📄 রোমের বাদশা হিরাক্লার ঘটনা
হিরাকলা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ফেলেছিল। আর তার কামনা ছিল রাসুল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে থাকলে তিনি তার দুই পা ধুয়ে দিত। কিন্তু তার অসৎ সঙ্গী পাপাচারী বন্ধুরা তার পথভ্রষ্টতা ও গোমরাহির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর সে তখন পরাক্রমশালী ও সর্বশ্রেষ্ঠ আল্লাহর কাছে যা আছে তার ওপর তাদের চাওয়াকে প্রাধান্য দেয়। হিরাকলা আবু সুফিয়ানকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন করে তার দেওয়া উত্তরগুলো থেকে নিশ্চিতভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তের সত্যতা সম্পর্কে জানতে পেরেছিল। কিন্তু সে যখন তার রাজত্ব, দলবল ও সঙ্গী-সাথির সাহচর্যকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের রাজা হয়ে থাকাকে প্রাধান্য দিলো, তখন সে বিপথগামী হয়ে গেল। ফলে সে সত্যকে অস্বীকার করে পরিণামে লাঞ্চিত হলো।
সহিহ বুখারিতে আবু সুফিয়ান ইবনু হারব থেকে বর্ণিত হয়েছে, হিরাকলা একবার আবু সুফিয়ান ইবনু হারব কুরাইশদের কাফেলায় ব্যবসা উপলক্ষ্যে সিরিয়ায় থাকাবস্থায় তার কাছে প্রতিনিধি পাঠায়। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু সুফিয়ান ও কুরাইশদের সাথে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সন্ধিবদ্ধ ছিলেন। ফলে আবু সুফিয়ান তার সঙ্গীদের-সহ হিরাকলার কাছে আসেন। হিরাকলা তাদের প্রতি মনোযোগী হয়ে দোভাষীকে ডাকলেন。
তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, এই যে ব্যক্তি নিজেকে নবী বলে দাবি করে, তোমাদের মধ্যে বংশের দিক দিয়ে তাঁর সবচেয়ে নিকটাত্মীয় কে? আবু সুফিয়ান বলেন, আমি বললাম, বংশের দিক দিয়ে আমিই তাঁর নিকটাত্মীয়। তিনি বললেন, তাকে আমার খুব কাছে নিয়ে এসো এবং তার সঙ্গীদেরও কাছে এনে পেছনে বসিয়ে দাও। এরপর তার দোভাষীকে বললেন, তাদের বলে দাও, আমি এর কাছে সে ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করব, সে যদি আমার কাছে মিথ্যা বলে, তাহলে সাথে সাথে তোমরা তাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রকাশ করবে। আবু সুফিয়ান বলেন, আল্লাহর কসম! তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রচার করবে-এ লজ্জা যদি আমার না থাকত, তাহলে অবশ্যই আমি তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা বলতাম。
এরপর তিনি তাঁর সম্পর্কে আমাকে প্রথম যে প্রশ্ন করেন তা হচ্ছে, তোমাদের মধ্যে তাঁর বংশমর্যাদা কেমন? আমি বললাম, তিনি আমাদের মধ্যে অতি সম্ভ্রান্ত বংশের। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে এর আগে আর কখনো কি কেউ এ কথা বলেছে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তাঁর বাপ-দাদাদের মধ্যে কি কেউ বাদশাহ ছিলেন? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তারা কি সংখ্যায় বাড়ছে, না কমছে? আমি বললাম, তারা বেড়েই চলেছে। তিনি বললেন, তাঁর দ্বীন গ্রহণ করার পর কেউ কি অসন্তুষ্ট হয়ে তা পরিত্যাগ করে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, নবুওয়তের দাবির আগে তোমরা কি কখনো তাঁকে মিথ্যার দায়ে অভিযুক্ত করেছ? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তিনি কি চুক্তি ভঙ্গ করেন? আমি বললাম, না। তবে আমরা তাঁর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তিতে আবদ্ধ আছি। জানি না, এর মধ্যে তিনি কী করবেন。
আবু সুফিয়ান বলেন, আমি এ কথাটুকু ছাড়া নিজের পক্ষ থেকে আর কোনো কথা সংযোজনের সুযোগই পাইনি। তিনি বললেন, তোমরা কি তাঁর সাথে কখনো যুদ্ধ করেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাঁর সঙ্গে তোমাদের যুদ্ধ কেমন হয়েছে? আমি বললাম, তাঁর ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধের ফলাফল কুয়ার বালতির ন্যায়। কখনো তাঁর পক্ষে যায়, আবার কখনো আমাদের পক্ষে আসে। তিনি বললেন, তিনি তোমাদের কীসের আদেশ দেন? আমি বললাম, তিনি বলেন, তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুর শরিক করো না এবং তোমাদের বাপ-দাদার ভ্রান্ত মতবাদ ত্যাগ করো। আর তিনি আমাদের নামাজ আদায় করা, সত্য কথা বলা, নিষ্কলুষ থাকা এবং আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করার আদেশ দেন。
তারপর তিনি দোভাষীকে বললেন, তুমি তাকে বলো, আমি তোমার কাছে তাঁর বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তুমি তার জবাবে উল্লেখ করেছ যে, তিনি তোমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশের। প্রকৃতপক্ষে রাসুলগণকে তাঁদের কওমের উচ্চ বংশেই প্রেরণ করা হয়ে থাকে। তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, এ কথা তোমাদের মধ্যে ইতিপূর্বে আর কেউ বলেছে কি না? তুমি বলেছ, না। তাই আমি বলছি যে, আগে যদি কেউ এ কথা বলে থাকত, তবে অবশ্যই আমি বলতে পারতাম, সে এমন ব্যক্তি, যে তাঁর পূর্বসূরির কথারই অনুসরণ করছে। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে কোনো বাদশাহ ছিলেন কি না? তুমি তার জবাবে বলেছ, না। তাই আমি বলছি যে, তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে যদি কোনো বাদশাহ থাকত, তাহলে আমি বলতাম, তিনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি তাঁর বাপ-দাদার বাদশাহি ফিরে পেতে চান।
আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, এর আগে কখনো তোমরা তাঁকে মিথ্যার দায়ে অভিযুক্ত করেছ কি না? তুমি বলেছ, না। এতে আমি বুঝলাম, এমনটি হতে পারে না যে, কেউ মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা ত্যাগ করবে অথচ আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলবে। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, সবলরা তাঁর অনুসরণ করে, না দুর্বল লোক? তুমি বলেছ, দুর্বলরাই তাঁর অনুসরণ করে। আর বাস্তবেও এরাই হন রাসুলগণের অনুসারী। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তারা সংখ্যায় বাড়ছে না কমছে? তুমি বলেছ, বাড়ছে। প্রকৃতপক্ষে ঈমানে পূর্ণতা লাভ করা পর্যন্ত এ রকমই হয়ে থাকে। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তারা তাঁর দ্বীন গ্রহণের পর অসন্তুষ্ট হয়ে কেউ কি তা ত্যাগ করে? তুমি বলেছ, না। ঈমানের স্নিগ্ধতা অন্তরের সাথে মিশে গেলে ঈমান এরূপই হয়। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তিনি চুক্তি ভঙ্গ করেন কি না? তুমি বলেছ, না। প্রকৃতপক্ষে রাসুলগণ এরূপই, চুক্তি ভঙ্গ করেন না。
আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তিনি তোমাদের কীসের নির্দেশ দেন। তুমি বলেছ, তিনি তোমাদের এক আল্লাহর ইবাদত করা ও তাঁর সাথে অন্য কিছুকে শরিক না করার নির্দেশ দেন। তিনি তোমাদের নিষেধ করেন মূর্তিপূজা করতে আর তোমাদের আদেশ করেন নামাজ আদায় করতে, সত্য কথা বলতে ও কলুষমুক্ত থাকতে। তুমি যা বলেছ তা যদি সত্য হয়, তাহলে শীঘ্রই তিনি আমার এ দু-পায়ের নিচের জায়গার মালিক হবেন। আমি নিশ্চিত জানতাম, তাঁর আবির্ভাব হবে; কিন্তু তিনি যে তোমাদের মধ্য থেকে হবেন, এ কথা ভাবিনি। যদি জানতাম, আমি তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারব, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমি যে-কোনো কষ্ট স্বীকার করতাম। আর আমি যদি তাঁর কাছে থাকতাম, তাহলে অবশ্যই তাঁর পা দুটো ধুয়ে দিতাম।
অতঃপর হাদিসের শেষ অংশে হিরাকলার শেষ অবস্থার বিবরণ উল্লেখ করে বর্ণিত হয়েছে, তারপর হিরাকলা তাঁর হিমসের প্রাসাদে রোমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ডাকলেন এবং প্রাসাদের সব দরজা বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। দরজা বন্ধ করা হলে তিনি সামনে এসে বললেন, হে রোমবাসী! তোমরা কি কল্যাণ, হেদায়েত এবং তোমাদের রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব চাও? তাহলে এই নবীর আনুগত্য মেনে নাও。
এ কথা শুনে তারা জংলি গাধার মতো ঊর্ধ্বশ্বাসে দরজার দিকে ছুটল, কিন্তু তারা তা বন্ধ পেল। হিরাকলা যখন তাদের মনোভাব লক্ষ করলেন এবং তাদের ঈমান থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন, তখন বললেন, ওদের আমার কাছে ফিরিয়ে আনো। তিনি বললেন, আমি একটু আগে যে কথা বলেছি, তা দিয়ে তোমরা তোমাদের দ্বীনের ওপর কতটুকু অটল, কেবল তার পরীক্ষা করেছিলাম। এখন আমি তা দেখে নিলাম। এ কথা শুনে তারা তাকে সেজদা করল এবং তার প্রতি সন্তুষ্ট হলো। এই ছিল হিরাকলার শেষ অবস্থা。
এবার বর্ণনা করব অসৎ সঙ্গ যাকে নষ্ট করে দিয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ তাকে রক্ষা করল।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
فَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَسَاءَلُونَ. قَالَ قَائِلٌ مِنْهُمْ إِنِّي كَانَ لِي قَرِينٌ. يَقُولُ أَإِنَّكَ لَمِنَ الْمُصَدِّقِينَ. أَإِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَابًا وَعِظَامًا أَإِنَّا لَمَدِينُونَ. قَالَ هَلْ أَنْتُمْ مُطَّلِعُونَ. فَاطَّلَعَ فَرَآهُ فِي سَوَاءِ الْجَحِيمِ. قَالَ تَاللَّهِ إِنْ كِدْتَ لَتُرْدِينِ. وَلَوْلَا نِعْمَةُ رَبِّي لَكُنْتُ مِنَ الْمُحْضَرِينَ.
অর্থ : অতঃপর তারা একে অপরের দিকে মুখ করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তাদের একজন বলবে, আমার এক সঙ্গী ছিল। সে বলত, তুমি কি বিশ্বাস করো যে, আমরা যখন মরে যাব এবং মাটি ও হাড়ে পরিণত হব, তখনও আমরা প্রতিফলপ্রাপ্ত হব? আল্লাহ বলবেন, তোমরা কি তাকে উঁকি দিয়ে দেখতে চাও? অপর সে উঁকি দিয়ে দেখবে এবং তাকে জাহান্নামের মাঝখানে দেখতে পাবে। সে বলবে, আল্লাহর কসম, তুমি তো আমাকে প্রায় ধ্বংসই করে দিয়েছিলে। আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ না হলে আমিও যে গ্রেফতারকৃতদের সাথেই উপস্থিত হতাম।
ইমাম সাদি রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজ তাফসির গ্রন্থে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতিদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, খাবার-দাবার, পানীয়, উত্তম সঙ্গী-সাথি এবং খোশগল্পের আসরের আনন্দচিত্তের বর্ণনার সাথে সাথে সেখানে তাদের মাঝে পরস্পরের অতীত জীবনের আলাপচারিতার বিবরণ এই আয়াতে দিয়েছেন। সেখানে তারা পরস্পরের খোঁজখবর এবং বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবে। একপর্যায়ে তাদের একজন অন্যজনকে এভাবে বলবে, দুনিয়াতে আমার একজন বন্ধু ছিল। সে রাসুলের নবুওয়তকে অস্বীকার করত। তাঁর প্রতি বিশ্বাসের কারণে আমাকে সে তিরস্কার করে বলত, তুমি কি বিশ্বাস করো যে, আমরা যখন মরে যাব এবং মাটি ও হাড়ে পরিণত হব, তখনও কি আমরা প্রতিফলপ্রাপ্ত হব? মানে আমাদের কাজের প্রতিফল কি দেওয়া হবে?
অর্থাৎ সে আমাকে বোঝাতে চাইত, এমন অসম্ভব ও দুঃসাধ্য বিষয়ে কীভাবে তাকে তুমি বিশ্বাস করলে? কারণ আমরা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মাটি এবং হাড্ডিতে পরিণত হব। তখন আমাদেরকে পুনরায় জীবিত ও পুনরুত্থিত করে আমাদের হিসাব নেওয়া এবং কাজের প্রতিফল দেওয়া কি সম্ভব?!
অর্থাৎ জান্নাতি ব্যক্তি আরেকজন তার জান্নাতি ভাইকে নিজ অতীত জীবনের কাহিনি এবং সংবাদ বলবে এভাবে যে, আমার একজন বন্ধু ছিল দুনিয়াতে। আমি ছিলাম একজন আল্লাহভক্ত ও বিশ্বাসী মুমিন। আর সে ছিল পুনরুত্থান অস্বীকারকারী একজন অবিশ্বাসী। এভাবেই আমাদের মৃত্যু হয়ে যায়। এরপর আমাদের পুনরুত্থিত করা হয়েছে। তোমরা এখন প্রত্যক্ষ করছ। আল্লাহ তাআলার অশেষ অনুগ্রহে আমি এসে পৌঁছেছি চিরস্থায়ী জান্নাতের নেয়ামতের মাঝে। যার সংবাদ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে দিয়েছিলেন। আর নিঃসন্দেহে আমার সঙ্গী সে জাহান্নামের শাস্তির স্থানে পৌঁছেছে। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের লক্ষ্য করে বলবেন,
قَالَ هَلْ أَنتُم مُّطَّلِعُونَ.
অর্থ: তোমরা কি তাকে উঁকি দিয়ে দেখতে চাও?
জান্নাতিরা তখন উত্তরে বলবে, হ্যাঁ, আমরা তাদের এ জন্য দেখতে চাই, যেন আমাদের আনন্দ ও সুখ আরও বৃদ্ধি পায়। আর এর চাক্ষুষ জ্ঞানও আমরা লাভ করি।
কুরআনে বর্ণিত জান্নাতিদের পারস্পরিক আনন্দ বিনিময় এবং ভালোবাসার দৃশ্য থেকে বুঝে আসে যে, যখন তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে, তারা তখন এভাবে উত্তর দেবে এবং তারা আল্লাহ তাআলাকে অনুসরণ করে চলতে থাকবে তাদের দুনিয়ার সাথিদের দেখার জন্য।
فَاطَّلَعَ فَرَآهُ فِي سَوَاءِ الْجَحِيمِ.
অর্থ: তখন সে উঁকি দিয়ে তাকে জাহান্নামের মাঝখানে দেখতে পাবে। অর্থাৎ সে তার বন্ধুকে জাহান্নামের অন্ধকারে কঠিন শাস্তিতে আবদ্ধ দেখতে পাবে। তখন সেই বন্ধুকে তার আজকের অবস্থানের ওপর ভর্ৎসনা করে তার চক্রান্ত থেকে আল্লাহ তাআলা তাকে রক্ষা করায় কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া আদায় করে বলবে,
قَالَ تَاللَّهِ إِن كِدتَّ لَتُرْدِينِ.
অর্থ: সে বলবে, আল্লাহর কসম, তুমি তো আমাকে প্রায় ধ্বংসই করে দিয়েছিলে। অর্থাৎ তোমার মনগড়া সংশয় ও সন্দেহের বীজ আমার ভেতরে প্রবেশের মাধ্যমে তুমি তো আমাকে ধ্বংস করে ফেলেছিলে।
وَلَوْلَا نِعْمَةُ رَبِّي لَكُنتُ مِنَ الْمُحْضَرِينَ.
অর্থ: আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ না হলে আমিও যে গ্রেফতারকৃতদের সাথেই উপস্থিত হতাম। অর্থাৎ ইসলামের ওপর আমার অটল-অবিচল থাকার প্রতি যদি আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ না হতো, তাহলে আমি তোমার সাথে জাহান্নামের শাস্তির সম্মুখীন হতাম。
টিকাঃ
৮০. বুখারি শরিফ: ৭; মুসলিম শরিফ: ১৭৭৩।
৮১. সুরা সাফফাত: ৫০-৫৭।
হিরাকলা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ফেলেছিল। আর তার কামনা ছিল রাসুল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে থাকলে তিনি তার দুই পা ধুয়ে দিত। কিন্তু তার অসৎ সঙ্গী পাপাচারী বন্ধুরা তার পথভ্রষ্টতা ও গোমরাহির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর সে তখন পরাক্রমশালী ও সর্বশ্রেষ্ঠ আল্লাহর কাছে যা আছে তার ওপর তাদের চাওয়াকে প্রাধান্য দেয়। হিরাকলা আবু সুফিয়ানকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন করে তার দেওয়া উত্তরগুলো থেকে নিশ্চিতভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তের সত্যতা সম্পর্কে জানতে পেরেছিল। কিন্তু সে যখন তার রাজত্ব, দলবল ও সঙ্গী-সাথির সাহচর্যকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের রাজা হয়ে থাকাকে প্রাধান্য দিলো, তখন সে বিপথগামী হয়ে গেল। ফলে সে সত্যকে অস্বীকার করে পরিণামে লাঞ্চিত হলো।
সহিহ বুখারিতে আবু সুফিয়ান ইবনু হারব থেকে বর্ণিত হয়েছে, হিরাকলা একবার আবু সুফিয়ান ইবনু হারব কুরাইশদের কাফেলায় ব্যবসা উপলক্ষ্যে সিরিয়ায় থাকাবস্থায় তার কাছে প্রতিনিধি পাঠায়। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু সুফিয়ান ও কুরাইশদের সাথে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সন্ধিবদ্ধ ছিলেন। ফলে আবু সুফিয়ান তার সঙ্গীদের-সহ হিরাকলার কাছে আসেন। হিরাকলা তাদের প্রতি মনোযোগী হয়ে দোভাষীকে ডাকলেন。
তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, এই যে ব্যক্তি নিজেকে নবী বলে দাবি করে, তোমাদের মধ্যে বংশের দিক দিয়ে তাঁর সবচেয়ে নিকটাত্মীয় কে? আবু সুফিয়ান বলেন, আমি বললাম, বংশের দিক দিয়ে আমিই তাঁর নিকটাত্মীয়। তিনি বললেন, তাকে আমার খুব কাছে নিয়ে এসো এবং তার সঙ্গীদেরও কাছে এনে পেছনে বসিয়ে দাও। এরপর তার দোভাষীকে বললেন, তাদের বলে দাও, আমি এর কাছে সে ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করব, সে যদি আমার কাছে মিথ্যা বলে, তাহলে সাথে সাথে তোমরা তাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রকাশ করবে। আবু সুফিয়ান বলেন, আল্লাহর কসম! তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রচার করবে-এ লজ্জা যদি আমার না থাকত, তাহলে অবশ্যই আমি তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা বলতাম。
এরপর তিনি তাঁর সম্পর্কে আমাকে প্রথম যে প্রশ্ন করেন তা হচ্ছে, তোমাদের মধ্যে তাঁর বংশমর্যাদা কেমন? আমি বললাম, তিনি আমাদের মধ্যে অতি সম্ভ্রান্ত বংশের। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে এর আগে আর কখনো কি কেউ এ কথা বলেছে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তাঁর বাপ-দাদাদের মধ্যে কি কেউ বাদশাহ ছিলেন? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তারা কি সংখ্যায় বাড়ছে, না কমছে? আমি বললাম, তারা বেড়েই চলেছে। তিনি বললেন, তাঁর দ্বীন গ্রহণ করার পর কেউ কি অসন্তুষ্ট হয়ে তা পরিত্যাগ করে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, নবুওয়তের দাবির আগে তোমরা কি কখনো তাঁকে মিথ্যার দায়ে অভিযুক্ত করেছ? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তিনি কি চুক্তি ভঙ্গ করেন? আমি বললাম, না। তবে আমরা তাঁর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তিতে আবদ্ধ আছি। জানি না, এর মধ্যে তিনি কী করবেন。
আবু সুফিয়ান বলেন, আমি এ কথাটুকু ছাড়া নিজের পক্ষ থেকে আর কোনো কথা সংযোজনের সুযোগই পাইনি। তিনি বললেন, তোমরা কি তাঁর সাথে কখনো যুদ্ধ করেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাঁর সঙ্গে তোমাদের যুদ্ধ কেমন হয়েছে? আমি বললাম, তাঁর ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধের ফলাফল কুয়ার বালতির ন্যায়। কখনো তাঁর পক্ষে যায়, আবার কখনো আমাদের পক্ষে আসে। তিনি বললেন, তিনি তোমাদের কীসের আদেশ দেন? আমি বললাম, তিনি বলেন, তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুর শরিক করো না এবং তোমাদের বাপ-দাদার ভ্রান্ত মতবাদ ত্যাগ করো। আর তিনি আমাদের নামাজ আদায় করা, সত্য কথা বলা, নিষ্কলুষ থাকা এবং আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করার আদেশ দেন。
তারপর তিনি দোভাষীকে বললেন, তুমি তাকে বলো, আমি তোমার কাছে তাঁর বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তুমি তার জবাবে উল্লেখ করেছ যে, তিনি তোমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশের। প্রকৃতপক্ষে রাসুলগণকে তাঁদের কওমের উচ্চ বংশেই প্রেরণ করা হয়ে থাকে। তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, এ কথা তোমাদের মধ্যে ইতিপূর্বে আর কেউ বলেছে কি না? তুমি বলেছ, না। তাই আমি বলছি যে, আগে যদি কেউ এ কথা বলে থাকত, তবে অবশ্যই আমি বলতে পারতাম, সে এমন ব্যক্তি, যে তাঁর পূর্বসূরির কথারই অনুসরণ করছে। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে কোনো বাদশাহ ছিলেন কি না? তুমি তার জবাবে বলেছ, না। তাই আমি বলছি যে, তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে যদি কোনো বাদশাহ থাকত, তাহলে আমি বলতাম, তিনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি তাঁর বাপ-দাদার বাদশাহি ফিরে পেতে চান।
আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, এর আগে কখনো তোমরা তাঁকে মিথ্যার দায়ে অভিযুক্ত করেছ কি না? তুমি বলেছ, না। এতে আমি বুঝলাম, এমনটি হতে পারে না যে, কেউ মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা ত্যাগ করবে অথচ আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলবে। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, সবলরা তাঁর অনুসরণ করে, না দুর্বল লোক? তুমি বলেছ, দুর্বলরাই তাঁর অনুসরণ করে। আর বাস্তবেও এরাই হন রাসুলগণের অনুসারী। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তারা সংখ্যায় বাড়ছে না কমছে? তুমি বলেছ, বাড়ছে। প্রকৃতপক্ষে ঈমানে পূর্ণতা লাভ করা পর্যন্ত এ রকমই হয়ে থাকে। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তারা তাঁর দ্বীন গ্রহণের পর অসন্তুষ্ট হয়ে কেউ কি তা ত্যাগ করে? তুমি বলেছ, না। ঈমানের স্নিগ্ধতা অন্তরের সাথে মিশে গেলে ঈমান এরূপই হয়। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তিনি চুক্তি ভঙ্গ করেন কি না? তুমি বলেছ, না। প্রকৃতপক্ষে রাসুলগণ এরূপই, চুক্তি ভঙ্গ করেন না。
আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তিনি তোমাদের কীসের নির্দেশ দেন। তুমি বলেছ, তিনি তোমাদের এক আল্লাহর ইবাদত করা ও তাঁর সাথে অন্য কিছুকে শরিক না করার নির্দেশ দেন। তিনি তোমাদের নিষেধ করেন মূর্তিপূজা করতে আর তোমাদের আদেশ করেন নামাজ আদায় করতে, সত্য কথা বলতে ও কলুষমুক্ত থাকতে। তুমি যা বলেছ তা যদি সত্য হয়, তাহলে শীঘ্রই তিনি আমার এ দু-পায়ের নিচের জায়গার মালিক হবেন। আমি নিশ্চিত জানতাম, তাঁর আবির্ভাব হবে; কিন্তু তিনি যে তোমাদের মধ্য থেকে হবেন, এ কথা ভাবিনি। যদি জানতাম, আমি তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারব, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমি যে-কোনো কষ্ট স্বীকার করতাম। আর আমি যদি তাঁর কাছে থাকতাম, তাহলে অবশ্যই তাঁর পা দুটো ধুয়ে দিতাম।
অতঃপর হাদিসের শেষ অংশে হিরাকলার শেষ অবস্থার বিবরণ উল্লেখ করে বর্ণিত হয়েছে, তারপর হিরাকলা তাঁর হিমসের প্রাসাদে রোমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ডাকলেন এবং প্রাসাদের সব দরজা বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। দরজা বন্ধ করা হলে তিনি সামনে এসে বললেন, হে রোমবাসী! তোমরা কি কল্যাণ, হেদায়েত এবং তোমাদের রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব চাও? তাহলে এই নবীর আনুগত্য মেনে নাও。
এ কথা শুনে তারা জংলি গাধার মতো ঊর্ধ্বশ্বাসে দরজার দিকে ছুটল, কিন্তু তারা তা বন্ধ পেল। হিরাকলা যখন তাদের মনোভাব লক্ষ করলেন এবং তাদের ঈমান থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন, তখন বললেন, ওদের আমার কাছে ফিরিয়ে আনো। তিনি বললেন, আমি একটু আগে যে কথা বলেছি, তা দিয়ে তোমরা তোমাদের দ্বীনের ওপর কতটুকু অটল, কেবল তার পরীক্ষা করেছিলাম। এখন আমি তা দেখে নিলাম। এ কথা শুনে তারা তাকে সেজদা করল এবং তার প্রতি সন্তুষ্ট হলো। এই ছিল হিরাকলার শেষ অবস্থা。
এবার বর্ণনা করব অসৎ সঙ্গ যাকে নষ্ট করে দিয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ তাকে রক্ষা করল।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
فَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَسَاءَلُونَ. قَالَ قَائِلٌ مِنْهُمْ إِنِّي كَانَ لِي قَرِينٌ. يَقُولُ أَإِنَّكَ لَمِنَ الْمُصَدِّقِينَ. أَإِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَابًا وَعِظَامًا أَإِنَّا لَمَدِينُونَ. قَالَ هَلْ أَنْتُمْ مُطَّلِعُونَ. فَاطَّلَعَ فَرَآهُ فِي سَوَاءِ الْجَحِيمِ. قَالَ تَاللَّهِ إِنْ كِدْتَ لَتُرْدِينِ. وَلَوْلَا نِعْمَةُ رَبِّي لَكُنْتُ مِنَ الْمُحْضَرِينَ.
অর্থ : অতঃপর তারা একে অপরের দিকে মুখ করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তাদের একজন বলবে, আমার এক সঙ্গী ছিল। সে বলত, তুমি কি বিশ্বাস করো যে, আমরা যখন মরে যাব এবং মাটি ও হাড়ে পরিণত হব, তখনও আমরা প্রতিফলপ্রাপ্ত হব? আল্লাহ বলবেন, তোমরা কি তাকে উঁকি দিয়ে দেখতে চাও? অপর সে উঁকি দিয়ে দেখবে এবং তাকে জাহান্নামের মাঝখানে দেখতে পাবে। সে বলবে, আল্লাহর কসম, তুমি তো আমাকে প্রায় ধ্বংসই করে দিয়েছিলে। আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ না হলে আমিও যে গ্রেফতারকৃতদের সাথেই উপস্থিত হতাম।
ইমাম সাদি রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজ তাফসির গ্রন্থে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতিদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, খাবার-দাবার, পানীয়, উত্তম সঙ্গী-সাথি এবং খোশগল্পের আসরের আনন্দচিত্তের বর্ণনার সাথে সাথে সেখানে তাদের মাঝে পরস্পরের অতীত জীবনের আলাপচারিতার বিবরণ এই আয়াতে দিয়েছেন। সেখানে তারা পরস্পরের খোঁজখবর এবং বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবে। একপর্যায়ে তাদের একজন অন্যজনকে এভাবে বলবে, দুনিয়াতে আমার একজন বন্ধু ছিল। সে রাসুলের নবুওয়তকে অস্বীকার করত। তাঁর প্রতি বিশ্বাসের কারণে আমাকে সে তিরস্কার করে বলত, তুমি কি বিশ্বাস করো যে, আমরা যখন মরে যাব এবং মাটি ও হাড়ে পরিণত হব, তখনও কি আমরা প্রতিফলপ্রাপ্ত হব? মানে আমাদের কাজের প্রতিফল কি দেওয়া হবে?
অর্থাৎ সে আমাকে বোঝাতে চাইত, এমন অসম্ভব ও দুঃসাধ্য বিষয়ে কীভাবে তাকে তুমি বিশ্বাস করলে? কারণ আমরা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মাটি এবং হাড্ডিতে পরিণত হব। তখন আমাদেরকে পুনরায় জীবিত ও পুনরুত্থিত করে আমাদের হিসাব নেওয়া এবং কাজের প্রতিফল দেওয়া কি সম্ভব?!
অর্থাৎ জান্নাতি ব্যক্তি আরেকজন তার জান্নাতি ভাইকে নিজ অতীত জীবনের কাহিনি এবং সংবাদ বলবে এভাবে যে, আমার একজন বন্ধু ছিল দুনিয়াতে। আমি ছিলাম একজন আল্লাহভক্ত ও বিশ্বাসী মুমিন। আর সে ছিল পুনরুত্থান অস্বীকারকারী একজন অবিশ্বাসী। এভাবেই আমাদের মৃত্যু হয়ে যায়। এরপর আমাদের পুনরুত্থিত করা হয়েছে। তোমরা এখন প্রত্যক্ষ করছ। আল্লাহ তাআলার অশেষ অনুগ্রহে আমি এসে পৌঁছেছি চিরস্থায়ী জান্নাতের নেয়ামতের মাঝে। যার সংবাদ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে দিয়েছিলেন। আর নিঃসন্দেহে আমার সঙ্গী সে জাহান্নামের শাস্তির স্থানে পৌঁছেছে। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের লক্ষ্য করে বলবেন,
قَالَ هَلْ أَنتُم مُّطَّلِعُونَ.
অর্থ: তোমরা কি তাকে উঁকি দিয়ে দেখতে চাও?
জান্নাতিরা তখন উত্তরে বলবে, হ্যাঁ, আমরা তাদের এ জন্য দেখতে চাই, যেন আমাদের আনন্দ ও সুখ আরও বৃদ্ধি পায়। আর এর চাক্ষুষ জ্ঞানও আমরা লাভ করি।
কুরআনে বর্ণিত জান্নাতিদের পারস্পরিক আনন্দ বিনিময় এবং ভালোবাসার দৃশ্য থেকে বুঝে আসে যে, যখন তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে, তারা তখন এভাবে উত্তর দেবে এবং তারা আল্লাহ তাআলাকে অনুসরণ করে চলতে থাকবে তাদের দুনিয়ার সাথিদের দেখার জন্য।
فَاطَّلَعَ فَرَآهُ فِي سَوَاءِ الْجَحِيمِ.
অর্থ: তখন সে উঁকি দিয়ে তাকে জাহান্নামের মাঝখানে দেখতে পাবে। অর্থাৎ সে তার বন্ধুকে জাহান্নামের অন্ধকারে কঠিন শাস্তিতে আবদ্ধ দেখতে পাবে। তখন সেই বন্ধুকে তার আজকের অবস্থানের ওপর ভর্ৎসনা করে তার চক্রান্ত থেকে আল্লাহ তাআলা তাকে রক্ষা করায় কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া আদায় করে বলবে,
قَالَ تَاللَّهِ إِن كِدتَّ لَتُرْدِينِ.
অর্থ: সে বলবে, আল্লাহর কসম, তুমি তো আমাকে প্রায় ধ্বংসই করে দিয়েছিলে। অর্থাৎ তোমার মনগড়া সংশয় ও সন্দেহের বীজ আমার ভেতরে প্রবেশের মাধ্যমে তুমি তো আমাকে ধ্বংস করে ফেলেছিলে।
وَلَوْلَا نِعْمَةُ رَبِّي لَكُنتُ مِنَ الْمُحْضَرِينَ.
অর্থ: আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ না হলে আমিও যে গ্রেফতারকৃতদের সাথেই উপস্থিত হতাম। অর্থাৎ ইসলামের ওপর আমার অটল-অবিচল থাকার প্রতি যদি আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ না হতো, তাহলে আমি তোমার সাথে জাহান্নামের শাস্তির সম্মুখীন হতাম。
টিকাঃ
৮০. বুখারি শরিফ: ৭; মুসলিম শরিফ: ১৭৭৩।
৮১. সুরা সাফফাত: ৫০-৫৭।
📄 অসৎ সঙ্গীরা পাপচারকেই সুসজ্জিত করে উপস্থাপন করে
أَفَمَا نَحْنُ بِمَيِّتِينَ. إِلَّا مَوْتَتَنَا الْأُولَى وَمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِينَ.
অর্থ: এখন আমাদের আর মৃত্যু হবে না, আমাদের প্রথম মৃত্যু ছাড়া এবং আমরা শাস্তি প্রাপ্তও হব না。
অর্থাৎ জান্নাতীগণ তখন তাদের জাহান্নামি সাথিকে জান্নাতে চিরস্থায়ী বসবাস এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে নিরাপত্তার নেওয়ামতের ওপর গর্বভরে দৃঢ়তার সাথে এই কথাগুলো বলবে।
খারাপ ও অসৎ সঙ্গীরা তোমার কাছে মিথ্যা ও অহেতুক বিষয়গুলোকে সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপন করবে। আর এসবের প্রতি তোমার ভালোবাসা তৈরির চেষ্টা করবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِي عَدُوًّا شَيَاطِينَ الْإِنسِ وَالْجِنِّ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُورًا وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوهُ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ.
অর্থ: এমনইভাবে আমি প্রত্যেক নবীর জন্যে শত্রু করেছি শয়তান, মানব ও জিনকে। তারা ধোঁকা দেওয়ার জন্যে একে অপরকে কারুকার্যখচিত কথাবার্তা শিক্ষা দেয়। যদি আপনার পালনকর্তা চাইতেন, তবে তারা এ কাজ করত না।
অসৎ সঙ্গীরা কল্যাণকর ও ভালো বিষয়গুলো থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে এবং তা থেকে নিবৃত্ত করবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
قَدْ يَعْلَمُ اللهُ الْمُعَوِّقِينَ مِنكُمْ وَالْقَائِلِينَ لِإِخْوَانِهِمْ هَلُمَّ إِلَيْنَا وَلَا يَأْتُونَ الْبَأْسَ إِلَّا قَلِيلًا.
অর্থ: আল্লাহ খুব জানেন তোমাদের মধ্যে কারা তোমাদেরকে বাধা দেয় এবং কারা তাদের ভাইদেরকে বলে, আমাদের কাছে এসো। তারা কমই যুদ্ধ করে।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
টিকাঃ
৮২. সুরা সফফাত: ৫৮-৫৯।
৮৩. সুরা আনআম: ১১২।
৮৪. সুরা আহযাব: ১৮।
أَفَمَا نَحْنُ بِمَيِّتِينَ. إِلَّا مَوْتَتَنَا الْأُولَى وَمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِينَ.
অর্থ: এখন আমাদের আর মৃত্যু হবে না, আমাদের প্রথম মৃত্যু ছাড়া এবং আমরা শাস্তি প্রাপ্তও হব না。
অর্থাৎ জান্নাতীগণ তখন তাদের জাহান্নামি সাথিকে জান্নাতে চিরস্থায়ী বসবাস এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে নিরাপত্তার নেওয়ামতের ওপর গর্বভরে দৃঢ়তার সাথে এই কথাগুলো বলবে।
খারাপ ও অসৎ সঙ্গীরা তোমার কাছে মিথ্যা ও অহেতুক বিষয়গুলোকে সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপন করবে। আর এসবের প্রতি তোমার ভালোবাসা তৈরির চেষ্টা করবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِي عَدُوًّا شَيَاطِينَ الْإِنسِ وَالْجِنِّ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُورًا وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوهُ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ.
অর্থ: এমনইভাবে আমি প্রত্যেক নবীর জন্যে শত্রু করেছি শয়তান, মানব ও জিনকে। তারা ধোঁকা দেওয়ার জন্যে একে অপরকে কারুকার্যখচিত কথাবার্তা শিক্ষা দেয়। যদি আপনার পালনকর্তা চাইতেন, তবে তারা এ কাজ করত না।
অসৎ সঙ্গীরা কল্যাণকর ও ভালো বিষয়গুলো থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে এবং তা থেকে নিবৃত্ত করবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
قَدْ يَعْلَمُ اللهُ الْمُعَوِّقِينَ مِنكُمْ وَالْقَائِلِينَ لِإِخْوَانِهِمْ هَلُمَّ إِلَيْنَا وَلَا يَأْتُونَ الْبَأْسَ إِلَّا قَلِيلًا.
অর্থ: আল্লাহ খুব জানেন তোমাদের মধ্যে কারা তোমাদেরকে বাধা দেয় এবং কারা তাদের ভাইদেরকে বলে, আমাদের কাছে এসো। তারা কমই যুদ্ধ করে।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
টিকাঃ
৮২. সুরা সফফাত: ৫৮-৫৯।
৮৩. সুরা আনআম: ১১২।
৮৪. সুরা আহযাব: ১৮।
📄 অসৎ সঙ্গী সত্যকে সন্দেহযুক্ত করে উপস্থাপন করে
لَوْ خَرَجُوا فِيكُم مَّا زَادُوكُمْ إِلَّا خَبَالًا وَلَأَوْضَعُوا خِلَالَكُمْ يَبْغُونَكُمُ الْفِتْنَةَ وَفِيكُمْ سَمَّاعُونَ لَهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ.
অর্থ: যদি তোমাদের সাথে তারা বের হতো, তবে তোমাদের অনিষ্ট ছাড়া আর কিছু বৃদ্ধি করত না, আর অশ্ব ছুটাত তোমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। আর তোমাদের মাঝে রয়েছে তাদের গুপ্তচর। বস্তুত আল্লাহ জালেমদের ভালোভাবেই জানেন。
অনুরূপভাবে অসৎ সঙ্গীরা সত্য ও সঠিক বিষয়ে সন্দেহ এবং সংশয়ে ফেলার চেষ্টা করবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَقَالَت طَائِفَةٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ آمِنُوا بِالَّذِي أُنزِلَ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَجْهَ النَّهَارِ وَاكْفُرُوا آخِرَهُ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ.
অর্থ: আর আহলে-কিতাবদের একদল বলল, মুসলমানদের ওপর যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে, তাকে দিনের প্রথম ভাগে মেনে নাও, আর দিনের শেষভাগে অস্বীকার করো, হয়তো তারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে。
অসৎ সঙ্গী মূলত অভিশপ্ত শয়তানের অনুসারী। আর শয়তান আদম সন্তানের কল্যাণের সকল পথে ওত পেতে বসে থাকে এবং তাকে সেখান থেকে দূরে সরিয়ে রাখে ও তাকে বাধা দেয়।
হাদিস শরিফে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই শয়তান আদম-সন্তানের রাস্তাসমূহে বসে থাকে। সে ইসলামের পথে বসে বাধা সৃষ্টি করতে গিয়ে বলে, তুমি ইসলাম গ্রহণ করবে, আর তোমার দ্বীন ও তোমার বাপ-দাদার দ্বীন এবং তোমার পিতার পূর্বপুরুষদের দ্বীন পরিত্যাগ করবে? কিন্তু আদম সন্তান তার কথা অমান্য করে ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর শয়তান তার হিজরতের রাস্তায় বসে বলে, তুমি হিজরত করবে, তোমার ভূমি ও আকাশ পরিত্যাগ করবে? মুহাজির তো একটি রশিতে আবদ্ধ ঘোড়ার ন্যায়। কিন্তু সে ব্যক্তি তার কথা অমান্য করে হিজরত করে। এরপর শয়তান তার জিহাদের রাস্তায় বসে এবং বলে, তুমি কি জিহাদ করবে? এ তো নিজেকে এবং নিজের ধন-সম্পদকে ধ্বংস করা। তুমি যুদ্ধ করে নিহত হবে, তোমার স্ত্রী অন্যের বিবাহে যাবে, তোমার সম্পদ ভাগ হবে। সে ব্যক্তি তাকে অমান্য করে জিহাদে গমন করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে এরূপ করবে, তাকে জান্নাতে প্রবেশের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন। আর যে ব্যক্তি শহিদ হয়, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর ওপর অবধারিত। যদি সে ডুবে যায়, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর ওপর অবধারিত। আর যদি তার সওয়ারি তাকে ফেলে দিয়ে তার গর্দান ভেঙে দেয় বা মেরে ফেলে, তখনও তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর ওপর অবধারিত。
অবশ্যই শয়তান তার রবকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিল,
قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ ثُمَّ لَآتِيَنَّهُمْ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَائِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ.
অর্থ: সে বলল, আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, সে কারণে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আপনার সোজা পথে বসে থাকব। তারপর অবশ্যই তাদের নিকট উপস্থিত হব, তাদের সামনে থেকে ও তাদের পেছন থেকে এবং তাদের ডান দিক থেকে ও তাদের বাম দিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না。
পবিত্র কুরআনে আরও বর্ণিত হয়েছে,
وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ.
অর্থ: আর নিশ্চয়ই শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্ররোচনা দেয়, যাতে তারা তোমাদের সাথে বিবাদ করে। আর যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো, তবে নিশ্চয়ই তোমরা মুশরিক。
এ জন্যই কল্যাণের যত পথ রয়েছে অসৎ মানুষ এবং জিন শয়তান তাতে ওত পেতে বসে থাকে। মানুষদেরকে কল্যাণ থেকে দূরে রাখে ও বাধা দেয়। এ কারণেই আল্লাহর নবী হযরত শুয়াইব আলাইহিস সালাম তাঁর সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন,
وَلَا تَقْعُدُوا بِكُلِّ صِرَاطٍ تُوعِدُونَ وَتَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِهِ وَتَبْغُونَهَا عِوَجًا.
অর্থ: আর যারা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছে তাদেরকে ভয় দেখাতে, আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিতে এবং তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করতে তোমরা প্রতিটি পথে বসে থেকো না।
এ জন্যই কোনো মানুষ যখন দ্বীনের পথে অটল-অবিচল থাকার জন্য অগ্রসর হয়, সেখানে সে তার অসৎ সঙ্গীদেরকে পায়; যারা তাকে এ পথের কষ্ট, দুঃখ ও বিপদ-আপদের ভয় দেখিয়ে তার কাছে বিষয়টি কঠিন করে তোলে। কেউ যখন দান-খয়রাত করার ইচ্ছা করে তার অসৎ সঙ্গী তাকে বিরত রাখে এবং সম্পদ জমা করতে উদ্বুদ্ধ করে। যখন কেউ হজের ইচ্ছা করে অসৎ সঙ্গীরা তাকে চেপে ধরে এবং নিরুৎসাহিত করে সময়ক্ষেপণ করে। এভাবেই শয়তানের অনুসারী অসৎ সঙ্গীরা সর্বদাই মানুষদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ থেকে বাধা দেয় এবং বিরত রাখে。
টিকাঃ
৮৫. সুরা তাওবা: ৪৭।
৮৬. সুরা আলে ইমরান: ৭২।
৮۷. নাসায়ি শরিফ: ৬/২১-২২; মুসনাদু আহমদ: ৩/৪৮৩।
৮৮. সুরা আরাফ: ১৬-১৭।
৮৯. সুরা আনআম: ১২১।
৯০. সুরা আরাফ: ৮৬।
لَوْ خَرَجُوا فِيكُم مَّا زَادُوكُمْ إِلَّا خَبَالًا وَلَأَوْضَعُوا خِلَالَكُمْ يَبْغُونَكُمُ الْفِتْنَةَ وَفِيكُمْ سَمَّاعُونَ لَهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ.
অর্থ: যদি তোমাদের সাথে তারা বের হতো, তবে তোমাদের অনিষ্ট ছাড়া আর কিছু বৃদ্ধি করত না, আর অশ্ব ছুটাত তোমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। আর তোমাদের মাঝে রয়েছে তাদের গুপ্তচর। বস্তুত আল্লাহ জালেমদের ভালোভাবেই জানেন。
অনুরূপভাবে অসৎ সঙ্গীরা সত্য ও সঠিক বিষয়ে সন্দেহ এবং সংশয়ে ফেলার চেষ্টা করবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَقَالَت طَائِفَةٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ آمِنُوا بِالَّذِي أُنزِلَ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَجْهَ النَّهَارِ وَاكْفُرُوا آخِرَهُ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ.
অর্থ: আর আহলে-কিতাবদের একদল বলল, মুসলমানদের ওপর যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে, তাকে দিনের প্রথম ভাগে মেনে নাও, আর দিনের শেষভাগে অস্বীকার করো, হয়তো তারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে。
অসৎ সঙ্গী মূলত অভিশপ্ত শয়তানের অনুসারী। আর শয়তান আদম সন্তানের কল্যাণের সকল পথে ওত পেতে বসে থাকে এবং তাকে সেখান থেকে দূরে সরিয়ে রাখে ও তাকে বাধা দেয়।
হাদিস শরিফে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই শয়তান আদম-সন্তানের রাস্তাসমূহে বসে থাকে। সে ইসলামের পথে বসে বাধা সৃষ্টি করতে গিয়ে বলে, তুমি ইসলাম গ্রহণ করবে, আর তোমার দ্বীন ও তোমার বাপ-দাদার দ্বীন এবং তোমার পিতার পূর্বপুরুষদের দ্বীন পরিত্যাগ করবে? কিন্তু আদম সন্তান তার কথা অমান্য করে ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর শয়তান তার হিজরতের রাস্তায় বসে বলে, তুমি হিজরত করবে, তোমার ভূমি ও আকাশ পরিত্যাগ করবে? মুহাজির তো একটি রশিতে আবদ্ধ ঘোড়ার ন্যায়। কিন্তু সে ব্যক্তি তার কথা অমান্য করে হিজরত করে। এরপর শয়তান তার জিহাদের রাস্তায় বসে এবং বলে, তুমি কি জিহাদ করবে? এ তো নিজেকে এবং নিজের ধন-সম্পদকে ধ্বংস করা। তুমি যুদ্ধ করে নিহত হবে, তোমার স্ত্রী অন্যের বিবাহে যাবে, তোমার সম্পদ ভাগ হবে। সে ব্যক্তি তাকে অমান্য করে জিহাদে গমন করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে এরূপ করবে, তাকে জান্নাতে প্রবেশের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন। আর যে ব্যক্তি শহিদ হয়, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর ওপর অবধারিত। যদি সে ডুবে যায়, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর ওপর অবধারিত। আর যদি তার সওয়ারি তাকে ফেলে দিয়ে তার গর্দান ভেঙে দেয় বা মেরে ফেলে, তখনও তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর ওপর অবধারিত。
অবশ্যই শয়তান তার রবকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিল,
قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ ثُمَّ لَآتِيَنَّهُمْ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَائِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ.
অর্থ: সে বলল, আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, সে কারণে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আপনার সোজা পথে বসে থাকব। তারপর অবশ্যই তাদের নিকট উপস্থিত হব, তাদের সামনে থেকে ও তাদের পেছন থেকে এবং তাদের ডান দিক থেকে ও তাদের বাম দিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না。
পবিত্র কুরআনে আরও বর্ণিত হয়েছে,
وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ.
অর্থ: আর নিশ্চয়ই শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্ররোচনা দেয়, যাতে তারা তোমাদের সাথে বিবাদ করে। আর যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো, তবে নিশ্চয়ই তোমরা মুশরিক。
এ জন্যই কল্যাণের যত পথ রয়েছে অসৎ মানুষ এবং জিন শয়তান তাতে ওত পেতে বসে থাকে। মানুষদেরকে কল্যাণ থেকে দূরে রাখে ও বাধা দেয়। এ কারণেই আল্লাহর নবী হযরত শুয়াইব আলাইহিস সালাম তাঁর সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন,
وَلَا تَقْعُدُوا بِكُلِّ صِرَاطٍ تُوعِدُونَ وَتَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِهِ وَتَبْغُونَهَا عِوَجًا.
অর্থ: আর যারা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছে তাদেরকে ভয় দেখাতে, আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিতে এবং তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করতে তোমরা প্রতিটি পথে বসে থেকো না।
এ জন্যই কোনো মানুষ যখন দ্বীনের পথে অটল-অবিচল থাকার জন্য অগ্রসর হয়, সেখানে সে তার অসৎ সঙ্গীদেরকে পায়; যারা তাকে এ পথের কষ্ট, দুঃখ ও বিপদ-আপদের ভয় দেখিয়ে তার কাছে বিষয়টি কঠিন করে তোলে। কেউ যখন দান-খয়রাত করার ইচ্ছা করে তার অসৎ সঙ্গী তাকে বিরত রাখে এবং সম্পদ জমা করতে উদ্বুদ্ধ করে। যখন কেউ হজের ইচ্ছা করে অসৎ সঙ্গীরা তাকে চেপে ধরে এবং নিরুৎসাহিত করে সময়ক্ষেপণ করে। এভাবেই শয়তানের অনুসারী অসৎ সঙ্গীরা সর্বদাই মানুষদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ থেকে বাধা দেয় এবং বিরত রাখে。
টিকাঃ
৮৫. সুরা তাওবা: ৪৭।
৮৬. সুরা আলে ইমরান: ৭২।
৮۷. নাসায়ি শরিফ: ৬/২১-২২; মুসনাদু আহমদ: ৩/৪৮৩।
৮৮. সুরা আরাফ: ১৬-১৭।
৮৯. সুরা আনআম: ১২১।
৯০. সুরা আরাফ: ৮৬।
📄 অসৎ সঙ্গীদের থেকে বেঁচে থাকো
অসৎ সঙ্গী হলো জাহান্নামের দরজাসমূহে দাঁড়িয়ে তার দিকে আহ্বানকারী। সুতরাং যে অসৎ সঙ্গীর আহ্বানে সাড়া দেবে, সে তাকে তাতে নিক্ষেপ করবে। বুখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে, হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযি. বলেন, লোকেরা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কল্যাণ-বিষয়ক প্রশ্ন করত, আর আমি অকল্যাণে পতিত হওয়ার আশঙ্কায় অনিষ্ট ও অমঙ্গল সম্পর্কে প্রশ্ন করতাম। একদা আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা মূর্খতা ও অকল্যাণে ডুবে ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদেরকে এই কল্যাণ দান করলেন। কিন্তু এই কল্যাণের পর আবারও অকল্যাণ আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আছে। আমি বললাম, অতঃপর ওই অকল্যাণের পর আবারও কল্যাণ আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আর তা হবে ধোঁয়াটে। আমি বললাম, তার মধ্যে ধোঁয়াটা কী? তিনি বললেন, এমন এক সম্প্রদায় আসবে, যারা আমার প্রদর্শিত পথ ছাড়া অন্যের অনুসরণ করবে এবং আমার নির্দেশিত পথ ছাড়া ভিন্ন পথে মানুষকে পরিচালিত করবে। যাদের কিছু কাজ ভালো হবে এবং কিছু কাজ অন্যায় হবে। আমি বললাম, এর পরও কি কোনো অকল্যাণ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তা হলো জাহান্নামের দরজাসমূহে দণ্ডায়মান আহ্বানকারীরা। যে ব্যক্তি তাদের আহ্বানে সাড়া দেবে, তাকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করবে। আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাদেরকে তাদের পরিচয় বলে দিন। তিনি বললেন, তারা আমাদেরই স্বজাতি হবে এবং আমাদেরই ভাষায় কথা বলবে। আমি বললাম, যদি আমি সে সময় পাই, তাহলে আমার ব্যাপারে আপনার কী উপদেশ? তিনি বললেন, মুসলিমদের জামাত ও ইমামের পক্ষাবলম্বন করবে। আমি বললাম, কিন্তু যদি মুসলিমদের জামাত ও ইমাম না থাকে? তিনি বললেন, ওই সমস্ত দল থেকে দূরে থাকবে; যদিও তোমাকে কোনো গাছের শিকড় কামড়ে থাকতে হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমার ওই অবস্থাতেই মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়েছে。
টিকাঃ
৯১. ধোঁয়া দ্বারা এখানে সর্বদা পাপ-পঙ্কিলতায় জর্জরিত অন্তর উদ্দেশ্য-ইমাম নববি।
৯২. গোমরাহি ও পথভ্রষ্টতার দিকে আহ্বানকারী শাসকবর্গ এবং দরবারি আলেম এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত।
৯৩. বুখারি শরিফ: ৩৬০৬; মুসলিম শরিফ: ১৮৪৭।
অসৎ সঙ্গী হলো জাহান্নামের দরজাসমূহে দাঁড়িয়ে তার দিকে আহ্বানকারী। সুতরাং যে অসৎ সঙ্গীর আহ্বানে সাড়া দেবে, সে তাকে তাতে নিক্ষেপ করবে। বুখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে, হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযি. বলেন, লোকেরা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কল্যাণ-বিষয়ক প্রশ্ন করত, আর আমি অকল্যাণে পতিত হওয়ার আশঙ্কায় অনিষ্ট ও অমঙ্গল সম্পর্কে প্রশ্ন করতাম। একদা আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা মূর্খতা ও অকল্যাণে ডুবে ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদেরকে এই কল্যাণ দান করলেন। কিন্তু এই কল্যাণের পর আবারও অকল্যাণ আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আছে। আমি বললাম, অতঃপর ওই অকল্যাণের পর আবারও কল্যাণ আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আর তা হবে ধোঁয়াটে। আমি বললাম, তার মধ্যে ধোঁয়াটা কী? তিনি বললেন, এমন এক সম্প্রদায় আসবে, যারা আমার প্রদর্শিত পথ ছাড়া অন্যের অনুসরণ করবে এবং আমার নির্দেশিত পথ ছাড়া ভিন্ন পথে মানুষকে পরিচালিত করবে। যাদের কিছু কাজ ভালো হবে এবং কিছু কাজ অন্যায় হবে। আমি বললাম, এর পরও কি কোনো অকল্যাণ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তা হলো জাহান্নামের দরজাসমূহে দণ্ডায়মান আহ্বানকারীরা। যে ব্যক্তি তাদের আহ্বানে সাড়া দেবে, তাকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করবে। আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাদেরকে তাদের পরিচয় বলে দিন। তিনি বললেন, তারা আমাদেরই স্বজাতি হবে এবং আমাদেরই ভাষায় কথা বলবে। আমি বললাম, যদি আমি সে সময় পাই, তাহলে আমার ব্যাপারে আপনার কী উপদেশ? তিনি বললেন, মুসলিমদের জামাত ও ইমামের পক্ষাবলম্বন করবে। আমি বললাম, কিন্তু যদি মুসলিমদের জামাত ও ইমাম না থাকে? তিনি বললেন, ওই সমস্ত দল থেকে দূরে থাকবে; যদিও তোমাকে কোনো গাছের শিকড় কামড়ে থাকতে হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমার ওই অবস্থাতেই মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়েছে。
টিকাঃ
৯১. ধোঁয়া দ্বারা এখানে সর্বদা পাপ-পঙ্কিলতায় জর্জরিত অন্তর উদ্দেশ্য-ইমাম নববি।
৯২. গোমরাহি ও পথভ্রষ্টতার দিকে আহ্বানকারী শাসকবর্গ এবং দরবারি আলেম এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত।
৯৩. বুখারি শরিফ: ৩৬০৬; মুসলিম শরিফ: ১৮৪৭।