📄 অসৎ সঙ্গীর প্রতারণা করে ও মিথ্যা স্বপ্ন দেখায়
অসৎ সঙ্গীরা তাদের বন্ধুদেরকে ধোঁকা দেয় এবং মিথ্যা আশা-আকাঙ্ক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا اتَّبِعُوا سَبِيلَنَا وَلْنَحْمِلْ خَطَايَاكُمْ وَمَا هُم بِحَامِلِينَ مِنْ خَطَايَاهُم مِّن شَيْءٍ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ. وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَّعَ أَثْقَالِهِمْ وَلَيُسْأَلُنَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَمَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ.
অর্থ: আর কাফেররা মুমিনদের বলে, তোমরা আমাদের পথ অনুসরণ করো এবং যেন আমরা তোমাদের পাপ বহন করি। অথচ তারা তাদের পাপের কিছুই বহন করবে না। নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী। আর অবশ্যই তারা বহন করবে তাদের বোঝা এবং তাদের বোঝার সাথে আরও কিছু বোঝা। আর তারা কেয়ামতের দিন অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে সে সম্পর্কে, যা তারা মিথ্যা বানাত。
টিকাঃ
৯৭. সুরা আনকাবুত : ১২-১৩।
📄 পথভ্রষ্ট সঙ্গীরা অন্যদেরও পথভ্রষ্ট করতে চায়
ফেতনাবাজ, পথভ্রষ্ট ও গোমরাহ লোকেরা তাদের সঙ্গীদের জন্যও ফেতনাবাজি, পথভ্রষ্টতা এবং গোমরাহি পছন্দ করে। যাতে তারা তাদের মতো হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
قَالَ الَّذِينَ حَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ رَبَّنَا هَؤُلَاءِ الَّذِينَ أَغْوَيْنَا أَغْوَيْنَاهُمْ كَمَا غَوَيْنَا.
অর্থ: যাদের জন্য শান্তি অবধারিত হবে তারা বলবে, হে আমাদের রব, ওরা তো সেসব লোক, যাদেরকে আমরা বিভ্রান্ত করেছিলাম। তাদেরকে আমরা বিভ্রান্ত করেছিলাম যেমন আমরা বিভ্রান্ত হয়েছিলাম।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَيُرِيدُ الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الشَّهَرَاتِ أَن تَمِيلُوا مَيْلًا عَظِيمًا.
অর্থ: আর যারা প্রবৃত্তির অনুসরণ করে তারা চায় যে, তোমরা প্রবলভাবে সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হও。
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَدُّوا مَا عَنِتُمْ.
অর্থ: তারা তোমাদের মারাত্মক ক্ষতি কামনা করে。
অর্থাৎ তারা তোমাদের মুসিবত এবং বিপদের আশায় উদগ্রীব হয়ে থাকে। এ ছাড়াও আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ كَمَا كَفَرُوا فَتَكُونُونَ سَوَاءٌ فَلَا تَتَّخِذُوا مِنْهُمْ أَوْلِيَاءَ.
অর্থ: তারা চায় যে, তারা যেমন কাফের, তোমরাও তেমনই কাফের হয়ে যাও, যাতে তোমরা এবং তারা সব সমান হয়ে যাও। অতএব, তাদের মধ্যে কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَلَا يَزَالُونَ يُقَاتِلُونَكُمْ حَتَّى يَرُدُّوكُمْ عَن دِينِكُمْ إِنِ اسْتَطَاعُوا.
অর্থ: বস্তুত তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদিগকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে, যদি সম্ভব হয়。
তিনি আরও বলেন,
وَلَن تَرْضَى عَنكَ الْيَهُودُ وَلَا النَّصَارَى حَتَّى تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ.
অর্থ: ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা কখনই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করেন。
এ জন্যই একজন ব্যভিচারী কামনা করে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ ব্যভিচারী হয়ে যাক। অনুরূপ সাজাপ্রাপ্ত চোর চায় পৃথিবীর সকল মানুষ চুরিতে লিপ্ত হোক। এ ছাড়া একজন মদপানকারীও এটাই চায় যেন পৃথিবীর সমস্ত মানুষ মদপান করে। যাতে এরা সবাই এক হয়ে যায়। তাদের আর অন্যদের মাঝে কোনো পার্থক্য না থাকে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. তার লিখিত 'আল-ইসতিকামাত' গ্রন্থে কিছু বিষয় আলোচনা করার পর তিনি লেখেন, এগুলো এমন বিষয়, যেগুলো অর্জন করা মুমিনদের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। কেননা এতে তাদের দুটি বিষয়ের প্রয়োজন হয়: এক. তার সমগোত্রীয় লোকজন দ্বীনি ও দুনিয়াবি যেসব ফেতনায় পতিত হয়, নিজের মধ্যে সেগুলোর প্রতি আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও সেগুলো থেকে নিজেকে রক্ষা করা। কেননা, তাদের সঙ্গে যেমন প্রবৃত্তি ও শয়তান রয়েছে, তার সঙ্গেও রয়েছে। আর বাস্তবতা হলো, অন্যদের তুলনায় মুমিনদেব ক্ষেত্রে গুনাহ ও অপরাধের চাহিদা বেশি থাকে। তদুপরি মানুষের মধ্যে বিদ্যমান প্রবৃত্তি ও শয়তান সেই আগ্রহকে আরও শক্তিশালী করে। এমনইভাবে ভালো এবং কল্যাণকর কাজের ক্ষেত্রেও অনুরূপ হয়।
এ জন্যই অনেক মানুষের ক্ষেত্রে এমন হয় যে, তারা ভালো কিংবা মন্দ কোনোটিই প্রতিহত না করে অন্যের অনুসরণ করে। বিশেষত তার সঙ্গী-সাথিদের কেউ যখন কোনো কাজ করে, তখন সে-ও তাই করে বসে। কারণ, স্বভাবের দিক থেকে কতা পাখির ঝাকের মতো। যাদের একটি থেকে অন্যটিকে পার্থক্য করা যায় না। এ কারনেই ভালো এবং খারাপ কাজের সূচনাকারী তার অনুসারীদের ন্যায় পুণ্য এবং শাস্তিপ্রাপ্ত হয়। যেমনটা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, জারির ইবনু আবদুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত; রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে লোক ইসলামে কোনো সুন্নত চালু করল এবং পরবর্তীকালে সে অনুসারে আমল করা হলো, তার জন্য আমলকারীর প্রতিদানের সমান প্রতিদান লিখিত হবে। এতে তাদের প্রতিদানে কোনো ঘাটতি হবে না, আর যে লোক ইসলামে কোনো অশুভ নীতি চালু করল এবং তারপর সে অনুযায়ী আমল করা হলো, তার জন্য আমলকারীর খারাপ প্রতিদানের সমান গুনাহ লিখিত হবে। এতে তাদের পাপ সামান্য ঘাটতি হবে না。
আর তা মূলত তাদের সম্মিলিত অংশগ্রহণের কারণে হবে। আর এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, প্রত্যেক জিনিসের বিধান তার অনুরূপ বিষয়ের মতোই হয়। আর সাদৃশ্যপূর্ণ জিনিস তার দিকেই অনুরূপ জিনিসকে টেনে আনে। আর যেহেতু মানুষের মধ্যে শক্তিশালী দুটি চাহিদাশক্তি বিদ্যমান, সুতরাং যখন সেগুলোর সঙ্গে আরও আহ্বানকারী মিলিত হয়, তখন অবস্থা কী দাঁড়ায় একটু চিন্তা করুন! এ জন্যই অধিকাংশ অপরাধী ও গুনাহগার ব্যক্তি তার মতো অপরাধী ও গুনাহগারকে ভালোবাসে। আর যারা তাদের মতো কাজ করে না, তাদের প্রতি বিদ্বেষ এবং শত্রুতা পোষণ করে।
এমনইভাবে পার্থিব ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণকারী লোকগুলো তাদের সঙ্গীদেরকেও তাদের কাজকর্ম এবং প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে আগ্রহী করে। আর এটা হয়ে থাকে নিজেদের সহযোগী বৃদ্ধি করতে। যেমন: রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ডাকাতদল প্রভৃতি। অথবা এ জন্য করে থাকে যে, অন্যরাও তাদের সঙ্গী হলে এতে তারা স্বাদ অনুভব করে। যেমন: মদপানের আড্ডা। অর্থাৎ তাদের সঙ্গে উপস্থিত সকলেই মদপান করুক, এটাই তারা কামনা করে। অথবা এ জন্য করে থাকে যে, ভালো কাজের মাধ্যমে কেউ তাদের থেকে আলাদা থাকুক এটা তারা অপছন্দ করে, তাদের প্রতি হিংসাবশত। কিংবা তারা যেন তাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে না পারে এবং তাদের ছাড়া অন্য কারও প্রশংসা না করা হোক এই প্রত্যাশায়।
অথবা এই জন্য যে, তাদের বিরুদ্ধে যেন কোনো দলিল-প্রমাণ কারও কাছে না থাকে। কিংবা এ জন্য যে, তাদের নিজেদের কারও কারণে যেন পরবর্তীতে বিপদের সম্মুখীন হতে না হয়, অথবা কেউ যেন লোকদের নিকট এই অপরাধ প্রকাশ না করে, কিংবা বিপদের সম্ভাব্য পথ বন্ধের আশায়। এ ধরনের আরও বিভিন্ন কারণে তারা চায় যেন সবাই তাদের মতোই হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَدَّ كَثِيرٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَوْ يَرُدُّونَكُم مِّن بَعْدِ إِيمَانِكُمْ كُفَّارًا حَسَدًا مِّنْ عِندِ أَنفُسِهِم مِّن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْحَقُّ.
অর্থ: আহলে কিতাবের অনেকেই চায়, যদি তারা তোমাদেরকে ঈমান আনার পর কাফের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারত! সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর তাদের পক্ষ থেকে হিংসাবশত তারা এরূপ করে থাকে।
অন্যত্র মুনাফিকদের অবস্থার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ كَمَا كَفَرُوا فَتَكُونُونَ سَوَاءً.
অর্থ: তারা চায় যে, তারা যেমন কাফের, তোমরাও তেমনই কাফের হয়ে যাও, যাতে তোমরা এবং তারা সমান হয়ে যাও।
উসমান ইবনু আফফান রাযি. বলেছেন, ব্যভিচারিণী চায় সব নারীই তার মতো ব্যভিচারে লিপ্ত হোক।
কখনো কখনো মানুষ সম্মিলিতভাবেই অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে। যেমন সম্মিলিতভাবে মদপান, মিথ্যা বলা এবং ভ্রান্ত বিশ্বাস ও আকিদা রাখা। আবার কখনো কখনো এই মর্মে ঐক্যবদ্ধ হয় যে, অন্যরাও গুনাহে লিপ্ত হয়ে যাক এই কামনায়। যেমন: ব্যভিচারী চায় অন্যরাও তার মতো ব্যভিচারে লিপ্ত হোক। চোর চায় অন্যরা তার মতো চুরি করুক। তবে তাদের এই কামনাটা এভাবে হয় যে, সে যার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে, অন্যরা তার সাথে নয়, বরং অন্য কারও সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হোক। অথবা সে যা চুরি করেছে, অন্যরা তা ছাড়া অন্যকিছু চুরি করুক। অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হওয়ার আরও একটি কারণ হলো, অপরাধী ব্যক্তি অন্যকে তার অপরাধ এবং গুনাহের কাজে অংশগ্রহণের জন্য নির্দেশ করে। যদি এতে তারা অংশগ্রহণ না করে, তাহলে সে তার শত্রু হয়ে যায়। বিভিন্নভাবে তাকে সে কষ্ট দিতে থাকে। এক পর্যায়ে তো সে জোর-জবরদস্তিরও সীমা অতিক্রম করে।
যারা নিজেদের মন্দ কাজে অন্যদের শরিক করতে পছন্দ করে, অথবা আদেশ করে, কিংবা সাহায্য করে, অতঃপর অন্যরা যখন তাদের মন্দ কাজে অংশগ্রহণ করে, তখন তারা তাকে হেয়প্রতিপন্ন করে এবং তাচ্ছিল্য করে। শুধু তাই নয়, অন্য সময় তাকে মন্দ কাজে অংশগ্রহণ করাতে এটিকে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে রেখে দেয়। পক্ষান্তরে যদি সে তাদের সাথে অংশগ্রহণ না করে, তাহলে তারা তার সাথে শত্রুতায় লিপ্ত হয় এবং তাকে কষ্ট দেয়। এটি বেশিরভাগ শক্তিশালী ও অত্যাচারীদের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। এ সমস্ত কারণ ও চাহিদা অন্যায় অপরাধের মধ্যে যেমন পাওয়া যায়, তেমনই ভালো কাজে তারচেয়ে আরও বেশি পাওয়া যায়। যেমনটা আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِ.
অর্থ : আর যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহর জন্য ভালোবাসায় দৃঢ়তর。
অবশ্যই কল্যাণের আহ্বান অত্যন্ত শক্তিশালী। কেননা মানুষের ভেতরে ঈমান, এলেম, সততা, আমানতদারিতার দিকে আহ্বানকারী একজন রয়েছে। অতঃপর যখন সে অনুরূপ কাজ কারও থেকে হতে দেখে; বিশেষত তার মতো কারও থেকে, তখন তার ভেতর এ কাজের প্রতি আরেকটি আহ্বায়ক এবং দাবি তৈরি হয়। আর যদি সে তার পছন্দের নেককার মুমিনদের কাউকে করতে দেখে, যার কাজগুলো তাকে আনন্দিত করে এবং সে না করলে ব্যথিত হয়, তখন তৃতীয় আরেকটি শক্তি তৈরি হয়। এরপর যখন কেউ তাকে এ কাজে সমর্থন ও সহযোগিতা করে এবং এ কাজগুলো ছেড়ে না দিলে তার সাথে শত্রুতা করে ও শাস্তি দেয়, তখন চতুর্থ আরেকটি শক্তি তৈরি হয়।
এ জন্যই মুমিনদেরকে মন্দের পরিবর্তে ভালো কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন: একজন রুগীকে তার বিপরীত ঔষধ দ্বারা চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। তাই একজন মুমিনকে দুই জিনিসের মাধ্যমে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: এক. ভালো কাজ করার মাধ্যমে। দুই. মন্দ কাজ বর্জনের মাধ্যমে।
পাশাপাশি যা কিছু ভালো কাজকে বাধাগ্রস্ত করে এবং খারাপ ও মন্দকে কামনা করে, তা থেকেও বেঁচে থাকতে হবে। আত্মপরিশুদ্ধির এই চারটি ধাপ। শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী এই চারটির মাধ্যমে অপরকেও সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলার বাণী,
وَالْعَصْرِ. إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ.
অর্থ: কসম যুগের। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্য এবং সবরের উপদেশ দেয়。
টিকাঃ
৯৮. সুরা কাসাস : ৬৩।
৯৯. সুরা নিসা : ২৭।
১০০. সুরা আল ইমরান : ১১৮।
১০১. সুরা নিসা: ৮৯।
১০২. সুরা বাকারা: ১১৭।
১০৩. সুরা বাকারা: ১২০।
১০৪. মুসলিম শরিফ: ১০১৭।
১০৫. সুরা বাকারা: ১০৯।
১০৬. সুরা নিসা: ৮৯।
১০৭. সুরা বাকারা: ১৬৫।
১০৮. সুরা আসর: ১-৩।
📄 অসৎ লোকের সঙ্গীরাও শাস্তির ভাগ পাবে
মক্কার মুসলমানদের একটি দল বদর যুদ্ধের দিন মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য তাদের সাথে যুদ্ধে বের হয়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে থাকা মুসলমানদের একটি তির মুশরিকদের সঙ্গে থাকা তাদের এক ভাইয়ের শরীরে বিদ্ধ হয়। এতে মুসলমানরা ব্যথিত হয়ে বলে উঠল, আমরা আমাদের ভাইকে হত্যা করে ফেললাম। তখন আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে থাকা মুসলমানদের অন্তরের দুঃখ ও ব্যথা উপশমের জন্য এবং মুশরিকদের সঙ্গ দেওয়া লোকদের সতর্ক করে পবিত্র কুরআনে আয়াত অবতীর্ণ করেন। বুখারি শরিফে আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযি. বলেন, কিছুসংখ্যক মুসলিম মুশরিকদের সঙ্গে থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে মুশরিকদের দল ভারী করেছিল। তির এসে তাদের কারও ওপর পড়ত এবং তাকে মেরে ফেলত অথবা তাদের কেউ মার খেত এবং নিহত হতো, তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন,
إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنتُمْ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا فَأُولَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءَتْ مَصِيرًا.
অর্থ : নিশ্চয়ই যারা নিজদের প্রতি জুলুমকারী, ফেরেশতারা তাদের জান কবজ করার সময় বলে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে, আমরা পৃথিবীতে দুর্বল ছিলাম। ফেরেশতারা বলে, আল্লাহর জমিন কি প্রশস্ত ছিল না, তোমরা তাতে হিজরত করতে? সুতরাং ওরাই তারা যাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম। আর তা মন্দ প্রত্যাবর্তনস্থল。
বুখারি শরিফে হযরত আয়েশা রাযি. আনহু থেকে বর্ণিত হাদিস, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একটি বাহিনী কাবা ঘরের ওপর আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে বের হবে। অতঃপর যখন তারা সমতল বাইদা নামক স্থানে পৌঁছবে, তখন তাদের প্রথম ও শেষ ব্যক্তি সকলকেই জমিনে ধসিয়ে দেওয়া হবে। এ কথা শুনে আয়েশা রাযি. বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! কেমন করে তাদের প্রথম ও শেষ—সকলকে ধসিয়ে দেওয়া হবে? অথচ তাদের মধ্যে তাদের বাজারের ব্যবসায়ী এবং এমন লোক থাকবে, যারা আক্রমণকারীদের অন্তর্ভুক্ত নয়। তিনি বললেন, তাদের প্রথম ও শেষ—সকলকে ধসিয়ে দেওয়া হবে। তারপর তাদেরকে তাদের নিয়ত অনুযায়ী পুনরুত্থিত করা হবে।
হাফেজ ইবনু হাজার রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লেখেন, সায়িদ ইবনু যুবায়ের রহ. এই আয়াতের শিক্ষায় বলেন, যে এলাকায় অপরাধ সংঘটিত হয়, সেই এলাকা থেকে হিজরত করা আবশ্যক।
আবদুল্লাহ ইবনু উমর থেকে বুখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন আল্লাহ তাআলা কোনো কওমের ওপর আজাব অবতীর্ণ করেন, তখন সেখানে বসবাসরত সকলের ওপরই সেই আজাব পতিত হয়। অবশ্য পরে প্রত্যেককে তার আমল অনুযায়ী উঠানো হবে।
মুসলিম শরিফের হাদিসে হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে, একদা রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত-পা নাড়ালেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আজ রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় আপনি এমন আচরণ করেছেন, যা পূর্বে আপনি কখনো করেননি। তিনি বললেন, আশ্চর্য ব্যাপার এই যে, কুরাইশ বংশীয় এক ব্যক্তি বায়তুল্লাহ শরিফে আশ্রয় গ্রহণ করবে। তার কারণে আমার উম্মতের একদল লোক বায়তুল্লাহর ওপর আক্রমণের ইচ্ছা করবে। তারা রওনা হয়ে উদ্ভিদশূন্য ময়দানে আসতেই তাদেরসহ ভূমি ধ্বসিয়ে দেওয়া হবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! বিভিন্ন রকমের মানুষই তো রাস্তা দিয়ে চলে। জবাবে তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাদের মধ্যে কেউ তো স্বেচ্ছায় আগমনকারী, কেউ অপারগ, আবার কেউ পথিক মুসাফির। তারা সকলে একসাথেই ধ্বংস হয়ে যাবে। তবে বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে তাদের উত্থান হবে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তাদের নিয়তের ভিত্তিতে উত্থিত করবেন।
বুখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিসে জয়নাব বিনতু জাহাশ রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে বললেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। অচিরেই আরবরা বিপদগ্রস্ত হয়ে ধ্বংস হবে। আজ ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর এতটুকু পরিমাণ খুলে দেওয়া হয়েছে। এ সময় সুফিয়ান রহ.-এর হাত দ্বারা দশের চক্র বানালেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্যে পুণ্যবান লোক থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব? জবাবে তিনি বললেন, হ্যাঁ, যখন পাপাচার বেড়ে যাবে。
মুসলিম শরিফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাযি. থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ কথা বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তাআলা যখন কোনো গোত্রকে শাস্তি দেওয়ার ইচ্ছা করেন, তখন এ শাস্তি ওই গোত্রে অবস্থিত প্রত্যেকের ওপরই নিপতিত হয়। অতঃপর কেয়ামতের দিন তাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ আমল অনুযায়ী পুনরুত্থিত করা হবে。
যদি সাধারণভাবে অসৎ লোকদের প্রতি লক্ষ করি, বা যাদের কেউ একাকী অন্ধকার কারাগারে ভুগছে, কিংবা বড় কোনো অপরাধে লিপ্ত আছে অথবা যে অনেক বড় পাপী বা পিতা-মাতার অবাধ্য, তাহলে আমরা দেখতে পাই তাদের অপরাধ, গুনাহ ও মাতা-পিতার অবাধ্যতার সবচেয়ে বড় কারণ তাদের অসৎ বন্ধু এবং মন্দ সঙ্গী。
টিকাঃ
১০৯. বুখারি শরিফ: ৪৫৯৬।
১১০. সুরা নিসা: ৯৭।
১১১. বুখারি শরিফ: ২১১৮।
১১২. বুখারি শরিফ: ৭১০৮, মুসলিম শরিফ: ২৮৭৯।
১১৩. হাফেজ ইবনু হাজার রহ. ফাতহুল বারিতে লেখেন, এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম মুহাল্লাব বলেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত অপরাধমূলক কাজে কোনো সম্প্রদায়ের সাথি হবে, অপরাধী সম্প্রদায়ের সাথেই ওই ব্যক্তির শাস্তি আবশ্যকীয় হবে। তিনি আরও বলেন, এ থেকে ইমাম মালেক রহ. বলেন, মদপানকারীদের সাথে উপবেশনকারীকেও শাস্তি দেওয়া হবে। যদিও সে মদপান না করে থাকে। ইবনুল মুনির রহ. ইমাম মালেক রহ.-এর কথার ওপর প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, হাদিসে আসমানি শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এর ভিত্তিতে শরিয়তের শাস্তিকে অনুমান করা যথাযথ নয়। হাদিসের শেষ অংশ 'আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তাদের নিয়তের ভিত্তিতে উত্থিত করবেন'-এতে এই ব্যাখ্যারই সমর্থন পাওয়া যায়। কেননা এই হাদিসে বলা হয়েছে, কর্তার নিয়তের হিসেবে কর্মফল ধর্তব্য হবে। এ ছাড়া এতে অপরাধী জালেম সম্প্রদায়ের সাথে উঠাবসা থেকে সতর্ক করে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। আর তাদের দল বৃদ্ধি করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে যাকে এ ক্ষেত্রে বাধ্য করা হয়, তার কথা ভিন্ন। দুর্নীতিবাজ অসাধু ব্যবসায়ীর সঙ্গ গ্রহণ করার বিষয়টি গভীরভাবে ভাববার বিষয়। এতে কি তার অপরাধে তাকে সহযোগিতা করা হয়, নাকি এটি মানুষের মানবিক প্রয়োজনের কারণেই হয়?
পক্ষান্তরে 'অতঃপর প্রত্যেকের কাজ তার নিয়ত অনুযায়ী ধর্তব্য হয়' বাহ্যত হাদিসের এই অংশটি দ্বিতীয় ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে।।
ইবনু তিন বলেন, হাদিসে যে দলকে ধসিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সম্ভাবনা রয়েছে যে এরাই কাবা শরিফকে ধ্বংস করেছিল। তাই তাদেরকে শাস্তিস্বরূপ জমিনে ধসিয়ে দেওয়া হয়। তার এই ব্যাখ্যার ওপর প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, মুসলিম শরিফের হাদিসের একটি অংশে বলা হয়েছে, 'আমার উম্মতের একটি দল'। আর কাবা শরিফকে যারা ধ্বংস করেছিল তারা ছিল কাফেরদের দল। এ ছাড়াও যদি এমনই ব্যাখ্যা হয়, তাহলে হাদিসের দাবি হলো কাবা শরিফকে ধ্বংস করে তাদের প্রত্যাবর্তনের পর তাদেরকে ধসিয়ে দেওয়া হবে, অথচ হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, তাদেরকে ধসিয়ে দেওয়া হয়েছিল মক্কায় পৌঁছানোর পূর্বেই। -ফাতহুল বারি: ২৪১/৪
১১৪. মুসলিম শরিফ: ২৮৮৪।
১১৫. বুখারি শরিফ: ৭০৫৯; মুসলিম শরিফ: ২৮৮০।
১১৬. মুসলিম শরিফ: ২৮৭৯।
📄 অসৎ সঙ্গ নিজের প্রতি অপবাদ আরোপে প্ররোচনা দেয়
সন্দেহবাদী, মন্দ ও ফেতনাবাজ লোকদের সাথে উঠাবসাকারী ব্যক্তি তার প্রতি অন্যকে অপবাদ আরোপে প্ররোচিত করে এবং মানুষের মনে তার নিজের সম্পর্কে সন্দেহ জাগায়।
বুখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে, বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আনসারি সাহাবি হযরত ইতবান ইবনু মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি নবীজির নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আমার দৃষ্টিশক্তিতে কমতি অনুভব করছি। এ ছাড়া আমার ও আমার গোত্রের মধ্যকার উপত্যকাটি বৃষ্টি হলে প্লাবিত হয়ে যায়। তখন তা পার হওয়া আমার জন্য কষ্টকর হয়। তাই আমার একান্ত আশা যে, আপনি এসে আমার ঘরের এক স্থানে নামাজ আদায় করবেন। আমি সে স্থানটি নামাজের স্থান হিসেবে নির্ধারিত করে নেব।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আচ্ছা তাই করব। সুতরাং পরের দিন সূর্যের তাপ যখন প্রবল হলো, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর রাযি. আমার বাড়িতে এলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলে আমি তাঁকে অনুমতি দিলাম। তিনি না বসেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ঘরের কোন স্থানে আমার নামাজ পড়া তুমি পছন্দ করো? আমি যে স্থানে তাঁর নামাজ পড়া পছন্দ করেছিলাম, সেই স্থানের দিকে ইশারা করে দেখিয়ে দিলাম।
সুতরাং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজে দাঁড়িয়ে তাকবির বললেন। আমরা সারিবদ্ধভাবে তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে গেলাম। তিনি দু- রাকাত নামাজ পড়ে সালাম ফেরালেন। তাঁর সালাম ফেরানোর সময় আমরাও সালাম ফেরালাম। তারপর তাঁর জন্য যে 'খাযির' প্রস্তুত করা হচ্ছিল, তা খাওয়ার জন্য তাঁকে অপেক্ষা করালাম। ইতিমধ্যে মহল্লার লোকেরা শুনল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বাড়িতে। সুতরাং তাদের কিছু লোক এসে জমায়েত হলো। এমনকি বাড়িতে অনেক লোকের সমাগম হলো। তাদের মধ্যে একজন বলল, মালেক ইবনু দুখশুন কোথায়? একজন জবাব দিলো, সে মুনাফিক! আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসে না। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এমন কথা বলো না। তুমি কি মনে করো না যে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের ইচ্ছায় 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে? সে ব্যক্তি বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই অধিক জানেন। তবে আল্লাহর কসম! আমরা তাকে মুনাফিকদের সাথেই ভালোবাসা ও আলাপ-আলোচনায় লিপ্ত দেখতে পাই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিয়েছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে。
টিকাঃ
১১৭. চর্বি ও আটা দিয়ে প্রস্তুত এক প্রকার খাবার।
১১৮. বুখারি শরিফ: ১১৮৬, মুসলিম শরিফ: ১৫২৮।