সম্পর্কে ইমাম নববি রহ. বলেন, গুনাহ এবং অন্যায়ে পতিত হওয়ার প্রবল ধারণা না হলে সবার সাথে মিলেমিশে জীবনযাপন করাই উত্তম। যদি তা না হয়, তাহলে একাকী জীবনযাপনই ভালো। আর অন্যদের অভিমত হলো, অবস্থাভেদে বিধান ভিন্ন ভিন্ন হবে। অন্যায় প্রতিরোধের সামর্থ্য যে রাখে তার জন্য সবার সাথে মিলেমিশে জীবনযাপন আবশ্যক। সময় ও সামর্থ্য অনুপাতে এ কাজ তার জন্য কখনো ফরজে আইন, কখনো ফরজে কেফায়া। আর যে ব্যক্তি মনে করে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার পর সে নিজেকে সকল প্রকার প্রতিকূলতা থেকে নিরাপদ রাখতে পারবে, কিংবা এ ব্যাপারে যার কোনো পরোয়া নেই, তাহলে সবার সাথে মিলেমিশে জীবনযাপন আবশ্যক। তবে শর্ত হলো, এ ক্ষেত্রে তাকে অনুসরণীয় মনে করা যাবে না। কেননা, এতে দুর্বলরা তার অনুসরণ করে সমস্যায় জড়িয়ে পড়বে। এই বিধান ওই পরিস্থিতিতেই প্রযোজ্য হবে, যখন ব্যাপক কোনো ফেতনার আশঙ্কা না থাকবে। যদি ব্যাপকভাবে ফেতনার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে একাকী থাকাই উত্তম। কেননা তখন গুনাহে লিপ্ত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সবার ওপরই আল্লাহর শান্তি নেমে আসবে। এ জন্য পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْكُمْ خَاصَّةً.
অর্থ: আর তোমরা ভয় করো ফেতনাকে, যা তোমাদের মধ্য থেকে বিশেষভাবে শুধু জালেমদের ওপরই আপতিত হবে না。

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রহ.-কে জিজ্ঞাসা করা হয়, মুরিদের জন্য নির্জনে বসবাস উত্তম, নাকি মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকা?

উত্তরে তিনি লেখেন, এই মাসতালায় পক্ষ অবলম্বনের ক্ষেত্রে মানুষ সীমালঙ্ঘন করে থাকে। তবে এই মাসআলাটির সমাধান হলো, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করা কখনো কখনো আবশ্যকীয় হয়। কখনো আবার মুস্তাহাব সাব্যস্ত হয়। একই ব্যক্তি কখনো একবার মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকার প্রতি আদিষ্ট হন। আবার কখনো একাকী থাকার নির্দেশপ্রাপ্ত হন। এ ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যতা এভাবে করবে যে, মানুষের সাথে মেলামেশা যদি ভালো ও তাকওয়ার কাজে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য হয়, তাহলে এ জন্য সে আল্লাহর পক্ষ থেকে আদেশপ্রাপ্ত। আর যদি তার কারণে গুনাহ ও অপরাধমূলক কাজে সাহায্য করা হয়, তাহলে এ কাজ তার জন্য নিষিদ্ধ।

তাই অনেক ক্ষেত্রেই মুসলমানদের সঙ্গে মিলেমিশে একত্রে থাকা ইবাদতের অংশ। যেমন: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জামাতে অংশগ্রহণ ও দুই ঈদের নামাজ, সূর্যগ্রহণের নামাজ, বৃষ্টির প্রার্থনার নামাজে অংশগ্রহণের জন্য আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ ও হুকুম করেছেন।

একইভাবে মুসলমানদের সাথে হজে অংশগ্রহণ, কাফের ও ধর্মত্যাগী খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়া ইবাদত। যদিও এ কাজের আহ্বানকারী ইমাম ও নেতৃবৃন্দ পাপাচারী হয়। আর তাদের দলে পাপী ব্যক্তিরা থাকে। অনুরূপভাবে যে সকল সম্মিলিত কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বান্দার ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং মানুষ তার থেকে উপকৃত হয়, কিংবা তার উপকার হয়, ইত্যাদি সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ করা ইবাদত।

বান্দার জন্য দুআ, জিকির, নামাজ, মুরাকাবা, আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ইত্যাদি যে সকল ইবাদত ও কাজ ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত, তাতে একাকীত্বে নির্জনে ঘরে সময় দেওয়া আবশ্যক। যেমনটা তাবেয়ি তাউস রহ. বলেছেন, হ্যাঁ! ঘর পুরুষের ইবাদতগাহ হলে, তার চোখ ও জিহ্বা নিরাপদ থাকে।

নয়তো ঘরের বাইরে কোনো নির্জন স্থানে সময় ব্যয় করবে। সব সময় সর্বত্র মানুষের সাথে মেলামেশা করা অনুচিত। একইভাবে সব সময় একাকী থাকা ও ভুল; বরং এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকে তার প্রয়োজনমতো সময় ব্যয় করবে। এটাই উত্তম। তাই এই বিষয়ে উপর্যুক্ত আলোচনার প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখবে。

টিকাঃ
১৫৩. তিরমিজি শরিফ: ২৫০৭; মুসনাদে আহমদ: ৫/৩৬৫; আদাবুল মুফরাদ: ৩৮৮।
১৫৪. বুখারি শরিফ: ১৯।
১৫৫. ফাতহুল বারি: ৩৩৩/১১।
১৫৬. ফাতহুল বারি: ৪২/১৩।
১৫৭. সুরা আনফাল: ২৫।
১৫৮. মাজমুউল ফাতাওয়া: ৪২৫/১০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00