📘 সৎ সঙ্গে সর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ > 📄 নিশ্চয়ই মানুষ সঙ্গী দ্বারা প্রভাবিত হয়

📄 নিশ্চয়ই মানুষ সঙ্গী দ্বারা প্রভাবিত হয়


পাপাচারে লিপ্ত লোকজন; যাদের ঈমান দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, আল্লাহর সাহায্যের প্রতি যাদের বিশ্বাস কমে গিয়েছিল এবং যারা তাদের রাসুলের অবাধ্য হয়েছিল, তাদের থেকে পৃথক হয়ে যেতে হযরত মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার নিকট আবেদন করেছিলেন।
ঘটনা এমন যে, যখন মুসা আলাইহিস সালাম তাদেরকে পবিত্র ভূমিতে প্রবেশের আহ্বান জানালেন, তারা তাতে অস্বীকার করল। আর এ কথা বলে তার বিরুদ্ধাচরণ করল যে,
قَالُوا يُمُوسَى إِنَّا لَنْ نَّدْخُلَهَا أَبَدًا مَّا دَامُوْا فِيْهَا فَاذْهَبْ أَنْتَ وَ رَبُّكَ فَقَاتِلَا إِنَّا هُهُنَا قُعِدُوْنَ.
অর্থ: হে মুসা, আমরা কখনই তাতে প্রবেশ করব না, যতক্ষণ তারা তথায় থাকবে। তাই তুমি এবং তোমার রব গিয়ে তাদের সাথে লড়াই করো, আমরা এখানে বসে রইলাম।
তখন মুসা আল্লাহর কাছে এই দুআ করলেন,
قَالَ رَبِّ إِنِّي لَا أَمْلِكُ إِلَّا نَفْسِي وَأَخِي فَافْرُقْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ الْقَوْمِ الْفُسِقِينَ.
অর্থ: হে আমার রব! আমি আমার এবং আমার ভাই ব্যতীত কারও বিষয়ে কর্তৃত্ব রাখি না। সুতরাং আপনি আমাদের এবং পাপাচারী সম্প্রদায়ের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিন।
এ ছাড়া হযরত ইবরাহিম খলিল আলাইহিস সালামও নিজ পাপাচারী সম্প্রদায়ের সাথে উঠাবসা ত্যাগ করে তাদের বলেছিলেন,
وَ اعتَزِلُكُم وَ مَا تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ وَ اَدعُوا رَبِّي عَسَى أَلَّا أَكُونَ بِدُعَاءِ رَبِّي شَقِيًّا.
অর্থ: আর আমি তোমাদের ও আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত তোমরা করো তাদের পরিত্যাগ করছি এবং আমি আমার রবের ইবাদত করছি। আশা করি আমার রবের ইবাদত করে আমি ব্যর্থ হব না।
তিনি আরও বলেন, وَ قَالَ إِنِّى ذَاهِبٌ إِلَى رَبِّى سَيَهْدِيْنِ. অর্থ: আমি আমার রবের পথে যাত্রা করছি। অবশ্যই তিনি আমাকে সঠিক পথ দেখাবেন।
ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে মর্যাদা ও সম্মান দান করেন। আর তাঁকে উত্তম বিনিময় ও প্রতিদান দেন। যেমনটা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন,
فَلَمَّا اعْتَزَلَهُم وَ مَا يَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ وَهَبْنَا لَهُ إِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَ كُلَّا جَعَلْنَا نَبِيًّا. وَ وَهَبْنَا لَهُم مِّن رَّحْمَتِنَا وَ جَعَلْنَا لَهُم لِسَانَ صِدْقٍ عَلِيًّا.
অর্থ: অতঃপর যখন সে তাদেরকে এবং আল্লাহ ছাড়া যাদের তারা ইবাদত করত তাদের সবাইকে পরিত্যাগ করল, তখন আমি তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুব এবং তাঁদের প্রত্যেককে নবী করলাম। আর আমি তাঁদেরকে আমার অনুগ্রহ দান করলাম আর তাঁদের সুনাম-সুখ্যাতিকে সমুচ্চ করলাম।
তাই যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পাপাচারীদের সঙ্গ ত্যাগ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে এভাবেই সম্মানিত করেন। আর যে আল্লাহর ভয়ে কোনো কিছু ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাআলা তাকে তার চেয়ে উত্তম বিনিময় দেন।
তাই আমরা একজন ফকিহ আলেমকে শত ব্যক্তির হত্যাকারীকে তার নিজ জায়গা ও আবাসস্থল ত্যাগ করে আল্লাহর ইবাদতগুজার সৎ বান্দাদের পবিত্র ভূমিতে চলে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিতে দেখতে পাই। সেখানে যেন সেও তাদের সাথে আল্লাহর ইবাদত করতে পারে। এটি ফেতনা থেকে বাঁচার অনেক কার্যকরী একটি পন্থা।
বুখারি ও মুসলিম শরিফে হযরত আবু সায়িদ খুদরি রাযি. হতে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের পূর্ববর্তী (বনি ইসরাইলের যুগে) এক ব্যক্তি ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছিল। অতঃপর সে লোকদের নিকট বিশ্বের সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তাকে এক খ্রিষ্টান রাহেবের কথা বলা হলো। সে তার কাছে এসে বলল, সে ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছে। এখন কি তার তাওবার কোনো সুযোগ আছে? সে বলল, না। সুতরাং সে (ক্রোধান্বিত হয়ে) তাকে হত্যা করে একশ পূরণ করল। পুনরায় সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। এবার তাকে এক আলেমের খোঁজ দেওয়া হলো। সে তার নিকট এসে বলল, সে একশ মানুষ খুন করেছে। সুতরাং তার কি তাওবার কোনো সুযোগ আছে? সে বলল, হ্যাঁ, আছে! এমন কে আছে, যে তোমার ও তাওবার মধ্যে বাধা সৃষ্টি করবে? তুমি অমুক দেশ চলে যাও। সেখানে কিছু লোক এমন আছে, যারা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে। তুমিও তাদের সাথে আল্লাহর ইবাদত করো। আর তুমি নিজ দেশে ফিরে যেয়ো না। কেননা, ওটা পাপের দেশ। সুতরাং সে ব্যক্তি ওই দেশে যেতে শুরু করল।
যখন সে মধ্যরাস্তায় পৌঁছল, তখন তার মৃত্যু এসে গেল। (তার দেহ-পিঞ্জর থেকে আত্মা বের করার জন্য) রহমত ও আজাবের উভয় ফেরেশতা উপস্থিত হলেন। ফেরেশতাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হলো। রহমতের ফেরেশতাগণ বললেন, এই ব্যক্তি তাওবা করে এসেছিল এবং পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর দিকে তার আগমন ঘটেছে। আর আজাবের ফেরেশতারা বললেন, সে এখনো ভালো কাজ করেনি (এই জন্য সে শাস্তির উপযুক্ত)। এমতাবস্থায় একজন ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করে উপস্থিত হলেন। ফেরেশতাগণ তাকে সালিস মানলেন। তিনি ফয়সালা দিলেন, তোমরা দুই দেশের দূরত্ব মেপে দেখো। (অর্থাৎ সে যে এলাকা থেকে এসেছে সেখান থেকে এই স্থানের দূরত্ব এবং যে দেশে যাচ্ছিল তার দূরত্ব) এই দুয়ের মধ্যে সে যার দিকে বেশি নিকটবর্তী হবে, তারই অন্তর্ভুক্ত হবে। অতএব তারা দূরত্ব মাপলেন এবং যে দেশে সে যাওয়ার ইচ্ছা করেছিল, সেই (ভালো) দেশকে বেশি নিকটবর্তী পেলেন। সুতরাং রহমতের ফেরেশতাগণ তার জান কবজ করলেন।
মুসলিম শরিফের অন্য বর্ণনায় এভাবে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু সায়িদ খুদরি রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এক ব্যক্তি ৯৯ ব্যক্তিকে হত্যা করে জিজ্ঞাসা করে বেড়াতে লাগল, তার কি তাওবা করার সুযোগ আছে? অবশেষে সে এক পাদরির নিকট এসে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। পাদরি বলল, তোমার জন্য তাওবার সুযোগ নেই। তখন সে পাদরিকেও হত্যা করল। এরপর সে আবারও লোকদের জিজ্ঞাসা করতে লাগল। তারপর সে এক জনপদ থেকে অন্য জনপদের উদ্দেশে রওনা হলো, যেখানে কিছু নেক লোক বসবাস করছিল। চলার পথে এক পর্যায়ে তার সামনে মালাকুল মওত উপস্থিত হলো। তখন সে বুকের ওপর ভর করে সামনের দিকে অগ্রসর হলো। তারপর সে মারা গেল। তখন রহমতের ফেরেশতা ও আজাবের ফেরেশতা তার ব্যাপারে বিবাদে লিপ্ত হলো। তখন দেখা গেল, সে নেক লোকদের জনপদের দিকে এক বিঘত পরিমাণ নিকটবর্তী রয়েছে। তাই তাকে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হলো。

টিকাঃ
২৬. সুরা মায়েদা: ২৪।
২৭. সুরা মায়েদা: ২৫।
২৮. সুরা মারইয়াম: ৪৮।
২৯. সুরা সাফফাত: ৯৯।
৩০. সুরা মারইয়াম: ৪৯-৫০।
৩১. বুখারি শরিফ: ৩৪৭০; মুসলিম শরিফ: ৭১৮৪-৭১৮৫।
৩২. মুসলিম শরিফ: ৭১৮৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00