📘 সৎ মানুষের হৃদয়ে শয়তান প্রবেশর ধরণ ও প্রকৃতি > 📄 কৃত্রিম পূর্ণতা

📄 কৃত্রিম পূর্ণতা


পাঁচ :
কৃত্রিম পূর্ণতা
'তুমি পরিপূর্ণ'- মানুষের সমাজে এ অনুভূতি জাগিয়ে তোলে শয়তান। বলে, তুমি অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ। তুমি নামায পড়, অন্যরা অনেকেই নামায পড়ে না। তুমি রোযা রাখ, অন্যরা অনেকেই রোযা রাখে না। এভাবে নেক আমলের ক্ষেত্রে সে আপনাকে অধস্তনদের প্রতি তাকাতে শেখায়। এ সব কিছু সে আপনাকে আমল থেকে দূরে সরানোর জন্য করে, যখন আপনি নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবেন, তখন বিভ্রান্ত হয়ে অনেক আমল-ভালকাজ থেকে দূরে সরে যাবেন।
তোমার আমলই তোমার জন্য সুপারিশ করবে বলে ব্যক্তিকে শয়তান মুবাহ আমলে লিপ্ত রাখে। তারপর বলে খানিক বিশ্রাম নিন; আপনিতো ব্যস্ত, আপনি তো অন্যদের তুলনায় ভালো। এসব বলে কালক্ষেপণ করায় এবং ভালকাজ ও আমল থেকে তাকে বিরত রাখে।
উচিততো ছিল উল্টোটা, নেক আমলের ক্ষেত্রে যারা অগ্রগামী তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করা, অর্থাৎ এক ব্যক্তি সোম-বৃহঃ- রোজা রাখে, কিন্তু আপনি রাখেন না; এক ব্যক্তি তাহাজ্জুদের নামায আদায় করে, আপনি করেন না। এক ব্যক্তি অধিক নফল আমল করে, কিন্তু আপনি করেন না... তার প্রতি দৃষ্টিপাত করা আপনার কর্তব্য ছিল।

📘 সৎ মানুষের হৃদয়ে শয়তান প্রবেশর ধরণ ও প্রকৃতি > 📄 নিজের সত্ত্বা ও তার সামর্থ্যের সঠিক মূল্যায়ন না করা

📄 নিজের সত্ত্বা ও তার সামর্থ্যের সঠিক মূল্যায়ন না করা


ছয় :
নিজের সত্ত্বা ও তার সামর্থ্যের সঠিক মূল্যায়ন না করা।
সত্ত্বার মূল্যানের ক্ষেত্রে শয়তানের দু'টো দৃষ্টিভঙ্গি আছে
দৃষ্টিভঙ্গি-১. আত্মতুষ্টি ও অহমিকাঃ
প্রথমত শয়তান মানুষকে নিজ সত্ত্বার প্রতি বিমুগ্ধদৃষ্টি প্রদানে প্রবৃত্ত করে। তুমি নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ, কত কী-ই না করেছ। তখন ঐ ব্যক্তির (মনস্তাত্তিক) পরিবর্তন ঘটে; ক্রমশ সে অহংকারী হয়, অহমিকা তাকে আচ্ছন্ন করে। অন্যদের সে তখন অবজ্ঞা করে, সত্য প্রত্যাখ্যান করে এবং ভুল করলে সংশোধনে অস্বীকৃতি জানায়। অন্যদের থেকে শিখতে, ইলমের আলোচনায় বসতে অনীহা প্রদর্শন করে। এ জাতীয় কোনো কোনো হালকায় (আলোচনা সভায়) আমি প্রত্যক্ষ করেছি যে, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতে যখন কোনো ব্যক্তি ভুল করে, তখন ভুল শুদ্ধ হওয়া পর্যন্ত হালকাগুলো অবধারিত করে নেয়ার পরিবর্তে সে তৎক্ষনাৎ হালকাগুলোর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। জন সমক্ষে লজ্জিত হবে, এ ভয়ে গোটা জিন্দেগী সে শেখে না।
একটু চিন্তা করলেই সে বুঝত, যে ভালভাবে পড়তে সক্ষম সে ব্যক্তিও কোনো একদিন তার মতই ছিল। (পড়তে জানতো না) তারপর শিখেছে। ঐ ব্যক্তির এ গুণটি যতদিন রইবে ততদিন তার সঙ্গ দেবে। তার উপকারে আসবে। কবি বলেন- যখনই তুমি কোন রাজপুরুষের সঙ্গ পাবে, তার লোকসমাজে গুপ্ত দোষগুলোও তুমি জানবে।
এ জন্য মন্দ স্বভাব লুকানো নয় বরং এর থেকে নিস্কৃতি পেতে আত্ম প্রশিক্ষণে সচেষ্ট হওয়া আবশ্যক।
দৃষ্টিভঙ্গি-২. বিনয় ও হীনমন্যতা
শয়তান আপনাকে বলবে বিনয় অবলম্বন অত্যন্ত জরুরী। যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয় অবলম্বন করবে আল্লাহ তার মর্যাদা সমুন্নত করবেন।
আর তুমি এ বিষয়ের যোগ্যও নও। এটাতো মনীষীদের কাজ। এর দ্বারা শয়তানের উদ্দেশ্য, আপনাকে আপনার মিশনচ্যুত করা। আর এটা হবে বিনয়ের মাধ্যমে।
শয়তান আপনাকে হীনমন্যতার এমন পর্যায়ে ঠেলে দেবে, যেন আপনার ধারণা জন্মে যে, আত্মশক্তির উৎকর্ষ সাধনে সত্ত্বাগত শক্তি দিয়ে আপনি কোনরূপ উপকৃত হতে পারবেন না। তাই আত্মশক্তির উন্মেষ ঘটাতে আপনি সচেষ্ট হবেন না। অথচ আমরা প্রত্যেকেই নিজ-নিজ শক্তি ও সামর্থ্যের ব্যাপারে দায়িত্বশীল; এর উৎকর্ষ সাধন অত্যাবশ্যক। যদি উৎকর্ষ সাধন না করা হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে এর জন্য জওয়াবদিহি হতে হবে। দিতে হবে হিসাব।
এটা মূলতঃ বিনয় নয়, দায়িত্ব হতে পলায়ন, কর্তব্যে ফাঁকি। কিন্তু শয়তান তাকে বলে, তোমার তুলনায় শ্রেষ্ঠ যারা, তাদের জন্য এ অঙ্গন ছেড়ে দাও। দাওয়াত তো উঁচু কাজ; অন্যান্য সাধারণ ব্যক্তিদের কাজ। কখনও শয়তান এর সহায়ক ভাবনা নিয়েও আসে। দায়িত্ব পালনে কোন ব্যক্তি কখনও ভুল করে। তখন শয়তান তার মনে ভুলের ব্যাপকতার ধারণা সৃষ্টি করে যে, এমন ভুলতো সবাই করে ব্যাপকতার এ ধারণাটাও শয়তানের পথ এবং কাজ।

📘 সৎ মানুষের হৃদয়ে শয়তান প্রবেশর ধরণ ও প্রকৃতি > 📄 সন্দেহ সৃষ্টি

📄 সন্দেহ সৃষ্টি


সাত :
সন্দেহ সৃষ্টি
'সন্দেহ সৃষ্টি' শয়তানের ভয়ঙ্কর পথসমূহের অন্যতম। যে পথে শয়তান মানুষের অভ্যন্তরে, আবির্ভূত হয়। কিন্তু কীভাবে তা করে? নিষিদ্ধকৃত বস্তু থেকে দূরে, আল্লাহর নির্দেশের অনুগামী, নিষ্ঠাবান এমন এক ব্যক্তির অনুসৃত জীবন পদ্ধতির শুদ্ধতার ব্যাপারে শয়তান সন্দেহের সৃষ্টি করে।
কিভাবে?
শয়তান প্রথমে তার কাছে আসে। তারপর তার অনুসৃত পথের শুদ্ধতার ব্যাপারে তাকে সন্দিহান করে। বিশেষ করে যখন অসৎ মানুষটি মন্দলোকদের যারা আল্লাহর নির্দেশ মানে না তাদের সাথে মেশে, তখন শয়তান তাঁকে কু-মন্ত্রণা দেয় 'এত মানুষ! সবাই জাহান্নামী!! আর তুমি একা জান্নাতী?!
সঠিক কথা হল, সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও সংখ্যা লঘিষ্টতাকে মাপকাঠি না বানানো। বরং আল্লাহ ও রাসূলের কথানুযায়ী হলে সেটাই হক। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মাপকাঠি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়; সত্যানুবর্তিতা। তাই আপনি যদি একাই সত্যানুবর্তী হন, তবুও আপনিই আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত। আল্লাহ তা'আলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন-
وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ ﴾ [يوسف: ١٠٣]
“আপনি যতই কামনা করেন না কেন, অধিকাংশ লোকই ঈমান আনবার নয়।” (অর্থাৎ কম সংখ্যক লোকই ঈমানের দৌলত পেয়ে থাকে।)
তাবেয়ী নু'আইম ইবন হাম্মাদ রহ. বলেন, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আত তাই, যা আল্লাহর আনুগত্য মোতাবেক চলে।
জামা'আত যদি পথচ্যুত হয়, তাহলে আপনার কর্তব্য, জামা 'আত পথচ্যুত হওয়ার পূর্বে পোষিত আকীদাকেই আঁকড়ে থাকা। এ ক্ষেত্রে যদি আপনি একাও হন তবুও আপনিই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত।'
নিয়্যতে সন্দেহ সৃষ্টি শয়তানের প্রবেশ পথের অন্যতম। তাই নিয়‍্যাতে সন্দেহ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে লোকদেরকে সে বলে, আপনি রিয়াকার (লোক দেখানো ভাবনা পোষণকারী) আপনি প্রদর্শন প্রিয়, আপনি কপট। আপনি নেক আমল বা সৎকর্ম করেছেন মানুষের কারণে। ব্যক্তিকে আমল পরিত্যাগী করাতে সে এসব বলে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।
এর একটা উদাহরণ :
এক ব্যক্তি সাদকা করার ইচ্ছা পোষণ করল। অন্য এক ব্যক্তি তাকে দেখে ফেললো। তখন সে মনে মনে বললো, যদি সে আমাকে দেখে তাহলে রিয়াকার ভাববে। তারচে' সাদকা না করাই ভাল। (এভাবে নিয়্যাতে সন্দেহ সৃষ্টি করে নেক আমল পরিত্যাগ করায় শয়তান।)
নিয়্যতের ক্ষেত্রে আমরা আত্ম-সমালোচনা ও আত্ম যাচাইয়ের প্রতি আদিষ্ট, যাতে নিয়্যতটা একান্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়।
বিখ্যাত তাবেয়ী ইবরাহীম ইবন আদহাম রহ. বলেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ত্রিশজন সাহাবীকে পেয়েছি প্রত্যেকেই নিজের ব্যাপারে ইখলাসহীন আমলের আশঙ্কা করেছেন।
আত্মযাচাই ও আত্মসমালোচনা কাম্য। তবে এমন আত্মযাচাই নয়, যা আপনাকে আমল পরিত্যাগকারীতে পরিণত করবে। বরং আমলের মান ও পরিমাণ বৃদ্ধি করবে এমন আত্মযাচাই ও আত্ম-সমালোচনাই কাম্য।
হারেস ইবন কায়েস রা. বলেন- “আপনি নামাযরত এ অবস্থায় শয়তান এসে যদি আপনাকে বলে 'তুমি তো মানুষকে দেখানোর জন্য নামায পড়ছো' তাহলে নামায আরো দীর্ঘ করুন।”

📘 সৎ মানুষের হৃদয়ে শয়তান প্রবেশর ধরণ ও প্রকৃতি > 📄 ভীতি প্রদর্শন

📄 ভীতি প্রদর্শন


আট :
ভীতি প্রদর্শন
মানুষকে দু'পন্থায় শয়তান ভীতি প্রদর্শন করে।
ভীতি প্রদর্শনের প্রথম পন্থাঃ
শয়তানের বন্ধুদের ভয়
শয়তান লোকদেরকে তার সেনা ও সাঙ্গপাঙ্গ, পাপী-ফাসিকদের সম্পর্কে ভয় দেখিয়ে বলে, এদের থেকে সাবধান! এরা সুবিপুল শক্তির অধিকারী। তখন ভয়ে লোকেরা আল্লাহর আনুগত্য পরিত্যাগ করে আমল ছেড়ে দেয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّوْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴾ [ال عمران: ١٧٥]
“শয়তানই তোমাদের তার বন্ধুদের ভয় দেখায়। সুতরাং যদি তোমরা মু'মিন হও, তবে তোমরা তাদেরকে ভয় করো না। কেবলমাত্র আমাকেই ভয় কর।” (সূরা আলে ইমরান : ১৭৫)
অর্থাৎ শয়তান আপনাদেরকে তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের ভয় দেখায়। কাফের, মুশরিক, মুনাফিক শক্তির ভয় দেখিয়ে আপনাকে দুর্বল করতে চায়।
ভীতি প্রদর্শনের দ্বিতীয় পন্থাঃ
দারিদ্রের ভয়
আল্লাহ তা'আলা বলেন-
الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاءِ ﴾ [البقرة: ٢٦٨]
"শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্রের ভয় দেখায় এবং কার্পণ্যের নির্দেশ দেয়।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২৬৮]
শয়তান লোকদেরকে বলে, এ চাকরিটা ছেড়ে দিলে আরেকটা চাকরি কোথায় পাবে?
তুমি تو নিতন্ত দরিদ্র হয়ে যাবে। তখন লোকেরা দারিদ্রের ভয় করে এবং হারামে লিপ্ত হয়। যে ব্যক্তি মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও মদের কেনা-বেচা, সূদী লেন-দেন, মুসলিমদের শত্রুদের উৎপাদিত পণ্যের ব্যবসা ও বিপনন বৈধ মনে করে এটা তার উদাহরণ। আল্লাহর আশ্বাসে আস্থা না রেখে মুক্তির আশা নিয়ে রিযকের জন্য আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়ায় শয়তান তাকে নিয়ে হাসে। কারণ, রিযকের ব্যাপারে আল্লাহ তা 'আলা স্বয়ং বলেন-
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ ﴾ [الطلاق: ٢، ٣]
“যে ব্যক্তি আল্লাহ র তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তার পথ করে দেবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রিযক দান করবেন।” (সূরা আত-তালাক : ২-৩)
আমরা সুদ গৃহীতাকে দারিদ্র শঙ্কায় শঙ্কিত হতে দেখি। সে বলে, কীভাবে বাঁচব? মানুষ তো স্বচ্ছল হয়ে গেল। আর আমি আজো নিঃস্ব!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00