📄 সুন্দরী স্ত্রীর দ্বারা ইমরান ইবনু হাত্তান রহ.-এর প্রভাবিত হওয়া
ইমরান ইবনু হাত্তান রহ. ছিলেন তাবেয়িদের একজন। আহলে সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তি। কল্যাণ ও সততার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তার কী পরিণতি হলো?!
সে তার চাচার মেয়েকে বিবাহ করল। যে ছিল খারেজিদের একজন। তবে অতিশয় সুন্দরী। সে চেয়েছিল তাকে হেদায়েতের পথে আনতে। কিন্তু স্ত্রীই তাকে খারেজিদের বিষাক্ত ও ঘৃণিত পথে নিয়ে গেল। ফলে সে আমিরুল মুমিনিন আলি রাযি.-কে গালি দিতে শুরু করল। শুধু তাই নয়, তার হত্যাকারী আবদুর রহমান ইবনু মুলজিমের চূড়ান্ত প্রশংসা করতে লাগল। ইবনু মুলজিমের প্রশংসায় সে কয়েকটি কবিতাও আবৃত্তি করে বসল। যাহাবি রহ. তার সিয়ারু আলামিন নুবালা গ্রন্থে সেগুলো উল্লেখ করেছেন। যাতে বর্ণিত হয়েছে,
সে আলি রাযি.-এর হত্যাকারী দুরাচার ইবনু মুলজিমের আঘাতদ্বয়ের প্রশংসা করে বলছে, হে মুত্তাকি ব্যক্তির আঘাতদ্বয়! যা দ্বারা কেবল আরশের অধিপতির সন্তুষ্টিই কামনা করা হয়েছে। যখন কেয়ামতের মাঠে মিজান স্থাপন করা হবে, তখন আমি আল্লাহ তাআলার সামনে এই হত্যাকাণ্ডকে উল্লেখ করব এবং মুক্তির জন্য নেকি হিসেবে এটাকেই যথেষ্ট মনে করব। অতঃপর এই ইবনু মুলজিমকে শহিদ আখ্যা দিয়ে সে বলে, সেই জাতিকে সম্মান করো, পাখির পেটসমূহ যাদের কবর; আর তাদের দ্বীনকে অবাধ্য বিদ্রোহীদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলো না।
ইমাম যাহাবি রহ. বলেন, তার এই কবিতাগুলো আবদুল মালেক ইবনু মারওয়ানের নিকট পৌঁছলে হযরত আলি রাযি.-এর নৈকট্যের কারণে তার দেহে জ্বর শুরু হয়ে যায়। ফলে তিনি তাকে হত্যার মানত করেন এবং তার পেছনে গুপ্তচর নিযুক্ত করেন। কোনো ভূখণ্ডই তাকে গ্রহণ করেনি। অর্থাৎ সে কোথাও স্থির হচ্ছিল না। তাই তিনি রুহ ইবনু জিম্বাকে ভাড়া করেন। সুতরাং সে তার কোনো এক মেজবানিতে তাকে প্রশ্ন করে, তুমি কোথা থেকে এসেছ? সে বলল, আজদ থেকে। ইমরান ইবনু হাত্তান তার নিকট এক বছর অবস্থান করে। ইমরান ইবনু হাত্তানকে তার খুব ভালো লেগে যায়। একদিন রুহ ইবনু জিম্বাহ আমিরুল মুমিনিনের নিকট রাত কাটান। তখন আমিরুল মুমিনিন আবদুল মালেক ইবনু মারওয়ান ইমরানের সেই কবিতার আলোচনা করেন। অতঃপর রুহ ইবনু জিম্বা সেখান এসে ইমরান ইবনু হাত্তানের নিকট আমিরুল মুমিনিনের নিকট ঘটে যাওয়া বিষয় বলে।
তখন ইমরান ইবনু হাত্তান অবশিষ্ট কবিতা আবৃত্তি করে। অতঃপর রুহ ইবনু জিম্বা যখন আবদুল মালেক ইবনু মারওয়ানের নিকট গিয়ে বলল, আমার মেজবানিতে এক লোক এসেছিল। তার কথা-বার্তার চেয়ে সুন্দর কোনো কথা আমি কখনো শুনিনি। সে আপনার বর্ণিত সেই কবিতা পুরোটা আবৃতি করে শুনিয়েছে। তখন তিনি বললেন, তুমি আমার নিকট তার কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করো। তখন সে তার কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে। তিনি সেগুলো শুনে বললেন, তুমি ইমরান ইবনু হাত্তানের কথাই বলছ। তুমি আমার সাক্ষাৎ পর্যন্ত তাকে আটকে রাখো। তখন সে বলল, সে তো জাজিরাতুল আরবে পালিয়ে গেছে। অতঃপর সে ওমানে অবস্থান করে এবং তারা তাকে সম্মান করে।
কোনো কোনো আলেম বলেন, ইমরান ইবনু হাত্তান হযরত আলি রাযি.-এর হত্যাকারী ইবনু মুলজিম দ্বারাও প্রভাবান্বিত হয়েছিল। কেননা সে দেখেছে ইবনু মুলজিম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার মতবাদের ওপর অটল ছিল, যদিও এই অটলতা ছিল স্পষ্ট ভ্রান্তির ওপর। ইমাম শানকিতি রহ. 'আজওয়াউল বয়ান' গ্রন্থে বলেন: যখন হযরত আলি রাযি.-এর সন্তানগণ তার সন্ধানে বের হলেন, ততক্ষণে তার উভয় হাত ও পা কেটে দেওয়া হয়েছে। তখনও সে ভীতসন্ত্রস্ত না হয়ে অনবরত জিকির করছিল। যখন তার চক্ষু উপড়ে ফেলা হলো, তখনও সে জিকির করছিল। এক পর্যায়ে যখন সে সুরা আলা তিলাওয়াত করছিল, তখন তার উভয় চোখের গলিত অংশ তার গালে প্রবাহিত হচ্ছিল। অতঃপর লোকজন তার জিহ্বা কাটতে উদ্ধত হলে সে খুব ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। তখন তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে সে বলল, আমি ভয় করছি এতে এমন কিছু সময় আমার ওপর অতিবাহিত হবে, যে সময়ে আমি আল্লাহর জিকির করতে পারব না। উক্ত ঘটনা ইবনু কাসির প্রমুখ বর্ণনা করেছেন।
এ জন্যই ইমরান ইবনু হাত্তান সাদুসি ইবনু মুলজিমের প্রশংসা করেছিল। আল্লাহ তাআলা ইবনু মুলজিমকে কুৎসিত করুন। কেননা সে ছিল হযরত আলি রাযি.-এর হত্যাকারী।
এই ঘটনা থেকেও কি সে সকল লোক শিক্ষা নেবে না, যারা কেবল সৌন্দর্যের কারণে কোনো নারীকে বিবাহ করে এবং এ ক্ষেত্রে তারা নিজের দ্বীনের নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করে নারীর সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
📄 নবীজির সাহচর্যে সাহাবাদের মধ্যে কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপস্থিতি ও তাঁর কুরআন তেলাওয়াত সাহাবাগণকে অনেক বেশি প্রভাবিত করেছিল। আর যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বোত্তম রাসুল এবং তাঁর প্রতি অবতীর্ণ কিতাবই সর্বোত্তম কিতাব, সেহেতু তাঁর জাতি সর্বোত্তম জাতি এবং তাঁর সাহাবাগণ হলেন সর্বোত্তম মানুষ। সাহাবায়ে কেরাম রাযি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে এত আগ্রহের সাথে বসতেন, যেন তাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। আর তারা পাখি যেন উড়ে না যায় সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক। এরপর যখন তারা তাদের স্ত্রী-সন্তানদের সাথে মিলতেন তখন তাদের পরকাল-ভাবনা তেমনটা থাকত না। যেমনটা সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে,
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন পত্রবাহক হানজালা আল-উসাইদ রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আবু বকর রাযি. আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, হে হানজালা! তুমি কেমন আছ? আমি বললাম, হানজালা মুনাফিক হয়ে গেছে! তিনি (আশ্চর্য হয়ে) বললেন, সুবহানাল্লাহ! এ কী কথা বলছ? আমি বললাম, (কথা এই যে, যখন) আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থাকি, তিনি আমাদের সামনে এমন ভঙ্গিমায় জান্নাত ও জাহান্নামের আলোচনা করেন, যেন আমরা তা স্বচক্ষে দেখছি। অতঃপর যখন আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে বের হয়ে আসি, তখন স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও অন্যান্য (পার্থিব) কারবারে ব্যস্ত হয়ে অনেক কিছু ভুলে যাই। আবু বকর রাযি. বললেন, আল্লাহর কসম! আমারও তো এই অবস্থা হয়। সুতরাং আমি ও আবু বকর রাযি. গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হলাম। অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! হানজালা মুনাফিক হয়ে গেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে কী কথা? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা যখন আপনার নিকট থাকি, তখন আপনি আমাদেরকে জান্নাত-জাহান্নামের কথা এমনভাবে শুনান; যেন আমরা তা চাক্ষুস প্রত্যক্ষ করছি। অতঃপর আমরা যখন আপনার নিকট থেকে বের হয়ে স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও কাজ-কর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, তখন অনেক কথা ভুলে যাই। (এ কথা শুনে) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! যদি তোমরা সর্বদা এই অবস্থায় থাকতে, যে অবস্থাতে তোমরা আমার নিকটে থাকো এবং সর্বদা আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকতে, তাহলে ফেরেশতাগণ তোমাদের বিছানায় ও তোমাদের পথে তোমাদের সঙ্গে মুসাফাহা করতেন। কিন্তু হে হানজালা! (সর্বদা মানুষের এক অবস্থা থাকে না) কিছু সময় (ইবাদতের জন্য) ও কিছু সময় (সাংসারিক কাজের জন্য) তিনি এ কথা তিনবার বললেন।
টিকাঃ
২৫. মুসলিম শরিফ : ২৭৫০।