📘 সৎ সঙ্গে সর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ > 📄 সঙ্গী-সাথির প্রভাব

📄 সঙ্গী-সাথির প্রভাব


কোনো সন্দেহ নেই যে, বন্ধু-বান্ধব ও সমবয়স্ক সঙ্গীরা পরস্পরের দ্বারা প্রভাবিত হয়। একে অন্যের স্বভাব ও অভ্যাসগুলোর অনুকরণ করে। একজন অন্যজনের মতো কাজ করে। তবে আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্তরাই একমাত্র সাহচর্যের প্রভাব থেকে বেঁচে থাকতে পারে।

যখন কারও সঙ্গী তার চেয়ে যোগ্যতায় সম্মানিত বা মর্যাদায় উন্নত অথবা বয়সে বড় ইত্যাদি এমন সব গুণের অধিকারী হয়, যা তাদের একজনকে অন্যজনের ওপর আলাদা করে শ্রেষ্ঠত্ব দেয় এবং উত্তম বিবেচিত করে, তখন উল্লেখিত বিষয়টি অধিকাংশের ক্ষেত্রে আরও মজবুত ও শক্তিশালীরূপে পরিলক্ষিত হয়।

একজন অন্যজন দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার বিষয়টি হাদিসের মধ্যেও এসেছে। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ أَبِي مُوسَى عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ وَالسَّوْءِ كَحَامِلِ الْمِسْكِ وَنَافِخِ الْكِيرِ فَحَامِلُ الْمِسْكِ إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْه وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْه رِيحًا طَيِّبَةً وَنَافِخُ الْكِيرِ إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيحًا خَبِيثَة

অর্থ: হযরত আবু মুসা রাযি. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হলো সুগন্ধি বহনকারী ও হাফরের ফুঁক-দানকারীর মতো। সুগন্ধি বহনকারী হয়তো তোমাকে সুগন্ধি দেবে, অথবা তুমি তার থেকে সুগন্ধি ক্রয় করবে, অথবা তুমি তার থেকে মেশকের সুবাস পাবে। আর হাফরের ফুঁক-দানকারী হয়তো তোমার জামা পুড়িয়ে ফেলবে, অথবা তুমি সেখানে দুর্গন্ধ অনুভব করবে।

টিকাঃ
১২. বুখারি শরিফ: ৫৫৩৪; মুসলিম শরিফ: ২৬২৮।

📘 সৎ সঙ্গে সর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ > 📄 হাদিসের ব্যাখ্যায় সালাফদের উক্তি

📄 হাদিসের ব্যাখ্যায় সালাফদের উক্তি


ইমাম নববি রহ. বলেন তিনি বলেন, এই হাদিসে নেককার, সৎ লোক, কল্যাণ ও সৌজন্যের অধিকারী, উত্তম চরিত্র, খোদাভীতি, ইলম ও শারাফতের অধিকারী ব্যক্তিদের সাহচর্যের ফজিলতের আলোচনা করা হয়েছে। এবং অসৎ, বেদাতি, গিবতকারী, মন্দ ও বেহুদা কাজে লিপ্ত ইত্যাদি মন্দ স্বভাবের অধিকারী ব্যক্তির সাহচর্য অবলম্বন থেকে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

হাফেজ ইবনু হাজার আসকালানি রহ. বলেন: উক্ত হাদিসে দুনিয়া ও আখেরাত ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন ব্যক্তির সাহচর্য ও সঙ্গ অবলম্বন থেকে নিষেধ করা হয়েছে এবং যার সাহচর্য দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনকে উপকৃত করে তার সান্নিধ্য গ্রহণের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

আবু দাউদ শরিফের 'এক সঙ্গী অপর সঙ্গীর দ্বারা প্রভাবিত হওয়া'-বিষয়ক অধ্যায়ে হযরত আবু হুরায়রা রাযি. হতে বর্ণিত,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ.

অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মানুষ তাঁর বন্ধুর দ্বীনের অনুসারী হয়। তাই, তোমাদের দেখা উচিত, কার সাথে বন্ধুত্ব করছ।

এই হাদিসের সনদে কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। তবে কেউ কেউ হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।

মুবারকপুরি রহ. বলেন: যার দ্বীনদারি ও চরিত্রমাধুরীর প্রতি সন্তুষ্ট ও আনন্দিত হও তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো। আর যার দ্বীনদারি ও চরিত্রের ব্যাপারে সন্তুষ্ট ও খুশি হতে না পারো, তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। কেননা মানুষের স্বভাব ও মেজাজ প্রতিক্রিয়াশীল। পারস্পরিক সান্নিধ্য ও সাহচর্য মানুষের সংশোধন ও বিপর্যয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

ইমাম গাযালি রহ. বলেছেন: লোভী ব্যক্তির সাহচর্য ও তার সাথে মেলামেশা মানুষের ভেতর লোভকে জাগ্রত করে। আর অল্পেতুষ্ট ও দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তির সান্নিধ্য ও তার সাথে মেলামেশা মানুষের ভেতর অল্পেতুষ্টি ও দুনিয়ার প্রতি নির্মোহতা সৃষ্টি করে। কেননা মানুষের স্বভাব ও তবিয়তকে তার অজান্তেই অনুকরণপ্রবণ ও সাদৃশ্যপ্রবণ করে সৃষ্টি করা হয়েছে।

কুরাইশ পুরুষরা তাদের নারীদের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী ছিল। আর মদিনার পুরুষদের ওপর তাদের নারীরা প্রভাব বিস্তারকারী ছিল। যখন কুরাইশরা মদিনায় এলো তখন কুরাইশ নারীরা মদিনার আনসারি নারীদের স্বভাব গ্রহণ করতে শুরু করল। স্বামীদের সাথে কথাবার্তা ও সম্বোধনে তারা আনসারি নারীদের অনুগমন করতে লাগল। এই বিষয়টিই হাদিসে বর্ণিত হয়েছে এভাবে।

বুখারি শরিফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযি. হতে বর্ণিত। আমি বহুদিন ধরে উৎসুক ছিলাম যে, 'উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.-এর নিকট জিজ্ঞেস করব, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণের মধ্যে কোন দুজনের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেছেন-

إِنْ تَتُوبَا إِلَى اللَّهِ فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا.

অর্থ: তোমরা দুজন যদি অনুশোচনাভরে আল্লাহর দিকে ফিরে আসো (তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম), তোমাদের অন্তর (অন্যায়ের দিকে) ঝুঁকে পড়েছে।

অতঃপর অবশিষ্ট হাদিস বর্ণনার এক পর্যায়ে হযরত উমর রাযি. বলেন, আমরা কুরাইশ পুরুষরা নারীদের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী ছিল। পরবর্তীতে কুরাইশরা মদিনায় এসে দেখল, মদিনার পুরুষদের ওপর তাদের নারীরা প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে কুরাইশ নারীরা মদিনার আনসারি নারীদের স্বভাব গ্রহণ করতে শুরু করল। এতে আমি আমার স্ত্রীকে ধমক দিলাম। সেও আমার ধমকের প্রতিউত্তর দিলো। তার এই প্রতিউত্তর আমার পছন্দ হলো না। তখন সে বলল, আমার প্রতিউত্তর আপনি অপছন্দ করছেন কেন? আল্লাহর কসম! নবীজির স্ত্রীগণ তো নবীজির কথার প্রতিউত্তর দিতেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

الْأَعْرَابُ أَشَدُّ كُفْرًا وَنِفَاقًا وَأَجْدَرُ أَلَّا يَعْلَمُوا حُدُودَ مَا أَنزَلَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ.

অর্থ: বেদুইনরা কুফর ও মুনাফেকিতে অত্যন্ত কঠোর হয়ে থাকে এবং এরা সেসব নিয়ম-নীতি না শেখারই যোগ্য, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলের ওপর নাজিল করেছেন।

গ্রাম্য আরবরা কুফর ও মুনাফেকিতে অন্যদের চেয়ে শক্ত ও মজবুত; কিন্তু সেই অন্যরা কারা?

কোনো কোনো আলেম বলেছেন, বেদুইনরা কুফর ও নেফাকে মদিনার কাফের ও মুনাফেকদের তুলনায় শক্ত ও মজবুত। অতএব বেদুইন কাফেররা মদিনার কাফেরের চেয়ে বেশি গোঁড়া ও একরোখা। আর বেদুইন মুনাফিক মদিনার মুনাফিকের চেয়ে বেশি ঘোরতর।

কোনো কোনো আলেম এর কারণ বলেছেন, বেদুইনদের মধ্যে রূঢ়তা ও রুক্ষতা উভয়ই একসাথে পাওয়া যায়। আর যারা গ্রামে থাকে তারা সাধারণত রূঢ় স্বভাবের হয়। তা ছাড়া অজ্ঞতাও তাদের মধ্যে প্রকট আকারে থাকে।

আর মদিনার কাফের ও মুনাফিকরা সর্বদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবিদের সাথে মেলামেশা ও উঠাবসা করার কারণে বাহ্যিকভাবে তাদের স্বভাব-চরিত্র ও মন-মেজাজে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবি রাযি.-দের চরিত্রমাধুরীর প্রভাব পড়েছে। তাই দেখবে আরব ভূখণ্ডের কোনো খ্রিষ্টান রাশিয়ায় বসবাসকারী খ্রিষ্টানের মতো নয়। প্রথমজনকে যখন বলা হয় তোমার মেয়ে ব্যভিচার করেছে তখন সে লজ্জায় মরে যায়। বিপরীতে অপরজন তার চতুর্দিকের সকলেই ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার কারণে মেয়ের ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া বা না হওয়ার তার কোনো ভাবান্তর নেই। মেয়ের চারিত্রিক পবিত্রতা ও অপবিত্রতার ব্যাপারে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

শুধু মানুষের নৈকট্যই প্রতিক্রিয়াশীল—বিষয়টি এমন নয়। বরং জন্তু-জানোয়ারের নৈকট্যও প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রভাব বিস্তারকারী। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ رَأْسُ الْكُفْرِ نَحْوَ الْمَشْرِقِ وَالْفَخْرُ وَالْخُيَلاءُ فِي أَهْلِ الْخَيْلِ وَالْإِبِلِ وَالْفَدَّادِينَ أَهْلِ الْوَبَرِ وَالسَّكِينَةُ فِي أَهْلِ الْغَنَمِ.

অর্থ: আবু হুরায়রা রাযি. হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কুফরির মূল পূর্বদিকে, গর্ব-অহংকার ঘোড়া ও উটের মালিক এবং বেদুইনদের মধ্যে যারা তাদের উটের পাল নিয়ে ব্যস্ত থাকে, আর প্রশান্তি বকরির পালের মালিকদের মধ্যে।

কেননা উট যখন চলে তখন সে মাথা ঊর্ধ্বমুখী করে চলে, যা উটের আরোহীর মধ্যে অহংকার ও ঔদ্ধত্ব সৃষ্টি করে। আর বকরি স্থির ও শান্তশিষ্ট হওয়ার কারণে আল্লাহর অনুগ্রহে তা বকরির রাখালদের মধ্যে স্থিরতা ও নম্রতা সৃষ্টি করে।

এ কারনেই তো নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَا بَعَثَ اللَّهُ نَبِيًّا إِلَّا رَعَى الْغَنَمَ فَقَالَ أَصْحَابُهُ وَأَنْتَ فَقَالَ نَعَمْ كُنْتُ أَرْعَاهَا عَلَى قَرَارِيطَ لِأَهْلِ مَكَّةَ.

অর্থ: আবু হুরায়রা রাযি. হতে বর্ণিত। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা এমন কোনো নবী প্রেরণ করেননি, যিনি বকরি চরাননি। তখন সাহাবিগণ বললেন, আপনিও? তিনি বলেন, হ্যাঁ; আমি কয়েক কিরাতের (মুদ্রা) বিনিময়ে মক্কাবাসীর বকরি চরাতাম।

বিশুদ্ধ সূত্রে আমিরুল মুমিনিন হযরত উমর রাযি.-এর ঘটনা বর্ণিত আছে যে, তিনি একটি উটে সওয়ার হলে তখন সেটি তাকে নিয়ে দপদপ করে চলতে লাগল। তিনি সেটিকে প্রহার করলেন, কিন্তু এতে সেটির লাফালাফি আরও বৃদ্ধি পেল। ফলে তিনি নেমে পড়লেন এবং বললেন, তোমরা আমাকে একটি শয়তানের ওপর আরোহণ করিয়েছ। আমি তাতে চড়ে লজ্জিত হয়েছি এবং নেমে পড়েছি। অতএব উটে আরোহণ ও চলা তার আরোহীর অন্তরে প্রভাব বিস্তার করে। এ জন্য উমর রাযি. তা থেকে নেমে পড়েছেন। তিনি সম্মানপ্রদর্শনমূলক তা থেকে নেমে পড়েননি। এটা কীভাবে সম্ভব যে আমিরুল মুমিনিন উমর রাযি. আল্লাহর দান করা হালাল বস্তু হারাম করবেন। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন, وَالْخَيْلَ وَالْبِغَالَ وَالْحَمِيرَ لِتَرْكَبُوهَا وَزِينَةً. অর্থ: তোমাদের আরোহণের জন্যে এবং শোভার জন্যে তিনি ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা সৃষ্টি করেছেন।

বরং উটের লাফালাফি আমিরুল মুমিনিনের অন্তরে প্রভাব ফেলেছে, তাই তিনি ত্যাগ করেছেন এবং তা থেকে নেমে পড়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

لَّا يُحِبُّ اللَّهُ الْجَهْرَ بِالسُّوءِ مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا مَن ظُلِمَ وَكَانَ اللَّهُ سَمِيعًا عَلِيمًا.

অর্থ: আল্লাহ কোনো মন্দ বিষয় প্রকাশ করা পছন্দ করেন না। তবে কারও প্রতি জুলুম হয়ে থাকলে সে কথা আলাদা। আল্লাহ শ্রবণকারী, বিজ্ঞ।

কোনো কোনো আলেম এর ব্যাখ্যায় বলেন, অধিকহারে মন্দ কথা শ্রবণের ফলে শ্রবণকারীর নিকট তা সামান্য ও তুচ্ছ মনে হয়। যেমন: আপনি শুনতে পেলেন এক ব্যক্তি ব্যভিচার করেছে। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। আপনি তখন একে অশ্লীল মনে করবেন এবং ঘৃণা করবেন। এরপর বারবার এই সংবাদ আপনার কানে আসার কারণে আপনি তা শুনতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বেন এবং এর প্রতি আপনার ঘৃণাবোধ কমে যাবে। এমনকি কারও কারও অন্তর তো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে আসে। তাতে কেবল সামান্যই ঘৃণাবোধ অবশিষ্ট থাকে; বরং অশ্লীল কাজে লিপ্ত নারী-পুরুষের অশ্লীলতার বর্ণনায় তারা এমন শব্দ ব্যবহার করে, যা তাদের জন্য অশ্লীল কাজকে সহজ করে দেয়। তারা বলে অমুক ভুল করেছে, অমুক নারী ভুল করেছে।

যখন শুনবে কোনো ব্যক্তি তার মাহরাম নারীর সাথে ব্যভিচার করেছে, তখন তোমার প্রচণ্ড ঘৃণা হবে। কিন্তু যখন প্রতিদিন তোমার কানে আসবে একজন তার মাহরাম নারীর সাথে ব্যভিচার করেছে তখন দিনদিন তোমার ঘৃণাবোধ কমতে থাকবে।

এরপর কোনোদিন যখন শুনবে কোনো ব্যক্তি প্রকাশ্য রাস্তায় অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে, তখন তুমি তা কল্পনাও করতে পারবে না। কিন্তু যখন প্রতিদিন তোমার কানে আসবে, তখন তোমার ঘৃণা কমে যাবে। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে যেমনটা ঘটে চলছে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ততক্ষণ কেয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না মানুষ প্রকাশ্য রাস্তায় গাধার মতো অপকর্মে লিপ্ত হবে। আমি বললাম, এটাও হবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে।

মুসনাদে আবি ইয়ালা আল মুসেলি গ্রন্থে আবু হুরায়রা রাযি. হতে হাসান সূত্রে বর্ণিত। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ওই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ! এই উম্মত ধ্বংস হবে না যতক্ষণ পুরুষরা নারীদের ওপর চড়াও হবে এবং প্রকাশ্য রাস্তায় সঙ্গমে লিপ্ত হবে। সে সময় যারা বলবে যদি কাজটা এই দেয়ালের আড়ালে হতো তারাই তাদের মধ্যে উত্তম বিবেচিত হবে।

আল্লাহপ্রদত্ত সীমারেখার প্রতি এই শিথিলতা ও অবজ্ঞার উৎস হলো পাপাচারীদের সাথে মেলামেশা এবং এ সকল ব্যাধি ও অবক্ষয়ের কথা বেশি বেশি শ্রবণ করা। কেননা পাপিষ্ঠরা সর্বদা তাদের পাপকাজে সন্তুষ্ট থাকে এবং পাপকাজকে সুন্দররূপে উপস্থাপন ও আলোচনা করে। আর এটা শুধু ব্যভিচারের ক্ষেত্রেই নয়; বরং সকল ক্ষেত্রেই। সুতরাং এক ব্যক্তি মদপানকারীকে ঘৃণা করে; কিন্তু যখন বারবার তার কানে আসতে থাকে যে অমুক মদপান করেছে, অমুক অমুক মদপান করেছে, তখন মদপানকারীর প্রতি তার ঘৃণা কমতে থাকে। তবে আল্লাহ যাকে হেফাজত করেন সে-ই কেবল নিরাপদ থাকে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِي عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَا بَعَثَ اللَّهُ مِنْ نَبِي وَلَا اسْتَخْلَفَ مِنْ خَلِيفَةٍ إِلَّا كَانَتْ لَهُ بِطَانَتَانِ بِطَانَةُ تَأْمُرُهُ بِالْمَعْرُوفِ وَتَحَضُّهُ عَلَيْهِ وَبِطَانَةٌ تَأْمُرُهُ بِالشَّرِّ وَتَحَضُّهُ عَلَيْهِ فَالْمَعْصُومُ مَنْ عَصَمَ اللَّهُ تَعَالَى.

অর্থ: হযরত আবু সাইদ খুদরি রাযি. নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ যাকেই নবী হিসেবে পাঠান এবং যাকেই খলিফা নিযুক্ত করেন, তার জন্য দুজন ঘনিষ্ঠ সহকারী থাকে। একজন তাকে ভালো কাজের আদেশ দেয় এবং তার প্রতি উৎসাহিত করে। আর অপরজন তাকে মন্দ কাজের আদেশ দেয় এবং তার প্রতি উৎসাহিত করে। আর নিষ্পাপ ওই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাআলা রক্ষা করেন।

আল্লাহ তাআলা যে নবী বা প্রতিনিধি-ই প্রেরণ করেছেন, প্রত্যেকের সাথেই দুটি অন্তরঙ্গ প্রেরণাদাতা রয়েছে। একটি তাঁকে সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করে ও প্রেরণা দেয়, অপরটি তাঁকে অসৎকাজে প্ররোচিত করে ও উৎসাহ দেয়। এ ক্ষেত্রে আল্লাহ যাকে রক্ষা করেন সে-ই কেবল নিরাপদ।

টিকাঃ
১৩. আবু দাউদ শরিফ: ৪৮৩৩; মুসনাদে আহমাদ: ৮০২৮; তিরমিজি শরিফ: ২৩২৭। তিনি বলেন, হাদিসটি হাসান সহিহ।
১৪. তোহফাতুল আহওয়াজি: ৭/৪৯।
১৫. সুরা তাহরিম: ৬৬।
১৬. সুরা তাওবা: ৯৭।
১৭. বুখারি শরিফ: ৩৪৯৯, ৪৩৮৮, ৪৩৮৯, ৪৩৯০; মুসলিম শরিফ ১/২১, ৫২; মুসনাদু আহমাদ: ৯৪১৪।
১৮. বুখারি শরিফ: ২২৬২।
১৯. সুরা নাহল: ৮।
২০. তাফসিরে তাবারি ১/৭৬; আবু যায়েদ উমর ইবনে শিবতা রহ.-এর তারিখুল মাদানিয়‍্যাহ: ৩/৮২২, ৮২৩, তাফসিরে ইবনে কাসির ১/১৭১।
২১. সুরা নিসা: ১৪৮।
২২. সহিহ ইবনু হিব্বান: ১৮৮৯।
২৩. মুসনাদে আবি ইয়ালা: ১১/৪৩।
২৪. বুখারি শরিফ: ৭১৯৮।

📘 সৎ সঙ্গে সর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ > 📄 নিশ্চয়ই মানুষ সঙ্গী দ্বারা প্রভাবিত হয়

📄 নিশ্চয়ই মানুষ সঙ্গী দ্বারা প্রভাবিত হয়


পাপাচারে লিপ্ত লোকজন; যাদের ঈমান দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, আল্লাহর সাহায্যের প্রতি যাদের বিশ্বাস কমে গিয়েছিল এবং যারা তাদের রাসুলের অবাধ্য হয়েছিল, তাদের থেকে পৃথক হয়ে যেতে হযরত মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার নিকট আবেদন করেছিলেন।
ঘটনা এমন যে, যখন মুসা আলাইহিস সালাম তাদেরকে পবিত্র ভূমিতে প্রবেশের আহ্বান জানালেন, তারা তাতে অস্বীকার করল। আর এ কথা বলে তার বিরুদ্ধাচরণ করল যে,
قَالُوا يُمُوسَى إِنَّا لَنْ نَّدْخُلَهَا أَبَدًا مَّا دَامُوْا فِيْهَا فَاذْهَبْ أَنْتَ وَ رَبُّكَ فَقَاتِلَا إِنَّا هُهُنَا قُعِدُوْنَ.
অর্থ: হে মুসা, আমরা কখনই তাতে প্রবেশ করব না, যতক্ষণ তারা তথায় থাকবে। তাই তুমি এবং তোমার রব গিয়ে তাদের সাথে লড়াই করো, আমরা এখানে বসে রইলাম।
তখন মুসা আল্লাহর কাছে এই দুআ করলেন,
قَالَ رَبِّ إِنِّي لَا أَمْلِكُ إِلَّا نَفْسِي وَأَخِي فَافْرُقْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ الْقَوْمِ الْفُسِقِينَ.
অর্থ: হে আমার রব! আমি আমার এবং আমার ভাই ব্যতীত কারও বিষয়ে কর্তৃত্ব রাখি না। সুতরাং আপনি আমাদের এবং পাপাচারী সম্প্রদায়ের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিন।
এ ছাড়া হযরত ইবরাহিম খলিল আলাইহিস সালামও নিজ পাপাচারী সম্প্রদায়ের সাথে উঠাবসা ত্যাগ করে তাদের বলেছিলেন,
وَ اعتَزِلُكُم وَ مَا تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ وَ اَدعُوا رَبِّي عَسَى أَلَّا أَكُونَ بِدُعَاءِ رَبِّي شَقِيًّا.
অর্থ: আর আমি তোমাদের ও আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত তোমরা করো তাদের পরিত্যাগ করছি এবং আমি আমার রবের ইবাদত করছি। আশা করি আমার রবের ইবাদত করে আমি ব্যর্থ হব না।
তিনি আরও বলেন, وَ قَالَ إِنِّى ذَاهِبٌ إِلَى رَبِّى سَيَهْدِيْنِ. অর্থ: আমি আমার রবের পথে যাত্রা করছি। অবশ্যই তিনি আমাকে সঠিক পথ দেখাবেন।
ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে মর্যাদা ও সম্মান দান করেন। আর তাঁকে উত্তম বিনিময় ও প্রতিদান দেন। যেমনটা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন,
فَلَمَّا اعْتَزَلَهُم وَ مَا يَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ وَهَبْنَا لَهُ إِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَ كُلَّا جَعَلْنَا نَبِيًّا. وَ وَهَبْنَا لَهُم مِّن رَّحْمَتِنَا وَ جَعَلْنَا لَهُم لِسَانَ صِدْقٍ عَلِيًّا.
অর্থ: অতঃপর যখন সে তাদেরকে এবং আল্লাহ ছাড়া যাদের তারা ইবাদত করত তাদের সবাইকে পরিত্যাগ করল, তখন আমি তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুব এবং তাঁদের প্রত্যেককে নবী করলাম। আর আমি তাঁদেরকে আমার অনুগ্রহ দান করলাম আর তাঁদের সুনাম-সুখ্যাতিকে সমুচ্চ করলাম।
তাই যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পাপাচারীদের সঙ্গ ত্যাগ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে এভাবেই সম্মানিত করেন। আর যে আল্লাহর ভয়ে কোনো কিছু ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাআলা তাকে তার চেয়ে উত্তম বিনিময় দেন।
তাই আমরা একজন ফকিহ আলেমকে শত ব্যক্তির হত্যাকারীকে তার নিজ জায়গা ও আবাসস্থল ত্যাগ করে আল্লাহর ইবাদতগুজার সৎ বান্দাদের পবিত্র ভূমিতে চলে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিতে দেখতে পাই। সেখানে যেন সেও তাদের সাথে আল্লাহর ইবাদত করতে পারে। এটি ফেতনা থেকে বাঁচার অনেক কার্যকরী একটি পন্থা।
বুখারি ও মুসলিম শরিফে হযরত আবু সায়িদ খুদরি রাযি. হতে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের পূর্ববর্তী (বনি ইসরাইলের যুগে) এক ব্যক্তি ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছিল। অতঃপর সে লোকদের নিকট বিশ্বের সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তাকে এক খ্রিষ্টান রাহেবের কথা বলা হলো। সে তার কাছে এসে বলল, সে ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছে। এখন কি তার তাওবার কোনো সুযোগ আছে? সে বলল, না। সুতরাং সে (ক্রোধান্বিত হয়ে) তাকে হত্যা করে একশ পূরণ করল। পুনরায় সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। এবার তাকে এক আলেমের খোঁজ দেওয়া হলো। সে তার নিকট এসে বলল, সে একশ মানুষ খুন করেছে। সুতরাং তার কি তাওবার কোনো সুযোগ আছে? সে বলল, হ্যাঁ, আছে! এমন কে আছে, যে তোমার ও তাওবার মধ্যে বাধা সৃষ্টি করবে? তুমি অমুক দেশ চলে যাও। সেখানে কিছু লোক এমন আছে, যারা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে। তুমিও তাদের সাথে আল্লাহর ইবাদত করো। আর তুমি নিজ দেশে ফিরে যেয়ো না। কেননা, ওটা পাপের দেশ। সুতরাং সে ব্যক্তি ওই দেশে যেতে শুরু করল।
যখন সে মধ্যরাস্তায় পৌঁছল, তখন তার মৃত্যু এসে গেল। (তার দেহ-পিঞ্জর থেকে আত্মা বের করার জন্য) রহমত ও আজাবের উভয় ফেরেশতা উপস্থিত হলেন। ফেরেশতাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হলো। রহমতের ফেরেশতাগণ বললেন, এই ব্যক্তি তাওবা করে এসেছিল এবং পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর দিকে তার আগমন ঘটেছে। আর আজাবের ফেরেশতারা বললেন, সে এখনো ভালো কাজ করেনি (এই জন্য সে শাস্তির উপযুক্ত)। এমতাবস্থায় একজন ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করে উপস্থিত হলেন। ফেরেশতাগণ তাকে সালিস মানলেন। তিনি ফয়সালা দিলেন, তোমরা দুই দেশের দূরত্ব মেপে দেখো। (অর্থাৎ সে যে এলাকা থেকে এসেছে সেখান থেকে এই স্থানের দূরত্ব এবং যে দেশে যাচ্ছিল তার দূরত্ব) এই দুয়ের মধ্যে সে যার দিকে বেশি নিকটবর্তী হবে, তারই অন্তর্ভুক্ত হবে। অতএব তারা দূরত্ব মাপলেন এবং যে দেশে সে যাওয়ার ইচ্ছা করেছিল, সেই (ভালো) দেশকে বেশি নিকটবর্তী পেলেন। সুতরাং রহমতের ফেরেশতাগণ তার জান কবজ করলেন।
মুসলিম শরিফের অন্য বর্ণনায় এভাবে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু সায়িদ খুদরি রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এক ব্যক্তি ৯৯ ব্যক্তিকে হত্যা করে জিজ্ঞাসা করে বেড়াতে লাগল, তার কি তাওবা করার সুযোগ আছে? অবশেষে সে এক পাদরির নিকট এসে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। পাদরি বলল, তোমার জন্য তাওবার সুযোগ নেই। তখন সে পাদরিকেও হত্যা করল। এরপর সে আবারও লোকদের জিজ্ঞাসা করতে লাগল। তারপর সে এক জনপদ থেকে অন্য জনপদের উদ্দেশে রওনা হলো, যেখানে কিছু নেক লোক বসবাস করছিল। চলার পথে এক পর্যায়ে তার সামনে মালাকুল মওত উপস্থিত হলো। তখন সে বুকের ওপর ভর করে সামনের দিকে অগ্রসর হলো। তারপর সে মারা গেল। তখন রহমতের ফেরেশতা ও আজাবের ফেরেশতা তার ব্যাপারে বিবাদে লিপ্ত হলো। তখন দেখা গেল, সে নেক লোকদের জনপদের দিকে এক বিঘত পরিমাণ নিকটবর্তী রয়েছে। তাই তাকে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হলো。

টিকাঃ
২৬. সুরা মায়েদা: ২৪।
২৭. সুরা মায়েদা: ২৫।
২৮. সুরা মারইয়াম: ৪৮।
২৯. সুরা সাফফাত: ৯৯।
৩০. সুরা মারইয়াম: ৪৯-৫০।
৩১. বুখারি শরিফ: ৩৪৭০; মুসলিম শরিফ: ৭১৮৪-৭১৮৫।
৩২. মুসলিম শরিফ: ৭১৮৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00