📄 করব-করছি
চার :
করব-করছি, এরকম কাল বিলম্ব করা
করব-করছি, কাল বিলম্ব করা, প্রলম্বিত আশা, বা অনেকে যে বলে, 'কঠিন সমস্যায় আছি' ইত্যাদি সবই শয়তানের প্রবেশ পথ। অনেকেই সাধারণ কোনো একটা বিষয়কে 'প্রতিবন্ধক' সাব্যস্ত করে। যেমন বলে, 'পড়া-লেখা শেষ করে ইনশাআল্লাহ' তাওবা করব। এটা পড়া লেখার প্রতিবন্ধকতা। পড়া-লেখার পাঠ চুকিয়ে বলে, ঐ চাকরিটা পেলে 'তাওবা' করব, যখন 'বিবাহ' করব, যখন... যখন... আর যখন! এ যখন শেষ হয় না কখনো।
মানুষ সর্বদা সামনে একটা কল্পিত বাঁধা দাঁড় করিয়ে রাখে। করব-করছি, ধীর-সুস্থে করে-করে প্রলম্বিত আশা নিয়ে জীবন যাপন করে। এভাবেই বেঁচে থাকে। অতঃপর মৃত্যুবরণ করে। কিছুই করতে পারে না। প্রকৃত জীবন শুরুই করে না।
📄 এরকম কাল বিলম্ব করা
আপনার কাছে শয়তানের চূড়ান্ত প্রত্যাশা, আপনাকে আমল থেকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা কিংবা আমল বিলম্বিত করা। আর এটা আল্লাহ ওয়ালাদের জন্য শয়তানের অবলম্বিত ভয়ংকর পথ।
শয়তান এসে আপনাকে কু-মন্ত্রণা দেবে যে, তুমি এখনও অন্যকে শিক্ষা দেয়া বা দাওয়াত দেয়ার মত উপযুক্ত নও, তাই নিজে শেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। অথচ একটি আয়াত জানলেও তা অন্যের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য আমরা আদিষ্ট। তাই যখনই কিছু শিখবেন অন্যকে তা শেখান! হোক তা একটি আয়াত!!
ইবনুল জাওযী রহ. 'তালবীসে ইবলীস' নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, 'শয়তান প্রচেষ্টায় দৃঢ় সংকল্প কত ব্যক্তিকে করব-করছির টালবাহানায় ফেলেছে! অর্থাৎ এই তো করব বলিয়েছে । উৎকর্ষের পথে ধাবমান কত ব্যক্তির সময় ক্ষেপন করিয়েছে ! অনেক সময় বিদ্যান ব্যক্তি পাঠ পূর্ণ অধ্যয়নের ইচ্ছা করেন, তখন শয়তান বলে, 'খানিক বিশ্রাম নিন' এভাবেই সে অলসতাকে বানাচ্ছে প্রিয়, আর কাল ক্ষেপন করাচ্ছে বিরামহীনভাবে।
অনেক সময় রাতে নামাযে অভ্যস্ত 'আবেদের কাছে এসে শয়তান বলে, রাত এখনও অনেক বাকী! এভাবেই সকাল হয়ে যায়, কিন্তু 'আবেদের আর নামায আদায় করা হয় না।
📄 কৃত্রিম পূর্ণতা
পাঁচ :
কৃত্রিম পূর্ণতা
'তুমি পরিপূর্ণ'- মানুষের সমাজে এ অনুভূতি জাগিয়ে তোলে শয়তান। বলে, তুমি অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ। তুমি নামায পড়, অন্যরা অনেকেই নামায পড়ে না। তুমি রোযা রাখ, অন্যরা অনেকেই রোযা রাখে না। এভাবে নেক আমলের ক্ষেত্রে সে আপনাকে অধস্তনদের প্রতি তাকাতে শেখায়। এ সব কিছু সে আপনাকে আমল থেকে দূরে সরানোর জন্য করে, যখন আপনি নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবেন, তখন বিভ্রান্ত হয়ে অনেক আমল-ভালকাজ থেকে দূরে সরে যাবেন।
তোমার আমলই তোমার জন্য সুপারিশ করবে বলে ব্যক্তিকে শয়তান মুবাহ আমলে লিপ্ত রাখে। তারপর বলে খানিক বিশ্রাম নিন; আপনিতো ব্যস্ত, আপনি তো অন্যদের তুলনায় ভালো। এসব বলে কালক্ষেপণ করায় এবং ভালকাজ ও আমল থেকে তাকে বিরত রাখে।
উচিততো ছিল উল্টোটা, নেক আমলের ক্ষেত্রে যারা অগ্রগামী তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করা, অর্থাৎ এক ব্যক্তি সোম-বৃহঃ- রোজা রাখে, কিন্তু আপনি রাখেন না; এক ব্যক্তি তাহাজ্জুদের নামায আদায় করে, আপনি করেন না। এক ব্যক্তি অধিক নফল আমল করে, কিন্তু আপনি করেন না... তার প্রতি দৃষ্টিপাত করা আপনার কর্তব্য ছিল।
📄 নিজের সত্ত্বা ও তার সামর্থ্যের সঠিক মূল্যায়ন না করা
ছয় :
নিজের সত্ত্বা ও তার সামর্থ্যের সঠিক মূল্যায়ন না করা।
সত্ত্বার মূল্যানের ক্ষেত্রে শয়তানের দু'টো দৃষ্টিভঙ্গি আছে
দৃষ্টিভঙ্গি-১. আত্মতুষ্টি ও অহমিকাঃ
প্রথমত শয়তান মানুষকে নিজ সত্ত্বার প্রতি বিমুগ্ধদৃষ্টি প্রদানে প্রবৃত্ত করে। তুমি নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ, কত কী-ই না করেছ। তখন ঐ ব্যক্তির (মনস্তাত্তিক) পরিবর্তন ঘটে; ক্রমশ সে অহংকারী হয়, অহমিকা তাকে আচ্ছন্ন করে। অন্যদের সে তখন অবজ্ঞা করে, সত্য প্রত্যাখ্যান করে এবং ভুল করলে সংশোধনে অস্বীকৃতি জানায়। অন্যদের থেকে শিখতে, ইলমের আলোচনায় বসতে অনীহা প্রদর্শন করে। এ জাতীয় কোনো কোনো হালকায় (আলোচনা সভায়) আমি প্রত্যক্ষ করেছি যে, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতে যখন কোনো ব্যক্তি ভুল করে, তখন ভুল শুদ্ধ হওয়া পর্যন্ত হালকাগুলো অবধারিত করে নেয়ার পরিবর্তে সে তৎক্ষনাৎ হালকাগুলোর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। জন সমক্ষে লজ্জিত হবে, এ ভয়ে গোটা জিন্দেগী সে শেখে না।
একটু চিন্তা করলেই সে বুঝত, যে ভালভাবে পড়তে সক্ষম সে ব্যক্তিও কোনো একদিন তার মতই ছিল। (পড়তে জানতো না) তারপর শিখেছে। ঐ ব্যক্তির এ গুণটি যতদিন রইবে ততদিন তার সঙ্গ দেবে। তার উপকারে আসবে। কবি বলেন- যখনই তুমি কোন রাজপুরুষের সঙ্গ পাবে, তার লোকসমাজে গুপ্ত দোষগুলোও তুমি জানবে।
এ জন্য মন্দ স্বভাব লুকানো নয় বরং এর থেকে নিস্কৃতি পেতে আত্ম প্রশিক্ষণে সচেষ্ট হওয়া আবশ্যক।
দৃষ্টিভঙ্গি-২. বিনয় ও হীনমন্যতা
শয়তান আপনাকে বলবে বিনয় অবলম্বন অত্যন্ত জরুরী। যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয় অবলম্বন করবে আল্লাহ তার মর্যাদা সমুন্নত করবেন।
আর তুমি এ বিষয়ের যোগ্যও নও। এটাতো মনীষীদের কাজ। এর দ্বারা শয়তানের উদ্দেশ্য, আপনাকে আপনার মিশনচ্যুত করা। আর এটা হবে বিনয়ের মাধ্যমে।
শয়তান আপনাকে হীনমন্যতার এমন পর্যায়ে ঠেলে দেবে, যেন আপনার ধারণা জন্মে যে, আত্মশক্তির উৎকর্ষ সাধনে সত্ত্বাগত শক্তি দিয়ে আপনি কোনরূপ উপকৃত হতে পারবেন না। তাই আত্মশক্তির উন্মেষ ঘটাতে আপনি সচেষ্ট হবেন না। অথচ আমরা প্রত্যেকেই নিজ-নিজ শক্তি ও সামর্থ্যের ব্যাপারে দায়িত্বশীল; এর উৎকর্ষ সাধন অত্যাবশ্যক। যদি উৎকর্ষ সাধন না করা হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে এর জন্য জওয়াবদিহি হতে হবে। দিতে হবে হিসাব।
এটা মূলতঃ বিনয় নয়, দায়িত্ব হতে পলায়ন, কর্তব্যে ফাঁকি। কিন্তু শয়তান তাকে বলে, তোমার তুলনায় শ্রেষ্ঠ যারা, তাদের জন্য এ অঙ্গন ছেড়ে দাও। দাওয়াত তো উঁচু কাজ; অন্যান্য সাধারণ ব্যক্তিদের কাজ। কখনও শয়তান এর সহায়ক ভাবনা নিয়েও আসে। দায়িত্ব পালনে কোন ব্যক্তি কখনও ভুল করে। তখন শয়তান তার মনে ভুলের ব্যাপকতার ধারণা সৃষ্টি করে যে, এমন ভুলতো সবাই করে ব্যাপকতার এ ধারণাটাও শয়তানের পথ এবং কাজ।