📄 মন্দ লোকের সাহচর্যের ব্যাপারে সতর্কবাণী
দুষ্টু, ফেতনাবাজ, কাফের, সন্দেহপ্রবণ, পাপাচারী ও অবাধ্য লোকদের সাথে উঠা-বসা এবং চলাফেরার প্রতি নিষেধাজ্ঞা এসেছে। নিম্নে তাদের সাথে মেলামেশা এবং তাদের নিকটবর্তী হওয়ার বিষয়ে সতর্কীকরণের পাশাপাশি এসবের কারণে ঘটমান সমস্যার কিঞ্চিত বিবরণ দেওয়া হলো。
সঙ্গীর কারণে সঙ্গীর প্রভাবিত হওয়াসহ পূর্বে উল্লেখিত বিষয়ে কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিসে অসংখ্যবার কাফের, মুশরিক, সংশয়বাদী, ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী, জালেম, পাপাচারী, অবাধ্য এবং উদাসীন ব্যক্তিদের সাথে চলাফেরা ও ওঠাবসা করতে সতর্ক করা হয়েছে。
নিম্নে সে সকল আয়াত ও হাদিস উল্লেখ করা হলো। আল্লাহ তাআলার বাণী,
وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا مَّثْلُهُمْ إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا.
অর্থ: আর কুরআনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতি এই হুকুম জারি করে দিয়েছেন যে, যখন আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন ও বিদ্রূপ হতে শুনবে, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না, যতক্ষণ না তারা প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে। তা না হলে তোমরাও তাদেরই মতো হয়ে যাবে। আল্লাহ জাহান্নামে মুনাফেক ও কাফেরদেরকে একই জায়গায় সমবেত করবেন。
وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ وَإِمَّا يُنسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ. وَمَا عَلَى الَّذِينَ يَتَّقُونَ مِنْ حِسَابِهِم مِّن شَيْءٍ وَلَكِن ذِكْرَىٰ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ.
অর্থ: যখন আপনি তাদেরকে দেখেন, যারা আমার আয়াতসমূহে ছিদ্রান্বেষণ করে, তখন তাদের কাছ থেকে সরে যান; যে পর্যন্ত তারা অন্য কথায় প্রবৃত্ত না হয়। যদি শয়তান আপনাকে ভুলিয়ে দেয়, তাহলে স্মরণ হওয়ার পর জালেমদের সাথে বসবেন না। এদের যখন বিচার করা হবে, তখন পরহেজগারদের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না; কিন্তু তাদের দায়িত্ব উপদেশ দান করা, যাতে ওরা ভীত হয়。
وَذَرِ الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَهُمْ لَعِبًا وَلَهْوًا وَغَرَّتْهُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا.
অর্থ: তাদেরকে পরিত্যাগ করুন, যারা নিজেদের ধর্মকে ক্রীড়া ও কৌতুকরূপে গ্রহণ করেছে এবং পার্থিব জীবন যাদেরকে ধোঁকায় ফেলে রেখেছে。
فَأَعْرِضْ عَن مَّن تَوَلَّى عَن ذِكْرِنَا وَلَمْ يُرِدْ إِلَّا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا. ذُلِكَ مَبْلَغُهُم مِّنَ الْعِلْمِ.
অর্থ: অতএব যে আমার স্মরণে বিমুখ এবং কেবল পার্থিব জীবনই কামনা করে, তার থেকে আপনি মুখ ফিরিয়ে নিন। তাদের জ্ঞানের পরিধি এ পর্যন্তই。
سَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ لَكُمْ إِذَا انقَلَبْتُمْ إِلَيْهِمْ لِتُعْرِضُوا عَنْهُمْ فَأَعْرِضُوا عَنْهُمْ إِنَّهُمْ رِجْسٌ وَمَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ.
অর্থ: এখন তারা তোমার সামনে আল্লাহর কসম খাবে, যখন তুমি তাদের কাছে ফিরে যাবে, যেন তুমি তাদের ক্ষমা করে দাও। সুতরাং তুমি তাদের ক্ষমা করো। নিঃসন্দেহে তারা অপবিত্র এবং তাদের কৃতকর্মের বদলা হিসেবে তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম。
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا بِطَانَةً مِّن دُونِكُمْ لَا يَأْلُونَكُمْ خَبَالًا وَدُّوا مَا عَنِتُمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاءُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَاتِ إِن كُنتُمْ تَعْقِلُونَ. هَا أَنتُمْ أُولَاءِ تُحِبُّونَهُمْ وَلَا يُحِبُّونَكُمْ وَتُؤْمِنُونَ بِالْكِتَابِ كُلِّهِ وَإِذَا لَقُوكُمْ قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا عَضُّوا عَلَيْكُمُ الْأَنَامِلَ مِنَ الْغَيْظِ قُلْ مُوتُوا بِغَيْظِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ.
অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না, তারা তোমাদের অমঙ্গল সাধনে কোনো ত্রুটি করে না; তোমরা কষ্টে থাকো, তাতেই তাদের আনন্দ। শত্রুতাপ্রসূত বিদ্বেষ তাদের মুখেই ফুটে বেরোয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরও অনেকগুণ বেশি জঘন্য। তোমাদের জন্য নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করে দেওয়া হলো, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে সমর্থ হও। দেখো! তোমরাই তাদের ভালোবাসো, কিন্তু তারা তোমাদের প্রতি মোটেও সদভাব পোষণ করে না। আর তোমরা সমস্ত কিতাবেই বিশ্বাস করো। অথচ তারা যখন তোমাদের সাথে এসে মিশে, বলে, আমরা ঈমান এনেছি। পক্ষান্তরে তারা যখন পৃথক হয়ে যায়, তখন তোমাদের ওপর রোষবশত আঙুল কামড়াতে থাকে। বলুন, তোমরা আক্রোশে মরতে থাকো। আর আল্লাহ মনের কথা ভালোই জানেন。
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ ٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ دِينَكُمْ هُزُوًا وَلَعِبًا مِّنَ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلْكِتَٰبَ مِن قَبْلِكُمْ وَٱلْكُفَّارَ أَوْلِيَآءَ ۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ وَإِذَا نَادَيْتُمْ إِلَى ٱلصَّلَوٰةِ ٱتَّخَذُوهَا هُزُوًا وَلَعِبًا ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْقِلُونَ
অর্থ: হে মুমিনগণ, আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের ধর্মকে উপহাস ও খেলা মনে করে, তাদেরকে এবং অন্যান্য কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। আল্লাহকে ভয় করো, যদি তোমরা ঈমানদার হও। আর যখন তোমরা নামাজের জন্যে আহ্বান করো, তখন তারা একে উপহাস ও খেলা বলে মনে করে। কারণ, তারা নির্বোধ。
এ ছাড়াও জালেমদের সাথে উঠা-বসা নিষেধ করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تَرْكَنُوٓاْ إِلَى ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ فَتَمَسَّكُمُ ٱلنَّارُ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ مِنْ أَوْلِيَآءَ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ
অর্থ: আর পাপিষ্ঠদের প্রতি ঝুঁকবে না। নতুবা তোমাদেরকেও আগুনে ধরবে। আর আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোনো বন্ধু নেই। অতএব কোথাও সাহায্য পাবে না。
তাই কখনো এ ধারণা করো না যে, জালেম তোমাকে সাহায্য করবে। হেফাজত করবে। আর যখন তোমার কোনো ক্ষতি ও খারাবির ইচ্ছা আল্লাহ তাআলা করবেন, তখন সে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত তোমার শাস্তিকে প্রতিহত করবে ও দূর করতে পারবে। এ বিষয়ে সতর্ক করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَوْلَا أَن تَبَّتْنَاكَ لَقَدْ كِدتَّ تَرْكَنُ إِلَيْهِمْ شَيْئًا قَلِيلًا. إِذًا لَّأَذَقْنَاكَ ضِعْفَ الْحَيَاةِ وَضِعْفَ الْمَمَاتِ ثُمَّ لَا تَجِدُ لَكَ عَلَيْنَا نَصِيرًا.
অর্থ: আমি আপনাকে দৃঢ়পদ না রাখলে আপনি তাদের প্রতি কিছুটা ঝুঁকেই পড়তেন। তখন আমি অবশ্যই আপনাকে ইহজীবনে ও পরজীবনে দ্বিগুণ শাস্তি আস্বাদন করাতাম। এ সময় আপনি আমার মোকাবিলায় কোনো সাহায্যকারী পেতেন না。
আল্লাহ তাআলা হুঁশিয়ার করে বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ قَدْ يَئِسُوا مِنَ الْآخِرَةِ كَمَا يَئِسَ الْكُفَّارُ مِنْ أَصْحَابِ الْقُبُورِ.
অর্থ: হে মুমিনগণ! আল্লাহ যে জাতির প্রতি রুষ্ট, তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো না। তারা পরকাল সম্পর্কে নিরাশ হয়ে গেছে, যেমন কবরস্থ কাফেররা নিরাশ হয়ে গেছে。
আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মসজিদে জিরারে নামাজ পড়তে নিষেধ করেছেন। কেননা সেখানে মুনাফিকরা একত্রিত হতো। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِدًا ضِرَارًا وَكُفْرًا وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَإِرْصَادًا لِّمَنْ حَارَبَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ مِن قَبْلُ وَلَيَحْلِفُنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا الْحُسْنَى وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ. لَا تَقُمْ فِيهِ أَبَدًا لَمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَن تَقُومَ فِيهِ فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَن يَتَطَهَّرُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَهِّرِينَ.
অর্থ: আর যারা নির্মাণ করেছে মসজিদ জিদের বশে এবং কুফরির তাড়নায় মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ওই লোকের জন্য ঘাটিস্বরূপ, যে পূর্ব থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাথে যুদ্ধ করে আসছে, আর তারা অবশ্যই শপথ করবে যে, আমরা কেবল কল্যাণই চেয়েছি। পক্ষান্তরে আল্লাহ সাক্ষী দিচ্ছেন যে, তারা সবাই মিথ্যুক। তুমি কখনো সেখানে দাঁড়াবে না,
টিকাঃ
৩৬. সুরা নিসা: ১৪০।
৩৭. সুরা আনআম: ৬৮-৬৯।
৩৮. সুরা আনআম: ৭০।
৩৯. সুরা নাজম: ২৯-৩০।
৪০. সুরা তাওবা: ৯৫।
৪১. সুরা আলে ইমরান: ১১৭-১১৯।
৪২. সুরা মায়েদা: ৫৭-৫৮।
৪৩. সুরা হুদ: ১১৩।
৪৪. সুরা ইসরা: ৭৪-৭৫।
৪৫. সুরা মুমতাহিনা: ১৩।
📄 ঘরে মেয়েলি পুরুষকে স্থান না দেওয়া
ঘর থেকে মেয়েলি পুরুষদেরকে বের করে দেওয়ার বিষয়ে বুখারি শরিফে বর্ণিত হয়েছে,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ - رضى الله عنهما - قَالَ لَعَنَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْمُخَنَّثِينَ مِنَ الرِّجَالِ، وَالْمُتَرَجَلاتِ مِنَ النِّسَاءِ، وَقَالَ أَخْرِجُوهُمْ مِنْ بُيُوتِكُمْ وَأَخْرَجَ فُلَانًا، وَأَخْرَجَ عُمَرُ فُلَانًا.
অর্থ: হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. হতে বর্ণিত। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষ হিজড়া এবং পুরুষের বেশধারী নারীদের ওপর লানত করেছেন। তিনি বলেছেন, ওদেরকে ঘর থেকে বের করে দাও। ইবনু আব্বাস রাযি. বলেছেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অমুককে বের করেছেন এবং উমর রাযি. অমুককে বের করে দিয়েছেন।
এ বিষয়ে বুখারি ও মুসলিম শরিফের অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হযরত উম্মু সালামা রাযি. হতে বর্ণিত। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে থাকাকালে সেখানে একজন মেয়েলি পুরুষ ছিল। ওই মেয়েলি পুরুষটি উম্মু সালামার ভাই আবদুল্লাহ ইবনু আবু উমাইয়াকে বলল, যদি আগামীকাল আপনাদেরকে আল্লাহ তায়েফে বিজয় দান করেন, তাহলে আমি আপনাকে গায়লানের মেয়েকে গ্রহণ করার পরামর্শ দিচ্ছি। কেননা, সে যখন আগমন করে, তখন তার পেটে চার ভাঁজ পড়ে আর যখন ফিরে যায়, তখন তার পেটে আট ভাঁজ পড়ে। এ কথা শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে যেন কখনো তোমাদের কাছে আর না আসে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,
والمهاجر من هجر ما نهى الله عنه.
অর্থ: প্রকৃত হিজরতকারী তো সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকে。
টিকাঃ
৫১. বুখারি শরিফ: ৬৮৩৪।
৫২. ইমাম খাত্তাবি থেকে হাফেজ ইবনু হাজার হাদিসের ব্যাখ্যায় লেখেন, এ কথার দ্বারা তার উদ্দেশ্য হলো, এই মেয়ের পেটে চারটি মোটা গোশতের রেখা রয়েছে। সামনে থেকে এগুলোকে একটি আরেকটির ওপর ভাজকৃত দেখা যায়। আর যখন সে পেছনে ফিরে তখন এই চারটি মাংসের ভেতরে একে আড়াআড়িভাবে আটটি দেখা যায়। মোটকথা তার উদ্দেশ্যে এ কথা বর্ণনা করা; এই মেয়েটির দেহ গোশতে পরিপূর্ণ। এমনকি তার পেটে গোশতের ভাঁজ পড়ে গেছে। আর এটা নারীদের স্থূলকায় হওয়ার কারণে হয়ে থাকে। অধিকাংশ আরব পুরুষ স্বভাবগতভাবে নারীদের এই গুণের প্রতি আগ্রহী হয়ে থাকে। -ফাতহুল বারি: ৯/৩৩৫
ইমাম নববি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাদিসের ব্যাখ্যায় উলামায়ে কেরাম মনে করেন, তাকে বের করে দেওয়ার তিনটি কারণ হতে পারে:
এক. তাকে মনে করেছিল, হয়তো সে যৌনকামনামুক্ত পুরুষ হবে। অথচ সে তেমনটা ছিল না। বরং এটা সে গোপন করেছিল।
দুই. পুরুষের নিকট সে নারীদের গুণাগুণ, সৌন্দর্য ও গোপনীয় বিষয়গুলো বর্ণনা করছে। অথচ একজন নারীকে তার স্বামীর নিকটও অন্য নারীর সৌন্দর্য বর্ণনা করতে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং এ কাজ কোনো পুরুষ পুরুষের নিকট করবে-এটা কীভাবে হতে পারে।
তিন. তার কাছে এ বিষয় প্রকাশিত হয়েছে যে, এই ব্যক্তি নারীদের শারীরিক গঠন এবং তাদের গোপনীয় এমন বিষয়ে অবগত, যেগুলো অধিকাংশ নারীর কাছেই গোপন থাকে। বিশেষত যখন এই ঘটনায় সে একজন অমুসলিম নারী সম্পর্কে বলছে। এমনকি সে তাতে তাদের দুই রানের মাঝের লজ্জাস্থান ও তার আশপাশের বিষয়গুলোও বর্ণনা করছে।
৫৩. বুখারি শরিফ: ৫২৩৫; মুসলিম শরিফ: ১৭১৫।
৫৪. বুখারি শরিফ: ১০।
📄 মন্দ সঙ্গী থেকে দূরে থাকা
অসৎ সঙ্গীদের থেকে দূরে থাকার আরও একটি দলিল হলো, লানতকারী পুরুষ ও নারীকে পৃথক করে দেওয়ার বিষয়ে বর্ণিত হাদিস। অর্থাৎ একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করার কারণে কসম করে। অতঃপর সেই নারী তার পবিত্রতার ব্যাপারে কসম করে। এর বিশদ বর্ণনা সুরা নুরে লিআনের আয়াতে রয়েছে। এতে স্বামী কোনোকিছু প্রমাণের দাবি করে, আর স্ত্রী তা অস্বীকার করে। নিঃসন্দেহে তাদের একজন এ ক্ষেত্রে মিথ্যাবাদী। আর স্ত্রীর ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত, যদি সে মিথ্যাবাদী হয়ে থাকে। স্বামীর ওপরও অভিশাপ, যদি সে মিথ্যাবাদী হয়। লানতকারী স্বামীর জন্য নির্দোষ স্ত্রীর সাথে বসবাস বৈধ নয়। তেমনই বৈধ নয় লানতকারী স্ত্রীর জন্য নিরপরাধ স্বামীর সাথে বসবাস করা। এটাই অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতামত যে, লানতকারীদের একে অন্য থেকে পৃথক করে দেওয়া হবে。
এ বিষয়ে বুখারি ও মুসলিম শরিফের বর্ণনা, সাদ গোত্রের সাহল ইবনু সাদ রাযি. থেকে বর্ণিত। আনসারদের জনৈক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে অন্য কাউকে দেখতে পায়, তবে কি সে তাকে হত্যা করবে? অথবা কী করবে? এ ব্যাপারে আপনার কী অভিমত? এরপর আল্লাহ তাআলা তার ব্যাপারে কুরআনে উল্লেখিত লিআনের বিধান অবতীর্ণ করেন। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তোমার ও তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে ফয়সালা দিয়েছেন。
বর্ণনাকারী বলেন, আমি উপস্থিত থাকতেই তারা উভয়ে মসজিদে লিআন করল। উভয়ের লিআন সমাপ্ত হলে সে ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! যদি আমি তাকে স্ত্রী হিসেবে রেখে দিই, তাহলে তার ওপর মিথ্যারোপ করেছি বলে সাব্যস্ত হবে? এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আদেশ দেওয়ার পূর্বেই সে তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনেই তারা পৃথক হয়ে গেল। তিনি বললেন, এই সম্পর্কচ্ছেদই লিআনের বিধান。
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাযি.-এর একটি হাদিস বুখারি শরিফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একজন পুরুষ ও নারীর মাঝে বিচ্ছেদ করে দিয়েছেন, যে পুরুষ তার স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করেছে এবং তারা দুজন শপথ নিয়েছে।
অন্য আরেক বর্ণনায় এভাবে বর্ণিত হয়েছে,
لا عن النبي صلى الله عليه وسلم بين رجل وإمرأة من الأنصار وفرق بينهما.
অর্থ: হযরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারি একজন নারী ও পুরুষের মাঝে লিআন করানোর পর তাদের মাঝে বিচ্ছেদ করে দেন।
কাফেরদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার কারণে বনি ইসরাইলের কাফেরদের প্রতি আল্লাহ তাআলা লানত ও অভিসম্পাত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ. كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَن مُّنكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ. تَرَى كَثِيرًا مِّنْهُمْ يَتَوَلَّوْنَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَبِئْسَ مَا قَدَّمَتْ لَهُمْ أَنفُسُهُمْ أَن سَخِطَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَفِي الْعَذَابِ هُمْ خَالِدُونَ. وَلَوْ كَانُوا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالنَّبِيِّ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مَا اتَّخَذُوهُمْ أَوْلِيَاءَ وَلَكِنَّ كَثِيرًا مِّنْهُمْ فَاسِقُونَ.
অর্থ: বনি ইসরাইলের মধ্যে যারা কাফের, তাদেরকে দাউদ ও মরিয়ম-তনয় ঈসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা এ কারণে যে, তারা অবাধ্যতা করত এবং সীমালঙ্ঘন করত। তারা পরস্পরকে মন্দ কাজে নিষেধ করত না, যা তারা করত। তারা যা করত তা অবশ্যই মন্দ ছিল। আপনি তাদের অনেককে দেখবেন, কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করে। তারা নিজেদের জন্য যা পাঠিয়েছে তা অবশ্যই মন্দ। তা এই যে, তাদের প্রতি আল্লাহ ক্রোধান্বিত হয়েছেন এবং তারা চিরকাল আজাবে থাকবে। যদি তারা আল্লাহর প্রতি ও রাসুলের প্রতি অবতীর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত, তাহলে কাফেরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই দুরাচার。
টিকাঃ
৫৫. বুখারি শরিফ: ৫৩০৯; মুসলিম শরিফ: ৩/৭১৬-৭১৭।
৫৬. ফাতহুল বারি: ৯/৪৫৮।
৫৭. ফাতহুল বারি: ৯/৪৫৮; মুসলিম শরিফ: ৩/৭২০।
৫৮. সুরা মায়িদা: ৭৮-৮১।
📄 বেদাতি ও প্রবৃত্তিপূজারীদের সাহচর্য নিন্দনীয়
এ জন্যই বেদাতিদের থেকে দায়মুক্তির বিষয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাযি. বলে, হযরত ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ামার থেকে বর্ণিত। বসরার অধিবাসী মাবাদ জুহাইনাহ প্রথম ব্যক্তি; যে তাকদির অস্বীকার করে। আমি ও হুমায়দ ইবনু আবদুর রহমান উভয়ে হজ অথবা উমরার উদ্দেশে রওনা করলাম。
আমরা বললাম, যদি আমরা এ সফরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে-কোনো সাহাবার সাক্ষাৎ পেয়ে যাই, তাহলে ওইসব লোক তাকদির সম্বন্ধে যা কিছু বলে, সে সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করব। সৌভাগ্যক্রমে আমরা আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাযি.-কে মসজিদে প্রবেশের পথে পেয়ে গেলাম। আমি ও আমার সাথি তাকে এমনভাবে ঘিরে নিলাম যে, আমাদের একজন তার ডান এবং অপরজন তার বামে থাকলাম। আমি মনে করলাম আমার সাথি আমাকেই কথা বলার সুযোগ দেবে। (কারণ, আমি ছিলাম বাকপটু)। আমি বললাম, হে আবু আবদুর রহমান! আমাদের এলাকায় এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটেছে, তারা একদিকে কুরআন পাঠ করে অপরদিকে জ্ঞানের অন্বেষণও করে। ইয়াহইয়া তাদের কিছু গুণাবলির কথাও উল্লেখ করলেন। তারা বলে, তাকদির বলতে কিছু নেই এবং প্রত্যেক কাজ অকস্মাৎ সংঘটিত হয়。
ইবনু উমর রাযি. বললেন, যখন তুমি এদের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন তাদের জানিয়ে দেবে যে, তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, আর আমার সাথেও তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাযি. আল্লাহর নামে শপথ করে বললেন, এদের কারও কাছে যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকে এবং তা দান-খয়রাত করে দেয়, তাহলেও আল্লাহ তার এ দান গ্রহণ করবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে তাকদিরের ওপর ঈমান না আনবে。
ইমাম দারামি রহ. বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেন,
لا تجالسوا أهل الأهواء ولا تجادلوهم؛ فإني لا أمن أن يغمسوكم في ضلالتهم، أو يلبسوا عليكم ما تعرفون.
অর্থ: তোমরা প্রবৃত্তির অনুসারীদের সাথে উঠাবসা করবে না। তাদের সাথে বিতর্কে জড়াবে না। কেননা তাদের প্রতি আমার ভরসা হয় না যে, তারা তোমাদেরকে তাদের বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত করবে না বা তোমাদের জানা বিষয়ে সন্দেহে নিপতিত করবে না。
তিনি আইয়ুব থেকে আরও বর্ণনা করেন, আমাকে সায়িদ ইবনু যুবাইর রাযি. একবার তালাক ইবনু হাবিবের মজলিসে দেখতে পেলেন। অতঃপর তার সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি বললেন, কী ব্যাপার আমি তোমাকে তালাক ইবনু হাবিবের মজলিসে বসা দেখতে পেলাম?! খবরদার!! কখনো তুমি আর তার মজলিসে বসবে না。
ইমাম দারামি রহ. হাসান বসরি ও ইবনু সিরিন রাযি. থেকে আরও বর্ণনা করেন, হযরত হাসান বসরি ও ইবনু সিরিন রাযি. তাদের শাগরেদদের দিকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা প্রবৃত্তির অনুসারী ব্যক্তিদের সাথে উঠাবসা করবে না। তাদের সাথে বিবাদে জড়াবে না। আর তাদের থেকে কোনো হাদিসও বর্ণনা করবে না。
টিকাঃ
৫৯. মুসলিম শরিফ: ৮।
৬০. দারেমি: ১০৮।
৬১. দারেমি: ১০৮। তালাক বিন হাবিব শিয়াদের রজাআত অর্থাৎ হযরত আলি রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পুনরায় প্রত্যাবর্তন করবেন এমন বিশ্বাস রাখেন বলে অভিযোগ ছিল।
৬২. দারেমি: ১১০।